শুভটা শুয়ে আছে লাশকাটা ঘরে,
টেবিলের ওপরে-
ডোম আর ডাক্তারের অপেক্ষায়,
আমরা কিছু মানুষ আর কয়েকজন পুলিশ
দাঁড়িয়ে আছি শিমূল গাছটার নীচে
এলোথেলো ঝোপঝাড়-গাছপালা
এই প্রখর রোদেও কী রকম ভয় মিশে আছে।
আমরা হাতের আড়ালে সিগারেট টানি-
ছাই ফেলি- নীচু স্বরে কথা বলি
দারোগা বাবুর ফাই ফরমাস খাটি আর
একটু পরপর দেখে আসি,
টেবিলে ডান হাতটা সেভাবেই ছড়িয়ে আছে
সময় ওখানে জড়-নিশ্চল।
চোখে স্বপ্ন মেখে ও শুয়ে আছে সারাটা রাত-
এখন দুপুর হতে চললো,
জানি না ওর জমাট মণিতে কি স্বপ্ন সেঁটে আছে
শুধু জানি পুলিশের খাতায়-দেয়ালে ঝুলনো চার্টে
ও এখন শুধুই একটা সংখ্যা, ক্রমিক নম্বর
এমনকি কিছুক্ষণ হলো-
সে তার নামটাও খোয়াতে চলেছে,
কেননা কেউ তাকে আর ‘শুভাগত’ বলছে না-
তারা বলছে, ‘লাশের কাটাছেঁড়া যা করার-
তাড়াতাড়ি করে ফেলুন’,
শুভাগত এখন শুধুমাত্র একটা সংখ্যা নয়
তার নামটাও পাল্টে কিরকম 'লাশ' হয়ে গেলো!
‘বেলা গড়িয়ে গেলো
লাশের সৎকার করতে হবে’,
ওর জ্যাঠা মশাই ফের তাগাদা দেন
তার ঘড়ির কাঁটায় স্পষ্ট ফেরার তাড়া!
এখানে স্তব্ধ পৃথিবী অথচ বাইরে কর্মমুখর দিন!
হাজারো স্বপ্ন জানলার ফ্রেমে বন্দী করে বাসগুলো
এই খাঁ খাঁ রোদ্দুরে কালো রাজপথ ধরে ছুটে যায়।
বাসের চাকায় শিমূলের ফুল পিষ্ট হতে থাকে
আমিও পিষ্ট হতে থাকি ভালোবাসায়।
আমার চশমার পুরু লেন্স ঘোলাটে, বাষ্পরুদ্ধ-
কেউ জানেনা সমাজ বদলের প্রবল বাসনা বুকে
একজন স্বপ্নবাজ মানুষ চৈত্রের ভর দুপুরে
কিভাবে সংখ্যা হয়ে যায়!
আমি বন্ধুর দিকে তাকাতে পারিনা,
ছিয়ানব্বই বর্গফুটের ঘরটা থেকে বের হয়ে আসি।
ঘর!
এটাকে কি করে ঘর বলে!
শুধু চারটে দেয়াল আর ছাদ থাকলেই কি ঘর হয়!
এখানে স্বপ্ন কোই!
ঘর মানে তো স্বপ্ন! ঘরে স্বপ্ন খেলা করে!
আপন জনের স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা-
কোই!
আমি তাকিয়ে থাকি লাশকাটা ঘরটার দিকে-
সেই যে আমার ছোটবেলার বন্ধুটা,
নিঃসঙ্গ টেবিলের ওপরে যে শুয়ে আছে-
যার চোখের কোটরে দিন বদলের স্বপ্ন নয়
কিছু প্রলেতারিয়েত মাছি খেলা করে!
