গতকাল দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতাটা ওল্টাতেই-
তোমার লেখাটা চোখে পড়লো।
শুরুতে অবশ্য বুঝতে পারিনি, অনিকেত- ছদ্মনামে লিখেছ,
কিন্তু কেন!পাঠকের মাঝে প্রকাশিত হতে চাওনা বুঝি!
তোমার লেখার হাত বরাবরি ভালো ছিলো,
এখন অবশ্য লেখা যে আরও ধারালো হয়েছে তা’ বেশ বুঝতে পারছি।
এক সময় তোমার লেখার প্রথম পাঠক তো আমিই ছিলাম!
তাই কবিতার ছন্দ আর শব্দচয়ন ধরে
কবিকে আবিষ্কার করতে যেয়ে বেগ পেতে হয়নি মোটে,
শব্দের পরতে পরতে তুমি লিখে গেছো তোমার অনুভূতির কথা।
কিন্তু কোথাও নিজের ব্যর্থতার কথা লিখতে পারোনি, লিখেছো কি!
হয়তো ভুলে গিয়েছিলে কিংবা সাহসে কুলোয়নি।
যেমন সাহস দেখাতে পারোনি আজ থেকে ছ’বছর আগে এক বিষন্ন হেমন্তে-
অর্ধযুগ! মাঝে অনেকটা সময় পেরোলেও আজো ঠিকি মনে আছে-
সেই শিউলি ঝরা খুনে বাতাসের দিনটার কথা! তোমার কাছে-
কুয়াশায় ভিজে ছুটে গিয়েছিলো সদ্য কৈশোর পেরোন এক তরুণী।
এইচএসসি ফার্স্ট ইয়ার।কতোইবা বয়স, ধরো ষোল কিংবা সতেরো-
চকচকে নতুন টাকার ঘ্রাণের মতো চারদিকে তখন চনমনে হাওয়া-
পলাশ-জুঁই-হাস্না হেনার বসন্ত ছুঁই ছুঁই আমার সমস্ত অন্তর জুড়ে।
তুমি হালকা বাতাসে ভেসে আসা শিমূল তুলোর মতো ছোঁয়া দিতেই-
ভেঙে চুরমার হয়েছিলো আমার সমস্ত অহংকার, প্রবল প্রতিরোধ-
আমি যেন সে আহবানে ক্রমশ অবশ হয়ে ইনফার্ণোতে তলিয়ে গিয়েছিলাম-
ফেরাতে পারিনি তোমাকে, কিংবা হয়তো ফেরাতে চাইনি ইচ্ছে করেই!
উত্তর খুঁজে ফিরি আজো, কেন ফেরাতে পারিনি সেদিনের আহ্বান;
আচ্ছা প্রেমে পড়লে ছেলেরা কেমন হাবাগোবা হয়ে যায়, তাই না!
আমার বেশ মনে আছে প্রথম দিনটার কথা-
সেই যে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, স্বপ্নমাখা দু’চোখে কালো ফ্রেমের চশমা
আর মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া এলোমেলো চুল,
সময়কে ছুটি দিয়েছিলে তাই হাতে ঘড়ি পড়তে না।
সেদিন তোমাকে দেখে হাসি যেমন পেয়েছিলো আবার অবাকও হয়েছি খুউব!
কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে যার বজ্রকন্ঠের শ্লোগান শুনতাম-
দিনবদলের প্রতিজ্ঞায় যার চোখে-মুখে অনুকরণীয় আত্মবিশ্বাস-
মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদে যার ছিলো কি দারুণ দখল-
নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যে ছিলো প্রথম সারিতে-
চে’র মতো সেই টগবগে তরুণের কেন ভেজা তুলোর দশা হবে!
তোমার দিকে তাকিয়ে আমার সেদিন আসলে খুব কষ্ট হয়েছিলো।
ওড়নার প্রান্তে চোখের জল মুছে প্রায়ই ভাবতাম, ভুল করছি নাতো!
ছোটবোনের বান্ধবী ছিলাম বলে তোমার বাসায় আসা-যাওয়াতো ছিলোই।
তোমার সঙ্গে কখনো দেখা হতো, আবার কখনও দেখা হতো না।
আমি কিন্তু আড় চোখে তোমাকে প্রায়ই খুঁজতাম,
তুমি হয়তো বুঝতেও পারোনি,
ছোটবোনকে তুই-তোকারি করার সুবাদে আমাকেও তাই বলতে,
প্রথম দিকে রাগ লাগতো খুব, কিন্তু পরে ঠিকি মেনে নিয়েছিলাম।
আসলে প্রিয়জনের কাছ থেকে তুমি ডাকটাই বেশী প্রত্যাশিত,
‘তুমি’ অনেক বেশি মায়াবী আর আপন লাগে।
আমি কিন্তু তোমাকে বরাবরি আপনি বলে ডাকতাম-
আর তুমি তা’ নিয়ে আমাকে ক্ষ্যাপাতেও প্রচুর,
পাতাঝরা চৈত্রের সে দিনগুলোয় তুমি অভিমান করলেও
কি এক লজ্জার অর্গল খুলে আমি বেরিয়ে আসতে পারিনি।
অথচ দেখো,আজ কিরকম অবলীলায় তোমাকে তুমি করেই বলছি।
হয়তো সময় মানুষকে বদলে দেয়,
বদলে দেয় তার চাওয়া-পাওয়ার হিসেবের খাতা।
একবার রাজনীতির কারণে তুমি কিছুদিনের জন্য জেলে ছিলে,
আমি কলেজের দেয়ালে লেখা শ্লোগান দেখে তা’ জেনেছিলাম,
‘রওনক ভাইয়ের মুক্তি চাই, দিতে হবে’
পার্টির ছেলেদের কাছে খোঁজ নিয়ে ঘটনার সবটা জানতে পারি।
তোমাকে নিয়ে তখন আমার ভীষণ কষ্ট, আবার গর্বও হয়েছিলো।
আচ্ছা, জেলখানার অন্ধ কুঠুরিতে তারা তোমাকে মেরেছিলো কি!
খেতে দিয়েছিলো কি ঠিক মতো? ঘুমোতে পেরেছিলে কি?
আমার আজো খুব জানতে ইচ্ছে করে!
রেলের কলোনীতে আমার ঘরের জানালার পাশে দোলনচাঁপার ঝার ছিলো-
হালকা মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ভেসে আসতো সাদা রঙের ফুলগুলো থেকে।
আমার বেশ মনে আছে, প্রথম যেদিন দেখা হবে-
প্রায় সারারাত জানালার শিক ধরে
আমি আর জেগে থাকা ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ মেখে নিয়েছিলাম সে ঘ্রাণ-
কি এক উত্তেজনায় সে রাতে ঘুমোতে পারছিলাম না মোটে।
তুমি আজো আমার কসমেটিকস এর ব্র্যান্ডগুলো মনে রেখেছো।
অথচ ব্র্যান্ড বলেতো কিছুনা, ভাইয়া ওগুলোই পাঠাতো বিদেশ থেকে,
এখন অবশ্য অন্য ব্র্যান্ড ব্যবহার করি, বদলে ফেলেছি পারফিউমের ঘ্রাণও-
যেমন বদলে ফেলেছি নিজেকে, বিগ ব্যাঙ্ থিওরীর মতো-
তোমার কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যেতে যেতে আর
অন্য আকাশের গ্রহচারী হয়ে এতোটা দূরে চলে এসেছি যে-
চাইলেও আর ফেরা হয়না, আসলে আর ফেরা যায়না।
