১
পাভেল......পাভেল......পাভেল। সমস্বরে অনেকের চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু পাভেল তাদের চিৎকারে কান দেয় না, সে ছুটে চলে হরিণের বেগে। আসলে পাভেল এইমাত্র যে দুষ্টামিটা করল সেটা ইতিহাস ঘাঁটলেও আর কেউ কখনো করেছে এমনটি বোধহয় শোনা যাবে না। আজ সকাল হতে না হতেই মুক্তা খালার মা অর্থাৎ সফুরা বেগম পাভেলের মাকে ছেলের বিরুদ্ধে একগাদা নালিশ করে গেছেন। সফুরা বেগম আত্মীয়তার সূত্রে পাভেলের মায়ের ফুফু অর্থাৎ পাভেলের দূরসম্পর্কের নানী হন। পাভেলের নানাজান জামিল সাহেব আর মুক্তা খালাদের পরিবার ১৯৪৭ সালের আগে আসামের কুচবিহারে একই গ্রামে থাকত। দেশভাগের সময়ে জামিল সাহেব অন্যান্য আরও অনেক পরিবারের মত এপার বাংলায় মাইগ্রেট করার সিদ্ধান্ত নিলে মুক্তা খালার বাবা অর্থাৎ লতিফ সাহেবও তার সঙ্গে এই ছায়াসুনিবিড় গ্রাম রায়গঞ্জে এসে থিতু হন। গ্রামটা আসলেই একটা সবুজ ক্যানভাসের মত। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটা বাড়িই আলো করে আছে আম-জাম-কাঠালের দীর্ঘ সারি। আর গ্রামের পথের ধারে যেখানে এমনিতে কিছুই জন্মেনা সেখানেও উদার প্রকৃতি সযত্নে লাগিয়ে রেখেছে ভাটফুল-শেয়ালকাঁটা-হাতিশুঁড় কিংবা শ্বেতদ্রোণের ঝাড়। এই গ্রামের কৃষকের দিগন্তছোঁয়া ফসলের মাঠে কিছুদূর পরপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সোনারঙের ফুল বুকে নিয়ে সবুজ কালকেসুন্দার ঝাড়। তাদের ডালে সারাক্ষণ দোল খায় ঘন কালো ফিঙ্গে কিংবা ছটফটে রঙিন বুলবুলি। এই গ্রামের শিশুদের কাকডাকা ভোরে ঘুম ভাঙ্গে পাখিদের বিচিত্র কলকাকলিতে। দুপুরে তারা ঘুঘুর উদাস সুরে তন্ময় হয়ে দুধ-মাখা ভাত খায় আর সন্ধ্যায় কিছু খেতে না চাইলে কলাগাছের ঝাড়ে বসে থাকা হুতুম প্যাঁচার হুম-হুম ডাক শুনিয়ে তাদের ভয় দেখানো হয়। গ্রীষ্মের রাতে শুতে যাবার আগে শিশুরা হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে দাদী-নানীর কাছে রূপকথার গল্প শোনে। সব মিলিয়ে একদম ছবির মত সুন্দর একটা গ্রাম হল রায়গঞ্জ।
দেশের একদম উত্তর-পশ্চিমের জেলা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থানায় ফুলকুমার নদীর পাড় ঘেঁষে এই গ্রামটি গড়ে উঠেছে। নদীর ওপর এখন যে ব্রিজটা আছে সেটা কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে বানানো হয়েছে। ব্রিজের নাম শহীদ লেঃ সামাদ ব্রিজ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ব্রিজের গোড়ায় তুমুল এক যুদ্ধে লেঃ সামাদ সঙ্গী আরও তিন মুক্তিযোদ্ধাসহ পাক সেনাদের নির্মম গুলিতে শহীদ হন। জেলা বোর্ডের আধা-পাকা রাস্তাটা ব্রিজের ওপর দিয়ে উত্তর দিকে আন্ধারিঝার হয়ে ভুরুঙ্গামারি থানার দিকে গিয়েছে। আর ব্রিজ থেকে দক্ষিণ দিকে কয়েক কিলোমিটার এগোলেই নাগেশ্বরী থানা এবং সেখান থেকে আরও দক্ষিণে গেলে ধরলা নদীর পাড়ে কুড়িগ্রাম জেলা শহর। জেলা বোর্ডের এই রাস্তাটা রায়গঞ্জকে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর দু’থানার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং গ্রামটি বলতে গেলে ঠিক এদের মাঝামাঝি জায়গায়। গ্রামের আধাপাকা রাস্তা ধরে ডিজেল ইঞ্জিনের পুরনো ঝরঝরে মোটরগাড়িগুলো ধুলো উড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে সে রাস্তায় মোটরগাড়ির পাশাপাশি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে মন্থর গতির গরুর গাড়িগুলোকেও ছুটে চলতে দেখা যায়। সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের গগন শিরীষ গাছটা থেকে ডান দিকে কয়েক কদম এগোলেই নদীর পাড়ে বিশাল এক বটগাছ আর সেই বটগাছটাকে ঘিরে সপ্তাহের প্রতি রবি আর বুধবারে হাট বসে। অবশ্য হাটবার ছাড়াও সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে সেখানে বেশ বড় বাজার বসে। তবে হাট কিংবা বাজার যাই বসুক না কেন মানুষের বিকিকিনির জন্য সেখানে সবসময় হৈ-হল্লা একটা কিছু লেগেই থাকে। হাটের একপাশে পুরনো একটা মন্দির। সেখানে প্রতি বছর বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজা হয়। পূজার সময়ে মন্দিরের সামনের মাঠে বারোয়ারী মেলা বসে। মেলা উপলক্ষে ছাঁচ পিঠা-গুড়ের সন্দেশ আর বাতাসার দোকান নানা বয়সী ক্রেতার ভিড়ে সবসময় গমগম করে। যাত্রাপালা-পুতুলনাচ-সঙনাচ-বায়স্কোপ সবই মেলে সেখানে। মেলায় গ্রামের হিন্দু ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি মুসলমান ঘরের ছেলেমেয়েরাও যেয়ে আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে। মন্দির ঘেঁষেই কুমারদের পাড়া। কুমারপাড়া ধরে দক্ষিণে কিছুদূর এগোলে সরকারি হাসপাতালের ঝকঝকে সাদা বিল্ডিংগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনের কাঁচা রাস্তাটা রায়গঞ্জের সাথে রতনপুর হয়ে দামালগ্রামকে মালার মত গেঁথেছে। আরেকটা পথ হাসপাতালের প্রাচীর ঘেঁষে নদীটাকে বামে রেখে সোজা পূর্বদিকে রাঙ্গালিবস গ্রামের দিকে চলে গেছে।
জেলা বোর্ডের রাস্তা থেকে কাঁচা সড়ক ধরে হাটের দিকে খানিকটা এগোলে শুরুতেই পড়বে মারোয়াড়ীদের বিশাল পাইকারি দোকান। দোকানের উল্টাদিকে পাকা রাস্তা বরাবর স্বর্ণকারদের বাস, গ্রামের লোকেরা অবশ্য বলে বাণিয়াপল্লী। যাহোক পল্লীর ভিতর দিয়ে একহারা মেঠোপথ নদীটাকে ডানে রেখে সোজা রামখানার দিকে চলে গেছে। তারপরেই ভারত-বাংলাদেশের সীমানা। পাকা সড়ক ধরে দক্ষিণে বেশ খানিকটা এগোলে দু’ধারে সার বেঁধে হরেকরকম পণ্যের দোকান কিংবা পাট ব্যবসায়ীদের পাটের মোকাম, আধাপাকা গুদামঘর ইত্যাদি। সাইকেল সারাইয়ের দোকান, তৈজসপত্র, ধান-চালের আড়ত, ওষুধঘর, কি নেই সেখানে! দোকানপাটের মাঝেই বয়সের ভারে নুয়েপড়া পাকুর গাছটার নিচে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমি অফিস। চৈত্রের গরম দুপুরে ভূমি অফিসে জমির খাজনা দিতে আসা লোকজন গাছের শীতল ছায়ায় বসে পান চিবায় কিংবা আড্ডাবাজি করে। কখনো তাদের মাটিতে ছক কেটে জামের বিচি দিয়ে ষোল গুঁটি বা বাঘবন্দি খেলতে দেখা যায়। রাস্তার পাশের বিশাল কদমগাছের নিচে কামারশালার হাপর চারকোলের চুলায় সারাদিন আগুন তাতিয়ে রাখে আর কামারের হাতুড়ির একঘেয়ে টিং টাং টিং টাং শব্দ কানে বিভ্রম ধরিয়ে দেয়। কামারের দোকান ছাড়িয়ে আরও সামনে এগোলে গ্রামের প্রান্ত ছুঁয়ে বিশাল মাঠ আর বিল। বিলের কালো গভীর জল আলো করে রাখে সাদা কিংবা লাল শাপলা আর লক্ষ কোটি পানচুলি। গ্রামের ছেলেরা বিলের পানিতে ঘন বর্ষায় কলা গাছের ভেলা ভাসায়, মাছ ধরে কিংবা সারা শরীরে কাদা মেখে শালুকের ডাঁটা কাঁধে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। কুড়ানো নারকেলের সঙ্গে শালুকের ডাঁটা রাঁধলে কী যে দারুণ লাগে! বিলের পাড়ের ধ্যানমগ্ন বক কিংবা পানির পাখি পানকৌড়ি অলস দৃষ্টিতে গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের প্রাণের উচ্ছ্বাস দেখে। পানকৌড়ি একটু পরপরই পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরে, তাই দেখে গ্রামের ছেলেমেয়েরা ছড়া কাটে, ‘পানকৌড়ি তোর ভাসুর আইলো ডুব’। বিলের ধার ঘেঁষে মাঠের একপ্রান্তে প্রাথমিক, আর আরেকপ্রান্তে বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। হাজারটা ঝুরি ঝুলিয়ে মাঠের ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষের পুরনো এক বটগাছ। সেই বটগাছের নিচে প্রতি বছর ঈদের নামাজ আর চৈত্রসংক্রান্তিতে মেলা বসে। আসলে রায়গঞ্জ গ্রামে হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে বাস করে। ঈদে কিংবা বিভিন্ন পূজা-পার্বণে তারা একসাথে আনন্দ উদযাপন করে এবং একে অপরের দুঃখ-কষ্টে এগিয়ে আসে।
বছরের অন্যান্য সময়ে ফুলকুমার নদীতে হাঁটুজল থাকলেও বর্ষায় তা ফুলেফেঁপে একদম কঠিন রূপ নেয়। তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাম না জানা সওদাগররা বিভিন্ন বর্ণের পালতোলা নৌকা নিয়ে রায়গঞ্জ ঘাটে এসে ভিড়ে। নদীর ঘাটকে কেন্দ্র করে জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণেই হয়ত গ্রামটি সুদূর অতীতে কোনো এক প্রভাবশালী রায় বাহাদুরের উপাধির সঙ্গে গঞ্জ মিলিয়ে রায়গঞ্জ নাম নিয়েছে। দেশভাগের আগে আসামে জামিল সাহেবের পরিবহন ব্যবসা ছিল। কিন্তু দুই বাংলা ভাগ হলে তিনি যৎসামান্য পুঁজি নিয়ে এপারে এসে প্রথমে রকমারি পণ্যের পাইকারি ব্যবসা শুরু করলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে ওষুধের ব্যবসায় ঢোকেন। ভাগ্যদেবী তার সহায় হওয়ায় এবং পুরো তল্লাটে তার চেয়ে বড় ওষুধের ব্যবসায়ী না থাকায় তার আয়-রোজগার এবং নামডাক বেশ ভালো। সেজন্যই হয়ত এলাকায় তার নামের শেষে ব্যাপারী তকমাটি লেগে যেতে বেশি সময় লাগেনি। তার নাম জামিল উদ্দিন থেকে হয়ে যায় জামিল ব্যাপারী। চার ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে তার বেশ জমজমাট সংসার। বড় ছেলে রেশাদ অবশ্য বিয়ে করে তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আলাদা থাকে। মেজো ছেলে রাহাত রংপুরে ডাক্তারি পড়ছে। তিন মেয়ের মধ্যে বড় দু’জন অর্থাৎ বেলী আর নেলীর বিয়ে হয়েছে।
পাভেলরা রংপুরে থাকে। তার বাবা সাইফ সাহেব একজন সরকারি কর্মকর্তা আর মা বেলী হক একজন পুরাদস্তুর গৃহিণী, দু’হাতে তিন সন্তান আর সংসার সামলাতে ব্যস্ত। পাভেল রংপুরের একটা বিখ্যাত স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে, ছোট ভাই রোমেল আর একমাত্র বোন তিনা প্রাইমারিতে পড়ছে। নেলী খালা তার স্বামী আর দু’ছেলে সৌম্য, স্বাধীনকে নিয়ে কুড়িগ্রাম শহরে থাকেন। খালু সেখানেই চাকরি করেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে পাভেল নানাবাড়িতে গেলে তার সব রকমের দুষ্টামির নিত্যসঙ্গী হয় ছোট মামা রিপন আর বড় মামার ছেলে লিটন। পাভেলের প্রায় সমবয়সী এই মামা ষষ্ঠ শ্রেণীতে আর মামাতো ভাই লিটন তার এক ক্লাস নিচে পড়ে অর্থাৎ রোমেলের সমবয়সী সে। নেলী খালার ছেলেরা স্কুল ছুটির দিনগুলোয় নানাবাড়িতে এলে তাদের দলটা বেশ ভারী হয় আর দুষ্টামিগুলোও তখন বেশ জমে ওঠে। নানাবাড়িতে বয়সে সবচেয়ে ছোট হলেন শেলী খালা, তিনি সবে রায়গঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছেন।
পাভেলের কাছে নানাবাড়িটা দারুণ লাগে। চারদিকে দারুণ সব ফলের গাছ আর সেসব গাছে সারা বছর জুড়েই কোনো না কোনো ধরনের ফল ধরে। নানাবাড়ির ঘরগুলোও বেশ সুন্দরভাবে তৈরি। জেলা বোর্ডের রাস্তা থেকে ওষুধের দোকান লাগোয়া সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলে প্রথমেই হাতের বামে বা ফুলের বাগানের পাশে পড়বে পশ্চিমঘর। ঘরটা আসলে বাড়ির আঙ্গিনার পশ্চিমে, তাই তার নাম দেওয়া হয়েছে পশ্চিমঘর। সে ঘরের একপাশের বিছানায় নানা-নানী আর অন্যপাশে ফুটবল মাঠের মত বিশাল বিছানায় রিপন মামা, শেলী খালাদের সঙ্গে সেও ঘুমায়। শীতের রাতে ভূতের ভয়ে যখন ঘরের বাইরে যেতে ভয় হয়, তখন সে আর রিপন মামা জানালার কাঠের পাল্লা খুলে হিসির কাজটা বিছানাতেই দাঁড়িয়ে সেরে নেয়। এই ঘর লাগোয়া ছোট ঘরটাকে মূলত স্টোর রুম হিসাবে ব্যবহার করা হয়। পাভেল জানে সেখানে নানীআম্মা টিনের বাক্সে মুড়ি-মোয়া নারকেলের নাড়ু-বাতাসা এসব জমিয়ে রাখেন। গাছ থেকে কলার কাঁদি পেড়ে আনলে সেঘরেই খুঁটির সঙ্গে ঝুলানো হয়। নানাজান প্রতিদিন দুপুরে দই-কলা দিয়ে ভাত মেখে খেতে ভালোবাসেন। তাই কলার ছড়ি সেখানেই রাখা হয়। হাতের ডান দিকের অর্থাৎ দক্ষিণের ঘরটা হল রান্নার। দক্ষিণ আর পূর্ব দিকের ঘরের মাঝে নলকূপের পাশেই গোসলখানা। পূর্ব দিকের ঘরে পাভেলের সেজো মামা থাকেন, তবে বড় খালা তার ছেলেদের নিয়ে নানাবাড়িতে বেড়াতে এলে এই ঘরেই থাকেন। পূর্ব এবং উত্তর ঘরের মাঝের সরু পথ ধরে একটু এগোলে হাতের বামে বেতের ছোট ঝাড়ের পাশেই মুক্তা খালাদের বাড়ি আর সেটা ছাড়িয়ে সোজা গেলে খালের পাড়ে শিমুলগাছের নিচে টিনের বেড়া দেওয়া টয়লেট। বাঁশঝাড় আর শটিবনের ভিতর দিয়ে খাল পেরিয়ে একদম পূবে গেলে হাতের বামে পড়বে সরকারি হাসপাতাল। তবে ডানের কাঁচা পথ সোজা চলে গেছে দামালগ্রামের দিকে। রান্নাঘরের পিছনে একটু দূরে একচালা গোলাঘর। সেখানে দু’টো ছাতিম গাছ মাথা উঁচিয়ে আছে। গোলাঘরের ভিতরে বাঁশের বড় বড় ডুলিতে ধান-চাল এসব রাখা থাকে, আর গোলাঘরের বারান্দায় বর্ষাকালের জন্য শুকনা খড়ি-পাটকাঠি-ধইঞ্চা এসব মজুত করা হয়। গোয়ালঘরটাও তার পাশেই। সেখানে বাঁধা গরুগুলো সারা বছর দুধ দেয়। প্রতি বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে এসে তারা সাধারণত যে ঘরটাতে উঠে সেটা হল উত্তরের ঘর। বাসার কাজের লোক আর রাখালের জন্য অবশ্য আলাদা কোনো ঘর নেই। তারা সাধারণত যেকোনো একটা ঘরের বারান্দায় কিংবা তারা যখন থাকে না তখন উত্তরের ঘরের মেঝেয় বিছানা পেতে ঘুমায়। শনের পুরু ছাউনি আর বাঁশের চাটাই ঘেরা চারটা বিশাল দোচালা ঘরের ঠিক মাঝখানে বড় আঙিনায় ধান শুকানো, পিঠা-পায়েসের আয়োজন এসব করা হয়। সে যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো তখন রিপন মামা আর বড়খালার ছেলে সৌম্য’র সঙ্গে তাকেও সেই আঙ্গিনাতেই শুইয়ে হাজাম দিয়ে মোসলমানি করানো হয়েছিল। মোসলমানি করার পরের দিনগুলো কী যে কষ্টের ছিল! কোনো ধরনের দুষ্টামি করা যেত না। সারাদিন লুঙ্গি উচিয়ে ধরে হাঁটতে হত। সেবারই সে প্রথম লুঙ্গি পরেছিল। নানাজান তাদের জন্য নাহারগঞ্জের হাট থেকে লুঙ্গি কিনে আনিয়েছিলেন। নানাবাড়ির সবগুলো ঘরের সামনেই উঁচু বারান্দা আছে, যেখানে বসার জন্য সবসময় কাঠের বেঞ্চ পাতা থাকে। রান্নাঘরের বারান্দায় অবশ্য ঢেঁকি বসানো আছে।
২
লতিফ সাহেব অবশ্য এপারে এসে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। ওপারে তার আয়-রোজগার বলতে ছিল বেশ কিছু ফসলের ক্ষেত আর পুকুর-ডোবা এসব থেকে যা পাওয়া যায় তাই আরকি। অবশ্য সে আয়ে তার সঞ্চয় তেমন না জমলেও খেয়ে-পড়ে বেশ ভালোভাবেই চলে যেত। হয়ত হুজুগের বশে কিংবা মৃত্যুভয়ে তিনিও জামিল সাহেবের সঙ্গে এপার বাংলায় চলে আসেন। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে তেমন কিছু জোটাতে না পেরে শেষে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমি অফিসে তিনি তহশিলদারের সহকারী হিসাবে থিতু হন। তবে সেখানে আয়-উপার্জন তেমন না থাকায় তাকে একরকম পরগাছার মতই জামিল সাহেবের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি পাভেলের নানাবাড়ির পাশেই সরকারি জমিতে দু’টো কাঁচা ঘর তুলে স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান মুক্তা খালাকে নিয়ে থাকেন। মুক্তা খালা রায়গঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে পড়েন। লতিফ সাহেবের বাঁশের চাটাই ঘেরা ঘরের একটিতে বুড়োবুড়ি আর অন্যটিতে মুক্তা খালা থাকেন। রান্নার কাজটা উঠানের একপাশেই সেরে নেওয়া হয়। খাবার পানিটা ভূমি অফিসের পিছনের সরকারি নলকূপ থেকে আনলেও তাদের গোসল-বাথরুম এসব পাভেলের নানাবাড়িতেই সারতে হয়। জামিল সাহেব কিংবা তার পরিবার অবশ্য এতে কিছু মনে করেন না। নিজের এলাকার একজন লোককে প্রতিবেশী হিসাবে পেয়ে তিনি বরং খুশিই হন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বায়েজিদ কোম্পানির হারিকেনের ম্যাড়ম্যাড়ে আলোয় সারাদিনের ব্যবসার হিসাব মেলাতে মেলাতে দুই বুড়ো ফেলে আসা দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেন, চা খান আর চার ব্যাটারির ট্রাঞ্জিস্টরে বিবিসির বাংলা সংবাদ শোনেন। পাভেলের নানার সঙ্গে সখ্যতার কারণেই হয়ত লতিফ সাহেব পাভেলের দুষ্টুমিতে তেমন একটা গা করেন না, তার দৃষ্টিতে বরং প্রশ্রয় ভাবই ফুটে ওঠে।
মুক্তা খালা অবশ্য তাকে সত্যি সত্যিই ভালোবাসেন, আদর করেন। পাভেল সেটা বেশ বুঝতে পারে। কতদিন তিনি পাভেলকে মারের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন তার হিসাব নেই। মাঝে মাঝে খালা পাভেলকে তার সঙ্গে স্কুলে নিয়ে যান, বিশেষ করে যেদিন রিলিফের বিস্কুট কিংবা গুঁড়া দুধ দেওয়া হবে। ওদিনগুলো বেশ আনন্দের হয়, কারণ তখন ক্লাস হয় না, শুধু খেলা আর খেলা। শিক্ষকরা সবাই রিলিফের বিস্কুট-খাতা-পেন্সিল কিংবা গুঁড়া দুধ, এসবের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে তাদের সেদিন ক্লাস নেওয়া হয় না। এরপর হেড স্যার এলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে রিলিফ বিলি করা হয়। পাভেল যদিও সে স্কুলের ছাত্র না তবুও রিলিফের পণ্য পেতে তার কোনো সমস্যা হয় না কারণ হেড স্যার নানার বন্ধু মানুষ, সন্ধ্যা হলে তাকেও বিবিসির খবর শুনতে নানার দোকানেই ছুটতে হয়। ডানহাতে মুঠোভর্তি গুঁড়া দুধ নিয়ে চেটেপুটে খেতে দারুণ লাগে আর ইউনিসেফের হালকা নীল রঙের খাতাগুলোও কী সুন্দর! এসবের বিনিময়ে অবশ্য তাকেও খালার এটু-সেটু কাজ করে দিতে হয়। এই যেমন তার কোনো বান্ধবীর কাছে দস্যু বনহুর সিরিজের কোনো বই পৌঁছে দেওয়া কিংবা তার বান্ধবীদের চিঠিপত্র লেনদেনে সাহায্য করা। খালার বান্ধবীদের সঙ্গে গল্পের বই লেনদেন করতে যেয়ে তার বেশ সুবিধা হয়েছে, এই যেমন বই চালাচালি করতে যেয়ে সেই বয়সেই দস্যু বনহুর আর কুয়াশা সিরিজের অনেকগুলো বই তার নিজেরও পড়া হয়ে গেছে। পাভেলের অবশ্য বই পড়তে ভালো লাগে। বাবা তাকে স্কুলের লাইব্রেরির সদস্য করে দিয়েছেন। সে লাইব্রেরি থেকে ইচ্ছেমত বই ইস্যু করে বাসায় নিয়ে আসতে পারে। পড়া হয়ে গেলে আবার ফেরত দিয়ে আসে। এভাবে সে শার্লক হোমসের, শ্রীকান্তের অনেক বই পড়েছে। তার সাধ, বড় হলে শার্লক হোমস বা কিরীটী রায়ের মত দুঁদে গোয়েন্দা হয়ে বড়বড় রহস্যের সমাধান করবে। আবার দস্যু বনহুর বা রবিনহুড পড়লে তার ডাকাত হতে ইচ্ছে করে। সে ঠিক করে তার একটা দল থাকবে, তাদের নিয়ে সে ধনীলোকদের ধনসম্পদ ডাকাতি করে গরিবদের মাঝে মিলিয়ে দেবে। কিন্তু সে তার দলের লোকদের কীভাবে জোগাড় করবে সে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। রিপন মামা, লিটন এদের দিয়ে হবে না। পাভেল ভাবে, বড় হলে দলটা নিয়ে প্ল্যান করা যাবে। পাভেলের বইপড়ার প্রিয় জায়গা হল গাছের মগডাল। সে একবার রবিনহুডের বাংলা অনুবাদ নিয়ে দুপুরের খাবারের পরপর মুক্তাখালাদের বাড়ির পাশের আমগাছে উঠেছিল। তারপর বইটা একটানা পড়ে শেষ করে একদম সন্ধ্যার আগে আগে গাছ থেকে নেমেছে। সফুরা নানী তখন যাচ্ছিলেন কলতলার দিকে, পাভেলকে হঠাৎ গাছ থেকে ওভাবে নেমে আসতে দেখে তিনি চমকে ওঠেন, ইন্না লিল্লাহ্………বলে বুকে থুথু দেন। ওনার অমনভাবে চমকে ওঠা দেখে পাভেলের সেদিন ভীষণ হাসি পেয়েছিল। যাক বিনা চেষ্টাতেই ওনাকে তাহলে জব্দ করা গেল! সফুরা নানী এই গাছে গাছে ঘুরে বেড়ান স্বভাবের কারণে পাভেলকে মাঝে মাঝে ডেউয়া বলে ডাকেন। ওনাকে ক্ষ্যাপাতে পাভেলের খুব ভালো লাগে।
৩
পাভেল জানে খালার বান্ধবীদের মধ্যে দু’একজন সহপাঠীদের সঙ্গে লাইন করে। তাদের চিঠিপত্র পাভেলকেই বইতে হয়। বিনিময়ে তারা পাভেলকে লেবেঞ্চুস বা কাঠি চকলেট উপহার দিলেও সে মাঝে মাঝে অবশ্য বিরক্ত হয়, কিন্তু কিছুই করার নাই কারণ মুক্তা খালার হুকুম তাকে মানতেই হবে। খালা কিন্তু খুব ভালো, তিনি কারো সঙ্গে লাইন করেন না। পাভেল অবশ্য দু’একদিন বেতের ঝাড়ের আড়ালে মুক্তা খালাকে রাহাত মামার সঙ্গে লুকিয়ে গল্প করতে দেখেছে। তারা কি নিয়ে কথা বলে সেটা অবশ্য পাভেল জানে না, তবে রাহাত মামার সঙ্গে মুক্তা খালাকে দারুণ মানায়! তাদের মধ্যে বিয়ে হলে পাভেল ভীষণ খুশি হবে। এই কথাটা একদিন ইনিয়ে-বিনিয়ে খালাকে বলতেই তিনি পাভেলের পিঠে দুম করে একটা কিল বসিয়ে দেন। কিন্তু খালার লাজরাঙ্গা মুখ দেখে খালার সঙ্গে রাহাত মামার যে লাইন চলছে তা নিয়ে পাভেলের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মে। তবে এই কথাটা সে কাউকেই বলেনি, খালা প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন। রাহাত মামা আসলে একজন চমৎকার প্রাণবন্ত মানুষ। মেডিকেল কলেজের ছুটির দিনগুলোতে মামা রায়গঞ্জে এলে ভীষণ আনন্দ হয়। মামাকে মাথা ভর্তি বাবরী চুল আর কানের দু’পাশে বড় জুলফিতে দারুণ লাগে। পাভেল ঠিক করে সেও বড় হয়ে মামার মতই বাবরী চুল রাখবে। সন্ধ্যায় উঠানে বসে মুড়ি-মোয়ার সঙ্গে চা খেতে খেতে মামার ভারী কণ্ঠে সিনেমার গান শুনতে কীযে দারুণ লাগে! ভাইবোন, মামা-খালা সবাই মিলে সন্ধ্যার সেসব আসর দারুণ জমে। রওনক মামা আসরগুলোতে একটার পর একটা রক্তহিম করা ভূতের গল্প বলেন। গল্প শুনে পাভেলরা ডানে-বামে তাকাতেও ভয় পায়। কি জানি, গল্পের সেই মুণ্ডুহীন ভূত হয়ত তাদের পাশে বসেই ভূতের গল্প শুনছে! মাঝে মাঝে আসরের পরিবেশটা হালকা করার জন্য নানীআম্মা রান্নাঘরের কাজ ফেলে একটা দুটো শোলক শুনিয়ে যান। নানীআম্মার শোলকের ভাণ্ডার অফুরন্ত! মাঝে মাঝে মুক্তা খালাও চুপিসারে তাদের সেই আসরে যোগ দেন কিন্তু ঘরের মেয়েদের সন্ধ্যের পরে বাড়ির বাইরে থাকতে নেই বলে নানী তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। হারিকেনের ম্যাড়ম্যাড়ে আলোতেও খালার মন খারাপ করা কালো মুখ তার দৃষ্টি এড়ায় না। পাভেলের তখন খুব খারাপ লাগে। সদ্য শোনা ভূতের গল্পের ভয় সত্ত্বেও সে খালার পিছু পিছু এগিয়ে যায়, বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তবে আসে। খালাটা এত ভালো কিন্তু সে জানে না নানীআম্মা কেন এরকম করেন! সে অবশ্য চাইলেও নানীআম্মার ওপর রাগ করতে পারে না, তিনি তাকে অসম্ভব আদর করেন। প্রতিবার ছুটি শেষে রংপুরে ফেরার সময়ে নানীআম্মা তার শার্টের বুক পকেটে কতগুলো আধুলি-সিকি ঢুকিয়ে দিয়ে নাতীকে বুকে জড়িয়ে হুহু করে কান্না করেন। জিজ্ঞেস করেন,
: ভাইয়া, আবার কবে আসবি? বড় হও ভাইয়া।
৪
মুক্তা খালার মা অর্থাৎ সফুরা নানী ঠিক যেন সবার উল্টাটা। নানাবাড়ির সবাই আদর-স্নেহ করলেও তার বাড়ির ত্রিসীমানায় পাভেলকে দেখলেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। কখনো লাঠি হাতে পাভেলের দিকে তেড়ে যান, আবার কখনো তিনি তার খনখনে গলায় কাশি দিতে দিতে অভিশাপ দেন। পাভেলের অবশ্য এগুলোতে একদম গা সওয়া হয়ে গেছে। সে এগুলোতে বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামিয়ে তার দুষ্টামিটাই বরং পুরাদমে চালিয়ে যায়। আজকের ঘটনাটাও আসলে অনেকটা সেরকম।
অন্যান্য দিনের মত আজো সফুরা বেগম সেই কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠান ঝাড় দেন। এরপর খাবার পানি আনার জন্য মাটির কলসিটা হাতে ভূমি অফিসের দিকে রওনা হলে পথেই পাভেলের দেখা মেলে। পাভেল তখন বেতের ঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছিল। সফুরা বেগমের সাথে চোখাচোখি হতেই পাভেল বেতের ঝাড়ের আড়াল থেকে সরে এসে পথ আগলে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
: কি গো নানী খবর কি?
তিনি পাভেলের কথার উত্তর না দিয়ে বরং মুখ ঝামটানোর সঙ্গে দুটো গালি দিয়ে হনহন করে হেঁটে নলকূপের দিকে যান। পাভেল তার এই ব্যবহারে বেশ রুষ্ট হয়ে সফুরা বেগমকে জব্দ করার জন্য তার সদ্য নিকানো উঠানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে নোংরা করে রাখে। এরপর সফুরা নানীর তামাশা দেখার জন্য পাভেল রান্নাঘরের পিছনে কাঁঠাল গাছটার আড়ালে লুকায়। কলসি কাখে ঘরে ফিরে আঙিনা জুড়ে আবর্জনার স্তূপ দেখে সফুরা বেগমের মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়। তিনি রেগেমেগে পাভেলকে আচ্ছা পিটুনি দেওয়ার জন্য লাঠি খোঁজেন। কিন্তু লাঠির বদলে মাটির উনুনের পাশে বাঁশের বেড়ায় গুঁজে রাখা সবজি কাটার ছুরিটা পেয়ে সেটা হাতেই পাভেলের দিকে তেড়ে যান। পাভেল ততক্ষণে সেখান থেকে দৌড়ে নানাবাড়ির খিড়কি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসতে থাকে। সফুরা বেগম তাকে ধরতে না পেরে রাগের বশে হিতাহিত বোধ হারিয়ে ছুরিটাই পাভেলের দিকে ছুড়ে মারেন। কিন্তু পাভেল তড়িৎ বেগে এক পাশে সরে গেলে সেটা বেশ দূরে পুঁইশাকের ক্ষেতে গিয়ে পড়ে। এরপর পাভেল হাসতে হাসতেই ছুরিটা ক্ষেত থেকে কুড়িয়ে সফুরা বেগমের দিকে ছুড়ে মারলে সেটা একদম তার নাকে গিয়ে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে একটা গভীর ক্ষত হয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় পাভেল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে না এরকম সময়ে তার কী করা উচিৎ। তবে সে এটা নিশ্চিত জানে যে সে কখনো এরকমটি করতে চায়নি। তার মধ্যে প্রচণ্ড রকমের অনুশোচনা এসে ভর করে। অবশ্য সফুরা নানী তাকে ওভাবে গালি না দিলে হয়ত এসবের কিছুই ঘটত না। সফুরা বেগম ইতিমধ্যে চিৎকার করে পাড়ার দু’চারজন মহিলাকে জড়ো করে ফেলেন। মহিলাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ পাভেলকে ধরার চেষ্টা করলে সে দু’লাফে পিছনের খাল পেরিয়ে সরকারি হাসপাতালের দিকে পালিয়ে যায়।
রায়গঞ্জের সরকারি হাসপাতালটা অজ্ঞাত কারণবশতঃ বাংলাদেশের অন্যান্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ে আয়তনে বেশ খানিকটা বড় এবং সেখানে কর্মচারীদের জন্য ফ্যামিলি কোয়ার্টার, ওষুধের ডিস্পেন্সরি, রোগীদের জন্য বেড ইত্যাদি মিলিয়ে বেশ একটা রমরমা অবস্থা। পাভেল হাসপাতালের প্রধান ফটক লাগোয়া আমগাছে ঢিল মেরে কয়েকটা কাঁচামিঠা আম পেড়ে ফ্যামিলি কোয়ার্টারের ছাদে যায়। সেখানে রেলিঙের আড়ালে বসে কাঁচা আম খেতে খেতে আজ সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবতে থাকে। সে ভাবে, তার আজ আর সকালের নাস্তা খাওয়া হল না! আজ হয়ত কাঁচা আম আর নলকূপের পানি খেয়েই পেট ভরাতে হবে। সে নিশ্চিত এতক্ষণে মায়ের কাছে তার বিরুদ্ধে একগাদা নালিশ চলে গেছে। সে জানে না আজ তার কপালে কি লেখা আছে। নির্ঘাত জোড় পিটুনি খেতে হবে আজ। এসব ভাবতে ভাবতে সে হয়ত একটু আনমনাই হয়ে গিয়েছিল তাই সেজো মামা কখন যে পা টিপে টিপে ছাদে এসে হাজির হয়েছে তা সে বুঝতেই পারেনি। তার এই সেজো মামা কিছুটা পাগল কিসিমের। তিনি নাগেশ্বরী কলেজে পড়েন। কলেজ থেকে ফিরেই ঘরের কোণে বসে গভীর মনোযোগে কিসব বই পড়া আর এটা-সেটা বানিয়ে সবাইকে তাক লাগানো হল তার নেশা। মাঝে মাঝে অবশ্য তিনি অদ্ভুত রকমের সব কাণ্ডকারখানা করে থাকেন। এই যেমন একবার দেখা গেল যে তিনি ছাতিম গাছটার ডালে বসা মৌমাছির চাকের নিচে মশারি টাঙিয়ে বসে আছেন। তার হাতে বেশ লম্বা একটা লাঠি আর সেটার সঙ্গে স্যালাইনের পাইপ সুতা দিয়ে বাঁধা। তার প্ল্যান হল স্যালাইনের পাইপটা মৌমাছির চাকে ঢুকিয়ে মধু খাবেন। সেজো মামা হঠাৎ শক্ত হাতে তার কান চেপে ধরলে পাভেল নিজেকে আর ছাড়াতে পারে না। ইতিমধ্যে বাড়ির রাখালটা এসে তার সঙ্গে যোগ দিলে পাভেলের আর নড়বার কোনো উপায়ই থাকে না। দু’জন দুই পাশ থেকে ধরে তাকে একরকম চ্যাংদোলা করে বাসায় নিয়ে যায়। হয়ত ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে মা তাকে কিছুই না বলে গম্ভীর মুখে উত্তরের ঘরে ঢুকিয়ে দরজার শিকল টেনে দেন।
বদ্ধ ঘরের ভিতরে বিছানায় শুয়ে পাভেল ভাবতে থাকে কী করা যায়। সকালে নাস্তা খাওয়া হয়নি বলে পেট ক্ষুধায় চোঁ-চোঁ করছে। আজ হয়ত তাকে কোনো খাবারই খেতে দেওয়া হবে না। সারাটা দিন অনাহারে থাকতে হবে ভেবে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। সে ঠিক করে এবারে ছুটি শেষে রংপুরে ফিরলে মায়ের বিরুদ্ধে বাবার কাছে নালিশ করবে। সে জানে পৃথিবীতে বাবাই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তার সব অন্যায় আবদার, দুষ্টামি, অত্যাচার হাসিমুখে সয়ে যান। পাভেলের বুকের ভিতর থেকে একরাশ আবেগ উথলে উঠে। সে থেকে থেকে কান্নার সঙ্গে হেঁচকি দেয়। বাইরের উঠানে সফুরা নানীর কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। তিনি পাভেলের মাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে কিসব অভিযোগ করছেন। একসময় তার মা বিরক্ত হয়ে বলেন,
: এখান থেকে যান তো মাসী। অনেক তো হল। ছেলেটা সেই সকাল থেকে একদম না খেয়ে আছে আর আপনি এসেছেন যতসব অভিযোগ নিয়ে।
পাভেল মায়ের ফোঁপানো কান্নার শব্দ শুনতে পায়। সফুরা নানীর আজগুবি সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে মায়ের দেওয়া উত্তরগুলো শুনে পাভেলের মন ভালো হয়ে যায়। সে মায়ের বিরুদ্ধে বাবার কাছে নালিশ করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।
কিন্তু দরজাটা তো কেউ খুলছে না! মায়ের জন্য পাভেলের মনটা খারাপ হয়ে যায়। সে ঠিক করে একবার এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেলে সে আর কখনো দুষ্টামি করবে না। একদম শান্ত ছেলে হয়ে পড়াশোনায় আরও মনোযোগ দেবে। অবশ্য এমনিতেই সে পরীক্ষায় বরাবর প্রথম হয়ে থাকে। পাভেল অবশ্য তার শান্ত ছেলে হয়ে থাকার সিদ্ধান্তে বেশিক্ষণ অটল থাকতে পারে না। দরজার চৌকাঠে ধাক্কা দিয়ে সে পাল্লা খোলার চেষ্টা করে কিন্তু শিকল সম্ভবত খুব শক্তভাবে আংটার সঙ্গে সেঁটে আছে। ঘরের দেয়াল বাঁশের চাটাইয়ের হলেও সেগুলো তামার তার দিয়ে বেশ আঁটোসাঁটভাবে বাঁধা। শনের ছাউনির নিচেও চাটাইয়ের সিলিং লাগানো আছে। সিলিংটায় বাঁশের চিকন বাতা দিয়ে সুন্দর নকশা করা আর তাতে রঙের গাঢ় প্রলেপ বসানো আছে। সিলিংয়ের একপাশে একটু ফাঁক থাকলেও তা’ বাঁশের ঢাকনি দিয়ে বন্ধ করা। প্রয়োজনে সেই ঢাকনিটা সরিয়ে এটা-সেটা সিলিংয়ের ওপরে রাখা হয়। একবার নানীআম্মা তাকে সিলিংয়ের ঢাকনা সরিয়ে আমসত্ত্বের বয়ম আনতে বলেছিলেন। মাঝে মাঝে অবশ্য সে আর রিপন মামা সবার অগোচরে সেখানে ঢুকে আম কিংবা বরইয়ের আচার, কলার কাঁদি, পাকা আম এসব পেড়ে খায়। নানীআম্মা কখনো হয়ত বুঝতে পারতেন আবার কখনো হয়ত মোটেই টের পেতেন না। তবে সে বেশ খেয়াল করেছে তারা চুরি করে কিছু খেলেও বেশিরভাগ সময়ই দোষটা গিয়ে পড়ে বাড়িময় ঘুরে বেড়ান আধা ডজন বিড়ালের ওপর।
পাভেল ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর কোনো পথ পাওয়া যায় কি না তা খুঁজতে থাকে। কিন্তু না, বাঁশের চাটাই বেশ শক্তভাবেই খুঁটির সঙ্গে বাঁধা। এমনকি তারের বাঁধনগুলোও বহু চেষ্টাতেও আলগা করা যায় না। হঠাৎ কী ভেবে সে সিলিংয়ের ভিতর দিয়ে বাইরে বেরোনোর কোনো পথ পাওয়া যায় কি না তা খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। সে খেয়াল করেছে ওই সিলিংয়ের ভিতর দিয়েই বিড়ালগুলো ঘরে ঢুকে এটু-সেটায় মুখ দেয়। সেখানে কোনো না কোনো ফোঁকর আছে। সে আর দেরি করে না। এভাবে অলস সময় কাটানো তার পক্ষে এককথায় অসম্ভব। বহুবারের অভিজ্ঞতার কারণে পাভেল অবলীলায় সিলিংয়ের ফাঁক গলে ভিতরে ঢুকে পড়ে। কেমন যেন ছায়া ছায়া অন্ধকার সেখানে। একটু অপেক্ষা করার পরে অবশ্য অন্ধকার চোখে সয়ে আসে। সে সহসাই চালের পূর্ব দিকে একটা হালকা ফোকর আবিষ্কার করে। সম্ভবত ওটা দিয়েই বিড়াল যাতায়াত করে থাকে। পাভেল হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে ফোকরের কাছে যায়। ঘরের চাল সংস্কার করার সময়ে ঘরামিরা সম্ভবত কাজে ফাঁকি দিয়েছিল তাই সেখানে তারের বাঁধন একটু আলগা এবং চাটাইটা ঘরের চালের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিকমত বাঁধা হয়নি। সে মনে মনে ধন্যবাদ দেয় সেসব ঘরামিদের যারা এই আলসেমিটা করেছিল। বিড়াল তার স্বল্প শক্তি দিয়ে যেটুকু ফোকর বানাতে পেরেছিল পাভেল তার কয়েকগুণ শক্তিতে সেটা আরও বড় করে নিজের উপযুক্ত করে নেয়। এরপর অযথা সময় নষ্ট না করে পাভেল সদ্য সৃষ্টিকরা ফোকর দিয়ে বাইরে লাফিয়ে নামে। প্রায় আট/নয় ফুট নিচের মাটিতে লাফিয়ে পড়ার সময় পায়ে হালকা ব্যথা পেলেও সে তাতে গা করে না।
এরপর পাভেল একরকম পা টিপে সফুরা বেগমের বাড়িতে যায়। সফুরা বেগম তখন উঠানের খড়ির চুলায় কিসব রান্নায় ব্যস্ত। চুলার আগুন থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আর তিনি পাশেই কাঠের পিঁড়িতে বসে একটু পরপর চুলায় খড়ি ঠেলে দিয়ে মনের সুখে পাতার বিড়ি ফুঁকছেন। বাসায় এই মুহূর্তে নানা বা খালা কেউ নেই বোঝা যাচ্ছে। একদম সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে চারদিকে। পাভেল চুপিসারে তাদের ঘরে ঢুকে কাঠের চৌকির নিচে ডিমে ওম দেওয়া মুরগিটা নিয়ে সটকে পড়তে চায় কিন্তু ঘর থেকে বেরোনোর ঠিক আগ মুহূর্তে মুরগিটা কক্ কক্ শব্দে চারদিকে জানান দিলে সফুরা বেগম টের পেয়ে যান। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন হতচ্ছাড়া কোনো বেজী বা বাঘডাশ জাতীয় কোনো প্রাণী তার পোষা মুরগিটা শিকারের লোভে ঘরের ভিতরে ঢুকেছে। কিন্তু মুরগি হাতে জলজ্যান্ত পাভেলকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বেশ ভিরমি খান। পাভেল তখনও উত্তরের ঘরে বন্দি বলে তার ধারণা ছিল। হতভম্ব দশা কাটতেই তিনি চিৎকার করে পাভেলের দিকে ডালের ঘুঁটনি হাতে তেড়ে যান। কিন্তু পাভেল তার দিকে তাকিয়ে মুখে ভেংচি কেটে একটা ফিচেল হাসি উপহার দেয়। এরপর সে আবারো শটিবনের ভিতর দিয়ে দৌড়ে কয়েক লাফে পিছনের সরুখাল পেরিয়ে দামালগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। আজ এক দিনেই তাকে দু’ দু’বার বাড়ি থেকে পালাতে হল। অসাবধানতার কারণে প্রথমবার ধরা পড়লেও এবার সে আর ধরা পড়তে চায় না। পাভেল তাই হরিণের বেগে দৌড়াতে থাকে। পিছনে পড়ে থাকে ধুলো মাখা পথ, ময়নাকাঁটার ঝোপ আর সবুজ ঘাসের বন। একসময় পথের ধারের আকন্দ-বাসক-ভাঁটফুলের আড়ালে তার বারো/তেরো বছরের লিকলিকে শ্যামলা শরীরটা হারিয়ে যায়, নিঃসীম এক শূন্যতা বিরাজ করে সেখানে।
