
বইয়ের নাম: শহীদ বদি ও আমার স্মৃতিতে একাত্তর
লেখকের নাম: রওশন আরা খানম
১
‘আমি সেদিন নাও থাকতে পারি। কিন্তু এদেশ স্বাধীন হবে। দেশের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটবে’, মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বদি কথাগুলো বলেছিলেন তার মা রওশন আরা খানমকে। তিনি ছেলের পাকিস্থান বিমান বাহিনীতে যোগদান ঠেকাতে পেরেছিলেন, কিন্তু এই কথার পর ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করা থেকে বিরত রাখতে পারেননি, হয়তো তিনি নিজেই চেয়েছিলেন ছেলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ুক। শহীদ রুমি’র মায়ের মতো তিনিও ছেলেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। এর আগে শহীদ রুমি, শহীদ আজাদ, শহীদ সামাদের মায়ের কথা লিখেছি। ‘শহীদ বদি ও আমার স্মৃতিতে একাত্তর’ বইটা পড়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বদি এবং তার মা, রওশন আরা খানম’এর কথা লিখছি। লেখিকা তার মুক্তিযোদ্ধা ছেলে এবং একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে অতিবাহিত দুঃসময়ের কথা বইয়ে তুলে ধরেছেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি, শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-বিভিন্ন পেশাজীবিদের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা, কাদেরিয়া বাহিনী- আফসার বাহিনী- হেমায়েত বাহিনী ইত্যাদি বেশ কিছু আঞ্চলিক গেরিলা বাহিনী সক্রিয় ছিল। এদের মধ্যে যাদের নাম একসময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকার পাতা দখল করে ছিল তারা হলেন মেজর খালেদ মোশাররফের আরবান গেরিলারা, আমরা যাদের সেক্টর দুই এর ক্র্যাক প্লাটুন নামে জানি। মূলত ঢাকা শহরের স্বচ্ছল পরিবারের এবং শিক্ষিত ছেলেদের বাছাই করে মেজর হায়দার দক্ষ গেরিলা হিসেবে প্রশিক্ষিত করেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ভীত-সন্ত্রস্থ করে রেখেছিলেন।
বদিউল আলম বদি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এনএসএফ করলেও মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরুতে ঝাঁপিয়ে পড়া তরুনদের একজন। বদি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্র্যাক প্লাটুনের একজন সদস্য। তিনি ঢাকায় বেশ কিছু গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরই একপর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে বন্দী হওয়ার পর নির্যাতন চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। শহীদ বদিউল আলম বীর বিক্রমের মা রওশন আরা খানম তার ছেলে এবং সেই সাথে তার নিজের মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণা এই বইটি। তিনি ছেলের জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা, এক মেধাবী অনুসন্ধিৎসু ও সংবেদনশীল তরুণ হিসেবে নানামুখী কর্মকাণ্ডের বিবরণের পাশাপাশি ঢাকা ও কিশোরগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর বর্ণনা করেছেন।
২
লেখিকা রওশন আরা খানমের জন্ম ১৯২৯ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানাধীন জাওয়ারা গ্রামে। তার স্বামী আবদুল বারী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ছয়পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের মধ্যে বদিউল আলম তার প্রথম সন্তান, যাকে নিয়েই এই বইটা লেখা হয়েছে। একজন শহীদ জননী হিসেবে লেখিকা আমৃত্যু পুত্রের এবং তার অনুষঙ্গে যুদ্ধপূর্ব এবং যুদ্ধকালীন দিনগুলোর স্মৃতির মাঝে বাস করেছেন। সেই মগ্নতাই অত্যন্ত সরল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে বইটির প্রতিটি বাক্যে বা লাইনে, যা পাঠকের মনকে স্পর্শ করবে। যুদ্ধকালীন অনেক ঘটনা এই বইটি থেকেই আমার মতো অনেক পাঠক হয়তো প্রথম জানতে পারবেন। যেমন- সেই পাকিস্তানি সৈনিকটির উর্দুতে বলা কথাগুলো, ‘মাজি, ছেলের লাশ আনতে কখনো ডাকবাংলো যাবে না। ওখানে গেলে মান-ইজ্জত সব হারাবে’। কিংবা বলা যেতে পারে দেশপ্রেমিক এক জেলের কথা, যার উপস্থিত বুদ্ধির কারণে বদিউল আলম রাজাকারদের হাতে ধরা পড়তে পড়তেও বেঁচে গিয়েছিলেন। জানা যাবে মুক্তিযুদ্ধে গ্রামীণ নারীদের সাহসী ভূমিকার কথা কিংবা পাকুন্দিয়ার একজন কর্তব্যপরায়ণ ডাক্তারের কথা, যিনি প্রতিটি মুহুর্তে নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও আমৃত্যু মানুষের সেবা করে গেছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেই ডাক্তার পাকিস্তানিদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। বইএ এরকম টুকরো টুকরো অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের ঋণ আসলেই কখনো পূরণ হবার নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের পুর্বপুরুষদের অবদান-আত্মত্যাগ জানতে হলে, একটা গর্বিত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে-বুক ফুলিয়ে চলতে হলে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বই পাঠের কোন বিকল্প নেই। লেখিকা পরম মমতায় ‘শহীদ বদি ও আমার স্মৃতিতে একাত্তর’ বইটি লিখে তার কাজটি করেছেন, এখন পাঠকদের দায়িত্ব বইটা সংগ্রহ করে ইতিহাসের টুকরো টুকরো অথচ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো জানা।
৩
বইএর সাথে মানানসই চমৎকার প্রচ্ছদ। প্রিন্টিং এবং বাঁধাই এর মানও বেশ উন্নত।
শুভ কামনা নিরন্তর।
সুমন সুবহান।
প্রকাশক- প্রথমা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ২০১৯
মুদ্রিত মূল্য- ৩০০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা- ১৪৪
গ্রন্থের প্রকৃতি- মুক্তিযুদ্ধ
প্রচ্ছদ- মাসুক হেলাল