ট্রেনের কামরায়, ওপাশে দুটো সীট তখনও ফাঁকা
এপাশের একটাতে ব্যাগ রেখে ভাবছি-
কে হতে যাচ্ছেন আমার সহযাত্রী!
ট্রেন ছেড়ে দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে
মওলানা সাহেব বসলেন একটায় আর
অন্যটিতে তার আবেয়া আবৃত ঘরনী,
নিখাদ চোখে সামনে তাকাতেই-
অগ্নি দৃষ্টিতে ভস্ম হতে হলো,
চশমার গ্লাস মুছে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম
যাত্রাপথটা কেমন পানসে হয়ে গেলো।
শহরের রেখা মুছে যেতে না যেতেই
হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটা থেমে গেলো
বাইরে তখন গাঢ়-ফিকে সবুজের সমারোহ
আতরের কড়া ঘ্রাণ ছড়িয়ে ওনারা নেমে গেলেন।
তারপর অনেকটা পথ একা, সীটদুটোও ফাঁকা
কেউই উঠলেন না........
তারপর! দীর্ঘ যাত্রার শেষে-
স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ঘেঁষে ট্রেনটা দাঁড়াতেই
ঝাঁকরা চুলের লোকটা ঝুপ করে বসে পড়লেন,
তার একহাতে গিটার, অন্য হাতে ব্যাকপ্যাক,
আমি বইএর পাতা থেকে মুখ সরালে-
একগাল হাসি দিয়ে বললেন,
- সালাম, কতদূর যাবেন!
উত্তরের অপেক্ষা না করেই হাতটা বাড়িয়ে দিলেন,
তার উষ্ণতা আমাকে স্পর্শ করে গেলো।
- আমি সৈয়দপুর, আপনি!
- এই তো কয়েকটা স্টেশন, পোড়াদহ।
- ওহ্! ওখানেও থামে নাকি!
উত্তর না দিয়ে বললেন,
- হাতে কি ওটা! ‘ধূসর পান্ডুলিপি’, জীবনানন্দ দাশ!
আচ্ছা ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটা কি করে অশ্লীল হয় ভাবুন তো ?
সজনীকান্ত ওনাকে কড়া সমালোচনায় রাখতেন মাইরি।
- জানি না।
কথা সংক্ষিপ্ত করার জন্য অবহেলে বললাম। কিন্তু-
- ‘ঘাই হরিণীর ডাক শুনি,’ আচ্ছা এই ঘাই হরিণীটা কে?
শোভনার প্রেম! নাকি লাবণ্যর রূপ!
উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি বললেন,
- আসুন চা খাই। বিলটা কিন্তু আমিই দিবো, ট্রেনের জলো চা আর
শুকনো খটখটে ফিস কাটলেট না খেলে জার্নিটা ঠিক জমে না।
বলেই এক প্রস্থ হাসি।
বইএর পাতায় চোখ রাখার আর সুযোগই পেলাম না।
তিনি কথার ডালাপালা, বাকল-শেকড় ছড়াতে ছড়াতে-
একসময় নেমে গেলেন নিজ ঠিকানায়।
পিছনে পড়ে থাকলো জমাট শূন্যতা!
কেউ কেউ অনেক প্রাণবন্ত হয়! এতোটাই যে-
ঝরো বাতাসের মতো সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায়।
আমি ঝিম মেরে বসে রইলাম।
আমার হাতে ‘ধূসর পান্ডুলিপি’
আর আমাকে ঘিরে তখন ধূসর নিঃসঙ্গতা!
সামনের সীটে এরপর কে বসবে!
না। তা নিয়ে আমার মোটেই আগ্রহ নেই-
আসলে বইটা শেষ করা দরকার।
কিন্তু তার কি আর জো থাকে!
যখন সামনের সীটটা কেউ আলো করে বসে পড়ে!
‘মাটিবালা’ একাই। এলেন, বসলেন আর-
মনোযোগের পুরোটা দখল করে রাখলেন।
এরপর অনেকটা সময় আমি কি এক ঘোরে!
না পারি সীট থেকে উঠতে, না পারি বসতে।
না পারি বইএর পাতায় চোখ ঠেসে রাখতে।
আবার কিছু জিজ্ঞেস করতেও ভয়!
যদি কিছু না বলে! যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়!
কি করবো বুঝে উঠতে পারিনা-
ভাবতে ভাবতেই একসময় গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।
সকল পালা সাঙ্গ করে, অগত্যা-
আমিও পা বাড়ালাম।
ও হ্যাঁ ‘মাটিবালা’ নামটি আমিই রেখেছিলাম,
আমি আসলেই তার শরীর থেকে অঘ্রানের শিশিরে
ভেজা মাটির ঘ্রাণ পেয়েছিলাম।
