১
এ্যারাবিয়ান উপকথায় আছে সাদা গোলাপকে বুলবুলি পাখি আলিঙ্গন করায় বুলবুলি পাখি গোলাপের কাঁটায় আহত হয়। এরপরে আহত বুলবুলি’র রক্ত গায়ে মেখে সাদা গোলাপ সাদা থেকে লাল গোলাপে পরিণত হয়েছে। জীবাশ্ম প্রমাণ যদি সত্যি হয়, তাহলে বলবো, গোলাপের জন্ম ৩৫০ লাখ বছর আগে। প্রাচীন কাল থেকেই গোলাপকে একটি পবিত্র ফুল হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীন মিশরীয় দেবী আইসিস, গ্রিক প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী আফ্রোদিতি এবং প্রাচীন রোমের ভালোবাসার দেবী ভেনাসের কাছেও গোলাপ ছিলো পবিত্র। গ্রিক পুরাণে আফ্রোদিতি হচ্ছে প্রেমের দেবী। বিশ্বাস করা হয়, আফ্রোদিতির কান্না এবং তার প্রেমিক অ্যাডোনিসের পায়ের রক্ত থেকে গোলাপ এর জন্ম। খ্রিষ্টীয় ধর্মে, মেরির কুমারীত্বের প্রতীক মনে করা হয় গোলাপকে। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে আছে বিষ্ণু ব্রহ্মাকে পদ্মই শ্রেষ্ঠ ফুল বললে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে স্বর্গে নিয়ে সেখানে হালকা রঙের একটি সুগন্ধি গোলাপ দেখান।
২
খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ বছরের আগেই চীনে গোলাপের বিস্তার ঘটে। খ্রিস্টপূর্ব ৭১৭ সালে ব্যাবিলনে গোলাপ পৌঁছে। এ্যাসিরিয় রাজা সারগন উর-এ গোলাপ নিয়ে আসেন। খ্রিস্টপূর্ব ৬৩০-৫৬২ এর মধ্যে নেবুচাদনেজার এর প্রাসাদের রাজ দরবার মুড়ে দেয়া হতো সাদা আর হলুদ গোলাপে। গোলাপ বিছানো থাকতো কার্পেটে। তার রাজপ্রাসাদের স্তম্ভে খোদাই করা ছিলো গোলাপ ফুল। চীনা পর্যটক কনফুসিয়াস এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ বছর এর আগেই চীনের ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে শুধু গোলাপকে নিয়েই বইএর সংখ্যা ছিলো ৬০০। খ্রিস্টপূর্ব ৫২৩ সালে ব্যবিলন নগরী রাজা সাইরাসের দখলে গেলে তিনি সবকিছু ধ্বংস করলেও গোলাপের গায়ে আঁচরটিও দেননি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরেই গোলাপ বাগানে বসে শরীরের ঘাম জুড়নো ছিলো তার অভ্যেস। সুন্দরী ক্লিওপেট্রা যখন মার্ক অ্যান্থনির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করেন তখন তার পুরো দেহে জুড়ে ছিলো গোলাপের পাপড়ি, যাতে করে মার্ক অ্যান্থনি ক্লিওপেট্রার ঐশ্বর্য এবং গোলাপের গন্ধ দীর্ঘদিন মনে রাখে। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে পারস্য হয়ে গেলো গোলাপের দেশ। সেখানে গোলাপ দেখা গেলো বাগানে, কার্পেটে, বিছানায়, সুগন্ধিতে, ছবিতে, নকশায়, ভাস্কর্যে, স্থাপত্যে, পোর্সেলিনে, এমনকি সাহিত্যেও। কোথায় নেই গোলাপ! ওমর খৈয়াম চেয়েছিলেন তার সমাধি ক্ষেত্রের পাশেই থাকবে গোলাপ গাছ। মোগল সম্রাট বাবর ভারতবর্ষে গোলাপ ফুল আমদানি করেন। তিনি কাবুলের মতো আগ্রায় গড়ে তোলেন গোলাপের বাগান। এর আগে ভারতে গোলাপের বাগান ছিলো না, ছিলো পদ্মের বাগান। বাবর বাগানে বসে লিখলেন,
‘আমার হৃদয় যেন লাল, আরো লাল গোলাপের কুঁড়ি,
পাপড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে উম্মোচন।
শত বসন্তের হাওয়া কি কখনো পারবে
আমার হৃদয়ের কুঁড়িকে গোলাপ করে দিতে?’
ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের স্ত্রী জোসেপিন ১৮০০ সালের দিকে তার রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে নানা প্রজাতির গোলাপের চাষ করেন। ১৮২৪ সালে বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ এবং চিত্রশিল্পী পিয়েরে জোসেফ রিদোতে ছবি আঁকার জায়গা হিসেবে বেছে নেন এই বাগানটিকে। তিনি তার জলরঙের বিশাল সংগ্রহ ‘লেস রোজ’ সম্পন্ন করেন এখানেই। আজও রিদোতের আঁকা ছবিগুলো বোটানিক্যাল ইলাস্ট্রেশনের সেরা কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৩
গোলাপ সম্পর্কে কবিদের কেন যে এতো টান! গোলাপ ঘুরে ফিরে বিভিন্ন ভাবে এসেছে কবিদের লেখায়। কখনো আলোর প্রসঙ্গে, কখনো অসুখের প্রসঙ্গে, অস্তিত্বের হাজারো সঙ্কটের প্রসঙ্গে গোলাপ। প্রেমের রাজ্যে গোলাপের একক রাজত্ব, আবার বিরহেও গোলাপ। যখন গোলাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তখন গোলাপ যেন কোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতিনিধি কিংবা প্রতীক। গোলাপ মৃত্যুরও সহচর, মৃত্যুর প্রস্থান এবং উত্থান দুয়ের জন্যই তার হাত ধরে ডাকাডাকি। গোলাপের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক কতো নিবিড়! রক্তপাত কিংবা রক্তক্ষরণ, সে হয়তো গোলাপের ঐ কাঁটার জন্যই। কবির কবিতায় গোলাপ যেমন উপবিষ্ট, তেমনি উপস্থিত তার কাঁটাও। শেলী রক্তাক্ত হতে হবে জেনেও ঝাঁপ দিতে চেয়েছিলেন, আর তার উপলব্ধি ‘থর্ন অফ লাইফ’।
কি সৌভাগ্য বলতে হবে রিলকের! একদম কবির মতোই মৃত্যু যেন! একবার গোলাপের কাঁটায় আঙ্গুল ছড়ে গিয়েছিলো তার। তারপর ধীরে ধীরে সেই ক্ষতই হয়ে গেলো মৃত্যুদূত, থানাতোস। তার জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের সময়ে সুইজারল্যান্ডের যে গ্রামে তার মৃত্যু হয়েছিলো সেখানে এক নতুন জাতের গোলাপের নামকরণ করা হয়েছিলো- রাইনার মারিয়া রিলকে। কবির সমাধিতে লেখা হয়েছিলো এপিটাফ,
‘Rose on the pure Contradiction,
Delight of Being No one’s Sleep under so Many Lids.’
অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত এর অনুবাদ করেছেন এভাবে,
‘বিশুদ্ধ বিরোধাভাস, হে গোলাপ,
সকলের চোখের পাতায়
রাজো, তবু নও কারো ঘুম নও।
সেই বুঝি সুখ’
৪
স্পেনের বিখ্যাত কবি হোয়ান রামোন হিমেনেৎ মাত্র এক লাইনের একটা কবিতায় প্রশ্ন করেছিলেন,
‘গোলাপ কি করে ছিল আবৃত অথচ নগ্ন একই সময়ে?’
তিনি আবারো বলেছেন,
‘আর ছুঁয়ো না, আবার ওকে অতো
বোঝ না কেন গোলাপ এই মতো’
স্পেনেরই আরেক কবি লোরকা’র লেখা কবিতা অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে,
‘গোলাপ
খোঁজে না সময় সূচনা ঊষাঃ
আপন বৃত্তে চিরজীবী প্রায় – খোঁজে
আরো কিছু আরো কিছু।
গোলাপ
বোঝে না তত্ত্ব, আলো কি ছায়াঃ
কিছু-কায়া কিছু-মায়া সে, কেবল খোঁজে
আরো কিছু আরো কিছু।
গোলাপের মন
মজে না গোলাপ-রাগে।
আকাশ-চিত্রে মূর্ছিত, ও কি খোঁজে
আরো কিছু, আরো কিছু!’
৫
ফিরে আসি আবারো গোলাপকে নিয়ে আরব উপকথায়, এবার গল্পটা সামান্য ঘুরিয়ে বলি, একদিন একটি বুলবুলি পাখি একটি সাদা গোলাপের কাছে গিয়ে বললো, আমি তোমাকে ভালোবাসি। গোলাপ পাখিটিকে বললো, যে দিন আমি সাদা থেকে লাল রং হবো, সে দিন আমিও তোমাকে ভালবাসবো। বুলবুলি চিন্তায় পরে গেল, সে অপেক্ষায় থাকে। এরপর একদিন বুলবুলি গোলাপের কাছে গিয়ে তার বুকের রক্ত দিয়ে গোলাপ’কে লাল রং বানিয়ে দিল, বুলবুলি মরে গেলে গোলাপ ফুলটি বুঝতে পারে ভালবাসা কি!
এতো গেল উপকথার কথা, এবার বলি ‘রোজা মিউতাবিলে’র কথা, বাংলায় এর নাম অনিত্য গোলাপ। ছবিতে দেয়া এই গোলাপটি সকালে যখন ফোটে তখন থাকে গাঢ় রক্তিম। এরপর যতই বেলা বাড়তে থাকে ম্লান হতে থাকে তার রং। যখন ঝরে পড়ে তখন পাপড়িগুলো মৃতের মতো সাদা! প্রকৃতিও আরব উপকথাটিকে কেমন ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুড়িয়ে দিয়েছে, প্রকৃতি আর উপকথার কীরকম মাখামাখি! যাহোক, সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন,
‘গোলাপ যাহা প্রণয় যদি হতো তাই,
আমি তারই হতাম পাতার মত’
এই লেখা শেষ করবো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কবিতা দিয়ে।
কবি লিখেছেন,
‘গোলাপ হাসিয়া বলে,"আগে বৃষ্টি যাক চলে,
দিক দেখা তরুণ তপন--
তখন ফুটাব এ যৌবন।’
হদিস:
১। পদ্য-পাগলের পাণ্ডুলিপি- পূর্ণেন্দু পত্রী
২। ইন্টারনেট
