কেউ রওনকের জন্য একটা চাকরি খুঁজে দেবেন!
বেতনটা খুব বেশি না-
হাজার বিশেক হলেই চলতো।
ওর জন্য আসলে একটা চাকরির খুব দরকার,
করোনার প্রথম আঘাতে যারা চাকরি খোয়ালো-
রওনক তাদেরই একজন,
আজ উনিশ দিন হতে চললো সে কর্মহীন।
সে এখন প্রতিদিন পার্কের ওদিকটায়-
সবুজ ঘাসের বুকে শুয়ে
আকাশের নীল সীমারেখায় নিকোটিন ছুড়ে দেয়।
আজো মেয়েটাকে স্কুলের গেটে পৌঁছে দিয়ে
সে পার্কের বেঞ্চে বসেছে, ছ’টা বাজলে ঘরে ফিরবে-
অদিতি, রওনকের স্ত্রী এখনো জানেনা।
চাকরিটা খোয়ানোর পর-
প্রথম দু’সপ্তাহ এখানে ওখানে অনেক দৌড়েছে,
কিন্তু একটা ছোটখাট চাকরিও মেলেনি, কে দিবে চাকরি!
করোনার তান্ডবে সবখানে যে কর্মী ছাঁটাই চলছে!
বিধ্বস্ত চেহারা দেখে অদিতি একদিন জিজ্ঞেস করলেও
অফিসে কাজের চাপ বলে রওনক এড়িয়ে গেছে।
মুখ শুকনো কেন জিজ্ঞেস করলে বলেছে-
অফিসের গৎবাঁধা লাঞ্চের মেনুতে যমেরও অরুচি,
দুটো আলু অথবা কুমড়ো টুকরোর সাথে ব্রয়লার মুরগী
পাতলা ডাল যেকোন মেসের রান্নাকেও হার মানাবে।
মুমু’র স্কুলের বেতন দু’মাস বাকী পড়েছে-
কথাটা বলে অদিতি ছায়ার মতো সরে গিয়েছিলো,
রওনক চুপচাপ শোনে-
করোনার তান্ডব মানুষের পেটের খিদে, চোখের ঘুম
এমনকি মুখের ভাষাও নিয়েছে কেড়ে।
খরচের দায় মেটাতে সেদিন-
বিয়ের আংটিটা বিক্রি করতে হয়েছিলো।
খাওয়ার টেবিলে অদিতি অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলো-
ড্রয়ারে রেখেছে বলে প্রসঙ্গ পাল্টেছে,
কিন্তু এরপর কি? হাতঘড়িটা!
বিয়ের স্মৃতিগুলো কী এভাবেই মুছে যাবে!
তারপর! তারপর কি? অদিতির গয়না!
এটা কি একটা সমাধান! আর কতদিন? কতকাল এভাবে!
ইদানীং চাইলেও খুচরোর অভাবে
সিগারেটের মাত্রাটা বাড়াতে পারেনা,
বুকটা কেমন চেপে আসে, হাঁসফাঁস করে।
মাঝরাতে শুন্য বিছানা দেখে-
অদিতি বেলকনিতে পাশে এসে দাঁড়ায়,
হাতটা চেপে ধরে কি হয়েছে জানতে চায়।
রওনক চাইলেও চেপে রাখতে পারেনা-
বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে জানায়, চাকরিটা আর নেই,
ফ্যাক্টরিতে তালা ঝুলছে, চলছে কর্মী ছাঁটাই।
প্রবল উৎকন্ঠা নিয়ে অদিতি শরীর ঘেষে দাঁড়ায়-
স্বামীর বুকে মাথা রেখে বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো।
রওনকের চোখের কোন থেকে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ে,
অদিতি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দেয়।
আকাশের মেঘটা বুঝি সরে গেলো!
শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ ভাসিয়ে দেয় তাদের,
ভাসিয়ে দেয় উত্তরের ছোট বেলকোনিটাও-
জানলার পর্দা সরে গেলে মুমুর মুখটা দেখা যায়,
পুতুলটা বুকে জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন!
তাদের হাতের মুঠোর বাঁধন জোড়ালো হয়।
ভালোবাসা-মায়া-মমতাহীন এই ধূসর নগরীতে-
সর্বশেষ রোমান্টিক জুটিটার প্রেম বাঁচিয়ে রাখার জন্য
রওনকের চাকরিটা খুব দরকার,
কেউ কি একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন!
বেতন খুব বেশি না, হাজার বিশেক হলেই চলতো।
