১
১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যাটি একটি ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সূত্র মতে এই সংখ্যাটি প্রায় এক কোটি (১০ মিলিয়ন)। এই ব্যাপক জন-প্রবাহকে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এবং দ্রুততম দেশান্তরের ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা ভারতের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে ‘এক কোটি শরণার্থীর’ সংখ্যা নিয়ে কিছু মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক বিদ্যমান। সমালোচকরা এর পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, তবে এই এক কোটি শরণার্থী কেবল একটি পরিসংখ্যান ছিল না; এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকা হারানোর, চরম দুর্ভোগের এবং স্বাধীনতার জন্য তাদের দেওয়া নীরব মূল্যের প্রতীক।
২
লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রেম নাথ হুন (অবঃ) ৫ আগস্ট ১৯৯৯ তারিখে রেডিফে (https://m.rediff.com/news/1999/aug/05hoon.htm) দেয়া সাক্ষাৎকারটি ছিল মূলত ভারতের সামরিক কৌশল এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে। তিনি ১৯৭১ সালে পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৫ কোরের প্রধান ছিলেন। তার নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী ঐ সেক্টরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সফল যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করে। রেডিফে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে তার মন্তব্যটা ছিল আলোচনার একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা তিনি প্রসঙ্গক্রমে উচ্চারণ করেছিলেন। সেটি তার সাক্ষাৎকারের মূল বিষয়বস্তু ছিল না অথচ তার উচ্চারিত শরণার্থীর সংখ্যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেননা তিনি রেডিফকে বলেন, ‘There were 90,000 refugees in India. So there has to be an occasion. We went into East Pakistan because we had a reason.’ অথচ এই বিষয়ে ভারত সরকারের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলে ভিন্ন কথা। তাহলে শরণার্থীর সংখ্যাটা আসলে কত? পিনাকী ভট্টাচার্য তার ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ’ বইয়ের ৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় হালিম দাদ খান এর ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫’ বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে লিখেছেন ‘১৯৭২-এর ১ জানুয়ারি সরকারি ব্যবস্থাপনায় শরণার্থীদের দেশে ফেরা শুরু হয়। ২৩ জানুয়ারির মধ্যে মোট ৯৮ লাখ ৯৩ হাজারের মধ্যে ৫০ লাখ শরণার্থী প্রত্যাবর্তন করে।’ ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ ডক্যুমেন্টস’ বইয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের মোট ৮২৫টা ক্যাম্পে ৬৭,৯৭,২৪৫ জন এবং ক্যাম্পের বাইরে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় অবস্থানরত ৩১,০২,০৬০ জন, সবমিলে ৯৮,৯৯,৩০৫ জন শরণার্থীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যাটা ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখ পর্যন্ত আপডেটেড। ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালি হিন্দু, যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যাটি প্রায় ৯৯ লাখ (৯.৯ মিলিয়ন) থেকে ১ কোটি পর্যন্ত অনুমান করা হয়। এই তথ্যের কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র নিচে উল্লেখ করা হলো,
ক। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইউএনএইচসিআর শরণার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের জন্য তারা একটি বিশাল ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়। শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া মানুষদের বেশিরভাগই আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে,
(১) পশ্চিমবঙ্গ। প্রায় ৭২,৩৫,৯১৬ জন (মোট শরণার্থীর ৭৩.০৯%)।
(২) ত্রিপুরা। প্রায় ১৩,৮১,৬৪৯ জন (মোট শরণার্থীর ১৩.৯৫%)।
(৩) মেঘালয়। প্রায় ৬,৬৮,৯৮৬ জন (মোট শরণার্থীর ৬.৭৫%)।
(৪) আসাম। প্রায় ৩,৪৭,৫৫৫ জন (মোট শরণার্থীর ৩.৫১%)।
(৫) বিহার। প্রায় ৩৬,৭৩২ জন (মোট শরণার্থীর ০.৩৭%)।
(৬) মধ্যপ্রদেশ। প্রায় ২,১৯,২৯৮ জন (মোট শরণার্থীর ২.২১%)।
(৭) উত্তরপ্রদেশ। প্রায় ১০,১৬৯ জন (মোট শরণার্থীর ০.১০%)।
এই পরিসংখ্যান ভারত সরকার এবং ইউএনএইচসিআর-এর দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, যা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সংগৃহীত। ইউএনএইচসিআর শরণার্থী ইস্যুতে ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল,
(১) আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং তহবিল সংগ্রহ করা।
(২) ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে ভারতে সরবরাহ করা।
(৩) ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত সরকারের সাথে সমন্বয় করা।
এই বিশাল মানবিক সংকট মোকাবিলায় ইউএনএইচসিআর-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার ২৭ মার্চ ২০১২ তারিখে মুক্তিযুদ্ধে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা প্রদানের জন্য ইউএনএইচসিআর-কে সম্মাননা জানায়।
খ। পিএলওএস ওয়ান (PLOS One)।
পিএলওএস ওয়ান পাবলিক লাইব্রেরি অফ সায়েন্স-এর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল। এটি গবেষণার বৈজ্ঞানিক এবং পদ্ধতিগত নির্ভুলতার ওপর গুরুত্ব দেয়, অন্যকোন গুরুত্ব বা নতুনত্বের ওপর নয়। ৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এই জার্নালে ‘Death toll among the Bangladeshi refugees of the 1971 war’ শিরোনামে একটা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। যার বিষয়বস্তু হলো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা নির্ধারণ করা। সেখানে ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯৯ লাখ উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাপত্রটি যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট শরণার্থী সংকটে শুধু সহিংস মৃত্যুর পরিবর্তে রোগ এবং অন্যান্য কারণে হওয়া অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করে। এই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শরণার্থী শিবিরগুলোতে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহের কারণে শরণার্থীদের মধ্যে যে অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল, তার একটি অনুমান করা। নিবন্ধটি পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ব্যবহার করে দেখায় যে শরণার্থীদের মধ্যে আনুমানিক ৫,৬২,৯১৫টি অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছিল। এই সংখ্যাটি হলো প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এবং স্বাভাবিক সময়ে ওই একই জনসংখ্যার মধ্যে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যার পার্থক্য।
বাংলাদেশি শরণার্থীরা ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী রাজ্য যেমন পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়াও গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিবিরগুলোতে ঔষধ ও খাদ্য সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না, যার ফলে সেখানে মৃত্যুর হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
গ। অন্যান্য সূত্র।
অন্যান্য সূত্রের মধ্যে প্রথমেই আসে উইকিপিডিয়া’র কথা। উইকিপিডিয়াতে ‘East Bengali refugees’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়েছে যে প্রায় ১০ মিলিয়ন পূর্ব-বাঙালি শরণার্থী যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোতে ভারতে প্রবেশ করেছিল। ২৬ জুন ১৯৭১ তারিখের একটি সংবাদপত্রে ভারতের ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির রেফারেন্স দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় উল্লেখ করা হয় যে, সেই তারিখ পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৩,২৫,৯৯৮ জন। এবং এই সংখ্যা পরবর্তী সময়ে আরও বৃদ্ধি পায়। সংগ্রামের নোটবুক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৫ই ডিসেম্বরের গণনা অনুযায়ী মোট ৯৮,৯৯,৩০৫ জন শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এই শরণার্থীরা প্রধানত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং আসাম রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভারতের তৎকালীন সরকার এবং জনগণ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর জন্য ত্রাণ শিবির স্থাপন করে এবং তাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে।
ঘ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র।
(১) 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র' হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি মৌলিক ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। এটি কোন ইতিহাস গ্রন্থ না, ১৫টি খণ্ডে প্রকাশিত বইগুলো স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের সংকলন। তবে যেকোন ঐতিহাসিক সংকলনের মতোই এরও কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, যেমন- সংগ্রাহকদের ত্রুটি বা কিছু তথ্য বাদ পড়া, কিন্তু এর ব্যাপকতা, সরকারি স্বীকৃতি এবং অভিজ্ঞ সম্পাদনা কমিটির কারণে এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বিশ্বাসযোগ্য দলিল হিসেবে গণ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করতে ইচ্ছুক যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি অপরিহার্য রেফারেন্স গ্রন্থ।
(২) ১৯৭৮ সালে তথ্য মন্ত্রণালয় এই দলিলপত্রগুলো সংগ্রহের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ইতিহাসের পরিবর্তে দলিল ও তথ্য প্রকাশই ছিল এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ৯ সদস্যের প্রামাণ্যকরণ কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান এবং তিনিই মূলত এই বিশাল কাজের মূল কৃতিত্বের দাবিদার। প্রথম খণ্ডগুলো ১৯৮২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হওয়া শুরু করে এবং ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ১৫ খণ্ডের পুরো সেটটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এতে মুক্তিযুদ্ধের পেছনের পটভূমি থেকে শুরু করে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের সকল ধরনের সরকারি-বেসরকারি দলিল, রিপোর্ট, সাক্ষাৎকার এবং অন্যান্য নথি কোনরকম সম্পাদনা না করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটির ৮ম খণ্ডের ৫৪১ পৃষ্ঠা থেকে ৫৭২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অধ্যায়ে শরণার্থীর সংখ্যা সংক্রান্ত দলিলপত্র উল্লেখিত আছে। যার শুরুটা হয়েছে ৩ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের একটা রিপোর্ট দিয়ে। এরপর যথাক্রমে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড (১২ এপ্রিল ১৯৭১), অমৃত বাজার (৩০ এপ্রিল ১৯৭১), যুগান্তর (৯মে ১৯৭১), ন্যাশনাল হেরাল্ড (২২ মে ১৯৭১), স্টেটসম্যান (২৩ মে ১৯৭১) পত্রিকার সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে। বইয়ের ৫৫৩ পৃষ্ঠায় ২৮ জুলাই ১৯৭১ তারিখে প্রকাশিত শরণার্থীদের ওপর আইআরসি-র রিপোর্ট উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ৩ জুন ১৯৭১ নাগাদ শরণার্থীর সংখ্যা ৪৮ লাখ এবং ১৫ জুন ১৯৭১ নাগাদ সংখ্যাটা বেড়ে ৫৮ লাখে পৌঁছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঙ। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’- ৮ম খণ্ড বইয়ের ৫৫৯ পৃষ্ঠা থেকে ৫৭২ পৃষ্ঠায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের মোট ৮২৫টা ক্যাম্পে ৯৮,৯৯,৩০৫ জন শরণার্থীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটাই বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত শরণার্থী সংখ্যা।
৩
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ একটি নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য দলিল সংকলন হিসেবে স্বীকৃত। এর বিশ্বাসযোগ্যতা কয়েকটি কারণে প্রতিষ্ঠিত,
ক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্দেশ্য।
এটি কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একক উদ্যোগে নয়, বরং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত ও প্রকাশিত। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ইতিহাস রচনা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের দলিল ও তথ্য প্রকাশ করা, যাতে গবেষক ও সাধারণ মানুষ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রামাণ্য উৎস পায়।
খ। নিরপেক্ষ সম্পাদনা কমিটি।
দলিলপত্রগুলো সম্পাদনার জন্য ৯ সদস্যের একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটিতে ছিলেন দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও গবেষকগণ, যেমন- অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবীর (চেয়ারম্যান), অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, প্রমুখ। এই ধরনের অভিজ্ঞ এবং নিরপেক্ষ পণ্ডিতদের তত্ত্বাবধান এর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
গ। ব্যাপক উৎস থেকে সংগ্রহ।
এই সংকলনে শুধু বাংলাদেশের ভেতরের নয়, বরং আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও দলিল সংগ্রহ করা হয়েছিল। এতে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি, রিপোর্ট, সামরিক বার্তা, বিদেশি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, বিদেশি সরকারের বিভিন্ন নোট, এমনকি পাকিস্তান সরকারের নিজস্ব দলিলপত্রও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বহুমুখী উৎস ব্যবহার সংকলনটিকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চরিত্র দিয়েছে।
ঘ। বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস।
১৫টি খণ্ডকে সুনির্দিষ্ট ও বিষয়ভিত্তিক ভাগে ভাগ করা হয়েছে (যেমন: পটভূমি, মুজিবনগর সরকার, সশস্ত্র সংগ্রাম, বিদেশি প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি) । এই বিন্যাস একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর সব তথ্য এক জায়গায় পেতে সাহায্য করে এবং তথ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
ঙ। দলিলভিত্তিক প্রকাশনা।
এই সংকলনটিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব মতামত বা ব্যাখ্যা খুব কম দেওয়া হয়েছে। বরং, এখানে মূল দলিলগুলোই তুলে ধরা হয়েছে, যা পাঠককে নিজ থেকে বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়। উদাহরণস্বরূপ- ৭ম খণ্ডটি সম্পূর্ণ পাকিস্তানি দলিলপত্র নিয়ে, যা যুদ্ধের পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করে।
৪
শরণার্থী সংখ্যা নিয়ে মতভিন্নতা।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের সংখ্যা নিয়ে স্বভাবতই ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সরকারি হিসেবের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।
ক। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় সূত্রগুলোতে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ৭০ লাখ থেকে ১ কোটির মধ্যে বলে অনুমান করা হয়। ভারত শরণার্থীদের সংখ্যা সম্পর্কিত সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট সরকারি হিসেব প্রদান করেনি, তবে সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে শরণার্থীর সংখ্যা প্রকাশ করেছে, যেমন- ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার। এই পরিসংখ্যান অনুসারে, সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ (৭২ লাখের বেশি), এরপর ত্রিপুরা (১৪ লাখ), মেঘালয় (৬ লাখ) এবং আসাম (৩ লাখ)। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত যুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা ৩০ লাখ এবং সামগ্রিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে এই ধারণা করা হয় যে, এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়েছিল। বেশিরভাগ সূত্র অনুযায়ী, শরণার্থীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে মুসলিম, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষও সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।
খ। পাকিস্তান সরকার অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী সংকটের মাত্রা স্বীকার করেনি এবং সংকটটিকে তারা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখিয়েছিল। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত পাকিস্তানের শ্বেতপত্র (White Paper on the Crisis in East Pakistan)-এ শরণার্থী সংখ্যা সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়নি, বরং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ওপর জোর দেয়া হয়েছিল। ওই শ্বেতপত্রে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল, যারা ছিল মূলত বিহারী সম্প্রদায়ের, এবং তাদের সংখ্যা প্রায় ৬০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ জন। তবে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সূত্র এবং গবেষণা এই সংখ্যাকে অত্যন্ত কম এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করে। এছাড়াও বাংলাদেশে থেকে ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান সরকার সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং, ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছিল।
গ। ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান শরণার্থী সংকটকে সেসময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে চিহ্নিত করেন। ইউএনএইচসিআর-এর হিসেবে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯৯ লাখ থেকে ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিছু পশ্চিমা গবেষক এবং পাকিস্তানপন্থী সূত্রগুলো শরণার্থীর সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। কিছু বিতর্কিত গবেষণায় এই সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ লাখের মধ্যে বলে দাবি করা হয়েছে। পিনাকী ভট্টাচার্যের দাবীকৃত ৯০,০০০ শরণার্থীর সংখ্যা এরকমই একটি প্রয়াস বলা যেতে পারে। তবে এধরনের গবেষণাগুলো মূলধারার ইতিহাসবিদদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে এবং তাদের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ঘ। মতভিন্নতার কারণ।
(১) গণনা পদ্ধতির ভিন্নতা: যুদ্ধের সময় সঠিক গণনা করা কঠিন ছিল। অনেক শরণার্থী শিবিরে থাকলেও, অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বা বাইরে আশ্রয় নিয়েছিল, যার ফলে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা ছিল চ্যালেঞ্জিং।
(২) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ভালো দেখানোর জন্য শরণার্থীর সংখ্যা কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার জন্য এই সংখ্যাকে কিছুটা বেশি করে তুলে ধরেছিল।
সব মিলিয়ে বেশিরভাগ নির্ভরযোগ্য উৎস এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন ভারতের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছিল, যা ভারত সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
৫
১৯৭৩ সালের দিল্লি চুক্তি।
ক। ২৮ আগস্ট ১৯৭৩ তারিখে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি দিল্লি চুক্তি বা ভারত- পাকিস্তান- বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকট সমাধান করা। শরণার্থী এবং যুদ্ধবন্দি প্রত্যাবাসনের মূল প্রক্রিয়াটি এই চুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল। চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবন্দি এবং শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। এই চুক্তির ফলে,
(১) পাকিস্তান বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
(২) ভারত যুদ্ধের প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক নাগরিকদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে দেয়।
(৩) বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার বিহারীকে পাকিস্তান গ্রহণ করে।
(৪) পাকিস্তানে আটকে পড়া কয়েক হাজার বাঙালিকেও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
(৫) বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করতে চেয়েছিল। তবে চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ তাদের বিচারের দাবি থেকে সরে আসে। তবে এই চুক্তির পর বেশিরভাগ বাঙালি শরণার্থী বাংলাদেশে ফিরে এলেও পাকিস্তান সরকারের তরফে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি কোনো বড় উদ্যোগ বা সহযোগিতা দেখা যায়নি।
খ। ১৯৭৩ সালের দিল্লি চুক্তি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা কমাতে এবং উপমহাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
৬
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর আগমন ভারতের জন্য এক বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছিল। ভারত সরকার শরণার্থীদের জন্য বিভিন্ন ত্রাণ শিবির স্থাপন করে এবং খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। অনেক শরণার্থীকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। শরণার্থীদের এই মানবিক সংকট দ্রুতই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা সেসময় শরণার্থীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। যুদ্ধশেষে শরণার্থীরা ধীরে ধীরে নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন। তবে আসামে আশ্রয় নেয়া কিছু শরণার্থী যুদ্ধের পর থেকে গিয়েছিলেন জানা যায়। সেজন্য আসামের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব নির্ধারণের একটি বিশেষ তারিখ (কাট-অফ ডেট) নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। এই তারিখের পরে যারা আসামে প্রবেশ করেছে, তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিষয় নিয়ে আসামে আজও রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিতর্ক চলছে।
হদিস:
১। https://m.rediff.com/news/1999/aug/05hoon.htm
২। https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0320760
৩। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র- ৮ম খণ্ড
৪। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ- পিনাকী ভট্টাচার্য
