২
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সফুরা বেগম অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে জাউভাত রান্নার জন্য চুলায় আগুন দেন। ভেজা-স্যাঁতস্যাঁতে খড়িতে আগুণ একটু ধরেই আবারো নিভে যায়। তিনি বিরক্ত হয়ে আবারো চেষ্টা করতে থাকেন। মেয়েটা আরেকটু পরেই ঘুম থেকে উঠে গরম জাউভাত খেয়ে স্কুলে যাবে। সফুরা বেগম ভাবেন, মাত্র তের বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল তার। তাদের দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে অনেক ফকীর-কবিরাজের কাছে ধর্না দিয়ে অবশেষে শেষ বয়সে কোল আলো করে সুন্দর ফুটফুটে সন্তান আসে। শখ করে মেয়ের নাম রেখেছেন মুক্তা। মাঝে মাঝে তিনি অবাক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কালো মতন হলেও মেয়েটা দেখতে কি সুন্দর হয়েছে। হয়ত পুর্বপুরুষদের কারো রক্তের ধারা পেয়েছে। আসলে গরীবের সংসারে তাকে মানায় না, বুক থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসে। মেয়েটা খুব আহ্লাদি গোছের হয়েছে। পান থেকে চুন খসলেই ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকে। সংসারে খাওয়া-পড়ার অভাব মোটেই বুঝতে চায়না। তাই মেয়ের পাতে তুলে দেয়ার মত ভাল কিছু না থাকলে জামিল সাহেবের বাসা থেকে ভাত-মাছ অথবা রান্নার জন্য চাল নিয়ে আসতে হয়। ওনারা অবশ্য এতে কিছু মনে করেন না। তাছাড়া মেয়েটা তার কাছে যতটা না সময় থাকে তার চেয়ে বেশী সময় সে ওদের বাড়িতেই কাটায়। মেয়েটাকে আসলে জামিল সাহেবের বাড়ির আলো ঝলমলে পরিবেশেই বেশী মানায়। ওবাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার মেয়ের খুব সখ্য। আর এটাতো ঠিক ইনিয়ে বিনিয়ে সম্পর্ক হলেও ওবাড়ির ছেলেমেয়েরা তাকে বেশ সম্মান করে, মাসী বলে ডাকে। ওপার বাংলা থেকে মাইগ্রেট করা মুসলমান পরিবারগুলো এপারে এসে বসতি গড়লেও ওদিকের অনেক কৃষ্টি তারা এখনও ধরে রেখেছে। তারা ফুপা-ফুপুদের তাই আজো পিসি-মাসী বলেই সম্বোধন করে। জামিল সাহেবের স্ত্রী আনোয়ারা বিবি মুক্তাকে একদম নিজের মেয়ের মতই আদর সোহাগ করেন। দুই ঈদে তার জন্য জামাকাপড় কিনে দেয়া কিংবা বাড়িতে পোলাও-মাংস রান্না হলে প্লেট ভর্তি করে পাঠিয়ে দেয়া, এসব তিনি সানন্দেই করে থাকেন। হয়ত সেজন্যই মাঝে মাঝে সফুরা বেগম স্বপ্ন দেখেন, জামিল সাহেবের মেজো ছেলে রাহাতের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। হায়!অমন রাজপুত্রের মত দেখতে ডাক্তার জামাই কি তার কপালে লেখা আছে!তার বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। মেয়েকে রাহাতের সঙ্গে আড়ালে আবডালে অনেকবারই তিনি কথা বলতে দেখেছেন, আনোয়ারা বিবির চোখেও তা পড়েছে। তিনি সেজন্যই হয়ত প্রায়ই সফুরা বেগমকে মেয়ের দিকে খেয়াল রাখতে উপদেশ দেন। সফুরা বেগম অবশ্য তাতে গা করেননা। তার ইচ্ছে, তার মনের গোপন আশাটা যদি এভাবে পূরণ হয় তো হোক না! ছেলেমেয়েদের এসব ব্যাপার নিয়ে দুই গৃহবধূর মধ্যে যে একটা নীরব স্নায়ুযুদ্ধ চলমান তা কান পাতলেই বোঝা যায়।
মেয়েটাকে স্কুলে পাঠিয়ে তিনি আর মুক্তার বাবা রাতের বাসীভাত নুন-মরিচ ডলে খেয়ে নিবেন বলে ঠিক করেন। লোকটাকে অবশ্য তিনি যা খেতে দেন তাই চোখ বুজে খেয়ে নেয়। একদম টু শব্দটি করেনা। প্রায় আয় রোজগারহীন সংসারে আহারের পাতে মাছ-মাংস থাকা মানে চরম বিলাসিতা। তবে ভূমি অফিসে তহশিলদারী চাকুরীর সুবাদে হাতে দু’চার পয়সা এলে লতিফ সাহেব আর দেরী করেননা। বাজারের ব্যাগটা খুঁজে নিয়ে তাপসের দোকান থেকে কৈ-মাগুর কিংবা হোলা কসাইয়ের দোকান থেকে দু’এক সের গরুর মাংস, যাই পারেন কিনে আনেন। সেসব দিনগুলো তাদের জীবনে যেন একটু অন্য রকম হয়ে আসে। সেদিনগুলোতে সফুরা বেগম নিজেও যেন একটু আহ্লাদি হয়ে যান। তখন স্বামী-স্ত্রীতে নানান রকমের হালকা কথাবার্তার ফুলঝুরি ছোটে,
- হ্যাঁগো! অভাবের সংসারে এতগুলো টাকা এভাবে খরচ করার কি দরকার ছিল?
- সবসময় তো আর পারিনা? বছরে দু’একটা দিন একটু আধটু না হয় হলই। মেয়েটার মুখে দুটো ভালোমন্দ তো তুলে দিতে হয়! মানুষের খেয়ে পড়ে আর কত কাল কাটাবে?
- মেয়ের দিকে কখনও তাকিয়েছো? কি রকম তরতর করে বড় হচ্ছে। বিয়ে দিতে হবেনা!
- সে যখন বিয়ে দেবার সময় হবে তখন ভেবে দেখা যাবে।
- আমার জন্য তো কিছু চাইনা। দুটো নুন-ভাতেই আমার বেশ চলে যায়। ভাবিতো শুধু মেয়েটার কথা!
সফুরা বেগম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন। লতিফ সাহেব স্ত্রীর কথায় মিটিমিটি হাসেন আর বারান্দায় বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে মোনাজ কোম্পানির বিড়ি ফুঁকতে থাকেন। তিনি ঘরের বারান্দায় বসে মেয়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। বেলা একটু ঢলে পড়লেই মেয়েটা বেণী দোলাতে দোলাতে ঘরে ফেরে। বাবা-মেয়ে তখন উঠানে চাটাই বিছিয়ে বসে আর সফুরা বেগম হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে তাদের পাতে মাংস কিংবা আলুর টুকরাটা উঠিয়ে দেন। স্বামী-সন্তানকে তৃপ্তি ভরে খেতে দেখলে তার নিজেরও বেশ সুখী লাগে। তবে সবচেয়ে বেশী ভাল লাগে বাটিতে দুটো মাংসের টুকরা নিয়ে আনোয়ারা বিবির হাতে দিতে, জামিল সাহেবের জন্য। তিনি হয়ত দুপুরে খাবারের সময়ে মাংসের হাড় চিবাতে চিবাতে জানতে পারবেন লতিফ সাহেবের বাসা থেকে সেসব গিয়েছে। এতে তার স্বামীর সম্মান হবে। তরকারীর বাটিটা হাতে নেয়ার সময়ে আনোয়ারা বিবির ভুরূ খানিকটা কুঞ্চিত হলেও তিনি হাসি মুখেই তা গ্রহণ করেন এবং খাবার সময় হলে জামিল সাহেবের পাতে তুলেও দেন। তবে এই হাভাতের সংসারে সফুরা বেগমের জন্য সেরকম সুখের দিন খুব কমই আসে।
চুলায় বাঁশের গেড়ো ফাটার শব্দে সফুরা বেগমের চিন্তায় ছেদ পড়ে। আম কাঠের খড়িগুলো সম্ভবত ভাল করে শুকায়নি তাই সহজে আগুণ ধরতে চায়না। সফুরা বেগম কয়েকটা পাটকাঠি চুলায় ঢুকিয়ে বাঁশের চোঙ্গায় ফুঁ দেন। কিন্তু তাতে আগুণ না ধরে চারদিকটা বরং ধোঁয়ায় ভরে ওঠে। তিনি বিরক্ত হয়ে রাগে গজগজ করতে থাকেন। তার এসব দুর্দশার জন্য তিনি বরাবরি লতিফ সাহেবকে দায়ী করেন। সফুরা বেগম আসলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসামের আগমনী গ্রামেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি শুনেছিলেন দেশ ভাগের সময়ে আসামে যে দাঙ্গা হয়েছিল তা বিহার বা কলকাতার মত অতটা রক্তক্ষয়ী ছিল না। বিয়ের পর নিজের হাতে সাজানো সংসারটা চোখের সামনেই দেশভাগের আগুণে পুড়ে কেমন ছাই হয়ে গেল। তার স্বামীটা একটু বাউন্ডুলে গোছের হলেও বিয়ের পর সে বেশ ঘরমুখো হয়েছিল। সাত পুরুষের ভিটেমাটি, চোখ জুড়ানো ফসলের ক্ষেত, গোয়াল ভরা গরু এসব ছেড়ে এপার বাংলায় আসতে তার প্রাণ প্রায় ছিড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তার প্রচণ্ড রকমের ভীতু স্বামী কোনভাবেই মাটি কামড়ে ওপারে থাকতে রাজী হল না। লতিফ সাহেবের ধারণা ছিল শীঘ্রই আবারও হিন্দু-মুসলমানের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হবে এবং এবারে সেটা বড় রকমেরই হবে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে সরে পরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে তিনি ভেবেছিলেন। তাছাড়া তিনি যখন গোপনে খবর নিয়ে জানলেন, জামিল সাহেবও তলে তলে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন তিনিও তার সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে মাইগ্রেট করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবহণ ব্যবসার সুবাদে জামিল সাহেবের কাছে নগদ টাকা-পয়সা ছিল। তাই রাতারাতি স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি-বাট্টার ব্যবস্থা করতে না পারলেও এপার বাংলায় এসে নতুন করে সব কিছু শুরু করতে তার তেমন বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু লতিফ সাহেবের অবস্থা ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। তিনি তার ভিটেমাটি-জায়গাজমি বিক্রির কোন ব্যবস্থা করতে না পারায় সোনাদানাসহ হাতে নগদ সামান্য যা ছিল তা নিয়েই তাকে এপারে পাড়ি জমাতে হয়। রায়গঞ্জে এসে তিনি জামিল সাহেবের বাড়ির পাশেই সরকারি খাস জমিতে ঘর তোলেন। দেশ ভাগের ডামাডোলের মধ্যে এলাকাবাসীরা এতে আপত্তি না তুলে বরং তার দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়। গ্রামের সবাই সাধ্যমত সাহায্য-সহযোগিতা করায় তিনি বেশ ভাল ভাবে দাড়িয়ে যান। কিন্তু তার কপাল আসলে পুড়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে। পাকিস্থানি বর্বর সেনারা নাগেশ্বরী পর্যন্ত এগোলে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে অন্য অনেকের মত তিনিও সপরিবারে সীমান্তের ওপারে পালিয়ে যান। এরপর যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে দেখেন পাক সেনারা জামিল সাহেবের কাঠের দোতলা বাড়ির সাথে তার বসতভিটাও পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। এমনকি তাদের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাড়ির আশেপাশের বাড়ন্ত ফলের গাছগুলো পর্যন্তও রেহাই পায়নি। একদম নিঃস্ব অবস্থা থেকে তাকে নতুন করে আবারো সবকিছু শুরু করতে হয়।
অনেক চেষ্টার পরে চুলায় আগুন ধরলে সফুরা বেগমের চড়া মেজাজ কিছুটা ঠাণ্ডা হয়। তিনি চাল ধুয়ে মাটির হাড়িতে জাউভাত রান্নার জন্য উঠিয়ে দেন। এরপর ঘরের উঠানসহ আনাচে-কানাচে থাকা ময়লা আবর্জনা ঝাড় দিয়ে লেপে-মুছে পরিষ্কার করেন। টুকিটাকি আর সব কাজ শেষে কলসি নিয়ে খাবার পানি আনার জন্য ভূমি অফিসের দিকে হাঁটা দিলে পথে পাভেলের সঙ্গে দেখা হয়। ছোড়াটা দু’পাটি দাঁত মেলে হাসতে হাসতে তাকে কি যেন জিজ্ঞেস করে কিন্তু সফুরা বেগম তা না শোনার ভান করেন। তিনি বরং পাভেলকে অবজ্ঞা ভরে দু’টা গালি দিয়ে কলতলায় তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আসলে এই ছেলেটাকে দেখলে তার মধ্যে কি যেন ঘটে!বিশেষ করে গতবারে পাভেল যে চরম অপকর্মটি করেছে তারপর থেকে ছোড়াটাকে তিনি দুই চোখে সহ্য করতে পারেন না।
বয়সের ভারে সফুরা বেগমের যে বহুমূত্র রোগের সমস্যা হয়েছে সেটা কমবেশি সবাই জানে। জন্য তাকে রাতে অনেকবার শৌচাগারে যেতে হয়, গ্রাম এলাকায় শৌচাগার সাধারণত শোবার ঘর থেকে একটু দূরে বা ঘরের কাছে আঙিনার এক কোণে তৈরি করা হয়। পাভেলের কানে তথ্যটা পৌঁছানো মাত্র সে সফুরা বেগমকে ভয় দেখানোর জন্য মনে মনে একটা প্ল্যান আঁটে। প্ল্যান অনুযায়ী ঘটনার দিন বিকালে সে রান্নাঘর থেকে একটা হাড়ি সংগ্রহ করে গোয়াল ঘরে বসে আছিরুদ্দিকে নিয়ে খড়কুটো, বাঁশ, পুরনো কাপড় এসব দিয়ে একটা কাকতাড়ুয়া বানিয়ে উত্তরের ঘরের পিছনে লুকিয়ে রাখে। আছিরুদ্দি কাকতাড়ুয়া বানানোর কারণ জানতে চাইলে সে কি একটা অজুহাত দেখায়। পাভেলের কথাগুলো আছিরুদ্দির কাছে সন্দেহজনক মনেহলেও সে কাজের চাপে ব্যাপারটা কাউকে জানাতে ভুলে যায়। এরপর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে, পাভেল তখন প্রস্রাব করার অজুহাতে টর্চ হাতে ঘর থেকে বের হয় এবং কাকতাড়ুয়াটা হাতে নিয়ে সফুরা বেগমের ঘরের ঠিক উল্টাদিকে লাউয়ের মাচার নীচে দাড়া করিয়ে রাখে। কাজ শেষে সে চুপচাপ ঘরে ফিরে শান্ত সুবোধ বালকের মত ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাভেল জানতে পারে সফুরা বেগম নাকি শৌচকর্মের প্রয়োজনে গতরাতে ঘরের দরজা খুলে লাউএর মাচার পাশ দিয়ে যাবার সময়ে ভূত দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এরপর বাকী রাত তাকে নিয়ে ওবাড়িতে বেশ হুলস্থূল পড়ে যায়। রাতে সে ঘটনার পর থেকেই তিনি নাকি হিস্টিরিয়া রোগীর মত ক্রমাগত হেঁচকি দিয়ে বিড়বিড় করছিলেন, তাই ভূত তাড়ানোর জন্য তাকে ভোরবেলাতেই ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আছিরুদ্দি আসল ঘটনাটা সবাইকে জানাবে বলে পাভেলকে হুমকি দিলে পাভেলও তাকে শাসিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয় যে কাকতাড়ুয়া বানাতে সেও তাকে সহযোগিতা করেছিল। অতএব এটা তার একার কাজ না এবং কেউ যদি জানতে পারে যে এর পিছনে আছিরুদ্দিও ছিল তাহলে তার চাকুরী চলে যাবে। পাভেলের হুমকিটা কাজ দেয়, আছিরুদ্দি চাকুরী হারানোর ভয়ে ব্যাপারটা গোপন রাখে। একবার অবশ্য রিপন মামা পাভেলকে ইশারায় আসল ঘটনাটা কি জিজ্ঞেস করলে সে চোখ টিপ দিয়ে ইশারায় জানায়। তবে আনোয়ারা বিবি ব্যাপারটা আঁচ করতে পারেন কারণ হাড়িটা তাঁর রান্নাঘরের এবং তিনি গতকাল পাভেলকে সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখেছিলেন। সেবার সফুরা বেগমের শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ধকল গিয়েছিল। বিশেষ করে তিনি ওঝার হাতে ঝাড়ুর পিটুনি খাবার কথা কোন মতেই ভুলতে পারেন না। আছিরুদ্দি ঘটনার বেশ কয়েকমাস পরে একদিন সফুরা বেগমের কাছে এক প্যাকেট বিড়ি উপহারের বিনিময়ে পুরো ঘটনাটা বলে দেয়। কিন্তু পাভেল ততদিনে ছুটি শেষে রংপুরে ফিরে যাওয়ায় বিষয়টা আর সামনে এগোয়নি। তবে সবটা জানার পরেও কাউকে না জানানোর কারণে আছিরুদ্দিকে রওনক মামার হাতে বেদম মার খেতে হয়েছিল বলে পাভেল শুনেছে। পাভেল খবরটা শুনে খুশীই হয়েছে, তারমতে এটা হলো বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি। আরেকবার কি একটা কারণে সফুরা বেগম গালি দিলে পাভেল তার রান্নাঘরের বাঁশের মাচার নিচে ডিমে ওম দেয়া মুরগীটা ছুঁড়ে ফেলে একে একে সব ক’টা ডিম ভেঙ্গে ফেলেছিল। চোখের সামনে এতবড় সর্বনাশ ঘটতে দেখে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সফুরা বেগমের গাছ পাকা ফল পাখি কিংবা পাভেলের পেটেই যায়। পাভেলের দুষ্টামির দীর্ঘ তালিকায় এগুলো দু’একটা নমুনা মাত্র। বলতে গেলে পাভেল গ্রীষ্মের ছুটিতে নানাবাড়ি এসে কখন কিভাবে তার জীবনটা দুষ্টামিতে বিষিয়ে তুলবে তা ভেবে তিনি এক ধরণের বিভীষিকায় পড়ে যান। কিন্তু তরি-তরকারী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা চাহিদা পূরণের জন্য তাকে প্রায়ই ওবাড়ির অনুকম্পার উপর নির্ভর করতে হয়। হয়ত একারণে না চাইলেও পাভেলের অপকর্ম-অত্যাচার তাকে চোখ-মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। পাভেলের দুষ্টামির যন্ত্রণায় মেজাজটা কখনো বেশী চড়ে গেলে তিনি সবার অগোচরে গালি-অভিশাপ দিয়ে মনের ঝাল মিটিয়ে নেন। স্বভাববশত সেদিনও পাভেলকে দেখে তিনি তাই করেছিলেন।
কলতলায় যেয়ে কাজ শেষ হতে না হতেই কি এক অমঙ্গল আশঙ্কায় তিনি তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরেন। আর ঘরে ফিরেই তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। তার সুন্দর ভাবে নিকানো উঠোন ময়লা আবর্জনায় একেবারে ভরে আছে। এটা কার কাজ হতে পারে সেটা বুঝতে বেশী কষ্ট করতে হয়না। পাভেলের এই অনাসৃষ্টিতে তার মেজাজ এক লাফে সপ্তমে উঠে যায়। ছেলেটাকে ধরে আচ্ছা মতন দু’এক ঘা বসিয়ে দেবার তাড়না পেয়ে বসে তাকে। কিন্তু কাছেপিঠে লাঠি খুঁজে না পেয়ে শেষে চুলার পাশে বাঁশের বেড়ায় গুঁজে রাখা সব্জি-পেঁয়াজ কাটার ছুরিটা নিয়ে পাভেলের দিকে তেড়ে যান। পাভেল সফুরা বেগমকে ছুরি হাতে তার দিকে তেড়ে আসতে দেখে ভোঁ দৌড় দেয়। তিনি পাভেলকে তাড়া করলেও বয়সের ভারে বেশিদূর এগোতে পারেন না। অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠে শেষে ছুরিটাই ছুড়ে মারেন হার্মাদ ছেলেটার দিকে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছুরিটা একটু দূরে পড়লে পাভেল সেটা কুড়িয়ে উলটো তার দিকেই ছুঁড়ে মারে। সব মিলিয়ে ঘটনাটা যে এরকম হতে পারে তা হয়ত পাভেল কিংবা তিনি কেউই কল্পনাও করেননি। ছুরিটা সরাসরি সফুরা বেগমের নাকের পাশে লেগে একটা গভীর ক্ষত বানিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। সফুরা বেগমের চীৎকার চেঁচামেচিতে মুক্তা খালা বিছানা ছেড়ে চোখ ডলতে ডলতে ঘরের বাইরে আসেন। এছাড়া ভূমি অফিসের কলতলা থেকে পানি সংগ্রহ করতে আসা আশেপাশের বাড়ির বউ-ঝিরাও এসে পাশে দাঁড়ায়। সফুরা বেগম তাদেরকে দেখে আরও উচ্চস্বরে কান্নাকাটি আর পাভেলকে অভিশাপ দিতে থাকেন। সবকিছু শুনে তারা, এমনকি মুক্তা খালাও পাভেলকে ধরতে তৎপর হন কিন্তু পাভেল দৌড়ে পালিয়ে যায়। এরপর সফুরা বেগম শাড়ির আঁচল ক্ষতস্থানে চেপে পাভেলের মায়ের কাছে নালিশ করতে যান।
সফুরা বেগম যখন পাভেলের মা বেলী হককে ছেলের বিরুদ্ধে নালিশ করতে উদ্যত তিনি তখন রান্নাঘরে, গরম লুচি ভাজায় ব্যস্ত। গতরাতে আতপচালের পায়েস বানানো হয়েছিল। সকালের নাস্তায় আজ সবাই লুচি দিয়ে পায়েস খাবে। বাড়ির লোকজনদের কেউ ঘুম থেকে উঠেছে কিংবা ওঠার তোড়জোড় করছে। জামিল সাহেব অবশ্য অনেক আগেই এক কাপ চা খেয়ে দোকানে চলে গেছেন। সকালের নাস্তা তিনি সাধারণত দোকানেই বেচাকেনার ফাঁকে সেরে নেন। রিপন মামা কলতলার পাশে দাড়িয়ে কাঠকয়লা দিয়ে দাঁত মাজছে। ছোট খালা এখনো ঘুম থেকে ওঠেননি। তিনা ডানহাতে একটা মোয়া নিয়ে সারা আঙিনায় মুরগী তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর পাভেলের নানী বাড়ির রাখাল, আছিরুদ্দিকে দিয়ে গোলাঘরে রাখা ডুলী থেকে ধান নামানোয় ব্যস্ত। ওগুলো সিদ্ধ করে পিঠে-পায়েসের জন্য ঢেঁকিতে ছাঁটা হবে। আমেনাবু তার অসুস্থ বাবাকে দেখতে গতকাল সন্ধ্যায় সেইযে রতনপুরে গিয়েছেন, এখনও ফেরেননি। আমেনাবু ফিরলেই নানান রকম পিঠের আয়োজন করা হবে। সবমিলিয়ে বলতে গেলে গ্রামবাংলার যে কোন গৃহস্থ বাড়ির সকালের স্বাভাবিক চিত্র এটি।
সফুরা মাসীর বাড়ির দিক থেকে কি নিয়ে যেন শোরগোলের শব্দ ভেসে আসছে। পাভেলের মা কান দু’টো সজাগ করেন কিন্তু এতদূর থেকে সবকিছু ঠিকমত বোঝা যায়না। তবুও কি এক অমঙ্গল আশঙ্কায় তার বুকটা কেঁপে ওঠে। তিনি অবশ্য কিছুক্ষণ আগেও পাভেলকে পশ্চিমের ঘরের বড় বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেছেন, তাই ছেলেকে নিয়ে আপাতত একটু নিশ্চিত থাকেন। হয়ত অন্য কোন কারণে ওদিকে হৈচৈ হচ্ছে। অবশ্য মাসীর একটা বদভ্যাস হল যে কোন ঘটনার ক্ষেত্রে সবসময় তিল কে তাল করা আর সামান্য কোন ছুতা পেলেই চীৎকার চেঁচামেচিতে বাড়ি মাথায় তোলা। অজ্ঞাত কারনবশত তিনি পাভেলকে মোটেও সহ্য করতে পারেননা। সবসময় ছেলের বিরুদ্ধে রাজ্যের অভিযোগ শুনতে শুনতে তার দু’কান একদম ঝালাপালা। অবশ্য পাভেলও কেন জানেন না সারাক্ষণ তার পিছনে আঠালির মত লেগে থাকে। শোরগোলটা ক্রমেই বাড়তে বাড়তে আঙিনার কাছে এলে তিনি চোখ তুলে তাকান। সফুরা বেগমের শাড়ির আঁচল তখনো রক্তে লাল হয়ে আছে। তিনি পাভেলের বিরুদ্ধে একগাদা নালিশ করে আঁচল সরিয়ে নাকের পাশের ক্ষতটা দেখান। পাভেলের মা মাসীর অভিযোগ আমলে না নিয়ে দৌড়ে পশ্চিমের ঘরে যেয়ে দেখেন বিছানা খালি। পাভেল কখন বিছানা ছেড়েছে তিনি বুঝতেও পারেননি। অগত্যা তাকে মাসীর সব নালিশ মেনে নিতে হয়। তবে তিনিও মাসীকে দু’টা কড়া কথা শোনাতে ছাড়েন না। চীৎকার চেঁচামেচিতে পাভেলের নানী আনোয়ারা বিবি গোলাঘর থেকে উঠানে এসে সফুরা বেগমের কাটা নাক দেখে ফিক্ করে হেসে ফেলেন। তিনি পুরো ঘটনাটা শুনে যথাযথ বিচার করার আশ্বাস দিয়ে সফুরা বেগমকে হাসপাতালে যেয়ে নাক ব্যান্ডেজ করানোর পরামর্শ দেন। সফুরা বেগমের বদ্ধমূল ধারণা, নানীর অপত্য স্নেহে বখে গিয়েই পাভেলের এমন দশা, তাই তিনি আনোয়ারা বিবির কথায় যেন আস্থা রাখতে পারেন না। কিন্তু ক্ষতস্থানের রক্তপাত বন্ধ করতে তাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে যেতে হয়।
সফুরা বেগমকে কোন মতে সামলান গেলেও পাভেলের মা মনেমনে ভীষণ ক্ষেপে উঠেন। বাঁদর ছেলেটাকে তিনি বিছানা না ছাড়তে পইপই করে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেটা যদি তার কথা শুনতো!তিনি পাভেলের সেজো মামা রওনককে ডেকে ভাগনেকে ধরে আনতে নির্দেশ দেন। আনোয়ারা বিবি নিষেধ করলেও বেলী হক মায়ের কথায় নীরব থাকেন। আসলে ছেলের সারাক্ষণ এটাসেটা দুষ্টামিতে তিনি ক্রমান্বয়ে ধৈর্যহারা হয়ে পড়েন। রওনক মামা বড় বোনের আদেশে আছিরুদ্দিকে নিয়ে ভাগনের খোঁজে বের হন।
পোস্ট ভিউঃ 22