একবার ডেকে দেখ আমি ফিরে আসি কি না!
ফিরে আসি কি না তোর স্পর্শের সীমারেখায়
তোর অনামিকার নাগালে এসে আংটি হয়ে সেঁটে থাকি কি না দেখ!
কবর সমান নিস্তব্ধতায় আমার প্রতিটা মুহুর্ত কাটে নীরবে
সময়গুলো মিনিট থেকে সেকেন্ড হয়ে ঝুলে থাকে হ্যাঙ্গারে,
সময়ের সাথে ঝুলে থাকে তোর দেয়া পাঞ্জাবিটাও-
কোন এক বসন্তের দিনে দিয়েছিলি আমাকে।
তুই হয়তো জানিস না, তোর হাতের স্পর্শ মুছে যাবার ভয়ে
ওটা আমি ধুতে দেইনি কখনও,
এমনকি পাঞ্জাবির কলারে লেগে থাকা তোর ঠোঁটের গ্লসি স্পর্শটাও
ববিব্রাউন ব্র্যান্ডের ক্রিমসন রেড লিপস্টিকের দাগটা ছিল বড় প্রিয়,
এই আমি কীরকম হাভাতের মতো তাকিয়ে থাকতাম তোর ঠোঁটের দিকে!
তুই হয়তো কখনো এক পয়সা আধ পয়সা ছুঁড়ে দেয়ার মতো-
একটা দুটো স্পর্শ ছুঁড়ে দিতি আমার সিগারেটে পোড়া ম্যাট গ্রাফাইট ঠোঁটে।
ম্যাট আর গ্লসির ক্যানভাসে রঙের কী অদ্ভুত মিশেল!
ভাবতেই হাসি পায়, হাসি পায় আমার বেহায়াপনার কথা ভাবলে।
তবে ওগুলো, ওগুলোর দাগ আমি মুছে যেতে দেইনি জানিস!
আমার অদ্ভুত আঁধার জীবনে ওগুলো আজো রঙিন প্রজাপতি হয়ে ওড়ে।
একবার বিশ্বাস কর অনেকদিন মুখ ধুইনি আর পানি খেয়েছি ঠোঁট বাঁচিয়ে,
হ্যাঁ, আমি তখন পানি চিবিয়ে খেয়েছিলাম।
পান করলে তোর ঠোঁটের স্পর্শ ধুয়ে যাবে তাই-
আগলে রেখেছিলাম পরম যতনে, প্রথম দেখার স্মৃতির মতোন।
তোর কি মনেপরে আমাদের প্রথম দেখার মুহুর্তটুকুর কথা!
প্রথম যেদিন দেখা হবে-
তার আগের রাতে আমি কিন্তু ঘুমোতে পারিনি সত্যি,
অনেকটা সময় বিছানা আর বালিশে এপাশ-ওপাশ করে-
ছাদের কার্নিসে পা ঝুলিয়ে সিগারেট জ্বেলেছিলাম একটার পর একটা।
কি এক তারুণ্যের জোয়ার আর উচ্ছ্বাসে জেরবার আমি তখন,
সেদিন কিন্তু আমার আবেগের উম্মাদনায় একটা মহাপ্রলয় ঘটতে পারতো!
হতে পারতো আরেকটা সুনামি ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে,
ক্যালিফর্নিয়ায় জলোচ্ছ্বাস কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল হতে পারতো,
সেদিন কিন্তু ফুজিয়ামার অগ্ন্যুৎপাতে টোকিও শহরটাও তলিয়ে যেতে পারতো!
অথচ আমি তখন আরেকটা বিগব্যাঙ্ থিওরি আবিষ্কারের নেশায়-
সারাটা রাত তাকিয়েছিলাম ঘুমকাতুরে আকাশের দিকে,
উজ্জ্বল নক্ষত্র ভেজা সে রাতে আমার সঙ্গী তারাটার নাম ছিল চিত্রা,
বেশ মনে আছে আমার।
রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিকে বাঁধের শেষে শিমুল গাছগুলো
দাঁড়িয়ে আছে আজো, আমাদের অসংখ্য ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে,
আমাদের প্রথম দেখা কিন্তু সেখানেই হয়েছিল।
আমার মনে আছে তুই এসেছিলি-
হালকা বেগুনী রঙের ফুলের নকশা আঁকা জামায়,
জামার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আর সব কিছু, আর-
তোর শরীর থেকে ভেসে আসছিল হালকা ফিনফিনে ঘ্রাণ,
বেশ মনে আছে আমার, সেটা ছিল ক্রিশ্চিয়ান ডিওর।
অথচ দেখ, কীরকম গেঁয়ো ভূত আমি!
প্রথম দেখাতে কিনা পরেছিলাম সাদা পাঞ্জাবি!
ক্ষয়ে যাওয়া নীল জিন্সের সাথে সাদা পাঞ্জাবি দেখে তুই হেসেছিলি,
দম্কা হাসির উচ্ছ্বাস আর প্রবল বিদ্রুপে জানতে চেয়েছিলি-
সরাসরি মিলাদের আয়োজন থেকে দেখা করতে গিয়েছিলাম কিনা!
হয়তো সেকারণেই জিলেপির জন্য হাত পেতে মজা করেছিলি,
তবে তোর এগিয়ে দেয়া সে হাত আমি ফিরিয়ে দেইনি
তুলে দিয়েছিলাম সদ্য পেড়ে আনা এক গোছা স্বর্ণচাঁপা।
সে ফুলের ঘ্রাণ মিশেছিল তোর শরীরের ঘ্রাণের সাথে।
সে ফুলের রঙ মিশেছিল তোর শরীরের রঙের সাথে।
আমার সবকিছু মনে আছে জানিস!
তুই আমার হাতে সেদিন তুলে দিয়েছিলি
ঝকঝকে মলাটে বাঁধা সুনীলের একশো কবিতা।
আমি আজো সুনীলের মতো হাজার বরুনার মাঝে খুঁজে ফিরি তোকে,
এই ঘুণেধরা শহরে ঘুণপোকা হয়ে লক্ষ তরুণীর মাঝে খুঁজে ফিরি তোর মুখ।
শুধু একটিবার, শুধুমাত্র একটিবার তোকে দেখবো বলে-
ছেঁড়া পোস্টার হয়ে সেঁটে আছি এই শহরের দেয়ালে দেয়ালে,
ডিসির মোড়-পায়রা চত্বর-শাপলা কিংবা কলেজ রোড-
কোথায় নেই আমি! যদি একটিবার চোখ তুলে তাকাস!
আসলে আমার এই আধপোড়া কাগজের জীবনে-
স্মৃতির রেখায় পথ চলতে গিয়ে খুব বেশী জমানো স্মৃতি নেই বলে
তোর সঙ্গে ঘিরে থাকা প্রতিটা মুহুর্ত জড়িয়ে রেখেছি আমার স্মৃতির সাথে,
আমার জীবনের সাথে, যেমন- পোষাক জড়িয়ে থাকে আমাকে।
আর আমি ভাদ্রের পুকুরে ছিপ ফেলার মতো-
তাকিয়ে থাকি স্মৃতির সাগরের দিকে।
ইতি, শুধু একবার, শুধুমাত্র একটিবার ডেকে দেখ!
আমি ফিরে আসি কিনা তোর কাছে!
ফিরে আসি কিনা ফেরত চিঠির মতোন!
