পোস্ট অফিসের গলিতে বসে-দাঁড়িয়ে
আমরা ক’জন চা পান করছিলাম,
হাতের সিগারেট থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে
রকের আড্ডাটা তখনো ঠিক জমে ওঠেনি।
একজন দু’জন করে আসছে-
কেউ কেউ আবার এক ঝলক দেখা দিয়ে চলে গেলো,
‘আজ যাই রে, বাবা'র জন্য ওষুধ কিনতে হবে’ কিংবা
‘ছোট বোনটাকে দেখতে বর পক্ষ আসবে-
ম্যালা কাজ, ঘরে না ফিরলে মা নির্ঘাত ঠ্যাঙাবে’।
সিগারেটের শেষ ধোঁয়াটা ছেড়ে দিয়ে
গলির মুখে তাকিয়ে আছি-
হঠাৎ যেন একটা মুখ ছায়ার মতো সরে গেলো!
আরে! শুভাগত না! ঠিক অমন ফর্সা মুখ!
কিন্তু তা কি করে হয়!
আমি নিজেই তো পত্রিকার পাতায় হেডলাইন দেখে-
মর্গে ছুটে গিয়েছিলাম,
ছিয়ানব্বই বর্গফুটের ঘরটায় ও শুয়েছিলো,
ওর লোহার মত শক্ত হয়ে যাওয়া মুষ্টিবদ্ধ হাত
মৃত্যুর ওপারেও যেন শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলছিলো।
সেই যে শুভাগত! আমার বন্ধু-
রোজ সাইকেলে প্যাডেল মারতে মারতে
যে ইসকুলে আসতো, পিঠে নীল ক্যাম্বিসের ব্যাগ!
ক’দিন আগে পায়রা চত্ত্বরে রাঙা বৌদির সাথে দেখা,
দু’হাতে শাখা, কপালে সিঁদুর আর চোখে ঘন কাজল-
ওকে কি যে দারুণ লাগছিলো!
ও কিন্তু পাড়ার ইসকুলেই-
আমাদের ঠিক চার ক্লাস নিচে পড়তো,
ইসকুল ছুটির দিনে মাসিমার পাশে ঘুরঘুর করতো
কত ক্ষ্যাপাতাম ওকে!
আমরা তখনই জানতাম, শুভাগত’র বউ হবে বলে-
মাসিমা’র অপত্য স্নেহে ও বেড়ে উঠছিলো,
শেষে কিনা বিয়ে হলো সুখেনের সাথে-
আমাদেরই বন্ধু,
কর্পোরেশনের অফিসে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক।
বছর খানেক হলো মাসীমাও গত হয়েছেন-
পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে ওর বোনটা আসতে পারেনি,
আমরাই সৎকারের আয়োজন করেছিলাম।
বায়োস্কোপের ফিতের মতো সব স্মৃতি ভেসে ওঠে-
ঘোর কাটে রানা মাসুদের খোঁচায়,
বুঝি, দৃষ্টিভ্রমে পেয়েছিলো।
একটা দীর্ঘশ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে-
সিগারেট পুড়ে ছাই হতে থাকে!
আমিও পুড়ি।
শুভাগত হোম, বন্ধু আমার-
পুরো শৈশব জুড়ে কতো স্মৃতি!
ও রোজ প্যাডেল মারতে মারতে ইসকুলে আসতো,
পিঠে চাপানো নীল ক্যাম্বিসের ব্যাগ-
ডান হাতে মুঠোবন্দী সাদা রুমাল,
রুমালে ফুল-পাতার এমব্রয়ডারির পাশে-
রঙিন সুতোয় বোনা ছিলো ‘ভালো থেকো’।
