শুভাগত হোম আমার বন্ধু
পিঠে বইভর্তি ক্যাম্বিসের ব্যাগ
রোজ প্যাডেল মারতে মারতে ইসকুলে আসতো,
বসতো একদম পেছনের সারিতে
চিবুকে লাল বড় আঁচিল, ফর্সা-চুপচাপ,
কখনো পড়া পারতো, কখনো পারতো না
কখনো কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো বেঞ্চের ওপর।
কোন ছেলের হাত যে এতো নরম হতে পারে
ছুঁয়ে না দেখলে আমি জানতামই না,
খুব ঘামতো ওর হাত-
সবসময় একটা সাদা রুমাল
ওর ডান হাতে মুঠোবন্দী হয়ে থাকতো,
রুমালের এক কোণে ফুল-পাতার এমব্রয়ডারি
মাসিমা যত্ন করে বানিয়ে দিয়েছিলেন।
টিফিনের সময় আমরা যখন ক্যান্টিনে
ও তখন ক্লাস রুমের এক কোণে লুকিয়ে,
এলুমিনিয়ামের টিফিন বক্সে খাবার আনতো
আমি একদিন জোর করে দেখেছিলাম-
সাদা ভাত আর কি একটা ভর্তা!
সাথে দুটো কাঁচা লংকা,
ও লজ্জায় শামুকের মতো গুটিয়ে গিয়ে ছিলো।
ইসকুল শেষে আমরা একই কলেজে পড়তাম
শুভাগত কলেজে বেশ সাহসী হতে পেরেছিলো,
কিংবা ইসকুলের পরিচয়ের সূত্রে-
সে সামনের বেঞ্চে আমার পাশেই বসতো।
তারপর-
আমি জড়িয়ে গেলাম ছাত্র আন্দোলনে,
মিছিল-মিটিং-প্ল্যাকার্ড-স্টাডি সার্কেল
সাথে সদ্য ভেজা গোলাপের কুঁড়ির মতো
একটা না ফোঁটা প্রেমের গল্প।
অনেকদিন শুভাগত'র খবর নেয়া হয়নি
ছেলেটা কোথায় যেন হারিয়ে গেলো!
অনেক বছর পর-
ওকে খুঁজে পেলাম পত্রিকার প্রথম পাতায়
বড় হেডলাইন আর ছবির ক্যাপশনে,
পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে
পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নিহত!
হঠাৎ সাদা রুমাল-সাদা ভাতের স্মৃতি-
সাথে দুটো লংকার শোক ছুঁয়ে গেলো আমাকে,
ভেতরের লেখাগুলো পড়তে ইচ্ছে করলো না
তবে চিবুকের বড় আঁচিলটা দেখে ঠিক চিনলাম
ও আমাদের বন্ধু শুভাগত হোম।
কিন্তু ও!
সেই যে নরম হাতের ফর্সা একহারা ছেলেটা-
ওর বুকে এতো স্বপ্ন! এতো দ্রোহ!
এতো দহন ও কোথায় পুষে রেখেছিলো?
সময়, স্বপ্ন আর শ্রমের সাথে আপোষ করে-
আমরা কেউ আমলা, কেউ খাঁটি বুর্জোয়া
আবার কেউ পাতি বুর্জোয়া হয়েছি,
শুভাগত হোম বেওয়ারিশ লাশ হয়েছে।
