১৩
স্বপ্নের শুরুটা।
সোনিয়া উপাখ্যান।
কালাবাবু একটা হত্যা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে কাসিমপুর কারগারে দীর্ঘ মেয়াদের সাজা খাটছেন। মানিকগঞ্জ থেকে শুরু করে সাভার-মিরপুর পর্যন্ত আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবকিছু তিনি জেলখানার সেলে বসেই নিয়ন্ত্রণ করেন। কালাবাবু আসলে ভীষণ ধুর্ত, আর তার আছে গ্রীক পুরাণের হাইড্রার মতো অসংখ্য মুখ-চোখ, তাই দিয়ে তিনি দারুণ দক্ষতায় তার এলাকা নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। কালাবাবুর চেহারা যতটা না কালো, তার মনটা তারচেয়ে আরও বেশী কালো। তবে তিনি কথা বলেন অত্যন্ত চিকন সুরে, যেটা আসলে তার দশাসই চেহারার সাথে একদম যায়না। এটা প্রকৃতির একটা বিস্ময়। তবে এটা তো ঠিক, জীবনে অপূর্ণতার দায় নিজেকেই বহন করতে হয়।
কালাবাবু জেলে থাকায় দলের সব ধরনের টাকা পয়সার হিসাব রাখে তার রক্ষিতা সোনিয়া, একসময়ের বিখ্যাত র্যাম্প মডেল। এখন তার বয়স ২৭ কিংবা ২৮ হবে। দারুণ ফিগার তার। পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার দীর্ঘ শরীরে ফর্সা সুন্দর ত্বক। তার চোরা দৃষ্টিতে এখনো আরেকটা ট্রয় নগরী ধ্বংস হতে পারে।
সোনিয়া একটা টিভি চ্যানেলের ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে একসময় খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছিল। খুলনার বি.এল কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়লেও তার মন কিন্তু পড়ে থাকত অন্য কিছুতে। পড়াশুনার বদলে নিত্য নতুন ফ্যাশনের পোশাক আর সাজগোজ নিয়ে তার মেতে থাকতে ভাল লাগত। কলেজে মৌলবাদী আর বামপন্থীদের মধ্যে আদর্শগত কারণে যতটা না মারামারি হত, তাকে প্রেমপত্র লেখা নিয়ে ছেলেদের মধ্যে মারামারিটা হত তার চেয়েও বেশী। সে যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড, আর তাতে ঝাঁপ দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকত উঠতি বয়সী ছেলেরা। তাকে ঘিরে এসব ধ্বংসযজ্ঞ সে অবশ্য বেশ উপভোগ করত। সৌন্দর্য আর মেধার উপযুক্ত সমন্বয় না থাকায় ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় সুবিধা করতে না পারলেও দলের গ্রুমিং এর দায়িত্বে থাকা কানিজ ফাতেমার দৃষ্টিতে সে পড়ে যায়। কানিজ ফাতেমা প্রায়ই দেশের নামকরা সব ফ্যাশন হাউজগুলোর জন্য ফ্যাশন শো এ্যারেঞ্জ করে থাকে।
এরপরের কয়েকটা বছর সোনিয়া দাপিয়ে বেরিয়েছে ঢাকার সব বড় বড় ফ্যাশন শো’র আলো ঝলমলে রানওয়ে’তে। দীর্ঘ সুডৌল পায়ের কারণে তার ক্যাটওয়াক ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। হয়ত এজন্যই সোনিয়ার অল্প সময়ের মধ্যে র্যাম্প মডেল হিসাবে বেশ খ্যাতি, অর্থ আর প্রাচুর্য চলে আসে। গ্ল্যামার আর সিনে ম্যাগাজিনের রঙিন পাতাগুলোতে তাকে নিয়ে নিয়মিত কাভারস্টোরি করা ছাড়াও সেন্টার স্প্রেডে বিভিন্ন ভঙ্গীতে তার বোল্ড ছবি নিয়মিত ছাপা হতে থাকে। তবে একসময় কালের অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া অন্য অনেক মডেলদের মত সেও নিয়মিত ইয়াবা, কোকেন, হিরোইন, মারিজুয়ানা ইত্যাদি সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মডেলিং এর পাশাপাশি তাকে কানিজ ফাতেমার নির্দেশে সমাজে অভিজাত শ্রেণীর ক্লায়েন্টদের দৈহিক চাহিদা মেটাতে রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল-গেস্ট হাউজে যেতে হয়। বাড়তি অর্থের লোভে সে একসময় ভালভাবেই এসবের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সমাজের অভিজাত শ্রেণী, ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ প্রশাসনের উচ্চমহলের লোকজনদের সাথে এভাবে তার পরিচয় ঘটে। সোনিয়ার এসব ঘটনা বিভিন্নজন হয়ে একসময় দেশের বাড়ীতে বাবা-মায়ের কান অবধি পৌঁছায়। তারা তাকে এ জগত থেকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। মডেলিং-এর জগতটা আসলে এক ধরনের নেশার মত। সহজে কাউকে এই জগত থেকে ছাড়ানো এক কথায় অসম্ভব। সোনিয়ার বাবা-মা অনেক তিক্ততার শেষে মেয়ের সঙ্গে সব ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
পরিবারের আপনজনদের সাথে বিচ্ছিন্নতার কারণে তখন সময়টা খুব খারাপ কাটছিল। এরকম সময়ই এক নামকরা ফ্যাশন হাউজের মালিক ও চিত্র নির্মাতা আরিফ আজিমের সাথে সোনিয়ার গাঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের প্রায়ই গুলশানের নামী রেস্টুরেন্টগুলোতে একসঙ্গে দেখা যেতে থাকে। সোনিয়ার ফুরফুরে প্রজাপতি দিনগুলো ভালই যাচ্ছিল। কিন্তু একদিনের এক দুর্ঘটনা তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় র্যাম্প মডেলিং-এর রঙিন জগত থেকে।
১৪
অতলের গভীরে।
এয়ারপোর্ট রোডের এক পাঁচ তারকা হোটেল।
সেটা ছিল দেশের নামকরা সব ফ্যাশন ডিজাইনারদের ডিজাইনে করা ব্রাইডাল ফ্যাশন শো। হালকা সুরের মূর্ছনা আর হাজারো দর্শকের চোখ এবং ক্যামেরার উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ লাইটের আলো ঝলকানিতে সোনিয়া রানওয়ে ধরে ক্যাট ওয়াক করছিল। স্টেজের ধবধবে সাদা স্পট লাইটটাও ওয়াক ওয়ে ধরে তাকে অনুসরণ করে। রাউন্ড শেষ হলে সে ব্যাক স্টেজে যেয়ে বসে, সোনিয়া জানে সে শো-স্টপার, নেক্সট রাউন্ড আসতে অনেক দেরী হবে। র্যাম্পে তখন পরবর্তী ইভেন্টের ছেলেমেয়েরা পারফর্ম করছিল, সে উইংস এর পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের পারফর্মেন্স দেখার পর ব্যাক স্টেজে বসে ড্রাগ সেবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি তার ট্রেনার কানিজ ফাতেমা নিষেধ করলেও সে গায়ে মাখেনা।
- এখন তো এসব করার সময় না সোনিয়া।
- ইটস ওকে আপু। সমস্যা হবেনা।
- অবশ্যই সমস্যা হবে।
- কিন্তু তোমার হাতে আমার বিকল্প তো কেউ নেই আপু। সো একসেপ্ট ইট।
- মানে!
- কিছুই না। আমি জানি, আই অ্যাম দ্যা বেস্ট।
কানিজ ফাতেমা চোয়াল শক্ত করে সোনিয়ার দিকে চেয়ে থাকেন, মুখে কিছু বলেন না। সোনিয়ার দাবী ড্রাগ নিলে তার ক্যাটওয়াক ভাল হয়, রানওয়েতে কনসেন্ট্রেশন থাকে। তার শরীরী ভাষায় একধরনের অহংকার ফুটে ওঠে। তবে সোনিয়ার যেমনটা দাবী, তার ক্যাটওয়াক আসলেই সেদিন বেশ ভাল হয়েছিল। সে প্রতিবারই শো-র দীর্ঘ রানওয়ে ধরে গর্বিত রাজহংসীর মত সাঁতরে যায়। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে একেবারে শেষ ইভেন্টে। সেটা ছিল ডিজাইনার মাসুদ আলমাসের ডিজাইনে বানানো ধবধবে সাদা ওয়েডিং গাউন। রানী ভিক্টোরিয়া বিয়েতে এ ধরনের পোশাক চালু করেন। স্পট লাইটের উজ্জ্বল আলোয় ধবধবে সাদা লিলি ফুলে ভর্তি ব্রাইডাল বাকেট হাতে সোনিয়াকে দেখতে আসলে রানি ভিক্টোরিয়ার চেয়ে কোন অংশে কম লাগছিল না। সে রানওয়ের মাথায় গর্বিত গ্রীবা উচিয়ে একটা স্মোকি লুক দিয়ে যখন ইউ টার্ন করছে, ঠিক তখনই এক অর্বাচীন ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটে তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। হিরোইনের কারণে ঘোরলাগা অনুভূতি কিংবা ক্যামেরার চোখ ধাঁধান ফ্ল্যাশে শরীরের ভারসাম্য হারালে তার গাউনের দীর্ঘ লেস পেন্সিল হিলে চাপা পড়ে। এরফলে হোঁচট খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলে সোনিয়ার ডান পায়ের এ্যাংকেল মচকে যায়।
পায়ের সমস্যার কারণে তাকে ব্যান্ডেজ বেঁধে অনেকদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে-বসে কাটাতে হয়। তবে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে জানতে পারে যে সে আর কানিজ ফাতেমার গ্রুপে নেই, তার জায়গায় অন্য কেউ কাজ করছে। কানিজ ফাতেমা ডাস্টবিনে কলার খোসা ছুড়ে ফেলার মত করে তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সোনিয়া সেদিনই প্রতিজ্ঞা করে, এ জীবনে কোনদিন সুযোগ পেলে সে এর চরম প্রতিশোধ নেবে।
অনেক জায়গায় চেষ্টা করলেও ড্রাগ এডিকশনের খবর ততদিনে বেশ চাউর হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই তাকে ইভেন্টের কাজে নিতে রিস্ক অনুভব করে। এই অসহ্য দিনগুলোতে যাকে সবচেয়ে বেশী পাশে প্রয়োজন ছিল সেই চিত্রনির্মাতাও তখন লাপাত্তা। পরে অবশ্য শুনেছে বিদেশে টাকা পাচার সংক্রান্ত একটা অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলার কারণে সে বিদেশে পালিয়ে গেছে। এদিকে তার হাতে জমানো টাকার অনেকটা হাসপাতালের খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েক মাসের বাড়ী ভাড়া বাকী পড়ে যায়। ভেবে পায়না সে কি করবে। বাবা-মা সম্পর্ক ছিন্ন করায় সেখানে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই, তাছাড়া সে নিজেও তাদের এ মুখ দেখাতে চায়না। অর্থের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে সে অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। জায়গা এবং মানুষগুলো তার পরিচিত, সোনিয়া ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকে অতলের আরও গভীরে।
১৫
গুলশান-১ ও ২ এর মাঝে একটা স্বল্প পরিচিত গেস্টহাউজ।
ঘন বর্ষার এক রাত।
কালাবাবু ক’দিন আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ায় তার সঙ্গীরা পার্টি দিয়েছে। ঘরের আলো আঁধারিতে সাউন্ড সিস্টেমে লাউড মিউজিক বাজছে। কয়েকজন ডান্সার বিচিত্র ভঙ্গিতে মিউজিকের তালে তালে নাচছে, তাদের পরনে পশ্চিমা সংক্ষিপ্ত পোশাক। গেস্টরা সবাই অপরাধ জগতের, তাদের কেউ বসে, কেউবা দাঁড়িয়ে। সবার হাতে মদের পেয়ালা কিংবা বিয়ারের ক্যান, ক্যান উপচে সাদা ফ্যানা পড়ছে কারো কারো হাতে। সিগারেট আর সীসা’র ধোঁয়ায় ঘরে দমবন্ধ হওয়ার মত অবস্থা। পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে সোনিয়া সেখানে নাচতে গিয়েছিল। টুকটাক মডেলিং এর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ভালো অফার পেলে তাকে ইদানিং এসবও করতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ নাচার পর পাশের রুমে যেয়ে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে সে তার জীবনের করুণ পরিণতির কথা ভাবছিল। নিয়তি তাকে কোথা থেকে কোথায় টেনে নামিয়েছে! তার বুক চিরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। কালাবাবুর ধুর্ত দৃষ্টিতে সেটা এড়ায়না। সে একসময়ের মডেল সম্রাজ্ঞী সোনিয়াকে দেখে ঠিকই চিনতে পারে। কিন্তু একি হাল হয়েছে তার! কথা বলার জন্য সোনিয়াকে ইশারায় কাছে ডাকে।
কালাবাবু স্পীকারের লাউড মিউজিক এড়াতে দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় বসতেই সোনিয়া যান্ত্রিক ভাবে তার পরনের কাপড় খুলতে শুরু করে। কালাবাবু একটু অবাক হয়, সে ধমক দিয়ে পোশাক পরতে বলে। এরপর তার দুরবস্থার কারণ জানতে চায়। সোনিয়া প্রথমে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়নি। অসহায় পরিণতির কথা সবাইকে বলে কি লাভ! সে জানে, তার জীবনের গল্প শুনে কারো মনে একটু করুণার উদ্রেক হয়ত হবে কিন্তু অবশেষে তো ঐ শরীরটাই বেচতে হবে! তাই অযথা সময় নষ্ট না করে বরং ঝটপট কাজ সেরে বাসায় ফিরতে পারলে তার জন্য ভাল হয়। আবার সে এও ভাবে, তার দুর্দশার জন্য যে সবচেয়ে বেশী দায়ী, অর্থাৎ কানিজ ফাতেমার ওপরে প্রতিশোধ নিতে হলে এনাদের মতই কাউকে তার প্রয়োজন। সে কালাবাবুর প্রতিপত্তি আর দুর্ধর্ষ জীবনের কথা শুনেছে, পত্রিকাতেও পড়েছে। আজ নিয়তি তাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে।
অনেক ভেবে অবশেষে সোনিয়া কালাবাবুর কাছে মেলে ধরে তার নিজের জীবনের করুণ ইতিহাস। বাবা-মা, স্কুল-কলেজ জীবন, ঢাকায় আসা, র্যাম্প মডেলিংএ ক্যারিয়ার গড়া কিছুই বাদ যায়না। কিভাবে ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় এসে কানিজ ফাতেমার নজরে পড়ে এবং এরপর তার গ্রুপে ঢুকে ফ্যাশন শো’র রানওয়েতে বিচরণ। তার নির্দেশে সমাজের বিভিন্ন জনের কাছে শরীর বিলানো। রাজী না হলে ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি ছেড়ে দেয়ার হুমকি। কানিজ কিভাবে তাদেরকে মাদকদ্রব্যে অভ্যস্ত করে শেষে স্লেভে পরিণত করে, অনর্গলভাবে সবকিছু বলে যায়। কালাবাবু চুপচাপ তার সব কথা শোনে। অপরের কস্ট এর আগে এভাবে কখনও তাকে স্পর্শ করেনি। সে সোনিয়ার প্রতি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাকে মাদকাসক্তি থেকে উদ্ধার করতে দেশের নামকরা এক রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করে দেয়। কয়েকমাস পরে সোনিয়া যখন মোটামুটি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে, তখন সে যেন অন্য এক নারী! সোনিয়া এরপর কালাবাবুর ফ্ল্যাটে শিফট করে তার সাথেই থাকতে শুরু করে, সোনিয়া কয়েকবার বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিল কিন্তু কালাবাবুর অনাগ্রহে তা বেশিদূর এগোয়নি। কালাবাবু আসলে সোনিয়াকে বিয়ে করে তার অনিশ্চিত জীবনের সাথে বাঁধতে চায়না। বরং সে দলের টাকা-পয়সার হিসাব ঠিকঠাক রাখলেই ভাল। কালাবাবু জানে, সে যতটা না জেলের বাইরে, তারচেয়ে জেলের কাঁটাতারের ভিতরেই বেশি সময় কাটাতে হয়। এরকম অবস্থায় একজন বিশ্বস্ত মানুষ খুব দরকার, যে তার অবর্তমানে বাইরের হিসাবকিতাব ঠিকঠাক ম্যানেজ করবে। সে জানে সবসময়ই জীবন-মৃত্যুর মাঝে তার অবস্থান। এরকম অবস্থায় বিয়ে করে আরেকজন মানুষকে জেনেবুঝে সে বিপদে ঠেলে দিতে চায় না। একটা চাপা অভিমান থাকলেও কৃতজ্ঞতা বোধের কারণে সোনিয়া সব মেনে নিয়েই তার সাথে দিন পার করে দিচ্ছে।
সোনিয়া কালাবাবুর ফ্ল্যাটে চলে আসার কয়েক মাস পরে পুলিশ কানিজ ফাতেমাকে মৃত অবস্থায় তার স্টাডি রুম থেকে উদ্ধার করে। তার অর্ধউলঙ্গ শরীর ঘরের সিলিঙ্গ ফ্যানের সাথে ঝুলছিল। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট থেকে পুলিশ জানতে পারে তার মৃত্যু রশিতে ঝুলে হয়নি, তাকে ধর্ষন করার পর গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই লোমহর্ষক কাজটা কে করেছে তা ফ্ল্যাটের দারোয়ান বা অন্য কেউ বলতে পারেনি। ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরা নষ্ট থাকায় কোন ফুটেজ সংগ্রহ করা যায়নি, ক্রাইম সীন থেকে পর্যাপ্ত আলামতের অভাবে পুলিশ কাউকে গ্রেফতারও করতে পারেনি। খবরের কাগজে কানিজ ফাতেমার মৃত্যু সংবাদ বেশ বড় করে ছাপা হয়। সোনিয়া নির্বিকার ভাবে সেদিনের পেপারটা উল্টিয়ে দেখে। সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে ওঠে তার মুখে। এখনও সে হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। গুলশান থানায় পুলিশ রেকর্ডে সেটা অমীমাংসিত কেস হিসেবে এখনো পড়ে আছে। সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে দারোয়ানকে কোর্টে চালান দিলেও যথাযথ স্বাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে কিছুদিন পর সে জামিনে বের হয়ে আসে। হত্যাকান্ড যারা ঘটিয়েছিল তারা বেশ প্রফেশনাল। র্যাবের ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশনেও কিছু পাওয়া যায়নি, প্লেস অফ অকারেন্সে দুর্বৃত্তরা কোন সূত্র ফেলে যায়নি।
১৬
জীবনের বিভীষিকা।
আন্ডারওয়ার্ল্ড মিরপুর।
আন্ডার ওয়ার্ল্ডে বিভিন্ন দলের মধ্যে বিরোধ বা মারামারি লাগলে চাঁদাবাজিতে ভাটা পড়ে। তাই নিজেদের প্রয়োজনেই বুদ্বুদের মত কোন ঝামেলার উৎপত্তি হলে তা’ মিটে যেতে কখনো সময় লাগেনা। কখনো খুব বেশী রকমের ঝামেলা হলে হয়ত দু’চারজন পোস্টার হয়ে পড়ে থাকে শহরের বিভিন্ন জায়গায়, অলিতে গলিতে। দু’চারদিন মর্গে লাশ পড়ে থাকার পর আঞ্জুমানে মফিদুলের গাড়ি এসে বেওয়ারিশ লাশগুলো নিয়ে দাফন করে। আন্ডার ওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতের সমস্যাগুলো আসলে এভাবেই আপনা আপনি মিটে যায়। মৃত ব্যক্তিকে কেউ কখনো মনেও রাখেনা, একসময় সবাই সবকিছু ভুলে যায়। দুর্ধর্ষ মানুষগুলো এভাবেই পুলিশের খাতায় স্রেফ সাদাকালো ছবি হয়ে যায়। পুলিশের কাছে এসব ঘটনা অবশ্য গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে, তাই তারা এসবে মাথা না ঘামিয়ে অন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সারে। আসলে থানার অপরাধী লিস্টে থাকা কেউ যদি এভাবে পরিস্কার হয়ে যায় তাতে তারা বরং খুশীই হয়।
পাঙ্খা নসুর সঙ্গে ব্যাঙ্গা বাবু, হোয়াইট মামুনসহ আরও কয়েকজন কাজ করে। নসুর হাতের কাজ ভালো, যেখানে এইম করে সেখানেই বুলেট লাগে। পিস্তলের মাজল থেকে বের হওয়া বুলেট সাধারণত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না, হাতও চলে দ্রুত, অনেকটা ওয়েস্টার্ন সিনেমার নায়ক ক্লিন্ট ইস্টউড-এর মতো করে সে পিস্তল ড্র করে। তাই দলে তার প্রচুর কদর আর লীডারও তাকে খুব পছন্দ করে। একদম কাছের লোক, বলতে গেলে সেই লীডারের ডান হাত। কয়েক বছর আগে লীডার গাজীপুরের এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অপারেশন শেষে ঢাকায় ফেরার পথে মাজুখানের দিকে পুলিশের এম্বুশে পড়ে। লীডার যদিও গাড়ির জানালার গ্লাস ভেঙ্গে বের হয়ে রাস্তার এক আরোহীর মটর সাইকেল কেড়ে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে পুলিশের ৭.৬২ মিঃমিঃ চায়নিজ রাইফেলের মাজল থেকে একটা বুলেট ছুটে এসে তার ডানপায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ হয়। সে অবস্থাতেই সাভার এলাকায় এক ক্লিনিকে যেয়ে বুলেটটা বের করতে পারলেও ক্র্যাচ হয়ে যায় তার সারাজীবনের সঙ্গী। এরপর থেকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে লীডারের নাম হয়ে যায় ল্যাংড়া মনির।
মিরপুর-পল্লবী এলাকার গার্মেন্টসগুলোর ঝুটমালের ব্যবসা নিয়ে প্রতিনিয়ত চলে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। সন্ত্রাসী দলগুলো তাদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নির্বিঘ্নে চাঁদাবাজি চালিয়ে থাকে। কখনও একদল আরেক দলের এলাকায় ঢুকে চাঁদাবাজি করলে কিংবা আরেক দলের এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেস্টা করলে শুরু হয় গোলাগুলি-বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ। পুলিশ ঝঞ্ঝাট থামাতে কখনো এগিয়ে আসে আবার কখনও ইচ্ছে করেই চুপ থাকে যেন তারা নিজেরাই খুনোখুনি করে শেষ হয়ে যায়। তা অবশ্য কখনো হয়না। কেউ গান ফাইটে মারা গেলে কিংবা র্যাব-পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সাথে সাথেই সে শুন্য স্থান পূরণ হয়ে যায়। ঝাঁঝালো বারুদের ঘ্রান আর রক্তের উত্তাপ মাখা এ এক অদ্ভুত জগত যেখানে কাঁচাপয়সা আর বর্ণীল জীবন যাপনের জন্য সবকিছুর ছড়াছড়ি। তাই যোগ্য লোকের অভাব হয়না। তবে কেউ একবার এই জগতে ঢুকে পড়লে তার পরিণতি জেলের সদর দরজা কিংবা বুলেটের সীসা।
ঝুটমালের ব্যবসায়ীরা কন্ট্রাক্ট পেলে এলাকার সন্ত্রাসীদের চাঁদাটা দিয়েই তবে গার্মেন্টসের গোডাউন থেকে পণ্য খালাস করে। বিনিময়ে মাল পরিবহণে নিরাপত্তা পাওয়া যায়, তা’নাহলে মালামাল লুটপাট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারটা তো আছেই। অনেকসময় সন্ত্রাসীরা নিজেরাই ঝুটমালের দখল নিয়ে তা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। আসলে ঝুটমালের চেয়ে ঝুটের বড় বড় গাইটের আড়ালে পাচার হওয়া স্টক লট আর চোরাই থান কাপড়ের জন্যই এত খুনোখুনি-রক্তারক্তি। ওসবের পরিমাণের ওপর সবসময় লাভের অংকটা ওঠানামা করে। এ এক বিশাল চক্র আর এর সাথে থানার ইনফর্মার থেকে শুরু করে গার্মেন্টসের দারোয়ান-ওয়্যারহাউজ কিপার-ফ্লোর ম্যানেজার এবং এলাকার মাস্তান-টাউট-বাটপাররাও জড়িত থাকে। সাধারণত গার্মেন্টস বা ফ্যাক্টরির ভিতরের লোকজনই দু’চার পয়সার বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। যারা এসব কাজে সন্ত্রাসীদের সহায়তা করে তারা টিকে থাকে, আর সহায়তা না করলে হাত-পা ভেঙ্গে বিছানায় পড়ে থাকতে হয় অথবা বেঘোরে প্রাণ দিতে হয়।
১৭
হেনা অধ্যায়।
রূপনগর বস্তি, মিরপুর।
স্বামীর অকাল মৃত্যুর পরে নসুর মা জুলেখা বেওয়া তার অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রামের বাড়ী নাভারন, যশোরে ফিরে যান। ফলে রূপনগর বস্তির ঝুপরি ঘরে নসুকে একাই থাকতে হয়। সে রাজমিস্ত্রী ডেকে ঘরের ভিতরটা আর বাথরুম ঠিক করে নেয়। নিজের প্রয়োজনে টিভি-ফ্রিজ সবই কিনে ঘর সাজায়। কিন্তু ঘর জুড়ে বাবা-মা, ভাই-বোনদের অসংখ্য স্মৃতি তাড়িয়ে ফেরে তাকে। সে মাদকের নেশায় চুর হয়ে কষ্টগুলো ভুলতে চেস্টা করে। মাকে সংসার চালাতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হয়। তার পাঠানো সেই টাকায় গ্রামে ভাইবোনদের খাওয়া-দাওয়া-লেখা-পড়া চলছে। পাঙ্খা নসুর এই নিঃসঙ্গ জীবনে বসন্ত বাতাসের মত এসে দোলা দেয় হেনা। গার্মেন্টসে চাকুরীর সূত্রে সে স্টিমারে উঠে বরিশালের হিজলা থেকে ঢাকায় এসেছে। তার মত আরও কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে সে মিরপুর এক নাম্বারে ভাড়া বাসায় থাকে। নসু একবার এক গার্মেন্টসের ঝুটের চালান সাফাই করতে গেলে হেনার সাথে পরিচয় হয়। সেই পরিচয় থেকেই একটু আধটু ভাল লাগা। নসু একসময় বিয়ের জন্য চাপ দিলেও হেনা নসুর এই অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে ভয় পায়। সে হয়ত নসুকে ভয় পায়, তাই এক কথায় সম্পর্কের ইতি টানতে পারে না। সে ভাল করেই জানে নসুর সাথে তার সম্পর্কের কারণে ফ্যাক্টরির ফ্লোর ম্যানেজার থেকে শুরু করে অনেকেই ভয় পায়, সমীহ করে কথা বলে। তাকে অশ্লীল কিছু বলতে বা অন্য অনেক মেয়েদের মত তাকেও স্টোর রুমের কোনায় নিয়ে যৌন হয়রানি করতে সাহস পায়না।
গার্মেন্টসের মেয়েদেরকে তাদের ওপরে চালানো নানারকম যৌন নিপীড়ন নীরবে সহ্য করতে হয়, তা’না হলে ফ্লোর ম্যানেজার যে কোন অজুহাতে চাকুরী থেকে ছাটাই করতে মালিকের কাছে সুপারিশ করবে। তবে যেসব ফ্যাক্টরিতে কমপ্লায়েন্স নীতিমালা ঠিকঠাক মেনে চলা হয় সেখানে এসব সমস্যা কম বা একদম নেই বললেই চলে। তাদের ফ্লোর ম্যানেজার জয়নাল ভীষণ বদমেজাজি আর তার হাতে যেটুকু ক্ষমতা আছে তা সে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। হেনার মাঝে মাঝে তাকে স্যান্ডেল পেটা করতে ভীষণ ইচ্ছে করে। হেনা মনে মনে ঠিক করেছে একদিন নসুকে দিয়ে ওর বেপরোয়া হাতটা ভাঙবে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির গেটের দারোয়ানগুলোও লুচ্চামিতে কম যায়না। তবে তার কখনও ঢুকতে দেরী হলে দারোয়ান সামসু মিয়া মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করার সাহস পায়না। অন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে এরকম হলে হয়ত দশ/বিশ টাকা ঘুষ দিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে দারোয়ানকে ম্যানেজ করে তবে কারখানার ভিতরে ঢুকতে হয়। নসুর দলের ছেলেরাও তাকে খুব সম্মান করে। তাকে দেখলে উঠে দাঁড়ায়, ভাবী বলে ডাকে। কখনো হয়ত রিক্সা ডেকে জোর করে উঠিয়ে দেয় বা দোকান থেকে কোক/স্প্রাইট এনে খেতে দেয়। সে জানে নসুর আশ্রয়ে সে নিরাপদ। যদি নসু তার পাশে থাকে তাহলে এই হায়েনা শহরে কেউ তার দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকাতে সাহস পাবেনা।
বিয়ে করা নিয়ে হেনার দ্বিধাগ্রস্থতা দেখে নসু খুব বিরক্ত হয়। কোন এক শনিবারের রাতে সে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে হেনাকে জোরপূর্বক তার বস্তির ঘরে এনে তোলে। হেনা শুরুর দিকে বাঁধা দিলেও একসময় এই জীবন তাকে মেনে নিতে হয়। তাকে বাধ্য হয়ে নসুর সাথে লিভটুগেদার করতে হয়। তবে সে মনে মনে প্ল্যান আঁটে, হাতে কিছু টাকা পয়সা জমলে এখান থেকে পালিয়ে যাবে। নসুর অবশ্য ইচ্ছা হাতে প্রচুর টাকা জমলে, গ্রামে ফিরে যাবে। হেনাকে বিয়ে করে সংসার করবে। সন্তান-সন্ততিতে ভরে উঠবে তার সাজানো সংসার। প্রায়ই সে তার স্বপ্নের কথা হেনাকে শোনায়। হেনা সেসব শোনে কিন্তু তার মনে কি ভাবনা তা শুধু সেই জানে। নসু হেনাকে তার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করলে সে একরকম নিরুত্তর থাকে, কিংবা কৌশলে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যায়। নসু আসলে হেনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। হেনা আপত্তি করলেও নসু একদিন গার্মেন্টসের চাকুরী থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনে। এরপর থেকে সে বস্তির চার দেয়ালে বন্দী, কিন্তু যে পাখি উড়তে শিখেছে তাকে কি খাঁচায় বন্দী করে রাখা যায়!
১৮
কাসিমপুর জেলখানা।
কোন এক ঝলমলে রোদের দিন।
হাতে কাজের কোন ফর্দ না থাকলে নসু আগে ঘরেই শুয়ে বসে সময় কাটাতো, কিন্তু ইদানীং হয়েছে তার ঠিক উল্টোটা। বাইরেই বেশীর ভাগ সময় কাটছে তার। এখন কখনও গভীর রাতে, আবার কখনওবা সেই কাকডাকা ভোরে ঘরে ফিরতে হয়। আবার কখনও হয়ত ঘরে ফিরছে তিন-চার দিন পর। জিজ্ঞেস করলেও ঠিক মত উত্তর পাওয়া যায়না। হেনা ভাবে এখন হয়ত তার কাজের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সে শ্রাগ করে, যার জীবন সেই ভাল বুঝবে। ল্যাংড়া মনিরের দলে নসু এখন সেকেন্ডম্যান। সে প্রায়ই ভাবে লীডারকে পাতালে বা হাসপাতালে পাঠিয়ে সে নিজেই দলের দখল নিবে, কিন্তু কালাবাবুর ভয়ে সাহস পায়না। দলের কিছু ছেলে অবশ্য তার এই প্ল্যানে রাজী, তাদের ইশারা ইঙ্গিতে সেটা বোঝা যায়। কিন্তু কালাবাবু কিভাবে যেন বিষয়টা টের পেয়ে যায়। ব্যাটা মহা ধুরন্ধর! একদিন নসুকে জেলগেটে ডেকে পাঠায়,
- এই হালা বান্দির পুঁত ক্যালা! তোর নামে কিসব শুনতাছি ?
- কি ?
- তুইই ভালো জানোস! কইলজা টাইনা ছিঁইড়া ফালামু। হালার পো হালা। সাবধান
হইবি কইলাম।
- কি যে, সব কইতাছেন বস!
- কি কইতাছি মানে! যা হাছা তাই কইতাছি।
নসু যেন ভুলেও কখনও মনিরকে দুনিয়া থেকে সরানোর চিন্তা না করে, এসব বলে সাবধান করে দেয়। কালাবাবু সেদিন দলের ছেলেদের সামনেই নসুকে আরো আজেবাজে-অপমানজনক কথা বলে। নসু সেসব কথা গায়ে না মেখে বরং দাবার বোর্ডে পাল্টা চাল দিয়ে বসে,
- বস, মগর একখান কথা আছিলো।
- কইয়া ফালা।
- একটু সাইডে আহেন। পারসোনাল।
- এই হালায় কয় কি? বান্দির পুঁত কি কইবি এই হানেই কইয়া ফালা।
- বস, সোনিয়া ম্যাডামের দিকে একটু খেয়াল রাইখেন। পাখি উড়াল দিবার পারে। বাতাসে কিছু
কথা উড়তাছে কইলাম।
কালাবাবু চীৎকার করে উঠে এবং এরপর নসুর পিছনে জোরে একটা লাথি কষে বের হয়ে যেতে বলে। নসুকে ছিটকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে কেউ কেউ কাছে এগিয়ে আসতে চায়। নসু ইশারায় তাদের না করে দিয়ে প্যান্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ায়। আগের মতই একরোখা ভঙ্গীতে বলে,
- কথাটা মাথায় রাইখেন বস। পরে কিন্তু পস্তাইবেন। অই ব্যাডার লগে ম্যাডামের আগে থাইকাই লাইন আছে। এক ক্লিনিকের ডাক্তারের লগেও কীসব চলতাছে শুনি।
কালাবাবুর কঠিন দৃষ্টিতে নসু যেন ভস্মে পরিণত হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে। নসু সেই দৃষ্টির সামনে শ্রাগ করে চলে আসে, সে জানে তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। নসু মনেমনে হাসে।
১৯
মিরপুর।
একদিন সন্ধ্যায়।
নসুকে জেলগেটে ডেকে নিয়ে অপমান করাটাই যেন কালাবাবুর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। স্বভাবে হিংস্র আর একরোখা নসু এই অপমানের জ্বালাটা কোনভাবেই ভুলতে পারেনা। তার অতীত ইতিহাস অন্তত তাই বলে। প্রতিশোধ স্পৃহা নসুকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে তার অন্যান্য কাজগুলোও ঠিকভাবে করাই দায় হয়। স্বভাবে কিছু পরিবর্তন দেখে লীডার তাকে জিজ্ঞেস করে,
- তর কি হইছে রে ? ভাও ভাল্লাগতেছে না। সমস্যা কি?
নসু উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থাকে। তার ওভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে ল্যাংড়া মনির তাকে আবারও জিজ্ঞেস করে,
- কিছু কস না ক্যালা! কি হইছে কইয়া ফালা। কিছু লাগবো!
- না, লীডার। সব তে ঠিকঠাক আছে।
- হুন, আমি বুঝছি, তর উপর দিয়া বহুত চাপ যাইতাছে। এক কাম কর, কিছুদিন ঢাকার বাইর থাইক্যা ঘুইরা আয়। কক্সবাজার যা।
লীডার তাকে কিছুদিন ঢাকার বাইরে কাটিয়ে আসার পরামর্শ দেয়। এতে হয়ত তার মানসিক চাপ লাঘব হবে, কিন্তু নসু তাতে রাজী হয়না। সে আপনমনে ভাবতে থাকে, ল্যাংড়া মনিরের বদলে কালাবাবুকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলে কেমন হয়! রিস্ক নিতে হলে বড় ধরনের রিস্ক নেয়াই উচিৎ। প্ল্যানটা ঠিকমত কাজ না করলে মৃত্যুর সম্ভাবনা দু’টোতেই আছে, কিন্তু কালাবাবুকে সরাতে পারলে লাভের অংকটা বিশাল। সারাক্ষণ এই এক চিন্তা সিন্দাবাদের ভূতের মত তার মাথায় চেপে বসে থাকলেও প্ল্যানটাকে কিভাবে কার্যকর করবে তা ভেবে পায়না। এরকম এক উথাল পাতাল সময়ে একটা অভাবিত ঘটনা ঘটে তার ব্যক্তিগত জীবনে। যার কারণে তাকে ওপারে পালিয়ে যেতেই হয়।
২০
রূপনগর বস্তি, মিরপুর।
নভেম্বর মাসে কোন এক বুধবারের রাত।
নসুর ঘরে ফেরার কোন নির্দিষ্ট সময় সূচি না থাকায় হেনা সাধারণত বেশী রাত পর্যন্ত জাগেনা। সে তার মত ঘুমাতে যায়। নসু হেনার ঘুমের ব্যাঘ্যাত না ঘটাতে একটা চোরাই ফোকরে হাত গলিয়ে নিঃশব্দে দরজার হুড়কোটা খুলে ঘরে ঢোকে। তারপর নিজের টুকটাক কাজ শেষ করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ে। এভাবেই সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো কোন এক বুধবারের রাতে। নসু বরাবরের মত মাঝরাতে ঘরে ঢুকে সেদিন তার জীবনের চরমতম ধাক্কাটা খায়।
নসুর বিছানায় ব্যাঙ্গা বাবু। সে হেনাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে।
ঘরের হালকা নীল আলোয় চোখটা সয়ে গেলে নসু সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। তাদের শরীরের ওপর থেকে পাতলা কম্বলটা সরে গেছে। মশারীর আবরণ ভেদ করে হেনার উম্মুক্ত স্তন চোখে পড়ে। মেঝের ঘিয়ে রঙের টাইলসে লুটাচ্ছে হেনার পরনের শাড়ি। ব্লাউজ-ব্রা-পেটিকোট পড়ে আছে সোফার কুশনের ওপর। শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে কামারের হাপরের মত তাদের বুক ওঠানামা করছে। সেন্টার টেবিলের উপরে চীনেমাটির প্লেটে অভুক্ত ভাত, আধখাওয়া পাউরুটির টুকরো। বাটিতে মাংসের ঝোল লেগে আছে। হুইস্কির বোতলটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে আছে, সে নিজেই গত সপ্তাহে খাওয়ার জন্য এনেছিল। ইদানীং হেনাও তার সাথে দু’এক পেগ করে খেতে শিখেছে। তার অবর্তমানে ঘরের ভিতরে কিকি ঘটেছে সেলুলয়েডের ফিতের মত তার চোখে ধরা পড়ে।
কোন এক অজ্ঞাত কারণে নসুর মনেহত, সে অপারেশনে বাইরে থাকলে হেনা হয়ত কারো হাত ধরে পালিয়ে যেতে পারে। এজন্যই সে একদিন হেনাকে চাকুরি থেকে ছাড়িয়ে আনে। শুধু তাই না, ব্যাঙ্গা বাবুকে বলে হেনার দিকে খেয়াল রাখতে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে অপারেশনে গেলে। কিছুদিন আগে হাতে চোট পাওয়ায় আজকাল ব্যাঙ্গা বাবুকে কোন অপারেশনে নেয়া হচ্ছে না। কিন্তু দলে দীর্ঘদিনের সঙ্গী যে তার সাথে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে তা ঘুণাক্ষরেও তার মাথায় আসেনি।
চোখের সামনে হেনা এবং ব্যাঙ্গা বাবুকে এভাবে নগ্ন শরীরে বিছানায় জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতে দেখে সে কি করবে প্রথমে ভেবে পায়না। নসু কয়েক মিনিট হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর রাগে-ক্ষোভে চীৎকার দিয়ে ওঠে। পিস্তলের সন্ধানে পকেটে হাত বাড়ায় কিন্তু ব্যাঙ্গা বাবুর ভাগ্য আসলেই ভাল, পিস্তলের ম্যাগাজিনে একরাউন্ড বুলেটও অবশিষ্ট নেই। পিস্তলের হ্যামার ফায়ারিং পিন-এ আঘাত করলে ক্লিক করে একটা শব্দ বেরোয় কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়না। সন্ধ্যার অপারেশনে বেশ ফায়ারিং হয়েছিল, তাতেই পিস্তলের ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেছে। এরপর পিস্তলের ম্যাগাজিন রিলোড করতে খেয়াল ছিল না। তার জান্তব চীৎকারে দু’জনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। নসুর বিভ্রান্তির সুযোগে ব্যাঙ্গা বাবু জিন্সের প্যান্টের ভিতর দু’পা গ’লে দৌড়ে পালিয়ে যায়। হেনা বিছানা থেকে নেমে ওভাবেই ঘরের এক কোনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কি করবে ভেবে পায়না। তার মাথায় এলোমেলো চুলের জটলা। হাই চাপতে চাপতে হেনা বামহাত দিয়ে আলতো ভাবে কপাল-চোখের ওপর থেকে চুলের গোছা সরিয়ে নেয়।
ব্যাঙ্গা বাবুর সাথে হেনা অবশ্য সেদিনই প্রথম বিছানায় যায়নি। যেদিন থেকে নসু তাকে পাহারার কাজে লাগিয়েছে তার সপ্তাহ খানেক পর থেকেই নসু বাইরে গেলে তারা একান্তে মিলিত হত। হেনা অবশ্য এটা টাকা বা অন্য কিছুর লোভে করেনি। তার প্ল্যান ছিল এভাবে ব্যাঙ্গা বাবুর সাথে ভাব জমিয়ে একদিন সুযোগ বুঝে তার সাথে পালিয়ে যাবে। নসুর সাথে বন্দী পাখির জীবন তার কাছে অসহ্য লাগছে। সবকিছু কেন জানেনা বিরক্তির শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল, তাছাড়া সেতো নসুর বিয়ে করা বউ না যে তাকে নসুর সাথে থাকতেই হবে।
তাকে জোর করে তুলে এনে এই যে একসাথে স্বামী-স্ত্রীর মত থাকা, এটা সে কোনদিনই মন থেকে মেনে নেয়নি। নসু তার মন সেভাবে ছোঁয়ার আগেই শরীরের দিকে হাত বাড়িয়েছে। একবারও জানতে চায়নি হেনা কি চায়! সে জানে গার্মেন্টসের অনেক মেয়ে থাকার জায়গার অভাবে কিংবা খোরপোষ খরচ কমাতে পুরুষ সহকর্মীদের সাথে গোপনে লিভ টুগেদার করে। এতে মেয়েদের লাভ হল মাথার ওপরে বিনে পয়সায় মাথা গোঁজার ঠাঁই, আর ছেলেদের লাভ হল বিনে খরচায় অবাধ যৌনতার পাশাপাশি রান্না-বান্নার ঝুট ঝামেলা পোহাতে হয়না। তবে এরচেয়েও ভয়ংকর খবর হল, তারা কিছুদিন পরপর নিজেদের মধ্যে পার্টনার পরিবর্তন করে থাকে। কিছু কিছু এনজিও অবশ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণসহ অন্যান্য স্বাস্থসেবার কারণে এসব খোঁজ-খবর টুকটাক রাখে। হেনা এসব ঘটনা গার্মেন্টসের অন্যান্য মেয়েদের মত অল্প-বিস্তর জানলেও সে কখনোই এসব পছন্দ করেনি। তাকে আসলে প্রতিকূল বাস্তবতার কারণে নসুর কাছে ভিড়তে হয়েছিল। কিন্তু নসু যে তার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে এভাবে তুলে এনে লিভটুগেদার করতে পারে, তা সে কোনদিনই ভাবতে পারেনি। সে যদি ঢাকাতেই না থাকে তাহলে তো আর নসুকে তার প্রয়োজন নেই। সে কখনোই নসুকে ভালোবাসেনি।
হেনা ভয়ার্ত হরিণ শাবকের দৃষ্টিতে দেখে নসু রান্না ঘর থেকে বটিটা এনে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। সে দু’হাতে বাঁধা দিয়ে নসুকে কিছু একটা বলতে বা বোঝাতে চায় কিন্তু পারেনা। তার আগেই নসুর হাতের ধারালো বটি হেনার ঘাড়ে নেমে আসে। হেনার না বলা কথাগুলো আর বলা হয়না। তার বদলে কেমন একটা ঘরঘর শব্দ বেরিয়ে আসে বিচ্ছিন্ন কণ্ঠনালী থেকে। হেনার না বলা কথাগুলো হয়ত ইথারেই ভেসে যায়। নসু হিস্টিরিয়াগ্রস্থ যুবকের মত বটি দিয়ে একের পর এক কোপ দিয়ে যায় হেনার পুরো শরীরে। ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়া রক্ত ভিজিয়ে দেয় নসুর জামা-কাপড়। সে এক সময় হাঁপিয়ে ওঠে। হাতে ধরে রাখা বটিটা খাটের দিকে ছুড়ে দিয়ে অবসন্ন দেহে বসে পড়ে ঘরের মেঝেয়। খাটের কোনায় ধাক্কা খেয়ে টাইলসের মেঝেয় লোহার বটিটা ঝনঝন শব্দে আছরে পড়ে। রক্তের প্রবল ধারা ভিজিয়ে দেয় ঘরের মেঝে।
একসময় হঠাৎ সংবিৎ ফেরে নসুর, চমকে ওঠে সে। সে এ কি কাজ করেছে! সে কিভাবে নিজ হাতে নিজের প্রেমিকাকে খুন করেছে! নসু উদ্ভ্রান্তের মতো ঘরের চারদিকে তাকায়। কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা। ধরহীন রক্তাক্ত দেহটা খিচুনি দিতে দিতে এক সময় নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রক্তের অজস্র ধারায় ভাসছে সে। মুহূর্তেই নসুর ষষ্ঠইন্দ্রিয় জেগে ওঠে। বালতির পর বালতি পানি এনে মুছে ফেলে রক্তের সব ধারা, এখানে সেখানে লেগে থাকা দাগ। তার পরনের কাপড়ে লেগে থাকা রক্তের দাগও মুছতে চেষ্টা করে কিন্তু তাতে কোন কাজ না হওয়ায় সেগুলো খুলে ধুয়ে খাটের স্ট্যান্ডে শুকাতে দেয়। এরপর সোফার উপরে পড়ে থাকা হেনার কাপড়-প্লেট-গ্লাস-হুইস্কির খালি বোতল বস্তায় ভরে ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়।
কালো জিন্সটা পরে ঘরের বাইরে এসে নসু চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চায় তাকে কেউ খেয়াল করছে কিনা। এদিকের ল্যাম্পপোস্টগুলোয় বাতি জ্বলেনা অনেক দিন। অনেকগুলো বাতি ভাঙ্গা। বস্তির ছেলেরা গুলতি মেরে ভেঙ্গেছে হয়ত। অন্যসময় এসবের জন্য তাদেরকে বকাঝকা করলেও আজ পরিস্থিতি সম্পুর্ণ ভিন্ন, সে মনেমনে তাদেরকে ধন্যবাদ দেয়। নসু অদূরে খালের পার ঘেষে আবছা জঙ্গলের দিকে তাকায়, তারপর দ্রুত পায়ে ঘরের বারান্দা থেকে কোদালটা হাতে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। গর্ত খোরা শেষ হলে ঘর থেকে বস্তাটা এনে সেখানে পুঁতে ফেলে। এরপর ঘরে ফিরে ধারালো চাকু হাতে হেনার হাত-পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে পলিথিনের ব্যাগে মুড়ে ডীপ ফ্রিজে রাখে। কাজ শেষে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে ভাল করে গোসল করে, কিন্তু তার শরীরে কাঁচা মাংসের ঘ্রাণ পারফিউমের বেইজ নোটের মত লেগে থাকে।
নসু লাইট জ্বেলে পুরো ঘর তন্নতন্ন করে এটাসেটা খুঁজে দেখে। খাটের নিচে রাখা হেনার ট্র্যাঙ্কে নসু অনেকগুলো টাকার বান্ডিল দেখতে পায়, পরে কাজে লাগতে পারে ভেবে ওগুলো তার ট্র্যাভেল ব্যাগে ভরে রাখে। হেনাকে বিভিন্ন সময়ে দেয়া তার কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল সেখানে। সেগুলোও ব্যাগে ভরে নেয়। এসব করতে করতেই প্রায় ভোর হয়ে আসে। এরপর বিছানায় শুয়ে একটু ঘুমাতে চেষ্টা করে, কিন্তু বটির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হেনার শরীরের দৃশ্যটা নসুর চোখ থেকে সরতে চায়না যেন। আঠার মতো লেগে থাকা দৃশ্যটা বারবার ফিরে আসে। নসু রাতের বাকী সময়টুকু বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই পার করে দেয়। তার মাথার বালিশে তখনো হেনার শরীরের ঘ্রাণ। ওর প্রিয় সুগন্ধি ছিল মুনড্রপ, নসুকে মার্কেট ঘুরে ঘুরে এখন আর কালোকেশি তেল কিংবা তিব্বত স্নো কিনতে হবেনা। তার প্রিয় হাস্না হেনা এখন শুধুই স্মৃতি।
২১
রূপনগর বস্তি, মিরপুর।
পরের দিন দুপুর।
নসু গোসল করে ঘর তালাবদ্ধ করে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার মোড়ে আবুলের চায়ের দোকানে নাস্তা খেতে বসে সে চোখ–কান খোলা রাখে। কেউ কিছু আঁচ করতে পেরেছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করে। মনেহচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। বিল মিটিয়ে সে মিরপুর দশ নাম্বার গোল চক্করের দিকে যায়। চায়ের দোকানদার আবুল হোসেন নসুর দিকে অবাক দৃষ্টিতে হা মেলে তাকিয়ে থাকে। কারণ সে এর আগে কখনই খাবারের বিল দিত না, সবসময়ই ফ্রিতে খেত। দোকানদার দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে ক্যাশ বাক্সে টাকা ভরে অন্য খদ্দেরের দিকে তাকায়। খদ্দেরের চাপে নসুর অস্বাভাবিক আচরণটা একসময় সে হয়ত ভুলেও যায়। নসু বাজার থেকে বড় সাইজের চারটা কর্কশিটের প্যাকিং বাক্স কেনে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এগুলোতে করে ঢাকায় মাছের চালান আসে। বাক্সগুলো ঘরে রেখে একটা ডাবল কেবিন পিকআপ ভাড়া করতে যায়। কাজগুলো শেষ হতে না হতেই লীডার তাকে ডেকে পাঠায়। তার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। ধরা পড়তে চায়না সে। ওই ব্যাটা নিমক হারাম ব্যাঙ্গা বাবু লীডারকে সব বলে দিয়েছে কিনা কে জানে! পরপর কয়েকবার ফোন এলে সে বাধ্য হয়ে ঘরে তালা মেরে লীডারের সাথে দেখা করতে যায়।
লীডার আসলে তাকে ডেকেছে পিস্তলের ম্যাগাজিন রিলোড করে নেয়ার জন্য। কাল অপারেশনের পরপরই কাজটা না করায় তিনি নসুকে গালমন্দ করেন,
- কীরে! ফোন ধরোস না ক্যান! কয়বার কল দিছি দেখছোস?
- ফোন সাইলেন্ট আছিলো, দেখি নাইক্যা।
- তোর কাছ থাইক্যা এইটা আশা করি নাই নসু!
- ভুল হইছে লীডার। কাইল অপারেশনের পর থাইক্যা আসলে মাথাটা কাম করতাছে না।
- ক্যান! কি হইছে ?
- কিছু না লীডার। হুদাই।
- তুই তো জানোস এই রকম হইলে শুধু নিজের না, বেবাগতির জন্যও বিপদ ডাইকা আনবি।
- আর হইবো না লীডার।
এধরনের অসাবধানতার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা বুঝিয়ে তিনি ব্যাঙ্গা বাবুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন,
- ব্যাঙ্গারে দেখছোস ?
- না।
- হালার পুঁতে গ্যালো কোই!
সে কোথায় গেছে দলের কেউই বলতে পারছে না, তার মোবাইল নাম্বারটাও বন্ধ। পুলিশ বা র্যাবের কাছে ধরা পড়লো কীনা কে জানে, লীডার আপন মনে ভাবেন।
আগের দিন রাতে হেনার সাথে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য মনে আসাতে নসু একটু আনমনা হয়ে পড়ে। তার আনমনা ঘোর কাটে বসের কথায়,
- হেনার লগে তোর কিছু হইছেনি!
- না তো। ক্যালা! কি হইবো ?
- কিছু না হইলেই ভালা। তবে ওর দিকে একটু খেয়াল রাখিস, দিনকাল ভালা না।
- হু।
- ব্যাঙ্গা বাবুরে যে কাম দিছোস ঐটা অন্য কাউরে দিস। ওর লগে আমার বহুত কাম আছে।
- আইচ্ছা।
নসু আসলে অল্প কথাতেই প্রসঙ্গটার ইতি টানতে চায়। লীডার হয়ত বুঝতে পারেন অজ্ঞাত কোন কারণে নসু মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। দু’দিন আগে দলের একজন ব্যাঙ্গা বাবুকে নসুর ঘরে ঢুকতে দেখেছে। সেটা জানালেও নসুর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া হয়না দেখে লীডার একটু অবাক হন। তবে বিষয়টা যেহেতু নসুর একান্ত ব্যক্তিগত তাই ও প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। ব্যাঙ্গা বাবু পুলিশ বা র্যাবের হাতে ধরা পড়লে নসুর ঝামেলা হতে পারে জানিয়ে তাকে সতর্ক ভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ দেন। লীডারের ওখানে আরো কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে কিছু টাকা হাতে নিয়ে সে চলে আসে। দূরে কোথাও অনেকগুলো কাক তারস্বরে চীৎকার করে যাচ্ছে। নসু ডান হাতের আড়ালে রোদ ঢেকে বুঝতে চেষ্টা করে। কিন্তু কোথা থেকে যে কাকের ডাক ভেসে আসছে সে বুঝতে পারেনা। আমাদের এই শহরে প্রতিদিন অসংখ্য কোকিল কাকের বাসায় ডিম পেরে যাচ্ছে! কেউ তার হিসেব রেখেছে কি?
২২
একই দিন বিকেল।
সাঁতারকুল, বাড্ডার দিকে একটা চারতলা বিল্ডিঙের চিলেকোঠা ঘর।
রাস্তার মাথার রড-সিমেন্টের দোকান থেকে নসু এক ব্যাগ সিমেন্ট আর দু’বস্তা বালি কিনে বাসায় ফেরে। কিসের কাজ করাবে দোকানদার জিজ্ঞেস করেছিল। বাথরুমের কাজ করাবে বলে নসু সাপের দৃষ্টিতে এমনভাবে তাকায় যে দোকানদার ভয়ে গুটিয়ে যায়। তার মুখ ভর্তি পান চিবানো থেমে যায়। এরপর দ্বিতীয় প্রশ্নটা না করে সে নিঃশব্দে টাকাগুলো গুনে নেয়। ভ্যানওয়ালাকে বালির বস্তা দু’টা দরজার সামনে নামাতে বলে সিমেন্টের ব্যাগটা সে নিজেই ঘরের ভিতরে টেনে নিয়ে যায়। এরপর হোটেলে যেয়ে সামান্য কিছু খেয়ে ঘরে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। তার আসলে ক্ষুধা নেই, গতকাল রাত থেকেই মুখের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। সে বালতিতে বালি-সিমেন্ট ভাল করে মিশিয়ে এক পাশে রাখে। এরপর কর্কশীটের প্যাকিং বাক্সগুলোতে হেনার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে সাজিয়ে তার ওপরে বালি-সিমেন্টের মিশ্রণ ঢেলে দেয়। এভাবে চারটি বাক্সই রেডি হলে খাটের নীচে লুকিয়ে রাখে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই প্যাকিং বাক্সগুলোর ভিতরে কি আছে। নসু এরপর গোসল সেরে পিস্তলের ম্যাগাজিন লোড করে জিন্সের প্যান্টের কোমরে গুঁজে ঘর থেকে বের হয়। সেফটি ক্যাচ সেইফ পজিশনে, পিস্তল লক করা আছে, সমস্যা নেই। বাতাসে প্যাকিং বাক্সের মিশ্রণ শুকাতে থাকে, একসময় জমাট বেঁধে সেগুলো সিমেন্টের ব্লকের মত আকার নেয়।
নসু একটা ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করে সাঁতারকুল, বাড্ডার দিকে যায়। সেখানে ব্যাঙ্গা বাবুর মামার বাড়ি। মামার চারতলা বাড়ীর ছাদে ছোট একটা কুঠুরি বা চিলেকোঠা আছে। হাবিজাবি জিনিসপত্র রাখার জন্য স্টোর হিসেবে বানানো হয়েছিল সম্ভবত। গতবছর এক অপারেশনের পরে সে আর ব্যাঙ্গা বাবু সেখানে কয়েকদিন লুকিয়ে ছিলো। ঢাকা শহরের ভিতরেই চমৎকার একটা হাইড আউট। তার ধারণা, তার কোনও ভুল না হলে ব্যাঙ্গা বাবু সেখানেই লুকিয়ে আছে। সে হল কুয়ার ব্যাঙ, তার চিন্তার দৌড় নসুর জানা আছে।
নসু পিছনের তিন তলা বিল্ডিঙের ছাদ থেকে স্যানিটারী পাইপের লাইন বেয়ে চারতলায় ওঠে। এরপর কুঠুরির পিছনে নিজেকে লুকিয়ে ছোট জানালাটা দিয়ে ভিতরে উঁকি মারে, তার ধারণা সঠিক। ব্যাঙ্গা বাবু আপন মনে শীষ দিয়ে পরিচিত গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ব্যাগ গোছাচ্ছে। সে সম্ভবত অন্য কোথাও পালানোর প্ল্যান এঁটেছে। নসু চুপিসারে ঘরের ভিতরে ঢোকে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সে আরেকটু পরে এলে ব্যাঙ্গা বাবুকে খুঁজে পেত না। ব্যাঙ্গা বাবু হঠাৎ ঘরের ভিতরে নসুকে আবিষ্কার করে প্রবল আতংকে চমকে ওঠে। তার হাত-পা কাঁপতে থাকে, ভয়ে মুখটা শুকিয়ে যায়। অবসন্ন শরীরে দু’হাত দু’পাশে ঝুলে পড়ে, নিজের অসহায়তা বুঝতে পেরে সে যেন তার এই পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য হয়। জেলখানার নির্জন কনডেম সেলে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীরাও নাকি দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে একসময় বিরক্ত হয়ে সবকিছু মেনে নেয়। ফাঁসি কার্যকর করার জন্য নিজ থেকেই জল্লাদকে সহযোগিতা করে, যমটুপি পরার সময় বা ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় কোন ঝামেলা করেনা। অনেকে এমনকি নিজ থেকেই এগিয়ে যায়, যেন তার অতি আপন বা পরম আরাধ্য কারো কাছে সে ফিরে যাচ্ছে। তারপর লিভারটা টেনে দেয়া হলে সে যেন মুক্তির শ্বাস ফেলে। অপেক্ষা এক ভয়ঙ্কর অসুখ। বেশীদিন এর চাপ সহ্য করা যায়না।
ব্যাঙ্গা বাবু জোরে চীৎকার করে কাউকে সাহায্য করার জন্য ডাকতে চায়, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোয় না। প্রচন্ড ভয়ের কারণে শুধু ফ্যাসফেসে একটা ধ্বনি বের হয় মাত্র। শেষ প্রচেষ্টা হিসাবে বলে,
- বস মাফ কইরা দ্যান। আমার কুনো দোষ নাই। হ্যায় নিজেই আমারে.........
নসু তাকে কথাটা শেষ করার সুযোগ দেয় না। বিছানা থেকে বালিশটা নিয়ে ব্যাঙ্গা বাবুর মুখে ঠেসে ধরে পিস্তলের মাজল ঠেকিয়ে ট্রিগার প্রেস করে। এক রাউন্ড বুলেট পিস্তলের মাজল থেকে বেরিয়ে গেলে ধুপ্ করে একটা শব্দ হয়। বুলেট ব্যাঙ্গা বাবুর মুখ দিয়ে ঢুকে করোটি ভেদ করে চলে যায়, পিছনে রেখে যায় টেনিস বলের সমান একটা গর্ত। রক্তমাখা মগজ ছড়িয়ে পড়ে, ঘরের মেঝেও রক্তে ভেসে যায়। খালি কার্টিজটা বিছানার নিচে গড়িয়ে পড়ে। কাজ শেষ করার পর নসু যে পথে এসেছিল চুপিসারে সে পথেই পালিয়ে যায়।
২৩
একই দিন সন্ধ্যার পরপর।
রোড টু ফেরিঘাট।
মাগরিবের আজানের পর ডাবল কেবিন পিকআপটা এলে নসু ড্রাইভারের হাতে কিছু টাকা দিয়ে হোটেলে ভাত খেতে পাঠায়। এরপর সে একাই একে একে চারটা প্যাকিং বাক্স ঘরের বাইরে এনে পিকআপের ট্রেইল বোটে রাখে। বালি আর সিমেন্টের মিশ্রণ জমাট বাঁধায় কর্ক শিটের বাক্সগুলো ওজনে বেশ ভারী হয়েছে। তেরপল দিয়ে বাক্সগুলো ঢাকার পর দড়ি শক্তভাবে ট্রেইল বোটের হুকের সাথে বাঁধে। ততক্ষণে ড্রাইভার ফিরে এলে সেও কাজে হাত দেয়। নসু ঘরের দরজায় তালা মেরে পিকআপের কেবিনে ড্রাইভারের ঠিক পিছন বরাবর বসে গাড়ি স্টার্ট করতে বলে।
ড্রাইভার গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রাখতে রাখতে হালকা ভাবেই জিজ্ঞেস করে,
- ওস্তাদ বাক্সোর ভিতরে কি?
- ফ্রোজেন ফিশ।
নসু ড্রাইভারের ঘাড়ের পিছনে পিস্তলের মাজলটা ঠেকিয়ে রাখে। এরপর সে আর কখনও কথা বলেনি। নিঃশব্দে গাড়ি চালাতে থাকে। একফাঁকে ড্রাইভারের কাছ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং এনআইডিটা সংগ্রহ নিজের প্যান্টের পকেটে রাখে। ড্রাইভারের নাম রহমত আলী,বাড়ি নরসিংদী। আমিনবাজার পার হওয়ার পর নসুর অনুমতি নিয়ে ড্রাইভার এফএম রেডিও’র একটা চ্যানেল অন করে। সে আসলে মানসিক চাপটা নিতে পারছিল না। খামাখা বাড়তি টাকার লোভে এই ট্রিপটা নেয়ার কারণে সে তার কপালকে দুষতে থাকে। রেডিওতে খেলার খবর প্রচারিত হচ্ছে। নসু ব্যাগটা কোলে নিয়ে সীটে হেলান দেয়। তার প্ল্যান হলো সাভার দিয়ে বেরিয়ে সোজা মানিকগঞ্জের দিকে চলে যাবে। এরপর পদ্মার পানিতে বাক্সগুলো ফেলে দিয়ে ফেরী পার হয়ে একটানে কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহের দিকে চলে যাবে। বাচ্চু চেয়ারম্যানকে বলা আছে, সে মহেশপুর বর্ডার হয়ে তাকে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিবে।
বাচ্চু চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মহেশপুর/বাঘাডাঙ্গা সীমান্ত দিয়েই তারা আন্ডার ওয়ার্ল্ডের জন্য দরকার অনুযায়ী অস্ত্র বা গোলাবারুদের চালান এনে থাকে। সে নিজেও কয়েকবার অস্ত্রের চালান বুঝে নিতে চেয়ারম্যানের লোকের সাথে ওপারে কৃষ্ণনগর, নদীয়া পর্যন্ত গিয়েছিল। কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ থেকে প্রতিদিন ফুলের ট্রাক লোড হয়ে শাহবাগ, ঢাকায় আসে। ট্রাকে ফুলের ঝাঁপির আড়ালে অস্ত্রের চালান লুকিয়ে ঢাকায় আনা হয়। ব্যাপারটা খুবই সহজ আর পদ্ধতিটাও মোটামুটি নিরাপদ। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পার হয়ে তারা বিশ মাইলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় দিনভর সংঘর্ষ-গোলাগুলিতে দু’জন ছাত্র নিহত হওয়ায় পুলিশ হাইওয়েতে ব্যারিকেড দিয়ে চেকপোস্ট বসিয়েছে, বাস-ট্রাক ইত্যাদি র্যান্ডম সার্চ করছে। এই হাইওয়ে ধরে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সমস্ত গাড়ী চলাচল করে। পুলিশের কম্বিং অপারেশনের কারণে হাইওয়েতে তাই বেশ জ্যাম লেগেছে। চেকপোস্টের সামনে এবং পিছনে অনেক গাড়ি লাইন ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে সন্দেহজনক মনে হলে কিছু মাইক্রোবাস বা কার গাড়ির লাইন থেকে আলাদা করে ডিটেইল সার্চ করা হচ্ছে। এক সময় তাদের পিকআপটিও গাড়ির লাইনধরে চেকপোস্টের সামনে এসে থামে। জানালার গ্লাস নামালে একজন পুলিশ কনস্টেবল ভিতরে উকি দিয়ে জানতে চায়,
- পিকআপের ট্রেইলবোটে কি আছে?
- ফ্রোজেন ফিশ। ব্যাক চালান।
কিন্তু তারা নসুর উত্তরে সন্তষ্ট হয়না। অন্য একজন কনস্টেবল এসে বলে,
- ঠিক আছে। চালানের কাগজপত্র দেখান।
পিকআপটা রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে তিনি ড্রাইভারকে গাড়ির ব্লুবুক, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও চালানের কাগজপত্র বের করতে বলেন, ডিটেইল সার্চ করা হবে।
- বস দেরী হলে মাছ পচে নষ্ট হবে।
নসু অনুরোধ করলেও পুলিশ কনস্টেবল তার আদেশে অনড় থাকেন। তিনি বলেন,
- কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করতেছেন ক্যান? ঠিকঠাক সহযোগিতা করেন, দেরী হবে না।
নসু ড্রাইভারকে গাড়ি সাইড লাইনে নিতে নিষেধ করে ব্যাগ হাতে নামতে গেলে পুলিশ কনস্টেবল তার ব্যাগটা ধরতে চায়, কিন্তু নসু এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দেয়। পুলিশ সদস্যটি আসলে তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু নসুর এমন অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
- হেই মিয়া আপনের ব্যাগে কি?
- কিছু না। কাপড়-চোপড়, ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র।
- ব্যাগের চেইন খোলেন দেখি।
সে যেন একেবারে নাছোড়বান্দা। এসময় আরেকজন কনস্টেবল বডি ফ্রিস্কিং করার জন্য নসুর দিকে এগিয়ে আসে। নসুর জিন্সের প্যান্টের পিছনে কোমরের বেল্টের সাথে তখন লোডেড ম্যাগাজিনসহ ৭.৬৫ মি.মি. ক্যালিবারের সেমি-অটোমেটিক বেরেতা পিস্তলটা গুঁজে রাখা। সে জানে যে কোন মুহুর্তে ব্যবহারের জন্য পিস্তলের ম্যাগাজিনে সাতটা আর চেম্বারে একটা বুলেট অপেক্ষা করছে। তবে সামনে তার জন্য কি পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে সেটা সে জানেনা, বিপদে পড়লে কি করবে সেটা সম্পর্কেও সে নিশ্চিত না।
হাজারটা চিন্তা নসুর মাথায় ঘন্টায় ১৮০ মাইল বেগে ঝড়ের তান্ডব চালাচ্ছে। তবে সে ততক্ষণে এটা অন্তত ভালভাবেই বুঝে গেছে যে, এখানে এভাবে ধরা পড়তে না চাইলে তার মাথা একদম ঠাণ্ডা আর নার্ভ শক্ত রাখতে হবে। নসু ফ্রিস্কিং করার সুযোগ না দিয়ে যে পুলিশ কনস্টেবল তার ব্যাগ চেক করতে চেয়েছিল তার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে তর্কাতর্কি শুরু করে দেয়। নসু দাবী করে যে, সে ব্যাগ চেক করার নামে তাকে আঘাত করেছে। ইতিমধ্যে লাইনের পিছনে দাঁড়ানো বেশ কয়েকটা গাড়ি এবং একটা এ্যাম্বুলেন্স অসহ্যভাবে একটানা হুটার বাজিয়ে চলছে। এ্যাম্বুলেন্সে ইমার্জেন্সি সাপোর্ট দিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী একজন রোগীকে বহন করা হচ্ছে। নসুর ওভাবে চীৎকার চেঁচামেচিতে রোগীর আত্মীয় স্বজন এবং যাত্রীবাহী গাড়ি থেকে কয়েকজন স্টাফ নেমে এলে সেখানে ছোটখাট একটা জটলার সৃষ্টি হয়। এরফলে রাস্তায় একটু জ্যাম লাগে। গাড়ির সাধারণ যাত্রীদের কেউ কেউ নেমে এসে বিষয়টা ভালোভাবে না জেনেই নসুর পক্ষ নিলে তর্কাতর্কি চরমে ওঠে। কর্তব্যরত পুলিশ কনস্টেবলদের কয়েকজন পিকআপের ট্রেইল বোট সার্চ করা বাদ দিয়ে তর্কাতর্কিতে যোগ দেন। তবে পুরো সময়টা জুরে নসুর একটা চোখ নিবদ্ধ থাকে পিকআপের ড্রাইভারের ওপর। কিন্তু ড্রাইভার কোন ঝামেলা না করে চুপচাপ ড্রাইভিং সীটে বসে থাকে।
জটলা দেখে একজন সাব ইন্সপেক্টর বাঁশি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে এসে সবাইকে তর্কাতর্কি বাদ দিয়ে দ্রুত রাস্তা ক্লিয়ার করতে বলেন। ওয়্যারলেস সেটে ম্যাসেজ এসেছে, মন্ত্রী মহোদয়ের গাড়ির বহর ঐ এলাকা অতিক্রম করবে। তবে একরোখা টাইপের একজন পুলিশ কনস্টেবল এসে পিকআপটিকে জোরপূর্বক রাস্তার এক সাইডে নিতে চাপাচাপি করলে নসু আবারও চেঁচামেচি শুরু করে। তার চীৎকার শুনে গাড়ীর স্টাফরা ঘুরে এগিয়ে আসতে উদ্যত হলে সাব ইন্সপেক্টর সাহেব পুলিশ কনস্টেবলকে বকা দিয়ে পিকআপ ছেড়ে দিতে বলেন। পুলিশের ব্যারিকেড সরানো মাত্রই নসু ঝুপ্ করে সীটে বসে পড়ে ড্রাইভারকে গাড়ী টান দিতে বলে। গাড়ীর ড্রাইভার সম্ভবত অ্যাড্রিনালিন হরমোনের প্রবল নিঃসরণের কারণে স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে তৈরিই ছিল। সে পিছনে এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে জটলা থেকে গাড়ীটা বের করে নিয়ে যায়। নসু এতক্ষণে প্রাণ খুলে হাসে। পাঙ্খা নসু আবারও পাঙ্খা।
২৪
পাটুরিয়া ফেরী ঘাট, মানিকগঞ্জ।
কুয়াশা মাখা শীতের রাত।
ঘাটে এসে তারা অপেক্ষমান একটা ফেরীতে উঠে পড়ে। ড্রাইভার নসুর নির্দেশ অনুযায়ী ফেরীর রেলিঙ ঘেঁষে পিকআপটিকে পার্ক করে। ঠিকঠাক কথা না শুনলে তার পরিবারের কি পরিণতি হবে সেটা নসু তাকে ভালভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিল। এজন্য ড্রাইভার পথে কখনই কোন রকম ঝামেলা করেনি। ফেরীর যাত্রীরা বাসে বসে কেউ ঘুমে অচেতন আবার কেউবা অর্ধ ঘুমে বা মশার কামড়ে এপাশ ওপাশ করছে। একটা ফেরী আরেকটা ফেরীকে অতিক্রম করার সময় ভেঁপু বাজিয়ে একে অপরকে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য সতর্ক করে থাকে। পিকআপের ট্রেইল বোটে, তেরপলে ঢাকা বাক্সগুলো ডেকে নামিয়ে রাখার আদেশ দিয়ে নসু সিগারেটে আগুন ধরায়। অনেকক্ষণ পরে সে একটু রিলাক্সড বোধ করে। সে অপেক্ষায় থাকে কখন ফেরী দু’টো একে অপরকে অতিক্রম করবে। ফেরীর ভেঁপু বেজে ওঠার সাথে সাথেই নসু ঝটপট একেএকে সবগুলো বাক্স পানিতে ফেলে দেয়, ড্রাইভার তাকে সহযোগিতা করে। ঘন কুয়াশার চাদর আর ভেঁপুর তীক্ষ্ণ শব্দে বাক্সগুলোর পানিতে পরার ঝুপঝুপ শব্দ হারিয়ে যায়। হেনা এখন শুধুই স্মৃতি! সিমেন্টে জমাট বাঁধা করুণ স্মৃতি।
নসু হোয়াইট বাবুকে ফোন করে বস্তিতে তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে বলে। হোয়াইট বাবু কোন প্রশ্ন করেনা, তবে কাজটা ঠিকঠাক পালন করে। এ জগতে কেউ কখনও প্রশ্ন করেনা বা অযথা কৌতূহল দেখায় না। তাদের চলাফেরা ছায়ার মত, তারা নীরবে-নিভৃতে শুধু আদেশ পালন করে যায়। নসু ভোরের দিকে কালীগঞ্জ সীমান্তে পৌঁছে বর্ডার ক্রস করার আগে লীডারকে ফোন করে সবকিছু খুলে বলে। নসু ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসু জানে এদিকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস অথবা কয়েক বছর তাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়ত সে ফিরে আসতে পারবে।
পরদিন পত্রিকার পাতায় খবর আসে রূপনগর বস্তিতে রাতে আগুন লেগে বেশ কিছু ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে। বস্তির একটা ঘরের বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছিল বলে জানা যায়। কয়েকজন বস্তিবাসীও ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।
পোস্ট ভিউঃ 23