: আপনার সাথে দেখা করবো বলে শহরের সব গাড়ি আজ রাস্তায়, শ্বাস নিলে শুধু কার্বন!
: যুগ যুগ ধরে সুন্দরী রমণীরা প্রেমিকদের অপেক্ষায় রাখবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম! ভালোবাসা মানে আমার প্রতি তোমার অবহেলা।
: আহা! নির্মলেন্দু গুন থেকে, কতবার বারণ করেছি। কবির মুখে শুধু তার লেখা কবিতার লাইন শুনতে চাই, যেখানে কবির নিজস্ব অনুভূতি মিশে থাকে, ভিজে মেঘের দুপুরের মতন।
: বলেছিলে বুঝি! সময় গড়িয়ে যাচ্ছে নুড়ি পাথরের মত, জুলফির প্রান্তেও আজ রূপোলী ঝলক।
: ইচ্ছে করেই ভুলে যান, জানি। কথা দিলেও রাখতে পারেননা, সেও ইচ্ছে করেই।
: কথা দেই কথা ভাঙবার বাহানায়। তোমার অভিমানের রেশ ছুঁয়ে যায় বিকেলের ছায়ার মতন, সেটা দেখবার ইচ্ছেয়। এখন যেমন………
: ‘স্প্যারো’! কফিশপের নামটা কি সুন্দর! তাই না!
: বুঝলাম প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইছো। এই তল্লাটে এদের কফিটাই সবচে ভালো। একটা আলাদা ফ্লেভার আছে। কফির নেশায় পুঁজিবাদের সেলোফোন পেপারে মোড়ানো রমণীরা এখানে আসেন শরীরের অর্গানিক ঘ্রাণ হারিয়ে। তাদের সিনথেটিক পারফিউম আর ব্ল্যাক কফির ফ্লেভার মিলে মুগ্ধতার একটা রেশ ডোপামিন ভুড়ভুড় সন্ধ্যেয় ছড়িয়ে পড়ে চারপাশ।
: ওহ! তাই বুঝি! আমাকে সামনে বসিয়ে অন্য নারীদের নিয়ে গবেষণা হচ্ছে! কি ব্যাপার বলুন তো!
: আমি আজন্মের হাভাতে। তবে তোমার শরীরের একটা আলাদা ঘ্রাণ আছে, আমি বেশ টের পাই।
: তাই বুঝি! তো সেটা কীরকম?
: তুমি বুঝবে না। আমি চোখ বন্ধ করে, শুধু বাতাসের ঘ্রাণ মেপে বলতে পারি তুমি এসেছো, আছো আশেপাশে কোথাও।
: উহু, ওটা আমার শরীরের না, পারফিউমের ঘ্রাণ। শ্যানেল, নাম্বার ফাইভ। আমার ভীষণ প্রিয়।
: আমি জানি। ওটার টপ নোটে অ্যালডিহাইডের সাথে আছে লাং লাং, বার্গামট আর পীচের নির্যাস। মিডল নোটে আইরিস-জেসমিন-লিলি অফ ভ্যালী’র মিশ্রণ আর বেইজ নোটে লেগে থাকে স্যান্ডেল উড-ওক মস-ভ্যানিলা-প্যাচৌলি’র সুঘ্রাণ। তোমাকে ছুঁয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
: বাব্বাহ! আপনি দেখছি পিএইচডি করে বসে আছেন।
: তা না, তবে আমার মত ক্ষ্যাপাটে প্রেমিক যারা, তারা খুব সহজেই সিন্থেটিক পারফিউমের বেইজ নোট থেকে প্রিয় রমণীর শরীরের সোঁদা ঘ্রাণ আলাদা করতে পারে।
: প্যাচৌলি কি!
: আবারও প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইছো! ওটা এক ধরণের গুল্ম, প্রসাধনী বানাতে দরকার হয়।
: বুঝলাম। কিন্তু এখানে বসেছেন কেন! যা ভ্যাপসা গরম বাইরে।
: স্মোকিং জোন। তুমি ছিলে না তাই। নিজের সাথে কথা বলার জন্য, সিগারেটের মতো উত্তম বন্ধু আর হয় না।
: কী যে ছাইপাশ খান! কাকে পোড়ান?
: কাউকে না, স্মৃতি পোড়াই, নিজে পুড়ি।
: কেন এমন করেন?
: কখনো ভালোবাসোনি বলে।
: কেন এতো দুঃখবোধ কবি!
: কেউ মুছে দেয়নি বলে।
: কীসে এতো কষ্ট!
: কেউ পাশে নেই বলে।
: আছি তো! এই যে, আপনি বেশ লিখছেন আর আমি তা কন্ঠে ধারণ করছি। প্রাণবন্ত হচ্ছে বইএর পাতায় সেঁটে থাকা অনুভূতিগুলো। এটাই কি পাশে থাকা নয় কবি!
: আসলেই আছো কী! আমিতো চাই কেউ আমাকে সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকুক, ক্রিপারস যেমন। আমার দু’চোখের মাঝে শেকড়ে-বাকলে হোক কারো বৃক্ষের সংসার।
: তা তো হয়না! বাস্তবতাটা ভিন্ন, সবই তো জানেন। তবুও কেন এতটা অবুঝ!
: গভীর রাতের অভিমান শিওরের বালিশকে বলে, কিছু মানুষ আছে অবিকল মানুষের মতো!
: এবার আপনি প্রসঙ্গ পাল্টালেন। তারা কারা? এলিয়েন!
: না, তারা জোম্বিও না। জোম্বিদের তবুও একটা গন্তব্য থাকে, ক্রমাগত ছুটে যায় মৃত্যুর দিকে, পতঙ্গ যেমন। আমি যাদের কথা বলছি তারা হলো বায়োলজিকাল রোবট, আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। মানুষের মতো হাত-পা-মুখ থাকলেও তাদের হৃদয়টা আসলে প্লাস্টিক।
: কেন এত হেয়ালিপনা! আঘাত করে কেন বলেন এসব! হৃদয়াবতী না হলে, কমলা রোদের এই নরম বিকেলে নিজেকে কেউ পোড়াতে আসে!
: তুমি তো নও। আমি তাদের কথা বলছি, যারা ভালোবাসতে জানে না। এই শহরের উপচে পড়া প্রাচুর্য আর স্বাচ্ছন্দ্যে বন্দি তাদের হৃদয়টা যে বিশুদ্ধ ভালোবাসার অভাবে হাঁসফাঁস করে, তারা বুঝতেও পারেনা।
: ভালোবাসা না থাকলে পৃথিবী পূর্ণ হলো কীকরে! চারপাশে তবে কেন এত আয়োজন!
: ওটা একটা জৈবিক প্রক্রিয়া। সময়ের ভাঁজে পৃথিবীর রমণীরা ভালোবাসা ছাড়াই সন্তান প্রসব করে গেছে মে ফ্লাই যেমন, তারা পুলকের স্বাদ পায়না। তারপরও পৃথিবীতে যাদের আসবার কথা ছিল তারা এসে ফিরে গ্যাছে পুর্ণতার ছায়া মেপে।
: উফ! আপনার সাথে কথা বলতে গেলে মাথা ধরে যায়। দেখুন তো কাঁচের চুড়িগুলো। আজ আপনার সাথে দেখা করতে আসবো বলে কিনেছি, আপনার কানের কাছে রিনিঝিনি মেলে ধরবার মেয়েলীপনায়।
: চুড়ি! ওতো দাসপ্রথার ধূসর অভিজ্ঞতা।
: বুঝেছি, আজ আপনাকে ভুতে পেয়েছে। এখানে বেশ গরম, ভেতরে চলুন। বেশ খিদে পেয়েছে।
: তুমি যাও, আমি শেষ টানটা দিয়ে আসছি।
