১
স্থান: জাঞ্জিবার এয়ারপোর্ট।
সময়: স্থানীয় সময় সকাল দশটা। ঝকঝকে সুন্দর সকাল।
গন্তব্য আপাতত নাইরোবি। সেখান থেকে দুবাই হয়ে ব্রিন্দিসি।
নির্ধারিত সীটে বসতে না বসতেই রুপালী ডানার প্লেনটা টেকঅফের প্রস্তুতি নিল। এন্টেবে থেকে দুবাই যাবার পথে নাইরোবিতে ট্রানজিট ছিল, সেটাকেই এক্সটেন্ডেড করে জাঞ্জিবারে ঘুরতে এসেছিলাম। ল্যাপটপ আর ক্যারি অন লাগেজ ওভারহেড বিনে রেখে কোমরের সীটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে জানালার বাইরে তাকালাম। যথারীতি উইন্ডো সিট। আমার জানালায় নীল জলরাশি আগলে রাখা বাদামী সৈকত ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ভারত মহাসাগরের কপোলে ছোট্ট টিপের মতো জাঞ্জিবার দ্বীপপুঞ্জে কয়েকদিন ছুটি কাটিয়ে নতুন কর্মস্থল ইটালির ব্রিন্দিসিতে জাতিসংঘের স্থায়ী লজিস্টিক বেইজে যোগ দিতে যাচ্ছি। ছুটি মানে তো দিনভর ঘুরে বেড়ানো অথবা বিচ চেয়ারে আধশোয়া হয়ে চিল্ড করোনা বিয়ারের সাথে রোস্টেড পিনাট আর সমুদ্রের ঢেউ গুনতে থাকা, হাতে ‘রুমি’স লিটল বুক অব উইজডম।’ আমার কাছে এন্টেবে মানে ডরিনমাখা মুহুর্ত, বিষাদঘন দিন আর স্মৃতিকাতর রাত। অফুরান মেলানকলিয়া থেকে মুক্তি পেতে আমার এই ব্রেকটা খুব দরকার ছিল!
প্রিসিশন এয়ারের ‘You are why we fly’ ট্যাগলাইনটা দারুণ। ক্যারিয়ারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাত-পায়ের মাংসপেশী যেন একটু শিথিল হয়ে এলো। সম্ভবত গতকাল রাতের ওয়াইল্ড পার্টির সাইড ইফেক্ট, কিংবা ককটেল আর জয়েন্টের ওভার ডোজ হতে পারে। জয়েন্ট বলতে গাঁজা ভরা সিগারেটের স্টিকের কথা বলছি। ভারত মহাসাগরের উদ্দাম ঢেউয়ের গা ছুঁয়ে আসা নোনা বাতাসের সাথে পারকাশনের বিট আর জয়েন্টের ধোঁয়ার মিশেলে আফ্রিকান ওয়াইল্ড নাইট! দূর্দান্ত অনুভূতি! লাভ ইউ আফ্রিকা, হাকুনা মাতাতা।
নর্থ কোস্টে আমার হোটেলটা ছিল একদম বিচ লাগোয়া, আর গতকাল রাতে ছিল তুমুল হ্যাপি আওয়ার। সন্ধ্যা হতেই সাউন্ড বক্সের ঢিপঢিপ শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। অগত্যা স্মারনফ ব্লু লেবেল ভদকার বোতলটা অদূরে ছুঁড়ে নাজারেথ আর আমি পার্টিতে যোগ দিয়েছিলাম। নাজারেথ আমার লোকাল গাইড, স্টিকের মশলা সেই ম্যানেজ করেছে। কথায় আছে When in Rome, do as the Romans do, নিজের চিন্তা-চেতনাকে তাই ডিজে’র হাতের যাদুকরীতে সমর্পন করলাম। মিউজিকের একেকটা নাম্বারে হাত-পা’র যেন স্বাধীন হবার দশা। Jennifer Lopez-এর Waiting For Tonight, Shakiraএর Hips Don't Lie, Modern Talking এর Cheri Cheri Lady, Brother Louie, Shaggy-এর It Wasn't Me, Angel, D'Banj-এর Fall in Love, Oliver Twist, Akon-এর Smack That ইত্যাদি একেকটা নাম্বারের সাথে উদ্দাম নাচ। র্যাপার Eminem এর Without Me, Love The Way You Lie, No Love, That's All She Wrote মহুয়ার মতো মাতাল করা সব নাম্বার।
নাচের ক্রাউড থেকে সামান্য দূরে বারবিকিউ-এর আগুন ঘিরে যুবক-যুবতীদের ভিড়। মশলার সাথে ভেড়ার মাংসের পোড়া গন্ধ পরিবেশটা তাতিয়ে রেখেছে। অ্যালমন্ডের ছাউনির নীচে বারটেন্ডার বিভিন্নভাবে শারীরিক কসরত করে ককটেল তৈরি করছে। ককটেলের যে গ্লাসটা হাতে নিয়েছিলাম তার নাম ‘নিক এন্ড নোরা’, ত্রিশের দশকের বিস্মৃতপ্রায় ‘লিটল মার্টিনি’ নব্বইয়ের দশকে নিউইয়র্ক সিটি’র বারটেন্ডার ডেল ডিগ্রফের হাতে নতুন নামে পরিচিত হয়। তারপর থেকে এই নামেই চলছে। আরিয়ান্না বারবিকিউ-এর ভিড়ে বন্ধুদের সাথে মজা করছিল, তার হাতের আঙুলের ফাঁকে জয়েন্টের আগুন। ককটেলের গ্লাসটা উঁচিয়ে ইশারা করতেই একমুখ হাসি নিয়ে আমার দিকটায় সরে এল। আমার গ্লাসে তখন ‘দ্য সেক্স অন দ্য বিচ’। ভদকার সাথে ক্র্যানবেরি, কমলার রস এবং পীচ স্ক্যাপস মিশিয়ে এই ককটেল। মিউজিকের কান ফাটানো শব্দের মাঝেই কানের কাছে মুখ রেখে চীৎকার করে বললাম,
: Hey! I’m having sex on the beach
সেও হাসতে হাসতে উচ্চস্বরে বললো,
: No man, you are drinking ‘sex on the beach’
আরিয়ান্না নিয়েছিল ‘মার্গারিটা’। টাকিলার সাথে লাইম জুস আর বরফের কুচি। কয়েকবার গ্লাস বদলে আমরা আলজিভের স্বাদ বদলে নিয়েছিলাম। আফ্রিকান ফ্রেশ গাঁজার ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আরিয়ান্না আমার হাতে ধরে রাখা ককটেলের ইতিহাস শুনিয়েছিল। টেড পিজিও নামে ফ্লোরিডার এক বারটেন্ডার নব্বইয়ের দশকে ককটেলটা উদ্ভাবন করেন। এটা কে কখন উদ্ভাবন করেছেন তা নিয়ে আমার মোটেই মাথাব্যাথা নেই, আমি শুধু ভাবছিলাম জিভের নাগালে এলে এর কাছ থেকে দূরে সরে থাকা কঠিন। আমিও পারিনি। আরিয়ান্নার ককটেল ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে তার এলোথেলো সোনালী চুলের অরণ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমার ভালো লাগে মেয়েদের গ্রীবার চুল সরিয়ে দিয়ে তাতে মুখ গুঁজে দেয়া। সেখানে নরম-রেশম চুলের যে গোছা তা আমাকে শিহরিত করে। মিউজিকের বিটের সাথে একাত্ম হয়ে একটার পর একটা স্টিক, আরিয়ান্না প্রতিবারই আমার ঠোঁট থেকে টেনে নিয়ে দীর্ঘ একটানে স্টিকের অর্ধেকটা পুড়িয়ে ফেলতো। তারপর কয়েক মুহুর্ত দম আটকে রেখে ধীরে ধীরে আমার মুখে ছেড়ে দিত। একলব্যের মতো গুরুদক্ষিণা দিতে দ্বিধা করিনি, আমিও তাইই করেছিলাম। শঙ্খলাগা ঘোরের ভিতরে আমরা, অথচ কেউই বিশ্বাস করেনি আরিয়ান্না’র সাথে পরিচয় মাত্র দু’দিন আগেই।
ইটালি’র তোরিনো শহর থেকে বন্ধুদের সাথে আরিয়ান্না জাঞ্জিবারের ছুটি কাটাতে এসেছিল। তোরিনো শহরটাকে আমরা তুরিন বলে জানি। আরিয়ান্না তার শহরের গল্প করেছিল, তার বেড়ে ওঠা, প্রথম প্রেম। এমনকি বয়ফ্রেন্ড কীভাবে লেঙ্গি মেরেছিল সে গল্পটাও শুনিয়েছিল। সে আমাকে ‘শ্রাউড অভ তুরিন’ এর ইতিহাস শুনিয়েছিল, ১৫৭৮ সালে যেটা শেষ পর্যন্ত তুরিনে গিয়ে পৌঁছে। সে আরেক গল্প।
নর্থ কোস্টের সাদা ধবধবে সৈকত আর ফিরোজা-নীল জলরাশির টানে প্রতিবছর প্রচুর ইটালিয়ান পর্যটক জাঞ্জিবারে আসেন। সপ্তাহখানেক বেড়িয়ে সাদা ত্বক ট্যান করে তারা ফিরে যান। শুধু বিকিনি ধরে রাখে শরীরের পূর্বের ছাপ, পর্ণমুভিতে এরকম দেখে এককালে খুব হাসি পেত। আবহাওয়া মেঘলা থাকলে পর্যটকরা সূর্যস্নান বাদ দিয়ে তারা এদিক সেদিক ঘুরতে বের হন। এরকম একটা টিমের সাথে আমি যোজানি ফরেস্টে ‘রেড কলোবাস মাঙ্কি’ দেখতে গিয়েছিলাম। পৃথিবীতে শুধু এখানেই এই প্রজাতির দেখা মেলে। এদের হাতে মোটে চারটে আঙ্গুল বলে কলোবাস নামে ডাকা হয়।
আরিয়ান্না’র সাথে প্রথম পরিচয় যোজানি ফরেস্টে, বিরল প্রজাতির বানর দেখতে গিয়েই। জঙ্গলে যার সাথে পরিচয় তার সাথে সম্পর্কে খানিকটা জঙ্গলিপনা থাকবে এটাই যেন স্বাভাবিক। নর্থ কোস্টের সফেদ সৈকতে আমরাও তাই দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো ভালোবাসা খুঁজেছিলাম। সেদিন মাঝরাতের পর বেহায়া চাঁদটা আকাশে উঁকি দিয়েছিল। মোমের মতো গড়িয়ে পড়া আলোয় উদ্ভাসিত ছিল চারদিক। ছিল ভারত মহাসাগরের ঝিকিমিকি উদ্দাম ঢেউয়ের ফেনা! সৈকতে আছড়ে পড়া বিক্ষুব্ধ জলরাশি ভিজিয়ে দিয়েছিল আমাদের। অন্তর্বাস দিগন্তে ছুঁড়ে আমরা দুই হোমো স্যাপিয়েন্স আদিম উল্লাসে মেতেছিলাম। বিদায়ের মুহুর্তে আরিয়ান্না কানের কাছে তাই ফিসফিস করে বলেছিল,
: Hei Army guy, now you can say we had sex on the beach.
২
স্থান: ফ্লাইট নাম্বার PW-449, প্রিসিশন এয়ার। ভারত মহাসাগরের উপরে কোথাও।
সময়: সময় এখানে স্থির।
প্লেনটা রানওয়ে ছেড়ে মুহূর্তেই আকাশে উড়াল দিলে উইংসের নীচের চাকাগুলো ক্যারিয়ারের ক্ষুধার্ত পেটের ভিতর ঢুকে গেল। ভারত মহাসাগরের সৌম্য জলরাশি ভেদ করে মাথা উঁচিয়ে থাকা ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটা আরও ছোট হতে হতে একসময় বিন্দুর মত মিলিয়ে গেল। অবয়ব হারিয়ে ঢাকা পড়ে গেল মেঘের অসীম রাজ্যে, ঢাকা পড়ে গেল আমার অল্প কয়েকদিনের মধুর জমাট স্মৃতি। ধন্যবাদ আরিয়ান্না। তোমার কোমল বিভায় আমার কয়েকটা দিন আলোড়িত আলোকিত এবং রঙিন করেছিলে।
রিটার্ন ফ্লাইটে সীটটা ইচ্ছা করেই হাতের বাঁ পাশে নিয়েছিলাম। কারণ প্রিসিশন এয়ারের ফ্লাইট জাঞ্জিবার থেকে নাইরোবি যাবার পথে মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর বরফ জমাট উঁচু চূড়ার পাশে একটা রাউন্ড দিয়ে যায়। ক্রিস্টোফার, আমার রুমানিয়ান কলিগ বলেছিল এই লাইফ টাইম সুযোগটা যেন হাতছাড়া না করি। আসলেই চমৎকার দৃশ্য! সূর্যের আলোতে বরফ সাদা চূড়াটা জ্বলজ্বল করছে, যেন একটা জ্বলন্ত আগুনের গোলা। সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবালুতায় পেয়ে বসে। আসলে সীমাহীন মেঘের রাজ্য আর ঘন নীলের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম। সংবিৎ ফিরলো কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরী এয়ারহোস্টেজের কথায়। ট্রলি থেকে সেলোফেন পেপারে মোড়ানো স্মোকড স্যান্ডউইচের প্যাকেটটা ট্রে টেবিলে রেখে কি ড্রিংকস সার্ভ করবেন জানতে চাইলেন। আমি পাইনআপেল জুস চেয়ে স্ন্যাক্সে কামড় বসালাম। এয়ারহোস্টেজ জুসের ডিসপোজেবল গ্লাসটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘HAKUNA MATATA! I love that.’ বুঝলাম, পরনের টি-শার্টের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি কথাটা বললেন। গতকাল বিকেলে স্টোন টাউনের হ্যান্ডিক্রাফট মার্কেট থেকে রাউন্ড নেক গেঞ্জিটা কিনেছিলাম।
পাইলটের যান্ত্রিক ঘোষণায় এক ঘন্টা বিশ মিনিটের জার্নিটা শেষ হলো।
৩
স্থান: জোমো কেনিয়াত্তা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।
নাইরোবি, কেনিয়া।
সময়: স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে এগারোটা। বাইরে দৃষ্টি
ঝলসানো রোদ।
প্লেনটা ধূসর টারমাকের প্রান্ত ছুঁয়ে এয়ারপোর্টের ঝকঝকে রানওয়েতে ল্যান্ড করলো। বোর্ডিং ব্রিজের কারণে বাইরের রোদের উত্তাপ টের পেলাম না। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে শরীরটা ওয়েটিং লাউঞ্জের চেয়ারে এলিয়ে দিলাম। ক্যারি অন লাগেজটা পাশেই। ল্যাপটপ ব্যাগের সাইড পকেট থেকে সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বইটা বের করে চোখ বোলাতে চেষ্টা করলাম। কাজী মাহবুব হোসেনের ‘কালো দালান’, এখনো সময় কাটাতে সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ণগুলো পড়ি। সেবা প্রকাশনী এবং আমাদের Generation X, আমরা একসাথে বেড়ে উঠেছি। সিরিজের এই বইটার গল্প Louis L'Amour-এর লেখা সায়েন্স ফিকশন ‘The Haunted Messa’ থেকে এডাপ্ট করা হয়েছে। দুবাইয়ের কানেক্টিং ফ্লাইট আরও চার ঘন্টা পরে, একটু আগে লাউডস্পীকারে ঘোষণা করা হলো। এতটা সময় কিভাবে কাটবে বুঝতে পারছি না, এদিকে বইটা হাতে নিলেও পড়তে ইচ্ছে করছে না। ব্যাগে ঢুকিয়ে ডিউটি ফ্রি শপের দিকে গেলাম। দেখি কেনার মতো কিছু পাওয়া যায় কীনা!
পরিপাটি করে সাজানো দোকানগুলোয় প্রসাধনী থেকে শুরু করে হস্তশিল্প কি নেই! অফিসের সম্ভাব্য কলিগদের জন্য এটাসেটা কিনে টার্মিনালের এমাথা থেকে সেমাথা খানিকক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ালাম। এক্সিট রুটের কাছেই কিওস্ক থেকে জেইন-এর এয়ারটাইমসহ সিম কিনে দেশে কথা বললাম। এরপর টার্মিনালে অপেক্ষমান অন্যান্য যাত্রীদের মতো আমিও এসএস মেইড চেয়ারে বসে যাত্রীদের আনাগোনা দেখতে থাকলাম। এয়ারপোর্টে নানা দেশের নানা ভাষার নানা চেহারার নানান বয়সী যাত্রীদের আনাগোনা। তবে তাদের সবাই ব্যস্ত। কেউ টিকেট আর পাসপোর্ট উঁচিয়ে নির্দিষ্ট গেইটের দিকে ফ্লাইট ধরার জন্য ছুটে যাচ্ছেন, কেউ মানি এক্সচেঞ্জে কারেন্সি ভাঙ্গাতে ব্যস্ত আবার কেউবা উদ্বিগ্ন হয়ে এখান থেকে সেখানে ছুটোছুটি করছেন হারানো লাগেজের সন্ধানে। কেউ কেউ অবশ্য আমার মতোই এই মুহুর্তে শুয়ে-বসে অলস সময় পার করছেন।
সম্ভবত একটা এয়ারক্রাফট এইমাত্র ল্যান্ড করেছে। একদঙ্গল যাত্রী কিচির মিচির করতে করতে ছুটে যাচ্ছেন কনভেয়ার বেল্টের দিকে, লাগেজ সংগ্রহ করতে। মেয়েদের একটা দল এসে পাশের খালি চেয়ারগুলো দখল করলেন। অজানা ভাষায় প্রায় চীৎকার করে তারা কথা বলছেন, সাথে বাঁধভাঙ্গা হাসির জোয়ার। একটু পরপর গড়িয়ে পড়ছেন একে অপরের শরীরে। তাদের হাসির উত্তাপে তারুণ্যের বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীর সব মেয়েরা একইভাবে তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে থাকে। স্থানভেদে ভাষার ভিন্নতা হয়তো আছে তবে তাদের অনুভূতির প্রকাশ অভিন্ন। একসময় মনেহলো এইমুহুর্তে তাদের আলোচনার সাবজেক্ট আমি নিজেই। ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করতেই পাশের জন কাঁধ ঝুকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
: Hi! Are you from India?
শুনেও না শোনার ভান করলাম, আসলে গত কয়েকদিন একইরকম প্রশ্ন শুনতে শুনতে আমার মনে বিরক্তি ধরে গেছে। হিন্দি মুভি আর সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়া অভিবাসী ভারতীয়দের কারণে এই অবস্থা। পশ্চিমবাংলা আর পূর্ববাংলার আমরা তো একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, রাজনীতি আমাদের আলাদা করেছে। তাছাড়া উপমহাদেশীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে চেহারায় সামান্য কিছু সাদৃশ্য তো রয়েছেই, কিংবা প্রশ্নটা হতে পারে কথা শুরু করার একটা উদ্যোগ মাত্র। আসলে কিছু একটা বলে তো কথা শুরু করতে হয়! আমাকে চুপচাপ দেখে প্রশ্নকারিণী একটু বিব্রত হয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়ালেন,
: I am Perlin, and you are Mr……
: Ifti Here.
: Nice to meet you, from which country?
স্মিত হেসে তাকে ভূগোল শেখাতে বসলাম। অনুসন্ধিৎসু ছাত্রীদের ম্যাপ এঁকে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের অবস্থানটা বোঝালাম। তারা মাদাগাস্কারের, পার্লিন জানালো, সবাই ছাত্রী এবং গ্রুপ ট্যুরে দুবাই যাচ্ছে। চকোলেট সুন্দরীদের গায়ের রং আর টানা টানা কালো চোখ দেখে আমি ডরিনের মতো ইথিওপিয়ান ভেবেছিলাম। কেননা আমার ধারণা পৃথিবীর সেরা কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরীরা ইথিওপিয়াতে থাকেন, ওরকম কালো হরিণ চোখ আর কোথায় পাবো! ইথিওপিয়া মানে তো the land of Queen of Sheba! হিব্রু বাইবেলে যার ইতিহাস পাওয়া যায়। আমরা রানী বিলকিস আর তার হুদহুদ পাখির গল্পটা জানি। হালকা হাসির ছররা আর টুকরো টুকরো কথায় পার্লিনের অনেকটা জানা হয়। কারো কারো জীবনের খাতাটা গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটার মতো নিমিষেই পড়ে ফেলা যায়, আবার কেউ কেউ আরামাইক ভাষার মতোই দুর্বোধ্য।
হাতঘড়িতে মিনিটের কাঁটাগুলো যেন সেকেন্ডের কাঁটার মতো দুরন্ত গতিতে ছুটতে থাকে। একসময় ভোজবাজীর মতো তারা মিলিয়ে গেলেও পারফিউমের ডিপ নোটের মতো কিছু উচ্ছ্বাস, কিছু মুগ্ধতার রেশ পাখার চিহ্নের মতো নিউরনে লেগে রইলো। তারা নেই মনে করিয়ে দিতে শূন্য চেয়ারগুলো পূর্ণদৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে। এদিকে ওদিকে তাকালাম কিন্তু স্মোকিং জোনটা খুঁজে পেলাম না। নিঃসঙ্গতা দূর করতে সিগারেটের মতো্ন এমন বন্ধু আর কে আছে! মনেপড়লো ইতির কথা, প্রথম প্রেম। একদিন তাকে খুশী করতে সিগারেটের প্রথম শলাকাটা হাতে নিয়েছিলাম। সে চলে গেছে তবে সিগারেট রয়ে গেছে। তারপর আরও অনেকে জীবনে এসেছে, ফেরত ঢেউয়ের মতো ফিরেও গেছে তারাও। ডরিনের মতো রেখে গেছে জমাট শূন্যতা আর খুচরো পয়সার মতো কিছু স্মৃতি। তল্পিবাহকের মতো সবস্মৃতি মুঠোয় ভরে আমি আজো যেন পৃথিবীর ধূসর পথে হাঁটছি!
৪
স্থান: ওয়েটিং লাউঞ্জ। জোমো কেনিয়াত্তা ইন্টারন্যাশনাল
এয়ারপোর্ট।
সময়: স্থানীয় সময় বেলা দেড়টা।
আমি আবারও ব্যাগ থেকে বইটা বের করে পড়ার চেষ্টা করলাম।
: কেমন আছো?
প্রথমে ভেবেছিলাম শ্রবণভ্রান্তি, গত কয়েকদিন ডিজে’র অত্যাচারে কানে তালা লেগে গেছে। কিন্তু বাংলায় আধো আধো কথা শুনে সামনে তাকিয়ে আমি হতবাক! এও কি সম্ভব! এতোটা বছর পর সামনে এ কাকে দেখছি! Miracles still happen! জলজ্যান্ত দেবীর মতো রাখী সামনে দাঁড়িয়ে। সিঁথিতে সিঁদুর ঊষার আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে। এখনও আগের মতোই কিংবা আগের চেয়েও বেশি সুন্দর। তরবারির তীক্ষ্ণ ফলার মতো ধারালো ফিগারটা ধরে রেখেছে। বিয়ের পর আসলে মেয়েদের সৌন্দর্যের ঝাঁপি খুলে যায়। এখনও হাসলে চিবুকে টোল পড়ে, বুকের বাঁ পাশের নিঃসঙ্গ লালচে তিলটাও আছে নিশ্চয়ই। একদিন আমি তিলটার পরিচর্যা করতাম। এখন সেখানে নতুন কোন মালী। একটা কথা বলে রাখা ভালো, যারা নিরামিষ ভালোবাসায় বিশ্বাসী, আমি তাদের দলে নেই। প্লেটোনিক ভালোবাসা দূর্বল প্রেমিকের আস্ফালন!
: চুপ করে আছো যে!
রাখীর প্রশ্নে ভাবনায় ছেদ পড়লো, একটুকরো লজ্জা এসে ভর করলো। কি ভাবছিলাম সে যদি জানতো! তড়িৎগতিতে দাঁড়িয়ে,
: এইতো, ভালো আছি। তুমি? এখানে কোথায়? বাচ্চাটা তোমার?
অজস্র প্রশ্ন একসাথে বুলেটের বেগে ছুঁড়ে আমি নিজেই হাঁপিয়ে উঠলাম যেন।
: ভাল আছি। আমার মেয়ে, ল্যুদমিলা। নাইরোবিতেই থাকি। তুমি এখানে?
‘ল্যুদমিলা’ নামটা শুনে চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
: এইতো, তোমার অপেক্ষা করতেছিলাম।
: ফাজলামির স্বভাবটা এখনো যায়নি তাহলে!
: না, তুমি না বলতে রাক্ষস! হাভাতে! ডাকাত! আরও যেন
কী কী! ভিখেরির স্বভাবটা এখনও যায়নি, বুঝলে!
আমার কথায় রাখীর মুখে রোদ্দুরের মতো লাজরাঙ্গা ভাবটা জেগে উঠে সরে গেল। ওকে সহজ করতে,
: বর কি করেন?
: Moi Avenue এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। গার্মেন্টস।
: কোথায় গেছিলা?
: দেশে। ঢাকা থেকে ফিরছি।
: ও, আচ্ছা
ডানে বামে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
: পতি দেবতা কোই? তুমি একা?
: ও যেতে পারেনি। আমি একাই। সম্ভবত পার্কিং এ গাড়ী
নিয়ে অপেক্ষা করছে।
: ও, সরি। তোমাকে মনেহয় তাইলে আটকায় রাখলাম।
: সমস্যা নেই, কিন্তু তুমি এখানে কেন? কোথা থেকে
ফিরছো? কোথায় আছো? কি করছো?
: জাঞ্জিবার গেছিলাম, ছুটি কাটাতে।
: ও, কি করছো?
: জাতিসংঘে চাকরি করতেছি।
: মানে! তুমি না আর্মিতে যোগ দিলে!
: ছেড়ে দিয়েছি। ভালো লাগতেছিল না।
: ওহ! তা বিয়ে-শাদী? বউ কোথায়?
: তুমি ফাঁকি দেয়ার পর ওসব নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়নাই।
তাছাড়া একা বেশ আছি।
আমার কথায় খানিকটা অভিমান ঝরে পড়লো যেন। রাখী বললো,
: সম্ভবত ভুলে গেছো। আর্মিতে যাবার পর তোমার খুব অহংকার হয়েছিল, আর সম্পর্কটা ভেঙ্গেছো তুমিই। আর আমি এতকিছুর পরও কেন নিজ থেকে এগিয়ে এসে কথা বলছি বুঝলাম না।
: কথা বলতে না!
: আগের মতই ক্ষ্যাপাটে, বাছুরে স্বভাব! এতটুকু বদলাওনি।
রাখী কথাটা বললো বটে কিন্তু গলা খানিকটা কেঁপে উঠলো যেন! ডিউটি ফ্রি শপ থেকে একটা টেডি বিয়ার কিনে ল্যুদমিলা’র হাতে দিলাম। সে ওটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এটাসেটা কথায় আরও কিছুটা সময় কেটে গেল। একটু পরপর লাউড স্পিকারে কনভেয়ার বেল্টে লাগেজ পৌঁছানোর ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। একটা কাগজে নিজের ফোন নাম্বার, বাসা’র ঠিকানা লিখে আমার হাতে দিল। আবার কখনও নাইরোবি এলে বাসায় বেড়াতে যাওয়ার অনুরোধ। তারপর হ্যান্ড লাগেজ ঠেলে এক্সিট রুটের দিকে এগিয়ে গেল, তাকে কনভেয়ার বেল্ট থেকে ব্যাগ-স্যুটকেস সংগ্রহ করতে হবে। মেয়েও চুলের পলকা ঝুঁটি দোলাতে দোলাতে মা’কে অনুসরণ করলো।
রাখী’র পদচিহ্নের দিকে তাকিয়ে আমি যেন বেশ পিছনে ফিরে গেলাম! আহা! প্রিয় শহর রংপুর। কারমাইকেল কলেজের সবুজ বিস্তৃত মাঠ। ইটের সুরকি বিছানো পথের ধারে বিশাল আকারের কৃষ্ণচূড়া গাছ। টিনের চৌচালা ঘরে ক্যান্টিন, খেলার ক্যারাম বোর্ড আর বন্ধুদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সিঙ্গারা খাওয়া। কখনো কখনো প্রশাসনিক ভবনের প্রশস্ত বারান্দা ধরে আমাদের মিছিলের সারি। এরশাদের স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে সবার কন্ঠে তখন একটাই শ্লোগান, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক।’ রাখীর সাথে পরিচয় ওভাবেই, সংগঠন করতে গিয়ে। আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, আর সে উদীচী। ও কিন্তু দারুণ রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারে, দুর্দান্ত আবৃত্তি করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সে পরিচিত মুখ। ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে অনেকেই চেনে, আর তাই একটু অহংকার বোধও ছিল। একসাথে সংগঠন করলেও কাউকে পাত্তা দিতে চাইতো না। আমি ওসব গায়ে মাখিনি। প্রথম পরিচয়ের পরের কয়েকটা মাস আইকা গামের মতো লেগেছিলাম। রবার্ট ব্রুসের ইতিহাসটা জানা ছিল।
আমার ধৈর্য্যের কাছে রাখী একসময় হার মেনেছিল, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কেননা গ্রীক দেবী থেমিসের মতো তার একহাতে ‘দাস ক্যাপিটাল’ থাকলেও আরেক হাতে ছিল ‘মনুসংহিতা’। বাম রাজনীতি করলেও তাই সংস্কার ছুঁড়ে ফেলতে পারেনি। আমিও যেমন, কম্যুনিস্ট পার্টির নীতিবাক্য ছুঁড়ে ফেলে এখন দিব্যি পশ্চিমা বিশ্বের তাবেদারি করছি। ১৯৯১ সালের ২৬শে ডিসেম্বরের পর থেকে পৃথিবীটা আসলে অন্যরকম! পৃথিবীটা এখন ভোগ্যপণ্যের বিশাল এক বাজার। এই পুঁজিবাজারে একেকজনের একেক দাম। জাতিসংঘ নামে শ্বেতহস্তীর মিশনগুলো কেন এবং কীভাবে হয় সে গল্পটাও অনেকেরই জানা।
রাখীর সাথে বছর দুয়েকের প্রণয় পরিণয়ে রূপ নেবার আগেই একদিন জমাট শিশিরের মতো টুপ করে ঝরে পড়লো। সে দিনটা ছিল চৈত্রের কাঠফাটা রোদের মতো, আমাকে নির্জীব করে সমস্ত অনুভূতি শুষে নিয়েছিল। আর আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়েছিলাম ওর যাবার পথের দিকে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রীকান্ত উপন্যাসে বলেছিলেন, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না—ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।’ তাই হয়তো আমাদের দূরে সরে যাওয়া। জীবনের এই অপূর্ণতাতেই হয়তো ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর। প্রিয় মানুষটাকে সবসময় পাশে পেলেই ভালোবাসা হয়না। কখনো কখনো একাকীত্বের রূঢ় বাস্তবতায় প্রিয়জনের স্মৃতি বয়ে বেড়ানোও একধরণের ভালোবাসা। মৃততারাদের মতো আমি আজো হয়তো ওর জীবনে আছি, দিনের আলোয় আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাকে খুঁজতে হবে রাতের গভীরে কিংবা রাখীর একান্ত অবসরে। রাখীর মেয়ের নাম তাই হয়তো ল্যুদমিলা! কেননা ল্যুদমিলা একদিন আমার হতে পারতো! নামটা যে একদিন আমিই ঠিক করেছিলাম! আমাদের মেয়েটার জন্য। একটা রুশ উপন্যাসে নামটা খুঁজে পেয়েছিলাম। রাখীর জীবনে আজ আমি হয়তো নেই, কিন্তু কেউ জানে না আমি ‘ল্যুদমিলা’ হয়ে আজো ওর জীবনে চিহ্নহীন চিহ্ন হয়ে আছি। আমাদের চলার পথ আজ আলাদা হলেও প্রবল সুখে একসময় একসাথে আমরা হেঁটেছি অনেকটা পথ। লাউড স্পীকারে আমার ফ্লাইটের ঘোষণা হলো, ফ্লাইট KQ 518 টারমাকে যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করছে। এস্কেলেটরে পা রেখে রাখী শেষবারের মতোন পিছনে ফিরে তাকালো, হাত নেড়ে বিদায় জানালো। জনস্রোতে একসময় হারিয়ে গেলে তাদের জায়গায় এখন অন্য মানুষ। কোথায় যেন পড়েছিলাম জীবনের অপূর্ণতায় ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর!
পোস্ট ভিউঃ 14