স্বাধীনতার ঘোষণা: আওয়ামী ন্যারেটিভ এবং একটি ঐতিহাসিক ছবি নিয়ে কিছু কথা

লেখালোক সমসাময়িক বিষয়
স্বাধীনতার ঘোষণা: আওয়ামী ন্যারেটিভ এবং একটি ঐতিহাসিক ছবি নিয়ে কিছু কথা

০৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে আমাদের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী’র মাঝে ভিডিও সংলাপ হয়েছে। আমি তাদের এই সংলাপের প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। কথা বলবো ভারতীয় সেনাপ্রধানের পিছনের ছবিটা নিয়ে। ছবিতে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে দলিলে স্বাক্ষররত মিত্রবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। দু’জনের ঠিক মাঝে পূর্বাঞ্চল বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চান্দ দেওয়ান, লেঃ জেনারেল নিয়াজির পিছনে পূর্বাঞ্চল সেনাবাহিনীর চিফ অভ স্টাফ মেজর জেনারেল এফ আর জ্যাকব, লেঃ জেনারেল অরোরার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরাল এস এম নন্দা। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে স্বাক্ষর করা আত্মসমর্পণের দলিলের এই ছবিটার দিকে তাকিয়ে পুরনো স্মৃতি মনেপড়লো। সেটা উল্লেখ করেই মূল প্রসঙ্গে যাবো।


২০১৯ সাল। 

তখন রংপুর সেনানিবাসে চাকুরী করছি।


সেনানিবাসের মূল প্রবেশ পথের বাম দিকে লম্বা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। দেয়ালে ‘৫২ থেকে ৭১’ শিরোনামে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের গ্রাফিতি করা হবে। প্রবেশপথে প্রথম পর্যায়ে আমার তত্ত্বাবধানে ‘Defender of the Strategic North’ নামাঙ্কিত আর্টিলারি গান ড্রিল এবং ‘অংশুমান’ শিরোনামে একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য নির্মাণ ও ল্যান্ডস্কেপিং করা হয়েছে। আমার সেই টিমের নক্ষত্র, বিপ্লব দত্তের সাথে প্রাথমিক আলোচনা শেষে গ্রাফিতির জন্য ছবি স্টাডি করতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুহুর্তের প্রসঙ্গ এসে যায়। তবে মূল ছবিটা খুঁজে পেতে নেটে বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করতে হলো, কারণ খণ্ডিত রঙিন ছবিটাই ইন্টারনেটে বেশি চোখে পড়ে, সবখানে ঘুরছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধে জয়লাভের একক কৃতিত্ব নেবার অভিলাসে ছবির বিকৃতি কিংবা প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করতেই পারে তবে বাংলাদেশ সরকারের ক্ষেত্রে একই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। কারণ আমি জানতাম সেদিন রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খন্দকার উপস্থিত ছিলেন, অথচ কোন ছবিতে তাকে রাখা হয়নি। সেদিনের স্বাক্ষরিত দলিলটা ইংরেজিতে লেখা, বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশি যৌথ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো………।


রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে সেনাকর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও তাদের সেনাপ্রধান উপস্থিত না থাকায়, প্রটোকলজনিত কারণে বাংলাদেশের বাহিনীর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালীন সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। তিনি উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খন্দকারকে কলকাতা থেকে ভারতীয় অফিসারদের সাথে রেসকোর্স ময়দানে পাঠিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে জেনারেল ওসমানী তার এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘ভারতীয় সেনাপ্রধান যদি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে বাংলাদেশের উপসেনা প্রধান থাকবেন।’ সেদিনের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে এ কে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাকে ছবিতে দেখা যায় না, কারণ আওয়ামীলীগ আমাদেরকে এই ন্যারেটিভ মেনে নিতে বলেছিল। কিন্তু কেন? সে উত্তরে পরে আসছি। কখনো কখনো ভারত এবং আওয়ামীলীগের ন্যারেটিভ একাকার হয়ে যায়। এটা তার স্পষ্ট উদাহরণ।


এ কে খন্দকার-এর নাম উল্লেখ করে সার্চ দিলে ইন্টারনেটে অবশেষে সাদাকালো ছবিটা খুঁজে পাই। তিনি অসামরিক পোষাকে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরাল এস এম নন্দার পাশে দাঁড়িয়ে। যাহোক গ্রাফিতির জন্য ডিজাইন রেডি করে সেসময়ে রংপুর সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডারকে দেখালে তিনি ডিজাইন থেকে এ কে খন্দকারের ছবিটা কেটে বাদ দিতে বলেন। আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘স্যার, উনি তো মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির পক্ষে সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং এটা ইতিহাসের অংশ।’ উত্তরে বললেন, ‘এই বিষয়ে উপরের নির্দেশনা আছে’, তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল আজিজ। সেনাবাহিনীতে সবসময় সিনিয়র যেটা বলবেন সেটাই সঠিক, তাই ওনার সাথে বিতর্কে না গিয়ে ঐ কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেই। ঐ দেয়ালটা এখনো খালি পড়ে আছে, গ্রাফিতিটা আর আঁকা হয়নি। হয়তো আর কখনো আঁকা হবেও না।


রংপুর সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার আমাকে উপরের যে নির্দেশনার কথা বলেছিলেন এবার সে প্রসঙ্গে আসি। ঐতিহাসিক ছবিটাতে মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খন্দকার থাকা বা না থাকার জটিলতাটা তৈরি করেছিলেন তিনি নিজেই। তার অপরাধ তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপরে ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ নামে একটা বই লিখেছিলেন, তার আরও অপরাধ তিনি সেখানে আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ না লিখে সত্যিটাই তুলে ধরেছিলেন। তার লেখা সত্য ইতিহাস শেখ হাসিনার পক্ষে স্বভাবতই মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এরফলে যা অবশ্যম্ভাবী ছিল তাই ঘটলো।


সরকারের চাপে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে তার বইয়ের একটি পুরো অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার এবং সংবাদ সম্মেলন করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। ০১ জুন ২০১৯ তারিখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সেই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমার লেখা বই ‘১৯৭১ ভেতরে বাহিরে’ ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর এর ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত বিশেষ অংশ ও বইয়ের আরও কিছু অংশ নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদ হয়। ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে উল্লেখিত অংশটুকু হলো, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনেকরি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। তিনি (বঙ্গবন্ধু) যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, জয় পাকিস্তান!


৩ 

বাস্তবতা হলো শেখ মুজিব বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সংগঠিত করলেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। ২৬শে মার্চ তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে রেডিওতে ভাষণ দেয়ার পরপরই দি ভয়েস অব বাংলাদেশ নামে একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে মর্মে যে ন্যারেটিভ চালু আছে তা সঠিক নয়। ২০১৫ সালে ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত শারমিন আহমদ-এর ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইটা নিয়ে বর্তমানে বেশ আলোচনা চলছে। এই বই নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বলেছেন, আওয়ামীলীগ যে ঘোষণার কথা বলে তা আসলে ওয়াপদা’র ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হকের দেয়া ঘোষণা, তার ভয়েস শেখ মুজিবের মতই ভরাট।


দেশ স্বাধীনের পর সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বেগম নুরজাহান সংসদে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে শেখ মুজিবের কাছে সুস্পষ্টভাবে জানতে চাইলে তিনি ইপিআর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ঘোষণা দেয়ার কথা বললেও সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর কারণ “পাকিস্তানি সেনারা আমাদের আক্রমণ করেছে অতর্কিতভাবে। তারা সর্বত্র দমননীতি শুরু করেছে। এই অবস্থায় আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম” মর্মে তাজউদ্দীন আহমদ-এর লেখা স্বাধীনতার খসড়া ঘোষণাটি শেখ মুজিবকে পাঠ করার প্রস্তাব দিলেও তিনি নিরুত্তর থাকেন এবং অনেকটা এড়িয়ে যান। এই পর্যায়ে তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবকে বলেছিলেন, “মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে। কেননা কালকে কী হবে, যদি আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়? তাহলে কেউ জানবে না যে আমাদের কী করতে হবে? এই ঘোষণা কোনো গোপন জায়গায় সংরক্ষিত থাকলে পরে আমরা ঘোষণাটি প্রচার করতে পারব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তাহলে সেটাও করা হবে।” শেখ মুজিব তখন প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, “এটা আমার বিরুদ্ধে একটা দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের বিচার করতে পারবে।


স্বাধীনতার সরাসরি এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটা এসেছিল ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে, মেজর জিয়াউর রহমানের কন্ঠে। এটাই ইতিহাস।



পোস্ট ভিউঃ 29

আপনার মন্তব্য লিখুন