কাল রাতে-ফাল্গুনের রাতের আঁধারে।।
যশোর রেলষ্টেশনটা ঐ রাত জেগে থাকা কালের সাক্ষী
বটগাছটার মতই পুরোনো। সেখানে ইট সুরকী আর ক্ষয়ে যাওয়া লোহার ফ্রেমগুলো দিনরাত ফিসফিস
করে কোনও এক সুদূর অতীতের কথা বলে, শৈশবে শোনা রূপকথার গল্পের ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীর মত। এলোমেলো বাতাসে মরচে ধরা টিনের ছাউনিগুলো দোল খায় বেতস
লতার মত। হাল্কা
বাতাসে কেঁপে ওঠে তিরতির করে। বিবর্ণ
ষ্টেশনটা যেন বিগত যৌবনা এক নারী, এক
সময় যার সাম্রাজ্য ছিল, ছিল অপার সৌন্দর্যের হাতছানি। রঙ-রূপ-রস হারিয়ে সে এখন খসে
পরা ধূসর পলেস্তরা, রংচটা ক্যানভাসে
হাবিজাবি আঁকিবুকি, যার এখন শুধু কাঠামোটাই টিকে আছে কোন একভাবে। পেত্রা নগরীর মত কালের
আবর্তে ধু ধু বালিয়াড়িতে তার জৌলুশ চাপা পড়েছে। শীতের শেষ তবু সন্ধ্যাগুলোয় ঘন কুয়াশার চাদর শাড়ীর মত জড়িয়ে
রাখে ষ্টেশনের জীর্ণ কাঠামোটাকে। বিদ্যুতের লাইনগুলো থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ে
রাতের ঘন শিশির। ভেজা ল্যাম্প পোস্টের আলোগুলোও যেন ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া কোনও
এক জবুথবু বুড়ি। আলো তাই মাটি অব্দি পৌছায় না। ল্যাম্প
পোষ্টের হলদেটে আলো যেন বাদুড়
ঝোলার মত পোস্টেই ঝুলে থাকে। ম্যাড়মেড়ে সে আলোয় প্ল্যাটফর্মে হেঁটে বেড়ান মানুষগুলোকে তাই আধিভৌতিক বা অপসৃয়মান ছায়ার মত লাগে। অস্পষ্ট
অবয়বগুলো যেন সরীসৃপের মত ক্রমাগত সরে যায় এদিক সেদিক। তাদের
কেউ হয়ত তার মতই রাতের ট্রেনের যাত্রী কিংবা ভবঘুরে মানুষ অথবা চোরাকারবারি। সীমান্তের
কাছে বলে চোরাচালান ব্যবসাটা বেশ
জমজমাট এখানে। ওপার থেকে চিনি আসে আর এপার থেকে যায় চায়নিজ সিল্ক সূতা
অথবা হুন্ডি হয়ে ডলার। ফেন্সিডিলও আসে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত। ফেন্সিডিলের
কারখানাগুলো অবশ্য এদেশের জনগণের ভোগের সুবিধার্থে পুরো সীমান্ত জুড়েই বসানো হয়েছে। যদিও বোতলের মোড়কে লেখা থাকে মেড
ইন হিমাচল।
রেল
পুলিশের দু’জন কনস্টেবল কাঁধে
চাইনিজ রাইফেল ঝুলিয়ে পান খায়, পিক্ ফেলে আর উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরে সারা
প্ল্যাটফর্ম জুড়ে। এর ওর
সঙ্গে কথা বলে, যাত্রীদের কারো সঙ্গে বস্তা
বা বড় ব্যাগ দেখলে কি আছে ভেতরে জিজ্ঞেস করে, হাতের লাঠি দিয়ে গুঁতো দেয় চটের বস্তায়, পরখ
করে দেখে। এত রাতেও একটা অন্ধ ভিখারি তার কিশোরী
কন্যাকে সাথে নিয়ে গান গায়, ভিক্ষা করে। ভিখারি কন্যার হাড় জিরজিরে শরীর ঠেলে উঁকি দেয়া পুষ্ট
স্তন জানান দিতে চাচ্ছে নতুন যৌবনের। নসু হায়েনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।
মেয়েটি বোধহয় নসুর চোখের আদিম ভাষা বুঝতে পারে। রহস্যময়
হাসি দিয়ে সে সরে যায় অন্য দিকে। প্ল্যাটফর্মের কোনের চায়ের স্টল থেকে ভেসে আসছে
মানুষের ফিসফাস–চাপা হাসি কিংবা চায়ের কাপে চামচের অযথা টুংটাং আর পুরনো দিনের হাল্কা
চটুল হিন্দি গানের সুর। যাত্রীদের মাঝে ট্রেনের অপেক্ষায় টানটান উত্তেজনা। কেউবা
ঘনঘন হাত ঘড়িতে সময় দেখে আর টর্চের অনুজ্জ্বল আলো ফেলে রেল লাইনের অতল অন্ধকার
বরাবর। টর্চের আলোয় ট্রেন খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টা আরকি! জিন্সের পকেট থেকে
লাইটারটা বের করে প্যাকেটের শেষ সিগারেটে আগুন দেয় নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে
পাঙ্খা নসু। একটা লম্বা
ঘন টান দিয়ে ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়তেই চোখে পরে প্ল্যাটফর্মের শেষে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা পাগলিটার দিকে। নোংরা চট মুড়ি দিয়ে শুকনো বিড়িতে টান দেয় আর বিরবির করে কি সব বলে।
দৃষ্টিটা সেখান থেকে সরিয়ে এনে এদিকে সেদিকে ঘন অন্ধকারে তাকায়। পুলিশ বা র্যাবের ইনফরমার তাকে ফলো করছে কিনা বোঝার চেস্টা করে। অবশ্য তাদের কারও
জানার কথা না যে সে সীমান্তের এপারে, কাঁটাতার পেরিয়ে দেশে ঢুকেছে। নসু শুধু
লীডারকে অর্থাৎ ল্যাংড়া মনিরকে ফোনে জানিয়েছে যে সে শীঘ্রই দেশে ফিরে আসছে।
কাঁধের
ব্যাগটা ক্ষয়ে যাওয়া ফ্লোরে নামিয়ে নিঃসঙ্গ কাঁঠালগাছটার নীচে বসে। এ জায়গাটা বোধ হয় প্ল্যাটফর্মের এক্সটেনশন।
সেখানে সিমেন্টে বাঁধানো ফ্লোর
থাকলেও মাথার ওপরে ছাউনিটা নেই। দূরে
আধো আলোয় রূপজীবী এক যুবতী দাড়িয়ে আছে খদ্দেরের আশায়। এতদূর থেকেও তার মুখের সস্তা
পাউডারের প্রলেপ আর ঠোঁট লেপ্টে থাকা টকটকে লাল লিপিস্টিকের রঙ বোঝা যায়। কি রকম
ভাবে দাড়িয়ে আছে সে! অজন্তা ইলোরার প্রস্তর মূর্তি যেন! শরীরের ভাঁজ দেখানোর কি এক
প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! তার স্পর্ধিত স্তনাগ্র মৈনাক চুড়া যেন! সেদিকে তাকিয়ে নসুর
শরীরটা কেমন যেন করে ওঠে। কিন্তু সেটা কয়েক মুহূর্তের আদিম লিপ্সা মাত্র। পরক্ষণেই
সে হাত দিয়ে জিন্সের কোমরে সাঁটান পিস্তলের অস্তিত্ব পরখ করে নেয়। এটা ওর একধরনের
অভ্যাস। ওরা অবশ্য পিস্তলকে বলে ঘোড়া। আর পিস্তলের গুলিকে বলে বীচি। ওর সঙ্গে
এমুহূর্তে গোটা দশেক আছে। দক্ষিণ
কলকাতায় পঞ্চাননতলা বস্তিতে থাকার সময়ে ঘোড়ায় দারুণ হাত পাকিয়েছে সে। সেখানে দাশু
মাস্তানের দলে ভিড়েছিল নসু। দাশু মাস্তানের
হয়ে সে ভাড়ায় কিলিং করত। এতে
নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি মাস শেষে ভাল মাসোহারা জুটত।
নসুর ঘরটা ছিল আমরি
হাসপাতালের ঠিক পিছনেই রেল লাইনের ধারে। একই ঘরে আলাদা চৌকিতে সে আর নলাদা থাকত। মেদিনীপুর
থেকে আসা নলাদা তার চেয়ে বছর আটেক বড় হবে, সে রোজ সুন্দর বেশ ভূষায় পার্ক স্ট্রীট
এলাকায় হাত ছাপাইয়ের কাজ করে। পার্ক
স্ট্রীট এলাকায় সে পকেটমারদের একটা
গ্রুপ চালায়। কখনও ফুর্তির জন্য ঘরে মেয়ে মানুষ নিয়ে এলে বিছানার মশারী চাদরদিয়ে
ঘিরে নিত নলাদা। চৌকির ক্যাচক্যাচ শব্দে নসুর রাতের ঘুম নষ্ট হলে হারিকেনের স্বল্প
আলোয় সেসব দেখত আর মনেমনে গালি দিত। নলাদা
এসব বুঝত কিন্তু সে মাইন্ড করত না। পরদিন সকালে বরং সে নসুর কাছে সার্টিফিকেট
চাইত। নসু তাকে একশ পার্সেন্ট নাম্বার দিতে কখনো ভুল করেনি। সঙ্গিনীর
আবদারে নলাদা কখনো তাকে ঘর থেকে বের করে দিলে সে উঠানের খুটিতে হেলান দিয়ে চুপচাপ
সারারাত পার করত। নসু এসবে কখনও প্রতিবাদ
করেনি। হয়ত তার
কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে। সে যখন জোড়া খুনের দায়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে ওপারে পার্ক স্ট্রিটে
উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরাফেরা করছিল তখন এই নলাদাই তাকে দয়া করে সোদপুরের পঞ্চাননতলা
বস্তিতে এনে ঠাই দিয়েছিল। তৃণমূলের
এক নেতার কল্যাণে কিভাবে যেন ভুয়া পরিচয়ে রেশন কার্ডও মিলে যায়। দাশু
মাস্তান নেতার কাছের লোক তাই হয়ত
পুলিশ কখনও তাকে ঘাটায়নি। পাশাপাশি
তার ওপরও কড়া নির্দেশ ছিল লালবাজার স্ট্রিটে পুলিশের খাতায় নাম ওঠান চলবেনা। কুয়াশায়
মাথা ভিজে যাচ্ছে,নসু মাফলারটা মাথায় ভাল করে পেঁচিয়ে নেয়। ঘড়ির
কাঁটায় এখন রাত সারে আটটা।
সুন্দরবন এক্সপ্রেস আসবে রাত ন’টায়। ঢাকায় যাবে। নসু সিগারেটে বেশ জোরে শেষটানটা
দিয়ে বাট দূরে ছুড়ে ফেলে। প্ল্যাটফর্মের কোনা
গড়িয়ে সেটা পড়ে রেল লাইনের ওপর। নিভুনিভু
আগুনটা একসময় পুরোপুরি নিভে যায়। পড়ে থাকে
নিঃসীম অন্ধকার আর শূন্যতা। কুয়াশার চাদরে ঢাকা চাদটাকে কেমন পানসে আর হলদেটে
লাগে! কম ভোল্টেজে বাতিগুলো যেমন জ্বলে আরকি! এরকম আরেক পানসে আলোয় শীতের রাতে জীবনটাকে
হাতে নিয়ে সে ওপারে পালিয়ে গিয়েছিল। সীতার মত স্বেচ্ছা নির্বাসনে! তা’ প্রায় বছর তিনেক আগে
হবে। তখন তার প্রিয় বাচ্চু ভাই অর্থাৎ কালীগঞ্জের বাচ্চু চেয়ারম্যান তাকে সাহায্য
করেছিল। তার কাছে সে খুবই
কৃতজ্ঞ। এপারে
এসেই নসু তার খোঁজ করেছিল। কিন্তু
সে আজ বেঁচে নেই। আন্ডার গ্রাউন্ড দল সর্বহারার লালন গ্রুপের হাতে খুন
হয়েছে। এখন তার ছেলে নজরুল এলাকার চেয়ারম্যান। তার বাবা কাদের হাতে খুন হয়েছে সে
ব্যাপারে নসু তাকে খোঁজ নিতে বলে। প্রয়োজনে সে
কিলিং মিশনে তার পুরো গ্রুপ নিয়ে আসবে। অবশ্য নসু এখনো জানেনা ঢাকায় ফেলে আসা তার গ্রুপটার এখন কি অবস্থা! পুরনো কে কে
গ্রুপে আছে? নতুন কারা এসেছে? তারা কে কি রকম? সে তেমন কিছুই জানেনা। লীডারের
কাছে শুধু জেনেছে তার অবর্তমানে
হোয়াইট বাবুই গ্রুপটাকে চালিয়েছে। সে ফিরে
গেলে হয়ত ওই গ্রুপটাকেই তাকে দেয়া
হবে কিংবা নতুন কোন গ্রুপ তৈরি করে নতুন এলাকার দায়িত্ব দেয়া হবে।
এক সময় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগের টাইরানোসোরাস
রেক্স ডাইনোসরদের মত হিসহিস শব্দ করতে করতে ট্রেনটা এসে দাঁড়ায় দাঁত মেলে বসে থাকা
প্ল্যাটফর্মে। মাকড়সা জননীর মত ট্রেনটা অসংখ্য যাত্রী প্রসব করে। মুহূর্তে
মানুষের প্রাণ চাঞ্চল্যে কর্মমুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেশন। যাত্রীরা কেউ নামছে আবার কেউবা উঠে নিজের সীটের
সন্ধানে ব্যস্ত। তবে যতজন যাত্রী নেমেছে উঠেছে বোধহয় তার দ্বিগুণ। মাথায় গামছা
বাঁধা লাল ফতুয়া গায়ে কুলীদের জোরালো হাকডাক শুনতে পাওয়া যায় চারদিকে। তারা
মাথায় বাক্স পেটরা নিয়ে দৌড়ে চলে ট্রেনের কামরার দিকে। সবাই ব্যস্ত অথচ নসুর যেন
কোন তাড়া নেই। সে বরং দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে আগুন ধরায় আর চেয়ে দেখে মানুষের
আনাগোনা। গ্রীক পুরাণের দানব মেডুসার মাথার হাজারো সাপের মত কিলবিল করছে যেন! এক সময় ট্রেনটা তীব্র
হুইসেলে সুর তোলে আর ঢংঢং করে বেজে ওঠে প্ল্যাটফর্মের লোহার
ঘন্টাটা। ট্রেনটা যেন ঝাঁকুনি দিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে। রেলের কর্মচারী পতাকা উড়িয়ে সংকেত দেয়। যাত্রার
প্রস্তুতি। নসু পায়ের তলায় সিগারেটের আগুন মাড়িয়ে কাঁধের ব্যাগটা হাতে নেয় আর লাফ
দিয়ে উঠে পড়ে সামনের বগিটাতে। ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন চলতে শুরু করে। নসু যাত্রীর বেশে
জনারন্যে মিশে যায়।
প্রেম ছিল,আশা ছিল–জ্যোৎস্নায়,
নসু মিয়া তখনও
পাঙ্খা নসু হয়ে ওঠেনি,সবাই ডাকত পিচ্চি। উচ্চতায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার কারণে। মিরপুরে
রূপনগর বস্তির এক মাথায় লেকের কাছাকাছি একটা ঝুপড়ি ঘরে থাকত তারা। বাবা-মা
আর পাঁচ ভাই-বোন মিলে বেশ বড় সংসার। নসু সবার বড়। নসুর বাবা ফুল মিয়া রোজ সকালে
ঘুম থেকে উঠে তার চটপটির ভ্যান নিয়ে চলে যেত চিড়িয়াখানার গেটে। মাঝেমাঝে অবশ্য
খেলা থাকলে ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যেত। বিক্রি
বাট্টা খারাপ হতনা। নসু রোজ দুপুরে টিফিনবাটিতে করে বাবার জন্য খাবার নিয়ে যেত। মা’র ছিল বিভিন্ন বাসায় ছুটা বুয়ার কাজ। দিনে
সময় পেত না মোটে। কিন্তু তারপরও ঠিকই সময় বের করে ছুটে এসে গরম ভাত, ভর্তা–ভাজি রান্না করে টিফিনবাটি
হাতে নসু মিয়াকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দিত। মাসে
একদিন তারা পরিবারের সবাই মিলে পর্বত সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে
যেত। মান্না ভাইয়ের অভিনয় ভাল লাগত নসুর। কি সুন্দর ফাইট করে! এরপর রঙিন বেলুন
কিনে আইসক্রিম খেতে খেতে সবাই একসঙ্গে বস্তিতে ফিরত। মার
যেদিন কাজ থাকত না সেদিন ওর বাবা ভ্যানে
তালা মেরে দুপুর নাগাদ বস্তিতে ফিরত। এরপর সবাই মেঝেয় চট পেতে খেতে বসত। খাওয়া শেষে ফুল মিয়া খানিক বিশ্রাম নিয়ে মুখ ভর্তি পান
চিবতে চিবতে কাজে ফিরে যেত। সেসব দিনগুলোতে তার মায়ের মুখে শেষ বিকেলের সোনা রোদের মত হাসি লেপ্টে থাকত। কি সুন্দর সুখের সংসার ছিল তাদের! বাবার জন্য খাবার নিয়ে
যাওয়া ছাড়া নসুর তেমন কোন কাজ ছিলনা। ছোট
ভাইয়ের সঙ্গে সারাদিন ডাঙ্গুলি
খেলে,ঘুড়ি উড়িয়ে তার দারুণ সময় কাটত। কোন কোনও দিন দু’ভাই
হাটতে হাটতে কালশি
রোড অব্দি চলে যেত। সেখানে পুরো
শরীরে রাস্তার ধুলো মেখে তবে তারা ঘরে ফিরত।
তবে ফুল মিয়া দু’ছেলেকে সে অবস্থায়
পেলে চলত জোর পিটুনি। তখন হয়ত মা এসে তাদের উদ্ধার করত। বাবাটা গুলি খেয়ে মরে
যাওয়ার পর হাসি–কান্না মাখা সে সুন্দর দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল!
সেবার মিরপুর স্টেডিয়ামে ক্রিকেট বিশ্বকাপ
খেলা উপলক্ষে প্রচুর নির্মাণ কাজ চলছিল। প্রায় শত কোটি টাকার কাজ সে শুনেছিল। টেন্ডারবাজির
ভাগ নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে বল্টু রাসেল আর আজগর বাহিনীর মধ্যে লেগে গেল ভীষণ
গণ্ডগোল। আজগর তার বিশাল দল নিয়ে রাজত্ব করত মূলত মাটিকাটা-কচুক্ষেত এলাকায়।
কিন্তু কাঁচা পয়সার লোভ তাকে টেনে আনে মিরপুর স্টেডিয়াম অবধি। একপর্যায়ে দু’দলে শুরু
হল প্রচন্ড গোলাগুলি,আর তার মাঝে পড়ে অকালে
প্রাণটা হারাল ফুল মিয়া। সেদিন সে স্টেডিয়াম এলাকায় চটপটি বিক্রি করতে গিয়েছিল।
সন্ত্রাসীদের ক্রস ফায়ারে পড়ে কপাল ফুটো
হয়ে গুলিটা বেরিয়ে যায়। পিছনে
রেখে যায় স্মৃতি। ভ্যান গাড়ীর প্যাডেলে বিচ্ছিন্ন
মগজের সঙ্গে ঠিকরে পড়ে নসুদের ভাগ্যের
চাকা। আজগর
নিজেই গুলিটা করেছিল। সেই গান ফাইটে বুকে আধা ডজন গুলি নিয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পরে
বল্টু রাসেল। সে তখন ল্যাংড়া মনিরের দলে শুটার হিসেবে কাজ করত। নসুর
সামনেই ইংলিশ সিনেমার এ্যাকশন দৃশ্যের মত সবকিছু ঘটে। টিফিন বাটি হাতে সে তখন দাঁড়িয়েছিল রাস্তার আরেক পাশে। নসু তখনই প্রতিজ্ঞা
করে বড় হয়ে একদিন বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিবে। আজন্মের লালিত প্রতিশোধ স্পৃহা
তাকে টেনে নেয় ল্যাংড়া মনিরের দলে। প্রথমে দলের ইনফরমার হিসেবে কাজ করত। এরপর এটা সেটা ফুট ফরমায়েশ খাটতে খাটতে সে একসময় ঘোড়া চালানোর
কায়দাও রপ্ত করে ফেলে। হাতের
কুশলতার জন্য সে অল্প সময়েই বেশ খ্যাতি অর্জন করে ফেলে। নসু মিয়া হাসতে হাসতেই
করোটিতে গুলি কিংবা নির্দয় ভাবে পেটে ছুড়ি চালাতে জানত। ততোদিনে
সে এও জেনে গেছে কোথায় গুলি করলে মানুষ রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে মরে যায় কিংবা কোথায় গুলি
করলে কেউ বুঝে ওঠার আগেই ঢলে পড়ে। একজন দক্ষ সার্জনের মত সে শিখেছিল মানব শরীরের এনাটমি। আর সে
ছুড়ি চালাত সেভাবেই দক্ষ
নিপুণ হাতে। আজগরের সঙ্গে তার পুরানো হিসাবটাও চুকিয়ে ছিল সে বেশ নিষ্ঠুর ভাবে।
তখনও মিরপুর-ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সংযোগ
সড়কটা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। সেসব দিনে ভুমিদস্যুদের দানবাকৃতির ট্রাকগুলো সারা রাত
ধরে জলাশয়ে বালি ফেলে জমি ভরাটের কাজ করত। এমনি এক কৃষ্ণপক্ষ
রাতে আজগরকে তার বাসা থেকে সংগোপনে তুলে আনে নসু। এরপর দলের একজন মাছের
ঘেরের কাছে ভাঁটফুলের জঙ্গলে আজগরকে
মাটিতে চেপে ধরে
আর আরেকজন তার মুখে বালি ভরে দেয়। একসময় ভেজা বালিতে আজগরের মুখ ভরে যায়। নিঃশ্বাস
নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় হাত-পা ছুঁড়তে চায়।
কিন্তু পারেনা। এরপর
নসুর ধারাল ছুড়ির ফলা আজগরের বুকে মাঝ বরাবর চলে যায় দক্ষ সার্জনের মত। আট
ইঞ্চি দৈর্ঘের ছুড়ির আঘাতে রক্ত গড়িয়ে পড়ে অজস্র ধারায়। একটা বালির ট্রাক থেকে
ব্যাটারি খুলে এনে এসিড ঢেলে দেয় হা মেলে থাকা বুকের খোলা পিঞ্জরে। পরদিন দুপুরে খোঁজ পাওয়ার আগে পর্যন্ত মৃতদেহ সেভাবেই
জঙ্গলে পড়ে থাকে।
লালচে পিঁপড়ের দল অবশ্য আগেই খোঁজ পেয়ে যায়। সারা শরীরে,চোখের কোটর-নাকের ফুটো ধরে
দাপিয়ে বেড়ায় তারা। পুডিঙের মত জমে থাকা রক্ত মাড়িয়ে চলে। কিসের অপেক্ষায় একটা
কুকুর আর কিছু কাক এসে ভেড়ে সেখানে।
বিকাল নাগাদ কিভাবে যেন আজগর বাহিনীর লোকেরা
জেনে যায় এটা পিচ্চি নসুর কাজ। চোখে মুখে প্রচন্ড জিঘাংসা নিয়ে তাকে ধরতে বাহিনীর
প্রায় সবাই বেরিয়ে পড়ে কিন্তু ততোক্ষণে নসু পগার পার। সে হাওয়ার মত কোথায় যেন মিলিয়ে
যায়! কেউ তার খোঁজ দিতে পারেনা। মিরপুরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সেই থেকে তার নাম বদলে হয়ে গেল
পাংখা নসু। মিরপুর থানায় পুলিশের ফাইলে রেকর্ড হয় নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাংখা
নসু,পিতাঃ মৃত ফুল মিয়া,গ্রামঃ রূপনগর বস্তি। স্থানীয় র্যাব ব্যাটালিয়নে তার
সম্পর্কে সব তথ্য আপডেট করে নতুন করে প্রোফাইল বানানো হয়। আজগরের মৃত্যুতে দলের নেতৃত্ব চলে আসে শুটার বাবুর হাতে।
নসু অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে আসে প্রায় বছরখানেক পর। ল্যাংড়া
মনিরের চেষ্টায় শুটার বাবুর সঙ্গে বিরোধ মিটে যাওয়ার পরে। অবশ্য বিরোধ না মিটিয়ে
উপায় ছিলনা তাদের। জেল থেকে কালাবাবুর প্রেশার ছিল। কালাবাবু মানিকগঞ্জে জেলে বসেই মানিকগঞ্জ থেকে শুরু করে সাভার-মিরপুর পর্যন্ত আন্ডারওয়ার্ল্ডের
সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সে ভীষণ ধুর্ত আর তার আছে গ্রীক পুরাণের হাইড্রার মত অসংখ্য
মুখ-চোখ, তাই দিয়ে সে দারুণ দক্ষতায় তার এলাকা নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। অবশ্য
কালাবাবুর চেহারা যতটা না কাল তার মনটা তারচেয়েও বেশী কাল। আর সে কথা বলে অত্যন্ত
মিহিসুরে যেটা আসলে তার দশাসই চেহারার সঙ্গে একদম যায়না।
কালাবাবু মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে থাকায় তার পক্ষে
তার সব ধরনের টাকা পয়সার হিসাব নিয়ন্ত্রণ করে তার স্ত্রী সোনিয়া। একসময়ের বিখ্যাত র্যাম্প মডেল। বয়স ২৭ কি ২৮ হবে। সন্তান হয়নি কিংবা ইচ্ছা করেই হয়ত
নেয়নি। দারুণ
ফিগার তার। পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার দীর্ঘ শরীরে ফর্সা সুন্দর ত্বক। তার চোরা
দৃষ্টিতে আরেকটা ট্রয় নগরী ধ্বংস হতে পারে। সে একটা টিভি চ্যানেলের ট্যালেন্ট
হান্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে একসময় খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছিল। সে খুলনার বি.এল কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়ত কিন্তু তার মন সবসময় পরে থাকত অন্য কিছুতে। পড়াশুনা
ভাল লাগত না। তার নিত্য নতুন ফ্যাশনের পোশাক আর সাজগোজ নিয়ে মেতে থাকতে ভাল লাগত। কলেজে
শিবির আর ইউনিয়নের মধ্যে আদর্শগত কারণে যতটা না মারামারি হত তাকে নিয়ে ছেলেদের
মধ্যে মারামারিটা হত তার চেয়েও বেশী। সে যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড আর তাতে ঝাপ
দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকত দিওয়ানা ছেলের দল। তাকে ঘিরে এসব ধ্বংসযজ্ঞ সে উপভোগ করত
বেশ। অবশ্য সৌন্দর্য আর মেধার উপযুক্ত সমন্বয় না থাকায় ট্যালেন্ট হান্ট
প্রতিযোগিতায় সে সুবিধা করতে না পারলেও তাদের দলের গ্রুমিং এর দায়িত্বে থাকা কানিজ
ফাতেমার দৃষ্টিতে পড়ে যায়। সে
প্রায়ই দেশের নামকরা সব ফ্যাশন হাউজগুলোর কালেকশন নিয়ে ফ্যাশন শো এ্যারেঞ্জ করে
থাকে। পরে
কোন একসময় যোগাযোগ করার জন্য সোনিয়া তার বিজনেস কার্ডটা সংগ্রহ করে রাখে।
এরপরের কয়েকটা বছর সোনিয়া দাপিয়ে বেরিয়েছে ঢাকার
সব বড় বড় ফ্যাশন শো’র আলো ঝলমলে রানওয়ে। দীর্ঘ
সুডৌল পায়ের কারণে তার ক্যাট ওয়াক ছিল অন্য আর সবার চেয়ে আলাদা এবং সত্যিই অসাধারণ।
হয়ত এজন্যই অল্প সময়ে তার র্যাম্প মডেল
হিসাবে বিশাল খ্যাতি, অর্থ আর প্রাচুর্য চলে আসে। গ্ল্যামার ম্যাগাজিনের রঙিন পাতাগুলোতে তাকে নিয়ে নিয়মিত
কাভারস্টোরি করা ছাড়াও সেন্টারফোল্ড বা সেন্টার স্প্রেডে তার ছবি নিয়মিত ছাপা হতে থাকে। একসময় অন্য অনেক তলিয়ে
যাওয়া মডেলদের মত সেও নিয়মিতভাবে ইয়াবা, কোকেন এবং মারিজুয়ানা সেবনে অভ্যস্ত হয়ে
পড়ে। এছাড়া
তাকে কানিজ ফাতেমার নির্দেশ অনুযায়ী সফেস্টিকেটেড ক্লায়েন্টদের চাহিদা মেটাতেও বিভিন্ন জায়গায়
যেতে হয়। বাড়তি অর্থের লোভে সে এসবে ভালভাবেই জড়িয়ে পড়ে। এসব
করতে যেয়ে সমাজের অভিজাত শ্রেণী,ব্যবসায়ী এবং প্রশাসনের উচ্চমহলে বিভিন্ন জনের
সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। তার এসব ঘটনা বিভিন্নজন হয়ে এক সময় বাড়ীতে বাবা-মায়ের কান
অব্দি পৌঁছায়। তারা তাকে এ জগত
থেকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। মডেলিঙের জগতটা আসলে এক ধরনের
নেশার মত। সহজে কাউকে এ থেকে ছাড়ানো এক কথায় অসম্ভব। সোনিয়ার বাবা-মা অনেক
তিক্ততার শেষে মেয়ের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এসময়ই এক ফ্যাশন হাউজের মালিক ও চিত্র
নির্মাতার সঙ্গে তার গাঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের প্রায়ই গুলশানের নামী রেস্টুরেন্টগুলোতে
একসঙ্গে দেখা যেতে থাকে। ভালই যাচ্ছিল ফুরফুরে প্রজাপতি দিনগুলো।
কিন্তু একদিনের এক দুর্ঘটনা তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় র্যাম্প মডেলিঙের রঙিন জগত থেকে।
সেটা ছিল ঢাকার এক অভিজাত হোটেলে দেশের
নামকরা সব ফ্যাশন ডিজাইনারদের ডিজাইনে করা ব্রাইডাল ফ্যাশন শো। হালকা সুরের
মূর্ছনা আর হাজারো দর্শকের চোখ এবং ক্যামেরার উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ লাইটের আলো ঝলকানিতে
সে রানওয়ে ধরে ক্যাট ওয়াক করছিল। সেখানে ধবধবে সাদা স্পট লাইট তাকে অনুসরণ করে। র্যাম্পে
বিভিন্ন ইভেন্টের ফাঁকে সে ব্যাক স্টেজে বসে একটার পর একটা মারিজুয়ানা স্টিক খেতে
থাকে। কানিজ ফাতেমা নিষেধ করলেও তার নির্দেশ সে গায়ে মাখেনা।
সোনিয়ার দাবী এতে তার ক্যাট ওয়াক ভাল হয়। রানওয়েতে ভাল কনসেন্ট্রেশন থাকে। তার শরীরী ভাষায় একধরনের
অহংকার ফুটে ওঠে। কানিজ
চোয়াল শক্ত করে চেয়ে থাকে শুধু, মুখে কিছু বলে না। তবে সোনিয়ার
দাবী অনুযায়ী তার ক্যাট ওয়াক আসলেই সেদিন ভাল হচ্ছিল। সে প্রতিবারই দীর্ঘ
রানওয়ে ধরে গর্বিত রাজহংসীর মত সাঁতরে
যায়। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে শেষ ইভেন্টে। সেটা ছিল ডিজাইনার মাসুদ আলমাসের ডিজাইনে বানান
ধবধবে সাদা ওয়েডিং গাউন। গ্রেট ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া বিয়েতে এ ধরনের পোশাক
চালু করেন। স্পট লাইটের উজ্জ্বল আলোয় ধবধবে সাদা লিলি ফুলে ভর্তি
ব্রাইডাল বাকেট হাতে সোনিয়াকে দেখতে রানি ভিক্টোরিয়ার চেয়ে কোন অংশে কম লাগছিল
না। সে রানওয়ের মাথায় গর্বিত গ্রীবা
উচিয়ে একটা স্মোকি লুক দিয়ে যখন ইউ টার্ন করছে,ঠিক
তখনই এক অর্বাচীন ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটে তার চোখ ধাধিয়ে যায়। রক্তে মারিজুয়ানার
প্রভাব কিংবা ক্যামেরার ফ্ল্যাশে সে শরীরের ভারসাম্য হারালে গাউনের দীর্ঘ লেস
পেন্সিল হিলে চাপা পড়ে। এরফলে সোনিয়া হোঁচট খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলে তার ডান পায়ের
এ্যাংকেল মচকে যায়। ব্যাথায় নীল হয়ে যায় সে। অগত্যা পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে তাকে অনেকদিন
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে সে জানতে পারে যে সে আর
কানিজ ফাতেমার গ্রুপে নেই, তার জায়গায় অন্য একজন কাজ করছে। কানিজ ফাতেমা বীনে কলার
খোসা ছুড়ে ফেলার মত করে তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সোনিয়া সেদিনই প্রতিজ্ঞা করে এ জীবনে কোনদিন সুযোগ পেলে সে এর
চরম প্রতিশোধ নেবে। অনেক জায়গায় চেষ্টা করলেও তার ড্রাগ এডিকশনের খবর ততোদিনে সব
জায়গায় চাউর হয়ে যাওয়ায় সবাই রিস্ক নিতে ভয় পায়। অসহ্য দিনগুলোতে যাকে সবচেয়ে বেশী
পাশে প্রয়োজন ছিল সেই চিত্রনির্মাতা তখন লাপাত্তা। এদিকে
হাতে জমানো টাকার অনেকটা হাসপাতালের
খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েক মাসের বাড়ী ভাড়া বাকী পড়ে। ভেবে পায়না সে কি করবে। বাবা-মা
সম্পর্ক ছিন্ন করায় সেখানে ফিরে যেয়ে সে তাদের এ মুখ দেখাতে চায়না। অর্থের
প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে সে অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। তলিয়ে যেতে থাকে অতলের গভীরে।
দিনটা ছিল ঘন বর্ষার এক রাত। কালাবাবু
ক’দিন আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ায় তার সঙ্গীরা গুলশানের এক
গেস্ট হাউসে পার্টি দিয়েছে। ঘরের আলো
আঁধারিতে সাউন্ড সিস্টেমে লাউড মিউজিক বাজছে। ঘরের কোনে
কয়েকজন ডান্সার বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচছে সে মিউজিকের তালে তালে। গেস্টরা কেউ বসে
কেউবা দাড়িয়ে। তাদের হাতে মদের পেয়ালা কিংবা বিয়ারের ক্যান। ক্যান উপচে ফ্যানা পড়ছে কারো কারও হাতে। পরিচিত
এক ব্যক্তির মাধ্যমে সোনিয়া সেখানে নাচতে গিয়েছিল। এখন
এসব করেই তাকে পেট চালাতে হয়। এক রাউন্ড নাচের শেষে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখের ঘাম
মুছতে মুছতে সে তার জীবনের এই করুণ পরিণতির কথা ভাবছিল। নিয়তি
তাকে কোথা থেকে কোথায় টেনে নামিয়েছে! তার বুক চিরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। কালাবাবুর
ধুর্ত দৃষ্টিতে সেটা এড়ায়না। সে একসময়ের মডেল সম্রাজ্ঞী সোনিয়াকে দেখে ঠিকই চিনতে পারে।
কিন্তু একি হাল হয়েছে তার! কথা বলার জন্য সোনিয়াকে ইশারায় পাশের রুমে ডাকে। স্পীকারের লাউড মিউজিক এড়াতে দরজাটা
ভেজিয়ে সে বিছানায় বসতেই সোনিয়া যান্ত্রিক ভাবে শরীরের কাপড় খুলতে শুরু করে। কালাবাবু তাকে
ধমক দিয়ে পোশাক পড়ে নিতে বলে তার দুরবস্থার কারণ জানতে চায়। সোনিয়া
প্রথমে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়নি। সে ভাবে তার অসহায় পরিণতির কথা সবাইকে বলে
কি লাভ! হয়ত তার জীবনের গল্প শুনে কারো মনে একটু করুণার উদ্রেক হবে কিন্তু শেষেতো
ঐ শরীরই বেচতে হবে! তাই এসব বলে সময় নষ্ট না করে বরং ঝটপট কাজ সেরে বাসায় ফিরতে
পারলে তার জন্য ভাল হয়। আবার সে এও ভাবে তার বর্তমান দুর্দশার জন্য সবচেয়ে বেশী যে
দায়ী অর্থাৎ কানিজ ফাতেমার ওপরে প্রতিশোধ নিতে হলে এনাকেই তার প্রয়োজন। সে শুনেছে
কালাবাবুর প্রতিপত্তি আর দুর্ধর্ষ জীবনের কথা। পত্রিকায় একসময় এসব পড়েছিল। আজ নিয়তি
তাকে টেনে নিয়ে এসেছে এখানে। অনেক ভেবে শেষে সোনিয়া কালাবাবুর কাছে মেলে ধরে তার নিজের জীবনের করুণ ইতিহাস।
বাবা-মা,স্কুল-কলেজ জীবন,ঢাকায় আসা,র্যাম্প মডেলিংএ ক্যারিয়ার গড়া কিছুই বাদ
যায়না। কিভাবে ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় এসে কানিজ ফাতেমার নজরে পড়ে এবং এরপর
তার গ্রুপে ঢুকে ফ্যাশন শো’র রানওয়েতে বিচরণ। তার প্রয়োজনে সমাজের বিভিন্ন জনের
কাছে শরীর বিলানো। রাজী না হলে ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি ছেড়ে দেয়ার হুমকি। কানিজ
কিভাবে তাদের মাদকে অভ্যস্ত করে শেষে তাদেরকে স্লেভে পরিণত করে,অনর্গলভাবে সবকিছু বলে
যায় সোনিয়া। কালাবাবু চুপচাপ তার সব কথা শোনে।
অপরের কস্ট এর আগে এভাবে কখনও তাকে স্পর্শ করেনি। সে সোনিয়ার প্রতি মানসিকভাবে
দুর্বল হয়ে পড়ে। তাকে
মাদকাসক্তি থেকে উদ্ধার করতে বনানীর এক রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করে দেয়। কয়েকমাস
পরে সোনিয়া যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে আসে তখন সে যেন অন্য এক নারী! কালাবাবু
তাকে বিয়ে করে ঘরে তোলে। সোনিয়া বিয়ের ব্যাপারে শুরুতে দ্বিধায় থাকলেও কালাবাবুর
প্রতি তার কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই বিয়েতে অমত করেনা। এই জীবন নিয়ে সে এখন সুখি।
সোনিয়ার
বিয়ের কয়েক মাস পরে পুলিশ কানিজ ফাতেমাকে মৃত অবস্থায় তার স্টাডি রুম থেকে উদ্ধার
করে। সে তখন উলঙ্গ দেহে সিলিঙ্গ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল। পোস্ট
মরটেম রিপোর্ট থেকে পুলিশ জানতে পারে যে তার মৃত্যু আসলে রশিতে ঝুলে হয়নি। তাকে
সম্ভবত রেপের পরে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছিল। তবে এই লোমহর্ষক কাজটা কে করেছে কেউ বলতে পারেনি। পুলিশ
কাউকে গ্রেফতারও করতে পারেনি। খবরের কাগজে কানিজ ফাতেমার মৃত্যু সংবাদ বেশ বড় করে ছাপা
হয়। সোনিয়া নির্বিকার ভাবে সেদিনের পেপারটা উল্টিয়ে দেখে। সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে
ওঠে তার মুখে। সোনিয়া
সে রাতে কালাবাবুকে তার প্রিয় রেস্টুরেন্টে ডিনারে নিয়ে যায়। এখনও সে হত্যা মামলার
রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। গুলশান
থানায় পুলিশ রেকর্ডে সেটা
পেন্ডিং কেস হিসেবে পড়ে আছে আজো।
হত্যাকান্ড যারা ঘটিয়েছিল তারা আসলে বেশ
প্রফেশনাল। এমনকি ডিবির ক্রাইম সিন
ইনভেস্টিগেশনেও কিছুই পাওয়া যায়নি। প্লেস অফ অকারেন্সে দুর্বৃত্তরা মামলার কোন আলামত রেখে যায়নি।
আন্ডার ওয়ার্ল্ডে বিভিন্ন দলের মধ্যে
বিরোধ বা মারামারি লাগলে চাঁদাবাজিতে ভাটা পরে। তাই নিজেদের প্রয়োজনেই সমুদ্রের
বুদ্বুদের মত কোন ঝামেলার উৎপত্তি হলে তা’ মিটে যেতে কখনো সময় লাগেনা। কখনো খুব
বেশী রকমের ঝামেলা হলে হয়ত দু’চারজন পোস্টার হয়ে পড়ে থাকে শহরের বিভিন্ন জায়গায়,অলিতে
গলিতে। তাদের সমস্যাগুলো আসলে এভাবেই আপনা আপনি মিটে যায়। মৃত ব্যক্তিকে
কেউ মনেও রাখেনা,এক সময় সবাই ভুলে
যায়। পুলিশের কাছে এসব ঘটনা অবশ্য গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে তাই তারা এসবে মাথা না
ঘামিয়ে অন্য প্রয়োজনীয় কাজ করে। থানার লিস্টে থাকা কেউ যদি এভাবে পরিস্কার হয় তাতে
তারা বরং খুশীই হয়। পাঙ্খা
নসুর সঙ্গে ব্যাঙ্গা বাবু,হোয়াইট মামুনসহ আরও কয়েকজন কাজ করে। নসুর হাতের কাজ ভাল। যেখানে এইম করে সেখানেই গুলি লাগে। তার গুলি সাধারণত
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না। হাতও চলে দ্রুত। তাই দলে তার প্রচুর কদর আর লীডারও তাকে
খুব পছন্দ করে। একদম
কাছের লোক, বলতে গেলে সেই লীডারের ডান হাত।
কয়েক বছর আগে লীডার গাজীপুরের এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অপারেশন শেষে ঢাকায়
ফেরার পথে টঙ্গী ব্রিজের কাছে পুলিশের এনকাউন্টারে পড়ে। সে
যদিও গাড়ির জানালার গ্লাস ভেঙ্গে বের হয়ে রাস্তার এক আরোহীর মটর সাইকেলে কেড়ে
ঘটনাস্থল থেকে পালাতে সক্ষম হয়। কিন্তু শেষ মুহুর্তে পুলিশের অস্ত্র থেকে একটা
গুলি এসে তার ডানপায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ হয়। সে অবস্থাতেই সাভার এলাকায় এক ক্লিনিকে
যেয়ে গুলিটা বের করতে পারলেও ক্র্যাচ হয়ে যায় তার সারাজীবনের সঙ্গী। সেই থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে
লীডারের নাম হয়ে যায় ল্যাংড়া মনির।
মিরপুর-পল্লবী এলাকার গার্মেন্টসগুলোর
ঝুটমালের ব্যবসা নিয়ে প্রতিনিয়ত চলে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। সন্ত্রাসী দলগুলো
তাদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে থাকে। কখনও একদল আরেক দলের এলাকায় ঢুকে চাঁদাবাজি করলে কিংবা আরেক
দলের এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেস্টা করলে শুরু হয় গোলাগুলি-বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ। পুলিশ ঝঞ্ঝাট
থামাতে কখনো এগিয়ে আসে আবার কখনও ইচ্ছে করেই চুপ থাকে যেন তারা নিজেরাই খুনোখুনি
করে শেষ হয়ে যায়। তা অবশ্য কখনো হয়না। কেউ গান ফাইটে মারা গেলে কিংবা র্যাব-পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সাথে সাথেই সে শুন্য স্থান পূরণ
হয়ে যায়। ঝাঁঝালো
বারুদের ঘ্রান আর রক্তের উত্তাপ মাখা এ এক
অদ্ভুত জগত যেখানে কাচাপয়সা আর বর্ণীল জীবন যাপনের জন্য
সবকিছুর ছড়াছড়ি। তাই লোকের অভাব হয়না। তবে কেউ
একবার এজগতে ঢুকে পড়লে তার পরিণতি
জেলের সদর দরজা কিংবা বন্দুকের নলে। ঝুটমালের
ব্যবসায়ীরা কন্ট্রাক্ট পেলে এলাকার সন্ত্রাসীদের চাঁদাটা দিয়েই তবে গার্মেন্টসের
গোডাউন থেকে পণ্য খালাস করে। বিনিময়ে মাল পরিবহণে নিরাপত্তা পাওয়া যায়,তা’নাহলে লুটপাট
হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারটাতো আছেই। অনেকসময়
সন্ত্রাসীরা নিজেরাই ঝুটমালের দখল নিয়ে তা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। আসলে ঝুটমালের
চেয়ে ঝুটের বড় বড় গাইটের আড়ালে পাচার হওয়া স্টক লট আর চোরাই থান কাপড়ের জন্যই এত
খুনোখুনি-রক্তারক্তি। ওসবের পরিমাণের ওপর লাভের অংকটা ওঠানামা করে। এ এক বিশাল
চক্র আর এর সঙ্গে থানার ইনফর্মার থেকে শুরু করে গার্মেন্টসের দারোয়ান-ওয়্যারহাউজ
কিপার-ফ্লোর ম্যানেজার এবং এলাকার মাস্তান-টাউট-বাটপাররাও জড়িত থাকে। সাধারণত গার্মেন্টস বা ফ্যাক্টরির ভিতরের লোকজনই দু’চার
পয়সার বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। যারা একাজে সন্ত্রাসীদের সহায়তা
করে তারা টিকে থাকে,আর সহায়তা না করলে রাস্তায় বেঘোরে প্রাণ দিতে হয়।
স্বামীর
অকাল মৃত্যুর পরে নসুর মা জুলেখা বেওয়া তার অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রামের বাড়ী
নাভারন, যশোরে ফিরে যান। ফলে রূপনগর বস্তির
ঝুপরি ঘরে নসুকে একাই থাকতে হয়। সে
রাজমিস্ত্রী ডেকে ঘরের ভিতরটা আর বাথরুম ঠিক করে নেয়। নিজের প্রয়োজনে টিভি-ফ্রিজ সবই
কেনে। কিন্তু ঘর
জুরে বাবা-মা, ভাই-বোনদের অসংখ্য স্মৃতি তাড়িয়ে
ফেরে তাকে। সে মাদকের নেশায় চুর হয়ে কষ্টগুলো ভুলতে চেস্টা করে। মাকে সংসার চালাতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হয়। সেই টাকায়
গ্রামে ভাইবোনদের খাওয়া-দাওয়া-লেখা-পড়া চলছে। পাঙ্খা নসুর এই নিঃসঙ্গ
জীবনে বসন্ত বাতাসের মত এসে দোলা দেয় হেনা। গার্মেন্টসে চাকুরীর সূত্রে সে
স্টিমারে উঠে বরিশালের হিজলা থেকে ঢাকায় এসেছে। তার
মত আরও কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে সে এক নাম্বারে ভাড়া বাসায় থাকে। নসু একবার এক গার্মেন্টসের
ঝুটের চালান সাফাই করতে গেলে হেনার সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই পরিচয়
থেকে একটু আধটু ভাললাগা এবং তারপর ভালবাসা। এরপর তারা এক সঙ্গে স্বপ্নের জাল বুনে অনেকটা
সময় পারি দেয়। নসু বিয়ের জন্য চাপ দিলেও হেনা নসুর এই অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে
গাঁটছড়া বাঁধতে ভয় পায়। তার পক্ষে নসুকে ছেড়ে দেয়া বা তাকে ভুলে যাওয়াও হয়ত সম্ভব
না। কিংবা সে হয়ত নসুকে ভয় পায় তাই এক
কথায় সম্পর্কের ইতি টানতে পারেনা। সে জানে
নসুর সঙ্গে তার সম্পর্কের কারনে ফ্লোর ম্যানেজার তাকে ভয় পায়। তাকে অশ্লীল কিছু বলতে বা অন্য অনেক মেয়েদের মত তাকেও কাপড়ের গাইটের আড়ালে কিংবা স্টোর
রুমের কোনায় নিয়ে যৌন হয়রানি করতে সাহস পায়না। ফ্লোরের মেয়েদের এসব নিপীড়ন নীরবে
সহ্য করতে হয়,তা’নাহলে ফ্লোর ম্যানেজার যে কোন অজুহাতে চাকুরী থেকে ছাটাই করতে
মালিকের কাছে রিপোর্ট করবে। তাদের ফ্লোর ম্যানেজার জয়নাল ভীষণ বদমেজাজি আর ক্ষমতা সে
বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে থাকে। হেনার মাঝে মাঝে তাকে স্যান্ডেল পেটা করতে ভীষণ
ইচ্ছে করে। হেনা ঠিক করে একদিন নসুকে দিয়ে ওর বেপরোয়া হাতটা ভাঙবে। গেটের
দারোয়ানগুলোও লুচ্চামিতে কম যায়না। তবে তার কখনও দেরী হলে দারোয়ান সামসু মিয়া মুখের
ওপরে দরজা চাপানোর সাহস পায়না। অন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে এরকম হলে হয়ত দু’চার টাকা
ঘুষ দিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে দারোয়ানকে ম্যানেজ করে তবে কারখানার ভিতরে ঢুকতে হয়।
এছাড়া নসুর দলের ছেলেরাও তাকে খুব সম্মান করে। তাকে দেখলে উঠে দাড়ায়, ভাবী বলে ডাকে। কখনো হয়ত রিক্সা
ডেকে জোর করে উঠিয়ে দেয় বা দোকান থেকে কোক/স্প্রাইট এনে খেতে দেয়। সে
জানে নসুর আশ্রয়ে সে নিরাপদ। যদি নসু তার পাশে থাকে তাহলে এই হায়েনা শহরে কেউ তার
দিকে ভুলেও তাকাতে সাহস পাবেনা। হেনার এরকম দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায় নসু বিরক্ত হয়। এরপর
এক শনিবারের রাতে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে হেনাকে জোরপূর্বক তার বস্তির ঘরে এনে
তোলে। হেনা বাঁধা দিতে চাইলেও একসময় তার এই জীবন মেনে নিতে হয়। তাকে
নসুর সঙ্গে লিভ টুগেদার করতে হয়। তবে সে প্ল্যান আঁটে হাতে কিছু টাকা পয়সা জমলে এই
রাহুগ্রাস থেকে পালিয়ে যাবে। নসুর অবশ্য ইচ্ছা হাতে প্রচুর টাকা জমলে গ্রামে মার
কাছে ফিরে যাবে। হেনাকে বিয়ে করে সংসার করবে। সন্তান-সন্ততিতে ভরে উঠবে তার সাজানো
সংসার। প্রায়ই সে তার স্বপ্নের কথা হেনাকে শোনায়। হেনা
সেসব শোনে কিন্তু তার মনে কি ভাবনা তা শুধু সেই জানে। নসু হেনাকে তার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করলে সে নিরুত্তর
থাকে কিংবা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। নসু আসলে
হেনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। হেনা আপত্তি করলেও নসু গার্মেন্টসের চাকুরী থেকে তাকে ছাড়িয়ে
আনে। হেনা
তখন থেকে বস্তির চার দেয়ালে বন্দী হয়ে যায়। কিন্তু যে পাখি উড়তে শিখেছে তাকে কি
খাঁচায় বন্দী রাখা যায়!
হাতে লিস্টি না থাকলে আগে ঘরেই বেশী সময় কাটাত
নসু কিন্তু এখন হয়েছে তার ঠিক উল্টোটা। বাইরেই
বেশীর ভাগ সময় কাটছে তার। ইদানীং কখনও গভীর রাতে আবার কখনোবা সেই কাক ডাকা
ভোরে ঘরে ফিরছে। আবার কখনও হয়ত ঘরে ফিরছে তিন-চার
দিন পর। জিজ্ঞেস করলেও ঠিক মত উত্তর পাওয়া যায়না। হেনা ভাবে এখন
হয়ত তার কাজের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সে শ্রাগ করে ভাবে যার জীবন সেই ভাল বুঝবে। ল্যাংড়া মনিরের দলে নসু এখন সেকেন্ড ম্যান। প্রায়ই ভাবে
লীডারকে পাতালে বা হাসপাতালে পাঠিয়ে সেই দলের দখল নিবে কিন্তু কালাবাবুর ভয়ে সাহস
পায়না। দলের কিছু ছেলে অবশ্য তার এই প্ল্যানে রাজী, ইশারা ইঙ্গিতে তা বোঝা যায়।
কিন্তু কালাবাবু কিভাবে যেন টের পেয়ে যায়। ব্যাটা মহা ধুরন্ধর! একদিন জেল গেটে
ডেকে নসু যেন ভুলেও কখনও মনিরকে সরানোর
চিন্তা না করে এই বলে সাবধান করে দেয়। এমনকি কালাবাবু তার দলের ছেলেদের সামনেই তাকে অপমান করে
বসে। আসলে কালাবাবুর নসুকে এই অপমান করাটাই কাল হয়ে দাড়ায়। স্বভাবে হিংস্র আর একরোখা নসু এই অপমানের জ্বালাটা
কোনভাবেই ভুলতে পারেনা। তার অতীত ইতিহাস অন্তত তাই বলে। প্রতিশোধস্পৃহা নসুকে এমনভাবে
আচ্ছন্ন করে যে তার অন্যান্য কাজগুলোও ঠিকভাবে করে ওঠাই দায় হয়ে যায়। তার স্বভাবে
কিছু পরিবর্তন দেখে লীডার তাকে কিছু হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলেও নসু উত্তর না দিয়ে
চুপচাপ থাকে। লীডার তাকে কিছুদিন ঢাকার বাইরে কাটিয়ে আসার পরামর্শ দেয়। এতে তার
মানসিক চাপ লাঘব হবে বলে জানায় কিন্তু নসু তাতে রাজী হয়না। সে আপনমনে ভাবে ল্যাংড়া
মনিরের বদলে কালাবাবুকেই সরিয়ে দিলে কেমন হয়! রিস্ক নিতে হলে বড় ধরনের রিস্ক নেয়াই
উচিৎ। প্ল্যান কাজ না করলে মৃত্যুর প্রবল সম্ভাবনা দু’টোতেই আছে কিন্তু কালাবাবুকে
সরাতে পারলে লাভের অংকটা বিশাল। সারাক্ষণ এই এক চিন্তা সিন্দাবাদের ভূতের মত তার মাথায়
চেপে বসে থাকলেও প্ল্যানটাকে কিভাবে কার্যকর করবে সে ভেবে পায়না। এরকম এক উথাল
পাতাল সময়ে একটা অভাবিত ঘটনা ঘটে তার ব্যক্তিগত জীবনে। যার কারণে তাকে ওপারে পালিয়ে
যেতে হয়।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন সম্ভবত
নভেম্বর। শীতের এক মাঝরাতে নসু ঘরে ফিরে ব্যাঙ্গা বাবুকে তার
বিছানায় পায়। তাদের গায়ের কম্বল সরে গেছে। মেঝেতে লুটাচ্ছে হেনার পরনের শাড়ি। হেনা
অর্ধনগ্ন অবস্থায় ব্যাঙ্গা বাবুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। হালকা
নিঃশ্বাসে কামারের হাপরের মত তাদের বুক ওঠানামা করছে। ইদানীং কেন জানেনা নসুর শুধু মনেহত সে অপারেশনে বাইরে
থাকলে হেনা পালিয়ে যেতে পারে। কারণেই একদিন গার্মেন্টসের চাকুরি থেকে হেনাকে সে
ছাড়িয়ে এনেছিল। কথা প্রসঙ্গে ব্যাঙ্গা বাবুকে বলেছিল হেনার দিকে একটু
নজর রাখতে। বিশেষ
করে সে যখন দু’তিনদিনের জন্য অপারেশনে
বাইরে থাকে সে সময়টাতে। হাতে
চোট পাওয়ায় আজকাল কোন অপারেশনে গেলে ব্যাঙ্গা বাবুকে নেয়া হতনা। কিন্তু তার
দীর্ঘদিনের সঙ্গী যে তার সঙ্গে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে ঘুণাক্ষরেও তা’ তার
মাথায় আসেনি। সে কি করবে ভেবে পায়না। রাগে ক্ষোভে নসু হঠাৎ অস্বাভাবিক জোরে চীৎকার দিয়ে ওঠে। পিস্তলের সন্ধানে পকেটে হাত বাড়ায় কিন্তু ব্যাঙ্গা বাবুর ভাগ্য ভাল যে
নসুর সঙ্গে গুলি নেই। বিকালের অপারেশনে ফুরিয়ে গেছে,এরপরে আর রিলোড করতে খেয়াল ছিলনা। তার জান্তব
চীৎকারে দু’জনের
ঘুম ভেঙ্গে যায়। নসুর বিভ্রান্তির সুযোগে ব্যাঙ্গা বাবু জিন্সের ভিতর দু’পা গ’লে দৌড়ে পালিয়ে যায়। হেনা
বিছানা থেকে নেমে ঘরের এক কোনে স্তব্ধ বিদ্যুৎ পোলের মত দাড়িয়ে থাকে। তার মাথায় এলোমেলো চুলের জটলা। সে বামহাত দিয়ে আলতো ভাবে কপাল-চোখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে
নেয়। ব্যাঙ্গা বাবুর সঙ্গে অবশ্য সে আজই প্রথম বিছানায় যায়নি। যেদিন থেকে নসু তাকে পাহারার কাজে লাগিয়েছে তার দুই
কিংবা তিন দিন পর থেকেই নসু
বাইরে গেলে তারা একান্তে মিলিত হত। হেনা অবশ্য এটা টাকার লোভে করেনি। তার প্ল্যান ছিল এভাবে
ব্যাঙ্গা বাবুর সঙ্গে ভাব জমিয়ে একদিন সুযোগ বুঝে পালিয়ে যাবে। হেনা ভয়ার্ত হরিণ
শাবকের দৃষ্টিতে দেখে নসু রান্না ঘর থেকে বটিটা এনে তার সামনে দাড়িয়েছে। সে কিছু একটা বলতে বা বোঝাতে চায় কিন্তু তার আগেই নসুর হাতের ধারালো বটি তার
ঘাড়ে নেমে আসে। হেনার না
বলা কথাগুলো আর বলা হয়না। তার বদলে কেমন একটা
ঘরঘর শব্দ বেরিয়ে আসে বিচ্ছিন্ন
কণ্ঠনালী থেকে। হেনার
না বলা কথাগুলো হয়ত
ইথারেই ভেসে যায়। নসু কেমন এক হিস্টিরিয়াগ্রস্থ যুবকের মত বটি দিয়ে একের পর এক
কোপ দিয়ে যায় হেনার পুরো শরীরে। ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়া রক্ত ভিজিয়ে দেয় নসুর জামা কাপড়।
সে এক সময় হাঁপিয়ে ওঠে। হাতে ধরে রাখা
বটিটা খাটের দিকে ছুড়ে দিয়ে অবসন্ন দেহে বসে পড়ে ঘরের মেঝেয়। খাটের কোনায় ধাক্কা
খেয়ে সিমেন্টের মেঝেয় লোহার বটিটা ঝনঝন শব্দে আছরে পড়ে। রক্তের প্রবল ধারা ভিজিয়ে
দেয় ঘরের মেঝে। হঠাৎ সংবিৎ ফেরে নসুর,চমকে ওঠে সে। সে এ কি কাজ করেছে! সে কিভাবে নিজ
হাতে নিজের প্রেমিকাকে খুন করেছে! নসু উদ্ভ্রান্তের মত ঘরের চারদিকে তাকায়। কি
করবে বুঝে উঠতে পারেনা। ধরহীন দেহটা জবাই করা প্রাণীর মত খিচুনি দিতে দিতে এক সময়
নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রক্তের অঝোর ধারায় ভাসছে সে। মুহূর্তেই নসুর ষষ্ঠইন্দ্রিয়
জেগে ওঠে। বালতির পর
বালতি পানি এনে মুছে ফেলে রক্তের সব ধারা।
তার পরনের কাপড়ে লেগে থাকা রক্তের
দাগও মুছতে চেষ্টা করে কিন্তু তাতে কোন কাজ না হওয়ায় সেগুলো খুলে ধুয়ে খাটের স্ট্যান্ডে শুকাতে দেয়। এরপর
হেনার শরীরের অবশিষ্ট কাপড় খুলে সেগুলো
বস্তায় ভরে ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়। কাল জিন্সটা পরে ঘরের বাইরে চারদিকে তাকিয়ে নসু
নিশ্চিত হতে চায় তাকে কেউ খেয়াল করছে কিনা। এদিকের ল্যাম্প পোস্টগুলোয় বাতি
জ্বলেনা অনেক দিন। অনেকগুলো বাতি ভাঙ্গা। বস্তির ছেলেরা গুলতি মেরে ভেঙ্গেছে হয়ত। নসু দূরে
খালের পার ঘেষে আবছা জঙ্গলের দিকে তাকায়।
কোদাল হাতে সেদিকে এগিয়ে যায়। গর্ত
খুড়ে বস্তাটা পুঁতে ফেলে
সেখানে। এরপর ঘরে ফিরে ধারালো চাকু হাতে নিখুতভাবে হেনার হাত-পাগুলো শরীর থেকে
আলাদা করে। পলিথিনে মুড়ে সেগুলো ডীপ ফ্রিজে ভরে রাখে। পাকস্থলীটা
সাবধানে পেটের খোলস থেকে আলাদা করে আরেকটা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে। এরপর
সেটাকেও লেকের পারে পুঁতে দিয়ে আসে। কাজ শেষে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে ভাল করে গোসল করে কিন্তু তার
সারা শরীরে তখনো কাঁচা মাংসের ঘ্রাণ লেপ্টে থাকে। লাইট জ্বেলে পুরো ঘর তন্ন তন্ন
করে খুজে দেখে এটা সেটা। হেনার টিনের বাক্সে অনেকগুলো টাকার বান্ডিল দেখতে পায়। পরে
কাজে লাগতে পারে ভেবে তার ট্র্যাভেল ব্যাগে ভরে রাখে। হেনাকে
দেয়া তার কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল সেখানে। সেগুলোও ব্যাগে নেয়। এসব
করতে করতেই প্রায় ভোর হয়ে আসে। এরপর নসু বিছানায় শুয়ে একটু ঘুমাতে চেষ্টা করে
কিন্তু হেনার বটির আঘাতে ক্ষত বিক্ষত শরীরের দৃশ্যটা চোখ থেকে সরতে চায়না যেন।
দৃশ্যটা বারবার ফিরে আসে দুঃখ জাগানিয়া মাছির মত। নসু রাতের
বাকী সময়টুকু বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই পার করে দেয়। তার মাথার বালিশে তখনো হেনার
শরীরের ঘ্রাণ। ওর প্রিয় সুগন্ধি ছিল মুন ড্রপ। নসুকে মার্কেট ঘুরে ঘুরে ওসব এখন আর
কিনতে হবেনা। তার প্রিয় হাস্না হেনা এখন শুধুই স্মৃতি।
নসু সকাল হতেই আবারও গোসল সেরে ব্যাগ হাতে ঘর
তালাবদ্ধ করে বেরিয়ে পড়ে। সে রাস্তার মোড়ের
আবুলের চায়ের দোকানে নাস্তা খেতে বসে চোখ–কান খোলা রাখে। কেউ কিছু
আঁচ করতে পেরেছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করে। মনেহচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। বিল মিটিয়ে সে
দশ নাম্বার গোল চক্করের দিকে রওয়ানা দেয়।
দোকানদার আবুল
হোসেন তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে হা মেলে তাকিয়ে থাকে,কারণ সে এর আগে সব
সময়ই ফ্রি খেত। দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে ক্যাশ বাক্সে টাকা ভরে অন্য
খদ্দেরের দিকে সে চোখ ফেরায়। খদ্দেরের চাপে নসুর অস্বাভাবিক আচরণটা সে একসময় ভুলেও
যায়। নসু বাজার থেকে বড় সাইজের চারটা কর্ক শিটের প্যাকিং বাক্স কেনে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল
থেকে এগুলোতে করে ঢাকায় চিংড়ী মাছ আসে। বাক্সগুলো ঘরে রেখে একটা ডাবল কেবিন পিকআপ
ভাড়া করতে যায়। কাজগুলো শেষ হতে না হতেই লীডার তাকে ডেকে পাঠায়। তার বুকটা ছ্যাঁত করে
ওঠে। ধরা পড়তে চায়না সে। ওই ব্যাটা নিমক হারাম ব্যাঙ্গা বাবু লীডারকে
সব বলে দিয়েছে কিনা কে জানে! কিন্তু না লীডার আসলে তাকে ডেকেছে পিস্তলের গুলি
দেয়ার জন্য। কাল অপারেশনের পরপরই ওগুলো না নেয়ায় নসুকে গালমন্দ করেন। নসুর এধরনের অসাবধানতা এক সময় তার
জন্য বিপদ ডেকে আনতে পেরে জানিয়ে সে ব্যাঙ্গা বাবুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। নসু
কিছু জানেনা বলে জানায়। সে কোথায় গেছে কেউ বলতে পারছে না। মোবাইল নাম্বারটাও বন্ধ
কাল রাত থেকে। পুলিশের বা র্যাবের কাছে ধরা পড়ল কিনা কে জানে। গত রাতে
হেনার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব দৃশ্য মনে আসাতে নসু আনমনা হয়ে যায়। ঘোর ভাঙ্গে বসের
ডাকে। হেনার
সঙ্গে কিছু হয়েছে কিনা লীডার
জানতে চায়। নসু সব ঠিক ঠাক আছে জানিয়ে প্রসঙ্গটা বদলাতে চায়। লীডার হয়ত বুঝতে পারে
কোন এক অজ্ঞাত কারণে নসু মনে মনে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। সে নসুকে হেনার দিকে খেয়াল
রাখতে উপদেশ দেয়। দু’দিন আগে দলের একজন ব্যাঙ্গা বাবুকে নসুর ঘরে ঢুকতে দেখেছে। খবরটা
শুনে নসুর কোন প্রতিক্রিয়া হয়না দেখে লীডার একটু অবাক হয়। এটা নসুর ব্যক্তিগত ব্যাপার তাই ও
প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে সে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। ব্যাঙ্গা বাবু পুলিশ বা র্যাবের হাতে ধরা পড়লে নসুর
সমস্যা হতে পারে জানিয়ে তাকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেয়। লীডারের
ওখানে আরো কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে কিছু টাকা হাতে নিয়ে সে চলে আসে। দূরে
কোথাও অনেকগুলো কাক তারস্বরে চীৎকার করে যাচ্ছে। নসু ডান হাতের আড়ালে রোদ ঢেকে
বুঝতে চেষ্টা করে। কিন্তু কোথা থেকে কাকের ডাক ভেসে আসছে সে খুঁজে পায়না।
রাস্তার মাথার রড-সিমেন্টের দোকান থেকে নসু
এক ব্যাগ সিমেন্ট আর দু’বস্তা বালি কিনে বাসায় ফেরে।
কিসের কাজ করাবে দোকানদার জিজ্ঞেস করেছিল। বাথরুমের
কাজ করাবে বলে নসু এমনভাবে সাপের
দৃষ্টিতে তাকায় যে দোকানদার ভয়ে গুটিয়ে যায়। তার মুখ ভর্তি পান চিবানো থেমে যায়। আর
কোন প্রশ্ন না করে সে মাথা নিচু করে নিঃশব্দে টাকাগুলো গুনে নেয়। ভ্যানওয়ালাকে
বালির বস্তা দু’টা দরজার সামনে নামাতে বলে সিমেন্টের ব্যাগটা সে নিজেই ঘরের ভিতরে টেনে নিয়ে যায়। এরপর হোটেল
যেয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘরে ফিরে দরজা লাগিয়ে দেয়। বালতিতে বালি সিমেন্ট ভাল করে
মিশিয়ে এক পাশে রাখে। এরপর প্যাকিং বাক্সে হেনার হাড় মাংসগুলো সাজিয়ে তার ওপরে
বালি সিমেন্টের মিশ্রণ ঢেলে দেয়। সে এভাবে একে একে চারটি বাক্সই রেডি করে খাটের
নীচে লুকিয়ে রাখে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই প্যাকিং বাক্সগুলোর ভিতরে কি
আছে। এরপর গোসল করে জিন্সের পকেটে ক্লোরোফর্মের ছোট শিশিটা ঢুকিয়ে নসু বাইরে বের
হয়। পিস্তলটা সঙ্গে নিতে ভুলেনা সে। বাতাসে
প্যাকিং বাক্সের মিশ্রণ শুকাতে
থাকে। একসময় জমাট বাঁধে
সেগুলো।
সে
একটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করে বিশ্বরোড ধরে সাঁতারকুল,বাড্ডার
দিকে যায়। সেখানে ব্যাঙ্গা বাবুর মামার বাড়ি। মামার চারতলা বাড়ীর ছাদে ছোট একটা কুঠুরি আছে।
হাবিজাবি জিনিসপত্র রাখার জন্য বানান হয়েছিল সম্ভবত। গতবছর এক অপারেশন শেষে
সে আর ব্যাঙ্গা বাবু সেখানে কয়েকদিন লুকিয়ে থেকেছিল। চমৎকার একটা হাইড আউট। তার
কোনও ভুল না হলে তার ধারণা ব্যাঙ্গা বাবু সেখানেই লুকিয়ে আছে। সে হল কুয়ার ব্যাঙ।
তার দৌড় নসুর জানা আছে। পিছনের তিন তলা বিল্ডিঙের ছাদ থেকে স্যানিটারী পাইপের লাইন
বেয়ে সে চারতলায় ওঠে। এরপর সন্তর্পণে
কুঠুরিটার পিছনে লুকিয়ে ছোট জানালা দিয়ে ভিতরে উঁকি মারে। তার ধারণাই ঠিক। ব্যাঙ্গা
বাবু ঠোটে শীষ দিয়ে পরিচিত গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ব্যাগ গোছাচ্ছে। হয়ত অন্য কোথাও
পালানর জন্য। নসু সেক্ষেত্রে আরেকটু পরে এলে ব্যাঙ্গা বাবুকে হয়ত পেত না। ব্যাঙ্গা
বাবু হঠাৎ নসুকে ঘরের মধ্যে আবিষ্কার করে চমকে ওঠে। ভয়ে তার
মুখ শুকিয়ে যায়। জোরে চীৎকার করে কাউকে ডাকতে ইচ্ছে করে কিন্তু ব্যাঙ্গা
বাবুর গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোয় না। প্রচন্ড ভয়ের কারণে সেখানে শুধু ফ্যাসফেসে
ধ্বনি। নসু তাড়াতাড়ি ক্লোরোফর্ম মাখা রুমালটা ব্যাঙ্গা বাবুর নাকে চেপে ধরে। এত দ্রুত
সবকিছু ঘটে যায় যে ব্যাঙ্গা বাবু প্রতিরোধ করার কোনও সুযোগই পায়না। হাত পা ছুড়তে
ছুড়তে এক সময় নিস্তেজ হয়ে শরীরটা মেঝেয় ঢলে পড়ে। নসু দেরী
না করে দ্রুতই ব্যাঙ্গা বাবুর মুখে একটা
বালিশ চেপে ধরে তাতে পিস্তলের নল
ঠেকিয়ে এক রাউন্ড গুলি করে। ধুপ্ করে একটা শব্দ হয়। গুলিটা ব্যাঙ্গা বাবুর মুখ
দিয়ে ঢুকে করোটি ভেদ করে চলে যায়। পিছনে রেখে যায় টেনিস বলের সমান একটা গর্ত। নসু যে
পথে ছাদে এসেছিল চুপিসারে সে পথেই পালিয়ে
যায়।
রাত প্রায় নয়টার দিকে ডাবল কেবিন পিকআপটা
এলে নসু ড্রাইভারের হাতে কিছু টাকা দিয়ে হোটেলে ভাত খেতে পাঠায়। এরপর সে একাই একে
একে চারটা প্যাকিং বাক্স ঘরের বাইরে এনে সুন্দরভাবে পিকআপের পিছনে ট্রেইল বোটে
সাজায়। বালি আর সিমেন্টের মিশ্রণ জমাট বাঁধায় কর্ক শিটের বাক্সগুলো ওজনে বেশ
ভারী হয়েছে। তেরপল দিয়ে বাক্সগুলো ঢেকে দড়ি দিয়ে শক্তভাবে ট্রেইল বোটের হুকের সাথে
বাঁধে। ততক্ষণে ড্রাইভার ফিরে আসায় সেও কাজে হাত লাগায়। নসু ঘরের দরজায় তালা মেরে
পিকআপের কেবিনে ড্রাইভারের ঠিক পিছন বরাবর বসে গাড়ি স্টার্ট করতে বলে। ড্রাইভার
স্টিয়ারিঙে হাত রাখতে রাখতে হালকা ভাবেই জানতে চায় বাক্সগুলোর ভিতরে কি আছে? নসু
ড্রাইভারের ঘাড়ের পিছনে পিস্তলের নলটা ঠেকিয়ে বলে ফ্রজেন ফিশ। এরপর সে আর কখনও কথা বলেনি। নিঃশব্দে গাড়ি চালাতে থাকে। আমিনবাজার
পার হওয়ার পর শুধু একবার নসুর অনুমতি নিয়ে এফ এম রেডিও ফুর্তি অন করে। রেডিওতে খবর
হচ্ছে। নসু ব্যাগটা কোলে নিয়ে সীটে হেলান দেয়। তার প্ল্যান হল সাভার দিয়ে সোজা বেরিয়ে
চলে যাবে মানিকগঞ্জের দিকে। এরপর পদ্মার পানিতে বাক্সগুলি ফেলে একটানে কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
সেখানে বাচ্চু চেয়ারম্যানকে বলা আছে মহেশপুর বর্ডার হয়ে তাকে ওপারে পৌঁছে দিবে। তার মাধ্যমে
এই পথেই তারা ওপার
থেকে পিস্তল আর গুলির চালান এনে থাকে। সে নিজেও কয়েকবার অস্ত্রের চালান বুঝে নিতে ওপারে
গিয়েছিল। মহেশপুর-বাঘাডাঙ্গা
সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফুলের ট্রাক লোড হয়ে শাহবাগ,ঢাকায় আসে। সেসব
ট্রাকে ফুলের ঝাঁপির ভিতরে তাদের অস্ত্রের চালান লুকিয়ে ঢাকায় আনা হয়। ব্যাপারটা
খুবই সহজ আর পদ্ধতিটাও মোটামুটি নিরাপদ। যাহোক
নসুর ঝামেলাটা বাঁধে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পার হয়ে সে বিশ মাইলের
কাছাকাছি পৌঁছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় দিনভর সংঘর্ষ-গোলাগুলিতে বেশ কয়েকজন
ছাত্র নিহত হওয়ায় পুলিশ হাইওয়েতে ব্যারিকেড দিয়ে চেকপোস্ট বসিয়ে বাস-ট্রাক ইত্যাদি
র্যান্ডম সার্চ করছে। এই
হাইওয়ে ধরে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সমস্ত গাড়ী চলাচল করায় পুলিশের সার্চ
অপারেশনের কারণে হাইওয়েতে বেশ জ্যাম লেগেছে। চেকপোস্টের সামনে এবং পিছনে অনেক গাড়ি
লাইনধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু মাইক্রোবাস বা কার গাড়ির লাইন থেকে
আলাদা করে একপাশে নিয়ে ডিটেইল সার্চ করা হচ্ছে। এক সময় তাদের পিকআপটিও লাইনধরে
চেকপোস্টের সামনে এসে থামে। জানালার গ্লাস
নামালে একজন পুলিশ কনস্টেবল ভিতরে উকি দিয়ে জানতে চায় পিকআপের পিছনে ট্রেইলবোটে কি
আছে। নসু ফ্রজেন ফিশের ব্যাক চালান আছে বলে জানায়। তারা নসুর
উত্তরে সন্তষ্ট হয়না। পিকআপ সাইড লাইনে নিয়ে দাড় করাতে ড্রাইভারকে নির্দেশ দেয়,ডিটেইল
সার্চ করা হবে। তাদেরকে সার্চের নামে দেরী করালে মাছ পচে নষ্ট হবে জানালেও পুলিশের
কনস্টেবল তার আদেশে অনড় থাকে। নসু ড্রাইভারকে গাড়ি সাইড লাইনে নিতে নিষেধ করে
ব্যাগ হাতে নামতে গেলে পুলিশ কনস্টেবল তার ব্যাগ ধরতে চায় কিন্তু নসু এক ঝটকায় তার
হাত সরিয়ে দেয়। পুলিশ সদস্যটি আসলে তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল কিন্তু নসুর এমন
অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সে অবাক হয়ে জানতে চায় ব্যাগে কি আছে। নসু ব্যাক্তিগত
জিনিস আছে বলে এড়াতে চাইলেও সে যেন নাছোড়বান্দা। সে ব্যাগ
খুলে দেখতে চায় আসলেই তার ভিতরে কি আছে। এসময় আরেকজন কনস্টেবল ফ্রিসকিঙ্গের জন্য এগিয়ে আসে। নসুর জিন্সের
পকেটে তখন লোডেড পিস্তল। কি করবে সে চিন্তায় তার মাথায় তখন ঘন্টায় ১৮০ মাইল বেগে ঝড়ের
তান্ডব চলছে। তবে সে ততক্ষণে এটা ভালভাবেই বুঝে গেছে যে এখানে এভাবে ধরা পড়তে না
চাইলে তার মাথা একদম ঠাণ্ডা আর নার্ভ শক্ত রাখতে হবে। নসু ফ্রিসকিঙ্গের সুযোগ না
দিয়ে যে পুলিশ কনস্টেবল তার ব্যাগ চেক করতে চেয়েছিল তার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝগড়ায়
জড়িয়ে পড়ে। নসুর দাবী সে
তাকে আঘাত করে ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে চেয়েছে। ইতিমধ্যে লাইনের পিছনে দাঁড়ানো বেশ
কয়েকটা গাড়ি এবং একটা এ্যাম্বুলেন্স অসহ্যভাবে একটানা হুটার বাজিয়ে চলেছে। এ্যাম্বুলেন্সে ইমার্জেন্সি সাপোর্ট দিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী
রোগী বহন করা হচ্ছে। নসুর চীৎকার চেঁচামেচিতে রোগীর আত্মীয় স্বজন আর যাত্রীবাহী গাড়ির স্টাফরা নেমে এলে সেখানে ছোটখাট একটা জটলার সৃষ্টি হয়ে বিশাল জ্যাম লেগে
যায়। গাড়ির
সাধারণ যাত্রীদের কেউ কেউ নেমে এসে নসুর পক্ষ নিলে ঝগড়া প্রায় মারামারির রূপ নিতে
চায়। ফলে পুলিশ কনস্টেবলরা পিকআপের ট্রেইল বোট সার্চ করা বাদ দিয়ে ঝগড়ায় যোগ দেয়।
ঝগড়ার পুরো সময়টা জুরে নসুর এক চোখ নিবদ্ধ থাকে পিকআপের ড্রাইভারের দিকে। কিন্তু
ড্রাইভার কোন ঝামেলা না করে চুপচাপ ড্রাইভিং সীটে বসে থাকে। এসময়
একজন ইন্সপেক্টর বাঁশি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে এসে সবাইকে ঝগড়া থামিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার
করতে বলে। কারণ ওয়্যারলেস সেটে ম্যাসেজ এসেছে মন্ত্রীর গাড়ির বহর চেকপোস্ট এলাকা অতিক্রম
করবে। অন্য আরেকজন পুলিশ কনস্টেবল এসে পিকআপটিকে জোরপূর্বক রাস্তার এক সাইডে নিতে চাপাচাপি
করলে নসু আবারও চেঁচামেচি শুরু করে। তার চীৎকার শুনে গাড়ীর স্টাফরা ঘুরে এগিয়ে আসতে উদ্যত হলে পুলিশের ইন্সপেক্টর কনস্টেবলকে
বকা দিয়ে পিকআপ ছেড়ে দিতে বলে। সে ব্যারিকেড
সরানো মাত্রই নসু ঝুপ্ করে সীটে বসে পড়ে ড্রাইভারকে গাড়ী টান দিতে বলে। ড্রাইভারের হাত
গাড়ীর স্টিয়ারিঙেই রাখা ছিল। সে পিছনে
এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে টান দিয়ে জটলা থেকে
গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে যায়। নসু এতক্ষণে প্রাণ খুলে হাসে। পাঙ্খা নসু আবারও পাঙ্খা।
পাটুরিয়া ফেরী ঘাটে এসে অপেক্ষমান একটা
ফেরীতে উঠে পড়ে তারা। ড্রাইভার নসুর নির্দেশ মত ফেরীর রেলিঙ ঘেষে এক জায়গায় পিকআপটিকে
দাড় করায়। নসু তাকে বুঝিয়ে দেয় কোন ঝামেলা করলে তার পরিবারের কি পরিণতি হবে! কুয়াশা মাখা শীতের
রাত! ফেরীর যাত্রীরা কেউ ঘুমে অচেতন আবার কেউবা অর্ধ ঘুমে এপাশ ওপাশ করছে। ফেরী পারাপারের
সময়ে এপারের ফেরী যখন ওপারের ফেরীকে অতিক্রম করে তখন সাধারণত দু‘টো ফেরীই জোরে
ভেঁপু বাজিয়ে একে অপরকে সংঘর্ষ এড়ানর জন্য সতর্ক করে থাকে। নসু ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে পিকআপের ট্রেইল বোটে তেরপলে
ঢাকা বাক্সগুলো একে একে রেলিঙের পাশে ডেকে নামিয়ে রাখে। এরপর তারা অপেক্ষায় থাকে কখন
ফেরী দু’টো একে অপরকে অতিক্রম করবে। ফেরীর ভেঁপু বেজে ওঠার সাথে সাথেই নসু ঝটপট
একে একে সবগুলো বাক্স পানিতে ফেলে দেয়। কুয়াশার চাদর আর ভেঁপুর তীক্ষ্ণ শব্দে
হারিয়ে যায় বাক্সগুলো পানিতে ফেলার ঝুপঝুপ শব্দ। হেনা
এখন শুধুই স্মৃতি! সিমেন্টে জমাট বাঁধা করুণ স্মৃতি। নসু হোয়াইট বাবুকে ফোন করে বস্তিতে
তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে বলে। হোয়াইট বাবু কোন প্রশ্ন করেনা। এ জগতে কেউ কখনও
প্রশ্ন করেনা। অযথা কৌতূহল দেখায় না। শুধু আদেশ পালন করে মাত্র। ভোরের
আগে আগে কালীগঞ্জ পৌঁছে বর্ডার ক্রস করার আগে লীডারকে মোবাইল করে
সব জানায় নসু ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসু। এখন কয়েক বছর
তার লুকিয়ে থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে
পরিস্থিতি স্বাভাবিক
হলে হয়ত একদিন ফিরে আসবে। পরদিন পত্রিকার পাতায় খবর আসে রূপনগর বস্তি গতকাল রাতে আগুনে পুড়ে ছাড়খার। জানা যায় বস্তির একটা ঘরের
বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুণের সূত্রপাত ঘটে।
যখন গিয়েছে ডুবে
পঞ্চমীর চাঁদ ।।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম
থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম সামনে এগোলেই একটা সরু মাটির গলি বাম দিকে চলে গেছে। গলির মাথায় ফাঁকা ধুধু মাঠ আর ফসলের ক্ষেত। ক্ষেতের কোল ঘেষে একটা সাড়ে তিন তলা বাড়ি
একাই দাড়িয়ে আছে। এ তল্লাটে
এটাই একমাত্র উঁচু বিল্ডিং। বাড়িটার ছাদে দু’রুমের একটা ছোট ফ্ল্যাটে পাঙ্খা নসু থাকে। নসুর
বসার ঘর থেকে গলি বরাবর পথটা একদম পরিস্কার দেখা যায়। এটাই তার
বর্তমান আস্তানা বা সেফ হাউজ। লীডার
তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে অনেকটা ইচ্ছে করেই নসুকে তার থেকে দূরে রাখলেও
নসুর ওপর সর্বক্ষণ চোখ রাখার জন্য রিয়াজকে নিয়োগ করেছে। এখন পর্যন্ত অবশ্য নসুর
আচরণে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েনি। রিয়াজ নামের হালকা পাতলা গড়নের ছেলেটার আসল কাজ
যাই হোকনা কেন নসু জানে ওর একমাত্র কাজ হল সিসিটিভি মনিটর করা আর মাঝে মাঝে বাইনোকুলার
বা নাইট ভিশনে চোখ রাখা। অতীতের রেকর্ডের কারণে লীডার হয়ত পাঙ্খা নসুকে পুরোপুরি
বিশ্বাস করতে পারেনা কিন্তু সে এটা ঠিকই জানে নিপুণ লক্ষ্যভেদ, নিষ্ঠুরতা এবং কর্ম
কৌশলে দলে তার মত কেউ নেই। সে যদি নসুকে তার দলে নাও রাখে তাকে লুফে নিতে ঢাকার
আন্ডারওয়ার্ল্ডে দলের অভাব হবেনা। নারায়ণগঞ্জের হাজী মাস্তান কিংবা পুরান ঢাকার
জেমস বাহিনী তো তাকে নেয়ার জন্য একরকম মুখিয়ে আছে। তবে নসু লীডারের প্রতি প্রবল
আনুগত্য কিংবা অন্য কোন কারণে তাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে উৎসাহ বোধ করেনা। ওপার বাংলায়
দীর্ঘ অজ্ঞাতবাস কাটিয়ে দেশে ফিরলে নসুকে আগের মত কোন ছোট দলের ইন চার্জ না করে বরং
কন্ট্রাক্ট কিলিঙ্গের মত বিশেষ ধরনের কাজগুলো দেয়া হয়। কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডে
নেপালি বা বিহারের কিলারদের সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দিয়ে কাজ করতে যেয়ে নসু এখন আগের
চেয়ে আরও বেশী পরিণত আর দক্ষ। র্যাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিতে যেয়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডও
এখন অনেক পেশাদার। আগে কেউ কাটা রাইফেল বা গাদা বন্দুক হাতে পেলেই খুশী হত। শুধু
নসুর মত কিছু ভাগ্যবানরাই তখন ওপারের ফাইফ স্টার ব্রান্ডের পিস্তল ব্যবহার করার
সুযোগ পেত। অথচ ওসব এখন কেউ ছুঁয়েও দেখেনা। আজকাল অনেকেই পয়েন্ট ২২ ক্যালিবারের ওয়ালথার
পিপিকে কিংবা পয়েন্ট ৩২ ক্যালিবারের বেরেতা হরহামেশা ব্যবহার করছে। ওগুলো সাইজে
ছোট,মেকানিক্যাল ফল্ট হয়না আবার শরীরের লুকিয়ে রাখতেও সুবিধা। চোখে না দেখলেও উজি পিস্তল
ব্যবহারের কথাও শোনা যায়। অত্যাধুনিক পিস্তলের পাশাপাশি এখন একে ৪৭-টমি গান, এমনকি টেলিস্কোপিক
সাইট লাগানো স্নাইপার রাইফেলও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলে এসেছে বলে শোনা যায়। তারা
এখন গুলির শব্দ লুকানোর জন্য সাইলেন্সার এবং টার্গেট মিস না করার জন্য লেজার এইমিং
ডিভাইস ব্যবহার করে থাকে। অত্যাধুনিক এসব অস্ত্রপাতি ব্যবহার করার জন্য তাই নসুর
মত পেশাদারদের ডিমান্ড এখন অনেক বেশী। কন্ট্রাক্ট কিলিং ছাড়াও নসুকে প্রতি মাসের শেষে
সোনিয়ার কাছে কালাবাবুর বখরাটা পৌঁছে দিয়ে আসতে হয়। অবশ্য এই কাজটা সে একরকম জোর
করেই নিয়েছে। ল্যাংড়া মনির নসুর উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করতে পারলেও মুখে প্রকাশ
করেনা।
নসু ফিরে আসার পর দলের সবাই এখন জানে সে কিভাবে হেনা এবং ব্যাঙ্গা বাবুকে
সরিয়েছে। আজগর কিলিঙ্গের গল্পতো আগে থেকেই
সবার জানা। কিন্তু মজার ব্যাপার হল নসুর হাত একদম পরিস্কার। পুলিশের খাতায়
সন্ত্রাসী হিসাবে তার নাম লেখা থাকলেও তার কোন অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নাই। জোড়া কিলিঙের পরে ওপারে পালানোর সময় নসু যে পিকআপটা নিয়ে
কালীগঞ্জ গিয়েছিল সে পিকআপের ড্রাইভারকে পরে উথুলির আউটার সিগন্যালের কাছে ট্রেনে কাটা
পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। যদিও সবাই বলে যে সেটা নিছক দুর্ঘটনা ছিল কিন্তু দলের
ছেলেরা প্রমাণ না থাকলেও অনুমান করতে পারে সেখানে আসলে কি ঘটেছিল। নসু
আগেই কথা কম বলত এখন সে আরও বেশী চুপচাপ হয়ে গেছে। সে এখন যতটা না বলে, ভাবে তার
চেয়েও বেশী। তাকে নিয়ে ল্যাংড়া মনিরের উৎকণ্ঠা সে বুঝতে পেরে মনে মনে হাসে। সে আন্দাজ
করতে পারে রিয়াজের আসল কাজটা কি কিন্তু সেটা নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামায়না। এক সময় লীডারকে সরিয়ে তার
জায়গা দখল করার প্ল্যান থাকলেও সে এখন আর তা ভাবেনা। তার দৃষ্টি এখন অনেক দূরে কিংবা বলা যায়
অনেক ওপরে। বিশেষ করে কালাবাবু তাকে অপমান করার পর থেকে তার এখন একটাই ভাবনা কালাবাবুকে দুনিয়া
থেকে সরিয়ে দেয়া। তার সাম্রাজ্য দখল করা। এনিয়ে সে ওপারে শেল্টারে থাকা মিরপুর-শ্যামলী-আদাবর এলাকার
গডফাদার বোমা মিজানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। কালাবাবুর সঙ্গে পুরানো শত্রুতার
কারণে সেও নসুকে একাজে সব ধরনের সাহায্য করতে আগ্রহী। বোমা মিজান নিজেও একসময় পাঙ্খা
নসুর মতই চুনোপুঁটি ছিল কিন্তু তার সাহস, দক্ষতা আর পরিশ্রম তাকে ঐ পর্যায়ে নিয়ে
গেছে। সে এখনও ঢাকার অপরাধ জগতের কিংবদন্তী। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় তার নামটা
সবার শীর্ষে থাকায় সে দেশে ফিরতে পারছেনা। তাকে ধরার জন্য সরকারের পুরষ্কারের
অংকটাও নেহায়েত কম না। তবে সে কলকাতার সল্টলেকে তার প্রাসাদোপম বাড়ীতে বেশ আরামেই
আছে। ঢাকা
থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজী এবং মাদক ব্যবসার অর্থের একটা বড় অংশ তার কাছে বখরা হিসাবে
যায়। সেদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বড় কর্তারা মাস শেষে তার কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ
পায় বলে তাকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাছাড়া সেখানে শেল্টার নিলেও তার সমস্ত অপরাধমূলক
কর্মকান্ড ঢাকাকে ঘিরে। সেখানে বসে থেকেই সে ঢাকার ইয়াবা, ফেন্সিডিল আর অস্ত্রের
ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। সে আসলে এখন মাফিয়া ডনদের পর্যায়ে চলে গেছে বলে এসব খবরের সত্য
মিথ্যা আদৌ কখনো যাচাই করা সম্ভব হয়না।
কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে জেলের ভিতরেই করতে
হবে অথবা যখন তাকে কোর্টে মামলার প্রয়োজনে হাজির করা হয় তখন। সে আসলে ইচ্ছা করেই
মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয় জেলের নিরাপদ আশ্রয়ে। সে জানে বাইরে থাকলে কেউ না কেউ তাকে সরানোর চেষ্টা করবেই। তার
চেয়ে এই ভাল জেলের ভিতরে বসে অপরাধ
জগত সামলান। পরে একসময় সুবিধা-অসুবিধা বুঝে বের হওয়া যাবে। এতে তার কালেকশন হয়ত
একটু কম হচ্ছে কিন্তু সেতো নিরাপদ এবং আইনের কাছেও পরিষ্কার থাকতে পারছে। নসু
জানে সোনিয়াকে ম্যানেজ করতে পারলে কালাবাবুকে খুন করা কোন ব্যাপারই না।
শুধুমাত্র সোনিয়ারই
জেলগেটে কালাবাবুর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি আছে। সোনিয়া স্বামীর সঙ্গে দেখা করার
অজুহাতে ইনফর্মেশন আদান-প্রদান করে থাকে। শোনা যায় জেলের নীচের দিকের বাবুদের ম্যানেজ
করে সে মাসে দু’একবার কালাবাবুর সেলে রাত কাটিয়ে আসে। কালাবাবু একমাত্র তাকেই
বিশ্বাস করে। তাকে কোন ভাবে ম্যানেজ করতে পারলে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে কালাবাবুকে
খুন করা যেত। কিন্তু যেমনটা শোনা যায় সোনিয়াকে স্বামী হত্যায় রাজী করানো এক কথায়
অসম্ভব। তবে গুলশানের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে মার্কেটে
গুজব চালু আছে। নসু সোনিয়ায় এই গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে আরও ইনফর্মেশন জোগাড় করার
সিদ্ধান্ত নেয়। সে শুনেছে কোনও এক কারণে সোনিয়া সেই ব্যবসায়ীর মাধ্যমে পাসপোর্টে
মালয়েশিয়ার ভিসা সিলও মেরে রেখেছে। তবেকি সে দেশ ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছে! খোঁজ
নিতে হবে।
পাঙ্খা নসু ছক কেটে চলে। একটা না একটা ব্যবস্থা
হবে বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস। সে মোটামুটি তিনটা প্ল্যান ধরে এগোয়। যার কোন একটাকে
কাজে লাগাতে পারলে তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পুরন হবে। প্ল্যান ‘এ’ হল জেলখানার সেলের ভিতরেই তাকে খুন করা। কিন্তু
প্ল্যান ‘এ’ অনুযায়ী জেলের ভিতরে কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে নিজেকেই ছোটখাট একটা অপরাধ
করে জেলে যেতে হবে এবং কাজ শেষে জামিনে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থাও করতে হবে। কিন্তু
সেজন্য একটা ভাল চ্যানেল খুঁজে বের করতে হবে যারা নিশ্চিত করবে তাকেও মানিকগঞ্জ
জেলা কারাগারে পাঠানো হবে এবং কালাবাবুর পাশের কোন সেলে রাখা হবে। এরপর একজন ভাল উকিল নিয়োগ করে কাজ শেষে তাকে জামিনে বের করে
আনার ব্যবস্থা করা। ভালভাবে চেস্টা করলে এর সবই হয়ত ব্যবস্থা করা যাবে কিন্তু সমস্যা আসলে অন্যখানে। কোন ছোটখাট অপরাধ করে পুলিশের কাছে
ধরা দেয়ার পরে পুলিশ যদি তাকে কোন পেন্ডিং হত্যা বা ধর্ষণের মামলায় কোর্টে চালান
দেয় তাহলে জামিনে বের হওয়া খুবই কষ্টকর হবে। এছাড়া ক্রস ফায়ারে যাওয়ার রিস্ক তো
আছেই। এ লাইনে তার শত্রুর অভাব নেই। হয়ত দেখা যাবে ল্যাংড়া মনিরই তাকে সরানোর জন্য
টাকা ঢালছে। এছাড়া জেলখানায় যেয়ে কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে থানা-পুলিশেরও
সহযোগিতা লাগবে। কিন্তু সেটা কিভাবে ম্যানেজ করা সম্ভব!
প্ল্যান ‘বি’ হল কালাবাবুকে যেদিন আদালতে
হাজিরা দেয়ার জন্য নেয়া হবে সেদিন আদালত প্রাঙ্গনেই তাকে খুন করা। সেটা হতে পারে ধারালো
কমান্ডো নাইফ কিংবা সাইলেন্সার লাগানো বেরেতা দিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে সফল হতে হলে তাকে টার্গেটের খুব কাছে যেতে হবে। তবে কালাবাবু
বা পুলিশ সম্ভবত সে ধরনের সুযোগ দিবেনা। তাছাড়া আদালত প্রাঙ্গনে অত লোকের মাঝে হত্যাকান্ড
ঘটাতে গেলে অনেক রিস্ক নিতে হবে। এতে এমনকি হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও
আছে। অবশ্য ঘটনার দিন যদি আদালত প্রাঙ্গনে এলোপাথাড়ি বোমাবাজি করে ত্রাস ও
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায় এবং হৈ-হল্লার সুযোগে কালাবাবুর কাছে ঘেষে গুলি করা
সম্ভব হয় তাহলে হয়ত কার্যোদ্ধার হতে পারে। তবে এটা পুলিশ স্কর্টের পালটা এ্যাকশন এবং
অনেকাংশে তার ভাগ্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। এজন্য কিলিং দলটা বেশ ভারী করতে হবে। আবার দলে বেশী লোক টানা
মানে তথ্য লিক্ হওয়ারও বেশী সম্ভাবনা। সেরকম কিছু হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আরেকটা
পদ্ধতি হতে পারে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে দূর থেকে গুলি করে ফেলে দেয়া। সেক্ষেত্রে ওর
নিজের স্নাইপার রাইফেল না থাকায় ওটা কারো কাছ থেকে ধার করতে হবে। এই অস্ত্রটা সে কলকাতায়
কয়েকবার ব্যবহার করেছিল। চমৎকার কাজ দেয় কিন্তু ওর জানামতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে
এই অস্ত্র একটা কিংবা দুইটার বেশী নাই। অনেক দামী অস্ত্র তাই ওটার ভাড়া বেশী এবং
গুলিও দেয়া হয় খুব হিসাব কষে। এছাড়া ওটা হাতে নিতে গেলে চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ার
সম্ভাবনাও আছে।
নসুর প্ল্যান ‘সি’ হল কঠিন ভয়াবহ। আর্জেস
গ্রেনেড বা হাতবোমা মেরে কালাবাবুসহ পুলিশের প্রিজন ভ্যান উড়িয়ে দেয়া। সে ভাল করেই
জানে এতে প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি এবং অযথা রক্তপাত হবে। প্রিজন ভ্যানের
অন্যান্য সাধারণ কয়েদী ছাড়াও রাস্তার নিরাপরাধ পথচারীও এতে মারা যেতে পারে। সে
জানে কক্সবাজার কিংবা বান্দরবানের দিকে গেলে আর্জেস গ্রেনেড ম্যানেজ করা সম্ভব। সেখানে
চোরাই মার্কেট থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ অল্প দামে ম্যানেজ করা গেলেও সেটা ঢাকা
পর্যন্ত নিরাপদে আনাটাই ভীষণ রিস্কি। হাইওয়ের বিভিন্ন জায়গায় বিজিবি-পুলিশের
চেকপোস্টে ধরা পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনেক চিন্তা ভাবনা আর
প্ল্যানের কাট-ছাট করে নসু অবশেষে প্ল্যান ‘সি’ নিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ
সে গ্রেনেড বা বোমা মেরে কালাবাবুসহ পুলিশের প্রিজন ভ্যান উড়িয়ে দিবে। যতই রিস্ক থাকুক
আর রক্তপাত ঘটুক না কেন কালাবাবুকে খুন করতে তার কাছে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি বলে
বিবেচিত হয়।
মরিবার হ’ল তার সাধ।
পাঙ্খা নসুর সামনে এখন অনেক কাজ। প্ল্যান অনুযায়ী এগোতে
হলে তার এখন প্রচুর টাকা আর কিছু দক্ষ ছেলেপেলে প্রয়োজন। সে ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ছক
কষে ধীরে ধীরে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। পাঙ্খা নসু বুঝতে পারে তার প্ল্যান
কার্যকর করতে হলে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পড়ে থাকলে চলবে না। তাকে ঢাকা যেতে হবে
এবং কিছু দক্ষ ও পরীক্ষিত ছেলেদের নিয়ে একটা টিম তৈরি করতে হবে। তবে সবকিছুর আগে
সবচেয়ে বেশী যেটা প্রয়োজন সেটা হল ল্যাংড়া মনিরের তাকে নিয়ে অহেতুক উৎকণ্ঠা দূর
করা। কারণ লীডারের সাহায্যই এখন সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন তার। নসু প্ল্যান ‘সি’ নিয়ে লীডারের
সঙ্গে মিটিং করার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসে। নসু কি ভেবে লীডারকে এতটা
বিশ্বাস করে তা সে নিজেও জানেনা। তবে তার দৃঢ় বিশ্বাস লীডার তাকে সাহায্য করতে না পারলেও অন্তত প্ল্যানটা কারো কাছে ফাস
করে দিবেনা। এক সন্ধ্যায় মিরপুর বেড়ীবাঁধ এলাকার এক রেস্টুরেন্টে নসু আর লীডার
মিটিংএ বসে। ল্যাংড়া মনির অবশ্য জরুরী কাজের অজুহাতে নসুর সঙ্গে মিটিং এড়াতে
চেয়েছিল। সে আসলে এভাবে একাকী পাঙ্খা নসুর সঙ্গে বসতে চায়নি। তার ধারণা এটা হয়ত
তাকে হত্যা করার জন্য নসুর কোন প্ল্যান। লীডার তার গাঢ় নীল রঙের ভক্সিটা নিয়ে নসুর
সঙ্গে দেখা করতে আসে। তার সঙ্গে দু’জন গান ম্যান। তারা রেস্টুরেন্টের এক কোনে
জানালার পাশে আলো আধারিতে বসে নসুর ওপরে দৃষ্টি রাখে। তারা যথেষ্ট পেশাদার এবং অস্ত্রের ব্যবহারটাও নসুর চেয়ে কম বোঝেনা।
নসু একটু ঝামেলা করলেই তারা শ্যুট করতে দ্বিধা করবেনা। তাদের সেরকম ট্রেনিংই দেয়া
আছে এবং জার্মান শেফার্ড কুকুরের মত সেটা করতে তারা কখনও পিছুপা হয়না। নসু লীডারকে
নিয়ে এমন জায়গায় বসে যেখান থেকে রেস্টুরেন্টের ভিতর এবং প্রবেশপথটাও ভালভাবে নজরে রাখা
যায়। নসুর এই সব সময় সতর্ক থাকার অভ্যাসটা মনিরের খুব
ভাললাগে। একধরনের স্মার্টনেস আছে তার চলাফেরায়। দলের বেশীর ভাগ ছেলেরাই যেন কেমন,শুধু
এই পাঙ্খা নসুই একটু আলাদা। আসলে ওপারের প্রফেশনালদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কাজ করতে
যেয়ে সে শিখেছে অনেক কিছুই। অনেক বদলে গিয়েছে নসু। দলের
অন্য আর দশজন থেকে তাকে তাই সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। নসু হচ্ছে তার ট্র্যাম
কার্ড তাই লীডার তাকে হিসাব করেই ব্যবহার করে। কালাবাবু অনেক প্রস্তাব পাঠিয়েছিল
কিন্তু নসু তার দলে ভিড়েনি। ল্যাংড়া মনিরের প্রতি তার কৃতজ্ঞতাবোধই তাকে পুরনো দলে
ধরে রেখেছে।
নসু ওরফে পাঙ্খা নসু স্ম্যাশড পটেটো উইথ
বীফ স্টেকের সঙ্গে বিয়ারের অর্ডার দিয়ে লঘু স্বরে আলোচনা শুরু করে। নসু তার
প্ল্যানটা বলতে যেয়ে শুরুতে আসলে ঠিক নিশ্চিত ছিলনা লীডারের প্রতিক্রিয়া কিরকম
হবে। সে রাজী হবে কিনা তাও নসুর জানা নেই। তবু একথা সেকথায় একপর্যায়ে একরকম মরিয়া হয়েই সে লীডারকে তার প্ল্যান ‘সি’ বর্ননা করে এবং একাজে লীডারের
সাহায্য চায়। হয়ত নসুর এধরনের প্ল্যানের কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি তাই লীডার খানিকটা
ভিরমি খায়। তার গ্লাস থেকে কিছু পানীয় ছলকে টেবিলের ওপরে পড়ে এবং তার প্যান্ট ভিজিয়ে
দেয়। লীডার টিস্যু পেপার দিয়ে মুছতে চেস্টা করে কিন্তু তাতে লাভ হয়না। প্যান্টের
চেইনের পাশে কাপড়টা ভেজাই থাকে। সে বিব্রত বোধ করে। কিন্তু পরক্ষণেই তার অপ্রতিভ
অবস্থা কাটিয়ে গলা ঝেড়ে নসুকে জিজ্ঞেস করে এটা কিভাবে সম্ভব! এতে প্রচুর রিস্ক আছে।
কালাবাবুর দলটা অনেক বড়। আর অনেক লম্বা তার হাত। রাস্তার সাধারণ টোকাই থেকে শুরু
করে পুলিশ-প্রশাসন এমনকি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ
আছে। কালাবাবু প্রতি মাসে তাদের জন্য ভাল বাজেট রাখে। তার সাহায্য ছাড়া ডেভেলপার কোম্পানিগুলো
জায়গার দখল নিতে পারে না। তাই তারাও কালাবাবুর পিছনে প্রচুর টাকা ঢালে। তার কখনও পয়সার
অভাব হয়না। যদি তার এই প্ল্যান ভেস্তে যায় এবং কোনও ভাবে যদি তা কালাবাবুর কান
অবধি পৌঁছে তাহলে আর এই দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে হবেনা। এমনকি তারা কোথাও পালিয়েও
বাঁচতে পারবেনা। সব খানে তার লোক আছে। তারা প্রয়োজন বোধে কাউকে পাতাল থেকে ধরে এনেও
ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিতে পারে। এটাই হল কালাবাবুর নিজস্ব স্টাইল।
তার সঙ্গে বেঈমানির শাস্তিটা কি রকম ভয়ানক
সেটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবাইকে বোঝাতে সে হত্যা করে ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়।
কালাবাবু ভীষণ ধূর্ত আর শঠ। তাকে খুন করা এক কথায় অসম্ভব। আর কোনোভাবে নসু যদি তার
প্ল্যান কার্যকর করতে পারেও তাহলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে একদম তুলকালাম কান্ড লেগে যাবে।
ফাঁকা মাঠ পেয়ে অন্য এলাকার ডন মিরপুর এলাকার দখল নিতে আসা মাত্র রক্তের হোলিখেলা
ঢাকা শহরের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। নসু তাকে অযথা বেশী ভাবতে নিষেধ করে জানায় যে
তার এই প্ল্যানে বোমা মিজানের সমর্থন আছে এবং কালাবাবুর অবর্তমানে মিরপুর এলাকার
বস সেই হবে। ল্যাংড়া মনির তাকে অবিশ্বাস করলে নসু বোমা মিজানের নাম্বারে ফোন করে
লীডারকে কথা বলার জন্য মিলিয়ে দেয়। বোমা মিজান নসুকে সাধ্যমত সহায়তা করার জন্য অনুরোধ
করে। এরপরে আসলে আর কোন কথা থাকেনা। লীডার পাঙ্খা নসুর সঙ্গে বোমা মিজানের এত
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখে অবাক হয়। সে খুশী হয় একথা জেনে যে সে কখনই পাঙ্খা নসুর টার্গেট
ছিলনা কিন্তু নসুর মনে কি আছে তা সেই শুধু জানে।
সেদিনই সন্ধ্যা নাগাদ জেলে কালাবাবুর কাছে
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের এই মিটিং এর খবরটা পৌঁছে যায়। কালাবাবু তখন ডেপুটি
জেলারের অফিসে বসে দাবা খেলছিল। খবরটা পেয়ে কালাবাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ পরে। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে দাবার বোর্ডের
দিকে। দাবার চাল দিতে ভুল করে সে। এরপর হঠাৎ দাবার বোর্ড উল্টে দিয়ে মোবাইলে কয়েক
জায়গায় নির্দেশনা দিতে দিতে নিজের সেলে ফিরে যায়। তার এই হঠাৎ ক্ষেপে ওঠায় ডেপুটি
জেলার আছির সাহেব বেশ অবাক হন। তাকিয়ে থাকেন তার চলে যাওয়া পথের দিকে কিন্তু কিছু
বলার সাহস হয়না। প্রতিমাসে তিনি কালাবাবুর কাছ থেকে হাজার টাকার বান্ডিল আর পরিবারের
নিরাপত্তাটা পান। তার একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আছে,তার কথা তাকে ভাবতে হয়।
অনেক ভেবে চিন্তে নসু অপারেশনের জন্য জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয় আর সাভার বাজারের মাঝে জ্বালেশ্বর-রেডিও কলোনি এলাকাটাকে পছন্দ করে।
জায়গাটা অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশ ফাঁকা।
বিশ্বরোডের এই অংশটায় দোকানপাট-বাড়িঘর বেশ কম। এখানে এ্যাকশন
করে নির্বিঘ্নে বোমকা-বিরুলিয়া-জিরাবো হয়ে বাইপাল থেকে উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণ
পশ্চিমাঞ্চলে অথবা টঙ্গি থেকে ভৈরব হয়ে সিলেট বা চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যাওয়া
সম্ভব। অপারেশন সফল হলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য কিছুদিন সম্ভবত
লুকিয়ে থাকতে হতে পারে। নসুর সঙ্গে এর
আগেও কাজ করেছে এরকম কয়েকজন বিশ্বস্ত এবং
দক্ষ ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সে তার টিম
তৈরি করে। তারা অপারেশন প্ল্যান জানলেও কিলিং টার্গেট সম্পর্কে কিছু
জানেনা। গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে কাউকে তা জানান হয়নি। শেষ মুহূর্তে প্রয়োজন বোধে
তাদেরকে টার্গেট সম্পর্কে জানান হবে। পুরো প্ল্যানটা শুধু নসু আর লীডারের মাথায়। নসু
লীডারকে কালাবাবুর আদালতে হাজিরার তারিখ এবং কোন পথে কিভাবে তাকে সেখানে নেয়া হবে
সেসব তথ্য সংগ্রহ করতে বলে নিজে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হোয়াইট মামুনকে নিয়ে বান্দরবান
যায়।
লীডারের
নির্দেশে লোকাল কন্টাক্ট হিসাবে মং প্রু চাকমা তাদের সঙ্গে যায়। মং প্রু চাকমা
একসময় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ছিল। এখন রাজনীতি বাদ দিয়ে কাকরাইলের
মোড়ে একটা ফার্মে স্টেনো পদে চাকুরী করে। তার বড় ভাই ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির সময়ে
আত্মসমর্পণ করলে তারা রাজস্থলী থেকে স্বপরিবারে বান্দরবানের সুয়ালকে এসে বসতি গড়ে। নসু তার
সঙ্গে বান্দরবানের মেঘলা এলাকায় এক গেস্ট হাউজে ওঠে। তারা মং প্রু’র সঙ্গে বিভিন্ন
জায়গায় গেলেও কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারেনা বা কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলতেও চায়না। আইন
শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে অনেকেই এসব তথ্য জানলেও সহসা কেউই ধরা দিতে চায়না। পরে
কোন এক সোর্সের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তারা রোয়াংছড়ি যায়। রোয়াংছড়িতে নির্দিষ্ট
পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে একজন পাহাড়ি কারবারী তাদের সাহায্য করতে রাজী হয়। তার সঙ্গে
প্রয়োজনীয় দর কষাকষি শেষে তাকে গাইড হিসাবে সঙ্গে নিয়ে নসু বলিপাড়া থেকে থানচি হয়ে
আরও দক্ষিনপূর্বে রেমাক্রি যেয়ে আসল লোকের সন্ধান পায়। সে প্রতিবেশী দেশের কোন এক
বিদ্রোহী দলের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে দিতে রাজী হয়
কিন্তু এজন্য কয়েকদিন সময় চায় এবং প্রচুর
অর্থ দাবী করে। অনেক দর কষাকষি শেষে তাদের মধ্যে একটা আপোষ রফা হয় এবং
সে অনুযায়ী অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করে তারা থানচি থেকে আলিকদম হয়ে লামা যায়। রাত
যাপনের জন্য তারা লামা বাজারে একটা সাধারণ মানের বোর্ডিং হাউজে ওঠে। মং
প্রু চাকমা রাতে খাওয়ার টেবিলে এধরনের অস্ত্র কি কাজে লাগবে জানতে চাইলে নসু
নিরুত্তর থাকে। হোয়াইট মামুনও মুখ খোলে না। সে অবশ্য ভাসা ভাসা ভাবে শুনেছে যে কালাবাবুকে সরিয়ে দেয়া হবে তবে কবে
কোথায় কিভাবে সেটা সে জানেনা। এরপর থেকে মং প্রুও কোন প্রশ্ন না করে মুখে কুলুপ
এঁটে থাকে। পরের দিনটা তাদের একরকম চুপচাপই কাটে। শুয়ে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া হাতে
তেমন কাজ নেই। মং প্রু সুয়ালকে তার বাড়ীতে যেতে চায় কিন্তু নসু রাজী হয়না। নসু তাকে
ডিলিংস বুঝে নেয়ার পরে বাড়ীতে যাবার পরামর্শ দেয়। মামুনকে কিছু টুরিস্ট সামগ্রী,ট্যুর
প্রোগ্রাম সহ হোটেল ভাউচার,বড় সাইজের একটা ট্রাভেল ব্যাগ ইত্যাদি কিনতে কক্সবাজারে
পাঠিয়ে দেয়। নসু তাকে তিন দিন পরের কক্সবাজার-ঢাকা রুটের রাত্রিকালীন এসি
বাসের টিকেটও কাটতে বলে। রাত আটটার দিকে যে
বাসটা কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসবে তাতে ফাসিয়াখালি থেকে তারা উঠবে। মং
প্রু কান খাড়া করে তাদের কথোপকথন শোনে। হোয়াইট মামুন পরদিন সন্ধ্যায় তার কাজ শেষে
লামায় ফিরে আসে কিন্তু অস্ত্রপাতি তখনো না পৌঁছানোর কারণে নসু একটু চিন্তায় পড়ে
যায়। মং প্রু চাকমা অবশ্য তাকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে। তার মতে পাহাড়িরা এখনো
বাঙ্গালীদের তুলনায় অনেক সৎ। হয়ত বর্ডারে কোন সমস্যা হচ্ছে কিন্তু তার ডেলিভারি
ঠিক সময়ই চলে আসবে বলে সে জানায়।
তাদের যেদিন লামা থেকে ফাসিয়াখালি হয়ে ঢাকায় ফেরার কথা সেদিন বিকেলেই রেমাক্রি
থেকে ডিমান্ড মোতাবেক জিনিসপত্র এসে পৌঁছায়। একটা একে-৪৭ রাইফেলসহ
কয়েকটা ম্যাগাজিন ভর্তি গুলি এবং গোটা দশেক আর্জেস গ্রেনেড। নসু দুশ্চিন্তা মুক্ত
হলেও অজানা আশংকায় সে কেঁপে উঠে। বাকী অর্থ পরিশোধ করে তারা লামা থেকে চিরিঙ্গায় চলে
আসে। নসু কোনও রিস্ক নিতে চায়না। এ লাইনে ডাবল গেইম খেলার লোকের অভাব নেই। মং প্রু
চাকমা পাওনা অর্থ বুঝে নিয়ে সুয়ালক যেতে চায়। লামা থেকে সুয়ালক কাছেই। নসু এবার যদিও
না করেনা কিন্তু তার মনটা খচখচ করতে থাকে। ঢাকায় আরও কাজ আছে বলে প্রলোভন দেখিয়ে
তাকে ঢাকায় ফিরে দেখা করতে বলে। মং প্রু দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ীর পথে পা
বাড়ায়। পথে এক জায়গায় থেমে সে
মোবাইলের দোকান থেকে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে। কয়েক হাত হয়ে সে খবর পৌঁছে যায়
কালাবাবুর কাছে এবং আরও কয়েক জায়গায়। নসু অবশ্য একবার মং প্রুকে ইয়াংচার দিকে নিয়ে
খুন করে জঙ্গলে ডেড বডি ফেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সামনে বড় কাজ থাকায় সে
এমুহুর্তে অপরিচিত জায়গায় কোন ধরনের উটকো ঝামেলায় পড়তে চায়নি। তাছাড়া ঢাকায় দেখা
হলে সেখানেও ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকছে। যাহোক নসু চিরিঙ্গায় একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে হোয়াইট মামুনকে নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে কক্সবাজারে হাজির
হয়। সেখানে
বাদ্যযন্ত্রের দোকান থেকে হাওয়াই গীটার রাখার ব্যাগ কিনে পরিচিত হোটেলে ওঠে এবং গোসল
সেরে রাতের খাবার খেয়ে নেয়। অস্ত্র
এবং গ্রেনেডগুলো গীটারের ব্যাগে সুন্দরভাবে প্যাক করে ঢাকায় ফেরার জন্য একটা
এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে। এরপর ওষুধের দোকান থেকে স্যালাইন ও অন্যান্য জিনিস কেনে
এবং কর্মচারীর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে একটা ভুয়া প্রেসক্রিপশন বানিয়ে নেয়। এরপর
নসু একটা সেলুনে ঢুকে মাথা ন্যাড়া করে এবং দাড়ি- গোঁফ ছেটে ফেলে। তার পুরো মুখের
মধ্যে শুধু ভুরুতে কিছু লোম দেখে হোয়াইট মামুনের হাসি পায়। নসুর কর্মকান্ডে সে অবাক
হলেও মুখে কিছু বলেনা। সে জানে নিশ্চয়ই এর পিছনে কোন কারণ আছে। নসু হোয়াইট মামুনকে
মাথার চুল এবং জুলফি ছোট করতে বলে। রাত সাড়ে আটটার দিকে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা
দেয়। হাওয়াই গীটারের ব্যাগটা বেডের নীচে ঠেলে দিয়ে নসু রোগীর বেডে শুয়ে পড়ে। হাতে
এমনভাবে স্যালাইনের নল লাগায় যেন তার শরীরে স্যালাইন চলছে। পিস্তলটা প্যান্টের
ভিতরে গুঁজে রাখে। হোয়াইট মামুন ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে।
এ্যাম্বুলেন্সের হুটার রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ঢাকার দিকে স্টার্ট করে কিন্তু
পটিয়াতে এসে তারা বাধাগ্রস্থ হয়। সামনে বেশ বড় জ্যাম। পুলিশ চেকপোস্ট বসেছে। ঢাকার
দিকে যাওয়া সব গাড়ীতে তল্লাশি চলছে। হোয়াইট মামুন ফিরে তাকায় নসুর দিকে। চার চোখের
মিলন হয় এবং তারা তাদের ভাষা বুঝে নেয়।
ড্রাইভার বেশ বিরক্ত হয়ে পথের অন্যান্য
গাড়ীকে পাশ কাটিয়ে আস্তে আস্তে এ্যাম্বুলেন্সটা পুলিশ চেকপোস্টের সামনে নেয়। দু’জন
পুলিশ কনস্টেবল কাছে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারা কোথা থেকে আসছে? কোথায় যাবে? বেডে
কে? রোগীর কি হয়েছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। হোয়াইট মামুন ঠাণ্ডা মাথায় তাদের সব প্রস্নের
উত্তর দেয়। সে জানায় তারা কয়েকদিন আগে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিল। আজ
বিকালে হঠাৎ ফুড পয়জনিং এর কারণে তার
বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তারের
পরামর্শে ভাল চিকিৎসার জন্য তাকে এখন ঢাকায় ফেরত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রোগীর শারীরিক অবস্থা
বেশী ভাল না, তার পরিবারের লোকজনদেরকে খবর দেয়া হয়েছে। রোগীর ব্যবস্থাপত্র এবং তারা
কক্সবাজারে যে হোটেলে ছিল তার ভাউচার ও অন্যান্য কাগজপত্র বের করে দেখায়। পুলিশ তাদের
ব্যাগ তল্লাশি করতে চায় কিন্তু রোগীর ক্রমাগত চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে ক্লিয়ার
সিগন্যাল দিয়ে এ্যাম্বুলেন্সটাকে সাইড কেটে বেরিয়ে যেতে বলে। কিছুটা এগোনোর পর
তাদের যে গাড়ীতে ঢাকায় ফেরার কথা ছিল সেটাকে তারা রাস্তার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায়
দেখতে পায়। পুলিশ লাগেজ বক্স থেকে যাত্রীদের সব মালপত্র নীচে নামিয়ে
প্রতিটি ব্যাগ পরীক্ষা করছে। সবাই যাত্রার অযাচিত বিলম্বের কারণে বেশ বিরক্ত
কিন্তু তাদের চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই। পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। ব্যাকভিউ
মিরর দিয়ে হোয়াইট মামুন পিছনে নসুর দিকে তাকায়। নসুর প্রতি শ্রদ্ধায় তার ঘাড় নুয়ে
পড়তে চায়। সে একারণেই পাঙ্খা নসুকে এত ভালবাসে। কি বুদ্ধিমান আর
স্মার্ট সে! তার সঙ্গে কাজ করার
মজাই আলাদা। ফাঁকা হাইওয়ে ধরে এ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশে হুহু করে এগিয়ে চলে। কাকডাকা
ভোরে যাত্রাবাড়ী পৌঁছে তারা এ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়। নসু স্যালাইনের নল খুলে গীটারের
ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। হোয়াইট মামুন ভাড়া মিটিয়ে নসুর
চলার গতির সঙ্গে তাল মেলায়। এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের
যাওয়ার পথের দিকে।
চিৎ হ’য়ে শূয়ে আছে টেবিলের ‘পরে ।
রৌদ্র
করজ্জল সেই দিনটা নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসুর জন্য খুবই
গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দিনটা তার জন্য একই সঙ্গে ভাগ্য গড়ার কিংবা ধ্বংসের দিন। লীডারের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সেদিনই
কালাবাবুকে আদালতে নেয়া হবে এবং কোন পথে আসামীকে আদালতে নেয়া হবে তাও সোর্সের
মাধ্যমে স্বয়ং ড্রাইভারের কাছ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। পূর্বের প্ল্যান
অনুযায়ী নসু জেলখানার গেট থেকে শুরু করে সাভার বাজার পর্যন্ত পথের বিভিন্ন স্থানে
ওয়াচম্যান বসিয়ে দেয়। তারা প্রিজন ভ্যান এবং পুলিশ এস্কর্টের মুভমেন্টের ব্যাপারে আগে
থেকে ফোন করে আপডেট দিবে। নসু ভিতরে ভিতরে খুবই রোমাঞ্চিত হয়ে আছে কিন্তু মুখে তা
প্রকাশ করে না। অনেক রকমের অজানা আশঙ্কা তার মনের ভিতরে উঁকি দিয়ে যায়। সে জানে এ অপারেশনে ব্যর্থ
হওয়া যাবেনা। আর যদি সে ব্যর্থ হয় তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ রকমের যা হয়ত সে
কল্পনাও করতে পারেনা। তা ভাবতে গেলে শরীরটা শুধু শিউড়ে ওঠে। তাই মাথা থেকে জোর করে সব দুশ্চিন্তা
ঝেড়ে ফেলে সে তার কাজে মন দেয়। এত দীর্ঘ প্রস্তুতির পর সে ব্যর্থ হতে পারেনা। একদিন
যেভাবে সে আর লীডার অপারেশন প্ল্যান করেছিল সেভাবেই সে অস্ত্র গোলাবারুদসহ তার দল
নিয়ে জ্বালেশ্বর রেডিও কলোনি এলাকায় অপেক্ষা করতে থাকে। নসুর হাতে কক্সবাজার থেকে
কেনা সেই গীটারের ব্যাগ আর একটা চটের ব্যাগ নিয়ে হোয়াইট মামুন তার পাশে বসে আছে।
তার চটের ব্যাগ থেকে কচি লাউএর ডগা উঁকি মারছে। যেন এই মাত্র বাজার থেকে সব্জি
কিনে বাসায় ফেরার পথে দু’বন্ধুর দেখা হয়েছে। যেন তারা গাছের ছায়ায় বসে গভীর আড্ডায়
ব্যস্ত। নসুর ব্যাগে একে-৪৭এর বাট ফোল্ডিং করে রাখা,সঙ্গে কয়েকটা লোডেড ম্যাগাজিন। হোয়াইট মামুনের চটের ব্যাগে আরজেস গ্রেনেডগুলো রাখা আছে।
সময় হলে ছেলেদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। বর্তমানে
তাদের একেকজন একেকবেশে অপেক্ষা করছে। কেউ বাদামওয়ালা সেজে বসে
আছে, আবার কেউবা বাদামওয়ালার পাশে অলস ভাবে বসে বাদামের খোসা ছিলছে। একজন অদূরে রাস্তার
পাশে একটা দেড়টন কাভার্ড ভ্যানে হেলান দিয়ে কানের ময়লা পরিষ্কারে ব্যস্ত,যেন তার আজ
কাজে যাওয়ার কোন তাড়া নেই! আরেকজন রেন্ট্রি গাছের ছায়ার একটা মোটর সাইকেলে বসে একটু
পরপর আয়নায় তাকিয়ে চুল ঠিক করছে বা আঙ্গুলের নখ দিয়ে মুখের ব্রণ খুচিয়ে চলছে। দূরে
তাদের আরেকটা গ্রুপ কোত্থেকে ক্যারাম বোর্ড জোগাড় করে আড্ডাবাজ যুবকদের মত চুটিয়ে
আড্ডা মারছে অথবা ক্যারাম খেলছে। আসলে বিভিন্ন বেশে ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে তারা সবাই
নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়ে এ্যাকশনের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা অবশ্য
জানেনা আজকের সাবজেক্টটা কে। জানলে হয়ত
তাদের অনেকেই এই অপারেশনে অংশগ্রহণ না করে পালিয়ে যেত। তবে
ভিতরে ভিতরে তারা সবাই যে উত্তেজিত হয়ে আছে তা বেশ বোঝা যায়। বারুদ,রক্তের
নেশা আর তাতানো রোদ্দুর তপ্ত করে রাখে তাদের।
ল্যাংড়া
মনিরের সঙ্গে নসুর হঠাৎ বেশী ঘনিষ্ঠতা শুরু থেকেই কালাবাবুকে বেশ সন্দিগ্ধ করে
তোলে। তাই যেদিন নসু সেফ হাউজ ছেড়ে ঢাকায় এসে তার তৎপরতা শুরু করে কালাবাবু সেদিন
থেকেই তার পিছনে চর লাগিয়ে দেয়। ল্যাংড়া মনিরের ঘনিষ্ঠ লোকজনই কালাবাবুর কাছে
অর্থের বিনিময়ে তথ্য পাচার করে। নসুর প্রতিটি মুভমেন্ট সে তার নজরে রাখে এমনকি
বান্দরবান থেকে অস্ত্রপাতি সংগ্রহ করা পর্যন্ত। সে অবশ্য নসুকে
অস্ত্রসহ সেখানেই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু সে অলৌকিকভাবে তার
পাতানো জাল ফস্কে বেড়িয়ে যায়। তারা বান্দরবান থেকে ঢাকায় ফেরার পর কালাবাবু অনেক
টাকার বিনিময়ে হোয়াইট মামুনকে কিনে ফেলে। এরপর থেকে তার বাকী কাজ খুব সহজ হয়ে যায়।
হোয়াইট মামুনও আসলে মনে মনে এমন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সে জানত নসু কোনদিনই
কালাবাবুর সঙ্গে ক্ষমতা বা বুদ্ধিতে পেড়ে উঠবে না। অথচ
নসুর উচ্চাশা পূরণ করতে যেয়ে শুধুশুধুই
তাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে। তার চেয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো টাকার অফার পেয়ে গোপনে কালাবাবুর
দলে ভিড়ে যাওয়াই উত্তম বলে সে বিবেচনা করে। কালাবাবুর নির্দেশে সে নসুর সঙ্গে বরাবরের
মত মিশে থাকে আর সুযোগ পেলেই নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন করে তথ্য জোগাতে থাকে। এভাবেই
পাঙ্খা নসুর প্ল্যানের সবকিছুই কালাবাবুর নখদর্পণে থাকে। সে জেলে
বসে সন্তর্পণে নসুকে বড়শিতে গাঁথার জন্য ছক কষতে থাকে। সে জানে সব কিছুই তার প্ল্যান অনুযায়ীই হবে কিন্তু পুলিশ তার টিকিটিও ছুঁতে পারবেনা। সে
জাল বুনে শিকারি মাকড়শার মতো অপেক্ষা করতে থাকে আর পাঙ্খা নসুকে তার প্ল্যান
অনুযায়ী এগিয়ে যেতে দেয়।
সেদিন প্রিজন ভ্যানে ওঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে
কালাবাবু অসুস্থ হওয়ার ভান করে। ডাক্তারের মতে তার মাইল্ড কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট হয়েছিল। তাই তাকে সেদিন কোর্টে হাজিরা দেয়ার জন্য নেয়া হয়না।
ডাক্তার এর বিনিময়ে বুঝে পায় পাঁচশত টাকার একটা বান্ডিল। জেল কর্তৃপক্ষ একেবারে
শেষ মুহুর্তে এই সিদ্ধান্ত নেয়ায় সেটা কোনভাবেই নসুর পক্ষে জানা সম্ভব হয়না। জেলগেটের
কাছে অপেক্ষারত নসুর ওয়াচম্যান তখন প্রকৃতির ডাকে একটু দূরে যাওয়ায় তার পক্ষেও
বিষয়টা আঁচ করা সম্ভব হয়না। সে ধরেই নেয় যে কালাবাবু প্রিজন ভ্যানের ভিতরেই আছে
এবং সে হিসাবেই সে নসুকে মোবাইলে জানায়। কালাবাবুকে ছাড়াই প্রিজনভ্যান সামনে-পিছনে
পুলিশের এস্কর্ট পিকআপসহ আদালত ভবনের উদ্দেশে মুভ করে। প্রিজন
ভ্যান নবীনগর পার হয়ে বিশ মাইলের কাছাকাছি পৌঁছামাত্র ওয়াচম্যান মোবাইলে কনভয়ের
অবস্থান জানায়। হোয়াইট মামুন দ্রুত সবার মাঝে গ্রেনেডগুলো ভাগ করে দেয়। নসুর মধ্যে
একই সঙ্গে একধরনের অস্থিরতা আর হৃদকম্পন শুরু হয়। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সে দীর্ঘ
প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। একসময়
দূর থেকে ঘন নীল রঙের প্রিজন ভ্যানের দেখা মেলে। সেটা যেন কোন এক প্রাগৈতিহাসিক
শ্বাপদের মত ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। বিপিএটিসি-রেডিও সেন্টার পার হয়ে সেটা রেডিও
কলোনি মডেল স্কুলের কাছাকাছি এসে পৌঁছালে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাভার্ড ভ্যান
রাস্তার পাশ থেকে ছুটে এসে আড়াআড়িভাবে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ানো মাত্র মোটর সাইকেল
আরোহী সোজা মোটর সাইকেল চালিয়ে এসে সেটাতে জোরে ধাক্কা মারে। সঙ্গে সঙ্গেই কাভার্ড
ভ্যানের ড্রাইভার আর হেল্পার গাড়ী থেকে নেমে মোটর সাইকেল আরোহীর সঙ্গে তর্কে লিপ্ত
হয়। সামনের রাস্তা ব্লক হয়ে যাওয়াতে প্রিজন ভ্যানের সামনে থাকা এস্কর্ট পিকআপের
ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে ঘন ঘন হর্ন বাজাতে থাকে কিন্তু তাতে কাভার্ড ভ্যানের ড্রাইভার
বা হেল্পারের যেন বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা তাদের ঝগড়া চালিয়ে যেতে থাকে
এবং একপর্যায়ে মোটর সাইকেল আরোহীর সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হয়। এ
পর্যায়ে এস্কর্ট পিকআপ থেকে কর্তব্যরত সাব-ইন্সপেক্টর নেমে এসে মারামারি থামিয়ে
রাস্তা ক্লিয়ার করাতে উদ্যত হয়। পুলিশের প্রিজন বাহী পুরো কনভয় তখন রাস্তায় দাড়িয়ে
গেছে আর প্রিজন ভ্যানের উঁচু শিকবদ্ধ জানালা থেকে ভিতরের উৎসুক কয়েদীরা বাইরে
তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেস্টা করছে। ঠিক এ মুহূর্তটুকুর অপেক্ষাতেই নসু অনেকগুলো
নির্ঘুম রাত পরিকল্পনার জাল বুনে কাটিয়েছে।
কাভার্ড ভ্যানের হেল্পার হঠাৎ ৪৫
ডিগ্রী কোনে ঘুরে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে দাড়িয়ে থাকা সাব-ইন্সপেক্টরের বুক বরাবর গুলি
করে। মুহূর্তেই ঘটে যায় দেশের ক্রাইম জগতের সবচেয়ে আলোচিত ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা।
যা পরে অনেকদিন পর্যন্ত দেশ সেরা দৈনিক পত্রিকাগুলোর হেডলাইন দখল করে রেখেছিল। এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা
দেশের অপরাধ জগতে এর আগে কখনও ঘটেনি। এসব ঘটনা এতদিন শুধু হলিউডের ক্রাইম থ্রিলার মুভিগুলোতেই
দেখা যেত। পিস্তলের গুলি পাক্ খেতে খেতে পুলিশ অফিসারের বুক ভেদ
করে পীঠে বড় স্বাক্ষর রেখে দূরে কোথাও হারিয়ে যায়। মোচড় দিয়ে সে রাস্তায় পড়ে এবং কিছু
বলার আগেই তার প্রাণ বায়ু বেড়িয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় এস্কর্ট পিকআপের ট্রেইল বোটে আসীন
প্রহরীরা হতভম্ব হয়ে যায়। তারা তাদের
সে প্রাথমিক হতবিহ্বল অবস্থা কাটিয়ে সঙ্গে থাকা চাইনিজ রাইফেল লোড করে ফায়ার করতে
উদ্যত হলে নসুর হাতের একে-৪৭ থেকে একপশলা গুলি এসে ভেদ করে তাদের শরীরে, ভ্যানের
এবং পিক আপের গায়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজেদের আসনেই হেলে পড়ে থাকে তাদের কেউ কেউ। ড্রাইভার
সহ দু’একজন অবশ্য পালাতে সক্ষম হয়। পিছনের এস্কর্ট পিকআপ সজোরে একটা বাঁক নিয়ে
সামনে এসে দাঁড়ান মাত্র পিকআপের প্রহরীরা সন্ত্রাসীদের দিকে লক্ষ্য করে ফায়ার করে
কিন্তু আচমকাই গ্রেনেডের হাজারো স্প্লিন্টার এসে ভেদ করে তাদের সমস্ত অঙ্গ
প্রত্যঙ্গ। কেউ কেউ মুখ থুবড়ে সেখানেই পড়ে যায়।
রক্তে ভেসে যায় পুরো রাজপথ। সন্ত্রাসীদের
কয়েকজন আহত এবং দু’একজন রাস্তার ওপরে বেকায়দায় মরে পড়ে থাকে। পুরো ঘটনাস্থল জুড়ে
রক্তের হাজারো ধারা রঞ্জিত করে দেয় কালো রাজপথ। গুলির আঘাত আর গ্রেনেডের
স্প্লিন্টার ক্ষত বিক্ষত করে রাখে পীচের কালো আস্তর,আশেপাশের গাছের ডাল-পালা আর
প্রিজন কনভয়ের গাড়ীগুলো। চারদিকের বাতাসে বারুদের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আর মানুষের
আর্ত চীৎকার। বাঁচার আশায় তীক্ষ্ণ করুণ আহাজারি আর্দ্র করে রাখে পুরো পরিবেশ। নসু
সঙ্গে কয়েকজনকে নিয়ে দৌড়ে প্রিজন ভ্যানের পিছনের ভারী তালা ভেঙে কালাবাবুকে খোঁজে।
কিন্তু নাহ্,কালাবাবু সেখানে নাই। প্রিজন
ভ্যানের ভিতরে এখানে সেখানে পড়ে আছে নাম না জানা হতভাগ্য কয়েকজন কয়েদীর লাশ। কেউ কেউ বাঁচার আশায় আকুতি
মিনতি করছে। হয়ত ভেবেছে তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হবে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে সদ্য
গোঁফ ওঠা এক কিশোর। নসুর লোকজন উপুড় হয়ে পড়ে থাকা লাশের সারি উল্টিয়ে দেখে কিন্তু
সেখানে কালাবাবুর নাম-গন্ধ পর্যন্ত নেই। সে যেন হাওয়ায় মিইয়ে গেছে। কিন্তু তা কি
করে সম্ভব! প্রিজন ভ্যানের তালাটা তো সে
নিজেই ভেঙ্গেছে আর ভ্যানের জানালা গ’লে পালিয়ে যাওয়া কোন ভাবেই সম্ভব না। তবেকি
কালাবাবু প্রিজন ভ্যানের মধ্যে হাজিরই ছিলনা। কিন্তু তা’ কি করে সম্ভব! নসু
কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যায়। এসময়েই ল্যাংড়া মনিরের কাছ থেকে নসুর কাছে ফোন আসে। তার
সোর্স এইমাত্র জানিয়েছে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে কালাবাবুকে সেদিন আদালতে নেয়া
হয়নি। অপারেশন ক্যান্সেল এবং সে আর এসবের মধ্যে নেই। নসু যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব
কিছু গুটিয়ে ফেরত চলে আসে। কালাবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। সে কালাবাবুকে
বুঝিয়ে একটা আপোষরফা করে নিবে,কোন সমস্যা হবেনা। কিন্তু এতজন পুলিশ সদস্যের লাশ!এর
কি হবে? রাষ্ট্র কি তাকে ক্ষমা করবে! একটা শীতল সরীসৃপ যেন হেটে যায় তার শিরদাড়া
বেয়ে। একরাশ ভয়ের কাল মেঘ এসে আচ্ছন্ন করে তাকে। ঘামতে থাকে সে। অন্যরা হতভম্ব হয়ে
তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা সবাই বুঝতে পারে বিপদ আসন্ন আর সেখান থেকে তাদের কারো
রেহাই নাই। তাদের এ পরিণতির জন্য তারা কেউ কেউ একে অপরকে দুষতে থাকে। মনের
মধ্যে কেউ যেন বলে ওঠে পালা নসু
...... পালা ... পালিয়ে যা তুই! এদিকে রাস্তার দু’দিকেই যাত্রীবাহী গাড়ীগুলো ক্রমান্বয়ে
ভিড় করতে থাকে। আশেপাশের লোকজন গোলাগুলির শব্দ থেমে যাওয়ায় ঘটনাস্থলে একে একে জড়ো
হতে থাকে। দূর থেকে পুলিশের টহল গাড়ীর তীক্ষ্ণ হুটারের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। হয়ত
গোলাগুলির শব্দ শুনে থানায় কেউ খবর দিয়েছে। নাহ্,আর এভাবে দাড়িয়ে থাকা নয়। যা
হবার তা হয়ে গেছে, এখন পালিয়ে বাঁচতে হবে। নসু হঠাৎই বেঁচে থাকার তীব্র তাগিদ
অনুভব করে। গ্রুপের সবাইকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশের যে কোন প্রান্তে
পালিয়ে যেতে বলে সে নিজেও হোয়াইট মামুনকে সঙ্গে নিয়ে মোটর সাইকেলে চেপে বসে। কিন্তু
সে জানেনা সে কোথায় পালিয়ে যাবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেফ হাউজ দলের অনেকেই চেনে।
তাদের কারো মাধ্যমে পুলিশের পক্ষে সেটা হয়ত সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এ
মুহূর্তে যেটা প্রয়োজন যতটা দ্রুত সম্ভব ঢাকা থেকে সরে পড়া। হোয়াইট
মামুনের সিদ্ধান্তে তারা মোটর সাইকেলে কুলিয়ারচরের দিকে রওয়ানা দেয়। সেখানে হোয়াইট
মামুনের পরিচিত একটা হাইড আউট আছে যেখানে প্রয়োজনে বেশ কয়েক দিন লুকিয়ে থাকা যাবে।
বিরুলিয়া-জিরাবো
হয়ে তারা প্রথমে আশুলিয়া হাইওয়েতে ওঠে। এরপর
টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক ধরে সোজা মোটর সাইকেল চালিয়ে তারা ঘোড়াশাল পৌঁছে
রিফুয়েলিং করার জন্য একটা ফিলিং স্টেশনের পাশে থামে। সেখানে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি
করে চা নাস্তা খেয়ে নেয়। কিন্তু মানসিক অবসাদ আর টেনশনের কারণে নসুর গলা দিয়ে পেটে
কিছু নামতে চায়না। রিফুয়েলিং শেষে প্রস্রাব করার অজুহাতে হোয়াইট মামুন টয়লেটে ঢুকে
কালাবাবুকে ফোনে তাদের অবস্থান এবং তারা কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করেছে তা জানিয়ে দেয়।
এরপর ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে হয়ে বিকেল নাগাদ তারা কুলিয়ারচর পৌঁছে। পাঙ্খা নসু আগের প্ল্যান পাল্টে অর্থাৎ হোয়াইট মামুনের
খোঁজ দেয়া হাইড আউটে না যেয়ে আপাতত সেখানেই একটা সস্তা বোর্ডিং হাউজে ছদ্ম পরিচয়ে কয়েকদিন
থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। নসু সেখান থেকে ঢাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তিতে
প্ল্যান ঠিক করবে বলে হোয়াইট মামুনকে জানায়। এক সময় হয়ত পরিস্থিতি কিছুটা
স্বাভাবিক হলে সে সীমান্ত পার হয়ে আবারো কয়েক বছরের জন্য ওপারে চলে যাবে। হোয়াইট
মামুনও তার সঙ্গে যেতে চায়। সে হ্যা বা না কিছু বলে না। কুলিয়ারচর রেলস্টেশনের
কাছেই দারিয়াকান্দি রোডে নাজমা বোর্ডিং এর বোর্ডারের খাতায় তারা নাম ওঠায়। ভুল নাম
ঠিকানায় তারা পেশা হিসাবে মাছের ব্যবসা উল্লেখ করে। সেখানে তাদের মত আরও অনেক মাছ
ব্যবসায়ী বোর্ডার থাকে। সন্ধ্যায় সিগারেট কেনার জন্য রুম থেকে বের হয়ে হোয়াইট মামুন ফোনে কালাবাবুকে
তাদের বোর্ডিং হাউজের নাম ও অবস্থান জানিয়ে দেয়। এরপর কয়েকটা রুটি আর কলা কিনে সে রুমে ফেরে। সেগুলো পেটে চালান করে দিয়ে সে গোসল সেরে
মাথায় একটা বালিশ চেপে সোফায় শুয়ে পড়ে। রাতে বাইরে কোথাও খেতে যাবেনা বলে নসুকে জানায়। এতটা পথ টানা মোটর
সাইকেল চালিয়ে সে এখন ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছে বলে নসুকে জানায়। কিন্তু তার আসল
প্ল্যান হল নসু রাতের খাবার
খেতে বাইরে যাওয়া মাত্রই সে
রুম থেকে সট্কে পড়বে।
অগত্যা নসু একাই স্টেশনের পথের ওপরে একটা রেস্তোরাতে
রাতের খাবার খেতে যায়। খাওয়া শেষে ল্যাংড়া মনিরকে মোবাইলে ফোন দেয় কিন্তু কেউ সে
ফোন রিসিভ করেনা। পর পর কয়েকবার রিং করলে এক সময়
মোবাইল ফোনটা বন্ধ পাওয়া যায়।
মোবাইল নাম্বারটা এরপর আর কখনও খোলেনি। ওটা আসলে স্তব্ধ হয়ে যায় চিরকালের মত আর
তার মালিক তখন কালশি রোডের মাথায় বিদ্যুৎ পোলের সঙ্গে ঝুলছে। এমনিতে কেউ জানেনা সেটা কাদের কাজ তবে নসুর মত যারা
আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা তারা ঠিকই বুঝতে পারে কিন্তু কেউই ভয়ে মুখ খোলেনা। ফোনে
লীডারের কোন সাড়া না পেয়ে খানিকটা চিন্তিত মুখে নসু বোর্ডিং হাউজে ফেরে। সেখানে রুমের
দরজা হা করে খোলা। হোয়াইট মামুন সোফায় আধ শোয়া ভঙ্গীতে পড়ে আছে আর তার মাথার বালিশ
রক্তে আধ ভেজা। বুকের ক্ষত স্থান থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তার দৃষ্টি স্থির
সিলিঙের দিকে। অভ্যাস বশেই তৎক্ষণাৎ জিন্সে গুঁজে রাখা পিস্তল টান মেরে ডান হাতে
নেয় কিন্তু তার আগেই সে করোটির পিছনে ধাতব নলের স্পর্শ অনুভব করে। মুহূর্তেই স্থির
হয়ে যায় পাঙ্খা নসু। হাত দু’টো হঠাৎ অসহায় ভাবে ঝুলে পড়ে কোমরের দু’পাশে। কিছু
করার থাকেনা। পিস্তলটা খসে পড়ে হাত থেকে। মেঝেতে ধুপ্ করে একটা ধাতব শব্দ হয়।
সময়টা হঠাৎ যেন দীর্ঘতর হতে থাকে। সেকেন্ডের কাঁটা যেন মিনিটের কাঁটায় পরিণত হয়ে
যায়। নসু তার এ হতভাগ্য পরিণতি মেনে নেয়। সে ভালকরেই জানত তার এই অপারেশনে ব্যর্থ
হওয়া মানে জীবন দিয়ে তার প্রতিদান দেয়া। একে একে বিগত দিনের সব স্মৃতি চোখের সামনে
এসে ভিড় করে বায়স্কোপের ফিতার মত। ছোটবেলা। ভাইবোনদের সঙ্গে একসঙ্গে রূপনগর বস্তিতে
বেড়ে ওঠা। এরপর একে একে সব কিছু। বাবার কথা মনেপরে খুব। তৃপ্তি পায় নিজ হাতে পিতৃ
হত্যার প্রতিশোধ নিতে পেরেছে বলে। আর সে
প্রতিশোধ নসু নিয়েছে খুব নিষ্ঠুর ভাবে। মনের সব ঝাল সে মিটিয়েছিল আজগরের
মৃতদেহের ওপরে। মনেপরে মায়ের কথা। তার মা জুলেখা বেওয়া কি কখনও জানতে পারবে বা
খুঁজে পাবে কি তার মৃত দেহ! মা এখন কি করছে তা নসুর খুব জানতে ইচ্ছে করে। তাকে মাস
শেষে এখন কে টাকা পাঠাবে! মা হয়ত মাস শেষে ঠিকই তার পাঠান টাকার অপেক্ষায় বসে থাকবে।
একদিন হয়ত জানতে পারবে তার ছেলে বেঁচে নেই। তখন কি সে কাঁদবে তার জন্য! তার মনেপরে
হেনার সঙ্গে তার সব স্মৃতি। প্রথম পরিচয়, তারপর প্রেম আর সবশেষে তার সঙ্গে হেনার বিশ্বাসঘাতকতা। মনেপরে যায় টুকরো টুকরো সব
স্মৃতি। সে নিজেকে শক্ত করে নেয়, সঁপে দেয় নিজেকে নিয়তির কাছে। সাইলেন্সার লাগান পিস্তলে
ধুপ্ করে একটা শব্দ হয়। নসু ঢলে পড়ে মেঝের ওপর। গুলিটা ওর করোটি ভেদ করে পাশের দেয়ালে বিঁধে। ঝুর ঝুর
করে খসে পড়ে জীর্ণ পলেস্তরা। পাঙ্খা নসুর আত্মা পাঙ্খা হয়ে ততোক্ষণে কোথায়
উড়ে যায়, কেউ জানেনা।
পরদিন সকালে ভৈরব থেকে পুলিশ এসে ডেড বডি
দু’টো নিয়ে যায়। মর্গের লাশ কাটা টেবিলে পাঙ্খা নসুর পাঙ্খাহীন লাশ চিৎ হয়ে পড়ে
থাকে পোস্ট মরটেমের অপেক্ষায়।
(এটি একটি ক্রাইম থ্রিলার। এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র এবং বর্নিত ঘটনা বা স্থান সবই কাল্পনিক। চারদেয়ালের মাঝে বসে লেখা এই গল্পের সঙ্গে বাস্তবের কোন কিছুর মিল খোঁজা হবে নিতান্তই অপচেষ্টা মাত্র)
পোস্ট ভিউঃ 28