পাভেলের নানাবাড়ি: পার্ট-৩

উপন্যাস পাভেলের নানাবাড়ি
পাভেলের নানাবাড়ি: পার্ট-৩

 ৩ 

গ্রীষ্মের এই খরদুপুরে সুর্যটা চারদিকে কেমন ঝাঁ ঝাঁ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এ অবস্থায় আকাশের নীল রেখার দিকে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়না। পাভেল তবুও ডান হাত দিয়ে চোখ দু’টা আড়াল করে আকাশের দিকে তাকায়। সে হয়ত সুর্য উত্তাপের প্রখরতা বোঝার চেষ্টা করে। আকাশে আজ মেঘের লেশমাত্র নেই। নিঃসীম শুন্যতার মাঝে একটা নিঃসঙ্গ ভুবন চিল অনবরত পাক্‌ খেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার বিস্তৃত ডানার প্রান্তে সুর্যের ঝিকিমিকি রেখা দেখা যায়। দামালগ্রামে যাবার রাস্তাটা একদম ধূলায় ধূসরিত। রাস্তার দু’কিনারায় গরুগাড়ীর চাকার অনবরত ঘষায় গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পাভেল কখনো রাস্তার মাঝের উঁচু অংশটি দিয়ে আবার কখনো পাশের গর্তে নেমে ধূলো উড়িয়ে হাঁটতে থাকে। সে অবশ্য এর আগে কখনও ওই গ্রামে যায়নি। তবে সে নানাবাড়ির রাখাল আছিরুদ্দির কাছে গ্রামটির অনেক গল্প শুনেছে। মাঝে শুধু একবার বাজারসদাই করার জন্য বড়মামার সঙ্গে রতনপুর হাট অব্দি গিয়ে ছিল। কিন্তু দামালগ্রাম নাকি সেখান থেকেও আরও কয়েক মাইল দক্ষিণ-পূবে।

গ্রীষ্মের ঝিমধরা অলস দুপুরগুলোতে বারান্দার কাঠের বেঞ্চে হেলান দিয়ে আছিরুদ্দির কাছে দামালগ্রামের গল্প শুনে গ্রামটির প্রতি পাভেলের যতটা না ভাললাগা তার চেয়ে বেশী কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। আছিরুদ্দির বাড়ি সেই গ্রামে। সেখানে নাকি মাইলের পর মাইল সবুজ পানের বরজ। পাভেল কখনো পানের বরজ দেখেনি। গ্রামের অদূরেই ভুরুঙ্গামারীর দিক থেকে নেমে আসা দুধকুমার আর ফুলকুমার নদী একই স্রোতধারায় মিলে আরও দক্ষিণ পূবে যেয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলেছে বলে সে আছিরুদ্দির কাছে জেনেছে। এত সুন্দর গ্রাম হয়! বাংলা বইএর পাতায় শিল্পী হাসেম খানের আঁকা ছবিগুলোর কথা মনেপরে পাভেলের। সে আর রিপন মামা একদিন গ্রামটি দেখার প্ল্যান আঁটে। কিন্তু পাভেল নিশ্চিত জানে যে মা কখনোই সেখানে যাবার অনুমতি দিবেন না। তাই অনুমতি চেয়েও লাভ নেই। তারা গোপনে ঘুরে আসার জন্য সুযোগ আর সময়ের অপেক্ষায় থাকে। আজ হয়ত সে সুযোগটিই এসেছে কিন্তু এমুহুর্তে সেতো একা! সে একাকি কখনো সেখানে যেতে চায়নি। পাভেল ভাবে, রিপন মামা আজ সঙ্গে থাকলে খুব ভাল হত। দু’হাত দিয়ে বুকের সঙ্গে চেপে ধরা মুরগীটা হঠাৎ কক্‌ কক্‌ শব্দ করে ওঠে। পাভেল মুরগীটা আরও জোড়ে চেপে ধরে, যেন সেটা উড়ে না যায়। দূর কোথাও থেকে ঘুঘুর উদাস করা ঘু ঘু ডাক ভেসে আসছে। মন খারাপ করা সে সুর শুনতে শুনতে পাভেল পথের ধূলো মাড়ায়।

রাস্তার দু’ধারেই শেয়াল কাঁটা, শ্বেতদ্রোণ আর ভেরেন্ডার বেশ ঘন ঝাড়। সেখানে হলুদ রঙের ছোট ছোট প্রজাপতিগুলো শেয়াল কাঁটার হলুদ থোকা থোকা ফুলের সঙ্গে কিরকম মিশে গেছে। ভাল করে তাকিয়ে না থাকলে একদম বোঝা যায়না কোনটা ফুল আর কোনটা প্রজাপতি। পাভেল রাস্তার পাশে দাড়িয়ে শেয়াল কাঁটার ঝারে হলুদ প্রজাপতির নাচ দেখতে থাকে। কয়েকটা দস্যু মৌমাছি শ্বেতদ্রোণের সাদা সাদা ফুলগুলো থেকে মধু আহরণে ব্যস্ত। মৌমাছিগুলোর বাসা কোথায় কে জানে! সে জানেনা তারা কতদূর থেকে এখানে পথের ধারে মধু সংগ্রহ করতে এসেছে। মৌমাছির বাসা বা চাক দেখলেই পাভেল একধরণের চঞ্চলতা অনুভব করে। কতবার সে যে ঢিল মেরে মৌমাছির চাক ভেঙেছে তার হিসাব নেই। একবার এরকম একটা দুষ্টুমির কথা মনেপরে যায়। ঘটনাটা রংপুরের, তাদের বাসার সামনে দুটো বিশাল লিচু গাছ আছে। পাভেল একদিন গাছের নীচ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে খেয়াল করে বড় লিচুগাছটার কোটরে মৌমাছি বাসা বেঁধেছে। ব্যাস, আর যায় কোথা! পাভেল কোথা থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে এনে গাছের ডালে চড়ে। এরপর গাছের কোটরে গুঁতো মারতেই মৌমাছি সব ভোঁ ভোঁ শব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাভেল মৌমাছির হুলের কামড় থেকে রক্ষা পেতে হাতের লাঠিটা কোটরে ছেড়ে দিয়ে গাছের ডাল থেকে দেয় এক লাফ। কিন্তু সে ঠিক মত মাটিতে পড়লেও কিভাবে যেন কোটরে ছেড়ে দেয়া লাঠিটা তার পিঠের ওপরে এসে পড়ে এবং তার পড়নের জামার ভিতরে ঢুকেও যায়। তারপর যা হবার তাই হল। লাঠির আগায় লেগে থাকা একটা মৌমাছিও বোধহয় তাকে সেদিন ছেড়ে দেয়নি, সব কটাই পাভেলের পিঠে হুল সেঁধিয়ে দিয়েছে। সেকি চীৎকার তারপর! পিঠের ব্যাথায় অনেকদিন বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাটাতে হয়েছে তাকে। এই লিচু গাছ নিয়ে তার আরেকটা মজার স্মৃতি আছে। ঘটনাটা বেশী দিন আগের না। এ বছরই জানুয়ারির মাঝামাঝিতে হবে। দিনটা ছিল শুক্রবার। পাভেল জুম্মার নামাজ সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে অঙ্ক কষতে বসেছে। এমন সময় কি একটা ব্যাপার নিয়ে ছোটবোনের সঙ্গে বিরোধ হলে সে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। তার সেই কান্না শুনে বাবা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করেই তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে সে প্রবল অভিমানে বাসা থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়। পাভেল এর আগেও অনেকবার এভাবে বাসা থেকে পালিয়েছিল কিন্তু প্রতিবারি তাকে খুঁজে ধরে আনা হয়েছে। আর প্রতিবারি ধরে আনার পরে তার কপালে জুটেছিল বেদম প্রহার। পাভেলের ঘর পালানো রোগের সঙ্গে পরিবারের সবাই পরিচিত থাকায় তাই কেউই তেমন একটা গা করেনা। তারা ভাবেন সন্ধ্যা হলে পাভেল এমনিই ঘরে ফিরবে কিংবা তাকে খুঁজে ধরে আনা হবে। তবে এবারের ঘর পালানটা কিন্তু অন্যান্যবারের মত ছিলনা। পাভেলের বাসার কাছেই আধাপাকা রাস্তার ওপারে তার বন্ধু মিলনদের টিনের বাসা। তার বাবা সরকারী ব্যাংকের চাকুরে। ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড় মিলন। সে এবং মিলন এর আগে অনেকবারই বাসা থেকে পালানোর ফন্দি এঁটেছিল। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সেই ইচ্ছা কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে রবিনহুড আর দস্যু বনহুর পড়ার পর থেকে তারা বাসা থেকে পালানোর জন্য একরকম মরিয়া হয়ে ওঠে। অবশ্য পালিয়ে কোথায় যাবে বা কি করবে সে ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় তাদের প্ল্যান কখনো বাস্তবতার মুখ দেখেনি। পাভেল তাদের বহুদিনের পরিকল্পিত ঘর পালানর ইচ্ছাটাকে এবার যে করেই হোক বাস্তবে রূপ দিতে মিলনের কাছে যায়। মিলনদের বাসার টিনের দরজায় কড়া নাড়লে মিলন নিজেই দরজা খোলে। পাভেল তাকে বাসার বাইরে ডেকে ঘর পালানোর পরিকল্পনা জানালে মিলন শুরুতে নিমরাজি হলেও পাভেলের প্রবল অনুরোধে একসময় সেও পালাতে রাজী হয়। সেখান থেকেই তারা জোর কদমে পা চালিয়ে শিমুদের চারতলার ছাদে যায় পরিকল্পনাটা ভালভাবে গুছিয়ে নেয়ার জন্য। বরাবরের মত এবারো কোথায় যাবে, কি করবে, পকেটে পয়সা নেই এসব বিষয় ছাড়াও সম্প্রতি ছেলেধরার উপদ্রপের ঘটনা সামনে এসে দাড়ায়। মূলত ছেলেধরার খপ্পরে পড়ার আশংকায় মিলন একসময় বেঁকে বসে। ছেলেধরার দল শিশু কিশোরদের ধরে খুন করে পাটক্ষেত কিংবা বিছুটির জঙ্গলে ফেলে দেয় বলে তারা বড়দের কাছ থেকে শুনেছে। পত্রিকায় খবর বেড়িয়েছে তারা মূলত শরীরের রক্ত, কিডনি এসবের জন্যই ছোট ছোট বাচ্চাদের অজ্ঞান করে ধরে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মিলনের ভীতু আচরণে বিরক্ত হয়ে পাভেল একাই পালানর সিদ্ধান্ত নেয়, তাছাড়া সেতো ইতিমধ্যে বাসা থেকে পালিয়েছে। তার আর ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছা নেই। মাগরেবের আযানের পরপর মিলন বাসায় চলে গেলে সে সন্ধ্যাটা পাড়ার মসজিদের দিকে কাটিয়ে রাতে বাসার সামনের লিচুগাছ দুটার মধ্যে যে কোন একটিতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ভোর হলে বাকী সিদ্ধান্তটা নেয়া যাবে। পাভেল এর আগে বাসা থেকে পালিয়ে যেসব জায়গায় গিয়েছিল তার সবই বাবার চেনা। পাভেল ভাবে, এবার অন্তত কেউ তাকে খুঁজে পাবেনা। পাভেল ভাবে, কিশোরদের ঘর পালানর যতগুলো গল্প সে পড়েছে সেখানে কেউই গাছে রাত কাটায়নি। সেদিক থেকে ভাবলে তার এই সিদ্ধান্তটা একদম আনকোরা এবং নতুন।

লিচু গাছ দুটার মধ্যে যেটা আকারে একটু বড় সেটার মাঝামাঝি জায়গায় তিনটা মোটা ডাল তিন দিকে ছড়িয়ে যাওয়ায় মাঝে একটা খোলের মত সৃষ্টি হয়েছে। পাভেল রাত কাটানোর জন্য সে জায়গাটাকেই উপযুক্ত বিবেচনা করে। সে গাছের খোলের মাঝে আরাম করে বসে দুদিকে দুই পা ছড়িয়ে দেয়। শীতের রাত অথচ তার পড়নে হাফ প্যান্ট আর হাফ হাতা গেঞ্জি। দুপুরের কোমল রোদে ওগুলো পড়েই সে অংক কষতে বসেছিল কিন্তু তারপর অঘটন যা হবার তাতো হয়েই গেল। পাভেল ভাবতে থাকে এই সামান্য পোষাকে দীর্ঘ শীতের রাত সে কিভাবে পারি দিবে। দূরে কোথায় ঢং ঢং শব্দে প্রতিটি ঘণ্টার জানান দিচ্ছে রাতজাগা ঘড়ি, সম্ভবত পুলিশ ফাঁড়ি হবে। প্রতি রাতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় যে এভাবে ঘড়ির শব্দ হয় তা তার জানা ছিলনা। রাত দশটার পরে বাবা আর রাহাত মামা কথা বলতে বলতে লিচু গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে যান। সম্ভবত তারা তাকে খুঁজতে বেড়িয়েছেন। মামা একবার দুই গাছের ডালেই টর্চের আলো ফেলেন কিন্তু পাভেল যেখানে ঘাটি গেড়েছে গাছে না ওঠা পর্যন্ত কারো সাধ্য নাই তাকে খুঁজে পায়। ঘণ্টা খানেক পরে তারা রাগে গজগজ করতে করতে বাসায় ফিরেও যান। রাত বাড়তে থাকে আর তার সঙ্গে বাড়তে থাকে মাঘের হাড় কাঁপানো শীত। লিচু গাছের পাতা বেয়ে শ্রাবণের ধারার মত টুপটাপ করে শিশির পড়তে থাকে। বাদুরের পাখা ঝাপ্টানি, রাত জাগা পাখির হঠাৎ কিচির মিচির ছাড়া চারদিকে জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা। পাভেল জেগে থাকে আর জেগে থাকে পুলিশ ফাঁড়ির ঘণ্টাটা। নিয়মিত বিরতিতে সেটা বেজে উঠে জানান দেয় দীর্ঘ রাত্রির শেষে আরেকটা দিন সমাগত। পাভেল কখনো জেগে, আবার কখনো আধো আধো ঘুমে রাত কাটায়। হঠাৎ তার চোখে পড়ে পাশের অপেক্ষাকৃত ছোট লিচু গাছটার পাশ দিয়ে কে যেন কুঁজো ভঙ্গীতে হেঁটে যাচ্ছে। মনেহচ্ছে সে যেন গাছের গোড়ায় বসলো! দুধের পাতলা সরের মত অবয়বের আগন্তুকের চেহারা বোঝা যায়না। পাভেল নিজের গায়ে চিমটি মেরে দেখে সে জেগে আছে কিনা, নাহ্‌, সে দিব্যি জেগে আছে। ভয়ে কিংবা আতংকে তার শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে পড়ে। পাভেল নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভুলে যায়, সে এসব কি দেখছে! এক সময় সেটা কুয়াশার মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। একটু পরে ফজরের আযান দিলে পাভেল যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। গরু গাড়ীর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ভাবালুতা কাটলে পাভেল বাস্তবতায় ফিরে আসে। গরু গাড়ীর ছই একটা লালপেড়ে শাড়ি দিয়ে প্যাঁচানো, ভিতরে কে বসে আছেন তা বাইরে থেকে বোঝা যায়না। হয়ত আম-কাঠালের ছুটিতে কোন এক গ্রামের বধু বাবার বাড়িতে নাইওর খেতে যাচ্ছে। পাভেলের সেবারে চারদিক ফর্সা হতে হতে ঘর পালানর ইচ্ছাটাও মরে যায়। এরপরে সে চুপচাপ গাছ থেকে নেমে বাসায় যায়। মা তখন সকালের নাস্তা বানানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তিনি ঘাড় ফিরিয়ে পাভেলকে দেখেন কিন্তু মুখে কিছু বলেননা। বাবাও চুপচাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন, রাহাত মামা তখনো ঘুমে। পাভেল নীরবে হাতমুখ ধুয়ে স্কুলে চলে যায়। পাভেল সেদিন ঠিক করেছিল জীবনে আর কখনো বাসা থেকে পালাবে না। কিন্তু আজ সকালে সফুরা নানীর কারণে পাভেলের পক্ষে সেই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঘর পালানর রোগ আবারো তাকে পেয়ে বসে। গরু গাড়ির গাড়োয়ানটা বয়সের ভারে ন্যুজ্জ ষাঁড় দুটিকে তাগাদা দিতে একটু পরপর হই হই শব্দে চীৎকার করে লাঠি দিয়ে আঘাত করছে। তার সেই নির্দয় লাঠির আঘাতে কিংবা পিলে চমকানো চীৎকারে ষাঁড়গুলো তাদের চলার গতি বাড়িয়ে দেয়। একটা তীব্র ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গরু গাড়ির ছইএর পিছনে শাড়ীর আড়াল সরিয়ে পাভেলের বয়সী একটা ছেলে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ছেলেটার পড়নে হাফপ্যান্ট আর তার গায়ের সবুজ রঙের শার্টের সব ক’টা বোতাম খোলা। তার বেলুনের মত বেরিয়ে থাকা পেটের দিকে তাকিয়ে পাভেলের হাসি পায়। ছেলেটা গভীর মনোযোগে হাতে ধরা কাঠি লজেন্স চুষে যাচ্ছে। লজেন্সের লাল রঙ তার ঠোটে লেপটে গেছে। ছেলেটা হঠাৎ মুখের ভিতর থেকে লজেন্সটা বের করে তার দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কাটে। পাভেলও পাল্টা ভেঙচি কেটে উল্টা দিকে ঘুরে নিজের পথ ধরে। একটানা বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে রতনপুর হাটের উঁচু ছাউনিগুলো দূর থেকে আবছা আবছা চোখে পড়ে। পাভেলের যেন আর তর সয়না। সে দৌড়াতে শুরু করে। তার হাঁটুর নীচে দুই পা ধূলায় লেপ্টে থাকে। সে হাটের এক প্রান্তে বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে কামারশালার কাছে এসে বাঁশের নড়বড়ে খুঁটিটা ধরে দাড়ায়। আজ অবশ্য হাটবার না, তাই দাঁত কেলিয়ে থাকা বাঁশ আর শালপাতার ছাউনিগুলো এই ভর দুপুরেও একদম খাঁ খাঁ করতে থাকে। হাটের দিনে মান্দার গাছগুলোর কাছে যেখানে কসাইরা গরু জবাই করে, সেখানে অবশ্য বরাবরের মত আজো এক দঙ্গল কাকের জটলা লেগে আছে। একটা হাড় জিরজিরে ক্ষ্যাপাটে কুকুর কি কারণে একটু পরপর কাকগুলোকে তাড়িয়ে দেয় কিন্তু পরক্ষনেই সেগুলো আবারো উড়ে এসে জটলায় যোগ দেয়। কয়েকবারের চেষ্টা সত্ত্বেও জটলা ভাঙতে না পেরে অবশেষে কুকুরটা উম্মুক্ত চায়ের দোকানের জীর্ণ বেঞ্চির নীচে শুয়ে পড়ে। গরমে হাঁসফাঁস করতে থাকা কুকুরটির দৃষ্টিতে তখন রাজ্যের নিরাসক্তি।

কামারশালায় কয়লার চুলার টকটকে লাল আগুন শিখার দিকে পাভেল মোহগ্রস্থের মতো তাকিয়ে থাকে। হাপরের বাতাসের তোড়ে আগুনের শিখা যেন সাপের জিহ্বার মত লক্ লক্‌ করে বাড়ছে, আবার কমছেও। লোহা আগুনে পুড়লেও কেমন একটা ঘ্রাণ বেরোয়! সেটা আসলে লোহা পোড়ার না কয়লা পোড়ার ঘ্রাণ সেটা অবশ্য পাভেল জানেনা। তবে ঘ্রাণটা তার ভালই লাগে। হাটবার থাকুক কিংবা না থাকুক কামারের যেন ফুরসৎ নেই। ব্যস্ত হাতুড়ির টুং টাং শব্দ তাই প্রতিদিনই শোনা যায়। রায়গঞ্জেও ফজলু ভাইয়ের এরকম একটা কামারশালা আছে। সে একদিন আছিরুদ্দির সঙ্গে সেখানে দা বানাতে গিয়েছিল। পাভেল ক্লান্ত ভঙ্গিতে দোকানের সামনের বাঁশের বেঞ্চে বসে তার এক পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে আরেক পায়ের গোছা চুলকাতে থাকে। পাভেলের বাম গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা ঘাম মাটিতে পড়েই শুকিয়ে যায়। কামার হাতের কাজ থামিয়ে পড়নের মলিন লুঙ্গীটা দিয়ে ঘামে ভেজা মুখ মুছে পাভেলের দিকে তাকায়। এরপর সে পাভেলের নাম ঠিকানা এসব জিজ্ঞেস করে। কিন্তু পাভেল বিরক্ত ভঙ্গিতে কখনও সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় আবার কখনও নিশ্চুপ থাকে। তার আসলে কথা বলতে ইচ্ছে করেনা। ক্ষুধায় তার মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। হাতের কোচরে মুরগীটা তখনো সেভাবেই তার শরীরের সঙ্গে এঁটে থাকে। মুরগীটা বেচতে চায় কিনা কামার জিজ্ঞেস করে। পাভেল তার এই প্রশ্নেরও উত্তর না দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে দামালগ্রামের দিকে চলে যাওয়া মেঠো পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে। দূরে পথের মরীচিকার মাঝে একসময় একটা মানুষের অবয়ব ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে। খানিকটা কাছে এলে তাকে অবশ্য চেনা যায়। তিনি হলেন পাভেলের আমেনাবু। নানাবাড়িতে চিড়া কিংবা মুড়ি মোয়া এসব বানাতে হলে আমেনাবুকে ছাড়া চলবেই না। তার হাতে যাদু আছে। পাভেলকে রতনপুর হাটে এভাবে কামারশালায় বসে থাকতে দেখে আমেনাবু বেশ অবাক হন। তিনিও কিছু প্রশ্ন করেন কিন্তু পাভেল তার সব কথার উত্তর দেয়না। সে বরং মুরগীটা আমেনাবুর হাতে গছিয়ে দিয়ে সফুরা নানীর বাসায় পৌঁছে দিতে অনুরোধ জানিয়ে আবারো ধূলোর পথ ধরে। জন্মের পরে পাভেল আমেনাবুর হাতেই বড় হয়েছে, পাভেল সেটা জানে। আমেনাবু স্নেহের দৃষ্টিতে পাভেলের চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। রতনপুর বাজারের পাশ থেকে একটা রাস্তা ডানদিকে নাগেশ্বরীর দিকে গেছে আর তার উল্টা দিকের রাস্তাটা দিয়ে চাইলে রাঙ্গালিবস হয়ে রায়গঞ্জে যাওয়া যায়। কিন্তু এমুহুর্তে পাভেলের রায়গঞ্জে ফেরার ইচ্ছে নেই। সে বরং ধুলোর রাজ্যে হারাতে ভালবাসে। রাস্তার পাশের বড় জামগাছটায় প্রচুর জাম ধরেছে, তার মতই বেশ কিছু ডানপিটে ছেলে গাছের ডালে বসে জাম খাচ্ছে আর চীৎকার করে বাংলা সিনেমার গান গাচ্ছে। সে তাদের থেকে চেয়ে নিয়ে কয়েকটা জাম মুখে দেয়। তার মনেপরে সম্ভবত দু’বছর আগে সেও একদিন এভাবে জামগাছে চড়ে কি বিপদের মুখেই না পড়েছিল! তার বরাবরি স্বভাব হলো ঝাল-লবন এসব সুন্দর করে মেখে কাগজের পুটলি বেঁধে গাছে ওঠা। তারপর এডাল সেডাল ঘুরে ঘুরে জাম ছিঁড়ে সেখানেই ঝাল-লবন মেখে খাওয়া। সেবার এভাবেই জাম খেতে গিয়ে সে পা ফসকে পড়ে যায় কিন্তু ভাগ্য ভাল তাই একেবারে মাটিতে না পড়ে কোনোক্রমে নীচের ডালে আটকে ছিল। মাটিতে পড়লে নির্ঘাত তার হাত-পা ভাংতো। আরেকবার ছুটিতে এসে বড়ইগাছের ডাল ভেঙ্গে ডালসহ মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। হাতে-পায়ে বড়ইয়ের কাঁটা বিঁধে সেকি করুণ অবস্থা! সে অবশ্য এখন অনেক সাবধানী হয়েছে। পাভেল জোর কদমে পা চালিয়ে কিছুদূর এগোলে পথের পাশেই একটা মসজিদ চোখে পড়ে। মাটির দেয়াল আর শনের ছাউনির ছোট একটা মসজিদ, সামনে প্রশস্ত বারান্দা, সেটাও শনের ছাউনির। সম্ভবত নামাজ শেষে সেখানে মিলাদ পড়ান হয়েছিল। মসজিদের বারান্দায় বিভিন্ন বয়সী ছেলে এবং মুরব্বী গোছের কয়েকজনকে দেখা যায় কলার পাতা বিছিয়ে বসে আছে। সম্ভবত সিন্নি খেতে দেয়া হবে। পাভেল সোজা মসজিদের পুকুরে যেয়ে হাতমুখ ধুয়ে একটা কলার পাতা নিয়ে তাদের পাশে বসে পড়ে। সিন্নিতে এভাবে ভাগ বসানোর কারণে তাদের কেউ কেউ বিরক্ত হয়। কিন্তু পাভেল জানে তার এসবে কান দিয়ে লাভ নেই। কেননা তার পেটে তখন খিদের আগুন জ্বলছে। একটু পর মসজিদের মুয়াজ্জিন বড় গামলা ভর্তি সিন্নি এনে সবার সামনে মেলে ধরেন। একে একে সবার মাঝে দু’মুঠো করে সিন্নি বিলান হয়। সরু আতপ চালের সঙ্গে গরুর মাংস আর ডাল মিশিয়ে সিন্নি রান্না করা হয়েছে। যেমনি রান্না তেমনি তার ঘ্রাণ! কিন্তু অতো অল্পে পাভেলের খিদে মেটেনা। সে আবারও হাত বাড়ায়। মুয়াজ্জিন সাহেব ধমক দিয়ে হাত সরিয়ে দিতে যেয়ে পাভেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কি ভেবে আবারো খানিকটা সিন্নি পাতে ঢেলে দেন। পাভেল বেশ দ্রুত খাবারটা পেটে চালান করে দিয়ে নলকূপের মুখে হাত চেপে পানি পান করে। পেটে কিছু খাবার আর পানি ঢোকায় সে আবারো তার শরীরে শক্তি অনুভব করে। পাভেল পুকুর পাড়ের কাঁঠাল গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসে আরাম করে আবারো পথে নামে।

সূর্যটা পশ্চিমে ঢলে পড়ার পরপরই পাভেল দামালগ্রামে ঢোকে। সেখানে একটা অবাক করা দৃশ্য তাকে বেশ নাড়া দেয়। সবুজ পাতা আর ধূসর রঙের একধরণের লতা জাতীয় গাছ গ্রামের প্রতিটা সুপারি গাছ সাপের মত পেঁচিয়ে রেখেছে। ওগুলো যে আসলে পান গাছ তা পাভেল অনেক পরে জানতে পেড়েছিল। সে এরকম অনেকগুলো ঘন সুপারির বন পাড় হয়ে শেষে নদীর পাড়ে পৌঁছে। ঘন বর্ষায় নদীটা গ্রামের বেশ কাছাকাছি থাকলেও এই গ্রীষ্মে পানি শুকিয়ে সেটা বেশ দূরে চলে গেছে। নদীর তীর পর্যন্ত অফুরন্ত বালির রেখা সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। খাড়া ঢালটা যেখান থেকে নেমে গেছে সেখানে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে বাঁশের মাচা বাঁধা রয়েছে। পাভেল মাচায় পা ঝুলিয়ে বসে। আশেপাশে জনসমাগম তেমন একটা নেই। শুধুই খাঁখাঁ নির্জনতা। বইয়ের পাতায় এধরণের দৃশ্যে বাঁশিসহ একজন রাখালের উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে তা চোখে পড়েনা। তারমত ভবঘুরে টাইপের দু’একজন লোক চোখে পড়লেও কারো হাতে বাঁশি বা দোতরা নেই। আসলে বাস্তবতা বড়ই কঠিন! বালির চিকচিক রুপালী রেখা তার চোখে ধাঁধা ধরিয়ে দিলে সে পিছনে ফিরে তাকায়। সেদিকেও আরেক অবাক দৃশ্য! নদীর সমান্তরালে খাড়া ঢাল বরাবর পাটকাঠির ধূসর রঙের ছোট ছোট ঘর চোখে পড়ছে। সেগুলোর মাঝে আবার সবুজ ফসলের ক্ষেত। কোথাও কোথাও ঘরগুলো থেকে গাছের শুকনো ডাল বেরিয়ে পড়েছে। পাভেল একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে সেগুলোই পানের বরজ।

ঘন সবুজ গ্রাম, গ্রামের শেষে গভীর ও খাড়া ঢাল বরাবর ধূসর পানের বরজের সারি এবং তার পরেই সাদা চিকচিক বালি আর বালি। বালির শেষে শীতল জলের নদী। সূর্যের লাল-কমলা আলোয় নদীর জলও রঙিন হয়েছে। কিন্তু এতদূর থেকে জলের মাঝে ভেসে বেড়ান নৌকা আর জেলেদের দেখতে ক্যামন কালো আঁকিবুঁকির মত লাগছে। কি অসাধারণ দৃশ্য! পাভেলের বেশীক্ষণ এই অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব হয়না। বড় মামার ডাকে তাকে বাঁশের মাচা থেকে নেমে আসতে হয়। পাভেল কিভাবে বা কার সঙ্গে নদীর পাড়ে এসেছে তিনি জানতে চান। পাভেল বড় মামার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মামা কি বোঝেন তিনিই জানেন। তিনি একটা জোড় ধমক লাগিয়ে পাভেলকে তার সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসতে বলেন। পাভেল প্রতিবাদ করার বা মামার আদেশ অমান্য করার সাহস পায়না। সে আসলে বড় মামাকে খুব ভয় পায়, তবে তার এই ভয়ের কারণ সে জানেনা। তবে একটা কারণ এই হতে পারে যে, মামা তার বাবাকে নাম ধরে ডাকেন। সে আসলে কখনোই আর কাউকে তার বাবাকে নাম ধরে ডাকতে দেখেনি। এমন কি নানাজানও না। জামিল সাহেব প্রয়োজনে পাভেলের বাবাকে জামাই বা বড়জামাই বলেই ডাকেন। কিন্তু মামা এখানে কি করে এলেন! তিনি কি আজ সকালের ঘটনা শুনে তাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছেন! তাহলে এর পরে কি? তার জন্যে কি পিটুনি অপেক্ষা করছে! রাজ্যের হাজারটা প্রশ্ন এসে পাভেলের চিন্তার জগতকে এলোমেলো করে দেয়। সাইকেলের পিছনে ক্যারিয়ারে বসে সে ভাবতে থাকে। অবশ্য সাইকেলের সামনে ঝুলানো বেশ বড় আকারের একটা রুই মাছ দেখে তার ধারণা হয় রেশাদ মামা সম্ভবত মাছ কিনতেই সেখানে গিয়েছিলেন। সে বেশ কয়েকজন লোককে দেখেছে নদীর পাড় থেকে মাছ কিনে ফিরছে। সম্ভবত তাই হবে। পাভেল মনে মনে প্রার্থনা করে তাই যেন হয়। সারাটা দিন অর্ধভূক্ত থাকার পরে সে এখন আর পিটুনি সইতে পারবেনা। রতনপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতেই প্রায় সন্ধ্যা নেমে এল। মাটির ধুলোমাখা পথ, তবুও মামা বেশ জোড়ে সাইকেলের প্যাডেল মেরে সন্ধ্যার পরপরই রায়গঞ্জে ঢুকলেন। নানাবাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে দূর থেকে বিবিসি’র বাংলা সংবাদের স্বাগত সঙ্গীতের সুর শোনা যায়। নানাজান বেশ চড়া ভলিউমে সংবাদ শুনে থাকেন। আসলে ঐসময়টায় দোকানের ভিতরে তাকে ঘিরে বেশ বড় জটলা হয়ে থাকে। লোকজন সবাই অধীর আগ্রহে সংবাদ শোনে, গল্প করে আর চা-সিগারেট খায়। আসলে এরকম একটা গমগমে পরিবেশে অল্প ভলিউমে সংবাদ শোনা যায়না।

রেশাদ মামা তাকে সাইকেলের পাশে মাছ পাহারায় রেখে জটলার ভেতর দিয়ে নানাজানের সঙ্গে দেখা করতে যান। পাভেল যে এখন মামার সঙ্গে আছে এবং আজ রাতে তার বাসায় থাকবে সেটাই হয়ত তিনি নানাজানকে জানাতে গিয়েছিলেন। তা’না হলে রাতে সবাই দুশ্চিন্তা করবে। রেশাদ মামা কিছুক্ষণ পরে জটলা থেকে ফিরে এসে তাকে সংগে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দেন। নদীর বড় মাছ কেনা হয়েছে, বড় ভাগিনা পরদিন দুপুরে মাছের মুড়িঘণ্ট খেয়ে তবে নানাবাড়িতে ফিরবে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল! পাভেল খুশী মনে মামার সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে পড়ে। নানাবাড়ি থেকে সোজা দক্ষিণে এক মাইল গেলেই রায়গঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে পাকা রাস্তার পাশেই রেশাদ মামার বাড়ী। জায়গাটার নাম তেঁতুলতলা। রাস্তার পাশে বড় ডোবাটার ধারে সেখানে একটা তেঁতুলগাছ আছে বলেই হয়ত এই নাম। এর আগে মামার বাসায় দিনের আলোয় অনেকবার গেলেও এরকম ঘুটঘুটে অন্ধকারের রাতে এবারই প্রথম যাচ্ছে। হয়ত পাভেলের মনের অবস্থা খানিকটা আঁচ করেই মামা জিজ্ঞেস করেন, 

- কি রে ভাগিনা! ভয় করে?

পাভেল চুপচাপ বসে থাকে। রেশাদ মামা ভালো করেই জানেন তার ভয়-ডর একটু কম তবুও হয়ত কিছু একটা বলার খাতিরেই প্রশ্নটা করেন। পাভেল কোন উত্তর না দিয়ে বরং গত বছর নানাবাড়িতে এসে সে যে দুঃসাহসিক কাজটা করেছিল সেটাই সাইকেলের পিছনে বসে ভাবতে থাকে।

রায়গঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতালের উত্তর-পূর্ব কোণে বিশাল বট গাছটার নীচে একটা মর্গ আছে। সেখানে সর্বশেষ কবে লাশ কাটা হয়েছিল তা শুধু ছোটরা কেন মুরুব্বীরাও বলতে পারবেন না, তবে সেটাযে এখন পরিত্যক্ত তা দেখলেই বোঝা যায়। দীর্ঘদিনের অব্যবহারে শ্যাওলা পড়া দেয়ালের এখানে সেখানে থেকে চুন-প্লাস্টার খসে পড়েছে। মর্গের ছাদের কার্নিশ বেয়ে ছোট-বড় কয়েকটা পাকুর গাছ উঠে গেছে এবং সেগুলোর ঝুরিও মাটি ছুঁইছুঁই। কয়েক দশকের পুরনো দরজা-জানালার চৌকাঠ থেকে খসে পড়া সেগুনকাঠ শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে। মর্গের পনেরো-বিশ হাত দুরে সীমানা প্রাচীরের ইটগুলো কারা যেন খুলে নিয়ে গেছে, ফলে সেখানে বেশ বড় একটা ফোঁকরের সৃষ্টি হয়েছে। রাঙ্গালিবস গ্রামের লোকেরা অবশ্য স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হলে সেই ফোঁকর গলেই হাসপাতালে যাতায়াত করে থাকে। ফোঁকরের পরেই কাঁচারাস্তা লাগোয়া একসারি খেজুর গাছ। এই কাঁচা রাস্তাটা ধরেই রাঙ্গালিবস গ্রামের লোকজন সাইকেল, পায়ে হেঁটে বা গরুর গাড়িতে করে রায়গঞ্জে বাজার সদাই করতে আসে। দেয়ালের ফোঁকর বরাবর রাস্তার ওপাশেই বাঁশঝাড় ঘেঁষে একটা শিবমন্দির আর তারপরেই নদীটা বাঁক নিয়ে সোজা পূর্ব-দক্ষিণে চলে গেছে। প্রতিবারি নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে পাভেল তার বয়সী ছেলেদের কাছে শুনেছে মর্গের পাশে বট-পাকুরগাছে নাকি প্রায় রাতেই ভূতের আনাগোনা হয়। এমনকি বড়রাও তাই বিশ্বাস করেন। সেজন্য রাঙ্গালিবস গ্রাম থেকে যারা বাজার সদাই করতে আসে তারা সন্ধ্যার আগেই সব কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে যায়। আর যদি কারো দেরী হয়েই যায় তাহলে তারা লাঠিসোটা হাতে একসঙ্গে দল বেঁধে বাড়িতে ফেরে। কারণ অনেকেই ভূতগুলোকে রাস্তা পার হয়ে মন্দিরের দিকে যেতে দেখেছে। সেজো মামাটা, যিনি সুযোগ পেলেই রাজ্যের সব ভূতের গল্প ফেঁদে বসেন তারও একই মতামত। রাত গভীর হলেই সেখানে ভূত-পেত্নীর দল বটগাছের ডালে কিংবা মর্গের ছাদের কার্নিশে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। নাকি সুরে গান গায়। তাদের চলাফেরার সময়ে যে ঠক ঠক শব্দ হয় তা নাকি অনেকদূর অবধি শোনা যায়। কিন্তু পাভেল এসব গল্প বিশ্বাস করতে চায়না। সে বরং বাবাকে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন এগুলো মানুষের মনের ভুল ধারণা, পৃথিবীতে আসলে ভুত-পেত্নী বলে কিছুই নেই। শুধুমাত্র দুর্বলচিত্তের লোকজনই এসবে বিশ্বাস করে ইত্যাদি ইত্যাদি। পাভেল ঠিক করে মর্গের ভূত রহস্য তাকে উদ্ঘাটন করতেই হবে। সেজন্য সে একটা প্ল্যানও আঁটে কিন্তু একা এধরণের দুঃসাহসী কাজ করা সম্ভব না। সে রিপন মামাকে তার প্ল্যানটা খুলে বলে কিন্তু সব শুনে তিনি বেঁকে বসেন। এরপর লিটনকে বললে সে খানিকটা গররাজি হয়। তবে তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাজী করালে শেষে রিপন মামাও সম্মান বাঁচাতে দলে যোগ দেন।

প্রথমেই তারা ঠিক করে মর্গের কাছে রাস্তার ওপারে শিবমন্দিরের যে পুরোহিত আছে তাকেই জিজ্ঞেস করে কিছু তথ্য সংগ্রহ করবে। পুরোহিত মশাই বাঁশঝাড়ের ওখানেই ঘর তুলে থাকেন বলে তারা শুনেছে। তিনি হয়ত ভুতের আনাগোনা বা উপদ্রপের ব্যাপারে কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন। পরদিন সকালে তারা মন্দিরের উঠানেই তাকে পেয়ে যায়। শিব মন্দিরটা বেশী পুরনো নয়, হয়ত স্বাধীনতার পর পরই বানান হয়েছে। পাভেলদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি তেমন কিছু বলতে পারেন না। কারণ সন্ধ্যের পূজা সেরে তিনি নিজেই ভূতের ভয়ে বাণিয়াপল্লী চলে যান, সেখানেই তার ঘর। তবে তিনি সকালে এসে মন্দিরের মেঝে ঝাড় দেয়ার সময়ে প্রায়ই পায়ের হালকা ছাপ দেখতে পান। বাঁশঝাড়ের পাশে পুরোহিতের যে ঘরটা আছে সেটা একসময় হয়ত কেউ ব্যবহার করত কিন্তু এখন একটা পাগলী তার সঙ্গী কুকুরটা নিয়ে সেখানে ডেরা পেতেছে। যদিও কাজের কাজ তেমন কিছুই এগোয়না তবুও পাভেল হাল ছাড়েনা। সে রহস্য উদ্ঘাটন করেই ছাড়বে। সে ভাবে পাগলীটাও তো তাদের মতই মানুষ, তার যদি কোন ক্ষতি না হয় তাহলে তাদের ক্ষতি কেন হবে! যেহেতু ভূতের দল সাধারণত মর্গের দিক থেকে মন্দিরের দিকে যায় এবং মন্দিরের মেঝেতে তাদের পায়ের ছাপ দেখা গেছে তাই পাভেল মন্দিরের ভিতরে অবস্থান নিয়ে রহস্য উদ্ঘাটনের সিদ্ধান্ত নেয়।

পরদিন সন্ধ্যার আগে আগে কাউকে না জানিয়ে সে রিপন মামা, লিটন আর আছিরুদ্দিকে নিয়ে মন্দিরের এক কোণে কালো রঙের একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে লুকিয়ে পড়ে। নিরাপত্তার জন্য তারা সবাই হাতে একটা করে লাঠি আর টর্চ লাইট সঙ্গে নেয়, এসব আগেই জোগাড় করে রাখা হয়েছিল। আছিরুদ্দি অবশ্য তাদের সঙ্গে আসতে চায়নি, দল ভারী করার জন্য তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে। আছিরুদ্দি কার কাছ থেকে যেন শুনেছে ভূত লোহা এবং আগুন ভয় পায়। তাই সে বেশ বড় একটা লোহার ছুড়ি এবং ম্যাচ বাক্স সঙ্গে এনেছে, আর অবশ্যই বিড়ির প্যাকেট। পাভেল তাকে অবশ্য অনেকবার লুকিয়ে বিড়ি খেতে দেখেছে কিন্তু তাদের সামনে এবারই সে প্রথম বিড়ি ধরাবে বোঝা যাচ্ছে। মনে মনে রাগ হলেও অভিযানের স্বার্থে সে কিছু বলেনা, বিষয়টা নিয়ে বরং পরে ভাবা যাবে।

পুরোহিত তার মত করে পূজা অর্চনা সেরে চলে যান। তিনি সম্ভবত চোখে কম দেখেন এবং কানেও কম শোনেন। অবশ্য তার বয়স যে অনেক তা শরীরের ঢিলে চামড়া আর লঘু লয়ের চলাফেরা খেয়াল করলেই বোঝা যায়। তারা যে মন্দিরে ঘাপটি মেরে বসে আছে তা তিনি মোটেই ঠাহর করতে পারেননা। এমনিতে শিব মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা কম! মূলত পাড়ার বৌ-ঝিরাই এই মন্দিরে বেশী আসেন। মুক্তাখালাদের বয়সী ছেলেমেয়েরাও মাঝেমধ্যে আসে। তবে তারা অল্প বিস্তর উপকরণ দিয়েই পূজা সেরে নেয়। তাছাড়া পাভেল শুনেছে অনার্য দেবতা শিব নাকি অল্পতেই তুষ্ট হন, তাই বেল অথবা তুলসী পাতার সঙ্গে আতপ চাল, দুধ আর কিছু ফলমূল ও ফুল হলেই চলে। অনেক সময়ে ভক্তরা চলে যাবার পরে মন্দিরের মেঝেয় ফুল-ফল পড়ে থাকে। সেদিনও বেশ ক’টা কলা পড়েছিল মন্দিরের মেঝেতে। পুরোহিত মশাই চলে যেতেই আছিরুদ্দি সেগুলো কুড়িয়ে খাওয়ার লোভে উঠতে উদ্যত হয় কিন্তু পাভেলের ধমক খেয়ে সে আবারো কম্বলের ভিতরে ঢোকে।

চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মশার একটানা পুপু শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যায়না। পাগলীটা সেই কখন থেকে একটানা বিড়বিড় করে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার পোষা কুকুরটা কুঁইকুঁই করে ওঠে, এরপর আবার সব চুপচাপ। মানুষের আনাগোনা না থাকায় কীরকম জমাট নিস্তব্ধতা বিরাজ করে সেখানে। একটা লোক গলা ছেড়ে বেশ চীৎকার করে গান গাইতে গাইতে জোরে সাইকেল চালিয়ে যায়। হয়ত মাথা থেকে ভূতের ভয় তাড়ানোর জন্য সে এটা করে। পাভেলের হাসি পায় কিন্তু বাকীরা বেশ গম্ভীর, চুপচাপ। লিটন একটু পর পর বিরক্ত হয়ে মশা মারছে আর আছিরুদ্দি একটার পর একটা বিড়িতে আগুন দিচ্ছে। একঘেয়েভাব দূর করার জন্য রিপন মামা আছিরুদ্দির কাছ থেকে একটা বিড়ি চেয়ে নিয়ে আগুন ধরান। পাভেল অবাক হয়ে রিপন মামার দিকে তাকায়, মামা মুচকি হেসে ভাগ্নের দিকে বিড়িটা এগিয়ে দেন। নিজেকে আরও অবাক করে দিয়ে পাভেল নিজেও বিড়িতে টান দেয়, কিরকম তামাক পোড়া বিশ্রী গন্ধ আর ধোঁয়ায় ভরে যায় চারদিকটা। লিটনই বা বাদ যাবে কেন, সেও যোগ দেয় ধূমপানের উৎসবে। এভাবে তারা যখন অনভ্যস্ত হাতে বিড়ি ফুঁকতে ব্যস্ত তখন হঠাৎ পাগলীটার কুকুরের ঘেউ ঘেউ চীৎকারে তাদের চোখ, কান একটু সজাগ হয়। কুকুরের চীৎকার থেমে যেতেই তারা দেখে বারান্দার দিক থেকে হেলেদুলে বেশ কয়েকটা কালো মতন প্রাণী মন্দিরের ভিতরে ঢূকছে। তাদের উপস্থিতি প্রাণীগুলোও টের পায়নি বোঝা যায়। পাভেলদের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়, তারা এসব কি দেখছে! বাবাতো বলেছিলেন ভূত বলে কিছু নেই, কিন্তু এগুলো তাহলে কি? তাদের সবাই দাঁতে দাঁত চেপে চোখ মেলে দেখতে থাকে কি হতে যাচ্ছে। তারা উত্তেজনায় যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। একটা দুটো করে ছয় সাতটা প্রাণী এসে ঢোকে। সবকটার লেজ আছে। বিভিন্ন সাইজের সেগুলো, অন্ধকারেও বেশ বোঝা যায়। কোন কোনটি উচ্চতায় দুই কি আড়াই ফুট আবার একটা এক ফুটের মত হবে। সম্ভবত ওটা ভূতের বাচ্চা, বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে এসেছে। পাভেল চোখের সামনে এভাবে জলজ্যান্ত ভূত দেখে বুঝতে পারেনা সে কি করবে। সে ভাবে, তাহলে দেখছি রওনক মামার কথাই ঠিক, তবে এই দলে মুণ্ডু ছাড়া ভূত বা কবন্ধ নেই। পাভেলরা একে অপরের শরীরে চিমটি মেরে দেখে তারা জেগে আছে কিনা।

দলটার মধ্যে যেটাকে নেতা বলে মনেহচ্ছে সেটা ধীর পায়ে মন্দিরের মেঝেয় যেখানে কলা পড়ে আছে সেদিকে এগোচ্ছে। একটু আগেই হতচ্ছাড়া আছিরুদ্দিটার সেখানে যাবার কথা ছিল। কলা একেবারে মুখে পুরে দিয়ে প্রাণীটা তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। সম্ভবত বিড়ির উৎকট গন্ধ তার নাকেও ঢুকেছে। কলা খেকো ভূতের কথা পাভেল এর আগে শোনেনি, রওনক মামা হয়তো জানেন। পাভেল ভাবে, এখান থেকে উদ্ধার পেলে মামাকে জিজ্ঞেস করবে। ভূতের দলের বাকীরা কলা সাবারে ব্যস্ত থাকলেও নেতা গোছের ভূতটা দাঁত মুখ খিচে সোজা আছিরুদ্দির দিকে এগোয়। তাদের সামনে কি ধরণের বিপদ অপেক্ষা করছে তারা বুঝতে পারেনা। লিটন ভয়ে কম্বলের ভিতরে মাথা ঢুকিয়ে ফেলে। রিপন মামারও তার মতই চোখের পলক পড়ছে না। আছিরুদ্দি যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে, সেও তাকিয়ে আছে ভূতের নেতার দিকে। কিন্তু ওভাবে আসলে বেশীক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা যায়না, স্নায়ুর ওপর ভীষণ চাপের কারণেই হয়ত আছিরুদ্দি তার হাতে ধরে রাখা ছুড়িটা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পাভেল আর রিপন মামাও সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার করে টর্চ জ্বালায়। একসঙ্গে সবাইকে এভাবে অন্ধকার ফুঁড়ে লাফিয়ে উঠতে দেখে আর টর্চের আলোয় ভড়কে গিয়ে ভূতগুলো উল্টা ঘুরে দৌড় দেয়। হাতের লাঠি আর টর্চ নিয়ে পাভেলরাও সেগুলোর পিছু নেয়। হৈ হৈ শব্দে তাড়া করে। ওগুলো দৌড়ে রাস্তাটা পার হয়ে দেয়ালের ফোঁকর গলে মর্গের ছাদে-বটগাছের ডালে গিয়ে বসে। গাছের ডালের নীচে তাদের লম্বা লম্বা লেজগুলো ঝুলতে থাকে। পাভেল বুঝতে পারে ঘটনাটা আসলে কি ঘটেছে। ওগুলো আসলে ভূত না, ওগুলো হল হনুমান, কলা খেতে মন্দিরে ঢুকেছিল। পাভেল ছোটদের ‘বুক অব নলেজ’বইএ এরকম হনুমানের ছবি দেখেছে। তারা রাত না বাড়িয়ে বাসায় ফেরে। কাউকে বলে আসা হয়নি, বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।

বাসায় ফিরে দেখে উঠানের মাঝে জটলা, মায়ের মুখ থমথমে। রোমেল পাভেলকে দেখে খুশীতে চীৎকার করতেই মা ওকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। মামারা ঘুরে দাঁড়ান। ইতিমধ্যে একপ্রস্থ খোঁজাখুঁজি হয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছে, তারা আবার বেরোনোর তোড়জোড় করছিলেন। বড় মামা রেগে ধমক দিতে গেলে নানীআম্মা তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, 

- ভাইয়া, এভাবে না বলে কোথায় গিয়েছিলে? 

পাভেল অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবিস্তারে বর্ননা করে। সবাই হা করে গিলতে থাকে তাদের অভিযানের কাহিনী। রওনক মামাতো বিশ্বাস করতেই চান না। তাকে পরের দিন সকালে মন্দিরে গিয়ে প্রমাণ দেয়ার কথা বললে তিনি থেমে যান। রোমেল বড়ভাইয়ের বীরত্বের গল্প শুনে আনন্দে আটখানা হয়ে এরপর থেকে সেও সঙ্গী হবার বায়না ধরে। মা তাকে ধমক দিয়ে বলেন,

- থাক! তোমাকে আর বীর হতে হবেনা। তুমি মায়ের কাছেই থাকো। 

ছলছল চোখে রোমেলকে মায়ের আদেশ মেনে নিতে হয়। নানীআম্মা আর রাত না করে সবাইকে হাত-মুখ ধুয়ে রাতের খাবারের জন্য বসতে বলেন। লিটন খাওয়া সেরে মামার সঙ্গে তাদের বাড়িতে চলে যায়। ইতিমধ্যে নানাজানও দোকানে তালা মেরে ঘরে ফেরেন। নানীআম্মার অনুরোধে পাভেলকে শুরু থেকে আবারো গল্পটা বর্ননা করতে হয়। সবটা শুনে নানাজান ভীষণ খুশী হন। তিনি খেতে খেতে নাতীকে তার নিজের ছোটবেলার গল্প শোনান। রাতে বিছানায় শুতে না শুতেই মা জিজ্ঞেস করেন,

- এই তুই বিড়ি খেয়েছিস নাকি রে! তোর শরীর থেকে ওসবের গন্ধ আসছে কেন?

পাভেল উত্তর না দিয়ে ঘুমের ভান করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে ভাবে, মায়ের ঘ্রাণশক্তি কি ঐ হনুমানটার চেয়েও তীব্র!

পরদিন সকালে নাস্তা সারতে না সারতেই রেশাদ মামা লিটনসহ এলে পাভেল রওনক মামাসহ তার দলটাকে নিয়ে মন্দিরের ওখানে যায়। এলাকার আরও দু’একজন উৎসাহী লোকও তাদের সঙ্গে ভেড়ে। পাভেল তাদেরকে দেখিয়ে দেয় রাতে মন্দিরের কোন জায়গাটায় তারা ঘাপটি মেরে বসেছিল এবং হনুমানের দলটা কোন দিক থেকে কিভাবে ঢুকেছিল। পাভেলের কথা শুনে পুরোহিত মশাইয়ের চোখ তো ছানাবড়া! তিনি এতদিন ভেবেছিলেন এই মন্দিরের দেবতা জাগ্রত, ভোগ তার পেটেই যাচ্ছে। মন্দিরের মেঝেতে পাওয়া পায়ের ছাপের রহস্যটাও তার কাছে উম্মোচিত হয়। এরপর পাভেল সবাইকে যুক্তি দিয়ে বোঝায় যে, হনুমানগুলো তাদের লম্বা লেজ গাছের ডালের নীচে ঝুলিয়ে বসে থাকে বলে দূর থেকে সেগুলোকে দেখতে অনেকটা পায়ের মতই লাগে। হনুমানগুলো সম্ভবত মন্দির থেকে কলা চুরি করে গাছের ডালে বসেই খায়। তবে তারা সবাই নিশ্চিত যে ওগুলো এই তল্লাটের না। কারণ দিনের আলোয় কেউ সেখানে হনুমান দেখেছে বলে শোনা যায় না। হয়ত পাশের কোন গ্রাম বা জঙ্গল থেকে সন্ধ্যার পরে তারা মন্দিরের কলার লোভে সেখানে আসে। আর দীর্ঘদিনের অভ্যাসে সময় এবং রাস্তা তাদের অনেকটা পরিচিত হয়ে গেছে। রওনক মামা বলেন, 

- সে নাহয় বুঝলাম কিন্তু ওদের চলাফেরার সময় ঠকঠক করে যে শব্দ হয় সেটা তাহলে কি? 

পাভেল মর্গের দরজা-জানালার শুকনো কাঠের পাল্লাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে মর্গটা যেহেতু খোলা জায়গায় তাই নদীর দিক থেকে বা অন্য কোন দিক থেকে জোরে বাতাস বইলে কাঠের শুকনো পাল্লাগুলো দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ওরকম শব্দ হয়। এর কিছুটা বাস্তব আর বাকীটা মানুষের কল্পনা বা শব্দ বিভ্রম। আসলে নাকি গলায় কথা বলার ব্যাপারটাও তাই। এটাও গল্পের অতিরঞ্জন বা শব্দ বিভ্রম। অবশ্য মর্গের দেয়ালের ঘুলঘুলি দিয়ে জোরে বাতাস বইলেও একধরণের শো শো শব্দ হয়। হয়তবা সেটাকেই লোকজন অতিরঞ্জিত করে ওভাবে বর্ণনা করেছে। সবাই পাভেলের যুক্তি মেনে নেয়। আসলে তাদের মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় যে থাকেনা, কারণ সে রাতে পাভেলদের কাছে তাড়া খাবার পরে হনুমানগুলো আর এমুখো হয়নি।

সবাইকে তার মেধা, সাহস আর যুক্তি দিয়ে ঘায়েল করলেও পাভেলের কেবলি মনেহয় মর্গের ভূতের গল্পটা ছড়ানোর পিছনে কারো হাত বা অন্য কোন রহস্য আছে। কারণ এখানে স্রেফ তিলকে তাল বানানো হয়েছে এবং লোকজন ভালভাবে যাচাই না করেই গল্পটা বিশ্বাস করে বসে আছে। আসলে গ্রামগঞ্জে যেভাবে ভূত-পেত্নীর ভৌতিক গল্পের চর্চা হয় শহরে তো সেভাবে হয়না। শহরে বিদ্যুতের আলোয় বসে মানুষের সে সময় কোথায়। এ কারণে গ্রামে লোকজন ছোটবেলা থেকে ওসব গল্প শুনে শুনে একধরণের মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েই থাকে। এরফলে কেউ কোন গল্প ফাঁদলে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়না। পাভেলের ধারণা এই গল্পটা এভাবে ছড়ানোর পিছনে পাগলীটাই দায়ী। সেতো সারাদিন এ ঘর সে ঘরে ভিক্ষে করে বেড়ায়। তখনই হয়ত গল্পটা জনে জনে বলে বেড়িয়েছে। বাড়ির বৌ-ঝিরা কাজের অবসরে সে গল্প চর্চাকরে এবং আরও বেশী রঙ চড়িয়ে বাড়ির পুরুষদের বলেছে। আর সবাই এরকম গল্প বিশ্বাস করার জন্য তো তৈরি হয়েই আছে। কিন্তু পাগলীর উদ্দেশ্য কি হতে পারে? হয়ত পূজার জন্য ব্যবহৃত ফলমূল খাবার লোভে কিংবা ভূতের ভয়ে পুরোহিতের ছেড়ে যাওয়া নিরাপদ আশ্রয়টুকু দখলে রাখার বাসনায় সে একাজটি করেছে। হনুমান যেন পাগলীটার কোন ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য তার পোষা কুকুরটা তো সঙ্গেই রয়েছে। সবকিছু কেমন অংকের হিসাবের মত মিলে যাওয়াতে পাভেলের হাসি পায়। 

পাভেল হাসিটা মনেহয় জোরেই দিয়েছে তাই মামা জিজ্ঞেস করেন, 

- কিরে বাঁদর! একা একা হাসছিস ক্যান? কি হয়েছে?

মামার প্রশ্নে পাভেলের ভাবনার সুতো কেটে যায়, সে বাস্তবে ফিরে আসে। মামা হয়ত প্রথম প্রশ্নের জের ধরেই বলেন, 

- ভয় পাস না। শক্ত হয়ে বসে থাক। 

মামা ভয় না পাবার আশ্বাস দিয়ে ক্রিং ক্রিং বেলের শব্দে জোড়ে সাইকেলের প্যাডেল মারেন। নানাজানের দোকান থেকে ভেসে আসা বিবিসি’র সংবাদ পাঠকের ভরাট গলা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।                      



পোস্ট ভিউঃ 20

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমার শব্দযাত্রায় সঙ্গী হতে