বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার নিক্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

লেখালোক সমসাময়িক বিষয়
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার নিক্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

দূতাবাস হলো দুটো দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কেন্দ্র। কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে একটা দেশ আরেকটা দেশে দূতাবাস খোলে। কেননা এটি কূটনৈতিক আলোচনা, সমঝোতা চুক্তি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সহায়তা করে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে কিংবা পণ্যের বাজার সম্প্রসারণসহ বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা, বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে সংযোগ স্থাপনে দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ কাজ করে থাকে। এছাড়াও ভাষা, শিল্প, সংগীত, শিক্ষা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে দু’টি দেশের সরকার এবং জনগণ পর্যায়ে বন্ধন তৈরিতে দূতাবাসের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দূতাবাস সবসময় এই দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে পারে কি? সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশন অফিসগুলো ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে কি? বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের প্রতিটা প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতার আওতায় আসা উচিত।


বর্তমানে ঢাকার বারিধারায় ভারতীয় হাই কমিশনার অফিসের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং সিলেটে ৪ জন সহকারী হাই কমিশনার নিযুক্ত আছেন। ভারতেও অনুরূপ ভাবে বাংলাদেশের হাই কমিশনার অফিস নয়াদিল্লী ছাড়াও কলকাতা, ত্রিপুরা, চেন্নাই, গুয়াহাটি এবং মুম্বাইয়ে অবস্থিত।


সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশকিছু পণ্য, বিশেষ করে রেডিমেট পোশাক, খাবার আমদানিতে ভারত কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিয়েছে। এছাড়াও ফল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য, তুলা, সুতির পোশাক, প্লাস্টিক ও পিভিসি দিয়ে তৈরি জিনিস, রঞ্জকের মতো পণ্য আসাম, মিজোরাম, মেঘালয় বা ত্রিপুরাতে প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়টা আমাদের হাইকমিশন ও সহকারী হাইকমিশন অফিসের অর্থনৈতিক বিভাগের দেকভাল করার কথা। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্পের জন্য ভারত থেকে সূতা আমদানি একেবারে নিষিদ্ধ করেনি, কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীর অসাধু লেনদেন ঠেকাতে স্থলপথে নিষিদ্ধ করে সমুদ্র বা বিমানপথে আমদানির সুযোগ রেখেছে। স্থল বন্দরগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধার অভাব, সেটাও বড় কারণ।


সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় দেড়লক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ভারতে পালিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে অবস্থান করছে বলে জানা যায়। তারা এবং পুশ-ইন করা ভারতীয় নাগরিকরা সম্প্রতি এদেশের জন্য একধরণের নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি করেছে। গত ৪ মে ২০২৫ থেকে ৭ মে ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে যে ১৬৭জন নাগরিককে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই ভারতের গুজরাট এলাকার বলে জানা যায়। তাদেরকে এখনও ফেরত পাঠানো কিংবা এখন পর্যন্ত চলমান পুশ-ইন সমস্যার সুরাহা করা সম্ভব হয়নি।


ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে থাকা আমাদের হাইকমিশন অফিসগুলো আসলে কি কাজ করে আমি ঠিক ক্লিয়ার না। এরমাঝে কলকাতায় নবনিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার জনাব শাবাব বিন আহমেদ স্বপ্রণোদিত হয়ে আগামী কুরবানির ঈদে কলকাতা মিশনে কুরবানি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। যা কর্তৃত্ববাদী বিজেপি- আরএসএস এর মতাদর্শের সাথে মিলে যায়।


একটা তথ্যে দেখা যায়, ভারতে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ দিনদিন কমে যাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশী নাগরিকরা ভারতে ৫৩ কোটি টাকা খরচ করলেও গতবছরের নভেম্বরে ৪৭ কোটি, ডিসেম্বরে ৪০ কোটি, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩২ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২৯ কোটি এবং মার্চে তা ২৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এই হার ক্রমশ নিম্নমুখী হবার কারণ প্রতিবেশী দেশটাতে বাংলাদেশী রোগী ও পর্যটকদের সংখ্যা কমেছে। ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশীরা এখন সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীনমুখি হয়েছে।


আমার প্রশ্ন বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারতে বাংলাদেশের ৫টা সহকারী হাই কমিশন অফিস খোলা রাখার আদৌ প্রয়োজন আছে কীনা! সবচেয়ে ভাল হয় নয়াদিল্লীতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস চালু রেখে বাকিগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া। একইভাবে ভারতকেও বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশন অফিসটা চালু রেখে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং সিলেটের সহকারী হাই কমিশন অফিস বন্ধের পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অবস্থিত অফিসগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে যে অর্থের সাশ্রয় হবে তা দিয়ে মধ্যএশিয়া, পূর্বইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোয় নতুন নতুন অফিস খোলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্স হার বাড়ানো, ব্যবসা বা রফতানী পণ্যের জন্য নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বিভিন্ন দেশে চাকরির সংস্থান করে বেকারত্বের হার কমানো হতে হবে একমাত্র এজেন্ডা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরীপে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৩.৬৯% এ দাঁড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে, সংখ্যাটা ২৬ লাখ ১০ হাজার জন।


ভবিষ্যতে ভারত সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের দৃশ্যমান সমমর্যাদার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত হলে এসব অফিস পুনরায় চালুর বিষয়টা ভাবা যেতে পারে। একজন আয়কর দাতা হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা।


(তথ্যসূত্র: ১৮ ও ১৯ মে ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক আমারদেশ এবং ইন্টারনেট)  



পোস্ট ভিউঃ 28

আপনার মন্তব্য লিখুন