পাভেলের নানাবাড়ি: পার্ট-৫

উপন্যাস পাভেলের নানাবাড়ি
পাভেলের নানাবাড়ি: পার্ট-৫

আজ সকাল থেকেই পাভেলের মনটা খারাপ হয়ে আছে। রংপুর থেকে টেলিগ্রাম এসেছে, বাবা সামনের সপ্তাহেই রায়গঞ্জে আসছেন অর্থাৎ পাভেলের স্কুল ছুটির রঙিন দিনগুলো শেষ হতে যাচ্ছে। আবারো শুরু হতে যাচ্ছে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়া আর টিচারদের বিরক্তিকর লেকচার শোনা, তারপর হোম ওয়ার্ক করা কিংবা রাত জেগে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দেয়া ইত্যাদি, এক কথায় একঘেয়ে জীবন। পাভেলের আসলে পড়াশুনা করতে ভাল লাগেনা, তার ভাল লাগে পাখীর মত বাধাহীন-নিয়ন্ত্রণহীন জীবন। বাবার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হতে যাচ্ছে, সেজন্য অবশ্য বেশ আনন্দও লাগে। বাবা রায়গঞ্জে এলে তার সঙ্গে এখানে সেখানে ঘুরতে যাওয়া এবং দোকান থেকে এটা সেটা কেনার আবদার করা যায়। বাবা নানাবাড়িতে এলে রেশাদ মামা অবশ্যই তার বাসায় দাওয়াত দিবেন। সেদিন মামার বাসায় পোলাও-কোর্মা এসব রান্না হয়। তারা সকালের দিকে যেয়ে সারাটা দিন মামার বাসায় কাটায়, এরপর রাতের খাবার খেয়ে তবে নানাবাড়িতে ফেরে। সারাটা দিন বেশ মজা হয়। পাভেল ভাবে, প্রতিটা দিনই যদি ওরকম আনন্দের হত! রংপুরে শিগগিরই ফিরতে হবে জেনে পাভেলের নানীআম্মারও মনখারাপ হয়ে যায়। তিনি পাভেলকে দিয়ে বাড়ির এখানে সেখানে বিভিন্ন রকমের ফলের গাছ লাগিয়ে নেন। নানীআম্মা বলেন, 

- ভাইয়া, তুমি বড় হলে দেখবে গাছটা কীরকম ফুলে-ফলে ভরে গেছে! 

পাভেল বলে,

- নানীআম্মা, আমি বড় হলে অনেক বড় একটা ফলের বাগান করব। নানা রকম ফল থাকবে সেখানে।

আনোয়ারা বেগম নাতীর কথা শুনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন। তিনি ভাবেন সে পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা। ছুটির শেষের দিনগুলোয় তিনি নাতীকে কাছ ছাড়া করেন না, এতে পাভেলের দুষ্টামির মাত্রাও কিছুটা কমে যায়। তিনি এটা সেটা বানিয়ে নাতীকে খাওয়ান। পাভেলের ভাল লাগে নানীর হাতে কুমড়া ফুলের বড়া কিংবা সজনে ফুলের ভর্তা। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে নানির মুখে যতিন্দ্র মোহন বাগচির লেখা- 

             বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, 

             মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?

             পুকুর ধারে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে 

             ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই-

             মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?

  

নানীর কন্ঠে অদ্ভুত সুন্দর এই ছড়াটা শুনে অচেনা কোন এক কাজলা দিদির জন্য পাভেলের বুকেও কেমন নিঃসীম শূন্যতা ধরণের অনুভূতি জাগে। এছাড়াও নানী যখন মদনমোহন তর্কালঙ্কারের নীতিবাক্যমূলক ছড়া কাটেন, এই যেমন- 

              সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,

              সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। 

              আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, 

              আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।

ছড়াগুলো শুনে পাভেলের ভাল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু দুষ্টামিগুলো সে যে কেন ছাড়তে পারেনা! না চাইলেও দুষ্টামির আইডিয়াগুলো সবসময় মাথায় এসে গিজগিজ করে। আচ্ছা অতো বড় আর কঠিন ছড়াগুলো নানী কি করে মনেরাখেন! তিনি কি সুন্দর করে আবৃতি করেন, পাভেল ভাবতেই অবাক হয়। কি দারুণ মুখস্ত বিদ্যা তাঁর! আর রান্নার ফাঁকে ফাঁকে নানীর বলা শোলক কিংবা ধাঁধাগুলো সবসময়ই পাভেলের কানে টুংটাং করে বাজে। এই যেমন,

               আমার মধ্যে আছ তুমি

              তোমার মধ্যে নাই

              আব্বার মধ্যে আছো তুমি 

              দিদির মধ্যে নাই। 

- বলত ভাইয়া, এর অর্থ কি!

পাভেল নাওয়া খাওয়া প্রায় বন্ধ করে ভাবতে থাকে কিন্তু তবুও ধাঁধার অর্থ উদ্ধার করতে পারেনা। অবশেষে সে হাল ছেড়ে দিলে নানীআম্মা ধাঁধার অর্থ বলে দিয়ে আরেকটা শোলক জিজ্ঞেস করেন,  

- একজন কবি একটা গ্রামের পথ ধরে যাচ্ছিলেন। যাবার পথে তিনি একটা বাড়ির উঠানে দেখলেন একটা মেয়ে একটা ছোট ছেলেকে গোসল করাচ্ছে। সে দৃশ্য দেখে কবির মনেহল ছোট ছেলেটি ঐ মেয়েটির সন্তান না। কিন্তু তাদের সম্পর্কটা ঠিক কি ধরণের তা জানতে কবির খুব কৌতূহল হওয়ায় তিনি কবিতার সুরে জিজ্ঞেস করেন, “সাজে না গো ছওয়ার মাও, কার ছওয়ার গা ধোয়াও?” মেয়েটিও খুব চালাক ছিল বলে কবিতার সুরে সেও জবাব দিল, ‘‘ছওয়ার বাপ যার শ্বশুর, তার বাপ আমার শ্বশুর, এবার তুমি বুঝে নাও।” বলত ভাইয়া তাদের মাঝে সম্পর্ক কি! 

পাভেল অনেক ভেবে এবারো হাল ছেড়ে দেয়। নানীআম্মা শোলকের উত্তর বলে দিলে পাভেল হেসে গড়িয়ে পড়ে। এভাবে নানীআম্মার সঙ্গে পাভেলের মজার সময় কাটে।

দু’তিন দিন পরের এক বিকালে বাবা তাদেরকে নিতে রায়গঞ্জে আসেন। পাভেল তখন বাসায় ছিল না। সে এবং রিপন মামা খেজুরের গুঁড়ের খোঁজে রওনক মামার সঙ্গে সাইকেলে রাঙ্গালিবস গ্রামে গিয়েছিল। ঐ গ্রামে প্রচুর খেজুর গাছ থাকায় গ্রামের লোকেরা শীতকালে খেজুরের রস দিয়ে গুঁড় বানায় এবং সারা বছর জুড়ে তা বিক্রি করে। সাইকেল রওনক মামাই চালাচ্ছেন, পাভেল সাইকেলের সামনের রডে বসেছে আর রিপন মামা পিছনের ক্যারিয়ারে। হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে খেজুর গাছের সারিটা দেখে পাভেল হাসতে থাকে, রিপন মামাও সে হাসিতে যোগ দেন। তাদের দু’জনকে ওভাবে হঠাৎ হাসতে দেখে রওনক মামা একইসঙ্গে অবাক ও কৌতূহলী হন। তিনি হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে একবার রিপন মামাসহ কিভাবে খেজুরের রস চুরি করে খেয়ে খালি হাড়িতে নদীর পানি ভরে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছিল পাভেল সেই গল্পটা সবিস্তারে বর্ণনা করে। সেদিন একসঙ্গে ঢকঢক করে বেশ কয়েক গ্লাস পরিমাণ খেজুরের রস খাওয়ায় কিভাবে পেটের ব্যাথায় তারা কাতর হয়েছিল রিপন মামা তাও খুলে বলেন। ওদের এসব কাণ্ডকারখানা শুনে রওনক মামা বেশ মজা পান। সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় ফিরলে বাবার সঙ্গে পাভেলের দেখা হয়। সাইফ সাহেব তখন বারান্দায় কাঠের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছেন। পাভেল আহ্লাদে আটখানা হয়ে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। তিনা তখন সদ্য হাতে পাওয়া পুতুলটা নিয়ে খেলায় ব্যস্ত। রোমেল রান্না ঘরে মায়ের পাশে ঘুরঘুর করছে। মা তখন বাবার জন্য রান্নায় ব্যস্ত। আছিরুদ্দি তাকে এটা সেটা এগিয়ে দিয়ে রান্নায় সাহায্য করছে। এরিমধ্যে রোমেল কোত্থেকে যেন পাটকাঠির একটা টুকরা এনে তাতে আগুন ধরিয়ে সিগারেট খাওয়ার মত করে ফুঁকছে। ছোট ভাইকে পাটকাঠি সিগারেটের মত করে ফুঁকতে দেখে পাভেল রাগ করে সেটা টান দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলে রোমেল চীৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। মা রান্না ফেলে এদিকে এসে সবটা শুনে বলেন, 

- বড় ভাই যে পথে যাবে ছোটোটাও তো সে পথেই হাঁটবে। তুমি বিড়ি ফুঁকতে শুরু করেছ কাজেই তোমার ভাইও তো তাই করবে। শুধু শুধুই ওকে বকছো কেন?

পাভেল মায়ের কথার প্রতিবাদ করে জানায় যে সে বিড়ি খায় না। কিন্তু মা তার কথা মানতে নারাজ, তিনি বলেন, 

- ওভাবে মিথ্যা কথা বলতে এসো না। তুমি আজকাল বেশ মিথ্যা কথা বলতে শিখে গেছ। 

পাভেল এবার বুঝতে পারে, আছিরুদ্দি বিশ্বাসঘাতকটা সব ফাস করে দিয়েছে। পাভেল চোখ রাঙিয়ে আছিরুদ্দির দিকে তাকালে সে মাথা নিচু করে পেঁয়াজ কুটতে থাকে। পাভেল মনেমনে ঠিক করে অন্য কোন এক সময়ে আছিরুদ্দিকে একা পেলে চরম একটা শিক্ষা দিতেই হবে।

পরদিন সকালে সবাই সাজগোজ করে রেশাদ মামার বাসায় যায়। দুপুরে ভোজন পর্ব শেষে ঘরের দাওয়ায় বাবা আর রেশাদ মামা খোশ গল্প আর হাসি ঠাট্টায় ব্যস্ত। পাভেল, রোমেল আর লিটন তেঁতুলতলার মাঠে ফড়িঙ ধরে তার লেজে সুতা বেঁধে বাতাসে ছেড়ে দিয়ে সেগুলোর পিছু পিছু দৌড়াদৌড়ি করছে। কিছুক্ষণ পরে রিপন মামা সাইকেল নিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হয়। বেশ জোরে প্যাডেল মেরে আসায় মামা খানিকক্ষণ কথাই বলতে পারছিলেন না। তবে তিনি উত্তেজনার বশে হড়হড় করে যেটা বললেন সেটার মানে দাড়ায় রাহাত মামা বিয়ে করে নতুন বউসহ রংপুর থেকে এসেছেন। কিন্তু নানাজানের আদেশ তিনি বউ নিয়ে ঘরে ঢুকতে পারবেন না। মামার কথা শুনে পাভেল বেশ অবাক হয়। নিজের মামার বিয়ে হল আর নানাবাড়ির কেউ জানল না তা কি করে হয়! খবরটায় শুধু ছোটরা না বড়রাও অবাক হন। নানাবাড়ির পরিস্থিতি এমুহুর্তে খুব গরম, নানীআম্মা জামিল সাহেবকে ঠান্ডা করার জন্য বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাই সবাই তড়িঘড়ি নানাবাড়িতে ফেরে। পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বাবার অনুরোধে রেশাদ মামাও সঙ্গে আসেন। পাভেল রাহাত মামাকে পূর্বের ঘরের বারান্দায় বসে থাকতে দেখে। তার পাশেই শাড়ি পড়া একজন মহিলা মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে মাথা নিচু করে বসে আছেন। পাভেল আন্দাজ করে উনিই তার মেজো মামী। নানাজান ঘরে ঢুকতে নিষেধ করায় মামা-মামীর ব্যাগ-স্যুটকেস তখনও ঘরের আঙিনায় পড়ে আছে। সেগুলো ঘরে নিতে কারো সাহসে কুলাচ্ছে না, জামিল সাহেবকে কেউ আজকের মত এতো বেশী রাগ করতে দেখেনি। এ অবস্থায় বিষয়টার সুরাহা করতে বাবা রেশাদ মামাকে সাথে নিয়ে নানাজানের সঙ্গে আলাপ করতে দোকানে যান।

শুরুতে দোকান থেকে নানাজানের উত্তেজনাপূর্ণ গলার স্বর শোনা গেলেও ধীরে ধীরে তা স্তিমিত হয়ে আসে। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে মামা আর বাবা কথা বলতে বলতে পশ্চিমের ঘরের বারান্দায় এসে সেখানে পাতা চেয়ারে বসে পড়েন। বাবার হাসি মুখ দেখেই বোঝা তিনি সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন। পাভেলের অবশ্য আগে থেকেই ধারণা ছিল বাবা নানাজানকে সামলাতে পারবেন। নানাজান তাঁর বড় জামাইকে খুব স্নেহ করেন তাই তার কথা তিনি ফেলতে পারবেন না। সবার বুক থেকে একটা ভারী পাথর সরে যায় যেন। হঠাৎ করেই গুমোট পরিবেশটা কোথায় মিলিয়ে যায়। পাভেল জানে, সবচেয়ে খুশী হয়েছেন নানীআম্মা। বাবা রাহাত মামা আর নতুন মামীর সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করেন, পাভেল সেসবের অর্থ ধরতে পারেনা। তবে পরিবেশটা হালকা হওয়ায় সবার মত সেও খুশী। মুক্তা খালার করুণ মুখচ্ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠেই আবারো মিলিয়ে যায়। পাভেল এদিক সেদিকে তাকিয়ে খালাকে খোঁজে কিন্তু তাকে কোথাও চোখে পড়েনা। পাভেল জানেনা খালার জন্য কেন তার খারাপ লাগে। পাভেল পরে অবশ্য রিপন মামার কাছে শুনেছে যে, রাহাত মামা যখন বাড়িতে ঢোকেন তখন মুক্তা খালা তাঁর মা সহ এ বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু মামাকে বউসহ দেখে খালা সেই যে ছুটে পালালেন, তিনি আর এ বাড়ি মুখো হননি। সফুরা নানীকেও আশেপাশে দেখা যায়না। তবে মুক্তা খালার বাড়ি থেকে কারো চাপা কণ্ঠে কান্নার শব্দ পাভেল ঠিকই শুনতে পায়। সে জানেনা কান্নার সে শব্দ রাহাত মামা কিংবা নানীআম্মার কান অবধি পৌঁছায় কিনা! নানীআম্মার কানে হয়তো পৌঁছায় কিন্তু তিনি কারো কাছে ধরা দেন না। ছেলে যেভাবেই বিয়ে করুক না কেন তিনি ছেলের উপরে বেজায় খুশী। তিনি মুক্তা খালাকে যে ছেলের বউ হিসাবে কখনো মেনে নিতে পারতেন না তা পাভেলের চেয়ে কে বেশী জানে! মুক্তা খালার মত এতো ভাল মেয়ে কেন যে এপথে পা বাড়ালো! বড় হলে সে কখনো লাইন করবেনা। লাইন করা আসলেই ভীষণ খারাপ। রাহাত মামার ওপর পাভেলের ভীষণ অভিমান হয়। সে ঠিক করে সে আর কখনো রাহাত মামার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবেনা, এমনকি মামা কিছু কিনে দিলেও সে তা নিবে না। সে রাতে ছোট পরিসরে হলেও বউকে ঘরে নেবার আনুষ্ঠানিকতা সারতে রাত বেশ গভীর হয়ে যায়। ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে পাভেল রাতে ঠিক মত খেতেও পারেনি। পুবের ঘরটা রাহাত মামা-মামীর জন্য ছেড়ে দেয়া হলে রওনক মামার উদ্বাস্তু দশা হয়। তিনি রেশাদ মামার সঙ্গে তাদের বাড়িতে শুতে যান।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে বারান্দায় দাড়িয়ে পাভেল অবাক হয়ে যায়। উঠোন ভর্তি মানুষ গিজ গিজ করছে। মনেহচ্ছে বাজার ভেঙ্গে মানুষের ঢল নেমেছে নানাবাড়িতে। পুলিশের পোশাক পড়া লোকও দেখা যায়। তারা সম্ভবত নাগেশ্বরী থানা থেকে এসেছে। রিপন মামা কানের কাছে এসে ফিসফিস করে মুক্তা খালার আত্মহত্যা করার তথ্য দেন। পাভেলতো খবরটা শুনে অবাক! সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মামার দিকে তাকায়। এটা কি করে সম্ভব! এটা হতেই পারেনা। সে আসলে খালার মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারেনা। পাভেল দৌরে সফুরা নানীর বাসায় যায়, তিনি তখন রান্নার চুলার পাশে বসে বিলাপ করছেন আর বুক চাপড়ে কাঁদছেন। তিনি মেয়ের মৃত্যুর জন্য লতিফ সাহেবকে দায়ী করেন। ভারত থেকে এপারে না এলে তাকে মেয়েটাকে হারাতে হত না। তিনি অনেকবারই ফিরে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু স্বামীর অনিচ্ছার কারণে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতা যুদ্ধের পরেও তিনি এপারে ফিরে আসতে চাননি। পাভেল সফুরা নানীর কান্না আর বিলাপ বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারেনা। তার দুচোখ ভরেও পানি চলে আসে। পাভেল খালাকে কতটা ভালবাসত তা নিজেও বোধহয় জানত না। বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সে চাইলেও খালার মায়াবী সুন্দর মুখটা আর দেখতে পারবেনা এটা মেনে নিতে ভীষণ কষ্ট হয়। রিপন মামার কাছে জানতে পারে বাড়ির পাশে বড় আমগাছের সঙ্গে খালার মৃতদেহ ঝুলে ছিল, তার পড়নে ছিল ফিরোজা রঙের শাড়ি। সম্ভবত শেষ রাতের দিকে আত্মহত্যার ঘটনাটা ঘটেছে। অতো ভোরে ওখানে যেতে খালার এতোটুকুও ভয় ডর লাগলো না! খালা তো ভীতু স্বভাবের ছিলেন, পাভেল অবাক হয়। ঐ আমগাছটার মগডালে কতদিন সে গল্পের বই পড়ে কাটিয়েছে। বইগুলো খালার কাছ থেকেই নেয়া। শেষবার খালার কাছ থেকে বঙ্কিমের লেখা ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বইটা নিয়ে পড়েছিল। আম গাছের নিচু ডালটার সঙ্গে রশির কাটা অংশ তখনো ঝুলে আছে। সম্ভবত রশি কেটে খালার মৃতদেহ নামানো হয়েছে। আর কেউ না জানলেও পাভেল জানে মৃত্যুর সময়ে খালার পড়নের শাড়িটা রাহাত মামার দেয়া।

বোধহয় অনেকদিন পরে রায়গঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মর্গটায় ডোমের আগমন ঘটেছে। ডোমকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার ময়নাতদন্ত করতে ব্যস্ত। মর্গের বাইরে পুলিশের কয়েকজন সেপাই নির্বিকার ভঙ্গীতে দাড়িয়ে আছে। তারা চাকুরীর খাতিরে এসব অহরহ দেখে অভ্যস্ত বলে মনেহয়। জামিল সাহেব অর্থাৎ পাভেলের নানাজান রংপুর মেডিক্যাল কলেজে লাশ পাঠাতে চাননি। মেয়ে আত্মহত্যা করেছে, যে যাবার সেতো চলেই গেছে এখন অযথা তার শরীর কাটাছেড়া করে কি লাভ! তাড়াতাড়ি দাফনের কাজটা সেরে ফেলাই এখন অনেক জরুরী। কিন্তু পুলিশ সামান্যতম হলেও রিপোর্ট লেখার জন্য অতটুকু করতে অনুরোধ করে। থানায় কেস ফাইল করতে প্রয়োজন হবে। লতিফ সাহেব নির্বাক হয়ে শোবার ঘরের বারান্দায় বসে আছেন। খরচপাতি যেটুকু করার নানাজানই করছেন। এছাড়া দৌড়াদৌড়ি এটাসেটা ম্যানেজ করার দায়িত্ব রেশাদ মামা তাঁর কাঁধেই তুলে নিয়েছেন। রওনক মামা ব্যস্ত জানাজা আর খালার মৃতদেহ দাফন করার আয়োজনে। রাহাত মামাকে কোথাও দেখা যায়না। পুলিশ অবশ্য একবার মামার বিয়ের সঙ্গে মুক্তা খালার আত্মহত্যার কোন সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলতে পারেনা বলে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তাকে জানানো, রাহাত মামা নিজেও অস্বীকার করেন। আর তাছাড়া খালাও কাউকে দায়ী করে কিছু লিখে যান নি। কিছুটা হয়ত সফুরা নানী বলতে পারতেন কিন্তু তাতো শুধু তার অনুমান মাত্র! শুধু অনুমানের ওপর ভর করে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যায়না। তাতে শুধু বিপদই বাড়ে। পাভেলরা বয়সে এত ছোট যে পুলিশ তাদেরকে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন অনুভব করেনা। তাছাড়া পাভেল খালার মত নানীআম্মাকেও ভীষণ ভালবাসে। সে আন্দাজ করতে পারে, রাহাত মামার সঙ্গে মুক্তা খালার সম্পর্কের ব্যাপারে পুলিশকে কিছু বলতে গেলে সেটার ফলাফল কতদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে, আর তাতে নানীআম্মাও ভীষণ কষ্ট পাবেন। পাভেলের বুক উথলে হুহু করে কান্না বেরিয়ে আসে। রাহাত মামার উপরে তার প্রচণ্ড রাগ হয়, সে জানে সে মামাকে কোনদিনও ক্ষমা করবে না।

সফুরা নানী ইদানীং একদম নির্বাক হয়ে গেছেন। এ বাড়িতে আসা-যাওয়া বলতে গেলে ছেড়ে দিয়েছেন, নানিআম্মাও তাকে আগের মত তেমন একটা ডাকেন না। পাভেলকে দেখলেও আর বকা দেন না। অবশ্য পাভেল নিজেও তাকে জ্বালানো বা বিরক্ত করা ছেড়ে দিয়েছে। মুক্তা খালার চল্লিশা পর্যন্ত পাভেলদের রায়গঞ্জে থাকা সম্ভব হয়না। পাভেলের স্কুল খোলার সময় হয়েছে। বাবার ছুটিও শেষ। পিছনে লাল-নীল, সাদা-কাল অসংখ্য স্মৃতি আর নানীআম্মার চোখ ভরা জল রেখে এক কাকাডাকা ভোরে পাভেল বাবা-মা’র সঙ্গে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। আর সেই সঙ্গে আরেকটা গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হয়। সে জানে না পরের বারে কি ঘটবে!                                           



পোস্ট ভিউঃ 20

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমার শব্দযাত্রায় সঙ্গী হতে