বিকেলের রোদে কচুরিপানায় জল ফড়িঙের যে অবাক নাচানাচি!
সে জীবন আমার না, কিংবা ধরো-
অবেলার বৃষ্টি শেষে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া নরম কমলা রোদে
ঘাস ফড়িঙের যে এলোমেলো ছুটোছুটি!
সে জীবনটাও আমার না,
আমার জীবন তো জীর্ণ সুতোয় বাঁধা-
চৈত্রের তপ্ত বাতাসে দোল খাওয়া ক্লান্ত ঘুড়িটার মতো,
যার প্রান্ত ছুঁয়ে কালো ফিঙেদের আজো কি দারুণ মাতামাতি!
ছোটবেলায় একদিন আমার বেয়ারা হাতে-
সূতায় বাঁধা দুরন্ত ফড়িঙের লেজ ছুটে গিয়েছিলো,
শীর্ণ শরীর থেকে খসে পড়া সে লেজটা দেখে-
সেদিন আমি কি রকম গুঁটিয়ে গিয়েছিলাম মাইরি!
সারারাত ঘুমোতে পারিনি অব্যক্ত এক যন্ত্রণায়।
আমার জীবনও তো হতে পারতো সূতোয় বাঁধা ফড়িঙের মতো!
তেপান্তরের মাঠ পেড়িয়ে ঘুরিয়া খালের যে বাঁক-
সেখানে ফাগুনের জোছনায়-
শ্বেতদ্রোণের ঝাড়ে অস্থির জোনাকিরা আজো খেলা করে,
বুকে তাদের ভালোবাসার তীব্র দহন।
সে দহনে আমিও পুড়ে খাক্ হই জানিস!
সেখানে সবুজ প্রান্তর ছুঁয়ে থাকা আকাশের জ্বলজ্বলে তারাগুলো-
নিজেদের মাঝে ফিস্ফিস্ করে কথা বলে আজো!
মনেপড়ে কৈশোরে একবার
বুক পকেটে জোনাকি পোকা রেখেছিলাম
ইতিকে ভয় দেখাবো বলে,
আরেকবার তেলেসমাতি দেখানোর আশায়
কাঁচের শিশিতে ভরে রেখেছিলাম অজস্র জোনাকি পোকা।
কিন্তু কি জানিস!
অক্সিজেনের অভাবে ওরা নিজেরাই জ্বলতে জ্বলতে-
সলতের মতো একসময় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো।
আমার আর তেলেসমাতি দেখানো হয়নি রে!
জোনাকির ফসফরাস আলোয় পুড়ে ছাই হয়েছিলো
আমার কিশোর বেলার প্রেম।
ইতির আঁচলে তাই এখন অন্য পুরুষ খেলা করে-
বরুনার মতো ইতির শরীর জুড়েও এখন অন্য পুরুষের ঘ্রাণ!
শেয়ালকাঁটার জঙ্গলে দস্যি বাতাসে প্রজাপতির যে নাচন-
সে জীবনটাও কিন্তু আমার না,
একবার বোশেখের ঝড়ে বিপন্ন প্রজাপতির হলুদ রঙ-
ফিকে হতে হতে জলে মিশে গিয়েছিলো,
চোখের জলে সব রঙ খুইয়ে প্রজাপতির তখন
ফসলের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকা বিবর্ণ কাকতাড়ুয়ার দশা!
আমার মধ্যবিত্ত আত্মা থেকে স্বপ্ন তাড়াতে যেয়ে,
কখন যে আমিও কাকতাড়ুয়া বোনে গেছি বুঝতেও পারিনি!
যেমন বুঝতে পারিনি ছোট বেলার সে ফড়িঙ-
সে জোনাকি-সে প্রজাপতির জীবন আসলে আমার না।
আমার তো লেটার প্রেসের বনসাই জীবন-
জয়নুলের গরুগাড়ির মতো নিজেকে বয়ে চলা,
অভিশপ্ত সিসিফাসের মতো আমিও জীবনের কাছে
জীবনের ঋণ শুধে চলি,
ইতিকে না পাওয়ার কষ্টের মতো অজস্র কষ্ট তাই-
বুকের গভীরে মেডুসার সাপ হয়ে খেলা করে আজো।
নিখিল, সুনীলের নিখিলেশ এর মতো তুইও এসে দেখে যা-
বারুদ-বুলেট-ককটেলের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, আর দহনের মাঝে-
আমি কি রকম বেঁচে আছি!
