রংপুর শহরের কেরানীপাড়া সি এন্ড বি স্টাফ কোয়ার্টারের পাশের গলিটায় বেশ কিছু টিন শেড আধাপাকা বাসা আছে। চারদিকে বিশাল সব ফলের গাছ আর ঘন বাঁশ ঝাড় ঘেরা দু’রুমের বাসাগুলোর ছাদ টিনের আর দেয়ালগুলো বাঁশের তর্জার তৈরি। অবশ্য তর্জার ওপরে এঁটেল মাটি ও তুষের মিশ্রণের ভারী আস্তর সাঁটানো আর তার ওপরে হালকা বালু-সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে সাদা চুনকাম করা। দেখতে অনেকটা তাই ইটের দেয়ালের মতই লাগে। ৪৭ এর দেশ বিভাগের সময় কিছু হিন্দু পরিবার এই বাসাগুলো ফেলে ওপারে চলে গেলে সেগুলো বিহারী পরিবারদের দখলে আসে। এরপরে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে বা পরে বিহারী পরিবারগুলো পাকিস্থানে চলে গেলে সেগুলো বর্তমান মালিকদের দখলে আসে। তাদের কেউ ক্রয় সূত্রে আবার কেউবা বিবাহসূত্রে এই বাসাগুলোর মালিকানা লাভ করে। যাহোক এই বাসাগুলোর একটিতে মোঃ মকবুল হোসেন তার স্ত্রী রেবেকা খাতুন আর বৃদ্ধা মা’কে নিয়ে ভাড়া থাকেন। দু’রুমের বাসার একটিতে তিনি স্ত্রী সহ আর অন্য রুমে তার মা অর্থাৎ সফুরা বিবি কাজের মেয়ে ময়নাকে নিয়ে ঘুমান। শোয়ার ঘর লাগোয়া খড়ের চালের রান্নাঘরে রান্না এবং খাওয়াদাওয়া দু’টো কাজই চলে। রান্না ঘরের পাশে কাঁঠালতলায় পাতকুয়াটা বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা। গোসল আর কাপড়-চোপড় ধোয়া সেখানে সম্ভব হলেও খাবার পানিটা বাড়িওয়ালার বাসায় বসানো টিউবঅয়েল থেকেই আনতে হয়। সেকাজটা অবশ্য ময়নাই করে থাকে। সে রোজ দু’বেলা কাঁসার কলসিতে খাবার পানি এনে জগে ভরে রাখে। পেশায় মোঃ মকবুল হোসেন আয়কর অফিসের নিম্নমান অফিস সহকারী আর তার স্ত্রী কেরানীপাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তার মাসিক আয় খুব বেশী না হলেও দু’জনের সম্মিলিত আয়ে অংকের হিসাবটা ভাল। বেশ ভালভাবেই খেয়ে পড়ে চলে যায় তাদের।
মকবুল
সাহেব লম্বা একহারা গড়নের তবে তার স্ত্রীর একটু মোটার ধাঁচ রয়েছে। উচ্চতায় রেবেকা
আর দশটা স্বাভাবিক বাঙালি মেয়েদের মত হলেও তার গায়ের রংটা বেশ ফরসা। তাদের বিয়েটা ধুমধামের
সঙ্গে পারিবারিক ভাবেই হয়েছে এবং স্ত্রীকে নিয়ে মোঃ মকবুল হোসেন বেশ সুখেই জীবন
যাপন করছেন। বয়ঃসন্ধিকালের সেইসব নির্জন আর একান্ত মুহূর্তগুলো থেকে রেবেকা ঠিক
যেরকম স্বামীর প্রতিচ্ছবি কল্পনা করে এসেছেন বাস্তবের স্বামীর সঙ্গে তার কোনও মিল
না থাকলেও মকবুল সাহেবকে মেনে নিয়েছেন আর দশটা বাংলাদেশী মেয়েদের মত। অনেক সময় নিয়তির
কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া ছাড়া তাদের আসলে কিছুই করার থাকে না। জোর করে হলেও ভালবাসতে
হয় অজানা অচেনা মানুষটাকে। এক মুহূর্তের ‘কবুল’ উচ্চারণ নির্ধারণ করে দেয় তাদের
সারা জীবনের গতি প্রকৃতি। সারাজীবন সংসারের ঘানি টেনে চলেন তারা। স্বামীকে মন থেকে
ভালবাসতে না পারলেও জৈবিক প্রবৃত্তির তাড়নায় এক সময় তাদের সংসার ছেলে-মেয়েয় ভরে
ওঠে। সারাজীবন ভর একধরনের সুখী নারীর ভূমিকায় অভিনয় করে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে
পড়েন তারা। মকবুল সাহেব প্রতিদিন লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় এসে খাওয়া শেষে মুখে খিলি পান
পুরে অফিসে যান মহাসুখে গুন গুন করতে করতে। কখনও সময় ও সুযোগ মিলে গেলে লাঞ্চ
ব্রেকেই স্বামী হিসেবে তার একটা দু’টা দাবী স্ত্রীর কাছ থেকে মিটিয়ে নিতে ভোলেন
না। তখন তার হালকা চনমনে মেজাজ দেখে অফিসের সহকর্মীরা রসিকতা করে জিজ্ঞেস করেন-
--কি মকবুল সাহেব সাপ লুডু খেলে ফিরলেন
নাকি! বেশ ফুরফুরে লাগছে যে!
সহকর্মীদের এসব রসিকতায় তিনি অবশ্য কিছু
মনেকরেন না। তিনি বরং এসব হাল্কা রসিকতা বেশ উপভোগ করেন এবং নিজেও প্রায়ই সক্রিয়
ভাবে অংশ নিয়ে থাকেন।
রেবেকা খাতুন সকালের নাস্তা সেরে স্বামীর
সঙ্গে স্কুলের দিকে পা বাড়ালেও তার স্কুল বারোটার দিকে ছুটি হওয়ায় তিনি সাধারনত
আগেই বাসায় ফেরেন। এরপর কাজের মেয়েকে নিয়ে রান্নার তদারকি আর গোসল সারতে না সারতেই
স্বামী বাসায় ফিরলে তারা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে নেন। তার শাশুড়ি অবশ্য আগেই খাওয়া
সেরে ঔষধ খেয়ে ভাত ঘুম দেন। তাদের নির্ঝঞ্ঝাট পারিবারিক জীবন এভাবে বেশ সুখেই
কাটছিল। তবে দুপুরে খাওয়ার পর স্বামী অফিসে চলে গেলে রেবেকা’র সময়টা খুব স্লো হয়ে
যায়। টিভিতে ডিশের সংযোগ থাকলেও সব সময় টিভির পর্দায় চোখ রাখতে ভাল লাগেনা। তাই কখনো
উল-কাটা নিয়ে সোয়েটার বা মাফলার বুনতে বসে যান। আবার কখনোবা দিনের দৈনিক পত্রিকা কিংবা
কোন উপন্যাসের পাতায় নাক ডুবিয়ে দেন। ক’দিন ধরে নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব
উপন্যাসের পাতায় পড়ে আছেন তিনি, লাইনে লাইনে সেখানে ভালবাসা আর বিয়োগ ব্যথার
ছড়াছড়ি, তারপরও অলস সময় কাটতে চায়না। অবসন্ন দুপুরে কাজের মেয়েটা হয়ত টুকটাক
সাংসারিক কাজে ব্যস্ত আর বৃদ্ধা শাশুড়ি তখন ঘুমে হালকা নাক ডাকছেন। এই সময়গুলো মাঝে মাঝে বেশ
অসহ্য মনেহয় তার কাছে। অবশ্য মকবুল সাহেব সুযোগ পেলে অনেক সময় আগেই বাসায় চলে আসেন,তখন
স্বামী-স্ত্রীতে খুনসুটি করে বেশ সময় কাটে তাদের। আসলে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হলেও
অল্পদিনেই তাদের মধ্যে সুন্দর বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। রেবেকা মাঝে মধ্যে স্বামীকে বাচ্চা নেয়ার কথা
বলেন কিন্তু মকবুল সাহেব এখনই ওসবে রাজী না। তিনি আসলে আরেকটু সংসারটা গুছিয়ে তারপর
সন্তান নেয়ার পক্ষপাতী। তার শাশুড়িও আজকাল প্রায়ই সন্তান নেবার জন্য তাকে খোঁচা
দেন। নিজের ছেলেকে বলতে ভয় পান, তাই ছেলের বউকেই তিনি প্রকারন্তরে চাপ দেন।
--বৌমা এভাবে আর কতদিন?
বাচ্চা-কাচ্চা নিবা না! বয়স হয়ে গেছে, কতদিন বাঁচবো জানিনা। একটু নাতি-পুতির মুখ
দেখতে তো ইচ্ছা হয়!
--মা, এ কথা আপনি আপনার ছেলেকে বলে বোঝান।
আমি অনেক বলেছি তিনি আমার কথা শোনেন না। দেখেন যদি আপনার কথা তিনি শোনেন!
সফুরা বিবি অবশ্য বোঝেন তার ছেলের
অমতের কারণেই তিনি নাতি-পুতির মুখ দেখতে পারছেন না। মাঝে মধ্যে সেকথা ছেলেকে ইনিয়ে
বিনিয়ে বললেও আজকাল তাতে কোন কাজ হচ্ছে না। ছেলে তার কথা একান দিয়ে শুনে ওকান দিয়ে বের করে
দেয়। তিনি ছেলের
একগুয়েমিপনায় বিরক্ত হন কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। তার এই ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই একটু
একরোখা গোছের, নিজে যেটা ভাল বুঝবে সেটাই সে করবে।
কোন বিষয়েই কারো কথা শুনতে চায়না!
মকবুল সাহেব অবশ্য বুঝতে পারেন
দুপুরের খাবারের পরে তার স্ত্রীর সময় কাটানটা আসলেই বেশ কষ্টকর। তিনি ছুটির
দিনগুলোতে প্রায়ই স্ত্রীকে এখানে সেখানে বেড়াতে বা সিনেমা দেখাতে নিয়ে যান। কিন্তু অফিসের দিনগুলোতে তার আসলে কিছুই করার থাকেনা। অফিস
কামাই দিয়ে তো আর বউকে নিয়ে থাকা যায়না! মানুষ শুনলে কি বলবে! অনেক ভেবে চিন্তে শেষ
পর্যন্ত মকবুল সাহেব স্ত্রীর জন্য একটা মোবাইল সেট কেনেন। তার মোবাইল ফোন আগে
থেকেই ছিল, সেট কেনার ফলে এখন থেকে সবসময়ই স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে। রেবেকা
খাতুনও প্রয়োজনে স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।
এতে তার মনটা হয়ত একটু হালকা হবে। তার টুকটাক যেটুকু
উপরি আয় হয় তা’ সংসারের বিভিন্ন টুকিটাকি জিনিস কিনতেই বেরিয়ে যায়। তিনি অবশ্য কারো
আয়কর ফাইল আটকে রেখে উৎকোচ নেন না। কাজ করে দেয়ার পরে কেউ খুশী হয়ে কিছু দিলে
সেটাই সন্তষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে থাকেন। তারপরও উপরি হিসাবে যেটা আসে মাস শেষে
হিসাব কষলে সেটা নেহায়েত মন্দ না। তা দিয়ে ছোটখাট শখ আহ্লাদ অনায়াসেই পূরণ করা যায়। এভাবে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি
আর ছোট ছোট আনন্দ-বেদনা-কস্ট নিয়েই তাদের টোনাটুনি সংসার।
সম্প্রতি কেরানীপাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোঃ জিল্লুর রহমান
শিক্ষক হিসাবে জয়েন করেছেন। শ্যামলা আর মাঝারী গড়নের জিল্লুর সাহেব বেশ আমুদে
টাইপের ভদ্রলোক।
এখনও বিয়ে থা করেননি। হয়ত পছন্দের কাউকে খুঁজে পাননি
আজো। ক্লাসের ফাঁকে টিচার্স রুমের আড্ডাটা উনিই কিন্তু হাসি-ঠাট্টায় বেশ জমিয়ে রাখেন।
একদিন গল্পের টেবিলেই একথা সেকথায় রেবেকা খাতুনের মোবাইল নাম্বারটা তিনি চেয়ে নেন।
শুরুতে মাঝে মধ্যে হঠাৎ এক-আধটু কথা হলেও ধীরে ধীরে তাদের কথার দৈর্ঘ্য ও ব্যাপ্তি
ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে দুপুরে খাবার পর মকবুল সাহেব অফিসে চলে গেলে যখন
করার মত হাতে কিছু থাকেনা তখন মাঝে মাঝে মোবাইলে গল্প করেন রেবেকা খাতুন। সফুরা
বিবির অবশ্য ধারণা বৌমা তার ছেলের সঙ্গেই কথা বলছে, তাই তিনি এতে খুশীই হন। ভাবেন
তাদের দিনকালতো শেষ এখন তার ছেলে যদি বউকে নিয়ে সুখে থাকে তাহলে তিনি মরেও সুখ পাবেন।
তিনি একদিন দুপুরে ছেলেকে খাওয়ার টেবিলে খানিকটা আহ্লাদে জিজ্ঞেস করেন
-হ্যারে! মোবাইলে বউয়ের সঙ্গে এত
কথা বলে খামাখা পয়সা নষ্ট করিস কেন? বাসায় যখন থাকিস তখন ঠিক মত কথাবার্তা বললেই
তো হয়! তোদের কি যে এত ইটিস পিটিস বুঝিনা বাপু!
সফুরা বিবির হঠাৎ এ মন্তব্যে রেবেকা
বিব্রত হয়ে স্বামীর দিকে তাকান। মকবুল সাহেবের ঝোল মাখা খাবারের লোকমাটা মুখের
কাছেই থেমে যায় কিন্তু তিনি মায়ের কথার পৃষ্ঠে কোন কথা না বলে প্রসঙ্গের আপাতত ইতি
ঘটান। আসলে কয়েকদিন ধরে তিনিও এটা খেয়াল করেছেন। ইদানীং প্রায়ই স্ত্রীকে ফোন করলে অনেকক্ষণ
ধরে মোবাইল ব্যস্ত পাওয়া যায়।
তবে কিভাবে প্রসঙ্গটা তুলে স্ত্রীকে
জিজ্ঞেস করবেন তা তিনি বুঝতে পারেন না। হয়ত তার শালীনতা বোধ তাকে বাধা দেয়। তার মা খাবার টেবিলে
প্রসঙ্গটা তোলাতে তার বরং একটু সুবিধাই হয়। তিনি খাওয়া শেষে স্ত্রীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস
করেন
-মা যে কথাটা বললেন তা’তো বুঝতেই
পেরেছো। তুমি কার সঙ্গে এত কথা বল?
রেবেকা খাতুন সত্যি কথাটাই বলেন
-স্কুলের কলিগদের সঙ্গে।
-ঠিক আছে। কথা বলতে তো দোষ নেই।
কিন্তু এক নাগারে এভাবে কথা বললেতো দেখতে দৃষ্টিকটু লাগে নাকি!
- ভুল হয়ে গেছে। এরপর থেকে খেয়াল
রাখব।
এরপর আসলে আর বলার কিছু থাকেনা। প্রসঙ্গটা
সেদিন এভাবে হালকা আলাপচারিতার মাঝেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মকবুল সাহেবের মাথা থেকে
খট্কাটা যেন যেতেই চায়না। কারণ এরপরও তিনি তার স্ত্রীর মোবাইল একই ভাবে ব্যস্ত
পেয়েছেন। সম্প্রতি তার কথা বলার প্রবণতাটা আরও বেড়েছে বলে তার ধারণা। তিনি ঠিক
করেন আর দেরী না করে বাচ্চা নিয়ে নেবেন। হয়ত একাকীত্বের জ্বালা থেকে রেহাই পেতেই তার
স্ত্রী মোবাইলে কথা বলে নিজেকে ব্যস্ত রাখে! রেবেকা’র মত সফুরা বিবিও ছেলের এই
সিদ্ধান্তে খুশী হন। তিনি প্রতি ওয়াক্ত নামাজেই জায়নামাজে বসে ছেলের জন্য
কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্ তায়ালার কাছে দোয়া করেন। কিন্তু বাস্তবতা তো আর গল্প
সিনেমার মত হয়না! কিছুদিন অপেক্ষা করেও কোনও রেজাল্ট না পেয়ে তারা ডাক্তারের
শরণাপন্ন হন।
ডাক্তার তাদের সবকিছু জেনে আপাত দৃষ্টিতে
তাদের কারও কোন সমস্যা নেই বলে জানান। তবে তিনি কিছু প্যাথলজিকাল টেস্ট করাতে দিয়ে পরবর্তীতে আবারও রিপোর্টসহ দেখা
করতে বলেন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ধাপ এলাকায় এক প্যাথলজিকাল ল্যাবে রেবেকা খাতুন
ব্লাড, হরমোন ইত্যাদি এবং মকবুল সাহেব তার সিমেন স্পেসিমেন এনালাইসিস করতে দেন।
কয়েকদিন পর ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট আনতে গিয়ে মকবুল সাহেবের চক্ষু চড়কগাছ! তিনি
নিজেকে যেন বিশ্বাস করাতে পারেন না। তার মাথায় পুরো আকাশটা যেন ভেঙ্গে পরে। চেনা
পৃথিবীটা যেন আচমকা ওলটপালট হয়ে যায় তার কাছে। প্যাথলজিকাল টেস্টে তার স্ত্রীর সব ফলাফল পজিটিভ এসেছে
কিন্তু গোল বেঁধেছে তার নিজের ল্যাব রিপোর্টে। সিমেন এনালাইসিসে তার স্পার্ম
কাউন্ট এসেছে বিশ মিলিয়নের নীচে অথচ বাচ্চা
নিতে চাইলে এটা কমপক্ষে চল্লিশ মিলিয়ন হতে হয়। তিনি হতভম্ব হয়ে যান। কি করবেন ভেবে পান না। হঠাৎই যেন তার পা দু’টো
অবশ হয়ে আসতে চায়। তিনি পাশের বেঞ্চে ধপ্ করে বসে পরেন।
তার মাথাটা ঝিম মেরে ধরে থাকে। এসময় বেয়ারা মোবাইলটা বেজে ওঠে।
রেবেকা তাকে স্মরণ করিয়ে দেন আজ ল্যাবরিপোর্ট দেয়ার কথা,তিনি যেন অফিস থেকে ফেরার
পথে ওগুলো নিয়ে আসেন।
মকবুল সাহেব কথা না বাড়িয়ে রিপোর্ট নিয়ে আসার
প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফোনটা কেটে দেন। ফোনটা প্যান্টের পকেটে রাখতে গিয়ে তিনি নোটের বান্ডিলটার অস্তিত্ব অনুভব করেন। আজই এক
ক্লায়েন্টের কাছ থেকে উপ্রিটা পেয়েছেন। কিন্তু কি হবে এত টাকা দিয়ে যদি তার কোন
সন্তান না থাকে! কে ভোগ করবে তার এই সম্পদ! তার ভাবনাগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। রেবেকাকে
নিয়ে একরাশ দুর্ভাবনা ঘিরে ফেলে তাকে। তার ধারণা রেবেকা যদি জানতে পারে যে তার স্বামীর
কারণে তাদের কোন সন্তান হবেনা, তাহলে সে নির্ঘাত তাকে ডিভোর্স দিবে। তিনি জানেন
সন্তানের জন্য রেবেকা কতটা উম্মুখ হয়ে আছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন কিছু টাকা খরচ করে
হলেও তার রিপোর্টটা বদলে নিবেন। সন্তানের
বাবা হওয়ার সুখ তার কপালে না আসুক কিন্তু সংসারটা তাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এই সুখটাকে তিনি কোনভাবেই হাতছাড়া করতে রাজী নন।
যতই টাকা লাগুক তিনি তার
ল্যাব টেস্ট রিপোর্টটা বদলে নিবেন।
তিনি বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে থাকেন। একসময় ল্যাব কিছুটা ফাঁকা হলে
ল্যাব টেকনেশিয়ানকে অনেকটা জোর করেই বাইরের টি স্টলে চা খাওয়াতে নিয়ে যান। সেখানেই এক কথা দু’কথায়
ল্যাব টেকনেশিয়ানকে তিনি তার সমস্যার কথাটা জানান। এমনকি তাদের সংসারটা ভেঙ্গে যাবার
সম্ভাবনার কথাও বলেন। টেকনেশিয়ান
ছেলেটা মকবুল সাহেবের মনের কষ্ট বুঝতে পারে কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার
থাকতে সে ভূয়া রিপোর্ট তৈরিতে অপারগতা
প্রকাশ করে। অনেক অনুনয় বিনয় করেও কোন লাভ না হলে মকবুল সাহেব শেষে তার সামনে
নোটের বান্ডিলটা রেখে হাত চেপে ধরেন। বিবেক
টাকার কাছে হার মানে। সে
পরবর্তীদিন এসে রিপোর্টটা নিয়ে যেতে বলে।
অফিসের
ঝামেলার কারণে মকবুল সাহেবের পক্ষে পরদিন ল্যাব রিপোর্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়না।
তিনি তার স্ত্রীকে রিপোর্ট আনতে বলে সেদিন
বেশ রাতে বাসায় ফেরেন। রাতে খাবার টেবিলে ল্যাব রিপোর্ট নিয়ে স্বামী স্ত্রীতে
আলোচনা হয়। রেবেকা খুব খুশী তাদের দু’জনের কারও সমস্যা নেই জেনে। পরবর্তী সাপ্তাহিক ছুটির দিনটায় তারা ল্যাব রিপোর্ট নিয়ে পুনরায় ডাক্তারের কাছে যাওয়ার
প্ল্যান করে। ভবিষ্যৎ সন্তানের কল্পনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন রেবেকা। তাদের সে রাতটা
খুব দীর্ঘ আর আনন্দময় হয়। বুকের সব কষ্টগুলোকে পাথরচাপা দিয়ে মকবুল সাহেব রেবেকার
আহবানে সক্রিয় ভাবে সাড়া দেন। পরদিন সকালে বউমা’র কাছে টেস্টের ফলাফল জেনে সফুরা
বিবিও খুব খুশী হন। নামাজে বসে ছেলের জন্য দোয়া করেন। তাদের সংসার যেন সন্তান
সন্ততিতে ভরে ওঠে। নির্ধারিত দিনে ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখানো হলে তিনি কিছু পরামর্শ
আর ঔষধ খেতে বলে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলেন। অনেকেরই এরকম হয়ে থাকে বলে তিনি
জানান। হাসিমুখে ডাক্তারের চেম্বার থেকে তারা বাসায় ফেরেন।
কিন্তু প্রায় দু’ বছর অপেক্ষায় কেটে গেলেও
সফুরা বিবি নাতীর মুখ দেখতে না পেয়ে বউমার ওপরে খুবই বিরক্ত হন। বয়সের
ভাড়ে তিনি আগের চেয়ে এখন আরও
বেশী কাহিল হয়ে পড়েছেন। সারাদিন একমনে বিড়বিড় করে কথা বলেন আর রাগ ঝারেন ছেলের বৌয়ের ওপরে। তার
ধারণা বৌমার অবশ্যই কোন না কোন সমস্যা আছে আর সে কারণেই তার নাতীর মুখ দেখা
হচ্ছেনা। রেবেকা শাশুড়ির এসব অত্যাচার নীরবেই সহ্য করেন। একসময় তার মনেও রাজ্যের
প্রশ্ন এসে ভিড় করে। আসলেই কি তার শারীরিক সমস্যার কারণে বাচ্চা হচ্ছেনা! কিন্তু ডাক্তারতো
সব টেস্ট দেখেই বলে দিল তার কোন সমস্যা নেই! মাঝে মাঝে একলা চুপিসারে চোখের জল
ফেলেন তিনি। তার ভয়টা বেড়ে যায় যখন সফুরা বিবি ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করানোর জন্য উঠে
পড়ে লাগেন। মকবুল সাহেব অবশ্য
তার মায়ের এসব জেদাজেদিকে পাত্তা
দেন না। কিন্তু এভাবে কয় দিন? মকবুল সাহেব যদি সত্যিই একদিন সন্তানের আশায় বিয়ে
করে বসেন তাহলে তার কি হবে? তার পক্ষে সতীনের সঙ্গে সংসার করা সম্ভব না। তার এসব
কষ্টের কথাগুলো শেয়ার করার একমাত্র সঙ্গী হল জিল্লুর সাহেব। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তারা
এসব নিয়ে কথা বলেন। জিল্লুর সাহেব তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে বলেন।
তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে রেবেকার মন।
বাচ্চাদের ষাণ্মাসিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে
কয়েকদিন হল। কমনরুমে বসে জিল্লুর সাহেব আর রেবেকা পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন। সেদিন হেড
মাস্টার তার অফিসে ব্যস্ত আর বাকী টিচাররা অন্য কোথাও থাকায় চারপাশটা একদম নির্জন
ছিল। খাতা দেখার পাশাপাশি টুকটাক গল্প করছিলেন তারা। একথা সেকথায় পারিবারিক
অশান্তির বিষয়গুলোও তাদের আলাপচারিতায় উঠে আসে। শাশুড়ির মানসিক পীড়নের কথা বলতে
বলতে কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসে রেবেকা খাতুনের। এক সময় কান্না করে ফেলেন। এরকমই এক
দুর্বল মুহূর্তে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য রেবেকার চুলের গোছায় হাত গুঁজে মাথাটা নিজের
দিকে টেনে নেন জিল্লুর সাহেব। মাথায়-চুলে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। আদর করেন।
তার এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে
রেবেকা’র পুরো শরীরটা যেন কেঁপে ওঠে। মনের অজান্তেই যেন তিনি নিজেকে এলিয়ে দেন জিল্লুর
সাহেবের কাঁধে। সীমারেখার বাঁধনগুলো এক সময় আলগা হয়ে যায়।
পরীক্ষার খাতাগুলো পড়ে যায় টেবিল থেকে। ছড়িয়ে পড়ে সেগুলো কমনরুমের নির্জন মেঝেয়।
সফুরা বিবি ইদানীং প্রায়ই বিছানা নোংরা
করে ফেলেন। দৃষ্টি শক্তিও যেন কমে এসেছে তার। তার ঘোলা চোখে এখন শুধুই অপরাহ্ণের
ছায়া। তার কেবলই মনেহয় আজরাইল প্রাণ বায়ু ছিনিয়ে নেয়ার জন্য দরজার গোড়ায় এসে
দাড়িয়ে আছে। তাই কখনো কখনও তিনি লাঠি হাতে তেড়ে যান আজরাইলকে তাড়াবেন বলে। তার এসব
কাজকর্ম দেখে ময়না হেসে গড়াগড়ি খেলে সফুরা বিবি খেঁকিয়ে ওঠেন। এরকমই একদিন বিকেলে আজরাইল
তাড়াতে যেয়ে দেখেন তার বৌমা কুয়ার পারে বসে বমি করছে। তার নিভু নিভু দৃষ্টির আলো
যেন দপ্ করে জ্বলে ওঠে। খুশীর রেখা দেখা দেয় তার মুখে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে তিনি
তার ওই জরাগ্রস্থ শরীরটাকেই টেনে এগিয়ে যান বউমার দিকে। ময়নার সাহায্য নিয়ে ঘরে
এনে বসান রেবেকাকে। এতদিনে আল্লাহ্ তায়ালা
তার মনের বাসনা পূর্ণ করায় তিনি শুকরিয়া আদায় করেন।
এরপর ছেলে কখন অফিস থেকে ফিরবে সেজন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। রেবেকাও
বেশ রোমাঞ্চিত স্বামীকে এতদিনে একটা ভাল
খবর দিতে পারবেন বলে।
অফিসের কাজ সেদিন বেশ তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ায় পাঁচটা নাগাদ মকবুল সাহেব বাসায় ফেরেন। এরপর হাতমুখ ধুয়ে চা খেতে বসতে না বসতেই সফুরা বিবি ছেলেকে সুসংবাদ দেন। প্রথম দিকে ঘটনাটা বুঝতে না পেরে মকবুল সাহেব খানিকটা বিভ্রান্তভাবে স্ত্রীর দিকে তাকান। রেবেকা তাকে লাজুক হাসিতে মা হবার খবরটা দেন। মকবুল সাহেবের হাত-পা নিমিষেই যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসে। তার কাছে সবকিছুই কেমন তেতো-বিস্বাদ ঠেকে। ভিতরে ভিতরে তীব্র দহনে পুড়তে থাকলেও মুখে কিছু প্রকাশ করেন না। তার জলো দৃষ্টির সামনে দাড়িয়ে রেবেকা খানিকটা অস্বস্থি বোধ করেন। তিনি বুঝতে পারেন না মকবুল সাহেব আনন্দে উচ্ছ্বাসিত না হয়ে নিশ্চুপ কেন! স্বামী–স্ত্রী হিসেবে তাদের সম্পর্কটা সব সময়ই স্বাভাবিক ছিল। তিনি জিল্লুর সাহেবের সঙ্গে দু’একবার ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন সেটা ঠিক কিন্তু তার হিসাবতো ভুল হওয়ার কথা না। অজান্তেই পেটের ওপরে হাত চলে যায়। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে রেবেকাকে। তিনি বুঝে উঠতে পারেন না তার এমুহূর্তে কি করা উচিত। সে রাতে তাদের মধ্যে কথাবার্তা তেমন হয়না বললেই চলে। নিয়ম রক্ষার খাতিরে মকবুল সাহেব সামান্য কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়েন। কিন্তু রেবেকা নাছোড়বান্দার মত লেগে থেকে মকবুল সাহেবের কাছে জানতে চান তিনি খুশী নন কেন? মকবুল সাহেবের মুখ থেকে কোন কথা বেরোয় না। তিনি যেন মৌনব্রত পালনের কঠিন ব্রত নিয়েছেন। কিন্তু রেবেকার জোরাজুরির একপর্যায়ে পরদিন সকালে এনিয়ে কথা বলবেন বলে জানান। আসলে পুরো বিষয়টাকে তিনি ঠিক কি করে সামলে নিবেন সেটা নিয়েই ভাবছিলেন। তিনি ভালকরেই জানেন তার পক্ষে কোনদিনই বাবা হওয়া সম্ভব না। সেক্ষেত্রে রেবেকার গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করে তিনি চুপচাপ জীবনের বাকী দিনগুলো পার করে দিতে পারেন কিন্তু তার প্রবল পুরুষত্ববোধ তাকে বাধা দেয়। তিনি রেবেকার এ প্রতারণা মেনে নিতে পারেন না। মকবুল সাহেব সারা রাত একের পর এক সিগারেটে টান দিয়েও কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। তিনি মেনে নিতে পারেন না অযাচিত পিতৃত্বের সংবাদ কিংবা রেবেকাকে ছেড়ে একা থাকার অনুভূতি। আবার বৃদ্ধা মায়ের আনন্দ ঝলমল মুখ তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কি এক দুঃখের আগুনে পুড়তে থাকেন তিনি আর তার হাতের সিগারেট। একেরপর এক সিগারেটের ছাইয়ের স্তূপে চাপা পড়তে থাকে তার আনন্দ বেদনা হাসি ঠাট্টার মুহুর্তগুলো। কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে তিনি বিছানার পাশে বসেন। রেবেকা তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখে মা হওয়ার পরম তৃপ্তি। তার সে মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর মমতায় ভরে ওঠে মকবুল সাহেবের হৃদয়। তিনি নির্দ্বিধায় তার জীবনের চরম সিদ্ধান্ত নেন। বুকের ভিতরে আবেগ, ক্রোধ আর ভালোবাসাগুলোকে ছাই চাপা দিয়ে মেনে নেন সব কিছু। এরপর অফিসে যেয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিমেন এনালাইসিসের আসল রিপোর্টটা বের করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। কাগজটা পুড়তে থাকে। পুড়তে থাকে হিজিবিজি অক্ষরে লেখা সিমেনের হিসাব আর মকবুল সাহেবের প্রেম ভালবাসাগুলো।
পোস্ট ভিউঃ 37