১
নাজমা বোর্ডিং হাউজ, দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।
সময়টা সন্ধ্যার পরপর।
বাইরে বেশ ঝড়-বৃষ্টি চলছে। এর মাঝেই, ঝুপ। একটু পরে আবারও, ঝুপ।
ভোঁতা শব্দ দু'টো যখন ইথারে ভেসে এলো নাজমা বোর্ডিং হাউজের ক্যাশিয়ার অনিল দাস তখন রিসিপশনে বসে দিনের হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। তিনি চেয়ার থেকে সামান্য হেলে উঁকি দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু চোখে পড়লো না। বিরক্ত হয়ে ফ্লোর বয়কে ডাকলেন,
: শামসুজ্জামান, এই ব্যাটা শামসুজ্জামান। ওপরে কিসের শব্দ হলো? সুধীর ......দেখত...
কী ব্যাপার! দু’টার একটাও সাড়া দিচ্ছে না। বদমাশ দুটো গেল কোথায়? এখন বোধহয় সুধীরের ডিউটি না। তাহলে শামসুজ্জামান হতচ্ছাড়াটা যে কোথায় গেল! এই বৃষ্টির মাঝে তাকে কেউ বাইরে পাঠালো নাকি! অনেক সময় বোর্ডাররা রাতে-বিরাতে সিগারেট বা ওষুধ আনতে হলে ছেলেদেরকে বাইরে পাঠায় অবশ্য, কিন্তু তাই বলে এই ঝড়ের রাতে! এসব ভাবতে ভাবতে অনিল বাবু হাতের কাজটা ফেলে উঠে দাঁড়ান। কলম গড়িয়ে টেবিলের নিচে পড়ে যায় কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না। ঠিক এমন সময় কোথাও বাজ পড়ার শব্দের সাথেই কারেন্ট চলে গেলে তিনি রাগে গজগজ করতে থাকেন, বিরক্ত হয়ে অন্ধকার হাতরে টেবিলের ড্রয়ার থেকে টর্চলাইট বের করে সিঁড়ির দিকে এগোন।
সম্ভবত অনিল বাবুর পায়ের শব্দ পেয়ে বোর্ডিং হাউজের কেউ একজন রুমের দরজা খুলে বাইরে বের হলেন, মোমবাতি চাইলেন তার কাছে। অনিল বাবু বিরক্তবোধ করলেও ক্লায়েন্টের কাছে ধরা দেন না, তিনি রিসিপশন কাউন্টারে ফিরে যেয়ে আলমারির তাকে সাজানো মোমবাতির প্যাকেট থেকে দু’টা মোমবাতি এনে ভদ্রলোকের হাতে দিলেন। ভদ্রলোক এরই মধ্যে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছেন। সিগারেটের লাল আলোয় তার আবছায়া মুখ রহস্যময় লাগছে। তিনি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন,
: দাদা, একটু দেখুন তো, ওদিকটায় কিসের যেন শব্দ শুনলাম। যা বৃষ্টি, আর যেভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ভালোভাবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
কথাগুলো বলে লোকটা অবশ্য দাঁড়ালেন না। নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন। অনিল বাবু টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে সামনে এগোন।
শামসুজ্জামান এই বোর্ডিং হাউজের তিনজন ফ্লোর বয়ের একজন। কিন্তু অনিল দাসের কথায় কেউ সাড়া দিল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষা করে আবার ক্যাশে ফিরে গিয়ে ভাবলেন ওটা সম্ভবত বিড়ালের লাফিয়ে পড়ার শব্দ। ইঁদুরের যা উৎপাত বেড়েছে আজকাল! সারাদিন এখানে সেখানে ইঁদুর আর বিড়ালের ছোটাছুটি চলতেই থাকে, এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকবার জো নেই। তিনি ফতুয়ার কোণায় চশমার পুরু লেন্স ঘষে আবারও হিসেবের খাতায় মনযোগ দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজে মন বসে না, সুরটা কেটে গেছে যেন।
ডেস্কের এক কোণায় পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুন ধরাতে না ধরাতেই একজন আগন্তক ভেজা কাপড় থেকে বৃষ্টির ছাঁট ঝারতে ঝারতে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকেন। কয়েকদিন ধরে কী যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে! পৌষ মাসের ভরা শীতের মধ্যেও তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। কে যেন বললো সমুদ্রে নিম্নচাপের কারণে অসময়ের এই ঝড়-বৃষ্টি। পশ্চিমবঙ্গের দিকে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, আমাদের সাতক্ষীরা-বরিশালের দিকেও। তিনি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকান, বৃষ্টির কারণে যতটা না রাত হয়েছে তার চেয়ে বেশি গভীর দেখাচ্ছে। এমনিতেই শীতের রাত, কুয়াশার কারণে ঘন অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। কখন যে কারেন্ট আসবে কে জানে! জেনারেটরটা কয়েকদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে, কতবার মালিককে বলেছেন কিন্তু তিনি যেন গায়ে মাখছেন না। আসলে বোর্ডারদের কটু কথা তো তাকে শুনতে হয় না, ঝড়-ঝাপটা যা যাওয়ার সব তার ওপর দিয়েই যায়। প্রায় ১৪/১৫ বছর ধরে এখানে চাকরি করে কেমন মায়ায় জড়িয়ে গেছেন। ভালো কোথাও চাকরি জুটিয়ে যে চলে যাবেন সে ইচ্ছেও করে না, তাছাড়া অনেক বয়সও হয়ে গেছে। এ হলো বটবৃক্ষের জীবন, শেকড়-বাকল ছড়িয়ে এমন অবস্থা যে এই বয়সে আসলে নতুন করে আর কিছু শুরু করতে ইচ্ছে করে না।
একটু পরপর মেঘের গুরগুর ডাকের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তিনি ভাবলেন কিছুক্ষণ আগে শোনা শব্দটা মেঘের ডাকও হতে পারে। এসব নয়-ছয় ভাবতে ভাবতেই তিনি আগন্তকের দিকে তাকান। নাহ্, নতুন কেউ না। দোতলার ২০৭ নম্বর রুমের বোর্ডার, সন্ধ্যের আগে-আগে বোর্ডিং হাউজে এসে উঠেছেন। খাতায় তো নাম লিখেছেন জসিম আখতার, আসলে যে কে সেটা কেই বা জানে! কম তো দেখলেন না, কত কিসিমের লোকের যে আনাগোনা এই বোর্ডিং হাউজে! ২ ঘণ্টা/৩ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ২/৩ সপ্তাহও থাকে কেউ কেউ। এলাকাটার ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে বেশ নামডাক আছে, তাই যার যেরকম ধান্দা আর কী! ইনি যে কত দিন থাকবেন কে জানে! গেস্ট রেজিস্টারে নাম-ঠিকানা এসব টুকতে টুকতে অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি পরে জানাবেন বলেছিলেন। অবশ্য মালিকের পরিচিত যে ব্যক্তির মাধ্যমে রুম দু’টা বুক করা হয়েছে তিনি এক মাসের কথাই বলেছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলেন কিন্তু দেখাতে পারেনি, সাথে নেই বলে প্রসঙ্গের ইতি টেনেছিলেন। অনিল বাবু অভ্যেসবশত রেজিস্টারের পাতায় লেখা নামটা মিলিয়ে নেন। এই বোর্ডিং হাউজের এটাই নিয়ম, প্রতিবারই নামধাম নিশ্চিত করেই তবে রুমের চাবিটা হাতে দেয়া হয়। বোর্ডাররা এতে বিরক্ত হলেও তার কিছুই করার নেই, স্থানীয় থানার নির্দেশ। ব্যবসা চালাতে হলে তাদের বেঁধে দেয়া নিয়ম মানতেই হবে। কিন্তু তার সাথে তো আরেকজন থাকার কথা, ওনারা দুজন এসেছিলেন। ২০৭ আর ২১৭ নম্বর, মুখোমুখি রুম দু’টা তাদের জন্য বুক করা ছিল। তিনি গলা পরিষ্কার করে জানতে চান,
: কি ব্যাপার দাদা, আপনি একা যে! আপনার বন্ধু কই?
প্রকৃতপক্ষে জসিম সাহেব অর্থাৎ নসু ওরফে পাঙ্খা নসু উত্তর দিতে আগ্রহ বোধ করে না, রিসিপশন ডেস্কে হাত বাড়িয়ে চাবিটা নিয়ে একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। নাজমা বোর্ডিং হাউজে শুধু থাকবার ব্যবস্থা আছে। খাবার-দাবার বোর্ডারদের বাইরে থেকেই আনাতে হয় অথবা নিজেদেরই আশেপাশে কোথাও থেকে সেরে আসতে হয়। ফ্লোর বয়দের বললে তারা অবশ্য পাশের নূরানি হোটেল থেকে ভাত-মাছ যা লাগে এনে দেয়, হোটেলের সাথে একটা অলিখিত সমঝোতা করা আছে এবং সে অনুযায়ী তারা রুম সার্ভিস দিয়ে থাকে। বোর্ডাররাও কেউ আজ পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় কখনও অভিযোগ করেনি, তাই মালিকের বাপ-দাদার আমলের ব্যবসা আজও একই নিয়মে চলছে।
২
দোতলার করিডর।
নাজমা বোর্ডিং হাউজ, দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।
সারাদিনের ধকল আর টেনশনের পরে পেটে দু’মুঠো খাবার ঢোকায় নসু এখন একটু স্বস্তিবোধ করে। বোর্ডিং হাউজে ঢোকার মুখে যে ছাপরা রেস্তোরাঁটা আছে সেখান থেকে কড়া লিকারের এক কাপ চা মেরে দেওয়ার ফলে শরীরের ঝিমলাগা ভাবটা বেশ কেটে গেছে, মামুনটা এলে পারত। ওর নাকি অত্যধিক টেনশনের কারণে খিদে উবে গেছে, এ মুহূর্তে গোসল সেরে একটা ঘুম বড় বেশি প্রয়োজন। নসু খামাখা জোর-জবরদস্তি না করে নিজের পেটটা ভরাতে যায়। মনের মাঝে একটা হালকা স্বস্তি ভাব থাকলেও রিসিপশনের লোকটার অযথা কৌতূহলে নসু বেশ বিরক্ত বোধ করে। এমনিতেই বোর্ডিং হাউজে খাবারের ব্যবস্থা নেই জেনে তার মেজাজটা তেতে ছিল। তার মতে এ ধরনের গায়ে পড়া বা তেলতেলে স্বভাবের লোকগুলো একটু ঘাঘু টাইপের হয়ে থাকে, সে এদের দু’চোখে দেখতে পারে না। সেজন্যই লোকটার প্রশ্নে সে উত্তর দেবার তাগিদও অনুভব করে না।
বুকিং থাকা সত্ত্বেও লোকটা এটা-সেটা প্রশ্ন, জাতীয় পরিচয়পত্র এসব চেয়ে একটু ঝামেলায় ফেলার চেষ্টা করেছিল। ডিবি’র টিকটিকি বোধহয়। মাথায় এক তাড়া বিপদ নিয়ে ঘুরছে বলে নসু তাকে কিছু বলেননি। অন্য সময় হলে এতক্ষণে তার কপালে খারাপ কিছু ঘটত। এর আগে এর চেয়ে অল্পতেও সে অনেকের ডেডবডি ফেলে দিয়েছিল। তার রাগচটা বা খুনে স্বভাবটা দলের কমবেশি সবাই জানে। স্বভাবে ওয়েস্টার্ন সিনেমার আউটল'দের মত ট্রিগার হ্যাপি বলে নসুর অযথা কথা বলতে ভালো লাগে না। অনিল বাবুর দিকে তাকিয়ে সামান্য চোখ পাকাতেই তিনি যেন শামুকের মত গুঁটিয়ে যান। দ্বিতীয় প্রশ্নটি করার সাহস পাননি। আজ সকালেই সাভারে এত বড় একটা ঘটনার জন্ম দিলেও নসু কেন জানে না একটু ভারমুক্ত বোধ করে। নিজের এরকম কঠিন স্বভাবের কারণে সে নিজেও মাঝে মাঝে বেশ অবাক হয়। তবে এটা সে ভালো করেই জানে যে, এর সবটাই হয়েছে তার শক্ত-পোক্ত ট্রেনিং-এর কারণে। কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফেরার জীবন কাটানোর সময় দাশু মাস্তান তাকে নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন। দোতলার করিডরে শিস দিতে দিতে নসু নিজের রুমের দিকে এগোয়। শিসের এই সুরটা তার খুব প্রিয়, মন ফুরফুরে থাকলে সে প্রায়ই সুরটা তোলে, ফ্লো-রিডা হুইসেল—
Can you blow my whistle baby, whistle baby
Let me know
Girl I'm gonna show you how to do it
And we start real slow
কলকাতায় দাশু মাস্তানের হয়ে কাজ করার সময় দলের একটা ছেলের কাছ থেকে এই সুরটা শিখেছিল। একসময় সেও সুরটা রপ্ত করে ফেলে। রূপনগর বস্তির ঝুপড়িতে বেড়ে উঠলেও ছেলেটার কাছ থেকে অল্প-বিস্তর বাংলা-ইংরেজি লেখাপড়া শিখে নসু নিজেকে বদলে ফেলেছে। কিছু শেখার বা জানার প্রবল আগ্রহ থেকেই নসু আজ তাদের দলের সবার থেকে একদম আলাদা। আচ্ছা, কী যেন নাম ছেলেটার! সুদীপ্ত না সুখদেব! অনেক দিন হলো, ভুলে গেছে অনেক কিছু। এদিকের পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা হলে তার কলকাতায় যাবার কথা, দর্শনার উথুলি সীমান্তে সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া আছে। তবে এবার গেলে ছেলেটাকে খুঁজবে, রোগা লিকলিকে চেহারায় একমাথা চুল, দার্জিলিং-এর কোনো এক কনভেন্টে পড়ত। কী একটা অপরাধ করে সেখান থেকে পালিয়ে এসে দাশু মাস্তানের দলে যোগ দিয়েছিল। মাঝে মাঝে গিটার বাজিয়ে কী সুন্দর দারুণ গান গাইত!
এলোমেলো কী সব ভাবতে ভাবতে রুমের সামনে পৌঁছেই তাকে থমকে দাঁড়াতে হয়। কিছু একটা অস্বাভাবিক লাগছে, সে চারদিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় কিন্তু সমস্যাটা ঠিক ধরতে পারে না। বৃষ্টির কারণে বাতাসটাও বেশ ভারী, আর তাতে হালকা বারudes গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে যেন! নাকি সকালের ওরকম ফায়ারিং-এর পর থেকে তার ঘ্রাণশক্তি লোপ পেয়ে গেছে কে জানে! তবে সে খেয়াল করে তার রুমের বিপরীত দিকে অর্থাৎ ২১৭ নম্বর রুমের দরজার পাল্লা আধেকটা খোলা। কী ব্যাপার হোয়াইট মামুন কোথায় গেল? তার তো এভাবে দরজা মেলে রেখে কোথাও যাবার কথা না! নসুর কপালে চিন্তার রেখা হালকা ভাঁজ তুলেই মিলিয়ে যায়। সে জানে মামুন আর সবার মতো না, সে খুবই সতর্ক টাইপের ছেলে। নসু দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকতে চায়, কিন্তু বাথরুম থেকে শাওয়ারের পানির ফোঁটার শব্দ ভেসে এলে সে ঘুরে দাঁড়ায়। এখনো গোসল করছে! সে অবাক হয়, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। কবে যে ছেলেটার আক্কেল জ্ঞান হবে, নসু আপন মনে ভাবতে ভাবতে নিজের রুমের দিকে ফেরে।
৩
রুম নাম্বার- ২১০, নাজমা বোর্ডিং হাউজ।
দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।
নসু একটু কৌতূহলী হয়ে ২১৭ নম্বর রুমের বাথরুমে ঢুকলে দেখতে পেত কমোডের পাশে একটা লাশ বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে আছে। লাশটা ফ্লোর বয় শামসুজ্জামানের। জিভটা সামান্য বেরিয়ে আছে, গলায় নাইলনের কর্ডের গভীর দাগ। তার বিস্ফোরিত দু’চোখে তখনো আতঙ্ক ভিড় করে আছে। পেশাদার হাতের কাজ, চোখ বুঁজেলেই বলে দেয়া যায়। নসু ফ্লোর বয়ের লাশটা ওভাবে পড়ে থাকতে দেখলে নিজেকে অন্তত সতর্ক করতে পারত। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যেন তাকে তাড়া করে ফেরে তাই হয়ত সে নিজের রুমের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। হালকা মুডে দরজায় চাবি ঘোরাতে গিয়ে সে ওভাবেই যেন হঠাৎ একদম স্থির হয়ে যায়। করোটির পিছনে সে ধাতব একটা কিছুর ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করে। লোকটা ওভাবেই তাকে ফ্রিস্কিং করে, কোমরে গুঁজে রাখা ৭.৬৫ মি.মি. ক্যালিবারের সেমি-অটোমেটিক বেরেতা পিস্তলটা নিজের দখলে নেয়। জিন্সের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ঘরের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তবে তাড়াহুড়োর কারণে দ্বিতীয় ফোনটা চোরাই পকেটে রয়েই যায়, নসু তবুও সে মুহূর্তে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করে। অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝতে পারে তার করোটিতে ঠেকানো জিনিসটা আসলে কী। নিজেরাই তো কতবার একইভাবে অপারেশন করেছে। এতদিন সে ছিল শিকারি, আর আজ সে নিজেই যেন কারো শিকার। ধাতব বস্তুটির মালিক তাকে আলতোভাবে রুমের ভেতরের দিকে ঠেলে দেয়। দরজাটা সম্ভবত খোলাই ছিল। সামান্য ধাক্কায় পাল্লাটা সরে গেলে ঘরের ভেতরের উজ্জ্বল আলোয় যে দৃশ্যটা দেখতে পায় তার জন্য সে আসলে প্রস্তুত ছিল না।
হোয়াইট মামুনের নিথর দেহটা সোফার ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। খালি শরীর, কোমরে সাদা তোয়ালে প্যাঁচানো। ওর বাম হাতের বাহুতে আঁকা মারমেইড ট্যাটুতে টিউবলাইটের আলো রিফ্লেক্ট করায় জ্বলজ্বল করছে। রক্তে ভেজা সোফার কুশনটা মেঝেয় পড়ে আছে, তার প্রান্ত ছুঁয়ে রক্তের একটা ক্ষীণ ধারা ঘরের এক কোণে সরে গেছে, সম্ভবত তার ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তবে তার চোখের জমাট দৃষ্টি সিলিঙ-এ বিঁধে আছে যেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ঘটনাটা খুব বেশি আগে ঘটেনি, হয়ত সে যখন রেস্তোরাঁর পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল তখন, কিংবা যখন সে রিসিপশন ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল তখন। সে চোখের কোণা দিয়ে আশপাশে দেখার চেষ্টা করে। সে জানে না কিলিং মিশনে তারা কত জন এসেছে। সে শুধু জানে আততায়ী একজন হয়ে থাকলে সে সম্ভবত সামলাতে পারবে। হয়ত সে কারণেই তার শরীরের পেশীগুলো শক্ত হতে চায় কিন্তু আততায়ী তা যেন বুঝতে পেরে সামান্য পিছিয়ে আসে। সে ফিসফিস করে বলে,
: কোনো লাভ নেই, ডার্লিং।
একটা ফিচেল হাসি দিয়ে সে ফিসফিস করে আবৃত্তি করে,
"I was born with the devil in me."
These people search for me, sleeping within my chambers
The look of terror
Horror is defined by my legacy
Nothing is more entertaining than a good murder
"I was born with the devil in me."
নসুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে যেন, সে নির্ঘাত ঠাণ্ডা মাথার কোনো পেশাদার খুনির কবলে পড়েছে। প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে তার মুখটা দেখতে পারছে না। তবে আততায়ীর চোখে-মুখে এ মুহূর্তে যে রক্তের নেশা লেগে আছে তা বেশ অনুভব করতে পারছে। এরকম টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে যে ঠাণ্ডা মাথায় কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, সে আর যাই হোক কোনো সাধারণ খুনি নয়। নসু ভেবে পায় না, কে তাকে পাঠিয়েছে! এই জীবনে কত জনের হয়ে যে কত রকম কাজ করে দিয়েছে! কলকাতাতেও তো কত কিছু করেছে, কিন্তু এই টাইপের কিলারের সাথে তার কখনো পরিচয় ঘটেনি। সে জানে অন্ধকার জগতের কেউই তাকে এভাবে হত্যা করার সাহস করবে না, এমনকি কোটি টাকা দিলেও না। তার নিজের দলের বা প্রতিপক্ষ দলের কারো কলিজায় সেরকম সাহস নেই। এই লোকটা কালাবাবুর দলের কেউ হতে পারে না, ওদের অনেককেই সে কমবেশি চেনে। তারাও নসুর ক্ষিপ্রতা এবং নৃশংসতার ধরন সম্পর্কে জানে, এজন্যই আড়ালে-আবডালে অনেকে তাকে চিতা, আবার কেউ কেউ তাকে কসাই বলেও ডাকে। আপনমনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,
: দশ পেটি।
: হুম! কী?
আততায়ী কানের পাশে বাঁ হাতটি রেখে নসুর কথাগুলো শোনার ভঙ্গি করে। নসু আবারও উচ্চারণ করে,
: যে হানে পৌঁছান লাগবো কইবি, পাইয়া যাবি।
: উঁহু, মাত্র দশ লাখ! আমি তো আরও ভালো অফার পেয়েছি ডার্লিং!
হেঁয়ালি করে কথাগুলো বলেই সে হাসতে থাকে, এবং আবারও বিরক্তিকর আবৃত্তি,
A cellar filled with the fragrance of bodies
So much creativity when I hold a cadaver
The look of terror
I live for a true scream of agony
Blood stains my fingers
"I was born with the devil in me."
আততায়ীর উত্তর শুনে নসু ভাবে, ঠিকভাবে আলাপচারিতা চালানো গেলে একটা রফায় হয়ত পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। সেক্ষেত্রে টাকার অঙ্কটা যে তাকে খুন করতে পাঠিয়েছে তার চেয়ে অবশ্যই বেশি হতে হবে, কিন্তু অঙ্কটা কত হতে পারে সে ভেবে পায় না। তবু কথার সূত্র যেন ছিন্ন না হয় অথবা একটা কিছু বলার জন্যই হয়ত সে সাহস করে বলে ফেলে,
: এক খোখা অইবো? চলবো?
হিন্দি ক্রাইম থ্রিলার মুভির মাধ্যমে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে ব্যবহৃত কিছু কিছু শব্দ বা ডায়ালগ, খিস্তি-খেউড় এদিকেও চলে এসেছে। পেটি, খোখা এসব মূলত মারাঠি শব্দ, এক পেটি মানে এক লাখ এবং এক খোখা মানে এক কোটি। নসু এক কোটি টাকার কথা বলে বটে, তবে সে জানে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে সুদে-আসলে টাকাটা উসুল করে নেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে টাকার অঙ্কটা শুনে আততায়ী একটু মজা পায় যেন। সম্ভবত আরেকটু মজা করার জন্য আততায়ী নসুকে ঘরের এক কোণে ঠেলে দিয়ে নিজে একটা চেয়ার টেনে বসে। সে নসুকে হাত দুটো মাথার ওপরে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে বলে। ইঁদুর-বিড়াল খেলতে তার বেশ ভালো লাগছে। নসু ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায় এবং ঘাতককে চিনতে চেষ্টা করে। না, এই লাইনে সে সম্ভবত নতুন। সে একে এর আগে কখনো দেখেনি।
৪
বালাক্লাভার আড়ালে।
রুম নাম্বার- ২১০, নাজমা বোর্ডিং হাউজ।
ছাই রঙের বালাক্লাভার আড়ালে আততায়ীর চোখের শীতল দৃষ্টি এবং নিকোটিনে ঝলসানো ঠোঁটজোড়া ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। তার পরনে ধূসর রঙের জিন্স আর কালো হুডি। তার পায়ে বাদামি রঙের লোফার এবং হাতের কালো লেদার গ্লাভসে একটা পিস্তল মুঠোবন্দী। সে মাথার ওপর থেকে হুডিটা সরিয়ে বালাক্লাভাটা খুলে এক পাশে রাখে। এই মুহূর্তে তাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হয়, তা না হলে তার এরকম করার কথা না। তবে আততায়ী বেশ মার্জিত এবং পেটানো চেহারার। অনেকটা সামরিক ধাঁচের, চুলও সেভাবেই ছাঁটা। নিয়মিত জিম করে, দেখলেই বোঝা যায়। নসু তার শারীরিক শক্তি সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারে।
তার হাতের পিস্তলটা সম্ভবত পয়েন্ট ৩২ ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে, জার্মানির তৈরি সেমি-অটোমেটিক পিস্তল। জেমস বন্ড ব্যবহার করে থাকে। একসময় এরকম একটা পিস্তল জোগাড় করার জন্য সে খুব চেষ্টা করেছিল, পারেনি। আলাপচারিতার সুযোগ পেয়ে নসু যেন আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়, সে জিজ্ঞেস করে,
: তুই ক্যাডা?
আততায়ী হাসে, তার সাদা রঙের দাঁতগুলো ভেসে ওঠে। বলে,
: জুলিও সান্তানা, তোর মৃত্যুদূত।
নসু আততায়ীর হেঁয়ালিপনা গায়ে মাখে না, কারণ সময়টা আসলে তার প্রতিকূলে। তার মাথার ভেতরে প্রতি সেকেন্ডে একশোটা প্ল্যান উঁকিঝুঁকি মারছে, কিন্তু কোনো ধরনের সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। একই সাথে ঝুঁকি নেয়ার ইচ্ছা, কিংবা অনিচ্ছা, মুক্তি, মুক্তির পরের জীবন, এমনকি অতীতের ফেলে আসা দিনগুলো মাথার ভেতরে সেলুলয়েডের ফিতের মত ঘুরছে, ক্লোজ শট থেকে লং শট, রঙিন থেকে সাদাকালো, সে যেন দিব্যদৃষ্টিতে সব দেখতে পায়। একে একে বিগত দিনের সব স্মৃতি চোখের সামনে এসে ভিড় করে। ছোটবেলা। ভাইবোনদের সাথে একসঙ্গে রূপনগর বস্তিতে বেড়ে ওঠা। এটা-সেটা চুরি করে ডাণ্ডির নেশা করা, তারপর একে একে সব কিছু। বাবার কথা মনে পড়ে খুব। তৃপ্তি পায় নিজ হাতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পেরেছে বলে। খুব নিষ্ঠুরভাবে প্রতিশোধটা নিয়েছিল, যেমনটা চেয়েছিল। নসু তার মনের সব ঝাল মিটিয়েছিল আজগরের মৃতদেহের ওপরে। মনে পড়ে মায়ের কথা। তার মা জুলেখা বেওয়া কি কখনো জানতে পারবে বা খুঁজে পাবে কি তার মৃতদেহ? সে নিজেও তো জানে না তার মৃতদেহ নিয়ে এরা কী করবে! লাশটা কি এখানেই ফেলে যাবে! নাকি নদীতে ভাসিয়ে দেবে! মা এখন কী করছেন তাও নসুর খুব জানতে ইচ্ছে করে। তাকে মাস শেষে এখন কে টাকা পাঠাবে? মা হয়তো মাস শেষে ঠিকই তার পাঠানো টাকার অপেক্ষায় বসে থাকবেন। তারপর অপেক্ষা করতে করতে একদিন হয়ত জানতে পারবেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই। তখন কি তিনি কাঁদবেন ছেলের জন্য? তার মনে পড়ে হেনার সাথে সব স্মৃতি। প্রথম পরিচয়, তারপর তার সাথে প্রেম আর সবশেষে তার সাথে হেনার বিশ্বাসঘাতকতা। হেনার শেষ কথাটা শোনা হয়নি, মেয়েটা কী যেন বলতে চেয়েছিল! মনে পড়ে যায় টুকরো টুকরো সব কথা, অগুনতি স্মৃতি।
মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আততায়ীর সাথে কথা চালিয়ে যেতে যেতে একটা কিছু করার জন্য সে প্ল্যান আঁটে। নসু মাথা ঠাণ্ডা রেখে অনুত্তেজিত স্বরে আততায়ীকে জিজ্ঞেস করে,
: তুই আইছোস কইত্থন! কেডায় পাঠাইছে তোরে?
: তোর বাপ্।
উত্তর দিয়েই সে হাসতে থাকে, এবং আবারও নিচু স্বরে আবৃত্তি—
You have never experienced beauty until holding a body cavity
The apartments remain open so you may enter
The look of terror
কবিতার একটি শব্দও তার মাথায় আর ঢোকে না। নসুর মাথায় এ মুহূর্তে বরং খুন চেপে বসে। দলের সবাই জানে, বাবাকে নিয়ে কিছু বললে সে স্থির থাকতে পারে না। দলের সবাই জানে আজগরকে সে কীরকম নিষ্ঠুরভাবে খুন করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিল।
