১
‘স্বাধীনতা চাও, না বঙ্গবন্ধুকে চাও?’
আবেগী প্রশ্নটার মাধ্যমে কিছুদিন ধরেই শেখ মুজিবের কাছের ছাত্রনেতাদের ক্রমাগত উসকে দিয়েছেন খন্দকার মোশতাক। এমনিতেই ছাত্রনেতাদের দাবী, তাদের সাথে পরামর্শ না করেই প্রবাসী সরকার গঠন এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তাদের সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে তিনি ছাত্রনেতাদের বলেছেন, এখনো যদি যুদ্ধ বন্ধ করে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় তবেই হয়তো বেঁচে যাবেন শেখ মুজিব। মাইকের সামনে দাঁড়ানো আবদুল আজিজকেও উসকানি দেয়া হয়েছে, তিনি তার বক্তৃতায় ধুয়ে দিচ্ছেন প্রবাসী সরকারকে। কনফারেন্সে উপস্থিত প্রায় শ’চারেক এমপি/এমএনএ/ কাউন্সিলর/অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। আবদুল আজিজের প্রবল আক্রমণের শিকার হচ্ছে প্রবাসী সরকার। সেখানে উপস্থিত বিচক্ষণ পরিষদ সদস্য ময়েজউদ্দীন বুঝতে পারলেন বক্তার প্রকৃত উদ্দেশ্য। মঞ্চে লাফিয়ে উঠে তিনি আবদুল আজিজের শার্টের কলার ধরে সরিয়ে দিলেন।
যুবনেতাদের চীৎকার, ‘এই সরকার মানি না, মানি না। বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনো।’
তাদের অশালীন আক্রমণে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হতভম্ব। কথা বলতে যেয়ে ব্যর্থ হলেন প্রধান সেনাপতি। শুধু একজন, খন্দকার মোশতাক সবার অলক্ষ্যে মিটিমিটি হাসছেন, তিনি ভাবলেন কাজটা বুঝি সেরে ফেলতে পেরেছেন। এমন সময় মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে দাঁড়ালেন তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি দিলেন সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা,
‘আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা পেলেই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে পাবো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে যদি, খোদা না করুন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয় পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে, তাহলে বঙ্গবন্ধু শহীদ হয়েও স্বাধী বাঙালি জাতির ইতিহাসে অমর ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি একটি নতুন জাতির জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হবেন। ব্যক্তি মুজিব, ব্যক্তি সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, মনসুর আলী, মোশতাক, কামরুজ্জামান কেউ বেঁচে থাকবেন না। একদিন না একদিন আমাদের সকলকেই মরতে হবে। বঙ্গবন্ধুকেও মরতে হবে। আমরা কেউ চিরদিন বেঁচে থাকবো না।
আল্লাহর পিয়ারা দোশত, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-ও চিরদিন বেঁচে থাকেননি। কিন্তু তিনি তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় আজ পরম শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তেমনি, আমরা যদি বাঙালিকে একটি জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, আমরা যদি বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক আরেকটি রাষ্ট্রের মানচিত্র স্থাপন করতে পারি, তাহলে সেই স্বাধীন জাতি এবং নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রভাতসূর্যের মতোই উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে।
আমরা যখন বাংলাদেশ ছেড়ে যার যার পথে ভারতে চলে আসি, তখন কিন্তু জানতম না বঙ্গবন্ধু জীবিত আছেন, না শহীদ হয়েছেন। ভারতে এসে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমিও জানতাম না সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী কিংবা হেনা সাহেব (কামরুজ্জামান) জীবিত আছেন কিনা। আমি নিজেও বাঁচতে পারবো এ কথাটি একবারও ভাবতে পারিনি। এখানে আসার পর, যতক্ষন পর্যন্ত পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ঘোষণা না করেছেন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের কাছে বন্দী রয়েছেন, ততোক্ষণ পর্যন্ত আমিও মনে করতে পারিনি যে তিনি জীবিত আছেন। পাকিস্তানী জল্লাদ বাহিনীর কামান, বন্দুক,ট্যাংক, মেশিনগানের গোলাগুলির মধ্যে বঙ্গবন্ধু আর বেঁচে নেই- একথা ভেবে এবং সম্ভবত মেনে নিয়েই তো আমরা নিজ নিজ প্রাণ নিয়ে চলে এসেছি।
বঙ্গবন্ধু আজীবন রাজনীতি করেছিলেন, জেলে থেকেছেন। তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন দেশের জন্যে জীবন দিতে। তিনি নিজেও বারবার বাংলার পথে প্রান্তরে বলেছেন, বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য তিনি জীবন দিতে কুন্ঠিত নন। আজ যদি বঙ্গবন্ধু মুজিবের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাই, তাহলে সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যেই আমরা পাবো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। আমি নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিছুতেই পাকিস্তানীদের কাছে তাঁর নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপোস করবেন না, আত্মসমর্পন করবেন না, এবং করতে পারেন না। এটাই আমার প্রথম ও শেষ বিশ্বাস।
বাংলাদেশ যদি আজ এত রক্তের বিনিময়েও স্বাধীন না হয়, তাহলে এই বাংলাদেশ চিরদিনের জন্য পাকিস্তানী দখলদারদের দাস ও গোলাম হয়ে থাকবে। পূর্ব পাকিস্তানীর মর্যাদাও বাঙালি কোনোদিন আর পাকিস্তানীদের কাছে পাবে না। প্রভুভক্ত প্রাণীর মতো আমরা যতই আনুগত্যের লেজ নাড়ি না কেন, পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে আর বিশ্বাস করবে না, বিশ্বাস করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আর এই অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েও আসেন, তবু তিনি হবেন পাকিস্তানের গোলামীর জিঞ্জির পরানো এক গোলাম মুজিব।
বাংলাদেশের জনগণ কোনোদিন সেই গোলাম শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলে গ্রহন করবে না, মেনে নেবে না। আমার স্থির বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর পাকিস্তানীদের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। বাঙালি জাতির গলায় গোলামীর জিঞ্জির পরিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তিনি নিজে বরং ফাঁসীর রজ্জু গলায় তুলে নেবেন হাসিমুখে। এটাই আমার বিশ্বাস। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এটাই আমার ঈমান। এ মুহুর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া, আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আর কোন বিকল্প নেই। বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর কোন অস্তিত্ব নেই, আর কোনো পরিচয় নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পরাধীন বাংলায় বঙ্গবন্ধু ফিরে আসবেন না। গোলামের পরিচয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসবেন না কোনোদিন। জীবনের বিনিময়ে হলেও আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করবো। পরাধীন দেশের মাটিতে আমার লাশও যেন ফিরে না যায় সে জন্যে জীবিতদের কাছে আর্জি রেখে যাই। আমার শেষকথা, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমরা বাংলার মাটিকে দখলদার মুক্ত করবো। বাংলার মুক্ত মাটিতে মুক্ত মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমারা ফিরিয়ে আনবো। মুজিব স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেতে ফিরে আসবেন এবং তাঁকে আমরা জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনবো ইনশাআল্লাহ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ রক্ষার জন্য বিশ্ব-মানবতার কাছে আমরা আকুল আবেদন জানাচ্ছি।’
তাজউদ্দীন আহমদের বক্তৃতা শেষ হওয়া মাত্র আবেগে দাঁড়িয়ে গেল সভাকক্ষ। মতভেদ/ভুল বোঝাবুঝি ফেলে সবাই আস্থা রাখলেন প্রবাসী সরকারের ওপরে।
‘জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!!’ স্লোগানে সেদিন কেঁপে উঠেছিল শিলিগুড়ি।
বিভ্রান্ত ছাত্রনেতারা বুঝে গেলেন জনমত তাদের পক্ষে নেই। পেছনের দরজা দিয়ে তারা বেরিয়ে গেলেন। খন্দকার মোশতাকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। এভাবেই নিষ্পত্তি হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের একটি বিভ্রান্তিমূলক ও আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রের।
২
মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একাংশের কাছ থেকে দাবি উঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি কারাগার থেকে যে কোন মূল্যে মুক্ত করে আনার। এমনকি এই দাবি শেষ পর্যন্ত ‘বঙ্গবন্ধু কে চাই না স্বাধীনতা চাই’ এমন হঠকারী বির্তকে রূপ নেয়। এছাড়া ১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিদিনের খাবার, ওষুধ জোগাড়সহ বিভিন্ন ধরনের চাহিদা বাড়তে থাকে। একইসাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তা চালিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছিল। পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্রের অভাবে বড় কোন অভিযান চালাতে না পারার কারণে মুক্তিবাহিনীতেও একরকম হতাশা দেখা দেয়। এরকম নানা কারণে যুদ্ধের গতি কিছুটা ধীর হতে শুরু করে। তখন শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া নিয়েও চাপের মুখে পড়ে ভারত সরকার। বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে মতান্তর ঘটছিল প্রবাসী সরকারের মধ্যেও। এসব অযাচিত ঘটনা মুজিবনগর সরকার এর ভিতর ও বাইরে ভীষণ অস্থিরতার জন্ম দেয়।
মুজিবনগর সরকারের মধ্যে আত্মঘাতী বির্তক নিরসনের জন্য ভারত সরকারের পরামর্শে তৎকালীন ৭০’এর নির্বাচনে নির্বাচিত সকল পূর্ব পাকিস্তানি এমপি এবং এমএনএদেরকে সম্মেলনের জন্য আহ্বান করা হয়। প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে কনফারেন্স আয়োজনের দ্বায়িত্ব পড়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা কুমিল্লার কাজী জহিরুল কাইয়ুমের উপর এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দ্বায়িত্ব পান ডিপি ধর (প্রধাণমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ রাজনৈতিক সচিব)। এই ব্যক্তিদ্বয় সম্মেলনের স্থান ঠিক করেন শিলিগুড়ি। এই কনফারেন্সের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার অজিত কুমার মিত্র, যিনি এ কে মিত্র নামেও পরিচিত।
দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধে নিয়োজিত মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের যে কোন মূল্যে এমপি এবং এমএনএদেরকে কাছে এই সম্মেলনের সংবাদ পৌঁছে দিতে এবং তাদের নিরাপদে ভারতে যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেয়া হয়। এমনকি কেউ যেতে অনিচ্ছুক হলে দরকার হলে তাকে জোর করে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেও নির্দেশ দেয়া হয়। শিলিগুড়ি কনফারেন্সের সাফল্যের মাধ্যমে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একাংশের আগে বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনার নামে পাকিস্তানের সাথে সমঝোতা স্থাপন কিংবা প্রয়োজনে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করার গোপন বাসনা স্তিমিত হয়ে যায়।
৩
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোয় অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের মতই গুরুত্বপুর্ণ ছিল একই বছরের ৫ ও ৬ জুলাই তারিখে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত কনফারেন্স। প্রথম কনফারেন্সে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঊর্ধ্বতন ২৭ সেনা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে দেশকে স্বাধীন করার শপথ এবং যুদ্ধের রণকৌশল গ্রহণ করা হয়, আর দ্বিতীয় কনফারেন্সে প্রবাসী সরকারের সদস্য, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাসহ ৪০০ জন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে প্রবাসী সরকার অনেক সংকট ও দ্বন্দ্বের সমাধান করে তার ক্ষমতা সুসংহত করে। উভয় কনফারেন্সের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া সমন্বয় গতিময় করেছিল মুক্তিযুদ্ধকে।
শিলিগুড়ি কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। কারণ শিলিগুড়ি কনফারেন্সেই আওয়ামী লীগ দলীয় নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ৭০-এর নির্বাচিত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্যগণ মুজিবনগরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং অনুমোদন প্রদান করে। এই কনফারেন্সে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ঐতিহাসিক প্রস্তাবে অধিকৃত বাংলাদেশকে হানাদার বাহিনী মুক্ত করার লক্ষ্যে যে কোন কার্যকর ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করার নিঃশর্ত ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এছাড়াও একটি ঐতিহাসিক দলিলে স্বাক্ষর করে ঘোষণা করা হয় যে, অধিকৃত বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ তাঁদের নিজনিজ নির্বাচনী এলাকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি। স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে জনগণের নির্বাচিত এই প্রতিনিধিগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে এবং এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকারই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ সরকার। এই ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক দলিল।
৪
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার সময় আমরা অনেক কিছুই লেখি। ২৫ মার্চের রাতের গণহত্যা থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা, দেশি-বিদেশি অনেক রকম প্রভাবের কথা, কিন্তু সেই ভাবে লেখা হয় না একটি কনফারেন্সের কথা এবং সেই কনফারেন্সের ছোটখাট এক নেতার দূরদর্শী এক ভাষণের কথা, যা হয়তো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মতো সেই অর্থে জ্বালাময়ী নয়, কিন্তু বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ বাকিদের জন্য সেই ভাষণ ছিল বাতিঘরের মতই দিকনির্দেশক। ইতিহাসের খাতায় বড় করে লেখা হয়ে থাকে কোন ঘটনার ফলাফল, কিন্তু কখন যেন সেই ফলাফলের পিছনে ভূমিকা রাখা গূরুত্বপূর্ণ অথচ ছোট ঘটনাগুলো একসময় ঝাপসা হয়ে আসে। আমরা একসময় গৌরব উজ্জ্বল সেসব ঘটনা ভুলে যাই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঝাপসা হয়ে আসা সেরকম একটা ঘটনা হলো শিলিগুড়ি কনফারেন্স।
হদিস:
১। ১৯৭১ শিলিগুড়ি সম্মেলন- অনুবাদ: মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশন
২। সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ- সুহান রিজওয়ান
৩। একাত্তরের রনাঙ্গান অকথিত কিছু কথা- নজরুল ইসলাম
৪। ইন্টারনেট
