
১
বিশ্ব রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই, আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। ২০২৬ সালের আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (Mecca Joint Defence Agreement) বা তথাকথিত ‘মক্কা প্যাক্ট’ বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এক নতুন এবং শক্তিশালী অক্ষের জন্ম দিয়েছে। ন্যাটো চুক্তি অনুচ্ছেদ ৫-এর আদলে গঠিত এই চুক্তির মূল কথা—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা বাকি দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। চুক্তিটি সাক্ষরিত হওয়ার পরপরই যখন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ বদলাতে শুরু করে, তখন বাংলাদেশেও জোর আলোচনা শুরু হয় এই জোটে ঢাকার যুক্ত হওয়া নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নতুন সামরিক বলয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ বা যুক্ত হওয়ার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী? এটি কি কেবল কূটনৈতিক ভারসাম্য নাকি আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক বিরাট ঝুঁকি?
২
মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহ নিয়ে ভারতের এত মাথাব্যথা কেন?
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে যেকোনো নতুন সামরিক সমীকরণ দিল্লির নজরে থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে। বাংলাদেশের এই জোটে আগ্রহ প্রকাশ করা ভারতের জন্য কেবল রাজনৈতিক অস্বস্তি নয়, সরাসরি কৌশলগত ও ভৌগোলিক উদ্বেগের বিষয়।
# ‘টু-ফ্রন্ট ওয়াফেয়ার’ ও ঘেরাও হওয়ার ভয়: ভারতের মূল নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ সব সময়ই তার দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান ও চীনকে ঘিরে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ভারতের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তে একটি নিরাপদ ও মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রভাব সংবলিত এই সামরিক অক্ষের সাথে নিজেদের যুক্ত করে, তবে ভারতের পূব ও পশ্চিম—দুই সীমান্তেই একধরনের প্রতিপক্ষ বা অস্বস্তিকর ব্লকের বলয় তৈরি হয়।
# শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর সংবেদনশীলতা: উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত রেখেছে মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া শিলিগুড়ি করিডোর। ভারতের এই সবচেয়ে সংবেদনশীল ভূখণ্ডের ঠিক পাশেই বাংলাদেশের অবস্থান। বিরোধী ভাবাপন্ন সামরিক অক্ষের উপস্থিতি বা গোয়েন্দা নজরদারি যদি বাংলাদেশে বৃদ্ধি পায়, তবে শিলিগুড়ি করিডোরের প্রতিরক্ষা ভারতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
# গোয়েন্দা উপস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা: পাকিস্তান ও তুরস্কের নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দাসংস্থাগুলো যদি বাংলাদেশে তাদের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে পারে, তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দিল্লির জন্য কঠিন হতে পারে বলে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা মনে করেন।
# দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব হ্রাস: ভারত দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়াকে নিজেদের প্রভাব বলয় মনে করে এসেছে। বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানের ছায়া বিস্তৃত হলে অঞ্চলের শক্তিসাম্য বদলে যাবে এবং ভারতের একক কূটনৈতিক কর্তৃত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
২
মক্কা প্যাক্ট কি বাংলাদেশকে আসলেই কোনো বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা দিতে পারবে?
কাগজে-কলমে বা চুক্তির অনুচ্ছেদে পারস্পরিক নিরাপত্তার কথা বলা থাকলেও বাস্তব ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি দূরবর্তী সামরিক অক্ষ বাংলাদেশকে কতটুকু সুরক্ষা দেবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
# ন্যাটো-স্টাইলের সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা: মক্কা প্যাক্টকে অনেক সময় ন্যাটোর সাথে তুলনা করা হলেও, ন্যাটো কেবল একটি কাগজের চুক্তি নয়; এর পেছনে রয়েছে সম্মিলিত সেনা কমান্ড, প্রযুক্তিগত একীভূতকরণ এবং ভৌগোলিক অবিচ্ছিন্নতা। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত বাংলাদেশ যদি কোনো সংকটে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্য বা আনা তোলিয়া থেকে তাৎক্ষণিক সামরিক সাহায্য আসা ভৌগোলিক কারণেই অত্যন্ত কঠিন।
# সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব স্বার্থের অগ্রাধিকার: মক্কা প্যাক্টের মূল তিন চালিকাশক্তি—সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। সৌদি আরবের মূল লক্ষ্য তার বিপুল তেলসম্পদ ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখা; তুরস্ক চায় তার প্রতিরক্ষা শিল্প ও মধ্যপ্রাচ্য-ভুমধ্যসাগরীয় প্রভাব বিস্তার; আর পাকিস্তানের লক্ষ্য ভারতের বিরুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক অবস্থা কিছুটা সামলে নেওয়া। বঙ্গোপসাগর বা দক্ষিণ এশিয়ার কোনো স্থানীয় সংঘাতের জন্য এরা নিজেদের সামরিক শক্তি বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রসারিত করবে—এমন চিন্তা ভাবাবেগ নির্ভর, বাস্তবতা নির্ভর নয়।
# কূটনৈতিক ঝুঁকির সমীকরণ: এই জোটে সরাসরি নাম লেখানো মানে চীন ও ভারতের মতো নিকটবর্তী প্রতিবেশী শক্তির সাথে সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন তৈরি করা। এশিয়ান পরাশক্তিগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বেশি জরুরি, যা দূরবর্তী কোনো চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ।
৩
আন্তর্জাতিক ব্লকের চেয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি কেন বাংলাদেশের জন্য বেশি জরুরি?
ইতিহাস প্রমাণ করে, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র যদি নিজের নিরাপত্তাকে পুরোপুরি বিদেশি শক্তির দয়ার ওপর ছেড়ে দেয়, তবে তারা মূলত নিজের সার্বভৌমত্বকেই ঝুঁকিতে ফেলে। বাংলাদেশের মূল শক্তি হতে হবে "কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন" এবং আত্মনির্ভরশীলতা। বিদেশি জোটের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পথগুলো হতে পারে:
# 'ফোর্সেস গোল ২০৩০'-এর আধুনিকায়ন: প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমান ও নৌবাহিনীকে এমন একটি অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে যা এক ধরনের 'কৌশলগত প্রতিরোধ' (Strategic Deterrence) তৈরি করতে পারে।
# অস্ত্র সরবরাহে বহুমুখী উৎসের বিস্তার: কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অস্ত্রের জন্য নির্ভর না করে চীন, তুরস্ক, ইউরোপ কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে প্রযুক্তি সংগ্রহ করা বুদ্ধিমানের কাজ। তুরস্ক থেকে আধুনিক ড্রোন বা এয়ার ডিফেন্স কেনার সুযোগ মক্কা প্যাক্টে যোগ না দিয়েও স্রেফ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক দিয়েই সম্ভব।
# বঙ্গোপসাগরে ‘ব্লু-ওয়াটার নেভি’ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি মূলত বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস, ব্লু-ইকোনমি ও বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করছে। ফলে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে এমনভাবে শক্তিশালী করা দরকার যাতে সমুদ্রসীমায় কেউ বাংলাদেশকে চাপ দিতে না পারে।
# কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর অবস্থান: "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়"—এই নীতিকে দুর্বলতা ভাবলে চলবে না। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বের মাঝখানে নিজের লাভ অক্ষুণ্ণ রেখে নিরপেক্ষ থাকার নামই আসল কূটনীতি।
৪
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের ‘মক্কা প্যাক্ট’ বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আত্মনির্ভরতার এক নতুন প্রয়াস হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে ঠাণ্ডা মাথার হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও প্রশিক্ষণমূলক যোগাযোগ বাড়ানো অবশ্যই ইতিবাচক; কিন্তু নিজেকে কোনো সামরিক জোটের অংশ বানিয়ে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সরাসরি টার্গেটে পরিণত করা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী। বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা আসবে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করে গড়ে তোলার মাধ্যমে—অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে নয়।
--------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৩ আগস্ট ২০২৬