১
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা বা জেনোসাইড আজও দেশের ইতিহাসে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মীমাংসার অপেক্ষায় থাকা অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যাটি সরকারিভাবে স্বীকৃত এবং এটি বাঙালি জাতির বিশাল আত্মত্যাগ এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে এই ব্যাপক হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা এখনো সম্পূর্ণ সফল হয়নি, যা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। রুয়ান্ডার কিগালিতে অবস্থিত জেনোসাইড মিউজিয়ামে ১৯৭১ সালের ঘটনার অনুপস্থিতি যেমন একজন দর্শক হিসেবে আমাকে বিস্মিত করেছিল, তেমনি তা জাতিসংঘের স্বীকৃতি না থাকার কঠিন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।
জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি না দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু জটিল কারণ বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্পর্শকাতরতা, যেখানে পাকিস্তান এখনো ১৯৭১ সালের ঘটনাবলিকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ এবং তাদের সাথে বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক। পাশাপাশি আইনি ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যার সংজ্ঞায় ঘটনাটি পড়ে কিনা, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। এই সংজ্ঞার মূল দিকটি হলো একটি নির্দিষ্ট জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক ও জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অভাবও এই স্বীকৃতি না পাওয়ার অন্যতম কারণ। যদিও লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন ২০২১ সালে এটিকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সিলমোহর এখনো অধরা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে ৩০ লাখ শহিদ সংখ্যাটির বিশ্বাসযোগ্য ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উপস্থাপনা। এই ঐতিহাসিক বিতর্ক মীমাংসার জন্য প্রয়োজন আবেগ বিবর্জিত এবং যুক্তিনির্ভর একদল নিবেদিতপ্রাণ গবেষকের নিরলস প্রচেষ্টা, যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিগুলোকে আস্থায় নিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করবে।
২
পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক উইলিয়াম ড্রামন্ড-এর ৬ জুন ১৯৭২ তারিখে দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে শহিদের সংখ্যা ২,০০০ জন উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ২,০০০ জন সংখ্যাটা এসেছে আসলে একটি নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তরে (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়) জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে, যা মোট হতাহতের সংখ্যাকে প্রতিফলিত করে না। আমরা জানি, ২০ মে ১৯৭১ তারিখে শুধুমাত্র খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে সংঘটিত গণহত্যায় বিভিন্ন ইতিহাসবিদ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সূত্রমতে, প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার নিরীহ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। এটি ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধকালে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। শহিদের সংখ্যা প্রসঙ্গে পিনাকী ভট্টাচার্য তার ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ’ প্রথম খণ্ড বইয়ের পৃষ্ঠা ৭২ থেকে ৭৫-তে কী লিখেছেন সেটা দেখা যাক,
‘লন্ডন থেকে শেখ মুজিবুর রহমান টেলিফোনে কথা বলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। লন্ডনে তিনি এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন। হিথ্রো বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামার পর প্রথম কথা হয় ‘বিবিসি-ওয়ার্ল্ড সার্ভিস’-এর পূর্ব পাকিস্তান বিভাগের সিরাজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বিবিসি’তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধবিষয়ক সংবাদসমূহের আন্তর্জাতিক পরিবেশনার সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি উচ্ছ্বসিতভাবে শেখ মুজিবকে বলে উঠলেন-
-আপনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।
-আমি আবার কিসের প্রেসিডেন্ট হলাম?
-আপনি তো দেশে ছিলেন না মুজিব ভাই, আপনার নামে আমরা গোটা দেশকে একত্র করে ফেলেছি। আমরা দেশ স্বাধীন করে ফেলেছি।
শেখ মুজিব গভীর আবেগে সিরাজুর রহমানকে জড়িয়ে ধরলেন। জড়িয়ে ধরে হুহু করে কাঁদতে শুরু করলেন। দু’জনেই কাঁদছেন। এর মধ্যে আরো অনেকেই এলেন, জাকারিয়া খান চৌধুরী, প্রফেসর সুরাইয়া আলম প্রমুখ। সবাই ধীরে-সুস্থে তাঁর পাশে বসলেন। গল্পগুজব করতে করতে শেখ মুজিব বললেন যে, মুক্তিযুদ্ধ হলো, কিন্তু কীভাবে হলো? কীভাবে হলো সেটা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো। তিনি জানতে চাইলেন, কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়ার পর শেখ মুজিব হতবাক! বললেন-
-তুই তো ভয়াবহ কথা বলছিস। কত লোক মারা গেছেরে?
-কত লোক মারা গেছে কেউ তো হিসাব করেনি। তবে বিভিন্ন মিডিয়া থেকে, বিদেশি সংবাদপত্রের যে সাংবাদিকরা যাচ্ছেন, ভারতীয় সাংবাদিকরা খবর দিচ্ছেন-সব মিলিয়ে আবু সাঈদ চৌধুরীকেও আমরা বলেছি, সাংবাদিকদেরও বলেছি, এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশী মারা গেছে। ………………
…………………………………………’
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাথে এক টিভি ইন্টারভিউয়ে তিনি প্রথম ‘ত্রিশ লাখ’ শহিদের কথা উল্লেখ করেন। এরপর থেকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের উপর প্রাপ্ত সব বাংলা ও ইংরেজি প্রকাশনায় ৩০ লাখ শহিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে কোন প্রকার জরিপ বা কোন নিয়মতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশ ছাড়াই। মার্কিন গবেষক রিচার্ড সিসন এবং লিও ই রোজ রচিত ‘War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh’ বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “৩০ লাখ শহিদের সংখ্যাটি ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল, যার কোনো সুনির্দিষ্ট জরিপ বা পদ্ধতিগত হিসাব-নিকাশ ছিল না।” সিসন ও রোজ মূলত কূটনৈতিক এবং নীতিনির্ধারণী স্তরের উপর ভিত্তি করে এই গবেষণাটি করেছিলেন। তারা সেই সময়ের মূল ব্যক্তি যেমন ইন্দিরা গান্ধী, ইয়াহিয়া খান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং বিভিন্ন দলিলপত্র ঘেঁটে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
৩
শহিদের সংখ্যা, একটা অমীমাংসিত অধ্যায়।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে পাকিস্তানের কারাগার থেকে দিল্লী হয়ে ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিব রেসকোর্সের ভাষণে শহিদের সংখ্যা ‘ত্রিশ লাখ’ বলেছিলেন। তবে তাকে শহিদের এই সংখ্যাটা কে এবং কীসের ভিত্তিতে বলেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। তিনি সেদিন বলেন, ‘আমার বাংলায় আজ এক বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লক্ষ লোক মারা গেছে।’ পরদিন, ১১ জানুয়ারি তারিখে দি টাইম পত্রিকায় পিটার হেজেলহার্ষ্ট-এর প্রতিবেদনে তা ছাপা হয়।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ তারিখে শেখ মুজিব জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেখানে শহীদদের সংখ্যা ‘৩০ লাখ’ নয়, ‘লক্ষ লক্ষ’ উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানেও ‘ত্রিশ লাখ শহীদ’ না বলে ‘বীর শহীদগণ’ বলা হয়েছে। এভাবে শহিদের সংখ্যা নিয়ে এদেশে বিতর্ক দীর্ঘদিনের এবং এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বিষয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে বিভিন্ন সংখ্যা উঠে আসা এবং শেখ মুজিবের বক্তব্যেও সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন সংখ্যার উল্লেখ এই বিতর্ককে জটিল করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, শুরুর দিকের সংখ্যাটা ‘লক্ষ লক্ষ’ বলে উচ্চারিত হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে পৌঁছানোর পর এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব শহীদের সংখ্যা ‘লক্ষ লক্ষ’ (millions) বলেছিলেন। আবার লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাংবাদিক আয়ান জ্যাক এই বিষয়ে তার লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, শেখ মুজিব ৩০ লাখ সংখ্যাটি সরাসরি বলেননি। তাহলে ‘৩০ লাখ’ সংখ্যাটির উৎপত্তি কোথায়?
একটি সূত্রের মতে, ‘৩০ লাখ’ সংখ্যাটি পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের একটি হুমকির ওপর ভিত্তি করে এসেছে। ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করবেন।’, পরবর্তীতে কিছু গবেষক ও সংবাদ মাধ্যম এই সংখ্যাটি ব্যবহার করা শুরু করে। সিসন ও রোজ লিখেছেন, ‘ভারত পূর্ব পাকিস্তানে পাক সেনাবাহিনীর বর্বরতা নিয়ে সুস্পষ্টভাবে একটি ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করে যেখানে তারা দেখতে পায় যে বিদেশি সংবাদ মাধ্যম কোনরূপ যাচাই বাছাই ছাড়াই ঢাকার বর্বরতার গল্পগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করার ফাঁদে পড়েছে ও অনেকখানি ফুলিয়ে ফাপিয়ে অব্যাহতভাবে প্রচারও করেছে।’ সিসন ও রোজ-এর তথ্য মোতাবেক ‘৩০ লাখ’ সংখ্যা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেও প্রচারিত পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সাল থেকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অনুষদের অ্যাডজাঙ্কট অধ্যাপক ও সিনিয়র রিসার্চ স্কলার ডক্টর রওনক জাহান ১৯৭২ সালে ‘Pakistan: Failure in National Integration’ নামে একটা বই লিখেছেন। তিনি বইটিতে পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করেছেন। পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবোধের উপর গবেষণায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রামে এক থেকে তিন মিলিয়ন লোক নিহত হয়েছে।’ অথচ তিনি এই সংখ্যাটা কোথা থেকে পেয়েছেন তার কোন উৎসের নাম উল্লেখ করেননি। সামান্থা পাওয়ার তার পুলিৎজার বিজয়ী গ্রন্থ ‘এ প্রবলেম ফ্রম হেল: আমেরিকা এন্ড দি এজ অভ জেনোসাইড’ বইয়ে দাবি করেছেন, ‘১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আরম্ভ করে … পাকিস্তান সেনাবাহিনি দশ থেকে ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যা করেছে।’ তবে তার এই দাবির সপক্ষে তিনি কোনো সূত্র বা উৎসের নাম উল্লেখ করতে পারেননি।
‘দ্য লাস্ট ডেজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান’ বইয়ের লেখক জি. ডব্লিউ. চৌধুরী (গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী) ছিলেন একজন বাঙালি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং কূটনীতিক। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বইটিতে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ঘটনাবলী তিনি নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছেন। তিনি স্বাধীনতার পর বিদেশে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং কলম্বিয়া ও ডিউক ইউনিভার্সিটির মতো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ঐ সময়ের বাংলাদেশি সংবাদপত্র ও সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনের রেফারেন্স দিয়ে তিনি উপ-পুলিশ প্রধান আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের একটা তদন্ত কমিটির কথা বলেছেন। এই কমিটিকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭২ তারিখের মধ্যে তাদের রিপোর্ট সাবমিট করতে বলা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, শেখ মুজিব কমিটিকে তার দলীয় কর্মী ও সংসদ সদস্যদের হতাহতের সংখ্যা নথিভুক্ত করার জন্য এবং মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। তার মতে, তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে যে নির্দেশনা পাওয়া যায় তাতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে প্রায় ৫০,০০০ জন শহিদ হয়েছেন বলে ধরে নেয়া যায়। এটাই হয়তো সর্বমোট হতাহতের সংখ্যা যার মধ্যে উভয়পক্ষের নিহতসহ মৃত শরণার্থীদেরও ধরা হয়েছিল। বিতর্কটা হয়তো সেভাবেই শেষ হতে পারতো কিন্তু শেখ মুজিব ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য থেকে বের হয়ে প্রকৃত সত্য উম্মোচন করতে চাননি বলেই প্রতীয়মান হয়। আর তাই এই বিতর্ক আমাদের টেনে এনেছে অনেকটা পথ, যার সুরাহা এখনও হয়নি।
৪
বিতর্কের কয়েকটি সূত্র।
৪ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘প্রাভদা’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যার একটি তথ্য ছিল। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩ মিলিয়ন (৩০ লাখ) মানুষ নিহত হয়েছে। পরবর্তীতে ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ‘অবজারভার’ এবং দৈনিক ‘আজাদ’ পত্রিকা প্রাভদার এই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে ৩০ লাখ শহিদের খবর প্রকাশ করে। সংখ্যাটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, প্রাভদার প্রতিবেদন শহিদের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ বলে মনে করা হয়। ‘প্রাভদা’ পত্রিকার রিপোর্টে ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যার সূত্র সম্পর্কে সরাসরি কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও লেখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘৩০ লাখ’ সংখ্যার উৎপত্তি নিয়ে তিনটি সম্ভাব্যতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে,
ক। প্রথমটি হলো ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার প্রতিবেদন। কিছু সূত্রের দাবি অনুযায়ী ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকা প্রথমবার ৩০ লাখ শহিদের খবর প্রকাশ করে, এবং এর ১৩দিন পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘প্রাভদা’ পত্রিকা একই খবর প্রকাশ করে, যার সূত্র হিসেবে “বিশেষ প্রতিনিধি” উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকা এই সংখ্যাটা কোথা থেকে পেল? এবিষয়ে অনেকে ইয়াহিয়া খানের বিখ্যাত উক্তির কথা বলেন।
খ। দ্বিতীয় প্রচলিত ধারণা হলো, ৩০ লাখ সংখ্যাটি পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বিখ্যাত উক্তি বা হুমকির ওপর ভিত্তি করে এসেছে। ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করতে পারেন। এই সংখ্যাটি পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গবেষকরা ব্যবহার করা শুরু করেন বলে জানা যায়।
গ। তৃতীয় ধারণা, যেটা বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব সৈয়দ এ. করিম তার ‘শেখ মুজিব: ট্রায়াম্ফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ডেভিড ফ্রস্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে ৩০ লাখ সংখ্যাটি উচ্চারিত হয়েছিল। তিনি সম্ভবত পাকিস্তানের কারাগার থেকে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে ভারতীয় সূত্র থেকে এই তথ্য পেয়েছিলেন। সিসন ও রোজ-এর তথ্য মোতাবেক ভারতীয় মহল লক্ষ্য করেছে যে বিদেশি সংবাদ মাধ্যম কোনরূপ যাচাই বাছাই ছাড়াই তাদের সরবরাহ করা ঢাকার বর্বরতার গল্পগুলো সত্য বলে মেনে নিয়েছে। কেননা সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে বাংলাদেশের ভিতরে কোন ধরণের জরিপ চালানোর সুযোগ ছিল না। ‘৩০ লাখ’ শহিদের সংখ্যা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান করে নিলেও এর উৎস ও প্রচলন নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। কোনো একটি একক সূত্রকে এর একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তবে শহিদের সংখ্যা নিয়ে প্রচুর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা হয়েছে, যেমন-
(১) ‘কম্পটনস এনসাইক্লোপিডিয়া’ একটি সুপরিচিত বিশ্বকোষ এবং এটি তার নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য পরিচিত। এই বিশ্বকোষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার শিকার ৩০ লাখ শহিদদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
(২) টম হার্টম্যান এবং জন মিচেল লিখিত ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস অব মিলিটারি হিস্ট্রি’ একটি ঐতিহাসিক অ্যাটলাস, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী, ১৯৪৫ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক সংঘাতের মানচিত্র এবং সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হয়েছে। এখানে বাংলাদেশে সংঘটিত সামরিক অভিযান, পাকিস্তান ও ভারতের সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং যুদ্ধের ফলাফল সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়েছে। এটি সামরিক ইতিহাসবিদ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি রেফারেন্স বই হিসেবে চিহ্নিত। এই বইয়ে ১০ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে একটি সামরিক সংঘাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সংখ্যাটি সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে নিহতদের সংখ্যা বিবেচনা করেছে, নাকি গণহত্যা ও দুর্ভিক্ষের কারণে সৃষ্ট পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত করেছে, তা স্পষ্ট নয়। এছাড়াও সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র এবং গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি।
(৩) যুক্তরাজ্যের ‘দ্য ন্যাশনাল আর্কাইভস’ এর নথিতে নিহতের সংখ্যা ৫ লাখ থেকে ৩০ লাখের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসরটি তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকার এবং তাদের কূটনীতিকদের কাছে উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ আর্কাইভসের নথিপত্রগুলো সরকারি প্রতিবেদন, কূটনৈতিক তারবার্তা এবং সেসময়ে ঢাকায় অবস্থানরত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গঠিত। এই সূত্রগুলো সবসময় একই ধরনের তথ্য সরবরাহ করেনি, ফলে নিহতের সংখ্যার নির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। তবে সংখ্যার ভিন্নতা থাকলেও, ব্রিটিশ নথিগুলোতে স্পষ্টভাবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এসেছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি এও দেখায় যে, সেই সময়ে আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিল এবং কীভাবে তারা এই সংঘাতকে দেখছিল। যুদ্ধের প্রথম দিকে, যখন পাকিস্তান বাহিনী গণহত্যা শুরু করে, তখন নিহতের সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া কঠিন ছিল। পরবর্তীতে গণহত্যা ও দেশত্যাগের পরিমাণ বাড়তে থাকলে নিহতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ নথিগুলোতে এই পরিবর্তনশীলতার প্রতিফলন দেখা যায়।
(৪) সিআইএ এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তাদের প্রকাশিত নথিপত্রে নিহতের সংখ্যা ২ লাখ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। তবে সিআইএ এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের ২ লক্ষ নিহতের অনুমানটি যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনো চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়। আসলে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সিআইএ এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের মূল মনোযোগ ছিল ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ওপর। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা এবং যুদ্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা তাদের কাছে অগ্রাধিকার ছিল না। তাছাড়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য পেতে ব্যর্থ হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, সংবাদপত্রের সীমিত সুযোগ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার অভাবের কারণে তাদের অনুমান ছিল সীমিত। আবার তৎকালীন মার্কিন সরকার, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার, পাকিস্তানের পক্ষে থাকায় তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তথ্যের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে, যার ফলে নিহতের সংখ্যাকে কম দেখানো হয়েছিল।
(৫) মার্কিন নথিগুলোতে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। গণহত্যার কারণে সৃষ্ট পরোক্ষ মৃত্যু, যেমন - দুর্ভিক্ষ, রোগ এবং শরণার্থীর মৃত্যুর সংখ্যা সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে সংখ্যার বিষয়ে সিআইএ-র প্রাথমিক অনুমান কম থাকলেও নথিপত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। যেমন-
(ক) গণহত্যার স্বীকৃতি। মার্কিন কনস্যুলেটের কর্মীরা, যেমন—আর্চার ব্লাড, ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় ‘গণহত্যা’ (genocide) শব্দটি ব্যবহার করে বাঙালিদের ওপর চালানো নৃশংসতার কথা তুলে ধরেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।
(খ) ব্যাপক আকারের নৃশংসতা। নথিপত্রগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক আকারের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ পাওয়া যায়, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয়, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
(৬) ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ বইয়ের ৮ম খণ্ড বইয়ের ৫৫৪ পৃষ্ঠায় ৭ জুন ১৯৭১ তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় অ্যান্থনি লুইসের ‘মেজারিং দ্য ট্র্যাজেডি’ নিবন্ধে প্রকাশিত তথ্যের প্রেক্ষিতে আইআরসি-র মন্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “IRC’s Mission to India was able to verify through interviews with refugees that this was actually what happened. People were taken out of their houses and machine-gunned in the streets. Men, women and children were bayonetted to death. Women were raped. About 2,00,000 people were reported to have been killed. Millions of people began their escape into India. At that stage, they consisted mostly of Muslims identified with the Awami League and the political opposition to the West Pakistan regime.” তবে বাংলাদেশ সরকারের এই দলিলটা সামগ্রিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির দোষে দুষ্ট বলে অনেকেই অভিহিত করেছেন।
(৭) কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত মিল্টন লিটেনবার্গের গবেষণাপত্রে নিহতের সংখ্যা ১৫ লাখ বলা হয়েছে। লিটেনবার্গের গবেষণা পদ্ধতি এবং তথ্যসূত্র নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এটি একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। তিনি একজন সুপরিচিত আমেরিকান গবেষক এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ। তিনি প্রধানত যুদ্ধ, সংঘর্ষ এবং গণহত্যার উপর গবেষণা করেছেন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত তার একটি গবেষণাপত্র, যার শিরোনাম ‘Deaths in Wars and Conflicts in the 20th Century’, বিভিন্ন দেশের যুদ্ধ এবং সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করে। যদিও তার উল্লেখিত শহিদের সংখ্যা সরকারি অবস্থান ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যার চেয়ে কম, তারপরও এটি এও প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা সংক্রান্ত তার গবেষণায় সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়েছে, কারণ-
(ক) তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি। লিটেনবার্গ তার গবেষণায় বিদ্যমান তথ্যসূত্র, যেমন- বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, সরকারি নথি এবং অন্যান্য গবেষণাপত্রের ওপর নির্ভর করেছেন। এর কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সঠিক জরিপ করা সম্ভব ছিল না।
(খ) সরাসরি এবং পরোক্ষ মৃত্যু। তার গবেষণা শুধু সরাসরি যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা বিবেচনা করেছে কিনা, নাকি গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ এবং রোগের কারণে সৃষ্ট পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত করেছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তার উল্লেখকৃত ১৫ লাখ সংখ্যাটি অন্যান্য গবেষকদের দেওয়া সংখ্যার চেয়ে কম, যা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যেমন- অধ্যাপক আর.জে. রুমেল তার ‘Death by Government’ বইয়ে ‘গণহত্যা’ (democide) শব্দ ব্যবহার করে নিহতের সংখ্যা ১ থেকে ৩ মিলিয়ন (১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ) বলে উল্লেখ করেছেন। ইয়েলের গবেষণায় (২০০৫) ২.৫-৩ মিলিয়ন বা ২৫-৩০ লাখ মানুষ নিহত বলা হয়েছে। ড. মার্শাল জোবি তার গবেষণায় ১০ লাখ এবং ড. টেড রবার্ট গার ও বারবারা হার্ফ তাদের গবেষণায় ১২.৫-৩০ লাখ শহিদের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন।
(৮) মার্কিন গবেষক রিচার্ড সিসন এবং লিও ই রোজ প্রসঙ্গে আগেই বলেছি। তারা রীতিসম্মত উপায়ে গবেষণা করে শহিদের সংখ্যা সংক্রান্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে চেয়েছিলেন। তারা লিখেছেন, ‘ভারত পাকিস্তানি নৃশংসতার বলি হিসেবে ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যার সংখ্যাটি নির্ধারণ করেছে ও আজ পর্যন্ত এ সংখ্যাটি সর্বত্র উল্লেখ করা হচ্ছে। আমরা দু’জন ভারতীয় কর্মকর্তা যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিষয়ে দায়িত্বশীল পদে আসীন ছিলেন তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধে ১৯৭১ সালে সঠিক হিসেবে কতজন লোক নিহত হয়েছে, তখন তাদের একজন উত্তর দিয়ে বলেছিলেন প্রায় তিন লাখ। যখন তার দেয়া সংখ্যাটি তার সহকর্মীর চোখের ইশারায় অনুমোদন পেলো না তখন তিনি সংখ্যাটি পরিবর্তন করে বললেন তিন থেকে পাঁচ লাখ হবে।’ ভারতীয় কর্মকর্তাদের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বোঝা যায় যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কোন বাস্তব হিসেব ছাড়া মৃতের সংখ্যা নির্ধারন করেছিল ও যতোটা সম্ভব বেশি করে উল্লেখ করা যায় সেদিকে তাদের একটা প্রবণতা ছিল।
৫
শহিদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির কারণ।
২৬৫ দিনের মুক্তিযুদ্ধে শহিদের পরিসংখ্যানে ভিন্নতার মূল কারণ তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির ভিন্নতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সঠিক জরিপ করার অক্ষমতা। এছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ,
ক। তথ্য সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, এবং যুদ্ধকালীন সময়ে আদমশুমারি বা জরিপ চালিয়ে নিহতের সঠিক সংখ্যা গণনা করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে, বিভিন্ন গবেষক তাদের নিজস্ব সূত্র, যেমন- সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, কূটনৈতিক নোট এবং অন্যান্য নথিপত্রের উপর নির্ভর করেছেন, যা ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল দিয়েছে।
খ। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
কিছু প্রতিবেদন শুধুমাত্র সরাসরি যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা বিবেচনা করেছে, আবার কিছু প্রতিবেদন গণহত্যা এবং দুর্ভিক্ষের কারণে সৃষ্ট পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
গ। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট।
সিআইএ এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের মতো সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে সংখ্যাগুলো অনুমান করেছিল, যা অনেক সময় প্রকৃত অবস্থা থেকে দূরে ছিল।
ঘ। সময়কাল।
বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে প্রকাশিত নথিপত্রগুলো সাধারণত কম সংখ্যক নিহতের কথা বলেছিল, কারণ তখনো ব্যাপক গণহত্যার পূর্ণ চিত্র প্রকাশ পায়নি।
এছাড়াও শহিদের সংখ্যা নিয়ে চলমান বিতর্ক ও ভিন্ন মতামতের মূল কারণ হলো, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনো তালিকা করে হত্যাকাণ্ড চালায়নি। তাই সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। বিভিন্ন গবেষক জনসংখ্যার পরিসংখ্যান ও গণহত্যার ধরন বিশ্লেষণ করে একটি আনুমানিক সংখ্যায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমি এপ্রসঙ্গে একটা গবেষণা পুস্তক সম্পর্কে আলোচনা করবো। শর্মিলা বসুর লেখা ‘ডেড রেকনিং: মেমোরিজ অভ দ্য ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার’ এরকম একটি বই।
৬
‘ডেড রেকনিং: মেমোরিজ অফ দ্য ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার’
শর্মিলা বসু একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষাবিদ। তার ‘ডেড রেকনিং: মেমোরিজ অফ দ্য ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার’ বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে লেখা। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে তিনি একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছেন। তার যুক্তি, যুদ্ধের ইতিহাস বিজয়ীর দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয় এবং এতে পরাজিত পক্ষের বক্তব্য বা অপরাধগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। তিনি এই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করেছেন। আর এটা করতে গিয়ে তিনি প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, যেখানে কেবল পাকিস্তানি বাহিনীকে দোষারোপ করা হয়। তার দাবি অনুযায়ী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীকৃত হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের সংখ্যা অনেকাংশে অতিরঞ্জিত। তিনি যুক্তি দেখান যে, ৩০ লাখ মানুষ নিহত হওয়ার যে সংখ্যাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই এবং এটি একটি রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ। তিনি যুক্তি দেখান যে, এত কম সময়ে এত বেশি সংখ্যক মানুষ হত্যা করা সামরিকভাবেও অসম্ভব। বিভিন্ন ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সঠিক সংখ্যা নিরূপণে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনেকরেন।
শর্মিলা বসু তার বইটিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা অবাঙালি বিহারি এবং কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা’র দাবি করেছেন। শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা নয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং মুক্তিবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও লুটপাটের ঘটনাও তিনি বইটিতে তুলে ধরেছেন। নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তার মত হলো, এটি কেবল একটি পক্ষের নৃশংসতার যুদ্ধ ছিল না, বরং উভয় পক্ষেই সহিংসতা হয়েছিল।
‘ডেড রেকনিং’ বইয়ের জন্য শর্মিলা বসু মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৭০ জনের বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যাদের মধ্যে বাঙালি, অবাঙালি (বিহারি), পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক উভয়ই ছিলেন। তাদের স্মৃতিকথা, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত নথি এবং বিদেশি সংবাদ প্রতিবেদনগুলো গবেষণায় ব্যবহার করেছেন। অনেক সমালোচক অবশ্য তার গবেষণা পদ্ধতিকে পক্ষপাতদুষ্ট ও ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাদের মতে, শর্মিলা বসু ইচ্ছাকৃতভাবে পাকিস্তানি পক্ষের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং বাঙালি ভুক্তভোগীদের বর্ণনাকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন। অনেক ইতিহাসবিদ এবং গবেষক তার কাজকে “ঐতিহাসিক নেতিবাচকতা” (historical negationism) ও “গণহত্যা অস্বীকার” (genocide denial) বলে সমালোচনা করেছেন।
শর্মিলা বসু ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেছেন, যা স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচলিত ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন যে, এটি দুই স্বাধীন দেশের মধ্যে যুদ্ধ ছিল না, বরং একই রাষ্ট্রের (পাকিস্তান) দুটি অংশের মধ্যেকার সংঘাত। বইটি ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হবার সম্ভাব্য কারণ,
ক। পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ।
তিনি পাকিস্তানি পক্ষের বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বাঙালিদের বর্ণনাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের দেয়া বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করলেও, বাঙালি ভুক্তভোগীদের স্মৃতিচারণকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বাতিল করেছেন।
খ। গবেষণা পদ্ধতি।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তথ্য যাচাইয়ের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেননি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট ঘটনাকে বেছে নিয়েছেন যা তার পূর্বনির্ধারিত যুক্তির পক্ষে কাজ করে।
গ। যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে এড়িয়ে যাওয়া।
সমালোচকরা মনে করেন তিনি যুদ্ধের মূল যে প্রেক্ষাপট, অর্থাৎ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণকে প্রায় পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। এই শোষণই যে যুদ্ধের মূল কারণ ছিল, তা তিনি তার বইয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি।
৭
শহিদের সংখ্যা ২০০০!
ক। উইলিয়াম ড্রামন্ড একজন প্রশংসিত এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিক। তার সাংবাদিক জীবনের বিশ্বাসযোগ্যতাও বেশ উচ্চ। তিনি বার্কলেতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ জার্নালিজমে শিক্ষকতা করেছেন এবং দ্য লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ও এনপিআর-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে জাতিগত বৈষম্য, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, যা তাকে সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিতি এনে দিয়েছে। ৬ জুন ১৯৭২ তারিখে দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘The missing millions’। প্রতিবেদনটিতে ড্রামন্ড লিখেছেন যে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিদর্শকের কার্যালয় মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে তদন্ত শুরু করার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার প্রায় ২,০০০টি অভিযোগ পেয়েছে। এই তথ্যটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদ হওয়ার যে সংখ্যাটি সাধারণভাবে প্রচলিত, তার থেকে ভিন্ন।
খ। উইলিয়াম ড্রামন্ডের প্রতিবেদনটির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন,
(১) প্রতিবেদনের সময়কাল এবং প্রেক্ষাপট। সাংবাদিকতা হলো তাৎক্ষণিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করা। অন্যদিকে ইতিহাস হলো সময়ের সাথে সাথে প্রাপ্ত সকল তথ্য, গবেষণা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা। প্রতিবেদনটি ১৯৭২ সালের জুনে প্রকাশিত হয়েছিল। সেসময়ে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে তখনো সম্পূর্ণ ও নির্ভুল পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ২,০০০ সংখ্যাটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তরে (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়) জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে ছিল, যা মোট হতাহতের সংখ্যাকে প্রতিফলিত করে না।
(২) সাংবাদিকের উদ্দেশ্য। উইলিয়াম ড্রামন্ডের লেখাটি গবেষণামূলক প্রতিবেদন ছিল না, বরং যুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ। তিনি নিজেই তার প্রতিবেদনে ‘The missing millions’ শিরোনাম ব্যবহার করে শহিদের সংখ্যা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন।
(৩) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বিতর্ক। উইলিয়াম ড্রামন্ডের প্রতিবেদনটি পরবর্তীকালে কিছু গোষ্ঠী ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজে ব্যবহৃত করেছে। পিনাকী ভট্টাচার্য তার অনুষ্ঠানে যেমনটা করেছেন। এই প্রতিবেদনটি নিজে থেকে ৩০ লাখ সংখ্যাকে মিথ্যা প্রমাণ করে না। এটি কেবল সেই সময়ের সরকারি নথিতে রিপোর্ট হওয়া অভিযোগের সংখ্যা তুলে ধরেছিল। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ২,০০০ সংখ্যাটি যেমন একটি বিশেষ সময়ের সরকারি নথির উপর ভিত্তি করে, তেমনি ৩০ লাখ শহিদ হওয়ার সংখ্যাটি প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া এবং এটিই বাংলাদেশে সরকারিভাবে ও সাধারণভাবে স্বীকৃত। অনেক ঐতিহাসিক, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাও ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যাকে সমর্থন করে থাকেন, যা ইতিপুর্বে রেফারেন্সসহ উল্লেখ করেছি। উইলিয়াম ড্রামন্ডের প্রতিবেদনটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি বিশেষ তথ্যের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল এবং এটি সেসময়ের একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরে। এটি ৩০ লাখ শহিদের যে প্রতিষ্ঠিত ও বহুল স্বীকৃত সংখ্যা, তার সত্যতাকে বাতিল করে না।
৮
নিহতের সংখ্যা নিয়ে মতভিন্নতা।
১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিহত ভারতীয়, পাকিস্তানি এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি আনুমানিক চিত্র দেয়া হলো,
ক। পাকিস্তান সেনাসদস্য হতাহতের সংখ্যা।
যুদ্ধের পর জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তানের নতুন সরকার যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় সম্পর্কে তদন্ত করতে হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করেন। তদন্ত শেষে কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে এবং ডিক্লাসিফায়েড অংশ জনসাধারণের জানার স্বার্থে উম্মুক্ত করে। ‘৩০ লাখ শহিদ’ সংক্রান্ত বিষয়ে সেখান থেকে জানা যায়, ‘বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের মতে ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যা ও দু’লাখ পূর্ব পাকিস্তানি নারী ধর্ষণের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী দায়ী, এই সংখ্যাগুলো যে পরিষ্কারভাবে অতিরঞ্জিত তা বুঝতে আর বিস্তারিত যুক্তিতর্কের প্রয়োজন নেই। এমনকি অন্যকোন কিছু যদি নাও করতে হতো তাও পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে পূর্ণশক্তি নিয়োগ করেও এ ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হতো না।’ কমিশন নিজে শহিদের সংখ্যা দিয়েছে এভাবে, ‘সর্বশেষ বিবৃতি দিয়ে সেনা সদর দপ্তর থেকে আমাদের জানানো হয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত অভিযানে পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ২৬,০০০ জন নিহত হয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড থেকে জেনারেল হেড কোয়ার্টারে বিভিন্ন সময়ে দাখিলকৃত ঘটনা সম্পর্কিত প্রতিবেদন (SITREP)-এর উপর ভিত্তি করে এ সংখ্যাটি পাওয়া গেছে।’ SITREP হলো ঘটনার দালিলিক প্রমাণ তবে কমিশন ২৬,০০০ জন শহিদের সংখ্যাটিকেও অতিরঞ্জন বলে মনেকরে বলেছে, ‘এটা হতে পারে যে এমনকি এ সংখ্যাতেও হয়তো অতিরঞ্জিত কোনো বিষয় রয়েছে, কেননা সেসময় বিদ্রোহ দমনে নিচের দিককার ইউনিটগুলো তাদের অর্জনকে আরো বাড়িয়ে প্রকাশ করার মানসিকতা পোষণ করতো।’ তবে ‘অন্যকোন নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে’ কমিশন ২৬,০০০ মৃতের সংখ্যাকে ‘যুক্তিসহ সঠিক’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
অপরপক্ষে যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান প্রচলিত আছে। কিছু উৎস মতে তাদের প্রায় ১,৬০০ থেকে ২,৩০০ জন নিহত হয়েছিল। আবার আরেকটা সূত্র মতে প্রায় ৮,০০০ থেকে ৯,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য পশ্চিমা সূত্র এবং গবেষণায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা ৫,৮৬৬ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর লে জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের মতে ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ০৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ৪,৫০০ জন নিহত এবং ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ২,২৬১ জন নিহত অর্থাৎ সর্বমোট ৬,৭৬১ জন নিহত। জেনারেল নিয়াজি অবশ্য ০৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪,০০০ জন বলেছেন।
খ। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মৃত্যু সংখ্যা।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,৬০০ ভারতীয় সেনা সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। কিছু সূত্র অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ৩,৮৪৩ পর্যন্তও হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৬ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে ১,৬৬১ জন ভারতীয় সেনা শহীদ হন। বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে এই শহীদদের সম্মাননা জানানোর জন্য প্রতি পরিবারকে ক্রেস্ট এবং আর্থিক অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। লে জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের মতে শুধু ডিসেম্বর মাসেই ভারতের হতাহতের সংখ্যা ছিল ১,৪২১ জন এবং ৫৬ জন মিসিং। তবে ডিসেম্বরের আগেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধে জড়িয়ে যাবার বিষয়টা আমলে নিলে এই সংখ্যাটা অনেক বেড়ে যাবে। পাকিস্তান অবশ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর হতাহতের সংখ্যাকে সবসময়ই বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করে থাকে। তাদের বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষক এবং কিছু প্রকাশনায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মৃত্যুর সংখ্যা ২,০০০ থেকে ৪,০০০ এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ। মুক্তিবাহিনীর হতাহতের সংখ্যা।
শুধুমাত্র মুক্তিবাহিনীর কতজন সদস্য শহীদ হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়নি। কারণ এটি একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর মতো ছিল না এবং বহু বেসামরিক মানুষও এতে অংশ নিয়েছিল। আবার পাকিস্তানের পক্ষ থেকে মুক্তিবাহিনীর হতাহতের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি, কারণ তারা এটিকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করত। তারপরও বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী ১০,০০০-এর বেশি সদস্য নিহত এবং প্রায় ২০,০০০ আহত হয়েছিলেন। এই সংখ্যাটি শুধু নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের জন্য, যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়াও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে কতজন মারা গিয়েছিল তার সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন, কারণ সেই সময়ে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল ছিল এবং শরণার্থীরা অত্যন্ত দুর্দশার মধ্যে দিন কাটিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে শরণার্থীদের মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের মধ্যে প্রায় ৫,৬২,৯১৫ জনের ‘অতিরিক্ত মৃত্যু’ হয়েছিল। অতিরিক্ত মৃত্যু হলো সাধারণ পরিস্থিতিতে যে পরিমাণ মৃত্যু প্রত্যাশিত, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক মৃত্যু। এই সংখ্যাটি ৩,২৩,৫৬২ থেকে ৮,০২,২৬৮-এর মধ্যে হতে পারে বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনিসেফ-এর একটি অনুমান অনুযায়ী, শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরা, ডায়রিয়া এবং অপুষ্টির কারণে প্রায় ৫ লাখ শিশু ও বয়স্ক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো ইঙ্গিত করে যে, ১৯৭১ সালের শরণার্থী সংকট শুধুমাত্র একটি মানবিক বিপর্যয় ছিল না, বরং এতে অসংখ্য মানুষের জীবনহানিও ঘটেছিল, যা যুদ্ধ এবং গণহত্যার বাইরে একটি ভিন্ন ধরনের ট্র্যাজেডি।
৯
একটা যৌক্তিক সমাধানের জন্য অপেক্ষা।
ক। শর্মিলা বসু’র গবেষণা গ্রন্থ ‘ডেড রেকনিং’-এর তথ্য, উপ-পুলিশ প্রধান আব্দুর রহিমের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট এবং অন্যান্য সূত্রের হিসেব আমলে নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাঙালি-বিহারী, হিন্দু-মুসলমান, যোদ্ধা-অযোদ্ধা, ভারতীয়-পাকিস্তানি মিলে সংখ্যাটা ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ জন কিংবা সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের রেফারেন্সে সংখ্যাটা সর্বোচ্চ ৩ লাখ হতে পারে।
খ। হামুদুর রহমান কমিশনের হিসেব অনুযায়ী ২৬,০০০ জন সংখ্যাটা যেমন প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে তেমনি ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে রেসকোর্সের ভাষণে শেখ মুজিবের উচ্চারিত ৩০ লাখ শহিদ প্রকৃত সংখ্যার অতিরঞ্জন। তবে শেখ মুজিব হয়তো তখন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, বরং গণহত্যার ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য ‘৩০ লাখ’ এর মতো একটি বিশাল সংখ্যা ব্যবহার করেছিলেন।
গ। মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা সত্ত্বেও, এটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিল, যা লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। আর তাই উইলিয়াম ড্রামন্ড-এর উল্লেখিত ২,০০০ জন শহিদের সংখ্যা প্রকৃত ইতিহাসের অবমাননা।
১০
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে জনগণের বিশাল আত্মত্যাগ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার এক শক্তিশালী প্রতীক। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি জাতির আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার মূল্যবোধের প্রতীকী উপস্থাপন, যা জাতীয় চেতনা ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিরকাল বিবেচিত হবে। যদিও এই সংখ্যাটি সরকারিভাবে স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক মহলে বহুলাংশে গৃহীত, তবুও এর সঠিকতা নিয়ে কিছু মহলে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক বিদ্যমান। সমালোচকরা সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত প্রমাণের অভাব তুলে ধরেন, অন্যদিকে সমর্থকরা গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষ্যপ্রমাণকে ভিত্তি হিসেবে দেখান।
তবে একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যার জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে চাইলে শহিদের সংখ্যাকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সর্বসম্মত পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কোনোভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট বা আবেগপ্রবণ লোকদের দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আবেগ বিবর্জিত, সম্পূর্ণ যুক্তিনির্ভর এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক গবেষণায় নিবেদিতপ্রাণ একদল তরুণ গবেষক ও ঐতিহাসিক। তাদের বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানের হাত ধরেই হয়তো একদিন এই ঐতিহাসিক বিতর্ক মীমাংসিত হবে, এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের আত্মত্যাগের প্রকৃত চিত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
হদিস:
১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র- ৮ম খণ্ড
২। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ- প্রথম খণ্ড- পিনাকী ভট্টাচার্য
৩। ডেড রেকনিং: মেমোরিজ অফ দ্য ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার- শর্মিলা বসু
৪। দ্য লাস্ট ডেজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান- জি. ডব্লিউ. চৌধুরী
৫। ১৯৭১ অজানা গণহত্যা- জি এম ফয়সাল আলম
৬। ত্রিশ লক্ষ শহিদ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা- আরিফ রহমান
৭। ইন্টারনেট
পোস্ট ভিউঃ 13