হাঙ্গেরিতে অরবান-যুগের অবসান: ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতি ও নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ

লেখালোক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়
হাঙ্গেরিতে অরবান-যুগের অবসান: ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতি ও নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ

ইউরোপীয় রাজনীতির দীর্ঘ ১৬ বছরের এক অজেয় ‘অরবান-অধ্যায়’ ২০২৬ সালের এপ্রিলে এক নাটকীয় পতনের সাক্ষী হলো। ভিক্টর অরবানের ‘অনুদার গণতন্ত্র’ বা ‘অরবানতন্ত্রের’ এই অবসান কেবল হাঙ্গেরির অভ্যন্তরীণ পালাবদল নয়, বরং এটি ব্রাসেলস থেকে তেল আবিব পর্যন্ত এক প্রবল ভূ-রাজনৈতিক কম্পন সৃষ্টি করেছে। পিটার মাগিয়ারের অভাবনীয় উত্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নে হাঙ্গেরির একঘরে দশা কাটানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মহাদেশীয় সংহতিকে করবে আরও সুসংহত। এই পরিবর্তন একদিকে যেমন পুতিনের ক্রেমলিন-বান্ধব বলয়ে ফাটল ধরিয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ইউরোপের একক অবস্থানকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। বিশেষ করে হাঙ্গেরির মতো শক্তিশালী ঢাল হারিয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বুদাপেস্টের এই পরিবর্তন ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির মেরুকরণ কমিয়ে এক নতুন উদারপন্থী যুগের পদধ্বনি শোনাচ্ছে।


হাঙ্গেরির অভ্যন্তরীণ পালাবদল: অরবানের পতন ও তিসজা-র উত্থান।


১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হাঙ্গেরির সাধারণ নির্বাচনে পিটার মাগিয়ারের ‘তিসজা’ দলের অভাবনীয় বিজয় দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক স্থবিরতা ভেঙে এক গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ১৯৯টি আসনের মধ্যে ১৩৮টি আসন লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কেবল অরবানের ‘ফিদেজ’ পার্টিকে ধূলিসাৎ করেনি, বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটিয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে, এই ফলাফল বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত করবে, যা ‘অরবানতন্ত্রের’ অনুদার কাঠামোকে ভেঙে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। মাগিয়ারের আধুনিক অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দুর্নীতিতে জর্জরিত ভোটারদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, এই জয় হাঙ্গেরিকে রাশিয়ার প্রভাব বলয় থেকে বের করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনবে, যা ব্রাসেলসের সাথে বুদাপেস্টের দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটাবে। বহিবিশ্বের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হাঙ্গেরি এখন আর ইইউ-এর একক সিদ্ধান্তে ‘ভেটো’ প্রদানকারী বাধা হিসেবে থাকবে না, যা ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইউরোপকে আরও সংহত অবস্থানে নিয়ে যাবে। হাঙ্গেরির এই পটপরিবর্তন ভ্লাদিমির পুতিনের ইউরোপীয় মিত্র হারানোর পাশাপাশি ইসরায়েলের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক শূন্যতা তৈরি করবে। এই নির্বাচনের তারিখটি হাঙ্গেরির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা দেশটিকে একটি বিচ্ছিন্ন পপুলিস্ট রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অংশীদারে রূপান্তরিত করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।


ইউক্রেন যুদ্ধ: ক্রেমলিন-বান্ধব নীতির অবসান ও ইইউ সংহতি।


ভিক্টর অরবানের বিদায় ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রেমলিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘ইউরোপীয় বাধা’ অপসারিত করল, যা কিয়েভের জন্য এক নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে অরবানের অবস্থান এতদিন ইইউ-এর একক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে অচলাবস্থা তৈরি করেছিল, পিটার মাগিয়ারের উত্থান তার আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। এই পটপরিবর্তন কেবল হাঙ্গেরিকে মস্কোর বলয় থেকে মুক্ত করবে না, বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ও নিষেধাজ্ঞার নীতিকে আরও ইস্পাতকঠিন করে তুলবে।


ক। ভেটো রাজনীতির অবসান।

অরবানের বিদায়ের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের ‘ভেটো রাজনীতির’ অচলাবস্থা ভেঙে কিয়েভের জন্য আর্থিক ও সামরিক সহায়তার দ্বার উন্মুক্ত হলো। এতদিন পুতিন-বান্ধব কৌশলের অংশ হিসেবে অরবান এককভাবে ইউক্রেনীয় ফাণ্ড আটকে দিলেও, পিটার মাগিয়ারের সরকার এখন ব্রাসেলসের সাধারণ সিদ্ধান্তের সাথে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এরফলে হাঙ্গেরির বাধা ছাড়াই ইইউ এখন দ্রুততর সময়ে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ ও পুনর্গঠন তহবিল ছাড় করতে পারবে, যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। হাঙ্গেরির এই নীতিগত পরিবর্তন ইইউ-এর সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলল।


খ। ন্যাটো ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা।

সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটো অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অরবানের দীর্ঘদিনের টালবাহানা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে যে সংকটে ফেলেছিল, নতুন সরকারের আগমনে তার চূড়ান্ত অবসান ঘটতে যাচ্ছে। পিটার মাগিয়ারের প্রশাসন হাঙ্গেরিকে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা কাঠামোর সাথে নিবিড়ভাবে সংহত করার অঙ্গীকার করায় রাশিয়ার ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ রাজনীতি এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে বাল্টিক ও উত্তর ইউরোপের নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী হবে এবং হাঙ্গেরি আর জোটের ভেতরে ‘সংশয়বাদী’ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবে না। বুদাপেস্টের এই সংহতি ক্রেমলিনের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে পশ্চিমা সামরিক জোটের সম্মিলিত শক্তি ও রাজনৈতিক সংকল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।


গ। ট্রানজিট ও জ্বালানি নির্ভরতা। 

নতুন মাগিয়ার প্রশাসন রাশিয়ার জ্বালানি ও তেলের ওপর হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের অতিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ার যে সাহসী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা মস্কোর অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল করার ক্ষমতাকে নস্যাৎ করে দেবে। এতদিন অরবানের আপত্তির কারণে ইউক্রেনগামী সামরিক রসদ হাঙ্গেরির ভূমি ব্যবহারের অনুমতি না পেলেও, এখন নতুন সরকারের সবুজ সংকেতে লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই ট্রানজিট সুবিধা পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার ওপর থাকা চাপ কমিয়ে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথকে আরও দ্রুত ও নিরাপদ করে তুলবে। জ্বালানি স্বাধীনতা এবং এই লজিস্টিক সহযোগিতা কেবল হাঙ্গেরির জাতীয় নিরাপত্তাকেই নিশ্চিত করেনি, বরং সমগ্র ইউরোপীয় অঞ্চলের কৌশলগত সংহতিকেও এক মজবুত ভিত্তি প্রদান করেছে।


আইসিসি (ICC) ও নেতানিয়াহুর ‘রক্ষাকবচ’ অদৃশ্য হওয়া।


বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জন্য হাঙ্গেরি ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক ও আইনি ‘রক্ষাকবচ’, যা গত এক দশকে ইসরায়েল-বিরোধী যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ বা নিষেধাজ্ঞাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তবে হাঙ্গেরির নতুন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করায় এই দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। বুদাপেস্টের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে নেতানিয়াহু ইউরোপে তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভেটো-ক্ষমতা সম্পন্ন মিত্রকে হারিয়ে এখন আন্তর্জাতিক আইনি চাপের মুখে কার্যত একাকী হয়ে পড়েছেন।


ক। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) যখন গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তদন্ত বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পথে হাঁটছিল, তখন ভিক্টর অরবান সরাসরি আদালতের এক্তিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করে নেতানিয়াহুর জন্য সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছিলেন। তবে নবনির্বাচিত পিটার মাগিয়ার স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, হাঙ্গেরি রোম স্ট্যাটিউটের একজন গর্বিত স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আইসিসি-র যেকোনো রায় বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের ফলে বুদাপেস্ট এখন আর তেল আবিবের আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করবে না, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকার ও বিচারিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এরফলে হাঙ্গেরির মাটিতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলি নেতৃত্বের জন্য ইউরোপীয় ভূখণ্ডে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে গেল।


খ। নেতানিয়াহুর আইনি ও কূটনৈতিক ঝুঁকি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিটি যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ বা ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন’ সংক্রান্ত কঠোর শব্দগুলো হাঙ্গেরি এতদিন তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে বাদ দিতে বাধ্য করত, যা নেতানিয়াহুর জন্য একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক রক্ষাকবচ ছিল। কিন্তু বর্তমানে হাঙ্গেরির এই নিঃশর্ত সমর্থন হারিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে কার্যত আইনিভাবে অরক্ষিত এবং বন্ধুহীন হয়ে পড়েছেন। নতুন মাগিয়ার প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ায়, ইউরোপের যেকোনো দেশে সফরের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসি-র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি এখন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বুদাপেস্টের এই অবস্থান পরিবর্তন নেতানিয়াহুর জন্য ইউরোপের দরজাগুলো একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে এবং তাকে এক নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক আইনি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


গ। বুদাপেস্ট-তেল আবিব অক্ষের ভাঙন।

ভিক্টর অরবানের সাথে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও আদর্শিক সখ্যতা ছিল বিশ্বজুড়ে ‘ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদের’ (Right-wing Populism) এক শক্তিশালী স্তম্ভ, যা দুই দেশের রাজনৈতিক স্বার্থকে অভিন্ন সুতায় গেঁথেছিল। তবে পিটার মাগিয়ারের মধ্যপন্থী ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থান এই ব্যক্তিগত প্রভাবের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে বুদাপেস্ট-তেল আবিব অক্ষের চির ধরালো।


ইউরোপীয় ডানপন্থার ভবিষ্যৎ ও নতুন সতর্কবার্তা।


হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের পতন সমকালীন ইউরোপীয় রাজনীতিতে জনতুষ্টিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক জোরালো সতর্কবার্তা প্রদান করেছে। এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কেবল উগ্র জাতীয়তাবাদ কিংবা অভিবাসন-বিরোধী আবেগকে পুঁজি করে অনাদিকাল ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয় যদি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত ও সুশাসন ভেঙে পড়ে। ১৬ বছরের অজেয় দুর্গের এই ধস প্রমাণ করে যে, সাধারণ ভোটারদের কাছে আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে জীবনযাত্রার মান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সের মেরিন লে পেন কিংবা জার্মানির এএফডি-র মতো উদীয়মান অতি-ডানপন্থী দলগুলোর জন্য বুদাপেস্টের এই বার্তাটি একটি কঠোর বাস্তবসম্মত শিক্ষা। উগ্র পপুলিস্ট রাজনীতি যদি মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোও যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে, হাঙ্গেরি আজ তার জীবন্ত উদাহরণ। ইউরোপের মানুষ এখন সস্তা স্লোগানের চেয়ে কার্যকর সুশাসন ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতাকেই রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের আসল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করছে। এই পরিবর্তন আগামী দিনগুলোতে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির মেরুকরণ ও কৌশল পুনর্নির্ধারণে বাধ্য করবে।


বেইজিংয়ের ‘ইউরোপীয় প্রবেশদ্বার’ ও বলকান রাজনীতির নতুন সমীকরণ।


ভিক্টর অরবানের বিদায় কেবল পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শিবিরে স্বস্তি ফেরায়নি, বরং বেইজিং এবং বলকান অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী শক্তির জন্য এক চরম কৌশলগত অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চীনের ‘ইউরোপীয় প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত হাঙ্গেরির এই পটপরিবর্তন পূর্বের শক্তিকেন্দ্রগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক বিনিয়োগকে গভীর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। নতুন মাগিয়ার প্রশাসনের ইইউ-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক বিস্তার এবং বলকানের কট্টরপন্থী বলয়ে এক বিশাল ফাটল ধরিয়েছে।


ক। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পে অনিশ্চয়তা।

ভিক্টর অরবানের শাসনামলে হাঙ্গেরি ছিল ইউরোপে চীনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কৌশলগত সঙ্গী, যা বেইজিংকে বুদাপেস্ট-বেলগ্রেড রেলওয়ে এবং হুয়াওয়ের বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের এক অবারিত সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে নতুন মাগিয়ার প্রশাসন বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষার কথা বললেও, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে ইইউ এবং ন্যাটোর কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণের যে ঘোষণা দিয়েছে, তা চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এরফলে সংবেদনশীল খাতে বেইজিংয়ের অবাধ প্রবেশাধিকার সংকুচিত হবে এবং হাঙ্গেরি এখন থেকে চীনা বিনিয়োগের চেয়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেবে।


খ। বলকান অঞ্চলে অরবানের প্রভাব হ্রাস।

সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিক এবং বসনিয়ার সার্ব নেতা মিলোরাদ দোদিকের জন্য ভিক্টর অরবান ছিলেন ইউরোপের অভ্যন্তরে প্রধান রাজনৈতিক ঢাল ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষক, যার বিদায় বলকান অঞ্চলের এই ‘জাতীয়তাবাদী ব্লক’কে কার্যত অভিভাবকহীন করে তুলেছে। অরবানের পতন এই অঞ্চলের কট্টরপন্থী নেতাদের জন্য এক বিশাল কৌশলগত শূন্যতা তৈরি করেছে, কারণ তারা এতদিন বুদাপেস্টের মাধ্যমে ইইউ-এর চাপ থেকে সুরক্ষা পেয়ে আসতেন। মাগিয়ার সরকার যদি বলকানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং আইনের শাসনের পক্ষ নেয়, তবে এই অঞ্চলে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রক্সি রাজনীতি ও প্রভাব বলয় আরও সংকুচিত হতে বাধ্য।


গ। মধ্য-ইউরোপের নতুন মেরুকরণ।

হাঙ্গেরির এই রাজনৈতিক পালাবদল পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়ার সাথে তার দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ককে উষ্ণ করার মাধ্যমে মধ্য-ইউরোপের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সূচনা করবে। অরবানের বিদায়ের ফলে চেক ও পোল্যান্ডের বর্তমান উদারপন্থী সরকারগুলোর সাথে বুদাপেস্টের যে নীতিগত দূরত্ব ছিল, তা ঘুচে গিয়ে ‘ভিসেগ্রা গ্রুপ’ (V4) পুনরায় একটি শক্তিশালী ও সমমনা ব্লকে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই পুনঃসংহতি মধ্য-ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে কেবল আঞ্চলিক সহযোগিতাই বাড়াবে না, বরং ইইউ-এর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্রাসেলসের হাতকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করবে। একটি গণতান্ত্রিক ও সংহত হাঙ্গেরি এখন থেকে ইউরোপীয় সংহতির পথে বাধা হওয়ার পরিবর্তে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে।


হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের পতন কেবল একজন দীর্ঘমেয়াদী নেতার বিদায় নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে পপুলিস্ট এবং একনায়কতান্ত্রিক ঝোঁকের বিপরীতে এক শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। হাঙ্গেরিতে ২০২৬ সালের এই রাজনৈতিক বসন্ত প্রমাণ করেছে যে, উগ্র জাতীয়তাবাদের আবেগের চেয়ে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সুশাসনই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। বুদাপেস্টের এই রূপান্তর পুতিনের ক্রেমলিন-বান্ধব বলয়কে ছিন্নভিন্ন করার পাশাপাশি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের নিরাপদ প্রবেশদ্বারেও বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। একইসাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহুর অজেয় আইনি ও কূটনৈতিক সুরক্ষাকবচটি অদৃশ্য হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে এক নতুন শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পিটার মাগিয়ারের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরি এখন বিচ্ছিন্নতার পথ ত্যাগ করে আন্তর্জাতিক আইন ও ইইউ-ন্যাটো সংহতির মূল ধারায় ফিরে আসার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বলকান থেকে মধ্য-ইউরোপ পর্যন্ত এই ক্ষমতার পালাবদল রাশিয়ার ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতিতে বড় আঘাত হেনে ইউরোপকে আরও সুসংহত করেছে। এছাড়াও বুদাপেস্টের এই পরিবর্তন ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতির আধিপত্য কমিয়ে এক নতুন উদারপন্থী ও মধ্যপন্থী যুগের পদধ্বনি শোনাচ্ছে।



পোস্ট ভিউঃ 11

আপনার মন্তব্য লিখুন

আমার শব্দযাত্রায় সঙ্গী হতে