এই কাঠ-কয়লায় আঁকা জীবনটা তো অন্যরকম হতে পারতো!
অন্যরকম হতে পারতো পরিযায়ী বলাকার ফিরে যাওয়া কিংবা
শামুক আর ভুবন চিলের অন্তহীন ভালোবাসা।
জোনাকির বুকের দহন অতোটা তীব্র না হলেও তো পারতো,
সংক্ষিপ্ত হতে পারতো এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য-
পলাশের বুভুক্ষু চেয়ে থাকা কিংবা বিবাগী চাতকীর.....
কাঁচপোকা-ঘুণপোকা-দোয়েল-শ্যামাদের-
এই প্রান্তর আরও সবুজ হতে পারতো।
শ্যাওলায় ছেয়ে থাকা শহরের দেয়ালগুলো হতে পারতো
ম্যুরালে ঢাকা অসংখ্য গোয়ের্নিকা,
ধুলোয় মলিন রাজপথ হতে পারতো আলপনায় আঁকা চিত্রকর্ম
আর সড়ক দ্বীপগুলোয় দাড়িয়ে থাকতে পারতো গর্বিত ভাস্কর্য।
শহরের ইট-কাঠ, দালান-কোঠার দিকে তাকালে
আজ কেবলি মনেহয় খদ্দেরের আশায় বসে থাকা
রাতজাগা কোন এক বেশ্যা, যার শরীর জুড়ে শুধুই ক্লান্তি
ক্লান্তি তার দু’চোখের গভীরতায়-ওড়নার প্রান্তে-তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে।
জানিনা কতোটা রঙিন, পরিপূর্ণ আর বাস্তব হতে পারতো-
ছেলেবেলায় পাঁচ দুপুরে দেখা স্বপ্নগুলো।
জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলো এরকম হবার কথা ছিল না!
কথা ছিল না হাজারো মুক্তিযোদ্ধার-
বুকের গভীরে লালন করা স্বপ্নগুলোর এরকম হবার!
এই যে আগুনের লেলিহান শিখা, বুলেটের ঝাঁঝালো গন্ধ,
রাস্তায়-ডোবায় পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশ-
এসব তো একাত্তরেই শেষ হবার কথা ছিল!
জানিনা বেঁচে থাকবার নুন্যতম অধিকারে কেন কিশোরীদের শরীর বেচতে হয়?
তার তো বেণী দুলিয়ে পুতুল খেলবার কথা!
দাবী আদায়ের জন্য এখনো কেন রাজপথে রক্ত ঢেলে দিতে হয়!
নাগরিক অধিকার তো এমনিতেই মিলবার কথা!
এখনো কেন মিছিলে পুলিশের গুলী? সাম্রাজ্যবাদী পুলিশের মতো,
এসব তো অবাঙ্গালী পুলিশ করেছিল!
শাসনযন্ত্রের বন্দুকের আঘাতে সন্তানের শবদেহ কেন পিতার কাঁধে!
এসব তো আয়ুবখান-ইয়াহিয়ার প্রেতাত্মার সাথে বিদেয় নেবার কথা!
এই জুঁই-জবা-বেলীদের রাজ্য তো অন্যরকম হবার কথা ছিল!
অন্যরকম হবার কথা ছিল মায়েদের মুখ-বোনেদের ভালোবাসা-
ভাইয়ের বন্ধন-সোঁদা মাটি-ফসলের মাঠ-সবুজ প্রান্তর
কৃষক পিতার শরীরে ঘামের তাতানো গন্ধ!
চারপাশে ঘুরে বেড়ানো এইসব স্বপ্নবাজ চেহারা, এরা আসলে আমার কেউনা।
বিধ্বস্ত জমিন-পোড়া বিভূঁই আমার দেশ না, হতে পারেনা।
এই কৃষ্ণচূড়া-পলাশ-পারিজাত-শিমূলের প্রান্তর আমার না।
এই পৌষ-বসন্ত-বোশেখ-ভাদরের মৌতাত আমার না।
এই কার্তিক-নবান্ন-পিঠা-পুলি-পায়েসের দেশ আমার না।
এই সবুজ ঘাস-শেয়ালকাঁটা-ভাঁটফুল-শ্বেতদ্রোণের ঝাড় আমার না।
এই কলাপাতা-বাঁশ ঝাড়, লুকনো ডাহুকের চোখ আমার না।
বিষণ্ণ বায়স-শালিকের ঠোঁট-মাছরাঙার অনন্ত অপেক্ষা আমার না।
হাড়ের কাঠামোয় বেঁধে রাখা এই আপোষকামী আত্মাটা আমার না।
এই জোছনা এই নীহারিকা এই আকাশ এই পৃথিবী আমার না।
আমি মুক্তি চাই এই অবিচার-অন্যায়-অনাসৃস্টি থেকে,
আমি মুক্তি চাই আমার মাটি থেকে,
আমি মুক্তি চাই আমার শেকড় থেকে, জীবনের থেকে,
আমি মুক্তি চাই আমার নিজের কাছ থেকে।
আমি বলতে চাই কবি নবারুন ভট্টাচার্যের ভাষায় চীৎকার করে-
শোন হে মানুষ! এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না।।
