তোমার সাথে ওভাবে আবার দেখা হবে ভাবিনি,
দীর্ঘ পনেরো বছর! প্রায় দেড় যুগের ব্যবধানে-
আবারও দেখলাম তোমাকে।
সেই গভীর চোখ, সেই খাড়া নাক-ভুরু সব আগের মতোন
শুধু জুলফির চুলে হালকা রূপোলী রেখা।
চোখ আগের মতোই হাসে, অবিরাম কথা বলে
সেই আগের মতোই-
ঠোঁট যতোটা না বলে, চোখ বলে তারচে বেশি!
একুশের প্রথম প্রহর, শহীদ মিনার জুড়ে মানুষের ঢল,
আমি গিয়েছি কলেজের মেয়েদের নিয়ে-
ওদের গাইড করার দায়িত্ব আমার কাঁধেই বর্তালো-
আমি, সাথে আরও কয়েকজন।
বেদীতে ফুল দেয়া হলে ফিরে এসে তোমাকে আর পাইনি
অথচ তুমি দাঁড়িয়েছিলে দেয়াল ঘেঁষা হৈমন্তী গাছটার নিচে,
এদিক সেদিক কতো তাকালাম! তোমাকে আর খুঁজে পাইনি।
লোকটা কী সত্যিই তুমি ছিলে! নাকি দৃষ্টি বিভ্রম!
আমার ক্লান্ত দু’চোখ তো সারাক্ষণ তোমাকেই খুঁজে ফেরে।
আবার ভাবি, তা কী করে হয়!
সেই চোখ-নাক-ভ্রূ তো মিথ্যে হতে পারে না!
সেই যে ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে রাখা সিগারেট-
বাতাসে ধোঁয়ার কুন্ডলি, পরনে ঘিয়ে রঙের খদ্দের,
কাঁধে ঝোলানো পাটের ব্যাগে নিশ্চিত ‘দাস ক্যাপিটাল’।
কলেজ ক্যাম্পাসে শিমুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে,
আর আমি ছিলাম তোমার মনোযোগী শ্রোতা।
কিছুটা বুঝতাম, তবে বেশিরভাগই বুঝতাম না-
তুমি দু’চোখে স্বপ্ন মেখে সেসব বুঝিয়ে দিতে,
আমি ঘাসের ডগা ছিঁড়তে ছিঁড়তে কল্পনায় ডুবে যেতাম।
তুমি বলেছিলে আমাদের সন্তানের নাম হবে ভ্লাদিমির-
আমি এখনও বিয়ে করিনি, এখনও তোমার অপেক্ষায়-
মিছিলের রাজপথ থেকে তুমি একদিন ফিরে আসবে।
তোমার কর্মক্ষেত্র সারাবিশ্ব অথচ-
আমি তো চেয়েছিলাম ছোট্ট একটা সংসার,
তুমি, আমি আর আমাদের ছোট্ট ভ্লাদিমির।
বিপ্লব আমি সংসার থেকেই শুরু করতে চেয়েছিলাম-
আমি চেয়েছিলাম আমাদের সন্তান মানুষকে ভালোবাসুক,
মেয়েদের একতাল মাংস পিন্ড না, মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখুক।
এই পচে-গলে যাওয়া পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায়-
যেখানে প্রতিনিয়ত নারীদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত,
সেখানে ওটাই তো সবচে আগে দরকার রওনক দা!
বিপ্লবটা না হয় ওভাবেই শুরু হোক!
শ্রেণী সংগ্রাম বলতে আমি তো বুঝি ভাতের অধিকার-
শিক্ষার অধিকার,বস্ত্র-বাসস্থান, মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার।
কলেজের বাসে যাওয়া আসার পথে-
আমি হৈমন্তী গাছটার দিকে আজও তাকিয়ে থাকি।
এই হেমন্তে গাছটা ঘিয়ে রঙের ফুলে ভরে গেছে-
তোমার ঘিয়ে রঙা খদ্দেরের পাঞ্জাবিটার মতো।
রওনক দা আমি আজও বিশ্বাস করি-
সেদিন পত্রিকার পাতায় যা ছাপা হয়েছিলো তা মিথ্যে,
রওনক রা কখনো এভাবে হারিয়ে যেতে পারে না,
তারা তারাখসা র মতো আকাশে মিলিয়ে যেতে নয়-
ফিনিক্স পাখির মতো পৃথিবীতে বারবার আসে-
বারবার ফিরে আসে, নক্ষত্রদের জন্ম দিতে।
