কর্ণ

লেখালোক পাঠ প্রতিক্রিয়া
কর্ণ

বইয়ের নাম: কর্ণ 

লেখক: হরিশংকর জলদাস    

প্রকাশক: কথাপ্রকাশ   

প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩ 

তৃতীয় মুদ্রণ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩    

মুদ্রিত মূল্য: ৫০০ টাকা   

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৫২ 

গ্রন্থের প্রকৃতি: উপন্যাস 

প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা


১  

যদি কেউ প্রশ্ন করেন মহাভারতের কোন চরিত্রটি আমার ভালো লাগে, আমি বলবো কর্ণ। আর একারণেই হরিশংকর জলদাসের ‘কর্ণ’ উপন্যাসটা চোখে পড়া মাত্র কিনেছিলাম। লেখকের অনেকগুলো উপন্যাস এরমধ্যে পড়া হয়েছে। মধ্যবয়সে (৫৫ বছর) লেখালেখির জগতে এসেও পরীশ্রম করলে এবং লেগে থাকলে যে পাঠকদের মাঝে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব উনি তার প্রমাণ। এবারে আসি উপন্যাসের কথায়। মহাভারতের সবচেয়ে অবহেলিত অথচ অপরিহার্য চরিত্র হলেন কর্ণ। তিনি ছিলেন একাধারে জ্ঞানী এবং নীতিবোধের অধিকারী‚ শক্তিশালী‚ সেরা ধনুর্ধর এবং বুদ্ধিমান। জন্মমাত্র মা কুন্তী সমাজভয়ে তাকে নদীতে বিসর্জন দেন। মায়ের কাছে অবহেলিত হয়ে অধিরথ এবং রাধার সংসারে পরম আদরে বড় হন তিনি, তাকে বলা হয় রাধেয়। এভাবেই ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও তাকে সূতপুত্রের অপমান সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে। সূতপুত্র হওয়ায় কোনদিনও কারো কাছে যথাযথ মর্যাদা পাননি তিনি। অথচ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যখন বাধে তখন কর্ণ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তার সাথে তখন যোগাযোগ করেন কৃষ্ণ, ইন্দ্র, এমনকি কুন্তী। তবুও সহোদরদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে নামতে হয় তাকে।


ক্ষত্রিয় জাতির তীব্র বিরোধী ছিলেন পরশুরাম। কিন্তু তার মতো আচার্যর কাছে অস্ত্রশিক্ষা না পেলে তৃপ্ত হতে পারছিলেন না কর্ণ। তাইতো মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে তার কাছ থেকে অস্ত্রশিক্ষায় পারদর্শী হন। কিন্তু একদিন সত্যটা জানতে পেরে ক্ষিপ্ত পরশুরাম অভিশাপ দিয়েছিলেন‚ ‘যুদ্ধের অমোঘ শিক্ষাটা ঠিক যখন দরকার হবে তখন সেটা কর্ণের মনেপড়বে না।’ তার এই অভিশাপ বিফলে যায়নি। লেখক কর্ণ থেকে শুরু করে দুর্যোধন, বিদুর, কুন্তী, দ্রৌপদী, কৃষ্ণ ইত্যাদি উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র সমানভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষকরে মহাভারতের লিপিকারদের হাতে সবচেয়ে অবহেলিত, কর্ণের চরিত্রের নানাদিক লেখক দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন শব্দের শক্ত বুননে। তাই গল্পটা জানা থাকলেও লেখার মুন্সিয়ানার কারণে লেখক শেষ অবধি টানটান উত্তেজনার সাথে ধরে রাখতে পেরেছেন। এমনকি উপন্যাস পাঠ শেষে কর্ণের জন্য একধরণের ভালোলাগা ও বিষাদের রেশ থেকে যায়।


মহাভারতের ঘটনার প্রাচীনত্ব নিয়ে নানারকম মতবাদ আছে, অনেকে লৌহযুগের কথা বললেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র, শিরস্ত্রাণ, ঘোড়ায় টানা রথ এসবের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা থেকে ঘটনাটা যিশুখ্রিস্টের জন্মের ২৪০০-১৮০০ বছর আগের বলে অনুমান করা হয়। ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে কবির কল্পনার মিশেলে রচিত হয়েছে এই উপাখ্যান। গ্রিসের পাশাপাশি আদি তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগে টাইগ্রিস-ইউফ্রেতিস নদীর অববাহিকায় আসিরিয়া রাজত্বে, মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে যুদ্ধের প্রচলন ছিল, ব্যবহার ছিল ধাতব শিরস্ত্রাণ, তরোয়ালের। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দিল্লি থেকে ৬৮ কিলোমিটার দূরে সানৌলিতে মাথায় ধাতব ছাতা দেওয়া ঘোড়ায় টানা রথ, রাজকীয় সাজসজ্জার ৩টি কফিন-সহ আটটি সমাধিস্থল ও অস্ত্রশস্ত্রের নিদর্শন মিলেছে, যার সময়কাল পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে প্রায় ১৫০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তবে মূল ঘটনা যত প্রাচীন হোক না কেন আমাদের সমাজে এখনও একইরকম অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য এবং অবমাননা বিদ্যমান। সময় বদলেছে, মানুষের স্বভাব বদলায়নি।


২ 

ঋষি দুর্বাসা’র ঔরসে কুমারি মাতা পৃথা তথা কুন্তীর গর্ভে জন্ম হবার কারণে পুরো মহাভারত জুড়ে এই বীরকে পদে পদে বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে। কর্ণ ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন একজন তেজস্বী বীরযোদ্ধা হিসেবে অথচ রাজপুত্রদের অস্ত্র প্রদর্শনীতে কর্ণ যখন অর্জুনের সাথে লড়তে চান, তখন তাকে অপমান করে বলা হয় রাজার ছেলের সাথে সারথির ছেলের কখনোই লড়াই হতে পারেনা। সেসময় এই অপমান থেকে তাকে বাঁচায় দুর্যোধন। তাকে অঙ্গদ রাজ্যের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। এর বিনিময়ে কর্ণ দুর্যোধনের সাথে আমৃত্যু বন্ধুত্বের প্রতিজ্ঞা করেন। কর্ণ তার প্রতিজ্ঞা থেকে কখনো সরে আসেননি। যদিও তিনি জানতেন পাণ্ডবরাই ন্যায়ের পথে আছে। এমনকি কুন্তী স্বার্থপর এক নারীরূপে যখন কর্ণের সামনে উপস্থিত হন এবং কর্ণকে তার আসল পরিচয় জানিয়ে দুর্যোধনের পক্ষত্যাগ করতে অনুরোধ করেন তখনও তিনি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে কর্ণ তার জন্মদাত্রী মাকে খালি হাতে না ফিরিয়ে কথা দেন অর্জুন ছাড়া তার বাকি চার সন্তানকে হত্যা করবেন না। একারণেই যুদ্ধের এগারোতম থেকে পনেরোতম দিনের মধ্যে যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেবকে হত্যা করার সুযোগ পেয়েও করেননি।


কর্ণ পরাস্ত্র চেয়েছিলেন শুধুমাত্র অর্জুনকে। কেননা সবদিক দিয়ে যোগ্যতর হওয়া সত্ত্বেও অর্জুনকে অতিক্রম করতে না পারার অন্তর্দহন তাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলেছিল। কিন্তু যুদ্ধের ষোলতম দিনে অর্জুনকে নিরস্ত্র অবস্থায় পেলেও তখন সূর্যাস্ত হয়ে যাওয়ায় যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী তাকে ছেড়ে দিয়েছেন। এভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করেও তিনি যুদ্ধের নিয়ম মেনে চলেছেন। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! পরশুরামের অভিশাপের কারণে তাকে একের পর এক বাধার সম্মূখীন হতে হয়। দেবরাজ ইন্দ্র ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তার সহজাত সুরক্ষা কবচকুণ্ডল হরণ করেছেন। জন্মদাত্রী মা তাকে অন্যায় প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ করেছেন। দ্রোণাচার্য তাকে ছলনা করেছেন তার কাছে শিষ্যত্ব কালে। দেবতার আড়ালে দুর্দান্ত এক বর্ণবাদী কূটকৌশলী কৃষ্ণ তাকে ইন্দ্রপ্রস্থ ও দ্রৌপদীর প্রলোভন দেখিয়েছেন। দ্রৌপদী তাকে অপমান করেছেন আপন স্বয়ম্বর সভায়। শ্রীকৃষ্ণ কর্ণের রথে শল্যকে নিযুক্ত করেছেন মনোবল ও মনঃসংযোগ বিনষ্ট করার জন্য। কেননা কৃষ্ণ জানতেন কর্ণ অর্জুনের চেয়ে অনেক বড় ধনুর্ধর। যুদ্ধের সতেরোতম দিনে কর্ণের রথের চাকা ভেজা মাটিতে বসে গেলে অর্জুন কৃষ্ণের প্ররোচনায় নিরস্ত্র কর্ণকে হত্যা করতে দ্বিধা করেননি। এভাবে অনৈতিক যুদ্ধে অর্জুনের হাতে নিহত হয়েছেন মহাকাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠবীর কর্ণ। অথচ প্রথম কৌন্তেয় হিসাবে তিনিই রাজপরিবার, ইন্দ্রপ্রস্থ, দ্রৌপদী, সব কিছুরই অধিকারী ছিলেন। মহাভারতের যে দুটি চরিত্রকে সর্বাধিক অবমাননা সহ্য করতে হয়েছে, তারা হলেন কর্ণ এবং কৃষ্ণা বা পাঞ্চেলী বা দ্রৌপদী। দ্রৌপদী একসময় কৃষ্ণের কাছে কর্ণের কৌন্তেয় পরিচয় জানার পর আক্ষেপ করেছেন। তার মনে হয়েছিল, পঞ্চপাণ্ডবকে বিয়ে না করে কর্ণকে বিয়ে করলে অন্ততঃ ভরা সভায় তাকে বারবণিতা নামে ধিকৃত হতে হতো না। অর্জুনকে মহাভারত লিপিকাররা নানাবিধ বৈশিষ্ট্যে উজ্জল করে ফুটিয়ে তুললেও নিদারুন অবহেলায় যিনি আপন মহিমায় শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চশিখরে মহিমান্বিত হয়েছেন, তার নাম কর্ণ।


হরিশংকর জলদাসের লেখা এপর্যন্ত যে কয়েকটা উপন্যাস পড়েছি তারমধ্যে ‘কৈবর্তকথা’ আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তারপর ‘কর্ণ’। উপন্যাসের গায়ে বইয়ের মূল্য ৫০০ টাকা ছাপা থাকলেও রকমারি ডটকম তাদের ওয়েবসাইটে ৬০০ টাকা লিখে ১৪% ডিসকাউন্টে (৮৪ টাকা সেভ করার প্রলোভনে) ৫১৬ টাকা বিক্রয় মূল্য কেন দেখাচ্ছে জানিনা। কারণটা কেউ বলতে পারবেন কি?


উপন্যাসের সাথে মানানসই সুন্দর প্রচ্ছদ। সাদাকাগজে ঝকঝকে প্রিন্টিং। চমৎকার বাঁধাই।


হ্যাপি রিডিং 

শুভ কামনা নিরন্তর। 

সুমন সুবহান।



পোস্ট ভিউঃ 26

আপনার মন্তব্য লিখুন