গ্রাউন্ড জিরো: পার্ট-৩

উপন্যাস গ্রাউন্ড জিরো
গ্রাউন্ড জিরো: পার্ট-৩

২৫  

সেফ হাউজ। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন।


স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম হেঁটে সামনে এগোলেই একটা মেঠো পথ বাম  দিকে চলে গেছে। পথের শেষে ধুধু ফাঁকা মাঠ আর ফসলের ক্ষেত। ক্ষেতের কোল ঘেষে একটা সাড়ে তিন তলা বাড়ি একাই দাঁড়িয়ে আছে। এ তল্লাটে এটাই একমাত্র উঁচু বিল্ডিঙ। বাড়িটার ছাদে দু’রুমের একটা ছোট ফ্ল্যাটে পাঙ্খা নসু থাকে। নসুর বসার ঘর থেকে জানালা বরাবর পথটা একদম পরিস্কার দেখা যায়। এটাই তার বর্তমান আস্তানা বা সেফ হাউজ। লীডার তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে অনেকটা ইচ্ছে করেই নসুকে তার থেকে দূরে রাখলেও নসুর ওপর সর্বক্ষণ চোখ রাখার নামে ফুট-ফরমায়েশ খাটার জন্য রিয়াজকে নিয়োগ করেছে। এখন পর্যন্ত অবশ্য নসুর আচরণে অস্বাভাবিক কিছুই ধরা পড়েনি। রিয়াজ নামের হালকা পাতলা গড়নের ছেলেটার আসল কাজ যাই হোক না কেন নসু জানে ওর একমাত্র কাজ হল সিসিটিভি মনিটর করা আর মাঝে মাঝে বাইনোকুলার বা নাইট ভিশনে চোখ রাখা।


অতীতের রেকর্ডের কারণে লীডার হয়ত পাঙ্খা নসুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না কিন্তু সে এটা ঠিকই জানে নিপুণ লক্ষ্যভেদ, নিষ্ঠুরতা এবং কর্ম কৌশলে দলে নসুর মত দ্বিতীয়টি আর কেউ নেই। সে যদি নসুকে তার দলে নাও রাখে, তবুও তাকে লুফে নিতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে দলের অভাব হবে না। নারায়ণগঞ্জের হাজী মাস্তান কিংবা পুরান ঢাকার জেমস বাহিনী তো তাকে নেয়ার জন্য একরকম মুখিয়ে আছে। তবে নসু লীডারের প্রতি প্রচণ্ড অনুগত, সেজন্যই সে তাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে উৎসাহ বোধ করে না।


আট বছর আগে দীর্ঘ অজ্ঞাতবাস কাটিয়ে দেশে ফেরার পর নসুকে আগের মত কোন দায়িত্বে না রেখে বরং সুপারী কিলার বা প্রফেশনাল কিলার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কন্ট্রাক্ট কিলিং-এর মতো বিশেষ ধরনের কাজগুলোই আসলে তার জন্য উপযুক্ত। কলকাতার অপরাধ জগতে নেপালের তরাই এলাকার মদেশিয়া বা বিহারের কিলারদের সাথে রীতিমত পাল্লা দিয়ে কাজ করতে যেয়ে নসু অস্ত্র ব্যবহারে অনেক পরিণত এবং দক্ষ হয়েছে। তাছাড়া অভিজ্ঞতা ও  বয়সের কারণেও তার চেহারায় সম্প্রতি একটা ভারিক্কি ভাব এসেছে।


র‍্যাবের সাথে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিয়ে অপরাধ কর্মকান্ড ঘটাতে যেয়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডও এখন অনেক পেশাদার। আগে কেউ কাটা রাইফেল বা গাদা বন্দুক হাতে পেলেই খুশী হত। শুধু নসুর  মত কিছু ভাগ্যবানরাই ওপার থেকে আসা সস্তা ফাইফ স্টার ব্রান্ডের পিস্তল ব্যবহার করার সুযোগ পেত। ওসব এখন কেউ ছুঁয়েও দেখে না। আজকাল অনেকেই .২২ ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে কিংবা .৩২ বা ৭.৬৫ মি.মি. ক্যালিবারের বেরেতা হরহামেশা ব্যবহার করছে। ডার্লিং টাইপের এই অস্ত্রগুলো সাইজে ছোট, পুরো স্বয়ংক্রিয়, মেকানিক্যাল ফল্ট হয়না আবার শরীরে লুকিয়ে রাখতেও সুবিধা। চোখে না দেখলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডএ উজি পিস্তল ব্যবহারের কথাও শোনা যায়। অত্যাধুনিক পিস্তলের পাশাপাশি এখন একে ৪৭-টমি গান, এমনকি টেলিস্কোপিক সাইট, সাইলেন্সার লাগানো স্নাইপার রাইফেলও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলে এসেছে বলে শোনা যায়। তারা এখন পিস্তলের মাজল ফ্ল্যাশ বা কার্টিজের সাউন্ড লুকানোর জন্য অস্ত্রের সাথে সাইলেন্সার, টার্গেট মিস না করার জন্য লেজার এইমিং ডিভাইস ব্যবহার করে। এর পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটও ব্যবহার করা হয়। জিপিএস, থার্মাল ইমেজারসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র-সরঞ্জামাদি ব্যবহার করার খবরও শোনা যায়। এসব কারণে নসুর মতো পেশাদারদের ডিমান্ড এখন অনেক বেশী।


কন্ট্রাক্ট কিলিং ছাড়াও নসুকে আরেকটা বিশেষ কাজ করতে হয়। সেটা হলো প্রতি মাসের চতুর্থ শনিবারে সোনিয়ার কাছে কালাবাবুর বখরাটা পৌঁছে দিয়ে আসা। অবশ্য এই কাজটা সে একরকম জোর করেই নিয়েছে। ল্যাংড়া মনির নসুর উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করতে পারলেও সে মুখে কিছু প্রকাশ করেনি। নসু সবসময়ই চেষ্টা করেছে টাকার বান্ডিল পৌঁছে দেয়ার সুযোগে সোনিয়ার কাছাকাছি ভিড়তে। কিন্তু সোনিয়া আসলে গভীর জলের মাছ, সে একটা পর্যায়ের পর নসুকে আর কাছে ঘেঁষতে দেয়না। তবুও তারসাথে টুকটাক কথা বলে এবং বিভিন্ন চ্যানেলে খোঁজখবর নিয়ে যা বুঝতে পারে, তার মতো সোনিয়াও এক বিপন্ন খেলায় মেতেছে। তবে তার সাথে কারা জড়িত বা কিভাবে কি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে কোন আইডিয়া করতে পারেনা।


সোনিয়া নসু’র কাছে নিজের পরিকল্পনা মেলে না ধরে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। তা না হলে নসু হয়ত তাকে ব্ল্যাকমেইলিং করে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করত। নসু’র আসল উদ্দ্যেশ কি তা পরিষ্কার ভাবে বোঝার জন্য নসুর পিছনে সে লোক লাগিয়ে দেয়। পয়সা খরচ করলে এই জগতে কাজ করার জন্য লোকের অভাব হয়না। প্রতিমাসে তার কাছে যে পরিমাণ টাকা জমা হয়, তা থেকে দু’চার বা দশ-বিশ লাখ টাকা খরচ করা কোন ব্যাপার না। সে তাই করে এবং সরীসৃপের মত নিজের পরিকল্পনা ধরে এগিয়ে যায়।


২৬  

অপারেশন বিগফিশ। 

সূচনা পর্ব।


ওপার থেকে ফিরে আসার পর দলের প্রায় সবাই জানে নসু কিভাবে এবং কেন হেনা ও ব্যাঙ্গা বাবুকে সরিয়েছে। আজগর কিলিং এর গল্পতো আগে থেকেই সবার জানা। কিন্তু মজার ব্যাপার হল নসুর হাত একদম পরিস্কার, পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী হিসাবে তার নাম থাকলেও তার কোন অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নাই।


জোড়া কিলিং করে ওপারে পালানোর সময় নসু যে পিকআপটা নিয়ে কালীগঞ্জ গিয়েছিল সেই পিকআপের ড্রাইভারকে দর্শনার উথুলি আউটার সিগন্যালের কাছে ট্রেন লাইনে কাটা পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। পিকআপটা ট্রেনের ইঞ্জিনের আঘাতে দুমড়ে মুচড়ে রেললাইনের পাশেই পড়ে ছিল। যদিও পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী সেটা নিছক দুর্ঘটনা ছিল, কিন্তু দলের ছেলেরা প্রমাণ না থাকলেও অনুমান করতে পারে সেখানে আসলে কি ঘটেছিল।


নসু আগেও কথা কম বলত, কিন্তু এখন সে আরও বেশী চুপচাপ হয়ে গেছে। সে এখন যতটা না কথা বলে, ভাবে তার চেয়েও বেশী। তাকে নিয়ে ল্যাংড়া মনিরের উৎকণ্ঠা সে বুঝতে পেরে মনে মনে হাসে। সে আন্দাজ করতে পারে রিয়াজের আসল কাজটা কি, কিন্তু সেটা নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামায়না। এক সময় লীডারকে সরিয়ে তার জায়গা দখল করার প্ল্যান থাকলেও নসু এখন আর তা ভাবেনা। তার দৃষ্টি এখন অনেক দূরে কিংবা বলা যায় অনেক ওপরে। বিশেষ করে কালাবাবু তাকে অপমান করার পর থেকে তার এখন একটাই ভাবনা কালাবাবুকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া এবং তার সাম্রাজ্য দখল করা। এই বিষয়টা নিয়ে কলকাতায় এসটিএফ এর অসাধু সদস্যদের শেল্টারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং মিরপুর এলাকার আরেক গডফাদার বোমা মিজানের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। কালাবাবুর সাথে তার পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ নিতে সে নিজেও নসুকে একাজে সবধরনের সাহায্য করতে আগ্রহী। সে নিজ থেকেই কালাবাবুকে হত্যা মিশনের নাম দিয়েছে অপারেশন বিগফিশ, সতর্কতার জন্য সবসময় এই ছদ্মনাম ব্যবহার করে নসুকে কথা বলতে নির্দেশ দেয়। বোমা মিজান নিজেও একসময় পাঙ্খা নসুর মতই চুনোপুঁটি ছিল, কিন্তু তার সাহস, দক্ষতা আর পরিশ্রম তাকে বর্তমানের ঐ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সে এখনও ঢাকার অপরাধ জগতের কিংবদন্তী।


শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় বোমা মিজানের নামটা সবার আগে থাকায় সে দেশে ফিরতে পারছে না। বিশেষ করে ইন্দিরা রোড, ঢাকায় সেভেন মার্ডারের কারণে সে খুবই আলোচিত একজন সন্ত্রাসী। তাকে ধরার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের আগ্রহের কারণে কিছুদিন আগে ইন্টারপোল রেড এলার্ট জারী করেছে। তাছাড়া তাকে ধরার জন্য সরকারের ঘোষিত পুরষ্কারের অংকটাও নেহায়েত কম না। তবে সে সল্টলেকে প্রাসাদোপম বাড়ীতে বেশ আরামেই আছে। ঢাকা থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজী এবং মাদক ব্যবসার অর্থের একটা বড় অংশ তার কাছে হুন্ডী আকারে যায়। সেদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু বড় কর্তা এবং রাজনৈতিক নেতা মাস শেষে তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট অংকের উৎকোচ পায় বলে তার উপস্থিতি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তবে সেখানে যে কোন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে তার জড়িত না থাকার জন্য কঠোর নির্দেশনা  রয়েছে। সেজন্যই সেখানে শেল্টার নিলেও তার সমস্ত অপরাধমূলক কর্মকান্ড মূলত ঢাকাকে ঘিরেই। সেখানে বসে থেকেই সে ঢাকার ইয়াবা, ফেন্সিডিল, নারী-শিশু পাচার আর অস্ত্র চোরাচালানের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তবে সে মাফিয়া/ডন বলে এসব খবরের সত্য-মিথ্যা আদৌ কখনো যাচাই করা সম্ভব হয়না।


২৭

অপারেশন বিগফিশ। 

প্রস্তুতি পর্ব।


কালাবাবুকে হত্যা করতে চাইলে জেলের ভিতরেই করতে হবে, অথবা যখন তাকে কোর্টে   মামলার প্রয়োজনে হাজির করা হয় তখন। কালাবাবু জীবন বাঁচানোর জন্য মামলায় প্রভাব বিস্তার করে মাসের পর মাস জেলের নিরাপদ আশ্রয়ে কাটিয়ে দেয়। সে জানে জেলের বাইরে থাকলে তার প্রতিপক্ষ দল অথবা নিরাপত্তা-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ না কেউ তাকে সরানোর চেষ্টা করবেই। তার চেয়ে আপাতত এই ভাল, জেলের ভিতরে বসে অপরাধ জগত সামলানো। তাছাড়া দলের ক্যাডারদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা পয়সার কালেকশন এবং হিসাব রাখার কাজটা তো সোনিয়া বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছে।


ইদানিং অবশ্য সোনিয়ার ব্যাপারে টুকটাক কথাবার্তা তার কানে আসছে, কিন্তু কোন উপায় নেই। বর্তমান সরকার ক্ষমতা থেকে সরে গেলে সে নিরাপদ সময় বুঝে একসময় জামিন নিয়ে বের হবে। তখন সোনিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা যাবে। সরাসরি ফিল্ডে না থাকার কারণে তার মাসিক কালেকশন হয়ত একটু কম হচ্ছে কিন্তু সেতো নিরাপদ, এবং আইনের কাছেও পরিষ্কার থাকতে পারছে। তার মত অপরাধীদের জন্য জেলের ভিতরে সুযোগ-সুবিধার কমতি নেই। অর্থবিত্ত শুধু উপার্জন না, ঠিকমত ব্যবহার করার উপায়ও জানতে হয়। কালাবাবু জানে কিভাবে অর্থের বিনিময়ে সুখ কিনতে হয়।


নসুর ধারণা যে কোন উপায়ে সোনিয়াকে ম্যানেজ করতে পারলে কালাবাবুকে খুন করা কোন ব্যাপারই না। বিশেষ করে জেলের ডাক্তার, তার সাথে সোনিয়ার খুব ভালো সম্পর্ক। নসু বিভিন্ন সূত্র থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে, একমাত্র সোনিয়ার কালাবাবুর সাথে দেখা করার অনুমতি আছে। সে কালাবাবু'র সাথে দেখা করার অজুহাতে দলের বা চাঁদা সংগ্রহ  সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করে থাকে। আর এই কাজে তাকে সহযোগিতা করে কয়েদীদের স্বাস্থ্যসেবার কাজে নিয়োজিত ডাক্তার। সোনিয়া প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ দেয়ার পাশাপাশি দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ডাক্তার সাহেবকে ম্যানেজ করেছে। এভাবেই সে মাসে-দু’মাসে একবার কালাবাবুর সেলে রাত কাটিয়ে আসে। কালাবাবু একমাত্র সোনিয়াকেই বিশ্বাস করে।


কিন্তু যেমনটা শোনা যায়, সোনিয়াকে ম্যানেজ করা নাকি এক কথায় অসম্ভব। সে কালাবাবু'র প্রতি খুবই বিশ্বস্ত এবং তার কথাতেই উঠে বসে। তবে গুলশানের এক ব্যবসায়ীর সাথে তার  গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে মার্কেটে গুজব চালু আছে। এছাড়া সম্প্রতি এক ডাক্তারের সাথেও তার মাখামাখি সম্পর্কের কথা শোনা যায়। কিছুদিন আগে কোন এক পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার তাকে  এই তথ্যটা সরবরাহ করেছে। এ এও অদ্ভুত জগত, এখানে মাফিয়া-মিডিয়া-পুলিশ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। নসু সোনিয়ায় এসব গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে আরও তথ্য জোগাড় করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে শুনেছে কোনও এক কারণে সোনিয়া কিছুদিন আগে কারো  মাধ্যমে পাসপোর্টে কানাডার ভিসা নিয়ে রেখেছে। তবে কি সে ঐ ব্যবসায়ীর সাথে দেশ ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছে! নাকি সেই ডাক্তার! নাকি তৃতীয় অন্য কেউ! খোঁজ নিতে হবে, ঘটনাটা সত্য হতেও পারে, আবার সত্য নাও হতে পারে। কেননা জীবনের প্রতিটি বাঁকে প্রণয় রূপ বদলায়, যে তার একটি রূপকে ধ্রুব সত্য মানে সে দুঃখ পায়।


২৮ 

সেফ হাউজ।

স্টেশন রোড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।


পাঙ্খা নসু দিনের পর দিন হত্যার ছক কেটে চলে। একটা না একটা ব্যবস্থা হবে বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস। সে মোটামুটি তিনটা প্ল্যান ধরে এগোয়। এরমধ্যে কোন একটাকে কাজে লাগাতে পারলে তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পুরন হবে। প্ল্যান ‘এ’ হলো জেলখানার সেলের ভিতরেই তাকে খুন করা। কিন্তু প্ল্যান ‘এ’ অনুযায়ী জেলের ভিতরে কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে নিজেকেই ছোটখাট অপরাধ করে জেলে যেতে হবে এবং কাজ শেষে জামিনে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু সেজন্য একটা ভাল চ্যানেল খুঁজে বের করতে হবে, যারা তাকে নিশ্চিত করবে যে তাকে  মামলার শুনানি শেষে কাসিমপুর জেলে পাঠানো হবে এবং কালাবাবুর পাশের সেলেই রাখা হবে। এরপর একজন ভাল উকিল নিয়োগ করে তাকে জামিনে বের করে আনবে। ভালভাবে চেস্টা করলে এর সবই হয়ত ব্যবস্থা করা যাবে কিন্তু সমস্যা আসলে অন্যখানে। কোন ছোটখাট অপরাধ করে পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার পরে পুলিশ যদি তাকে তার পূর্বের অপরাধের কারণে কোন পেন্ডিং হত্যা বা ধর্ষণের মামলায় কোর্টে চালান দেয় তাহলে তো জামিনে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন হবে। এছাড়া ক্রস ফায়ারে যাওয়ার রিস্ক তো আছেই, এ লাইনে তার নিজেরও শত্রুর অভাব নেই। হয়ত দেখা যাবে ল্যাংড়া মনিরই তাকে সরানোর জন্য টাকা ঢালছে। এছাড়া জেলখানার ভিতরে কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে জেল পুলিশের সহযোগিতা লাগবে। সে জানে র‍্যাব-পুলিশও কালাবাবুকে সরাতে চায় কিন্তু সেটা তো জেলের বাইরে। জেলের ভিতরে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা কাস্টোডিয়াল ডেথ জাতীয় কোন রিস্ক নিতে চাইবে না।


প্ল্যান ‘বি’ হলো কালাবাবুকে যেদিন আদালতে হাজিরা দেয়ার জন্য নেয়া হবে সেদিন আদালত প্রাঙ্গনেই তাকে খুন করা। সেটা হতে পারে ধারালো কমান্ডো নাইফ কিংবা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে সফল হতে হলে তাকে টার্গেটের খুব কাছে পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। তবে কালাবাবু বা জেল পুলিশ সম্ভবত সে ধরনের সুযোগ দিবেনা। তাছাড়া আদালত প্রাঙ্গনে অত শত লোকের মাঝে হত্যাকান্ড ঘটাতে গেলে অনেক রিস্ক নিতে হবে। এতে এমনকি হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। অবশ্য ঘটনার দিন যদি আদালত প্রাঙ্গনে এলোপাথাড়ি বোমাবাজি করে ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায় তাহলে হৈ-হল্লার সুযোগে কালাবাবুর কাছে গিয়ে শ্যুট করা সম্ভব। তবে এটা পুলিশ স্কর্টের পাল্টা এ্যাকশন এবং অনেকাংশে তার ভাগ্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। এজন্য তার কিলিং দলটা বেশ ভারী করতে হবে। আবার দলে বেশী লোক টানা মানে তথ্য লিক্‌ হওয়ারও বেশী সম্ভাবনা। সেরকম কিছু হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।


আরেকটা পদ্ধতি হতে পারে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে দূর থেকে গুলি করে ফেলে দেয়া। সেক্ষেত্রে ওর নিজের কাছে স্নাইপার রাইফেল না থাকায় ওটা কারো কাছ থেকে ধার করতে হবে। এই অস্ত্রটা সে কলকাতায় কয়েকবার ব্যবহার করেছিল। চমৎকার কাজ দেয়, অনেক দূর থেকে সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান নিয়ে এইম করে লক্ষ্যবস্তু ফেলে দেয়া যায়। কিন্তু ওর জানামতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই অস্ত্র একটা কিংবা দু’টার বেশী নাই। অনেক দামী অস্ত্র, তাই ওটার ভাড়া বেশী এবং কার্টিজও দেয়া হয় খুব হিসাব কষে। এছাড়া ওটা সংগ্রহ করতে গেলে চারদিকে,  এমনকি পুলিশের কাছেও খবরটা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। নসুর প্ল্যান ‘সি’ হল সবচেয়ে কঠিন এবং ভয়াবহ। আর্জেস ৭২ গ্রেনেড মেরে কালাবাবুসহ জেল পুলিশের প্রিজন ভ্যান উড়িয়ে দেয়া। সে ভাল করেই জানে এতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি এবং অযথা রক্তপাত হবে। প্রিজন ভ্যানের অন্যান্য সাধারণ কয়েদী ছাড়াও রাস্তার নিরাপরাধ পথচারীও এতে মারা যেতে পারে।


কক্সবাজার কিংবা বান্দরবানের দিকে গেলে আরাকানের রোহিঙ্গা অথবা অন্যান্য আরাকান আর্মি’র মতো বিদ্রোহী দলগুলোর কাছ থেকে আর্জেস ৭২ গ্রেনেড ম্যানেজ করা সম্ভব। তবে এভাবে অস্ত্র গোলাবারুদ অল্প দামে ম্যানেজ করা গেলেও সেটা ঢাকা পর্যন্ত নিরাপদে  আনাটাই হবে ভীষণ রিস্কি কাজ। হাইওয়ের বিভিন্ন জায়গায় বিজিবি-পুলিশের চেকপোস্টে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পটিয়া-কেরানীগঞ্জের পর থেকে ওদিকে খুব সক্রিয়। তবে নসু অনেক চিন্তা ভাবনা আর প্ল্যান কাটছাট করে অবশেষে প্ল্যান ‘সি’ নিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। যতই রিস্ক থাকুক বা রক্তপাত ঘটুক না কেন কালাবাবুকে খুন করতে হলে তার কাছে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি বলে বিবেচিত হয়।


২৯    

প্রিয়াঙ্কা রেস্টুরেন্ট, মিরপুর বেড়ীবাঁধ এলাকা।

সন্ধ্যার পরপর।


পাঙ্খা নসুর সামনে এখন অনেক কাজ। প্ল্যান অনুযায়ী এগোতে হলে তার এখন প্রচুর টাকা আর কিছু ছেলেপেলে প্রয়োজন। সে ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ছক কষে ধীরে ধীরে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। পাঙ্খা নসু এটা ভালোভাবেই বুঝতে পারে যে তার প্ল্যান কার্যকর করতে হলে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পড়ে থাকলে চলবে না। ঢাকায় ফিরে কিছু দক্ষ ও পরীক্ষিত ছেলেদের নিয়ে একটা টিম তৈরি করতে হবে। তবে সবকিছুর আগে সবচেয়ে বেশী যেটা প্রয়োজন সেটা হলো ল্যাংড়া মনিরের তাকে নিয়ে যে অহেতুক উৎকণ্ঠা রয়েছে, সেটা দূর করা। কারণ সে হয়ত ছেলেপেলে ম্যানেজ করতে পারবে কিন্তু টাকা-পয়সার জন্য লীডারের সাহায্যই এখন তার সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন।


তবে টাকা-পয়সা সংগ্রহের জন্য বিকল্প সোর্স হতে পারে সোনিয়া। সে ইতিমধ্যে বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে যে, সোনিয়া সেই ব্যবসায়ী প্রেমিক আরিফ সাহেবের সাথে বিদেশে পালানোর  চেষ্টা করছে। তাদের ভিসা-পাসপোর্ট সব প্রস্তুত, তারা শুধু উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে। সোনিয়া ইতিমধ্যে বিট কয়েন, অনলাইন জুয়া, ভার্জিন আইল্যান্ড বা অন্য কোথাও অফশোর কোম্পানি খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে কানাডায় প্রচুর অর্থ পাচার করেছে এবং সেখানে টরেন্টোর বেগম পাড়ায় তার একটা ম্যানসন রয়েছে বলে শোনা যায়। তবে তার সেই ক্রাইম রিপোর্টার সূত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খবর হলো, তারা ডার্ক ওয়েব এক্সেস করে বিশেষ ব্যবস্থায় অ্যাকোনাইট বিষ সংগ্রহ করেছে। ডার্ক ওয়েব এক্সেস করার জন্য অনিওন নামের একটা নেটওয়ার্ক আছে, যা গেটওয়ে হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও গুগল প্লে-স্টোর থেকে অরবোট ডাউনলোড করে এন্ড্রয়েড স্মার্টফোনের মাধ্যমেও ডার্ক ওয়েবে এক্সেস করা যায়, তবে তারা কিভাবে এক্সেস করেছে তা তারাই ভালো জানে। নসুর সুত্র জানিয়েছে যে অ্যাকোনাইট ওষুধ হিসেবে আসলে খুবই সামান্যই ব্যবহৃত হয়, আর এই পরিমাণটা অল্প থেকে সামান্য বেশি হলে তা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অ্যাকোনাইটের বিষক্রিয়ার ফলে প্রাথমিকভাবে ডায়রিয়া, বমি এসব হয়। এরপর হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন শূন্যতার কারণে শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরা পড়ে অক্সিজেন স্বল্পতা বা দম বন্ধ হয়ে যাওয়া। তাই বিষক্রিয়ার কারণ দুর্ঘটনা নাকি উদ্দেশ্য প্রণোদিত তা সনাক্ত করা বেশ কঠিন।


সোনিয়া যে কালাবাবু’র সাথে ডাবল গেম খেলছে তা নসুর কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হলেও কালাবাবু হয়ত এখনও আন্দাজ করতে পারেনি অথবা কানাঘুষা শুনলেও তা বিশ্বাস  করতে চায় না। হয়তো ভালবাসা কিংবা প্রবল মায়া! তা না হলে সে এতদিনে সোনিয়াকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিত। অপরাধজগতে বিশ্বাসঘাতকতার একটাই শাস্তি, মৃত্যু। এটা নিশ্চয়ই সোনিয়া’র জানা, সে যে কালাবাবু’র এত টাকা-পয়সা বিদেশে সরিয়ে ফেলল সেক্ষেত্রে তারও তো একটা পালানোর পথ প্ল্যান করার কথা। কিন্তু সেটা ঠিক কি তা জানতে সোনিয়াকে যথোপযুক্ত সময়ে একটা টোপ দেয়া এবং প্ল্যান ‘সি’ নিয়ে লীডারের সাথে আলোচনা করার জন্য নসু ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসে। নসু কি ভেবে লীডারকে এতটা বিশ্বাস করে তা সে নিজেও জানেনা। তবে তার দৃঢ় বিশ্বাস লীডার তাকে সাহায্য করতে না পারলেও বা তার কাজে সহযোগিতা না করলেও অন্তত প্ল্যানটা কারো কাছে ফাঁস করে দিবে না।


কোন এক সন্ধ্যায় মিরপুর বেড়ীবাঁধ এলাকার একটা রেস্টুরেন্টে নসু আর লীডার মিটিংএ বসে। ল্যাংড়া মনির অবশ্য জরুরী কাজের অজুহাতে নসুর সঙ্গে মিটিংটা এড়াতে চেয়েছিল। সে আসলে এভাবে একাকী পাঙ্খা নসুর সাথে আলোচনায় বসতে চায়নি। তার ধারণা ছিল এটা হয়ত তাকে হত্যা করার জন্য নসুর কোন প্ল্যান। অনিচ্ছাসত্ত্বেও লীডার তার গাঢ় নীল রঙের ভক্সি মাইক্রোবাসটা নিয়ে নসুর সঙ্গে দেখা করতে আসে। তার সঙ্গে দু’জন গানম্যান। তারা  রেস্টুরেন্টের এক কোনে জানালার পাশে আলো আঁধারিতে বসে নসুর ওপরে দৃষ্টি রাখে। তারাও যথেষ্ট পেশাদার এবং অস্ত্রের ব্যবহারটাও নসুর চেয়ে কম বোঝেনা। নসু একটু ঝামেলা করলেই তারা শ্যুট করতে দ্বিধা করবেনা। তাদের সেরকম ট্রেনিংই দেয়া আছে এবং জার্মান শেফার্ড  কুকুরের মত প্রভুকে রক্ষা করতে তারা কখনও পিছুপা হবেনা। নসু লীডারকে নিয়ে এমন জায়গায় বসে যেখান থেকে রেস্টুরেন্টের ভিতর এবং প্রবেশপথটাও ভালভাবে নজরে রাখা যায়। নসুর এই যে সবসময় সতর্ক থাকার অভ্যাস, এটা মনিরের খুব ভাল লাগে। নসুর চলাফেরায় আসলে একধরনের স্মার্টনেস আছে, যেটার কারণে তাকে সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। তার দলের বেশীর ভাগ ছেলেরাই যেন কেমন পানসে টাইপের, শুধু পাঙ্খা নসুই একটু   আলাদা। আবার ঠিক এজন্যই তাকে দলের অন্যদের মত পুরোপুরি বিশ্বাসও করা যায় না। কেনোনা তার পক্ষেই সম্ভব যে কোন সময় পাশার দান উল্টে দেয়া। ওপারের প্রফেশনালদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কাজ করতে যেয়ে এই লাইনের অনেক কিছুই সে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হাতে কলমে শিখেছে। অনেক বদলে গিয়েছে নসু, দলের অন্য আর দশজন থেকে তাকে তাই একটু বিশেষ খাতির করতেই হয়। নসু হচ্ছে তার ট্র্যাম কার্ড, তাই লীডার তাকে হিসাব করেই ব্যবহার করে। কালাবাবু অনেকবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নসু নিজ থেকেই তার দলে ভিড়তে চায়নি। ল্যাংড়া মনিরের প্রতি তার কৃতজ্ঞতাবোধই হয়ত তাকে এখনও তার দলে ধরে রেখেছে।


নসু ওরফে পাঙ্খা নসু তার জন্য স্ম্যাশড পটেটো উইথ বীফ স্টেকের সঙ্গে বিয়ারের অর্ডার দিয়ে লঘু স্বরে আলোচনা শুরু করে। লীডার তার জন্য ফিশ গ্রিলের অর্ডার দেন, সাথে ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস। উনি এরকম আলোচনার মুহুর্তে মদ বা বিয়ার পান করেন না। নসু তার প্ল্যানটা বলতে গিয়ে আসলে নিশ্চিত ছিল না লীডারের প্রতিক্রিয়াটা ঠিক কিরকম হবে। তিনি রাজী হবেন কিনা তাও নসুর জানা নেই। তাই একথা সেকথার পর একপর্যায়ে একরকম মরিয়া হয়েই লীডারকে তার প্ল্যান ‘সি’ বর্ননা করে এবং একাজে লীডারের সাহায্য চায়।


নসুর এরকম প্ল্যানের কথা লীডার স্বপ্নেও ভাবেননি তাই খানিকটা ভিরমি খান। তার গ্লাস থেকে কিছু জুস ছলকে টেবিলের ওপরে পড়ে এবং তার প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়। টিস্যু পেপার দিয়ে মুছতে চেস্টা করেন কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়না। প্যান্টের চেইনের পাশে কাপড়টা ভেজাই থাকে, দলের ছেলেরা দেখলে অন্য কিছু ভাবতে পারে ভেবে তিনি বিব্রত বোধ করেন। কিন্তু পরক্ষণেই অপ্রতিভ অবস্থা কাটাতে গলা ঝেড়ে নসুকে জিজ্ঞেস করেন,


- এইটা ক্যামতে! প্রচুর রিস্ক।  

- ঠিক আছে, আমরাও কইলাম ছোট না।    

- অনেক লম্বা হ্যার হাত। 

- সবতেই জানে। 

- রাস্তার টোকাই থাইক্যা পুলিশ-প্রশাসন এমনকি পার্টির নেতাগোর লগেও হ্যার খাতির আছে।   

- জিতলে সবতে ম্যানেজ করা যাইবো। হ্যারা চেনে মাল, সেটা কালা বাবু না লীডার ক্যাঠায় 

 দিতাছে সেইটা বিষয় না। তাগো মাল-পানি ঠিকঠাক বুইঝা পাইলেই অইলো।       

- ডেভেলপার কোম্পানিগুলো হ্যার পিছনে প্রচুর পাত্তি ঢালে, হ্যার কখনও পাত্তির অভাব হয়না। 

- পরে আমগো পিছনে ঘুরবো।


নসু এবং ল্যাংড়া মনির তাদের ভাষায় আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। কখনও তাদের গলার স্বর উঁচুতে আবার কখনও খাদে নেমে যায়। তারা জানে কোনভাবে যদি এই প্ল্যান ভেস্তে যায় এবং তা যদি কালাবাবুর কান অবধি পৌঁছে তাহলে এই দুনিয়াতে আর বেঁচে থাকতে হবেনা। এমনকি দেশের কোথাও পালিয়েও বাঁচা সম্ভব না, সব খানে তার লোক আছে। প্রয়োজন বোধে পাতাল থেকে ধরে এনেও হত্যা করে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে তাদের মৃতদেহ ঝুলিয়ে দিতে পারে। এটাই হল কালাবাবুর নিজস্ব স্টাইল, অতীতেও দলের কেউ বেঈমানি করলে সে তাদেরকে এভাবেই শাস্তি দিয়েছে। এভাবেই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, তর্ক-বিতর্কের মধ্যে দিয়ে তাদের আলোচনা এগিয়ে যায়।


লীডার তাকে সব ধরণের বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেন। কালাবাবু ভীষণ ধূর্ত আর শঠ। তাকে খুন করা এক কথায় অসম্ভব। আর কোনোভাবে নসু যদি তার প্ল্যান কার্যকর করতে পারেও তাহলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে একদম তুলকালাম কান্ড লেগে যাবে। ফাঁকা মাঠ পেয়ে অন্য এলাকার ডন-মাফিয়ারা মিরপুর এলাকার দখল নিতে আসা মাত্র রক্তের হোলিখেলা ঢাকা শহরের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। এর আগেও একবার এরকম হয়েছিল। নসু তাকে এসব নিয়ে অযথা বেশী ভাবতে নিষেধ করে জানায় যে তার এই প্ল্যানে বোমা মিজানের সমর্থন আছে এবং কালাবাবুর অবর্তমানে মিরপুর এলাকার বস সেই হবে। ল্যাংড়া মনির তাকে অবিশ্বাস করলে নসু বোমা মিজানের বিশেষ আইএসডি নাম্বারে ফোন করে লীডারকে কথা বলার জন্য ফোনটা এগিয়ে দেয়। বোমা মিজান নসুকে সাধ্যমত সবরকম সহায়তা করার জন্য নির্দেশ দেন,  এরপরে আসলে আর কোন কথা থাকে না। লীডার পাঙ্খা নসুর সঙ্গে বোমা মিজানের এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখে অবাক হন। তবে লীডার খুশী একথা জেনে যে সে কখনই পাঙ্খা নসুর টার্গেট ছিল না, কিন্তু নসুর মনে কি আছে তা সেই শুধু জানে।


৩০ 

ডেপুটি জেলারের অফিস।

কাসিমপুর কারাগার, সময় রাত আনুমানিক বারোটা।


কালাবাবুর কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নসু এবং ল্যাংড়া মনিরের মধ্যে বিশেষ মিটিং এর খবরটা পৌঁছে যায়। কালাবাবু তখন ডেপুটি জেলারের অফিসে বসে দাবা খেলছিলেন। খবরটা পেয়ে কালাবাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কি বিষয়ে মিটিং তা অবশ্য জানা যায়নি। তিনি ভ্রু কুঁচকে দাবার বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দাবার চাল দিতে দু'একবার ভুল করেন। এরপর হঠাৎ দাবার বোর্ড উল্টে দিয়ে মোবাইল ফোনে কয়েক জায়গায় নির্দেশনা দিতে দিতে নিজের সেলে ফিরে যান। তার এই হঠাৎ ক্ষেপে ওঠায় ডেপুটি জেলার আছির সাহেব বেশ অবাক হন। তিনি কালাবাবুর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস হয়না। প্রতিমাসে কালাবাবুর কাছ থেকে তিনি লাখ টাকার বান্ডিল আর পরিবারের নিরাপত্তাটা পান। তার একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আছে, তার নিরাপত্তার কথাও তাকে ভাবতে হয়।


অনেক ভেবে চিন্তে নসু অপারেশনের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আর সাভার বাজারের মাঝে জ্বালেশ্বর-রেডিও কলোনি এলাকাটাকে পছন্দ করে। জায়গাটা অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশ ফাঁকা। বিশ্বরোডের এই অংশটায় দোকানপাট-বাড়িঘর বেশ কম। এখানে এ্যাকশন করে নির্বিঘ্নে বোমকা-বিরুলিয়া-জিরাবো হয়ে বাইপাইল থেকে উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অথবা টঙ্গি থেকে ভৈরব হয়ে সিলেট বা চট্টগ্রামের দিকে, এমনকি দরকার হলে মিয়ানমারেও পালিয়ে যাওয়া সম্ভব।


অপারেশন সফল হলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য কিছুদিন সম্ভবত লুকিয়ে থাকতে হতে পারে। নসুর সাথে এর আগেও কাজ করেছে এরকম কয়েকজন বিশ্বস্ত এবং দক্ষ ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সে তার টিম তৈরি করে। তারা অপারেশন প্ল্যান জানলেও কিলিং টার্গেট সম্পর্কে কিছু জানে না, গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে কাউকে তা জানানো হয়নি। শেষ মুহূর্তে প্রয়োজন বোধে তাদেরকে টার্গেট সম্পর্কে জানানো হবে। পুরো প্ল্যানটা শুধু নসু আর লীডারের মাথায়। নসু লীডারকে কালাবাবুর আদালতে হাজিরার তারিখ এবং কোন পথে কিভাবে তাকে সেখানে নেয়া হবে সেসব তথ্য সংগ্রহ করতে অনুরোধ করে নিজে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হোয়াইট মামুনকে সাথে নিয়ে বান্দরবান যায়।


৩১  

অপারেশন বিগফিশ। 

বান্দরবান, অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান।


লীডারের নির্দেশে লোকাল কন্টাক্ট হিসাবে মংপ্রু চাকমা তাদের সঙ্গে যায়। মংপ্রু চাকমা একসময় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ছোটখাট নেতা ছিল। এখন রাজনীতি বাদ দিয়েছে। অপরাধ জগতের লোকজনদের কারো কারো সাথে পরিচয় থাকলেও সে এখন কাকরাইলের মোড়ে একটা ফার্মে স্টেনো পদে চাকুরী করে। তার সম্পর্কে এরবেশি কিছু জানা যায় না। তবে তার বড় ভাই ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির ধারা মেনে আত্মসমর্পণ করলে তারা রাজস্থলী থেকে বান্দরবানের সুয়ালকে এসে বসতি গড়ে। নসু তার সাথে বান্দরবানের মেঘলা এলাকায় একটা গেস্ট হাউজে ওঠে। মংপ্রু’র সাথে তারা বিভিন্ন জায়গায় গোপনে অনুসন্ধান চালালেও কেউই অস্ত্র কেনাবেচার বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেনা বা কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলতেও চায়না। আসলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে অনেকেই এসব তথ্য জানলেও সহসা কেউই ধরা দিতে চায়না।


অবশেষে এক সোর্সের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তারা রোয়াংছড়ি যায়। সেখানে অর্থের বিনিময়ে একজন কারবারী তাদেরকে সাহায্য করতে রাজী হয়। তাকে গাইড হিসাবে নিয়ে নসু বলিপাড়া থেকে থানচি হয়ে আরও দক্ষিনপূর্বে রেমাক্রি যেয়ে আসল ব্যক্তিটির সন্ধান পায়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং টাটমাডো বা সেনাবাহিনীর অত্যাচার উৎপীড়নের কারণে মিয়ানমারের প্রায় প্রতিটা প্রদেশেই বিদ্রোহী বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। এসব বাহিনীকে ঘিরে সেখানে অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদের একটা চোরাই বাজার গড়ে উঠেছে। সে মিয়ানমারের এরকম  একটা বিদ্রোহী দলের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও এমুনিশন সংগ্রহ করে দিতে রাজী হয়, কিন্তু এজন্য সে প্রচুর অর্থ দাবী করে। দরদাম কষাকষির পর অবশেষে তাদের মধ্যে একটা আপোষ রফা হয়। সোর্সের দাবী অনুযায়ী অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করে তারা লামা'তে রাত যাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। লামা বাজারে একটা বোর্ডিং হাউজে উঠে তারা অপেক্ষা করতে থাকে।


মংপ্রু চাকমা রাতেই, খাওয়ার টেবিলে অস্ত্র কি জন্য প্রয়োজন হচ্ছে জানতে চাইলে নসু নিরুত্তর থাকে। হোয়াইট মামুনও মুখ খোলে না। তারা নিঃশব্দে খাবার শেষ করে রুমে এসে শুয়ে পড়ে। এখন অবশ্য শুয়ে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই। মংপ্রু এমনি ভাসাভাসা ভাবে শুনেছে যে কারা যেন কালাবাবুকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করছে, তবে কবে কোথায় কিভাবে হবে সেটা সে জানেনা। এরপর থেকে মংপ্রুও অস্ত্র কেনা’র বিষয়ে কোন প্রশ্ন না করে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। তাদের পরের দিনটা একরকম শুয়ে-বসে চুপচাপই কাটে। মংপ্রু একবার সুয়ালকে তার বাড়ী থেকে ঘুরে আসতে চেয়েছিল কিন্তু নসু রাজী না হয়ে তাকে ডিলিংস বুঝে নেয়ার পরে বাড়ীতে যাবার পরামর্শ দেয়।


নসু ট্যুর করার জন্য কিছু প্রসাধন সামগ্রী, ট্র্যাভেল ব্যাগ ইত্যাদি কেনা সহ ট্যুর প্রোগ্রাম, হোটেলের বিজ্ঞাপন ইত্যাদি সংগ্রহ করার জন্য মামুনকে কক্সবাজারে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া তিন দিন পরের কক্সবাজার-ঢাকা রুটের রাত্রিকালীন এসি বাসের টিকেটও কাটতে বলে। রাত আটটার দিকে যে বাসটা কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসবে তাতে ফাসিয়াখালি থেকে তারা উঠবে বলে জানায়। মামুন তার কাজে চলে যায়। মংপ্রু কান খাড়া করে নসু এবং মামুনের মধ্যে কথোপকথন শোনে কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তিতে তার প্রতিফলন ঘটে না। হোয়াইট মামুন পরদিনই সন্ধ্যায় লামায় ফিরে আসে কিন্তু অস্ত্রপাতি  তখনো না পৌঁছানোর কারণে নসু একটু চিন্তায় পড়ে যায়। মংপ্রু চাকমা অবশ্য তাকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে। তার ভাষ্যমতে পাহাড়িরা বাঙ্গালীদের তুলনায় অনেক সৎ, তারা কাউকে কথা দিলে সেটা রাখে। হয়তো সীমান্তে কোন সমস্যার কারণে খানিকটা দেরী হচ্ছে, কিন্তু তার ডেলিভারি ঠিক সময়ই চলে আসবে।


৩২  

কক্সবাজার-ঢাকা মহাসড়ক।

ফেরার পালা।


তাদের যেদিন ফাসিয়াখালি থেকে ঢাকায় ফেরার কথা সেদিন বিকেলেই চাহিদানুযায়ী সব  অস্ত্রপাতি এসে পৌঁছায়। একটা একে-৪৭ রাইফেলসহ কয়েকটা ম্যাগাজিন ভর্তি কার্টিজ এবং গোটা দশেক আর্জেস ৭২ গ্রেনেড। ম্যাগাজিনের গায়ে একটু মরচের দাগ থাকলেও তা ব্যবহার যোগ্য, প্রতিটা ম্যাগাজিনে ৩০ রাউন্ড করে এমুনিশন ঠাসা। নসু অস্ত্র থেকে ম্যাগাজিন রিলিজ করে চার্জিং হ্যান্ডেলটা কয়েকবার আগুপিছু করে এবং অস্ত্রের মাজল আকাশের দিকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দেয়। ক্লিক করে একটা আওয়াজ হয়। এভাবে অস্ত্রের বোল্ট, পিস্টন, ফায়ারিং পিন এসব ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা তা সহজেই বোঝা যায়। সে সেফটি লিভার সেইফ পজিশনে রেখে অস্ত্রটা মামুনের দিকে এগিয়ে দেয়। মামুন এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে নসু’র কাজকর্ম দেখছিল, সে জীবনে প্রথম এরকম একটা অস্ত্র স্পর্শ করতে পেরে খানিকটা উত্তেজিত বোধ করে।


নসু অস্ত্রের চালান বুঝে পেয়ে দুশ্চিন্তা মুক্ত হলেও অজানা আশংকায় তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তবে সেটা মুহুর্তের ভাবনা মাত্র। বাকী অর্থ পরিশোধ করে তারা লামা থেকে চিরিঙ্গায় চলে আসে। নসু আসলে কোনও রিস্ক নিতে চায়না। অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে এ লাইনে ডাবল গেইম খেলার লোকের অভাব নেই। মংপ্রু পাওনা অর্থ বুঝে নিয়ে সুয়ালক যেতে চায়। লামা থেকে সুয়ালক কাছেই। নসু এবার যদিও না করেনা কিন্তু তার মনটা খচখচ করতে থাকে। ঢাকায় আরও কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ঢাকায় ফিরে দেখা করতে বলে। মংপ্রু দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ীর পথে পা বাড়ায়। তবে সে পথে এক জায়গায় থেমে মোবাইলের দোকান থেকে অজ্ঞাত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ফোন করে। কয়েক হাত হয়ে সে খবর পৌঁছে যায় কালাবাবু এবং আরও কয়েক জায়গায়।


নসু একবার মংপ্রুকে ইয়াংচার দিকে নিয়ে হত্যা করে জঙ্গলে ডেডবডি ফেলে দিতে চেয়েছিল। নসু আসলে একটা বড় কাজ সামনে রেখে এরকম অপরিচিত জায়গায় কোন ধরনের উটকো ঝামেলায় পড়তে চায়নি। তাছাড়া ঢাকায় দেখা হলে সেখানেও ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকছে। নসু চিরিঙ্গায় একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে হোয়াইট মামুনকে নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে কক্সবাজারে হাজির হয়। সেখানে বাদ্যযন্ত্রের দোকান থেকে একটা হাওয়াই গীটারের ব্যাগ কিনে পরিচিত এক সস্তা  হোটেলে ওঠে এবং গোসল সেরে রাতের খাবার খেয়ে নেয়। অস্ত্র এবং গ্রেনেডগুলো গীটারের ব্যাগে সুন্দরভাবে প্যাক করে ঢাকায় ফেরার জন্য একটা এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে। এরপর ওষুধের দোকান থেকে স্যালাইন ও অন্যান্য জিনিসপত্র কেনে এবং কর্মচারীর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে একটা ভুয়া প্রেসক্রিপশন বানিয়ে নেয়।


নসু একটা সেলুনে ঢুকে মাথা ন্যাড়া করে এবং দাড়ি-গোঁফ ছেটে ফেলে। তার দিকে তাকিয়ে হোয়াইট মামুনের হাসি পেলেও সে মুখে কিছু বলেনা। সে জানে নিশ্চয়ই এর পিছনে কোন কারণ আছে। নসু হোয়াইট মামুনকে মাথার চুল এবং জুলফি ছোট করতে বলে। এরপর রাত সাড়ে আটটা/নয়টার দিকে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। হাওয়াই গীটারের ব্যাগটা বেডের নীচে ঠেলে দিয়ে নসু রোগীর বেডে শুয়ে পড়ে। হাতে এমনভাবে স্যালাইনের নলটা বাঁধা যেন তার শরীরে স্যালাইন চলছে। তবে যে কোন মুহুর্তে ব্যবহারের জন্য পিস্তলটা প্যান্টের কোমরে গুঁজে রাখে। হোয়াইট মামুন ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে। এ্যাম্বুলেন্সের হুটার রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে কিন্তু পটিয়াতে এসে তারা বাধাগ্রস্থ হয়। সামনে বেশ বড় জ্যাম। পুলিশ চেকপোস্ট বসেছে। ঢাকার দিকে যাওয়া সব গাড়ীতে তল্লাশি চলছে। হোয়াইট মামুন পিছনে ফিরে নসুর দিকে তাকায়। তাদের চার চোখের মিলন হয়। নসুর মুখে হালকা হাসির রেখা, তারা তাদের ভাষা বুঝে নেয়।


ড্রাইভার বেশ বিরক্ত হয়ে পথের অন্যান্য গাড়ীকে পাশ কাটিয়ে আস্তে আস্তে এ্যাম্বুলেন্সটা পুলিশ চেকপোস্টের সামনে নেয়। দু’জন পুলিশ কনস্টেবল কাছে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মামুন ঠাণ্ডা মাথায় তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়,


- কোথা থেকে আসছেন? 

- কক্সবাজার।

- কোথায় যাবেন? 

- ঢাকা।

- বেডে কে? ওনার কি হয়েছে? 

- কয়েকদিন আগে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আজ বিকালে হঠাৎ ফুড পয়জনিং এর কারণে তার বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তারের পরামর্শে ভালো চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রোগীর শারীরিক অবস্থা বেশী ভাল না, তার পরিবারের লোকজনদেরকে খবর দেয়া হয়েছে।


মামুন রোগীর ব্যবস্থাপত্র এবং তারা কক্সবাজারে যে হোটেলে ছিল তার ভাউচার ও অন্যান্য কাগজপত্র বের করে দেখায়। পুলিশ তাদের ব্যাগ তল্লাশি করতে চায় কিন্তু রোগীর ক্রমাগত চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে ক্লিয়ার সিগন্যাল দিয়ে এ্যাম্বুলেন্সটাকে সাইড কেটে বেরিয়ে যেতে বলে। কিছুটা এগোনোর পর তাদের যে গাড়ীতে ঢাকায় ফেরার কথা ছিল সেটাকে তারা রাস্তার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়। পুলিশ লাগেজ বক্স থেকে যাত্রীদের সব মালপত্র নিচে নামিয়ে প্রতিটি ব্যাগ পরীক্ষা করছে। সবাই যাত্রার অযাচিত বিলম্বের কারণে বেশ বিরক্ত কিন্তু তাদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই, পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে।


ব্যাকভিউ মিরর দিয়ে হোয়াইট মামুন পিছনে নসুর দিকে তাকায়। নসুর প্রতি শ্রদ্ধায় তার ঘাড় নুয়ে পড়তে চায়। সে একারণেই পাঙ্খা নসুকে এত ভালবাসে। কি বুদ্ধিমান আর স্মার্ট! তার সাথে কাজ করার মজাই আলাদা। ফাঁকা হাইওয়ে ধরে এ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশে হুহু করে এগিয়ে চলে। কাকডাকা ভোরে যাত্রাবাড়ী পৌঁছে তারা এ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়। নসু স্যালাইনের নল খুলে গীটারের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। হোয়াইট মামুন ভাড়া মিটিয়ে নসুর চলার গতির সঙ্গে তাল মেলায়।


এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে। ভোরের ঘন কুয়াশায় দুটো অবয়ব একসময়ে ফিকে হতে হতে মিলিয়ে যায়।


৩৩  

অপারেশন বিগফিশ। 

রেডিও কলোনি এলাকা, জ্বালেশ্বর, সাভার।

সময় আনুমানিক বেলা এগারোটা।


রৌদ্র করজ্জল সেই দিনটা নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। দিনটা তার জন্য একই সাথে ভাগ্য গড়ার কিংবা ধ্বংসের দিন। লীডারের দেয়া তথ্য   অনুযায়ী সেদিনই কালাবাবুকে আদালতে নেয়া হবে এবং কোন পথে আসামীকে আদালতে নেয়া হবে তাও সোর্সের মাধ্যমে প্রিজন ভ্যান চালকদের কাছ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। পূর্বের প্ল্যান অনুযায়ী নসু জেলখানার গেট থেকে শুরু করে সাভার বাজার পর্যন্ত পথের বিভিন্ন স্থানে লুক আউট ম্যান বসিয়ে দেয়। তারা প্রিজন ভ্যান এবং পুলিশ এস্কর্টের মুভমেন্টের তথ্য ফোনে জানিয়ে পরিস্থিতির আপডেট দিবে।


নসু ভিতরে ভিতরে খুবই রোমাঞ্চিত হয়ে আছে কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করে না। অনেক রকমের অজানা আশঙ্কা তার মনের ভিতরে উঁকি দিয়ে যায়। সে জানে এ অপারেশনে ব্যর্থ হওয়া যাবেনা। আর যদি সে কোন কারণে ব্যর্থ হয় তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ রকমের, যা হয়ত সে কল্পনাও করতে পারেনা। আর তা ভাবতে গেলে শরীরটা শিউড়ে ওঠে। তাই মাথা থেকে জোর করে সব দুশ্চিন্তা বা টেনশন ঝেড়ে ফেলে নিজের কাজে মন দেয়। এত দীর্ঘ প্রস্তুতির পর সে ব্যর্থ হতে পারেনা। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুন ধরায়। বুকের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের করে আকাশে ছুঁড়ে দেয়। টেনশনগুলো যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিশে যায়।


সে আর লীডার অনেকদিনের পরিশ্রমের পর যেভাবে অপারেশন প্ল্যান সেট করেছিল ঠিক  সেভাবেই দলের ছেলেদের নিয়ে জ্বালেশ্বর রেডিও কলোনি এলাকায় রোড এমবুশ পেতে শিকারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। নসুর হাতে কক্সবাজার থেকে কেনা সেই গীটারের ব্যাগ, আর একটা চটের তৈরি বাজারের ব্যাগ নিয়ে হোয়াইট মামুন তার পাশে বসে আছে। তার চটের ব্যাগ থেকে  লাউএর কচি ডগা উঁকি মারছে। যেন এইমাত্র বাজার থেকে শাকসবজি কিনে বাসায় ফেরার পথে দু’বন্ধুর দেখা হয়েছে। তারা যেন গাছের ছায়ায় বসে গভীর আড্ডায় ব্যস্ত।


নসুর ব্যাগে একে-৪৭এর বাট ফোল্ডিং করে রাখা, সাথে লোডেড ম্যাগাজিন। হোয়াইট মামুনের বাজারের ব্যাগে আরজেস ৭২ গ্রেনেডগুলো লুকিয়ে রাখা আছে। সময় হলে ছেলেদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। তাদের একেকজনের একেক রকম ছদ্মবেশ। কেউ বাদামওয়ালা সেজে বসে আছে, আবার কেউবা বাদামওয়ালার পাশে অলস ভাবে বসে বাদামের খোসা ছিলছে। একজন অদূরে রাস্তার পাশে একটা দেড়টন ওজনের কাভার্ড ভ্যানে হেলান দিয়ে কানের ময়লা পরিষ্কারে ব্যস্ত, যেন তার আজ কাজে যাওয়ার কোন তাড়া নেই! আরেকজন রেইন ট্রির ছায়ার একটা মোটর সাইকেলে বসে একটু পরপর আয়নায় তাকিয়ে চুল ঠিক করছে বা আঙ্গুলের নখ দিয়ে মুখের ব্রণ খুচিয়ে চলছে। দূরে তাদের আরেকটা গ্রুপ কোত্থেকে ক্যারাম বোর্ড জোগাড় করে আড্ডাবাজ যুবকদের মত চুটিয়ে ক্যারাম খেলছে। একটু পরপর সেখান থেকে হৈ-হল্লা ভেসে আসছে।


বিভিন্নরকম ছদ্মবেশে ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে তারা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়ে শিকারের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা অবশ্য তখনও জানেনা তাদের শিকার বা এই অপারেশনের সাবজেক্টটা আসলে কে। জানলে হয়ত তাদের অনেকেই এই অপারেশনে অংশগ্রহণ না করে পালিয়ে যেত। তবে ভিতরে ভিতরে তারা সবাই যে উত্তেজিত হয়ে আছে তা বেশ বোঝা যায়। বারুদ, রক্তের নেশা আর তাতানো রোদ্দুর তপ্ত করে রাখে তাদের। সময়ের সাথে সাথে তাদের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির মেডালা অঞ্চল থেকে অ্যাড্রিনালিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়েই চলে।


৩৪ 

নিজের সেল, কাসিমপুর কারাগার।

সময় আনুমানিক সকাল সাড়ে নয়টা।


ল্যাংড়া মনিরের সাথে নসুর হঠাৎ বেশী ঘনিষ্ঠতা শুরু থেকেই কালাবাবুকে বেশ সন্দিগ্ধ করে তোলে। তাই যেদিন নসু সেফ হাউজ ছেড়ে ঢাকায় এসে তার তৎপরতা শুরু করে কালাবাবু সেদিন থেকেই তার পিছনে আন্ডার কাভার স্পাই বা তাদের ভাষায় টিকটিকি লাগিয়ে দেয়। এর বাইরে ল্যাংড়া মনিরের ঘনিষ্ঠ লোকজনই কালাবাবুর লোকদের কাছে অর্থের বিনিময়ে তথ্য পাচার করে। এভাবে নসুর প্রতিটি মুভমেন্ট সে তার নজরে রাখে, এমনকি বান্দরবান থেকে অস্ত্রপাতি সংগ্রহ করা পর্যন্ত। সে অবশ্য নসুকে অস্ত্রসহ সেখানেই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে অলৌকিকভাবে তার পাতানো জাল ফস্কে বেড়িয়ে যায়। বান্দরবান থেকে ঢাকায় ফেরার পরপরই কালাবাবু অনেক টাকার বিনিময়ে হোয়াইট মামুনকে কিনে ফেলে। এছাড়াও অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে হোয়াইট মামুনের স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তানকে কালাবাবুর লোক অজ্ঞাতনামা কোন এক হাইড আউটে আটকে রেখেছে। এরপর থেকে তার বাকী কাজ খুব সহজ হয়ে যায়। তবে তারই রক্ষিতা যে তারই টাকা-পয়সা তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নসুর পিছনে ঢালছে এই তথ্য কিভাবে যেন লোক-চক্ষুর আড়ালে চলে গেছে।


হোয়াইট মামুন জানত নসু যতোই চেষ্টা করুক না কেন সে আসলে কোনদিনই কালাবাবুর সঙ্গে ক্ষমতা বা বুদ্ধিতে পেড়ে উঠবে না। অথচ নসুর উচ্চাশা পূরণ করতে যেয়ে শুধুশুধুই তাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে। তার চেয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো টাকার অফার পেয়ে সে গোপনে কালাবাবুর দলে ভিড়ে যাওয়াই উত্তম বলে বিবেচনা করে। এছাড়া তার স্ত্রি এবং সন্তানের প্রাণহানির শঙ্কা তো আছেই। কালাবাবুর নির্দেশে সে নসুর সাথে বরাবরের মত মিশে থাকে আর সুযোগ পেলেই নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন করে তথ্য জোগাতে থাকে। এভাবে পাঙ্খা নসুর প্ল্যানের কমবেশি সবকিছুই কালাবাবুর নখদর্পণে থাকে। সে জেলে বসে সন্তর্পণে নসুকে বড়শিতে গাঁথার জন্য ছক কষতে থাকে। সে জানে দিন শেষে সব কিছুই তার প্ল্যান অনুযায়ীই হবে কিন্তু পুলিশ তার টিকিটিও ছুঁতে পারবেনা। সে জাল বুনে শিকারি মাকড়শার মত অপেক্ষা করতে থাকে আর পাঙ্খা নসুকে তার প্ল্যান অনুযায়ী এগিয়ে যেতে দেয়।


প্রিজন ভ্যানে ওঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কালাবাবু অসুস্থ হওয়ার ভান করে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন মতে তার মাইল্ড কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট হয়েছিল। তাই কোর্টে হাজিরা দেয়ার জন্য সেদিন তাকে আর নেয়া সম্ভব হয়নি। ডাক্তার অবশ্য এর বিনিময়ে বুঝে পায় পাঁচশত টাকার একটা বান্ডিল। কালাবাবু এসব বিষয়ে খুব উদার। তার দৃঢ় বিশ্বাস এই পৃথিবীতে সবারই একটা বিক্রয় মূল্য আছে আর এই এমাউন্টটা নির্ভর করে পরিবেশ পরিস্থিতি এবং কারো চাহিদার অনুপাতে। কেউ ক্যাশে আবার কেউ কাইন্ডে এই এমাউন্টটা বুঝে নেয়। বিক্রয় মূল্যের এই তারতম্যের জন্যই হয়ত ডাক্তার সাহেব গোপনে আরেকটা অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন।


জেল কর্তৃপক্ষ একেবারে শেষ মুহুর্তে কালাবাবু’কে ড্রপ করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সেটা কোনভাবেই নসুর পক্ষে জানা সম্ভব হয়না। জেলের গেটের কাছে অপেক্ষারত নসুর লুকআউট ম্যান সেসময়ে প্রকৃতির ডাকে একটু দূরে সরে যাওয়ায় তার পক্ষেও বিষয়টা আঁচ করা সম্ভব হয়না। সে জেল পুলিশের কর্ম ব্যস্ততা আর যাত্রার প্রস্তুতির তারতম্য থেকে ধরেই নেয় যে কালাবাবু প্রিজন  ভ্যানের ভিতরেই আছেন এবং সে হিসাবেই নসুকে তথ্য আপডেট দেয়া হয়। কালাবাবুকে ছাড়াই প্রিজনভ্যান সামনে-পিছনে এস্কর্ট পিকআপসহ আদালত ভবনের উদ্দেশে যাত্রা করে। হুটারের  তীক্ষ্ণ শব্দ আর সব শব্দকে ছাপিয়ে কালো রাজপথ ধরে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।


৩৫ 

অপারেশন বিগফিশ।

অপারেশন এলাকা-রেডিও কলোনি, জ্বালেশ্বর, সাভার। 

সময় আনুমানিক বেলা বারোটা।


প্রিজন ভ্যান নবীনগর পার হয়ে বিশ মাইলের কাছাকাছি পৌঁছামাত্র ওয়াচম্যান মোবাইলে কনভয়ের অবস্থান জানায়। হোয়াইট মামুন দ্রুত সবার মাঝে গ্রেনেডগুলো ভাগ করে দেয়। নসুর মধ্যে একই সঙ্গে একধরনের অস্থিরতা আর হৃদকম্পন শুরু হয়। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। টানটান উত্তেজনার সাথে অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে  থাকে। একসময় দূর থেকে ঘন নীল রঙের প্রিজন ভ্যানের দেখা মেলে। সেটা যেন সরীসৃপের মত ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। বিপিএটিসি-রেডিও সেন্টার পার হয়ে রেডিও কলোনি মডেল স্কুলের কাছাকাছি এসে পৌঁছালে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাভার্ড ভ্যান রাস্তার পাশ থেকে ছুটে এসে আড়াআড়িভাবে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ানো মাত্র মোটর সাইকেল আরোহী মোটর সাইকেল চালিয়ে এসে সেটাতে সরাসরি জোরে ধাক্কা মারে। সঙ্গে সঙ্গেই কাভার্ড ভ্যানের ড্রাইভার আর একজন শ্রমিক গাড়ী থেকে নেমে মোটর সাইকেল আরোহীর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়।


রাস্তা ব্লক হয়ে যাওয়াতে প্রিজন ভ্যানের সামনে থাকা এস্কর্ট পিকআপের ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে ঘন ঘন হর্ন বাজাতে থাকে কিন্তু তাতে কাভার্ড ভ্যানের ড্রাইভার বা হেল্পারের যেন বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা তাদের ঝগড়া চালিয়ে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে মোটর সাইকেল আরোহীর সাথে  মারামারিতে লিপ্ত হয়। এ পর্যায়ে এস্কর্ট পিকআপ থেকে কর্তব্যরত সাব-ইন্সপেক্টর নেমে এসে মারামারি থামিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার করতে উদ্যত হন। পুলিশের প্রিজন বাহী কনভয় তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছে আর প্রিজন ভ্যানের উঁচু শিকবদ্ধ জানালা থেকে ভিতরের উৎসুক কয়েদীরা বাইরে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেস্টা করছে। ঠিক এ মুহূর্তটুকুর অপেক্ষাতেই নসু অনেকগুলো নির্ঘুম রাত পরিকল্পনার জাল বুনে কাটিয়েছে।


কাভার্ড ভ্যানের শ্রমিক হঠাৎ ঝগড়া থামিয়ে ৪৫ ডিগ্রী কোনে ঘুরে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে দাড়িয়ে থাকা সাব-ইন্সপেক্টরের বুক বরাবর ফায়ার করে। মুহূর্তেই ঘটে যায় দেশের ক্রাইম জগতের  সবচেয়ে আলোচিত ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা। যা পরবর্তীতে অনেকদিন পর্যন্ত দেশ সেরা দৈনিক পত্রিকাগুলোর হেডলাইন দখল করে রেখেছিল। এ ধরনের দুধর্ষ সন্ত্রাসী ঘটনা দেশের অপরাধ জগতে এর আগে কখনও ঘটেনি। এসব ঘটনা এতদিন শুধু হলিউডের ক্রাইম থ্রিলার মুভিতেই দেখা যেত। পিস্তলের প্রজেক্টাইল পাক্‌ খেতে খেতে পুলিশ অফিসারের বুক ভেদ করে পীঠে বড় স্বাক্ষর রেখে দূরে কোথাও হারিয়ে যায়। মোচড় দিয়ে সে রাস্তায় পড়ে এবং কিছু বলার আগেই তার প্রাণ বায়ু বেড়িয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় এস্কর্ট পিকআপের ট্রেইল বোটে  আসীন পুলিশ সদস্যরা হতভম্ব হয়ে যায়। তারা তাদের প্রাথমিক হতবিহ্বল অবস্থা কাটিয়ে সঙ্গে থাকা চাইনিজ রাইফেলে ম্যাগাজিন লোড করে ফায়ার করতে উদ্যত হলে নসুর হাতের একে-৪৭ থেকে একপশলা বুলেট এসে ভেদ করে তাদের শরীর, ভ্যান এবং পিক আপের বডিতে। বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিজেদের আসনেই হেলে পড়ে থাকে তাদের কেউ কেউ। ড্রাইভারসহ দু’একজন অবশ্য পালাতে সক্ষম হয়।


পিছনের এস্কর্ট পিকআপ সজোরে একটা বাঁক নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্র পিকআপে বসে থাকা পুলিশ সদস্যরা সন্ত্রাসীদের দিকে লক্ষ্য করে ফায়ার করে, কিন্তু আচমকাই গ্রেনেডের  হাজারো স্প্লিন্টার এসে ভেদ করে তাদের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। কেউ কেউ মুখ থুবড়ে সেখানেই পড়ে যায়। রক্তে ভেসে যায় পুরো রাজপথ। সন্ত্রাসীদের কয়েকজন আহত এবং দু’একজন রাস্তার ওপরে বেকায়দায় মরে পড়ে থাকে। পুরো ঘটনাস্থল জুড়ে রক্তের হাজারো ধারা রঞ্জিত করে দেয় কালো রাজপথ। বুলেটের আঘাত আর গ্রেনেডের স্প্লিন্টার ক্ষত বিক্ষত করে রাখে পীচের কালো  আস্তর, আশেপাশের গাছের ডাল-পালা আর প্রিজন কনভয়ের গাড়ীগুলো। চারদিকের বাতাসে বারুদের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আর মানুষের আর্ত চীৎকার। বাঁচার আশায় তাদের তীক্ষ্ণ করুণ আহাজারি আর্দ্র করে রাখে পুরো পরিবেশ। নসু কয়েকজনকে সাথে নিয়ে দৌড়ে প্রিজন ভ্যানের পিছনের ভারী তালা ভেঙে কালাবাবুকে খোঁজে।


কিন্তু নাহ্‌, কালাবাবু সেখানে নাই। প্রিজন ভ্যানের ভিতরে এখানে সেখানে পড়ে আছে নাম না জানা হতভাগ্য কয়েকজন কয়েদীর লাশ। কেউ কেউ বাঁচার আশায় আকুতি মিনতি করছে। হয়তো ভেবেছে তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হবে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে সদ্য গোঁফ ওঠা এক কিশোর। নসুর লোকজন উপুড় হয়ে পড়ে থাকা লাশের সারি উল্টিয়ে দেখে কিন্তু সেখানে  কালাবাবুর নাম-গন্ধ পর্যন্ত নেই। সে যেন হাওয়ায় মিইয়ে গেছে। কিন্তু তা কি করে সম্ভব! প্রিজন ভ্যানের তালাটা তো সে নিজেই ভেঙ্গেছে আর ভ্যানের জানালা গ’লে পালিয়ে যাওয়া কোন ভাবেই সম্ভব না। তবে কি কালাবাবু প্রিজন ভ্যানের মধ্যে হাজির ছিল না! কিন্তু তা’ কি করে সম্ভব!


নসু কিংকর্তব্যবিমুঢ়!


ল্যাংড়া মনিরের কাছ থেকে ফোন আসে,


- ওই হালা! তুই কই রে? 

- এইতো লীডার, এই হানে। 

- কেইস হয়া গেছে রে নসু। তুই বেবাগটিরে নিয়া ভাগ। পালা।  

- ক্যালা! কি হইছে? 

- আরে হালার পুত! কালাবাবু তো ভ্যানে আছিলো না। কেউ তোর লগে গাদ্দারি করছে। 

- কিন্তু এটা ক্যামতে।  

- জানি না। তুই তাড়াতাড়ি কাইট্যা পড়। কেউরে তর লগে রাখিস। কালাবাবু'র পোলাপাইন 

  তোরে মারণের লাইগা রওনা দিছে কইলাম। তুই ভাগ, দোহাই লাগে।


লীডার এও জানায় যে, অপারেশন ক্যান্সেল। সে আর এসবের মধ্যে নেই। নসু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব কিছু গুটিয়ে যেন পালিয়ে যায়। কালাবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। সে কালাবাবুকে বুঝিয়ে একটা আপোষরফা করে নিবে, আশাকরি কোন সমস্যা হবেনা।


কিন্তু এতজন পুলিশ সদস্যের লাশ! এর কি হবে ? রাষ্ট্র কি তাকে ক্ষমা করবে! মনেহয় না। একটা সরীসৃপ যেন শীতল পায়ে তার শিরদাড়া বেয়ে হেঁটে যায়। ভয়ের একরাশ কালো মেঘ এসে তাকে আচ্ছন্ন করে। সে ঘামতে থাকে আর দলের অন্যরা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা সবাই বুঝতে পারে কঠিন বিপদ আসন্ন, সেখান থেকে তাদের কারো রেহাই নাই। এই পরিণতির জন্য তারা একে অপরকে দুষতে থাকে। মনের মধ্যে কেউ যেন বলে ওঠে, পালা নসু ...... পালা ... পালিয়ে যা তুই!


৩৬  

নাজমা বোর্ডিং হাউজ, দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর। 

সময়টা সন্ধ্যার পরপর।


রাস্তার দু’দিকেই যাত্রীবাহী গাড়ীগুলো ক্রমান্বয়ে ভিড় করতে থাকে। আশেপাশের লোকজন গোলাগুলির শব্দ থেমে যাওয়ায় ঘটনাস্থলে একেএকে জড়ো হতে থাকে। দূর থেকে পুলিশের টহল গাড়ীর তীক্ষ্ণ হুটারের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। হয়ত গোলাগুলির শব্দ শুনে থানায় কেউ খবর দিয়েছে। নাহ্‌, আর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা নয়। যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন পালিয়ে বাঁচতে  হবে। নসু হঠাৎই বেঁচে থাকার তীব্র তাগিদ অনুভব করে। গ্রুপের সবাইকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশের যে কোন প্রান্তে পালিয়ে যেতে বলে। সে নিজেও হোয়াইট মামুনকে সাথে নিয়ে মোটর সাইকেলে চেপে বসে। কিন্তু সে জানেনা তারা কোথায় পালিয়ে যাবে! ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেফ হাউজ দলের অনেকেই চেনে। তাদের কারো মাধ্যমে পুলিশের পক্ষে সেটা হয়ত সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এ মুহূর্তে যেটা প্রয়োজন সেটা হল যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা থেকে সরে পড়া। হোয়াইট মামুনের পরামর্শ অনুযায়ী তারা মোটর সাইকেলে কুলিয়ারচরের দিকে রওয়ানা দেয়। সেখানে হোয়াইট মামুনের পরিচিত একটা জায়গা আছে, প্রয়োজন হলে সেখানে বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে থাকা যাবে।


বিকল্প কোন প্ল্যান হাতে না থাকায় নসু দ্বিতীয়বার আর কিছু না ভেবেই হোয়াইট মামুনের প্রস্তাবে সারা দেয়। একটানা মোটর সাইকেলে চালিয়ে তারা প্রথমে আশুলিয়া হাইওয়েতে ওঠে, তারপর টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক ধরে ঘোড়াশাল পৌঁছে। রিফুয়েলিং করার জন্য সেখানে একটা ফিলিং স্টেশনের পাশে থামে, সেখানে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি করে চা নাস্তা খেয়ে নেয়। কিন্তু মানসিক অবসাদ আর টেনশনের কারণে নসুর গলা দিয়ে পেটে কিছু নামতে চায়না। মোটর সাইকেল রিফুয়েলিং শেষে প্রস্রাব করার অজুহাতে হোয়াইট মামুন টয়লেটে ঢুকে কালাবাবু'র লোককে ফোনে তাদের অবস্থান এবং তারা কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করেছে তা জানিয়ে দেয়।


ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ধরে বিকেল নাগাদ তারা কুলিয়ারচর পৌঁছে। পাঙ্খা নসু আগের প্ল্যান পাল্টে অর্থাৎ হোয়াইট মামুনের খোঁজ দেয়া জায়গায় না যেয়ে আপাতত একটা সস্তা বোর্ডিং হাউজে ছদ্ম পরিচয়ে কয়েকদিন থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সেখান থেকে ঢাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তি প্ল্যান ঠিক করবে বলে হোয়াইট মামুনকে জানায়। এক সময় হয়ত পরিস্থিতি  কিছুটা স্বাভাবিক হবে, তখন সীমান্ত পার হয়ে ওপারে চলে যাবে। হোয়াইট মামুনও তার সাথে যেতে চায়, তবে সে হ্যাঁ বা না কিছু বলে না। কুলিয়ারচর রেলস্টেশনের কাছেই দারিয়াকান্দি রোডে নাজমা বোর্ডিং হাউজের বোর্ডারের খাতায় তারা নাম ওঠায়। ভুল নাম ঠিকানায় তারা পেশা হিসাবে মাছের ব্যবসা উল্লেখ করে। সেখানে তাদের মত আরও অনেক মাছ ব্যবসায়ী রাত যাপন করে থাকে। সন্ধ্যায় সিগারেট কেনার অজুহাতে রুম থেকে বের হয়ে হোয়াইট মামুন ফোনে কালাবাবু’র লোক’কে বোর্ডিং হাউজের নাম ও অবস্থান জানিয়ে দেয়। এরপর সিগারেটের সাথে কয়েকটা রুটি আর কলা কিনে সে রুমে ফেরে। এরপর সেগুলো পেটে চালান করে দিয়ে গোসল সেরে মাথায় একটা বালিশ চেপে সোফায় শুয়ে পড়ে। রাতে বাইরে কোথাও খেতে যাবেনা বলে নসুকে জানায়। এতোটা পথ একটানা মোটর সাইকেল চালিয়ে সে এখন ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছে বলে নসুকে জানায়। কিন্তু তার আসল প্ল্যান হলো নসু রাতের খাবার খেতে বাইরে যাওয়া মাত্রই সে রুম থেকে সট্‌কে পড়বে।


নসু একাই কুলিয়ারচর স্টেশনের পথের ওপারে একটা রেস্তোরাতে রাতের খাবার খেতে যায়। খাওয়া শেষে ল্যাংড়া মনিরকে মোবাইলে ফোন দেয় কিন্তু কেউ সে ফোন রিসিভ করেনা। পরপর কয়েকবার রিং করলে এক সময় মোবাইল ফোনটা বন্ধ পাওয়া যায়। মোবাইল নাম্বারটা এরপর আর কখনও খোলেনি। ওটা আসলে স্তব্ধ হয়ে যায় চিরকালের মতো আর তার মালিক তখন কালশি রোডের মাথায় বিদ্যুৎ পোলের সঙ্গে ঝুলছে। এমনিতে কেউ জানেনা সেটা কাদের কাজ তবে নসুর মত যারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা তারা ঠিকই বুঝতে পারে, কিন্তু কেউই ভয়ে মুখ খোলে না।


ফোনে লীডারের কোন সাড়া না পেয়ে খানিকটা চিন্তিত মুখে বোর্ডিং হাউজের দিকে রওনা করে। নসু কি ভেবে পিচ্চি জালালকে ফোন করে, সে মূলত পুলিশের ইনফরমার। কিন্তু রূপনগর বস্তিতে একসাথে বেড়ে ওঠা এবং অনেকবার ভাগাভাগি করে ডান্ডির নেশা করার কারণে নসু ও জালালের মধ্যে পুরনো সখ্যতা আজও রয়ে গেছে। এজন্য কখনো জরুরী অথবা গোপন তথ্যের দরকার পড়লে নসু তাকেই ফোন করে, সেও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যতোটা সম্ভব তথ্য দিয়ে নসুকে সাহায্য করে। আজ এরকম টানটান উত্তেজনার দিনে নসু জালালের স্মরনাপন্ন হয়।


কয়েকবার রিং টোন বাজার পর পিচ্চি জালাল ফোন ধরে,


- ক্যাডা রে! 

- নসু কইতাছি, ঐ দিকক্যার খবর কিরে!  

- তুই কই? এইটা কার নাম্বার? তাড়াতাড়ি ভাগ। দ্যাশের বাইরে যা। আমারেও ফোন দিস না। 

- ক্যান কি হইছে?

- তুই তো আগুন লাগায়া দিছোস।

- মানে! 

- ক্যান তুই কুনো আওয়াজ পাশ নাই! কিছু শুনোস নাই! লীডাররে তো কালাবাবু’র লোক মাইরা ফালাইছে। আর ঐদিকে কালাবাবু নিজেও নাকি জেলের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক কইরা মরছে। পুরা আন্ডার ওয়ার্ল্ডে এখন তুলকালাম চলতাছে। 

- সোনিয়া! সোনিয়ার খবর কি?

- সোনিয়া! সে আবার ক্যাডা?


নসু বুঝতে পারে, পিচ্চি জালাল সোনিয়ার ব্যাপারে কিছু জানেনা। তাদের মধ্যে আরও বেশ কিছুক্ষণ উত্তেজিত স্বরে কথাবার্তা চলে।


৩৭   

অপারেশন বিগফিশ। 

পরিণতি।


মামুনের রুমের দরজাটা আধেক ভেজানো দেখে সেদিকে এগিয়ে যায় কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার আগেই যা ঘটে তার জন্য সে আসলেই প্রস্তুত ছিল না। করোটির পিছনে পিস্তলের মাজলের ধাতব স্পর্শ অনুভব করে সে চিরাচরিত অভ্যাসবশেই তৎক্ষণাৎ জিন্সে গুঁজে রাখা পিস্তল টান মেরে ডান হাতে নিতে চায় কিন্তু পারে না। সময় এখন স্থির। নসুকে ঘরের ভিতরে ঠেলে দেয়া হলে সে দেখতে পায় হোয়াইট মামুন সোফায় হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, তার মাথার বালিশ রক্তে আধ ভেজা। বুকের ক্ষত স্থান থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তারমানে ঘটনাটা কিছুক্ষণ আগেই ঘটেছে, দৃষ্টি সিলিঙের দিকে স্থির।


নসু ভালো করেই জানত এই অপারেশনে ব্যর্থ হওয়া মানে জীবন দিয়ে তার প্রতিদান দেয়া। মুহূর্তেই স্থির হয়ে যায় পাঙ্খা নসু, তার হাত দু’টো হঠাৎ অসহায় ভাবে ঝুলে পড়ে কোমরের দু’পাশে। কিছু করার থাকেনা। এরকম সময়ে অনেক অপরাধীই তার নিয়তি মেনে নিয়ে বরং সহযোগিতা করে। তবে যারা একটু বেশি সাহসী তারা হয়ত রিএক্ট করার চেষ্টা করে, নসু এই গোত্রের।


পরদিন সকালে ভৈরব থেকে পুলিশ এসে ডেড বডি দু’টো নিয়ে যায়। মর্গের লাশ কাটা টেবিলে পাঙ্খা নসুর পাঙ্খাহীন লাশ চিৎ হয়ে পড়ে থাকে পোস্ট মরটেমের অপেক্ষায়।


৩৮

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।  

সময়- রাত দুটা বেজে দশ মিনিট।


বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটের নামগুলো খুব সুন্দর। রাজহংস, মেঘবাড়ি, ময়ুরকন্ঠি, আকাশবীণা কি দারুন সব নাম! এই মুহুর্তে শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট এর টারমাকে দাঁড়িয়ে থাকা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিম লাইনাটার এর নাম ‘জলছুট।’ ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে ভ্যান্কুভার যাবে। ঘন কুয়াশার মাঝে বিমানের সাদা ধবধবে অবয়বটা দেখতে অশরিরী লাগছে। আরিফ সাহেব নির্ধারিত কাউন্টারে চেক ইন করে বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ এবং ইমিগ্রেশন ফর্মালিটি পুরো করে বিজনেস ক্লাস লাউন্জের সোফায় শরীরটা এলিয়ে দেন। আশেপাশে অন্যান্য যাত্রীরা কেউ বসে বা কেউ দাঁড়িয়ে আছেন, তবে বিজনেস ক্লাসের জন্য নির্ধারিত বলে এই লাউঞ্জে যাত্রীসংখ্যা এমনিতেই কম। আরিফ সাহেবকে বারবার ঘড়ির ডায়ালের দিকে তাকাতে দেখা যাচ্ছে, তিনি সম্ভবত খানিকটা টেনশনে আছেন। কিছুক্ষণ পর একজন বৃদ্ধ মহিলা হুইল চেয়ারে বসে বিজনেস ক্লাস লাউন্জে ঢুকলেন, বাংলাদেশ বিমানের একজন এটেনডেন্ট তাকে সাহায্য করছেন। এয়ার লাইন্সগুলোতে যাতায়াতে এই একটা সুবিধা, টিকিট সংগ্রহের সময় বয়স্ক, অসুস্থতা বা শারীরিক অক্ষমতার কথা উল্লেখ করা থাকলে পৃথিবীর সব এয়ারপোর্টেই এই সুবিধাটা পাওয়া যায়।


শরীর আবায়া বোরকা আবৃত থাকায় সোনিয়াকে ঠিক চেনা যাচ্ছেনা, তবে আরিফ সাহেবের তাকে চিনতে অসুবিধা হল না। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা দু'জন একই ফ্লাইটে অপরিচিতের মতন আলাদাভাবে ভ্রমণ করছেন। দুবাই যেয়ে তারা মিলিত হবেন, পরবর্তী যাত্রাপথ সেভাবেই প্ল্যান করা আছে। ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলিয়ে তিনি ফ্রেশ রুমে যেয়ে ফ্রেশ আপ করে কফি কিয়স্ক থেকে দু'কাপ ব্ল্যাক কফি সংগ্রহ করলেন। এরপর কফির ধূমায়িত কাপের একটি নিজে নিয়ে  অন্যটি সৌজন্যতা প্রকাশ করে মহিলার দিকে এগিয়ে ধরলেন। এমন সময় বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জের পিএ সিস্টেমে ফ্লাইটে বোর্ড ইন করার জন্য ঘোষণা করা হল। কফির কাপে সোনিয়ার প্রথম চুমুকের দৃশ্যটা দেখে আরিফ সাহেব হ্যান্ড লাগেজসহ এগিয়ে গেলেন।


শারিরীকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ যাত্রীদের সবার শেষে বোর্ড ইন করা হয় বলে সোনিয়ার দেরী হবে। এটেনডেন্ট একটু পরে হুইল চেয়ারে করে তাকে বোর্ড ইন করবে।


তবে সোনিয়াকে আর কখনও বোর্ড ইন করতে হয়নি।


এয়ারপোর্টের এ্যাম্বুলেন্সটা হুটার বাজিয়ে রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিম লাইনার ‘জলছুট’ তখন দেশের আকাশ সীমা  পার হয়ে ভারতের ছোট নাগপুর মালভূমির ওপর দিয়ে দুবাইয়ের এয়ার রুট বরাবর ছুটে যাচ্ছে।


In restless dreams I walked alone

Narrow streets of cobblestone

‘Neath the halo of a streetlamp

I turned my collar to the cold and damp

When my eyes were stabbed by the flash of a neon light

That split the night

And touched the sound of silence

And in the naked light I saw

Ten thousand people, maybe more

People talking without speaking

People hearing without listening

People writing songs that voices never share

No one dare

Disturb the sound of silence



(এটি একটি ক্রাইম থ্রিলার। এখানে উল্লেখকরা প্রতিটি চরিত্র এবং বর্নিত ঘটনা বা স্থান সবই কাল্পনিক। চার দেয়ালের মাঝে বসে লেখা এই গল্পের সাথে বাস্তবের কোন কিছুর মিল খোঁজা হবে নিতান্তই অপচেষ্টা মাত্র)



পোস্ট ভিউঃ 26

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমার শব্দযাত্রায় সঙ্গী হতে