১
আকাশ জানে, বাতাস জানে, ফুল-প্রজাপতি জানে।
শুধু মানুষ জানেনা কবি কোথায় শুয়ে আছেন?
২
ওরা এক জন এক জন করে কবির দিকে এগিয়ে এল।
প্রথম জন কবিকে সজোরে এক লাথিতে মাটিতে ফেলে দিল;
কবি উঠে দাঁড়ালেন---যেমন সবাই ওঠে আর কি!
কবির শান্ত চোখে নেই-অনুযোগ হাসির ছটা।
দ্বিতীয় জন এসে নিপুণ ট্রিগারে বুকের মাঝ বরাবর ফুটো করে দিল।
কবি তবু অনুভূতিশূন্যের মতন হেসে উঠলেন হা হা শব্দে!
তৃতীয় জনের অব্যর্থ ছোরা তাঁর কণ্ঠ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল।
কবি নিঃসংশয়ে বললেন,
আমি বেঁচে থাকবই!
...মিথ্যে কথা, কবির হৃদয়ও ভুল বলে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমার স্বপ্ন’ কাব্যগ্রন্থের ‘কবির মৃত্যু: লোরকা স্মরণে’ কবিতা থেকে লাইনগুলো নেয়া হয়েছে।
কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। ১৮৯৮ সালের ৫ জুন মাসে গ্রানাডা শহরের কাছে ফুয়েন্তে ভাক্যুয়েরসে কবির জন্ম। তার বাবা ফেদেরিকো গার্সিয়া রোদরিগেস ছিলেন একজন স্বচ্ছল কৃষক, আর মা ভিসেন্তা লোরকা রোমেরা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা। লোরকার তরুণ বয়সে স্পেন অতিক্রম করছিলো সৃজনশীলতার এক অনন্য সময়। কাব্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র বা শিল্পকলা নতুন নতুন আবির্ভাবে ঋদ্ধ। বিস্ময়কর সব নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসা ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য রেখে যাচ্ছিলো। লোরকা ছিলেন উনিশ শতকের বিখ্যাত ‘জেনারেশন অব সেভেন্টিন’ এর একজন। তার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি, কবি রাফায়েল আলবারটি, কবি পাবলো নেরুদা, বুলফাইটার-কবি- নাট্যকার ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস, চিত্র পরিচালক লুই বুনুয়েলসহ অনেকেই। তার উল্লেখযোগ্য বই হলো ব্লাড ওয়েডিং, ইয়ারমা অ্যান্ড দি হাউস অব বার্নাডা, এলবা ইত্যাদি। স্পেন এবং স্পেনের বাইরে তার সমান জনপ্রিয়তা আজ পর্যন্ত আর কোন স্প্যানিশ কবির ভাগ্যে জোটেনি। কবি বলেছেন,
"The poem, the song, the picture, is only water drawn from the well of the people, and it should be given back to them in a cup of beauty so that they may drink - and in drinking understand themselves."
ত্রিশের দশকের টালমাটাল রাজনৈতিক হাওয়া স্পেনেও বইছিলো। বিশ্ব জুড়ে থাকা সমাজতন্ত্রী চিন্তার হাওয়া লেগেছিলো স্পেনেও। যা তখনকার শিল্প-সাহিত্যিকদের চিন্তায় ও রচনায় নানাভাবে প্রভাবিত করেছিলো। ক্ষমতায় ছিলো সমাজতন্ত্রী দ্বিতীয় স্প্যানিশ রিপাবলিকান। ১৯৩৬ সালে সেই সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল ফ্রান্সেসকো ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনালিস্টরা দখল করে আর স্পেন কেঁপে উঠেছিলো রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দামামায়। লোরকা গৃহযুদ্ধের প্রথমদিকে, ১৯৩৬ সালের অগাস্ট মাসের ১৮ তারিখে গ্রেপ্তার হন। তখন মাত্র আটত্রিশ বছর বয়স তার। তাকে গ্রানাডার জেল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী আলফাকার পাহাড়ের পাদদেশে এক নির্জন স্থানে। একজন শিক্ষক এবং দু’জন ন্যাশনালিস্ট বিরোধী বামপন্থী বুলফাইটারের সাথে তাকেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ১৯ আগস্ট ফ্রাঙ্কোর ঘাতক বাহিনীর ফায়ারিংয়ে তিনি নিহত হন, ১৯৭১ সালে আলবদররা যেভাবে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো।
১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই গৃহযুদ্ধে অর্ধ মিলিওনেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়ে ছিলো। ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে জুন মাসের মধ্যে ২৩৯টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। সেসময় ফ্যালাঞ্জিস্টরা প্রতিমাসে গড়পড়তায় এক হাজার করে রিপাবলিক্যানদেরকে হত্যা করতো। অনেকের মতো লোরকার লাশও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তার প্রকাশনা, এমনকি তাকে নিয়ে কথা বলার ওপর ফ্রাঙ্কো সরকারের নিষেধাজ্ঞা ছিলো। তারপর থেকে তার লেখাগুলো স্পেনে আস্তে আস্তে উন্মুক্ত হতে শুরু করে। মৃত্যুচিন্তা তার কবিতায় এক বিরাট জায়গা জুড়ে আছে। কবিরা বোধহয় ভবিষ্যৎ দেখতে পান,
Then I realized I had been murdered.
They looked for me in cafes, cemeteries and churches
…. but they did not find me.
They never found me?
No. They never found me.
(The Fable And Round of the Three Friends/ Federico García Lorca)
৩
সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থাকলেও তার রচনা এবং বিভিন্ন সময় নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতি ও বামপন্থীদের সাথে সংহতিমূলক ভূমিকার জন্য দক্ষিণপন্থীদের চোখে তিনি ছিলেন ‘লাল বুদ্ধিজীবী’। ফ্যালাঞ্জিস্টরা বহুদিন ধরেই তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় জানানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। কারণ তিনি মৃত্যুর কয়েকমাস আগে স্পেনের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘লা ভস’ এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘I will always be on the side of those who have nothing and who are not even allowed to enjoy the nothing they have in peace." ফ্রাঙ্কোর ক্ষমতা দখলের কয়েকদিন আগে বুনুয়েল ও অন্যান্য বন্ধুদের নিষেধ উপেক্ষা করে মাদ্রিদ থেকে গ্রানাডার গ্রামের বাড়িতে চলে যান লোরকা, কিন্তু সেখানেও নিরাপদ বোধ না করলে আশ্রয় নিয়েছিলেন তার ফ্যালাঞ্জিস্ট সমর্থক কবিবন্ধু লুইস রোসালিসের বাড়িতে। সেখান থেকে লোরকাকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়, রোসালিস তখন বাড়িতে ছিলেন না, ফিরে এসে বহু চেষ্টা করেও তিনি বন্ধুকে ছাড়িয়ে আনতে পারেননি।
লোরকাকে বন্দী করা একজন ফ্যালাঞ্জিস্টকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে লোরকার কী অপরাধ। সে তখন বলেছিলো যে, ‘তার লেখালেখি। অন্যেরা পিস্তল-বন্দুক হাতে নিয়েও যে ক্ষতি করতে পারেনি, সে কলম হাতে নিয়েই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে ফেলেছিলো’। তার হত্যাকারীরা অবশ্য প্রকাশ্যে তার লেখালেখি সংক্রান্ত অপরাধের কথা কখনো স্বীকার করেনি। বরং তার মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নানা অপপ্রচার চালানো হয়। লোরকা বলেছিলেন, “A dead man in Spain is more alive than a dead man anywhere in the world” ফ্রাংকোর স্বৈরাচারী সরকার সেজন্যই হয়তো লোরকাকে হত্যা করার কথা স্বীকারই করেনি।
লোরকা কি জানতেন যে তাকে এভাবে খুন করা হবে? কবিরা কি ভবিষ্যতদ্রষ্টা? নাহলে কী করে তিনি মৃত্যুর কয়েক বছর আগেই লিখে যান এমন কবিতা,
যখন শুদ্ধ আকৃতিগুলো ডুবে যায়
ঘাশফুলের কিচিরমিচিরের নিচে,
বুঝলাম যে আমাকে খুন করা হয়েছে।
ওরা ক্যাফে, গোরস্তান আর গীর্জায় খোঁজ করল।
পিপে ও আলমারি খুলে দেখল।
তিন-তিনটে কংকাল চূর্ণ করল তার সোনার দাঁতের জন্য।
তারপরও ওরা আমাকে পায়নি।
আমাকে পায়নি?
না, ওরা আমাকে পায়নি।
(উপকথা আর তিন বন্ধুর ঘুরনাচ- লোরকা/অনুবাদ-মোরশেদ শফিউল হাসান)
৪
স্পেনের একজন ঐতিহাসিক, মিগুয়েল কাবাল্লেরা পেরেজ দাবি করেছিলেন কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা কোথায় শুয়ে আছেন তা তিনি জানেন। তিনি তার দাবি তুলে ধরেছেন “The Last Thirteen Hours of Garcia Lorca” বইয়ে। এক্ষেত্রে তিনি রেফারেন্স হিসেবে ষাট দশকের স্পেনের একজন সাংবাদিক, এডোরাডো মোলিনা ফারারডো’র দেয়া তথ্য ব্যবহার করেছেন। মোলিনা ছিলেন অতি দক্ষিণপন্থী ফ্যালাঞ্জো দলের সদস্য। মোলিনার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার দেয়া তথ্যগুলো সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মোলিনা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সাথে সহজে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তার লেখা গ্রানাডার ভিনজার গ্রামের একটি স্থানকে নির্দেশ করে। এই জায়গা সম্পর্কে বলা হয়,পার্শ্ববর্তী দুটি গ্রামের খামারে পানি সরবরাহের জন্য এখানে সেই সময় খান খনন করা হয়েছিলো। ঐতিহাসিক আইয়ান গিবসন ১৯৭১ সালে দাবি করেছিলেন সেখানে লোরকার কবর আছে। ২০০৮ সালে স্পেনের আদালত কবির কবর অনুসন্ধানের জন্য সেখানে খননের অনুমতি দেয়। শুরুতে এই খোঁড়াখুঁড়িতে লোরকার পরিবারের অমত থাকলেও অনেক তর্ক-বিতর্ক শেষে তারাও সায় দেয়। ২০০৯ সালে এই স্থানটি খনন করা হলেও সেখানে কোন কবরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে অসাধারণ কিছু সনেট লিখেছিলেন লোরকা। গৃহযুদ্ধের রক্তাক্ত ডামাডোলে হারিয়ে গিয়েছে সেই সব সনেট। অসম্ভব ভালবাসা আর কষ্ট মাখানো সেইসব অমূল্য রত্নভাণ্ডার আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। লেখা শেষ করবো কবির Fare well কবিতার কয়েকটা লাইন দিয়ে, এটি ‘Selected Poems of Federico García Lorca’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে, ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন W. S. Merwin।
শত্রুরা লোরকার দৈহিক মৃত্যু নিশ্চিত করেছে কিন্তু মুছে ফেলতে পারেনি তার অস্তিত্বকে। সারা পৃথিবীর সকল বিপন্ন কবির অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে লোরকা আজো বেঁচে আছেন। তিনি ঘুমিয়ে আছেন দক্ষিণ গ্রানাডার এক নির্জন প্রান্তে। আকাশ জানে, বাতাস জানে, ফুল-প্রজাপতি জানে। শুধু মানুষ জানেনা, কবি কোথায় শুয়ে আছেন?
If I die,
leave the balcony open.
The little boy is eating oranges.
(From my balcony I can see him.)
The reaper is harvesting the wheat.
(From my balcony I can hear him.)
If I die,
leave the balcony open!
হদিস:
১। আমার স্বপ্ন- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
২। লোরকাঃ নির্বাচিত কবিতা- অনুবাদঃ মোরশেদ শফিউল হাসান
৩। ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা ইয়ের্মা- ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা
৪। অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ- ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা
৫। ইন্টারনেট
