সময়টা সম্ভবত নভেম্বরের মাঝামাঝি হবে। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন তখনো বেশ তুঙ্গে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন অজুহাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বন্ধ থাকছে আর বরাবরের মত তাদের কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হল খালি করে দিতে হচ্ছে।
সেবার এমনি এক রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝে গ্রামের বাড়ীতে ছুটি কাটিয়ে সোহেল আর পল্লব
ঢাকায় ফিরছিল। আগেই এক গল্পে যেমনটা বলেছিলাম তারা দু’জনই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এবং সূর্যসেন হলের একই রুমে থাকে। পল্লব দিনাজপুর আর সোহেল রংপুর
রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছে। একতা এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেন। রংপুর
থেকে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ছেড়ে
ঢাকায় পৌঁছে ভোর বেলা। ফুলছড়ি ঘাটে পৌঁছে স্টিমারে প্রমত্তা যমুনা নদী পার হতে হয়।
এরপর বাহাদুরাবাদ ঘাটে অপেক্ষমান ট্রেনে উঠলে ইসলামপুর-ময়মনসিংহ-টঙ্গী হয়ে তবে ঢাকা। ট্রেনে
ওঠার পরপরই হিস্হিস্ শব্দে শামুকের খোলের মত স্টেশন ছেড়ে ট্রেন অন্ধকার সাঁতরে ছুটে
চলে রাজধানীর দিকে। গৃহত্যাগী জোসনায় কাছের বা দূরের গ্রামগুলো কেমন কাল আঁকিবুঁকির
মত লাগে। রেললাইনের ধারে কানসোনা-ভাটিগাছের ঝোপে হাজারটা জোনাকি
পোকা ঝিকিমিকি জ্বলে আর নেভে। ছুটে চলে সে আলোর ফুলঝুরি ঝোপ থেকে ঝোপে। ট্রেনের সঙ্গে
পাল্লা দিতে যেয়ে গতির কাছে তারা হার মানে। হারিয়ে যায় হয়ত ঘন শটির বনে। তাদের
ছন্দময় জ্বলা নেভা দেখতে বেশ ভাললাগে। তার মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে যায়। এই একইপথে
একবার সে যখন ঢাকা থেকে ফিরছিল তখন লোপার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। কি সুন্দর আর আনন্দময়
ছিল সে ভ্রমণ। অথচ আজ সে একাকী এবং নিঃসঙ্গ। সোহেল তারই মত নিঃসঙ্গ চাঁদটার দিকে
চেয়ে থাকে। আচ্ছা লোপাও কি এই মুহুর্তে চেয়ে আছে ঐ নিঃসঙ্গ চাঁদটার দিকে! কাউনিয়া
স্টেশন ছেড়ে যেতেই ট্রেনের ক্যাটারিং সার্ভিস এসে খোঁজ নেয় রাতে কিছু খাবে কিনা?
সোহেল কিছু খাবেনা জানিয়ে শালটা শরীরে ভাল করে পেচিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কুম্ভকর্ণের সেই
ঘুম ভাঙ্গে ফুলছড়ি ঘাটে পৌঁছানোর পরে। ততোক্ষণে ট্রেনের পদ্যময় পথচলা থেমে গেছে।
সে জায়গায় তখন লাল ফতুয়াধারী কুলিদের হাঁক ডাক। সোহেল
তাড়াতাড়ি ব্যাগটা গুছিয়ে নেমে পড়ে তার বগি থেকে। পল্লবও তার বগি থেকে নেমে সামনে
এগিয়ে এলে তারা এক সঙ্গে নদীর ঘাটে রাজহাঁসের মত অপেক্ষমান সাদা রঙের স্টিমারের
দিকে ছুটে চলে। সাদা জোসনায় ওটা আরও ধবধবে সাদা লাগছে।
স্টিমারে উঠে দোতালার কেবিনে সীট খুজে নিয়ে
তারা বসে পড়ে। ঘড়িতে তখন
এগারোটার কাঁটা ছুঁইছুঁই। শীতের রাতে এগারোটা মানে বেশ গভীর রাত। স্টিমারের পানি কেটে সামনে এগোনোর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ
ছাড়া চারদিকে একদম সুনসান নীরবতা। বাইরে সফেদ জোসনার বানভাসি। কালচে নীল আকাশের ক্যানভাসে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ
জ্বলজ্বল করছে। সোহেল জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। স্নিগ্ধ জোসনায় যমুনার ঘোলা
জল চিক্চিক্ করছে চপলা ষোড়শীর গালের
স্বেদবিন্দুর মত। ক্যান্টিনে রাতের খাওয়া সেরে জোসনা দেখার জন্য তারা দু’বন্ধু স্টিমারের একদম উপরের
ডেকে যায়। সারেং এর কেবিনের সামনের ফাঁকা জায়গাটায় বসে পড়ে তারা। চন্দ্রভূক
দু’যুবক। চারদিকে দুধের সরের মত আধা ফিকে কুয়াশা। তাদের মাথার ওপর
দিয়ে সার্চ লাইটের তীব্র আলো ফেলে স্টিমার
ভীম গর্জনে এগিয়ে যায় রাতের নিস্তব্ধতাকে খান্খান করে। পুরো
আকাশটা যেন উল্টানো মদের পেয়ালা! আর সেখানে সাদা বুদবুদের মত অযুত তারার মিছিল। কেমন
মাতাল করে রাখে তাদের! চাঁদ চুইয়ে ঝরে পড়া সোমরস পানে তারা মত্ত। নিঃশেষ করে পেতে চায়
পেয়ালার শেষ বিন্দুটুকুও। ফিনফিনে বাতাসেও উতলা করা মদিরা হাতছানি। যেন
মহুয়ার বনে সর্বনাশী বান ডেকেছে। দুগ্ধফেনানিভ ছায়াপথ আর তার নীচে ধবল মেঘের সারি
কেমন যেন ছাড়া ছাড়া অগোছালো। মাঝে মাঝে মেঘের জীর্ণ
চাদরে চাঁদ হারিয়ে যায়। জোসনা তাই ম্লান হয়ে পড়ে, কিন্তু তা মাত্র কয়েক মুহূর্তের
জন্য,পরক্ষনেই জোসনা দ্বিগুণ উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত করে পুরো চরাচর। চাঁদের সে আলোয়
জলের ঝিকিমিকি দেখে মনে হয় লক্ষ আকাশ প্রদীপ। সৃষ্টিছাড়া উল্লাসে পানিতে ভাসিয়েছে কোন
কুলবধূ অজানা আকাঙ্ক্ষায়। মাখো মাখো জোসনায় ছেঁড়া মেঘের আঁচল আর ধবধবে কুয়াশার
চাদর পুরো পরিবেশটাকে কেমন যেন আধিভৌতিক কিংবা অশরীরী করে রাখে।
সক্রেটিস সত্য জেনে পেয়ালায় হেমলক পান করেছিল আর তারা দু’জন পান করে প্রকৃতির অমৃত
সুধা। সারেং টর্চ মেরে তাদেরকে দেখে, ঠাণ্ডায় খামাখা বসে না থেকে নিচে কেবিনে ফিরে
যেতে বলে কিন্তু তারা অযাচিত উপদেশ গায়ে মাখে না। সোহেল বরং পল্লবকে অনুরোধ করে
একটা গান গাওয়ার জন্য। ওর গানের গলাটা ভারী মিস্টি। পল্লব তার ভরাট কণ্ঠে গান
ধরে...
খুব কাছা কাছি...
তুমি আমি আছি ...
নিঃশ্বাসে খুঁজে পাই
বিশ্বাসের ছোঁয়া।
তোমার আমার প্রেম
বিশুদ্ধ সরোবরে ...
অবগাহনে ধোয়া ...
পল্লবের গানের সে সুর
ঢেউয়ের মাথায় ভেসে ছড়িয়ে যায় চারদিক। জলের অতলস্পর্শী ঘূর্ণির সাদা ফ্যানা ধরে সুরের সে
মূর্ছনা মোমের মত গলে পড়ে ভরা জোসনায়। সোহেল হাতের সিগারেটে ঘন টান দেয় আর গ্যালিলিয়ো
দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অসীমের দিকে। গান
শোনে। মনে পরে লোপার কথা। টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া লাগে বকুল মালার মত। সে যেন
এক নকশী কাঁথার মাঠ! যার প্রতিটি ফোঁড়ে অসংখ্য স্নেহ-ভালোবাসা আর বিয়োগ ব্যাথা
গেঁথে রয়েছে। তারা অন্য এক সোনামাখা দিনে এই একই আকাশের নীচে এরকমই এক স্টিমারে
কিছু মধুর সময় কাটিয়েছিল। অথচ লোপা আজ তার পাশে নেই। তার পাশে এখন শুধু সফেদ জোসনায়
প্রকৃতির সুন্দরের মাখামাখি আর লক্ষ তারার দীপাবলি। আর আছে পল্লবের দরদ মাখা কণ্ঠে
সুরের অমিয় ধারা। গানটা একসময় শেষ হয় কিন্তু তার রেশ লেগে থাকে আরও কিছুটা
সময়। সোহেলের অনুরোধে পল্লব পরপর আরও বেশ কয়েকটা গান গায়। টানা কয়েকটা গান গেয়ে চায়ের
তেষ্টা পায় পল্লবের। উঠে দাড়ায় সে, সোহেলকেও টানে। কিন্তু সোহেল তখন পুরোপুরি
চন্দ্রগ্রস্থ,ওঠানো যায়না তাকে। স্টিমারের ডেকে ফেভিকল লাগিয়ে প্রতিটি পল সে উপভোগ
করতে চায় হাভাতের মত। সে পল্লবকে অনুরোধ করে তার চা’টা কাউকে দিয়ে তার কাছে
পাঠিয়ে দিতে। পল্লব একাই চা খেতে নীচের ক্যান্টিনে যায় আর সোহেল তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে
জোসনা চোবানো আকাশের দিকে। পল্লবের যাওয়ার পথের দিকে ফিরে তাকানোর চেষ্টাও সে
করেনা।
সোহেলের ধ্যান ভাঙ্গে শীতে
জবুথবু এক বৃদ্ধের খন্খনে গলার আওয়াজে।
--বাবু চা খেতি চেয়েছিলেন!
তার দোআঁশলা বাংলা
উচ্চারন কৌতূহলী করে সোহেলকে কিন্তু শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে মুখ-শরীর সে এমনভাবে
চাদরে পেচিয়ে নিয়েছে যে মুখটা কিছুতেই ভালভাবে দেখা যায়না। সাঁওতাল বা মুন্ডা জাতির
কেউ হবে হয়ত। কয়েক হাত দূরেও তাকে কেমন ধোঁয়াটে লাগে।
--হুম্। ধন্যবাদ কস্ট
করে চা’টা আনার জন্য।
--ও কিছুক লয়কো বাবু।
কিন্তু চায়ের কাপটা
এগিয়ে দেয়ার পরেও লোকটা ঠায় দাড়িয়ে থাকায় সোহেল জিজ্ঞেস করে।
--কিছু বলবেন!
--নাহ্ বাবু। আপনে আরাম কোরে খান। হামি
খালি কাপ লিয়ে যাবো গো। বাবু
খোব জোসনা পছন্দ করে!
--নাহ্! এই একটু আধটু
আরকি। সোহেল লজ্জা পায়। আসলে শহরে তো বৈদ্যুতিক আলোর নীচে আজকাল আর জোসনাই খুজে
পাওয়া যায়না।
--হুম! সোত্তি কোতা বোলেছেন
বাবু। হামিও খোব জোসনা পছন্দ করে। জোসনা
রাতে হাড়িয়া খেইয়ে মাতাল
হোতাম গো বাবু। হামরা সান্তালরা সবাই মিলে তখন গান গাইতাম--
আম পাকা কালা রে মাদল পাকা,
তুহকে আকশিলা দিব রে মাদল
পাকা।
গানের সাথে আগুনের
চারদিক যুবক-যুবতীরা কোমরে হাত দেকে ঘোরে আর নাচে। ঢোল বাজে ঢুম্মা
ঢুম্মা ঢুম্মা ঢুম্মা। মাদলের রক্তে বান ডাকা শব্দে জেগে ওঠে পুরা সান্তাল পোল্লী।
কি সোন্দর দিন ছিল গো বাবু! বাচ্চারা চাঁদের আলোয় চাড়ী খেলে আর বুড়োরা মহুয়ার রস খেয়ে থেকে
থেকে গালি দেয়। ওসব দিন আর ফিরে আসবেক লয়কো! লোকটা আধেক বাংলা আর আধেক সাঁওতালী ভাষায় একটানা
কথাগুলো বলে একটু দম নেয়। সোহেলের তার কথাগুলো শুনতে বেশ মজা লাগে।
সোহেল চায়ের কাপে চুমুক
দিতে যেয়ে দেখে কাপের কিনারাটা একটু ভাঙ্গা। কাপটা ঘুড়িয়ে ভাল দিকটা মুখের কাছে নিয়ে
চায়ে চুমুক দেয়। কেমন বিস্বাদ আর
আঁশটে লাগে কিন্তু ক্যান্টিনে বোধহয় এরচেয়ে
ভাল কিছু পাওয়া যাবেনা।
--বাড়ী কোথায়? থাকেন
কৈ?
--একসোময় বলদিপুকুর ছিলোক
বটে। এখন কিছুই
লেইকো।
--ও আচ্ছা। আপনার নাম কি?
--গনেশ সোরেন। হামি
সান্তাল আছি।
-- দূরে দাড়িয়ে আছেন
কেন! এদিকে এসে বসেন,চা খেতে খেতে আপনার গল্প শুনি।
লোকটা একটু ফাঁকা জায়গা
রেখে সোহেলের পাশে বসে। তার শরীর থেকে পচা
ইলিশ মাছের মত কেমন একটা আঁশটে গন্ধ এসে সোহেলের নাকে ধাক্কা খায়। হয়ত ঠাণ্ডার
বাতিক থাকায় লোকটা অনেকদিন গোসল করেনি। নাকটা বিদঘুটে
গন্ধে একটু কুঁচকে গেলেও বিষয়টাকে সোহেল তেমন পাত্তা দেয়না। সে বরং তার সঙ্গে গল্প
চালিয়ে যায় আর লোকটাও তার অদ্ভুত বাংলা উচ্চারনে সমান তালে সোহেলের গল্পে সাড়া
দেয়। তার গল্প সোহেল খানিকটা শোনে আবার খানিকটা শোনেনা। সে আসলে তখন বানভাসি জোসনায়
মত্ত। তবে গনেশ সোরেনের কাছে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় শোনা গল্পটা অনেকটা এরকম—
উনিশশত একাত্তর সাল। চারদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের
ডামাডোল। আবাল বৃদ্ধ বনিতার অনেকেই সে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার
শপথ নিয়ে। অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে কেউ এতটুকুও কুণ্ঠাবোধ করছে না। রংপুর সেনানিবাস তখন আজকের মত এতটা বড় ছিলনা। উত্তরবঙ্গে
পাকিস্থানীদের প্রধান ঘাঁটি এই গ্যারিসনে তখন ২৩ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ছিল। সে
সময় সেনানিবাসের আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে শুরু করে শ্যামপুর,বলদি পুকুর, মিঠা পুকুর
পর্যন্ত এলাকাগুলোয় বাঙালীদের পাশাপাশি সাঁওতাল, ওঁরাও ইত্যাদি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর লোকজনও
বাস করত। জীবিকার তাগিদে তারা কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোটখাট প্রাণী এই যেমন
ইঁদুর, বেজী, খরগোশ ইত্যাদি শিকার করত। তাই বর্শা, তীর, ধনুক ইত্যাদি চালনায় তারা বেশ
দক্ষ আর নিপুণ ছিল। ২৩ মার্চে পাকিস্তানী আর্মি অফিসার লেঃ আব্বাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র
করে রংপুর শহরে তখন চরম উত্তেজনা। আর সে কারণে হিন্দু বিবেচনা করে সেনানিবাসের
আশেপাশের গ্রামগুলোতে পাকিস্থানী সেনার ভীষণ অত্যাচার চালায়। এসময়েই সাঁওতালদের কাছে
খবর আসে রংপুর গ্যারিসনের নিরাপত্তায় অল্প সংখ্যক ট্রুপ্স মোতায়েন রেখে বাকীদের
জেলার অন্যান্য এলাকায় গণ্ডগোল থামানর জন্য পাঠানো হয়েছে। এ খবর পেয়ে এলাকার সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বেশ উত্তেজিত হয়
এবং সাংঘাতিক কিছু করার অনুপ্রেরণা বোধ
করে। তাই প্রকৃতির সন্তান সহজ সরল মানুষগুলো হাতের লাঠি-সড়কি–দা-তীর–ধনুক যে যা
পেরেছে তাই নিয়ে ২৮ মার্চ সকাল এগারোটার দিকে রংপুর গ্যারিসন আক্রমণ করে। কিন্তু
তাদের সেনানিবাস আক্রমণ করার পরিকল্পনা গোপন চর মারফত পাকিস্থানীরা আগেই জেনে
যাওয়ায় তারা ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রস্তুত ছিল। আর তার ফলে সাঁওতালরা তাদের আদিম
অস্ত্র হাতে গ্যারিসন আক্রমণ করা মাত্রই পাশে বয়ে যাওয়া ঘাঘটের ঘোলা পানি রক্তিম
হয়ে যায় মেশিনগানের অজস্র গুলিতে। আধুনিক অস্ত্রের কাছে তাদের প্রাগৈতিহাসিক অস্ত্র সজ্জিত তেজদীপ্ত দেহাতি
শরীরগুলো ঢলে পড়ে কাটা কলাগাছের মত। নদীর পার বরাবর দীর্ঘ লাশের সারি পড়ে থাকে
সেভাবেই কাক-শেয়াল আর কুকুরের পেটে যাবে বলে। তাদের সেই আত্ম বলিদান স্মরণে রাখার
জন্য ক্যান্টনমেন্টের পেছনে সম্প্রতি স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠেছে। গনেশ সোরেন তার
বাপ-ভাইয়ের সঙ্গে সে যুদ্ধে গিয়েছিল তার সদ্য যৌবন পেরোনো শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে দেবার
জন্য। তা সে পেড়েছিল। মেশিনগানের একটা লং বার্স্ট ফায়ার তার পাকস্থলী ফুঁড়ে বেরিয়ে
গিয়েছিল। প্রায় দু’দিন পরে রাতের আঁধারে তার জাতির লোকেরা এসে যখন মৃতদেহ উদ্ধার
করে ততোক্ষণে অভুক্ত কাকের ঠোকরে এক চোখ মিলিয়ে গেছে। ঐ
অবস্থাতেই তারা ঘাঘটের পারে তাকে মাটি চাপা দিয়ে গাঁয়ে ফিরে যায়। যুদ্ধের
দাবানলে তার শাস্ত্রমতে শ্রাদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়ে তার আত্মা আজ
তাই অস্থিরভাবে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। ভরা জোসনায় মানুষকে ভয় দেখিয়ে মজা পায়। একটা
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে গনেশ সোরেনের বুক চিড়ে। কেমন ঘর্ঘর বিদঘুটে একটা শব্দ শোনা
যায় সেখানে। সোহেল তখনো উদাস হয়ে যমুনার বুকে জেগে ওঠা রুপালী চরের দিকে তাকিয়ে। জোসনার
আলোয় চরের সাদা বালি আরও সাদা দেখাচ্ছে। গণেশ সোরেনের গল্পে তাই তার বোধোদয় হয়না।
--বাবু খুব সাহসী আদমি
আছে! ভুতের গল্প শোনবেন? চা খেতে খেতে শোনতে ভালই লাগবেক গো বাবু!
গণেশ সোরেন ভুতের গল্প
শোনানোর বায়না ধরলে সোহেল ঘোরের মধ্যে থেকেই জবাব দেয়।
--হুম্ বলেন শুনি।
গনেশ সোরেন তার গল্প
বলা শুরু করে। তার ভাষ্যমতে গল্পটা সে শুনেছিল শ্রী
শশিভূষণ চৌধুরীর কাছ থেকে, সেও তার মত প্রেতযোনি প্রাপ্ত। গল্পটা
এরকম
ঘটনাটা দেশ স্বাধীনের বেশ আগে, আয়ুব খান
তখন ক্ষমতায়। এই ষাটের দশকের মাঝামাঝি যেকোনো একসময়ের হবে। রংপুর শহর তখনও এতটা ঘনবসতি পূর্ণ
হয়ে ওঠেনি। সরু আধাপাকা সড়ক শহরের বুক চিড়ে রেলস্টেশন থেকে সিও বাজারের দিকে
গিয়েছে। সেটাই মূলত প্রধান সড়ক আর সেটাকে সামনে রেখে তাই বেশ কিছু সরকারী ভবন গড়ে
উঠেছে। এর বাইরে পাকা দালান বলতে যা আছে তা হাতে গুণে রাখা যায়। বেশীর ভাগ বাড়িঘর
টিনের ছাদওয়ালা আধা পাকা অথবা বাঁশের তর্জার তৈরি। তর্জার ওপরে অবশ্য এঁটেল মাটির
প্রলেপ দিয়ে চুনকাম করা তাই ঘরগুলো কাঁচা না পাকা তা এমনিতে বোঝা যায়না। মোটরগাড়ি,সাইকেলের
পাশাপাশি গরু বা ঘোড়ার গাড়ী দখল করে রাখে শহরের রাজপথ। পৌরসভার গাধায় টানা পায়খানার
ময়লার গাড়িও চলে সে পথে। শহরের দালানকোঠা বা আধাপাকা টিনের দোকানঘরগুলো পেরোলে পৌরসভা
অফিসের উলটা দিকে ওরিয়েন্টাল সিনেমা হল, এরপর কিছুদূর গেলে লক্ষ্মী সিনেমা হল আর
টাউন হল মুখোমুখি দাড়িয়ে। পাবলিক লাইব্রেরীটাও সেখানে। এরপর পুলিশ লাইন পার হলে
বেশ অনেকটা জায়গা ফাঁকা। তারপর কাচারিবাজার এলাকা পার হলে রংপুর জেলা স্কুল আর
সিভিল সার্জনের বাসা রাস্তার এপার আর ওপার। খানিকটা এগোলে ডিসি-এসপির বাসভবন।
কিন্তু গল্পটা আসলে এই সিভিল সার্জনের দোতলা বাসাটাকে ঘিরেই। গেরুয়া রঙের সুন্দর
দোতলা বাড়ি। আশেপাশে অনেকটা ফাঁকা জায়গা আর ফুলের বাগান নিয়ে গর্ব ভরে দাড়িয়ে আছে।
শ্রী শশিভূষণ চৌধুরী সবেমাত্র সিভিল সার্জন হিসেবে বদলী হয়ে রংপুরে এসেছেন। আগেরজন
বাসা খালি না করায় আপাতত ডিসির বাসভবনের পাশেই সার্কিট হাউজে উঠেছেন তিনি। মাসখানেক
পরে বাসা খালি হলে শ্রী শশিভূষণ চৌধুরী তার পরিবার অর্থাৎ তার স্ত্রী শ্রীমতী মহামায়া
দেবী এবং পাচ বছরের মেয়ে অদিতিকে নিয়ে বাসায় ওঠেন। আর বিপত্তিটা শুরু হয় ঠিক তখন
থেকেই। শ্রী শশিভূষণ চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই একটু আমুদে বা সংস্কৃতিমনা ধরনের। নাটক, গান-বাজনা
বেশ পছন্দ করেন। সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যা বেলাটা তিনি সাধারণত পাবলিক লাইব্রেরীতে
বই পড়ে কাটাতে অথবা টাউন হলে কোন নতুন নাটক মঞ্চস্থ হলে তা দেখতে ভালবাসেন। রংপুরের
নাট্যমঞ্চের তখন বেশ রমরমা অবস্থা। এছাড়া মাঝে মধ্যে সিনেমা হলে কোন ভাল সিনেমা
এলে স্বপরিবারে সিনেমা দেখতে যান।
পাইপে তামাক ভরে রাতজেগে বই পড়া ডাক্তার
সাহেবের পুরনো অভ্যাস। বাসায় ওঠার পর থেকেই তার কেন যেন মনেহত এই বাড়ীতে অদৃশ্য
কিছু একটা আছে বা তার চারপাশে কিছু একটা ঘটছে অথচ তিনি তা ঠিক ঠাহর করতে পারছেন না। সারাক্ষণই বিশেষ করে মাঝরাতের
দিকে মনেহত কেউ বা কারা যেন তার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। মাঝেমাঝে
চোখের কোনা দিয়ে অস্পষ্ট,ছায়া ছায়া অবয়ব কিংবা বিভ্রান্তি এসে দেখা দেয়। তিনি তখন
চোখে মুখে পানির ঝাপ্টা দিয়ে আবার বইয়ের পাতায় ডুবে যেতে চেষ্টা করেন। আবার কখনো নীচতলার
ডাইনিং স্পেসে কারো পায়ের লঘু শব্দ, মৃদু হাসির ছর্রা কিংবা কানের কাছে কারো হালকা
ফিসফিস ধ্বনি শুনতে পান। আসলে সব মিলিয়ে কেমন যেন গা ছম্ছমে একটা অনুভূতি পেয়ে
বসত তাকে। এটা আসলে
ভাষায় প্রকাশ করার মত না। কখনও মনেহত কেউ যেন সাঁই করে পাশ দিয়ে ছুটে গেল, তখন
শরীরে যেন হালকা বাতাসের ছোঁয়া লাগত ইত্যাদি। শশিভূষণ চৌধুরী ভেবে পাননা তিনি কি
করবেন। কারো সঙ্গে তার অনুভূতিও শেয়ার করা হয় না কারণ কেউ যদি বিশ্বাস না করে বিষয়টাকে
হেসে উড়িয়ে দেয়! তিনি এমনকি তার স্ত্রীকেও এসব অদ্ভুতুড়ে অনুভূতি জানিয়ে অযথা ভড়কে
দিতে চাননি তাই পরিবারের কারো সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কখনো কথা বলেননি। কিন্তু তার
স্ত্রী নিজেই একদিন তাকে একই রকমের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। তিনি
জানান যে, তিনি যখন রান্না ঘরে রান্নায় কিংবা বাথরুমে গোসলে ব্যস্ত তখন তার কেবলি
মনেহত কেউ যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে,তাকে দেখছে
ড্যাবড্যাব করে। কখনোবা তিনি তার উম্মুক্ত পৃষ্ঠদেশে কারো কাঁপা কাঁপা হালকা
নিঃশ্বাসের ছোঁয়া অনুভব করতেন। সব মিলিয়ে একধরনের অশরীরী অনুভূতি কাজ করত তার মাঝে। শ্রী
শশিভূষণ চৌধুরীর ধারণা তার বাসায় আরেকটি অশরীরী পরিবার তাদের সঙ্গে একই ভাবে বসবাস
করছে,কিন্তু তিনি জানেন এটা কাউকে বললে সে বুঝতে চাইবেনা। এমনকি তার বন্ধুদের কেউ
কেউ তাকে হয়তবা মাথার চিকিৎসা করানোরও পরামর্শ দিতে পারে। তারা স্বামী-স্ত্রীতে এসব
নিয়ে অনেক আলোচনা করে শেষে পুরোহিত ডেকে গৃহ পূজা,পাঠা বলী দেয়া,চন্ডিপাঠ সবই করান। কিন্তু সমস্যার কোন সমাধান না পেয়ে শেষে বাসা
ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ডাক্তার সাহেব পরিবারকে দেশে পাঠিয়ে পুনরায় সার্কিট
হাউজে ওঠার প্ল্যান করেন।
বাসা ছেড়ে দেয়ার একদিন আগের ঘটনা।
সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র গোছানোর কাজ
প্রায় শেষ। ওরিয়েন্টাল সিনেমা হলে সম্প্রতি একটা ভাল সিনেমা এসেছে। জাগ উঠা ইনসান।
সে সময়ের খুবই হিট সিনেমা। শ্রী শশিভূষণ চৌধুরী পরিবার দেশে পাঠানোর আগে তাই
স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখার প্ল্যান করেন। সেদিন সন্ধ্যার শো’তে টিকিট না পেয়ে তারা
রাতের শো’য়ে সিনেমা দেখে বাসায় ফিরছিলেন।
বাসার ডিজাইনটা এমন যে নীচতলায় প্রধান ফটক খুললেই সামনে পড়বে ডাইনিং স্পেস আর তার
একপাশে রান্না ঘর ও স্টোর রুম এবং অন্য পাশে লিভিং এরিয়া। ডাইনিং স্পেসের পাশেই
দেয়াল ঘেষে হাতমুখ ধোয়ার জন্য একটা বেসিন লাগান আছে। শোবার ঘরগুলো একতলায়। স্ত্রীর
হাতে চাবির গোছাটা দিয়ে তাকে তালা খুলতে
বলে তিনি দরজার বাইরে দাড়িয়ে পাইপে আগুন ধরাতে চেষ্টা করছিলেন। তার
স্ত্রী শ্রীমতী মহামায়া দেবী দরজা
খুলে হা বনে যান। তাদের ডাইনিং টেবিলে স্বামী-স্ত্রী এবং দু’জন বাচ্চাসহ চারজনের
একটা অপরিচিত পরিবার ডিনার করছে। একজন বৃদ্ধ মহিলা পাশের বেসিনে একমনে সম্ভবত প্লেট বা গ্লাস ধোয়ায় ব্যস্ত।
ডিনারের টেবিলে প্লেট আর চামচের হালকা টুং টাং ধ্বনি, গল্পে হাসির ছর্রা সব মিলিয়ে
একটা সাধারণ সুখী পরিবারের চিত্র। ঘন ধোঁয়ার মত তাদের অবয়ব হলেও নারী-পুরুষ, এমনকি তাদের
চোখের পাতা ফেলা পর্যন্ত বেশ ভালভাবেই বোঝা যায়। বেসিন
থেকে ভেসে আসে পানির কল্কল শব্দের ধারা।
ঘটনার আকস্মিকতায় শ্রীমতী মহামায়া দেবী স্থবির হয়ে গেলেও পরক্ষনেই সামলে
নেন নিজেকে। স্বামীকে চীৎকার করে ঘরের ভেতরে আসতে বলেন। তার সে চীৎকারে ডাইনিং
টেবিলে ডিনারে ব্যস্ত পরিবার চম্কে ওঠে। তারা মহামায়া দেবীকে একরকম ধাক্কা দিয়ে
তড়িঘড়ি ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে চেস্টা করে। পুরো ঘরটাই মুহূর্তে আগুনের হলকা মাখা
গরম বাতাসে ভরে ওঠে। স্ত্রীর চীৎকার শুনে শ্রী
শশিভূষণ চৌধুরীও জ্বলন্ত পাইপ হাতে ভেতরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে যান। অশরীরী পরিবারটি
ডিনার ফেলে তার পেছনে হা মেলে থাকা দরজা ঠেলে
বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে তিনি দৌড়ে যেয়ে দরজার ভারী পাল্লা লাগিয়ে দেন। কিন্তু এরমধ্যে অশরীরী পরিবারের অন্যান্য
সদস্যরা বেরিয়ে যেতে পারলেও বৃদ্ধার ডান হাত দরজার চৌকাঠে চাপা পড়ে ছিড়ে যায়। অপার্থিব
একটা চীৎকার দিয়ে বৃদ্ধ মহিলা তার দিকে ফিরে তাকায়, তার সে দৃষ্টিতে ছিল ভাটার
চুল্লীর মত গন্গনে আগুনের লেলিহান শিখা আর প্রতিশোধ নেয়ার দৃঢ় স্পৃহা। শ্রী শশিভূষণ
চৌধুরীর শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের হিমশীতল স্রোত নেমে যায়। বৃদ্ধা তার ডান হাতটিকে
ওভাবেই ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। দরজার চৌকাঠের গোড়ায় পড়ে থাকা বৃদ্ধার বিচ্ছিন্ন হাত
কুয়াশার মত ফিকে হতে হতে এক পর্যায়ে বাতাসে সম্পূর্ণ মিশে যায়। ঘরের ভেতরের গরম
বাতাসও একসময় ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসে। সে রাতটা তাদের জেগেই কাটাতে হয়।
পরিবার দেশের বাড়ীতে রেখে এসে জেলা সিভিল
সার্জন শ্রী শশিভূষণ চৌধুরী সার্কিট হাউজে ওঠেন কিন্তু এর কয়েকদিন পরেই তিনি এক সরকারী
কাজ শেষে কুড়িগ্রাম থেকে রংপুরে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন। তিস্তা ব্রিজের কাছাকাছি এক জায়গায় একটা বাঁশবাহী গরুর
গাড়ীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে বাঁশের তীক্ষ্ণ ডগা জানালার কাঁচ ভেদ করে তার
কণ্ঠনালী ছিন্ন করে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর মুখে পতিত হন তিনি। অপঘাতে মৃত্যু বলে শ্রী
শশিভূষণ চৌধুরী প্রেতযোনি প্রাপ্ত হন। গণেশ
সোরেনের মত তারও একই অবস্থা হয়। তারা দু’জনই এখন ভরা জোসনা আর ঘন অমাবস্যার রাতে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়ান। দেবী
শিতলার মন্দিরে তাদের হয়ে পূজা অর্চনা না করা পর্যন্ত অতৃপ্ত আত্মার আহাজারি চলতেই
থাকবে।
গণেশ সোরেনের গল্পের এ পর্যায়ে পল্লবের
পদধ্বনি শোনা যায়। পরিচিত একটা গানের সুরে শীষ দিয়ে পায়ের ভারী কেড্সে ধুপধাপ
শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে সে। সে কাছাকাছি এসে হাঁক দেয়। তার সে ডাকে চমকে ওঠে
গনেশ সোরেন। উঠে দাড়িয়ে চায়ের খালি কাপটার জন্য সে হাত বাড়ায়। অস্থি চর্ম সার হাত
ঘন লোমে ভর্তি। অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালে তার এক চোখ আঁধারে পিট্পিট করলেও
আরেক চোখে যেন নরকের হাতছানি দেখা যায়। নিঃসীম ঘন অন্ধকার সেখানে। গনেশ সোরেন হেসে বলে—
--তুম হাকে বলেছিলাম না
বাবু হামার এক চোখ কাকে ঠোক্রে খেয়েছিলো! তুম বহুত সাহসী আদমি আছেন বাবু।
একথা বলেই আর দাড়ায় না
গনেশ সোরেন। কাপ হাতে সে এগিয়ে যায় স্টিমারের রেলিঙের দিকে। সোহেল তার পায়ের দিকে তাকালে দেখে তার
পায়ের পাতাগুলো গোড়ালি থেকে উল্টা দিকে আর তার আঙুল গুলোতে লম্বা বাঁকানো নখ চোখে
পড়ে। গনেশ সোরেন অবলীলায় স্টিমারের লোহার রেলিঙ ভেদ করে যমুনার
জলে মিলিয়ে যায়।
পল্লব পাশে দাড়িয়ে সোহেলের
কাঁধে হাত রাখলে সে চমকে পিছনে ফিরে তাকায়।
--কিরে! চম্কে উঠলি
ক্যান! নে শালা তোর চা। ক্যান্টিন থেকে অনেক বলে কয়ে নিয়ে এলাম। ব্যাটারা কাপ দিতে
চায়না।
পল্লব চায়ের কাপটা সোহেলের দিকে এগিয়ে ধরলে সে তার হাতের মুঠোয় কাপটা ভরে নেয়। বেশ গরম আছে এখনো। সোহেল চায়ের কাপে চুমুক দিতে যেয়ে দেখে এ কাপটিরও ঠিক একই জায়গায় ভাঙ্গা। এমনকি স্বাদও প্রায় একই রকম। সে বুঝতে পারেনা তাকে নিয়ে এসব হচ্ছেটা কি! জোসনা দেখায় আপাতত ক্ষ্যামা দিয়ে সে হঠাৎ ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের মত দৌড়ে নীচে তার কেবিনে চলে যায়। তার যাওয়া পথের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পল্লব, কয়েক সেকেন্ড পরে শ্রাগ করে সেও তার বন্ধুর পথ ধরে।
পোস্ট ভিউঃ 28