হেমন্তের শেষের
দিনগুলোতে শুকনা পাতার এই ওড়াউড়ি আর গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকা দুধের সরের মত ছেঁড়া
কুয়াশা দেখেই বলে দেয়া যায় শীত আসছে। প্রকৃতির নীরব আর সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো নাদিভ
আরসালান খুব গভীর ভাবে খেয়াল করে থাকে। আর সেটা প্রাণ ভরে উপভোগ করার জন্যই হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের
লেকের পারে এই জায়গাটা নাদিভের খুব প্রিয়।
লেকের ওপারে ডালপালা ছাড়িয়ে অগোছালো ভাবে দাড়িয়ে আছে অনেকগুলো শ্বেত কাঞ্চন। আর লেকের
এপার ঘেঁষে জল ছুঁই ছুঁই বাসক, আকন্দ আর
ঢোল কলমির ঝাড়। তার পাশেই ল্যাম্পপোস্টের মত নিঃসঙ্গ ছাতিম গাছটা তার অনেকগুলো
একাকী মুহূর্তের নীরব সাক্ষী। শরতের শেষে শুক্লা দ্বাদশীর রাতে বুড়ো ছাতিম গাছটা
হলদেটে কিংবা সবুজাভ সাদা রঙের ফুলে ভরে যায়। তখন ক্ষ্যাপাটে বাতাসে তার মিষ্টি
ঘ্রাণ থেকে থেকেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। সে ফুরফুরে মিষ্টি ঘ্রাণে কি রকম এক ভাললাগার অনুভূতি
ছড়িয়ে যায় শরীরের শিরায় উপশিরায়। অদূরে অনেকটা জায়গা জুড়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে
একহারা মেহগনি গাছগুলো। সেখানে ফ্যাকাসে খয়েরী রঙের গাছগুলোর মাথায় সবুজপাতার জটা।
হেমন্তের বিবর্ণ দুপুরগুলোতে যখন খাঁ খাঁ নির্জনতা, নিস্তব্ধ থাকে চারদিক, তখন আচমকা
এলো বাতাসে গাছগুলো যেন কথা বলে নিজেদের মাঝে। বাতাসের হালকা ভেজা স্পর্শে মেহগনি
বনে সবুজ জটা খুলে যায় যেন লজ্জাবতি পাতার মত। একধার থেকে ঝুরঝুর করে পড়তে থাকে জীর্ণ
পাতাগুলো। বাতাসের টানে পাতাগুলো ছুটে যায় এদিক থেকে সেদিকে। নাদিভের খুব ভাললাগে পাতার এই হঠাৎ ছন্দপতন দেখতে। পাতার এই ঝরে
পড়াটাকে সে অবশ্য বলে থাকে ঝরা পাতার গান। আর তাই পাতার মর্মর সুর শোনার জন্য অবসর
মুহূর্তগুলোতে সে প্রায়ই শুয়ে থাকে গাছের দীর্ঘ সারীর নীচে সবুজ গালিচার মত দূর্বা ঘাসের ওপর। একে একে ঝরে পড়া সবুজ পাতাগুলো তখন ঢেকে দেয় তাকে পরম
মমতায়। শুকনো পাতার স্তূপে শুয়ে আকাশ দেখতে ভাল লাগে তার। হেমন্তের
আকাশ কি দারুণ স্বচ্ছ নীল আর সেখানে ভর দুপুরে নিঃসঙ্গ চিলেরা আশ্রয় খুঁজে ফেরে।
নাদিভ তার
বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান আর তার বেড়ে ওঠা দেশের একদম উত্তরের প্রত্যন্ত শহর
কুড়িগ্রামে। সেখানেই প্রমত্তা ধরলার জল-হাওয়া গায়ে লাগিয়ে এস এস সি আর এইচ এস সি’র
বেড়াজাল টপকে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে ইংরেজি সাহিত্য
বিভাগে। প্রথম বর্ষে হোস্টেলে সীট না পেলেও দ্বিতীয় বর্ষে এসে ঠিকই ঠিকানা খুঁজে
পেয়েছে আল বেরুনি হলে। পড়াশোনার বাইরে ফটোগ্রাফি আর নিসর্গ তাকে খুব টানে। নাদিভ তার
বাবা অর্থাৎ আলতাফ হোসেন চৌধুরী সাহেবের মতই জীবনের রস খুঁজে পায় কবিতার বই কিংবা ক্যামেরার
লেন্সে। কোন এক জন্মদিনে ছেলেকে ক্যাননের একটা ফটোগ্রাফি ক্যামেরা উপহার দিয়েছিলেন
মাহবুবা বেগম চৌধুরী। সেটাকেই কাঁধে ঝুলিয়ে নাদিভ চষে বেড়িয়েছে ধরলার বুকে বিন্দুর
মত জেগে থাকা প্রত্যন্ত চরগুলোতে। কত
দিন সে ঘর থেকে পালিয়ে ধরলা-তিস্তার দুর্গম চরে মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম আর প্রকৃতির
প্রতিনিয়ত পালাবদলের রূপ ফ্রেমে বন্দী করেছে!
নাদিভের বাবা-মা দু’জনই কলেজে শিক্ষকতা করেন। তারা ছেলেকে গড়ে তুলেছেন তাদের মত করেই উদার
পারিবারিক আবহে। ছেলের সব পাগলামি আর খেয়ালিপনাগুলোকে তারা সস্নেহে সামলেছেন। তারা
জানেন তাদের সন্তান খুবই আবেগপ্রবণ আর ভাবুক প্রকৃতির। ভাবের
জগতে তার বিচরণ থাকলেও সে যে কখনও খারাপ কিছু করবেনা সে দৃঢ় বিশ্বাস তাদের বরাবরই
ছিল। নাদিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দিনগুলোতেও মানিব্যাগে সামান্য টাকা ভরে ছুটে
গিয়েছে টাঙ্গুয়া-হাকালুকি হাওর,সুসুং দুর্গাপুর,লামামুখ, পারকি-গহিরা-আনোয়ারা সহ
অনেক খানে। শুধুমাত্র নিসর্গের অপরূপ সৌন্দর্য ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করার জন্য!
সময়কে ধরে রাখার জন্য তার কি দারুণ প্রচেষ্টা! সে এক অদ্ভুত নেশা আর পাগলামি।
দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার বেশ পরে, হেমন্তের কোন এক পড়ন্ত বিকেলের আধফোটা রোদে ক্যাফেটেরিয়াতে
স্বাতির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগ পর্যন্ত তার এসব পাগলামি ছিল নিজের সঙ্গেই।
সুদীপ্তা
ব্যানার্জী অর্থাৎ স্বাতি গাবতলি, বগুড়ার মেয়ে। তিন ভাইবোনের মধ্যে সেই বড়। বাবা সুশান্ত
ব্যানার্জি পেশায় আইনজীবী হলেও তার মা সরযূবালা দেবী ব্যস্ত তার ঘর-সংসার নিয়ে। আজিজুল
হক কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে
ভর্তি হয়েছিল। হেমন্তের
সেই বিকেলে এক পশলা বৃষ্টিতে খানিকটা কাকভেজা হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার বারান্দায় যখন সে
চুলের প্রান্ত ছুঁয়ে থাকা জল ঝরাতে ব্যস্ত, নাদিভ তখন ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করছিল অবেলার
বৃষ্টিতে ভেজা শালিকের ডানা ঝাপটানি। কি এক কারণে হঠাৎ ক্যামেরার লেন্স ঘুরে গেলে
পুরো ফ্রেম দখল করে বসে স্বাতির জলে ভেজা সতেজ মুখখানি। বৃষ্টির রেশ লেগে আছে তখনও
তার চোখে-মুখে কিংবা কানের পাশে পুঁই ডগার মত নুইয়ে থাকা অবাধ্য কাল জুলফিতে। প্রচন্ড
বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে তাকানোর আগেই ক্যামেরার শাটার টিপে দেয় নাদিভ। রেগে
ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার জন্য নাদিভের দিকে তেড়ে যায় স্বাতি কিন্তু তার আগেই কিউপিড
এসে ভর করে তার মাঝে। ফলে স্বাতির আর রাগ করা হয়না। হালকা বৃষ্টির তোড়ে ভেজা সে বিকেলে ছিল আলো আঁধারির
খেলা, আর ছিল একজোড়া যুবক-যুবতীর ভালবাসা শুরুর গল্প। সৃষ্টিছাড়া সে ভালবাসায় ভেসে
যায় তারা দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকী দিনগুলোতে। ক্লাসের
অবসরে কিংবা ছুটির দিনগুলোতে তারা প্রায়ই এসে বসত লেকের পারে ছাতিম গাছটার তলে। মাঝে
মাঝে ছাতিম গাছের ছায়ায় বসে নাদিভ জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’ থেকে তার দরাজ
গলায় আবৃত্তি করত
সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি;
বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনাঃ
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে
এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে-আরো দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর।
কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে!
আকাশের আড়ালে আকাশে
মৃত্তিকার মতো তুমি আজঃ
তার
প্রেম ঘাস হ’য়ে আসে।
সুরঞ্জনা,
তোমার হৃদয় আজ ঘাসঃ
বাতাসের ওপারে বাতাস-
আকাশের ওপারে আকাশ।
আবার কখনোবা William Wordsworth
এর লেখা থেকে-
I
wandered lonely as a cloud
That floats on high o’er vales and hills,
When all at
once I saw a crowd,
A host, of golden daffodils;
Beside
the lake, beneath the trees,
Fluttering and dancing in the breeze.
আবৃতি করার মুহূর্তগুলোতে স্বাতি পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে
থাকত নাদিভের দিকে। তার খুব ভাললাগে নাদিভের এই হঠাৎ লাগামছাড়া কণ্ঠে কবিতার জাল বোনা
কিংবা উচ্চকণ্ঠে সিনেমার যত উদ্ভট গান গাওয়া, ভাল লাগে তার সব পাগলামী এবং অযথা হৈ
চৈ। কখনোবা সে কহলিল জিবরানের কোন লেখার মর্মার্থ নিয়ে তার সঙ্গে গভীর তর্ক জুড়ে দেয়।
When love beckons
to you, follow him,
Though his ways are hard and steep.
And when his wings enfold you yield to him,
Though the sword hidden among his pinions may wound you.
And when he speaks to you believe in him,
Though his voice may shatter your dreams
as the north wind lays
waste the garden.
স্বাতি যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেট ক্লাবের
সদস্য কিন্তু নাদিভের এসব পাগলামির সঙ্গে সে কখনও পেরে উঠে না। হয়তবা সে ইচ্ছে করেই নাদিভের কাছে হেরে যেতে চায়।
ভালবাসার মানুষের কাছে হেরেও সুখ। আসলে নাদিভকে ঘিরে তার একধরনের ঘোরলাগা অনুভূতি কাজ করে। তাকে ঘিরে সে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। কিন্তু বাস্তবতার
দুর্ভেদ্য প্রাচীর চোখের সামনে এসে দাঁড়ালে ভীষণ কষ্ট হয় তার। সে বুঝে উঠতে পারেনা
সে কি করবে! মাঝে মাঝেই সে দিকভ্রান্ত হয়ে যায়। কঠিন বাস্তবতায় তারা দু’জন ভিন্ন
ধর্মের অনুসারী এবং আজন্মের লালিত বিশ্বাস আর সংস্কার তাদের মাঝে যোজন দূরত্ব পেতে
রেখেছে। সে
জানে তাদের এই সম্পর্ক দেশ-কাল-পাত্রের উর্ধে তো নয়! বাড়ীতে বৃদ্ধ পিতা,তিনি শুনলে
তাকে নির্ঘাত সম্পর্কচ্যুত করবেন। আর তার মা এই অসম সম্পর্কের কথা জানলে হয়ত লোক-লজ্জার ভয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পরবেন। বিভিন্ন
পূজা পার্বণে পরিবার-পরিজন, কাছের কিংবা দূরের আত্মীয় স্বজন আর ভাইবোনদের নিয়ে
আনন্দ উল্লাসের চিত্র টুকরো টুকরো স্মৃতি হয়ে তার চোখের সামনে ভেসে আসে। সে জানে তার
পক্ষে কোনভাবেই ধর্ম-সংস্কার ত্যাগ করা সম্ভব না। সে পারবেনা জীবনের এতটা পথ
মাড়িয়ে এসে এখন নতুন করে অন্য ধর্মে দীক্ষিত হতে কিংবা নতুন বিশ্বাস ধারণ করতে। ব্যাপারটা নিয়ে সে অনেকবারই নাদিভের সঙ্গে খোলাখুলিভাবে কথা বলতে চেয়েছে কিন্তু নাদিভ
কখনোই এটাকে তেমন সিরিয়াসলি নেয়নি। বরং স্বভাব সুলভ ভাবে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে সে।
নাদিভের ধারণা যে উদার আর মানবিক ধ্যান ধারণায় তার বাবা-মা তাকে গড়ে তুলেছেন তাতে
ধর্ম বা সংস্কারের মত বিষয়গুলো স্বাতির সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে
পারেনা। নাদিভ তাই দৃঢ় বিশ্বাসে সবসময় স্বাতিকে বলেছে সময় আসুক তখন ভেবে দেখা
যাবে, এখন ওসব নিয়ে অযথা মাথা ঘামিয়ে মন খারাপ করতে রাজী নয় সে। স্বাতি
ভেবে পায়না সে কি করবে। একদিকে পরিবার-সমাজ-ধর্ম আর আরেকদিকে তার ভালবাসা। দু’টোই
সমান গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে। সে জানে নাদিভও তাকে খুব ভালবাসে, তাকে ছেড়ে সে থাকতে
পারবেনা। কিন্তু সে জানেনা সামনে হিমালয়ের মত দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ সমান বাঁধার দেয়াল
তারা পেরোবে কি করে!
লেকের পারে নাদিভের
প্রিয় জায়গাটাতে বছর জুড়ে থাকে প্রকৃতির পালাবদলের অদ্ভুত সুন্দর সব দৃশ্য! নাদিভ
কখনও সেসব ক্যামেরার লেন্সে, পেন্সিল স্কেচে কিংবা কবিতার লাইনে বন্দী করে রাখে আবার
কখনওবা শুধুই দু’চোখ ভরে উপভোগ করা! গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ কাঠ ফাটা রোদে সেখানে থাকে
অখন্ড নির্জনতা, বাতাসে আমের মুকুল আর কাঁঠালের এঁচোড়ের মাদক ছড়ানো ঘ্রাণ। ঘন
বর্ষায় তারা ছাতার নীচে বসে লেকের কাকচক্ষু পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা দেখতে ভালবাসে। ঢোল
কলমির বনে তখন শ্যাওলা মুখো কচুপাতার
আড়ালে সোনা রাঙা ব্যাঙগুলো দিনভর এস্রাজ বাজায় আর লাজুক পানকৌড়িগুলো ডুব জলে
সাঁতার কেটে সরে যায় দূর থেকে দূরে। বাতাসে শুধু বেলি, বকুল আর দোলনচাঁপার বৃষ্টি
ভেজা ঘ্রাণ। সারা দিনের বৃষ্টির শেষে মেঘের আড়াল থেকে যখন সূর্যটা উঁকি দেয় তখন
লেকের ধারে হেলে থাকা হেলেঞ্চা আর নলখাগড়ার পাতায় খেলা করে নানা রঙের ফড়িং। শরতে
লেকের ওপার জুড়ে কাশফুলের সে কি দারুণ মাতামাতি! কোজাগরী রাতে চারদিক ভেসে যায়
দুগ্ধ ফেনানিভ জোৎস্নায়। তখন সাদা কাশফুলগুলো কেমন অপার্থিব সৌন্দর্যের ফোয়ারা
নিয়ে বসে থাকে তাদের মুগ্ধ করবে বলে। বেলা শেষের আগে সেসব কাশবনে
ঘুরে বেড়ায় দিকভ্রান্ত মুনিয়ার ঝাঁক আর সবুজ বন টিয়া। হেমন্তের দিনগুলোতে বাতাসে
হালকা শীতের সঙ্গে লেকে শুরু হয় সাইবেরিয়ান যাযাবর পরিযায়ী পাখীগুলোর আনাগোনা। বাতাসে
তখন লাস্যময়ী হিমঝুরি আর স্বর্ণচাঁপার হালকা ফিনফিনে ঘ্রাণ ফিঙ্গেদের লেজে দোল
খেয়ে যায়। লেকের পারে শীতকালটা কেমন যেন মনখারাপ করা, যেন শিল্পীর তুলির আঁচরে
বিষণ্ণতার রঙ ছোঁয়ানো চারদিক। মেহগনি গাছগুলো পাতা হারিয়ে কেমন যেন বিবর্ণ রূপ
ধারণ করে। তখন সকালের সোনা রোদে ঘুঁটে শালিকের দল ঝগড়া থামিয়ে রোদ পোহায় আর
শীতার্ত ঘুঘু উদাস মনে ডেকে যায় একটানা ঘু ঘু ডাক। লেকের পারে প্রকৃতির আসল রূপটা ফুটে ওঠে বসন্তের বিবাগী
দিনগুলোতে। শিমুল-পলাশ আর মান্দার গাছগুলোতে তখন যেন আগুন লাগে, টকটকে লাল ফুলে ভরে
যায় গাছের শাখা-প্রশাখা। চারদিকে রঙ-বেরঙের ফুলের কেমন মন মাতানো সৌরভ! ফুলের
মাথায় উড়ে বেড়ায় নানান রঙের প্রজাপতি আর ঘাসের বুকে খাবি খায় সবুজ ঘাস ফড়িং। হালকা
ফিনফিনে বাতাস মনে অনুরণন তোলে, ইচ্ছে করে কাউকে ভালবাসতে, ভালবাসায় বিলীন হতে। বসন্তের
সেই ভালবাসার দিনগুলোতে নাদিভের মাঝে কেমন চঞ্চলতা আর দস্যিপনা এসে ভর করে। চৈত্রের উত্তাল বাতাসে ভেসে আসা পথভ্রান্ত পেঁজা শিমুল
তুলা দু’হাত পেতে ধরার জন্য তার সে কি দারুণ মাতা-মাতি! আবার কখনও মেহগনি বনে হঠাৎ হঠাৎ বাতাসের ঘূর্ণির
মাঝে শুকনা পাতার উদ্দাম দাপাদাপি দেখে সেও তার মাঝে ঢুকে পড়তে চায়। তার এসব পাগলামি আর
ছেলেমানুষি দেখে স্বাতি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। মমতায়
ওড়নার প্রান্ত দিয়ে মুছে দেয় নাদিভের ঘামে ভেজা মুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, ক্যাফেটেরিয়া
আর ক্লাসের ফাঁকে লাইব্রেরীতে বই’র পাতার ভাঁজে ফেলে আসা তারুণ্যের উদ্দাম ভরা ভালবাসার
সেই দিনগুলো সত্যিই কি দারুণ সুন্দর!
মাস্টার্স শেষে লেখাপড়ার ঝামেলা শেষ হতে না হতেই
নাদিভের শুরু হয় চাকুরী খোঁজার ঝক্কি। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে দিনাজপুরে একটা
বেসরকারি কলেজে চাকুরী হয় তার। চাকুরীতে
বছর না ঘুরতেই স্বাতির চাপে মেস ছেড়ে শহরের ঘাসি পাড়ায় একটা দু’রুমের বাসা ভাড়া
নিয়ে টুকটাক করে সাজিয়ে তোলে নিজের ছোট সংসার। এরপর অনেক জল্পনা কল্পনার শেষে তারা
তাদের ধর্ম-মত পরিবর্তন না করে কোর্টে যেয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিয়ের কাজটা
সেরে ফেলে। শুরু হয় নাদিভ আর স্বাতির নতুন জীবনের সূচনা। একে অপরের ওপর নির্ভর করে সামনে এগিয়ে চলা আরকি!
স্বাতি তার ধর্মমত পরিবর্তন না করলেও তার বাবা সুশান্ত ব্যানার্জি মুসলিম ছেলের
সঙ্গে তার মেয়ের এই বিয়ে মেনে নিতে পারেন না। তিনি এবং তার পরিবারের সবাই স্বাতির
সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। নাদিভের বাবা-মা অবশ্য খানিকটা উদারতার পরিচয় দিয়ে বুকে
পাথর বেঁধে হলেও একমাত্র ছেলের এরকম সৃষ্টিছাড়া বিয়ে মেনে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে আত্মীয়
স্বজনদের চাপে পরে তারাও বেঁকে বসেন। তারা ছেলেকে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী বিয়ে করার
জন্য ক্রমাগত চাপ দেন। অবশ্য স্বাতি তার ধর্ম মত পরিবর্তন না করলে বা ইসলাম ধর্মে
দীক্ষিত না হলে তা’তো সম্ভব নয়। কিন্তু স্বাতি এবং নাদিভের বাবা-মা তাদের
সিদ্ধান্তে একদম অনড় থাকায় নাদিভ দিশেহারা বোধ করে। একরকম দোটানার মাঝে কখনও পড়তে হতে পারে তা’ সে স্বপ্নেও
ভাবেনি। তার
পক্ষে স্বাতি কিংবা বাবা-মা কাউকে ছেড়ে থাকা এককথায় সম্ভব না। তাদের সবাইকেই সে
অসম্ভব ভালবাসে। কিন্তু ক্রমাগত মানসিক চাপ আর দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে তার
মাঝে এক ধরণের মানসিক বৈকল্য দেখা দেয়। আগে থেকেই নাদিভের ঘর পালানোর রোগটা ছিল, বাস্তবতার
নির্মোহ বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে তা’ থেকে মুক্তি পেতেই যেন প্রায়ই সে এদিক সেদিকে বেরিয়ে
পড়ে। দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’তিন দিন পরে উসকো-খুসকো চুল-দাড়ি আর ময়লা জামা-কাপড়ে
যখন সে বাসায় ফেরে তখন তার দিকে তাকান যায়না। নাদিভের এই বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায়
তার কি করা উচিত স্বাতি বুঝে উঠতে পারেনা। একদিকে ভালবাসার মানুষটার জন্য মমত্ববোধ
আর অন্যদিকে আজন্মের লালিত বিশ্বাস ধরে রাখার তীব্র বাসনার মাঝে পড়ে গভীর মর্মবেদনায়
সে বিভ্রান্ত।বাবা-মা
সম্পর্ক ছিন্ন করায় তাদের সঙ্গেও আলোচনা করার সুযোগ থাকেনা। একা একা ভেবে পায়না সে
কি করবে। সে বোঝে না আমাদের
এই সমাজ ব্যবস্থায় কেন শুধু মেয়েদেরই ত্যাগ স্বীকার করতে হয়!
বিগত কয়েক মাসের
মত সেদিনও সকালে নাস্তার পরে নাদিভ আর বাসায় ফেরেনি। স্বাতি প্রথমে ভেবেছিল ছুটির
দিন বলে হয়ত গুড়গোলায় তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু নুহাইদের ওখানে আড্ডা মারতে গিয়েছে।
নুহাইদ আর সে একই হলে থাকত। পড়াশুনা শেষে নুহাইদ এখন সুইহারিতে বাবার ব্যবসা
দেখছে। কিন্তু নাদিভ দুপুর গড়িয়ে রাতেও বাসায় না ফিরলে সে মোটামুটি ধরে নেয় আবারও ঘোড়া
রোগ ভর করেছে তার পতি দেবতার ওপরে। আগেরদিন অনেক রাত অবধি তাদের মাঝে ঝগড়া হয়েছিল
এবং পরদিন সকালে নাদিভ তার বাবা-মার সঙ্গেও মোবাইলে তর্ক করেছে অনেকক্ষণ। তাদেরকে বোঝাতে
চেষ্টা করেছে। বিষয় সেই একটাই। স্বাতির ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম নিয়ম অনুসারে
পুনরায় বিয়ে করা। বিয়ের দু’মাস পর থেকেই এসব দেখতে দেখতে তার এখন গা সওয়া হয়ে
গিয়েছে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে স্বাতি জানে এখন নাদিভের মোবাইলে ফোন করে লাভ নেই, সে
কল রিসিভ করবেনা। অভিমান ভাংলে দু’তিন দিন পরে সে নিজেই বাসায় ফিরবে। কিন্তু দিন গড়িয়ে সপ্তাহ হতে চলল অথচ নাদিভের দেখা নেই, অজানা
আশঙ্কায় তার গা শিউরে ওঠে।
স্বাতি উদ্ভ্রান্তের
মত নাদিভের মোবাইলে বারবার ফোন করে কিন্তু রিং টোন বাজলেও কেউ সে কল রিসিভ করে না। নাদিভের
বাবা-মাকে ফোনে বিষয়টা জানালে তারাও উদ্বিগ্ন হন এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছে ফোন করে
খোঁজ নিতে বলেন। স্বাতি নাদিভের খোঁজে বন্ধুদের অনেককে ফোন করে কিন্তু কারও কাছে
কোন তথ্য না পেয়ে শেষে ছুটে যায় নাদিভের
বন্ধু নুহাইদের কাছে। সেও এবিষয়ে কিছু জানেনা বলে জানায়। নাদিভ সেদিন আসলে তার
কাছে যায়নি। নুহাইদ স্বাতিকে নিয়ে দিনাজপুর শহরের সব
ক্লিনিক,হাসপাতাল ঘুরে শেষে থানায় যায়। কিন্তু কেউই তাদের কোন খবর দিতে পারেনা।
থানার ওসি তাদেরকে একটা জিডি করে পত্রিকায় ছবিসহ নিখোঁজ সংবাদ ছাপতে পরামর্শ দেন। হু
হু করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে স্বাতি। নুহাইদ কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা। স্বাতিকে
অনেক কষ্টে বুঝিয়ে বাসায় পাঠিয়ে সে নিজেই থানায়
জিডি করে জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় অফিসে যায় নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিতে। ছেলের খোঁজে
অস্থির হয়ে নাদিভের বাবা-মাও এসে পৌঁছেন দিনাজপুরে। তারাও আত্মীয় স্বজনদের কাছে খোঁজ খবর নেন কিন্তু কেউই
তাদের ছেলের সংবাদ দিতে পারেন না। এদিকে পত্রিকায় নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পর থেকে
শুরু হয়েছে আরেক জ্বালা। প্রায় প্রতিদিনই সময়ে অসময়ে কেউ না কেউ ফোন করে অর্থের
বিনিময়ে নাদিভের খবর দিতে চায়। আবার কেউ কেউ তার স্বামীর মত কাউকে কোথাও দেখেছে জানিয়ে
অর্থ দাবী করে। তার
এই দুঃসময়ে মানুষের এধরনের নিষ্ঠুর আচরণে স্বাতি বিপর্যস্ত বোধ করে।
দিন কয়েক
দিনাজপুরে কাটিয়ে ছেলের বউকে সঙ্গে নিয়ে কুড়িগ্রামে ফিরে আসেন নাদিভের বাবা-মা।
কিন্তু এভাবে বসে থেকে অপেক্ষার প্রহর গুণতে
কারইবা ভাল লাগে! স্বাতির মুখের দিকে তাকান যায়না। স্বর্ণচাঁপার মত ফুটফুটে মেয়েটা
শুকিয়ে প্রায় কঙ্কালসার হয়ে গেছে। প্রচণ্ড অনুশোচনা এসে ভর করে নাদিভের বাবা-মা’র মাঝে।
মেয়েটা ভালবাসার টানে নিজের পরিবার-সমাজ-সংস্কার
ছেড়ে নাদিভের কাছে ছুটে এসেছিল। কি হত অতটুকু অপ্রাপ্তি মেনে নিলে! আশেপাশে এধরনের
বিয়ে আজকাল প্রায়ই তো হচ্ছে। কিন্তু তারা কি করবে! আত্মীয় স্বজনদের কটু কথা আর
বাক্যবাণে জর্জরিত হয়ে মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাদের।
তাদেরকে তো সমাজেই বসবাস করতে হয়। আত্মীয় স্বজনদের মতামত উপেক্ষা করে কি করে! একঘরে
হওয়ার ভয়ে তাদের কথা শুনতে যেয়ে একমাত্র সন্তান আজ নিখোঁজ অথচ তারা কেউই আজ তাদের পাশে
নেই। নাদিভের বাবা একাই ছেলের খোঁজে কোথায় কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছেন! এদিকে স্বাতির
শরীরটাও ভাল যাচ্ছেনা। এমনিতে বোঝা যায়না, ছ’মাসের অন্তঃসত্তা সে। মাহবুবা
বেগম তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন ঠিক করেন।
প্রায় দেড়
সপ্তাহ কেটে গেল কিন্তু এখনও নাদিভের কোন খোঁজ নেই। কলেজের কলিগদের পরামর্শে আলতাফ
সাহেব ছেলেকে খুঁজে পেতে র্যাবের সহায়তা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কুড়িগ্রামে র্যাবের
অফিস নেই,রংপুরে যেতে হবে। একদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ স্বাতিকে নিয়ে রংপুরে র্যাব
ক্যাম্পে যান আলতাফ সাহেব। র্যাব ক্যাম্পের ইনচার্জ এ এস পি জাফর গভীর মনোযোগের
সঙ্গে তার সমস্যাটি শোনেন এবং দরখাস্তসহ অন্যান্য কাগজপত্র জমা নিয়ে তারপক্ষ থেকে
সর্বোত্তমভাবে সহায়তার আশ্বাস দেন। আলতাফ সাহেব কাল পোশাকের আড়ালে থাকা মানুষটির
সংবেদনশীল আচরণ ও সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহারে অভিভূত হন।
এ এস পি জাফর
একজন চৌকষ ও দক্ষ অফিসার। প্রায় ছ’মাস হতে চলল তিনি রংপুরে র্যাবে আছেন। তিনি আলতাফ সাহেবের ছেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি বেশ গুরুত্ব
সহকারে নিয়ে এর ওপরে জোর অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেন। তদন্তের শুরুতেই নাদিভের ব্যবহৃত
ফোন নাম্বার নিয়ে তিনি বিগত কয়েক মাসের কল ডিটেইলস সংগ্রহ করেন। যদিও এ অঞ্চলে
সাধারণ চুরি-ছিনতাই ছাড়া কিডন্যাপিং’র মত গুরুতর অপরাধগুলো তেমন একটা ঘটেনা তবুও
তদন্তের স্বার্থে সে লাইন ধরেই তিনি এগোতে থাকেন। তবে নাদিভের মোবাইলের কল লিস্ট এনালাইসিস
করে বোঝা যায় যে এটা কিডন্যাপ বা সে ধরনের কোন ঘটনা না। কারণ যেদিন সে বাসা থেকে
বের হয়ে গিয়েছিল তার পরের দুই দিন পর্যন্ত মোবাইল সেট ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। কল
হিস্ট্রি ঘেঁটে দেখা যায় নাদিভ নিজে এবং তার বন্ধুরাও মোবাইলে ফোন করে বিভিন্ন
সময়ে বেশ কয়েকবার কথা বলেছে। তাকে কিডন্যাপ করা হয়ে থাকলে এমন হওয়ার কথা না। যদিও
কল লিস্ট অনুযায়ী তার কলের সংখ্যা তেমন বেশী না তবুও তার ব্যবহৃত মোবাইল
টাওয়ারগুলোর অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে সে সাভার
বাজার কিংবা তার আশেপাশের এলাকায় ভ্রমণ করেছে। সাভারের পর থেকে নাদিভের মোবাইল ফোন
ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়না। আর
বর্তমানে সেটি পুরাপুরি বন্ধ বোঝা
যাচ্ছে। হয়ত সেটা হারিয়ে গেছে কিংবা ব্যাটারির চার্জ নেই। কল লিস্ট
ধরে নাদিভের বিভিন্ন সময়ে করা ফোন নাম্বারগুলো যাচাই করে দেখা যায় তারা সবাই পরিচিত জন কিংবা বন্ধুবান্ধব। তারা নাদিভের নিখোঁজ
সংবাদে বরং বিস্মিত হয়। নাদিভের সঙ্গে কথা বলার সময়ে বন্ধুদের মধ্যে কারো কারও হয়ত
তাকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত মনে হয়েছিল কিন্তু সে যে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছে তা
বিন্দুমাত্র বোঝা যায়নি। আর বিভিন্ন সময়ে যারা ফোন করে নাদিভকে খুঁজে পাওয়ার তথ্য দিতে
চেয়েছিল তাদের কয়েকজনকে ফোনে কিংবা অ্যারেস্ট করে ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে
যেটা জানা যায় যে তারা আসলে ধাপ্পাবাজি করে কিছু টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দী এঁটেছিল।
এর বেশী কিছু না। নাদিভের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটা বেশ রহস্যজনক হলেও এ বিষয়ে এর বেশী
এগোনো সম্ভব হয়না। নাদিভের বাবা-মা এবং স্ত্রীকে ডেকে তদন্তের অগ্রগতি
জানান হয়। নাদিভকে খুঁজে পাওয়া যায়নি জেনে তারা খানিকটা হতাশ হলেও তদন্তের মাধ্যমে
যতটুকু জানা গেছে তার জন্য র্যাব অফিসারের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ এস পি
জাফর তার হাতের অন্য কাজগুলোর পাশাপাশি নাদিভের ঘটনাটার দিকে নিজেই খেয়াল রাখবেন
এবং কোন তথ্য পাওয়া গেলে তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গেই ফোনে জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
তিনি ফাইলটি বন্ধ না করে নিজের কাছেই পেন্ডিং ফোল্ডারে রেখে দিয়ে অন্যান্য রুটিন
কাজগুলোতে দৃষ্টি দেন।
কয়েকদিন পরের
কথা।
লাঞ্চের
পরে সেদিন জাফর সাহেবের হাতে তেমন কাজ ছিলনা। টেবিলের পাশ থেকে জাতীয় দৈনিকটা হাতে
নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরাতে পত্রিকার ভিতরের পাতায় একটা ছোট খবরের হেড লাইনের দিকে
দৃষ্টি আটকে যায়, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের
লেকের পারে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ।’ পত্রিকায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী বেশ কয়েকদিন ধরে ডেডবডিটা সেখানে ঝোপের পাশে পড়েছিল, পচে
গলে তাই প্রায় বিকৃত হয়ে গেছে। জাফর
সাহেব জানেন একজন মানুষ মারা যাবার ৩/৪ ঘণ্টা পরে ডেডবডির রিগর মর্টিস শুরু হয় এবং
পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তা সম্পন্ন হয়ে ডেডবডি বিশ্লিষ্ট বা গলে যেতে শুরু করে। চিকিৎসা
শাস্ত্রের ভাষায় একে বলা হয় ডিকম্পজিশন এবং এর মোট পাঁচটি পর্যায় বা ধাপ আছে। নাদিভ নিখোঁজ হয়েছে প্রায় দু’সপ্তাহ হতে চলল। যদি সে আদৌ মারা যেয়ে থাকে তাহলে তার
ডেডবডি এখন ডিকম্পজিশনের দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ Putrefaction
Stage এ থাকার কথা। সাধারণত কেউ মারা যাওয়ার ০৪-১০ দিন পরে
ডেডবডির এই ধাপটা শুরু হয় এবং শরীরের ডিকম্পজিশন শুরু হয়ে গেলে অনেক সময়ে লাশ
সনাক্ত করা সত্যিই কষ্টকর। মনটা কেন যেন খচখচ করে ওঠে। তিনি টেবিলের ড্রয়ার থেকে নাদিভের
ছবির সঙ্গে পত্রিকায় দেয়া চেহারার বর্ণনা মেলাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু
পত্রিকার পাতায় চেহারার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তার সঙ্গে নাদিভের চেহারা তেমন একটা
মেলেনা। তাছাড়া পরিণত বয়সে এত অল্পে কেউ আত্মহত্যা করেনা। তার চাকুরীর অভিজ্ঞতা
থেকে দেখেছেন যে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের মধ্যেই শুধু আত্মহত্যার প্রবণতাটা বেশী
দেখা যায়। তবুও তিনি কি ভেবে আলতাফ সাহেবকে ক্যাম্পে এসে দেখা করতে বলেন।
র্যাব অফিসারের কাছ থেকে পত্রিকার পাতাটা হাতে
নিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে স্বাতি। লেখাগুলো কেমন যেন জলো-ঝাপসা ঠেকে তার
কাছে। অচেনা শব্দগুলো পড়তে কষ্ট হয় তার। সামান্য ঘটনার কারণে নাদিভ অভিমান ভরে এত
বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার। বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা
লাগে। দু’চোখের পাতা দুঃখ-কষ্ট-অভিমানে ভারী হয়ে আসতে চায়। সে ওড়নার প্রান্ত দিয়ে
চোখ মুছে র্যাব অফিসারের দিকে তাকায়। তিনি বলেন শুনতে যদিও খারাপ লাগবে তবুও বলতে হচ্ছে যে
এটা শুধুই তার অনুমান। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে তার স্বামী বেঁচে আছেন কারণ
পত্রিকায় দেয়া বর্ননার সঙ্গে নাদিভের শরীরের রঙ মিলছে না। আলতাফ সাহেবেরও বিশ্বাস
হয়না তার ছেলে এরকম কিছু করে বসতে পারে।
তার ধারণা ওটা অন্য কোন হতভাগ্য যুবকের ডেডবডি। জাফর সাহেব তবুও তাদেরকে ঢাকায় যেয়ে একটু দেখে
আসতে অনুরোধ করেন। অনেক সময়ই মানুষ আবেগ বশতঃ কি করে বসতে পারে তা আগে থেকে ধারণা
করা যায়না। কারো কারও অনেক
সময় বড় কষ্টেও কিছু হয়না আবার অনেক সময় সামান্য তুলার
আঘাতে ঠুনকো কাঁচের মত ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়ে। শংকর তার এক লেখায় বলেছিলেন ‘মানুষের মন বড়ই
বিচিত্র’! তিনি সাভার থানার ওসির মোবাইল নাম্বারটা সংগ্রহ করে জানতে পারেন ডেডবডি
বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে আছে। পোস্টমর্টেম শেষে ডেডবডি হিমঘরে রাখা
হবে। তাড়াতাড়ি সেখানে যেয়ে সনাক্ত না করলে তারা আঞ্জুমানে মফিদুলকে ডেডবডি সৎকারের
জন্য হস্তান্তর করা হবে। তথ্যটা জানিয়ে তিনি তাদেরকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেন।
আলতাফ
সাহেব তার স্ত্রী এবং পুত্রবধূসহ একটা মাইক্রোবাস নিয়ে সাভার থানার ওসি সাহেবের
সঙ্গে দেখা করেন। থানার ওসি ইন্সপেক্টর বখতিয়ার আলম একজন সজ্জন ব্যক্তি। প্রায় এক
বছর ধরে সাভার থানার ওসি হিসাবে কর্মরত। তিনি আলতাফ সাহেবের কাছে সব শুনে
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অনুলিপি রেখে দেন। চেহারার বর্ণনা শুনে তার মনেহচ্ছে এই
ডেডবডি আলতাফ সাহেবের ছেলের নাও হতে পারে তবুও মানসিকভাবে প্রবোধ দেয়ার জন্য তাদেরকে
দু’জন কনস্টেবলসহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠিয়ে দেন।
মর্গের পাশেই
হিমঘর। সেখানে ধাতব র্যাকে রাখা কফিন ট্রেতে সারি বেঁধে শুয়ে আছে সব ডেডবডি।
হিমঘরের ইনচার্জ নির্দিষ্ট র্যাকের সামনে যেয়ে কফিন ট্রের হাতল ধরে সামনে টান
দেন। কফিনের ঢাকনা খুলে যায়। এরপর বডি ব্যাগের চেইনটা টেনে নামিয়ে দিতেই গুমোট
বাতাসের সঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইড আর মিথেনের মিশ্রিত দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরে চারদিক। নাক
রুমালে চেপে ধরে কফিনের দিকে এগিয়ে যায় নাদিভের বাবা-মা। এদিকে কফিনের ঢাকনা খোলার
সময়েই দু’চোখ বন্ধ করেছিল স্বাতি। তার মন বলছে এই ডেডবডি নাদিভের না তবুও সে কঠিন
বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়। সে বিশ্বাস করতে চায় এই ডেডবডি নাদিভের না। তার
স্বামী এভাবে মারা যেতে পারেনা। তার জলে ভেজা দু’চোখ বন্ধ থাকলেও তীক্ষ্ণ কান ঠিকই
শুনতে পায় মাহবুবা বেগমের হৃদয় নিংড়ানো আর্ত চীৎকার। স্বাতির হঠাৎ মাথাটা ঝিম মেরে
ধরে, পায়ের নীচের মাটি যেন দ্রুতই সরে যায়। ফ্লোরে লুটিয়ে পরে সে। তাকে ধরাধরি করে বাইরে
একটা বেডে শুইয়ে মুখে পানি ছিটান হয়। কিছুক্ষণ পরে সে চোখ মেলে ফ্যাল ফ্যাল করে
তাকায় কিন্তু তার দু’চোখের দৃষ্টি যেন হারিয়ে গেছে। একটু কসরত করে উঠে বসে সে।
এরপর শাশুড়ির কাঁধে ভর দিয়ে কফিনের দিকে এগিয়ে যায়। মুখের মাংস যদিও আলগা হয়ে প্রায়
তেলতেলে সাদা পনিরের মত হয়ে গেছে কিন্তু কপালের বাম দিকে ভ্রূর উপরে কাটা দাগটা
দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়না ওটাই নাদিভের ডেডবডি। ছোটবেলায়
দুষ্টামি করতে যেয়ে টেবিলের কোনায়
আঘাত লেগে ওখানে কেটে গিয়েছিল। ঘা শুকিয়ে গেলেও সেখানে গভীর ক্ষতচিহ্নটা টিকে ছিল
দুষ্টামির সাক্ষী হয়ে। কতবার সে গভীর আবেগে চুমু দিয়েছিল নাদিভের ক্ষত চিহ্নটাতে। সেসব একান্ত আপনার
মুহূর্তগুলোকে ইতিহাস করে দিয়ে নাদিভ আজ তার সামনে বডি ব্যাগের ভিতরে শুয়ে আছে। সে
এত নিষ্ঠুর হল কেন! স্বাতির কথা সে একবারও ভাবল না! ভাবল না তাকে ছেড়ে সে কিভাবে
একা বেঁচে থাকবে? তারতো আপন বলতে আর কেউ রইল না! বাবা-মাকে ছেড়ে যার বুকে আশ্রয়
নিয়েছিল, যাকে ঘিরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল সে কেন এভাবে চলে গেল? স্বাতির বুক
ঠেলে হু হু করে কান্না বেরিয়ে আসে। সে কফিনের কোনাটা ধরে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে পরে।
মেডিকেল কলেজের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আরেকটা
মাইক্রবাসে নাদিভের ডেডবডি তুলে তারা সাভার থানার উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। স্বাতি ওসি
সাহেবকে অনুরোধ করে একজন গাইড দিয়ে নাদিভের ডেডবডিটা যেখানে পড়েছিল সে স্থানটা দেখিয়ে দিতে। ওসি বখতিয়ার
সাহেব স্বাতির মানসিক অবস্থার কথা ভেবে নিজেই তাদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যান। লেকের পারে মেহগনি
গাছের সারির নীচেই শুকনা পাতার আড়ালে
পড়েছিল নাদিভের ডেডবডিটা। এদিকটাতে
ঝোপঝাড় বেশ বেড়ে যাওয়ায় সহজে কারও চোখে
পড়েনি। ঘটনার
কয়েকদিন পরে পাতাকুড়ানির দল শুকনা পাতার খোঁজে এদিকটায় এসে পাতার আড়ালে একটা
ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখে। হয়ত তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের
গার্ডদের খবর দেয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ থানায় ফোন করে জানায়। স্বাতি
চারদিকে তাকায়। নিউরনে গেঁথে থাকা আবেগঘন মুহূর্তগুলো দৃশ্যমান হয় চোখের সামনে। এখানে
মাটির প্রতিটি ইঞ্চিতে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে তার আর নাদিভের পায়ের ছাপ। ছাত্রজীবনে
তারা কতবার এখানে এসেছিল। লেকের পারের প্রতিটি গাছ-লতা-পাতা তার মুখস্ত,
চির চেনা। কত স্মৃতি তার ওসব জড়িয়ে! ছেঁড়া ছেঁড়া সেসব স্মৃতি মনেপরে যায়। বুড়ো
ছাতিমগাছটা আজো দাঁড়িয়ে আছে সেই একই রকম ভাবে। হয়ত এখনো তার ডাল ভরে ওঠে ফ্যাকাসে
সবুজ থোকা থোকা ফুলে। কিন্তু সেসব দু’চোখ ভরে দেখার জন্য নাদিভ আজ আর বেঁচে নেই।
সে চলে গেছে দূরে, বহু দূরে না ফেরার দেশে। একদিন যে উঁই ঢিবিটার ওপরে দাঁড়িয়ে
নাদিভ চীৎকার করে জয় গোস্বামীর কবিতা আবৃত্তি করত
পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন
এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা
পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।
অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে
তুমি
ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন
পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব
পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন।
সেই ঢিবিটা রয়ে গেছে আজো ঠিক তেমনি ভাবে। পরিবর্তন বলতে
হলদেটে মাটির বদলে এখন সেখানে শুধুই কানসোনার ঝাড়। ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরে আছে বামনাকৃতির
গাছগুলো। ঢিবির পাশেই বসে পড়ে স্বাতি। আলতাফ সাহেব স্বাতির পাশে এসে দাঁড়ান। পিতৃ
স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বেলা পড়ে যাচ্ছে,তাদের অনেকটা পথ যেতে হবে।
এছাড়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃতদেহের সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বাতি উঠে
দাড়াতেই বখতিয়ার সাহেব কোত্থেকে একটা কাগজের টুকরা কুড়িয়ে এনে তার সামনে মেলে ধরেন।
ওসি সাহেবের অন্য হাতে ধরা কাঁচের শিশিটা
তখনও স্বচ্ছ তরলে আধেক পূর্ণ। স্বাতি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বর্ণহীন তরলটার
দিকে। ওটার কি কোন ঘ্রাণ আছে? সে জানেনা শিশির ভেতরের স্বচ্ছ তরলটার নাম? কিন্তু সে
এটুকু জানে যে ওটারই অর্ধেকটা মুখে ঢেলে তার স্বামী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। অদূরে
পাতার স্তূপে পড়েছিল শিশিটা,কাগজের টুকরাটাও সেখানেই পড়েছিল। ডেডবডি সংগ্রহের সময়ে
কেউ হয়ত খেয়াল করেনি। সে
অনেকটা রোবটের মত হাত বাড়িয়ে ওসি সাহেবের কাছ থেকে কাগজের টুকরাটা চেয়ে নেয়।
নাদিভের ডেথ নোট। গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে ইংরেজ কবি ক্রিস্টিনা রোজেত্তির লেখা
একটা ভালবাসার কবিতা। অনেকবারই সে আর নাদিভ লেকের পারে দাঁড়িয়ে কবিতাটা
আবৃত্তি করেছিল।
Remember me when I am gone away,
Gone far away into the silent land;
When you can no more hold me by the hand,
Nor I half turn to go yet turning stay.
Remember me when no more day by day
You tell me of our future that you plann’d:
Only remember me; you understand
It will be late to counsel
then or pray.
Yet if you should forget me for a while
And afterwards remember,do not grieve:
For if the darkness and corruption leave
A vestige of the thoughts that once I had,
Better by far you should forget and smile
Than that you should remember and be sad.
স্বাতি হাতের মুঠিতে চেপে ধরে নাদিভের লেখা ডেথ নোট। কাগজটা
মুচড়ে যায়। ওসি সাহেব না করেন না। ওটা স্বামীর স্মৃতি হিসাবে তার কাছেই থাকুক। মাহবুবা
বেগম স্বাতির কাছে এসে পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। এরপর তাকে অনেকটা জোর করে মাইক্রোবাসে
নিয়ে জানালার পাশে বসিয়ে দেয়া হয়। মাইক্রোবাস ছুটে চলে ধূলার মেঘ ছাড়িয়ে। পিছনে
পরে থাকে শুকনা পাতার চাদর। দমকা হাওয়ায় একসময় যেগুলো গাছ থেকে হয়ত সুরের মূর্ছনার
মত করে ঝরে পড়েছিল। নাদিভের ভাষায় ঝরা পাতার গান।
স্বাতি মাইক্রোতে বসে থাকে আলুথালু বেশে। তার চোখের নোনা জল শুকিয়ে গেছে অনেক আগেই কিন্তু গালে লেগে আছে তার শুকনা রেখা। দমকা বাতাস চুলগুলো উড়িয়ে নিতে চায়। কিন্তু তার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই। সে শুধু তাকিয়ে থাকে দূরের শুন্য রেখার দিকে। সেখানে সবুজ আঁকিবুঁকি। তার সে দেখা ভাবলেশহীন। কোন প্রাণ নেই তাতে। একটু থেকে থেকে কান্নার হেঁচকি আসে। মাহবুবা বেগম স্বাতির বাম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ভরে নিয়ে নীরবে কেঁদে চলেন। আলতাফ সাহেবের দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত, তিনি কাঁদতে পারেন না। তার পরিশ্রান্ত বুড়ো শরীর শুধু ঘুমাতে চায়। যেন রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে তার অবসন্ন দু’চোখে। কিন্তু প্রবল কর্তব্যবোধ জাগিয়ে রাখে তাকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে স্বাতি শুধু ভাবে এই পৃথিবী-চরাচর-বিশ্ব আগের মতই আছে। আগের মতই প্রকৃতিতে ঘটবে ঋতুর পালাবদল। জীবন একই ভাবে বয়ে চলেছে অথচ আজ পৃথিবীর এই রঙ-রূপ-রস দেখার জন্য নাদিভ বেঁচে নেই। বসন্ত আসবে বোধহয়। চারদিকে তার আগমনী বার্তা। রাস্তার পাশে পলাশ-মান্দার-শিমুল গাছে যেন আগুনের ছটা। খেজুরের ডালে নাচানাচি করছে দুষ্ট বুলবুলি আর বিশাল রেইন ট্রির কোটরে বাসা বানাতে ব্যস্ত ধূসর কাঠ ঠোকরা। কৃষ্ণচূড়ার উজ্জ্বল লাল-হলুদ পাপড়ি পড়ে আছে কাল রাজপথে। সেও নাদিভের পাশে থেকে প্রকৃতিকে চিনতে শিখেছে। ভালবাসতেও শিখেছে। বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে আবারও। ভিতরের সব কান্না উগড়ে বেরিয়ে আসতে চায় কিন্তু পারেনা। পেটের ভিতরে আরেকজন বেড়ে উঠছে যে! নড়ে উঠে সে জানান দেয় তার কাঁদা চলবে না। মাতৃ স্নেহে পেটের ওপরে ডান হাতটা ভাঁজ করে রাখে স্বাতি।
পোস্ট ভিউঃ 29