: সরি। দেরি হয়ে গেল।
: ও তেমন কিছু না। এই ধরুন পৌণে সাতটা থেকে পৌণে আটটা, মোটে একটি ঘন্টা!
: ওভাবে বলছেন! লজ্জা দিচ্ছেন কিন্তু। আসলে সপ্তাহের শেষ দিনটায় গাড়িগুলো যেন মদমত্ত হাতি! যেদিকেই যান না কেন জ্যাম, গাড়ির হর্ণ আর মানুষের অযথা কোলাহল।
: ‘এই শহরের ট্রাফিক জ্যাম কত পুরুষকে প্রেমিক বানালো, প্রেমিকাদের করলো গৃহত্যাগী’।
: বাহ্! দারুণ তো! কার লেখা? আপনার!
: না। এক ছাইচাপা কবি’র।
: ছাইচাপা!
: হুম। তার বাইরেটায় ভস্তক নগরীর শীতলতা আর বুকের ভেতর ফুজিয়ামার মতো জীবন্ত আগ্নেয়গিরি!
: কি যে বলেন!
: কেউ ভালোবেসে খুন হলে ওরকম হয়। প্রেমিক মানে ধ্বংস স্তুপের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক।
: সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়েই কথা বলবেন! নাকি কফিশপের ভেতরে কোথাও বসবো!
: কফিশপটার নাম তাবাক। কোণের টেবিলটা বুক করা আছে।
: বাহ্! দারুন তো! বৃষ্টির ছাঁট জানালার কাঁচে সরীসৃপের মতো গড়িয়ে পড়ছে।
: আমি জানতাম এই জায়গাটা আপনার ভালো লাগবে। রাস্তার দিকটায় তাকান। ট্রাফিক সিগন্যাল আর গাড়ির ব্যাক লাইট ভেজা রাজপথে কেমন পিছলে যাচ্ছে!
: হুম। আলোয় যেন ভেসে যাচ্ছে।
: ‘নোটবুক’ মুভিতে একটা নাচের দৃশ্য আছে, ট্রাফিক সিগন্যালের আলোয় কালো রাজপথে।
: প্রচুর মুভি দেখেন। না!
: বই, পেইন্টিং আর মুভি। সময় কাটানোর আর কোন পথ জানা নেই বলে।
: তাহলে মশাই খুদে বার্তাগুলো কে লিখে?
: ম্যারাডোনার মতো, ঈশ্বরের হাত।
: যা ভিড়! সবাই এতো জোরে কথা বলছে! বনানীর কাঁচা বাজার আর অভিজাত পাড়ার দামী কফি শপের মাঝে কোন পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছিনা।
: ওদিকে কান দেবার কি দরকার! আপনি বরং দু’কান বন্ধ করে ভাবুন, আমরা নর্থ পোলে এস্কিমোদের ইগলুতে বসে আছি, সামনের চুলোয় আগুন, সীল মাছের চর্বি গলে পড়ছে। দূরে কয়েকটা বল্গা হরিণ বাঁধা, আর আকাশ জুরে আলোর মেলা। অরোরা বরিয়ালিস। তুষার ধবল সাদার সাথে আকাশের জোসনার সাদা মিলেমিশে একাকার! তারমাঝে আমরা দুই আদিম নরনারী প্রথম দেখা উদযাপন করছি। পাশের তাঁবুগুলো থেকে ইনুইট তরুণ-তরুণীদের হাসিঠাট্টার শব্দ ভেসে আসছে।
: উহু। আমার ঠান্ডায় বড্ড এলার্জি।
: তাহলে চলুন আমরা বরং আফ্রিকার কথা ভাবি। আমরা হয়তো কেনিয়ার মারা নদীর পারে এক মাসাই পল্লীতে। বিকেলের আবছা আলোয় অদূরে কিছু মাসাই শিশু খেলা করছে, জল নিয়ে ঘরে ফিরছে বিভিন্ন বয়সী নারী। আর আমরা! আমরা হয়তো একটা ডুমুর গাছের নিচে বসে মাসাই তরুণদের আদুমু নাচ দেখছি।
: হুম। ভাবতে ভালো লাগে। মানুষের জীবনটা কীরকম অদ্ভুত, না! আচ্ছা, ওসব বাদ দিন! আপনি বরং আপনার কথাই বলুন। এতো ব্যস্ততার মাঝে আপনার কথা শুনবো বলেই এসেছি।
: তার আগে বলুন কি নেবেন, কফি! নাকি অন্য কিছু?
: আমার জন্য ব্ল্যাক কফি, ব্রাউন সুগার আলাদা করে। আপনি!
: সাধারণত ক্যাপাচিনো। তবে আজকে আপনার সম্মানে আমিও ব্ল্যাক কফি, উইথ ব্রাউন সুগার।
: অনেকটা সময় কেটে গেলো!
: হুম। বারবার ঘড়ির ডায়ালে চোখ রাখছিলেন, খেয়াল করেছি।
: ওটা অভ্যাসবশতঃ। তবে আজ আসলেই হাতে কম সময় নিয়ে এসেছি।
: অপেক্ষার নাগরিক মুহুর্ত যেন কাটছিল না, অথচ দেখুন সান্নিধ্যের সময়গুলো চোখের পলকে দৌড়ে যায়। আর কিছুক্ষণ বসুন না, প্লিজ।
: কাল বাসায় গেস্ট আসবে। বনানী কাঁচা বাজারে যেতে হবে, এই দেখুননা বাজারের ফর্দটা হাতে নিয়েই বেরিয়েছি। আপনাকে তো ফোনে বলেছিই! আজ অল্প সময় দিবো।
: তা অবশ্য বলেছেন।
: অদম্য কৌতূহল আর অভিযাত্রিক বাসনা নিয়ে আপনাকে জানতে এসেছিলাম। অথচ কিছুদিনের খুদেবার্তা আর সেলফোনের কথোপকথন থেকে যতোটা বুঝেছি, তারচে বেশি বিভ্রান্তি নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। আমার অবস্থা এখন দিকভ্রান্ত ঘুরির মতো।
: আমার জীবন তো উপন্যাসের খোলা পাতা, মেলেই বসে আছি! একটু কষ্ট করে পড়ুন। তবে আমাকে খুঁজে পেতে হবে দু’লাইনের মাঝে, ছাপার অক্ষরে না।
: সেতো অনেক শ্রমসাধ্য!
: ভালোবাসার জন্য মানুষ কীনা করে! কেউকেউ শ্যাওলার মতো দু’কূল ছাপানো জলে ভেসে যায়।
: একবারও বলেছি! ‘ভালোবাসি’!
: প্রশ্নটা আমাকে না, গভীর রাতে কফির মগ হাতে জানালার পাশে ঝিরঝিরে বাতাসে দাঁড়িয়ে, কিংবা খোলা ছাদে কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে ভাবুন। উত্তর গোলার্ধ উজ্জ্বল করে রাখা ধ্রুবতারা টাকে জিজ্ঞেস করুন। উত্তর খুঁজে পাবেন, ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’।
: বুঝতে পেরেছি, কথায় আপনার সাথে পারবোনা। এবার তাহলে ওঠা যাক।
: ঠিক আছে। এরপর তাহলে কবে দেখা হচ্ছে?
: এভাবেই দেখা হবে, আরেকদিন। ভালো থাকবেন।
: হুম। ভালো থাকবেন। আপনিও।
