: হ্যালো। মেঘ।
: আজ ঘুম থেকে উঠেই মনেপড়লো বুঝি! কি খবর কবি?
: সবসময়ই মনে পড়ে। সারাক্ষণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকো, চিন্তায় ও চেতনায়।
: ইসস! মিথ্যে কথা। মোটেই তা নয়।! আচ্ছা, আপনার ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে?
: অভিন্ন আকাশের নিচে আমাদের তপ্ত নগরী। বৃষ্টির অবিরাম ধারা দেখেই তোমাকে ফোন করলাম। কয়েকদিনের অসহনীয় গরমের পর বৃষ্টির এই জলসা খুব দরকার ছিল।
: বৃষ্টির জলসা! বাহ্! দারুণ বললেন তো! আপনি এতো সুন্দর করে বলেন……
: মনেহচ্ছে তুমি এখনও শুয়ে। কমফোর্টার জড়িয়ে ঘুমোচ্ছিলে বুঝি! এসি-তে ২০ কিংবা ২২।
: তা বলতে পারেন। বলতে পারেন আধো ঘুম, আধো জাগরণ। ঘুম ভেঙ্গেছে কিন্তু জানালার শার্শিতে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ছাঁট দেখে উঠতে ইচ্ছে করছে না, অথচ খিচুড়ি খেতে খুব ইচ্ছে করছে। আমার কাছে বৃষ্টি মানে তো ভুনা খিচুড়ির দিন, সাথে সামান্য একটা কিছু। আপনি কি করছেন কবি!
: জানালার ওপাশে সজনে গাছের ডালটায় দু’জোড়া শালিক অকারণে ভিজছে। আমি ধূমায়িত চায়ের কাপে ওদের কিছুক্ষণ পরপর পাখা ঝাপটানো দেখছি, দৃশ্যটা দেখতে দেখতে তোমার কথা মনেপড়লো। ভাবলাম একটু ফোন করে খোঁজ নেই।
: ফোন করে ভালো করেছেন কবি, আজ নির্ঘাত আপনার শুভ দিন। অপেক্ষার পালা সাঙ্গ করতে প্রিয় কেউ একজন শীঘ্রই আপনার জীবনে আসবে, বদ্ধ দুয়ারে কড়া নাড়তে।
: তার সাথেই তো কথা বলছি। তুমি প্রিয়জন নও!
: উহু, সেটা বলছি না বাবা! চার শালিক দেখলে প্রিয়জন কাছে আসে।
: ও, তাই বুঝি! কিন্তু একটা তো এইমাত্র কোথায় যেন উড়ে গেল! বাকী রইলো তিন। তার মানে আমার প্রিয়জন পশ্চিম আকাশের নক্ষত্রের মতো দূরে দূরেই থাকবে। আমার বুকে যে জীবন্ত ভিসুভিয়াস তা নেভাতে কখনো কাছে আসবে না। জানো তো এই ভিসুভিয়াস একদিন পম্পেই নগরীর জন্য অভিশাপ বয়ে এনেছিল!
: কেন মনখারাপের কথা বলছেন কবি! সবইতো জানেন, তবু কেন এরকম করেন! নিজে কষ্ট পান, আমাকেও কষ্ট দেন।
: আমি জানি, আমি অবুঝের মতো কথা বলি। কিন্তু মন তো মানতে চায়না মেঘ। মাঝে মাঝে মনেহয় এই সমাজের নিয়ম-কানুন সব ধ্বংস করে ফেলি। মাঝে মাঝে আমার সম্রাট শাহজাহান হতে ইচ্ছে করে।
: ওমা! সেকি! কেন কবি?
: সে এক হৃদয় লুণ্ঠনের ইতিহাস! আরেকদিন বলবো।
: শুনুন, তিন শালিক মানে আজ আপনার কাছে চিঠি আসবে। সেই চিঠি হয়তো নিয়ে আসবে কোন মঙ্গল বারতা! আনন্দে ঝলমল করে উঠবে আপনার মুখ! আপনি জানেন আপনার হাসিমুখ দেখতে আমার ভালো লাগে। যদি পারতাম……
: এযুগে কেউ চিঠি লিখে না মেঘ!
: তাহলে খুদে বার্তা! সেটাও তো চিঠির মতোই! নাতিদীর্ঘ চিঠি কিংবা নিদেনপক্ষে একটা চিরকুট!
: তুমি তো জানো এখন লেখালেখির জায়গা দখল করেছে দেখাদেখি। এখন কেউ সবুজ ঘাসের মাঠ নয়, ডেট করার জন্য বেছে নেয় দশ বাই বারো বর্গফুটের ঘর। পৃথিবীটা আসলেই ছোট হয়ে এসেছে, পোস্টঅফিসের ডাকবাক্সগুলোও আজকাল অযত্নে হা মেলে পড়ে থাকে। অথচ সেসব একসময় কত গল্প-কথা-উপন্যাসে ভরে থাকতো, মানুষের অজস্র স্মৃতির বাহক হয়ে। প্রযুক্তির দস্যিপনায় দিনগুলো কীরকম হারিয়ে গেল! প্রেম-ভালোবাসার অনুভূতিগুলোও যেন কেমন বিবর্ণ-ফ্যাকাশে। ওসব বাদ দাও, তুমি দেখছি পাখি বিশারদ ইনাম আল হক। তিন শালিকের কথা তো শুনলাম, এবার দুই শালিকের কথা বলো শুনি।
: দুই শালিক মানে তো আনন্দ আর আনন্দ। এখন কী একজোড়া! তবে এখনই ওদের দিকে তাকিয়ে সালাম দিন। আজ ঘরের দরজা-জানালা-ঘুলঘুলি বেয়ে আনন্দ এসে আপনাকে ভাসিয়ে নেবে। আর হ্যাঁ, এক শালিক মানে কিন্তু দুঃখ। ওরকম দিন যেন আপনার জীবনে না আসে কবি!
: প্রকৃতির কি অদ্ভুত খেয়াল দেখ! তোমার কথাটা সত্যি প্রমাণ করতেই শালিক জোড়া যেন উড়ে গেল। আমার সামনে এখন একটা নিঃসঙ্গ শালিক। এই মুহুর্তে সে ভিজছে বৃষ্টির জলে, আর আমি ভিজছি তোমার বিরহ ধারায়। এ আমার এক জীবনের কান্না, মেঘ। একটা অপূর্ণতার উপাখ্যান! এইমুহুর্তে নিজেকে সজনের ডালে বসে থাকা ঐ হতভাগ্য শালিকের মতোই মনেহচ্ছে।
