১
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখ, সকালে ইতিমধ্যে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন ঝকঝকে সুন্দর সকাল। পার্কিং বে-তে ল্যান্ডরোভারটা রেখে বৃষ্টির ছাঁট থেকে নিজেকে বাঁচাতে দৌড়ে অফিসে যখন ঢুকলাম ততক্ষণে সকাল প্রায় নয়টা। আমি ইফতেখার, উগান্ডার এন্টেবেতে জাতিসংঘের লজিস্টিক বেইজে কর্মরত আছি। দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে সোমবার সকালে অফিসে এসে পিসি অন করতেই অনেকগুলো পেন্ডিং মেইল চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আমি তখনও জানিনা আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে! বেশ কিছু রুটিন মেইলের উত্তর দেবার পর চোখে পড়লো বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেই মেইলটা। পোস্টিং অর্ডার! অথচ মেইলটা হাতে পাওয়ার পর বুঝতে পারলাম আমি আসলে কি হারাতে যাচ্ছি! এই এন্টেবির আকাশে মিশে আছে ডরিনের স্মৃতি, বাতাসে ডরিনের ঘ্রাণ আর ধুলোমাটি ধারণ করে আছে ডরিনের পদচিহ্ন! এখন খারাপ লাগছে, অথচ কিছুদিন আগেও এরকম একটা মেইলের জন্য আমি কতোটা উতলা হয়ে অপেক্ষা করছিলাম! প্রায়ই একে ওকে মেইল করে পোস্টিঙের জন্য চেষ্টা/তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে আমার বস আয়ারল্যান্ডের রিচার্ড এবং আমার কলিগ, মঙ্গোলিয়ান আর্মির ফিমেইল অফিসার মেজর চিমজি চিমেগ (অবঃ) এর মতো করে আমার মনের অবস্থাটা আসলে কেউই বুঝতে চাননি। আমি ভিতরে ভিতরে যে ঘুণেধরা চৌকাঠে পরিণত হয়েছি সেটা তারা ভালোভাবেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। রিচার্ড আমার ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃসহ অভিজ্ঞতার বিষয়ে খুবই সংবেদনশীল ছিলেন এবং সেজন্যই পোস্টিঙের জন্য চেষ্টা করে গেছেন। অথচ একজন নির্ভরযোগ্য সহকর্মী হিসেবে তিনি কখনই আমাকে হারাতে চা্ননি। আমি এন্টেবেতে প্রায় তিন বছরের চাকুরি জীবনের যতিচিহ্ন টানতে যাচ্ছি। তারচেয়েও বড় কথা, দীর্ঘ প্রায় এক বছরের টেনে নেয়া দুঃসহ স্মৃতি থেকে আমার মুক্তি ঘটতে যাচ্ছে! এই মুক্তির জন্যই মেইলের অপেক্ষায় প্রতিটা দিন হা পিত্যেস করেছি। এতটাই আকাঙ্ক্ষিত তবুও পোস্টিং অর্ডার রিসিভ করার পর থেকেই কেন জানি না সূক্ষ্ম চিনচিন একটা ব্যথা আমাকে এনজাইনার মতো চেপে ধরেছে!
এন্টেবেতে জাতিসংঘের এই লজিস্টিক বেইজকে রিজিওনাল
সার্ভিস সেন্টার ইন এন্টেবে, সংক্ষেপে RSCE বলে। ২৪ জুন ২০১০ সালে স্থাপন করা এন্টেবের
এই লগ বেইজ থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত জাতিসংঘ মিশনে প্রশাসনিক, লজিস্টিক,
ইনফরমেশন এবং কমিউনিকেশন প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান করা হয়। আমি আর্মি থেকে অবসরে যাবার
পর, ২০১৩ সালের অক্টোবরে এখানেই কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছি। আর আমার এন্টেবেতে
আসার মাসখানেক পর চিমজি লগ বেইজের ফিনান্স ডিপার্টমেন্টে জয়েন করে। এরআগে সে রিপাবলিক
অভ চাদে পোস্টেড ছিল। তবে মজার ঘটনা হলো তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশে,
২০০৬ সালের শেষের দিকে। আমরা একসাথে বিপসট, রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসে লজিস্টিকস কোর্স
করেছিলাম। অফিসিয়ালি জিপয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত দু’সপ্তাহের সেই কোর্স এবং ব্যক্তিগত
উদ্যোগে আবিষ্কৃত ইন্টারকোর্স থেকে আমরা শিখেছিলাম অনেক কিছু। এভাবেই আমাদের গ্লু-স্টিকের
সাথে পেপারের মতো লেগে থাকা এবং এভাবেই অনেকটা বছর। কোর্স শেষে দেশে ফিরেই সে আর্মি
থেকে অবসর নেয় এবং ইউএন জবে যোগ দেয়। তবে আমাদের সবসময়ই যোগাযোগ ছিল মেইল, ম্যাসেঞ্জার
কিংবা ফোনে। মোবাইল ফোনের ব্যয়বহুল যুগে আমাদের প্রতিমাসে একবারের জন্য হলেও কথা হতো।
আমি আর্মি থেকে অবসরে যাবার পর চিমজি আমাকেও ইউএন জবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
সময়ের পরিক্রমায় আমরা দু’জন ভীষণ ভালো বন্ধু হয়েছিলাম, কিংবা শারীরিক উষ্ণতায় আমাদের
সম্পর্ক ছিল বন্ধুতার চেয়েও খানিকটা বেশি!
২
অথচ লজিস্টিক বেইজে চিমজি জয়েন করার কয়েকমাস পর,
২০১৪ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আমার জীবনে ওয়েনি মেনগেশা ডরিনের
আগমন ঘটে। এবং তার বছরখানেক পর ঘটলো সেই বিয়োগান্তক ঘটনা! তারপর থেকে ডরিন আমার জীবনে
একটা ক্ষতচিহ্ন হয়ে রইলো। তার সাথে পরিচয় যেমন বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আমার দুয়ারে হাজির
হয়েছিল, তার মৃত্যুও আমাকে তেমনি শোকের অকূল সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে যায়। এন্টেবে এখন আমার
জীবনের একটা কালো অধ্যায়, যা কেবলই বিষাদ ছুঁয়ে থাকে। আমার তবুও মনখারাপ! অথচ এমন তো
নয় যে লেবাননের বৈরুত উপকূলের মতো যুদ্ধ উপদ্রুত অঞ্চলে আমার পোস্টিং হয়েছে। আমার পোস্টিং
হয়েছে ইউরোপে ব্রিন্দিসি, ইটালির নিরাপদ এবং শান্ত পরিবেশে। আমি জানি এন্টেবের অনেকেই
ব্রিন্দিসি লজিস্টিক বেইজে জব করতে মুখিয়ে আছেন। ইউএন গ্লোবাল সার্ভিস সেন্টারের বেইজটা
সেখানেই। লজিস্টিকস কোর্স করার সময়েই প্রথমবারের মতো ব্রিন্দিসি নামটা শুনেছিলাম, কিন্তু
কখনো সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল কী! হয়তো হয়েছিল, সৃষ্টিকর্তা হয়তো এভাবেই আমাদের
ইচ্ছেগুলো পূরণ করে থাকেন!
বৃষ্টিস্নাত সকালের একচিলতে রোদ গায়ে মেখে আমার ভালো নাকি খারাপ লাগা উচিত বুঝতে পারছিলাম না! আমার মানসিক অবস্থা তাইই বলছিল। কৌতূহল মেটাতে ঝটপট গুগল করে জানলাম অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে দক্ষিণ ইতালির আপুলিয়া অঞ্চলের একটি শহরের নাম ব্রিন্দিসি। যেখানে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে ওঠানামা করলেও শীতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাতের কারণে সেটা ৬ ডিগ্রিতে নেমে আসে। শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে দ্য সালেতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ট্রেনে রোম থেকে ব্রিন্দিসি যাওয়া যায় আবার সমুদ্র পথেও যোগাযোগ সুবিধা আছে। বলকান উপদ্বীপ, গ্রীস এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যের জন্য একটি প্রধান বন্দর শহর ব্রিন্দিসি। সবদিক থেকে আদর্শ বিবেচনায় ১৯৯৪ সালে এখানে জাতিসংঘের প্রথম স্থায়ী লজিস্টিক বেইজ স্থাপন করা হয়। আফ্রিকার গরম আবহাওয়ার চেয়ে ইউরোপের শান্ত শীতল পরিবেশে চাকুরি করা অনেকের কাছেই কাম্য, আমার কাছেও তাই। আমি হয়তো ছোট ছিমছাম সবুজ-শ্যামল-গোছানো শহর, এন্টেবে মিস করতে যাচ্ছি!
এন্টেবির মসৃণ রাজপথে ছায়া হয়ে থাকা সারিবদ্ধ জ্যাকারান্ডার ক্যানোপি আমি সবসময়ই মিস করবো। মিস করবো নীলচে বেগুনী ফুলে ছেয়ে যাওয়া ঘাসের সবুজ বুক কিংবা অ্যানাকোন্ডার শরীরের মতো পিচ্ছিল কালো রাজপথ। জমানো কষ্টের পাহাড় বুকে ধারণ করে কৃষ্ণচুড়া’র লালপ্রভা পৃথিবীতে যেন নীলচে জ্যাকারান্ডা হয়ে ঝরে পড়ে! আমি মিস করবো চার্চ রোডে ডরিনদের সাদাবাংলো, তাতে আকাশী নীল রঙের টিনের ছাউনি। সেখানে লনের সবুজ ক্যানভাসে ক্লিমেটিসের সাদা ঝাঁরগুলোয় উজ্জ্বল কমলা রঙের মাঝে বাঘের মতো কালো ডোরাকাটা প্রজাপতি সারাটাদিন উড়ে বেড়ায়। আমি জানি প্রজাপতির এই প্রজাতিটার নাম মোনার্ক, এদের অন্যনাম Danaus plexippus, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এই প্রজাপতিগুলোর প্রচুর দেখা মেলে। ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের সম্মানে প্রজাপতির মোনার্ক নামকরণ হয়েছে শুনেছি।
ডরিনদের সাদাবাংলো থেকে বের হয়ে হাতের বামে গ্যাস স্টেশন রেখে একশো গজ সামনে এগোলেই একটা ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চ। আশেপাশের বেশ কিছু ইথিওপিয়ান খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী পরিবার এই চার্চে নিয়মিত যান। গত রবিবার সকালেও ডরিনের মা, মিসেস বেরকনেসের সাথে আমার যথারীতি চার্চের গেটে দেখা হয়েছিল। সেদিন কী একটা কারণে বাথশেবা সাথে ছিল না। ডরিনের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমার জীবনে সম্ভবত কিছুটা পরিবর্তন এনেছে! জীবনটাকে শৃঙ্খলার সুতোয় বাঁধার জোর প্রচেষ্টা চলছে। এবং অনেককে অবাক করে দিয়ে আমি প্রতি রবিবার ঠিক সকাল দশটায় চার্চে যাই। প্রার্থনা সঙ্গীত শেষে ফাদারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনি আর চার্চের পিছনের সারিতে বসে নিজের মতো করে ডরিনের জন্য প্রার্থনা করি। পৃথিবীর সব ধর্মই আত্মার প্রশান্তি আর জীবনের শৃঙ্খলার কথা বলে। প্রার্থনা শেষে মিসেস বেরকনেস সন্তান স্নেহে আমাকে কাছে ডেকে নেন, মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দেন। প্রতিবার তিনি আমার কাছে ক্ষমা চান, কেননা তার ধারণা তিনিই ডরিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী। কারণ তার তো সোমালিয়া সীমান্তবর্তী কেনিয়ার ছোট শহর গারিসা যাবার কথা ছিলনা। তিনিই মেয়েকে ফোনে ডেকে নিয়েছিলেন। কেননা তার ধারণা হয়েছিল, পড়াশুনার অজুহাতে ডরিন আসলে আমার সাথে রাত কাটাবার প্ল্যান করেছিল। আর তাই প্রেজেন্টেশনের পরেরদিনই তিনি মেয়েকে ডেকে পাঠান। ডরিন গারিসা না যাবার জন্য অনেক রিকোয়েস্ট করেছিল কিন্তু তিনি তা শুনেননি। কী নিষ্ঠুরতা! আমি মিসেস বেরকনেসকে এজন্য কখনো ক্ষমা করতে পারিনি। কিন্তু সামাজিকতা ও ভদ্রতার খাতিরে আমাদেরকে অনেককিছুই সহ্য করতে হয়। তাই চার্চ থেকে বের হয়ে আমরা একসাথে সেমেটারিতে যাই। কখনো কখনো বাথশেবা, ডরিনের ছোটবোন আমাদের সাথে যোগ দেয় তবে মিঃ কেজেলা মেরদাসা, ডরিনের বাবাকে আমি কখনো চার্চে যেতে দেখিনি। আমরা ডরিনের সিমেন্টে বাঁধানো ধূসর সমাধিতে একগোছা গোলাপের কুঁড়ি রেখে আসি। যেখানে এপিটাফে সম্প্রতি লেখা হয়েছে,
‘Fondly loved and deeply mourned’
৩
লেক ভিক্টোরিয়ার বিচে নারকেল গাছের ঝিরঝিরে ছায়ায়
ক্যাম্পিং হ্যামকে শুয়ে আমি অসংখ্য রোদজ্বলা দুপু্র, ঝলমলে বিকেল এবং জীবনানন্দ দাসের
বিষণ্ণ সন্ধ্যা পার করেছি। নীলনদের অফুরন্ত জলের উৎস এই লেকটা আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম
এবং পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ অভিযাত্রী জন হানিং স্পেক মধ্য আফ্রিকায়
অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে তানজানিয়া, কেনিয়া এবং উগান্ডাব্যাপী বিস্তৃত লেক ভিক্টোরিয়া
আবিষ্কার করেন। আর আমি জনের আবিষ্কারের আড়াইশো বছর পর লেকের বিচে রোস্টেড পিনাটের সাথে
চিল্ড স্মারনফ বিয়ারের বোতল হাতে ঢেউয়ের ওঠানামায় জীবনের মানে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি!
এলোমেলো কীসব ভাবতে ভাবতে সাইড ড্রয়ারে খামের ভেতরে সযত্নে গুছিয়ে রাখা পেপার কাটিংসগুলো বের করে দেখছিলাম। মনখারাপ থাকলে আমি সাধারণত তাইই করি। আমাকে গভীর মনোযোগে ওভাবে ঝিম মেরে বসে থাকতে দেখে চিমজি কানের কাছে হাতের তুড়ি বাজালে ওর দিকে ফিরলাম,
: হেই! কী খবর!
: পোস্টিং অর্ডার।
: কী! আর ওগুলো…… পেপার কাটিংসগুলোর দিকে ইঙ্গিত
করে জিজ্ঞেস করলো।
: তুমি তো সবই জানো……
একপাশে সরে গিয়ে ইশারায় স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেইলটা পড়তে বললাম। ২৭ সেকেন্ডের মাথায় সে প্রবল উচ্ছ্বাসে চেয়ারের পিছন থেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো, কংগ্রাচুলেশন্স! ওর ওরকম উষ্ণ আলিঙ্গনে আমার মনের বিষাদের ছায়া যেন কেটে গেল।
: ইউ মাস্ট গিভ অ্যা ট্রিট। নো মার্সি লাকি ডিউড!
: ঠিক আছে। লেটস গো।
পোস্টিং অর্ডার উপলক্ষ্যে আজ ঢপ মারা যেতেই পারে! পাতলা জ্যাকেটটা কাঁধে ফেলে ওর সরু কোমরটা সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরতে চাইলাম। সম্ভবত আমার মাঝে প্রবহমান প্রবল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ! কিন্তু সে কৌশলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম সে এখন পাবলোর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ধনুকের ছিলা’র মতো চিমজি’র টানটান শরীর যেন কালিদাসের মেঘদূত থেকে উঠে আসা যক্ষপ্রিয়া। কবি’র ভাষায়,
তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী
মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি:।
শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং
যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিবাদ্যেব ধাতু:।।
বুদ্ধদেব বসু শ্লোকটির অনুবাদ করেছেন এভাবে,
তন্বী, শ্যামা, আর সুক্ষদন্তিনী নিম্ননাভি, ক্ষীণমধ্যা,
জঘন গুরু বলে মন্দ লয়ে চলে, চকিত হরিণীর দৃষ্টি
অধরে রক্তিমা পক্ক বিম্বের, যুগল স্তনভারে ঈষৎ-নতা,
সেথায় আছে সে-ই, বিশ্বস্রষ্টার প্রথম যুবতীর প্রতিমা।
৪
চিমজি চিমেগ এমনিতে দীঘির জলের মতো শান্ত, অথচ লগবেইজ ক্লাবে হ্যাপি আওয়ারের সন্ধ্যাগুলোয় সে যেন লেক ভিক্টোরিয়ার উদ্দাম জলরাশির মতোই বাঁধভাঙ্গা! দারুণ আড্ডায় সন্ধ্যাগুলো সে মাতিয়ে রাখে। বাংলাদেশে চিমজির এই রূপের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না। বিপসটের ক্লাসে অন্যদের নজর এড়িয়ে আমাদের মাঝে ইশারায় ভাবের আদান-প্রদান হলেও কথাবার্তা তেমন একটা হতো না। সে তখন শান্ত-সুবোধ একটা মেয়ে, কখনো কখনো কফিকর্ণারে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসতো। আমি ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, সেও চোখের ইশারায় উত্তর দিত। মোর্স কোডে ইথারে ছড়িয়ে যেতো আমাদের বায়বীয় অনুভূতি। লাঞ্চ-ব্রেকফাস্ট কিংবা ডিনারের টেবিলে আমাদের মাঝে এভাবেই অনুভূতির কুসুম কুসুম বহিঃপ্রকাশ ছিল। আমরা আসলে কথা বলতাম সারারাত, ক্লাস থেকে রুমে ফিরে। আমাদের কথা হতো ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে, কখনো শ্রেফ চ্যাটিং আবার কখনো ভিডিও বার্তায়। ল্যাপটপের স্ক্রিনে সারারাত জেগে পরেরদিন সকালে চোখের পাতা ডলতে ডলতে ক্লাসে ঢুকতাম। আমার রুমমেট, মেজর বোরহান অবাক চোখে তাকিয়ে এসব দেখতো আর ভাবতো, কি ঘটছে এসব! এযে রাত-বিরাতের পুকুর চুরি নয়, এখানে রীতিমত হৃদয়লোপাট চলছে! এযে চেঙ্গিস খানের দেশের মেয়ের ঈশা খাঁ’র দেশে এসে হৃদয় খোয়ানোর গল্প!
কোর্সের শেষ দিন বিকেল নাগাদ বাংলাদেশী অফিসাররা
মেস খালি করে চলে গিয়েছিল। শুধুমাত্র কিছু বিদেশী অফিসার রাতটা থেকে গিয়েছিল, কেননা
পরেরদিন বিভিন্ন গন্তব্যে তাদের ফ্লাইট। কম্বোডিয়ান আর্মির মেজর পুথিরিথের রুমে অ্যালকোহল,
মিউজিক আর ডান্সের সাথে তারা পূর্ণমাত্রায় নাইট সেলিব্রেট করছিল। কিছুক্ষণ ডান্স করে
চিমজি তার রুমে ফিরে গেল। আমিও ফিরে এলাম নিজের রুমে। আমি ছিলাম আমার গাড়ির অপেক্ষায়,
বিছানায় আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপ কোলে ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং করছিলাম। এমন সময় চিমজির
ম্যাসেজ, আমাকে তার রুমে ডেকেছে। সেদিন রাতে আমাদের মাঝে ঘটেছিল শারীরিক সম্পর্কের
প্রথম পাঠ। দু’সপ্তাহের রাতজাগা সেশন, ডান্স এবং অ্যালকোহলের পর একটা এস্থেটিক লেবেলের
ফোরপ্লে ছিল অবধারিত অভিজ্ঞতা! পরদিন সকালে চিমজিকে সিঅফ করতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম।
চেক-ইন ডেস্কের দিকে পা বাড়ানোর আগে চিমজি আমাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল, চুমু খেতে চেয়েছিল।
কিন্তু আমি লোকলজ্জা্র ভয়ে সরে গিয়েছিলাম। তাকে বলেছিলাম লোকাল কালচারের সীমাবদ্ধতার
কথা, আমাদের দেশে রাতের আঁধারে যা সম্ভব দিনের আলোয় তা যেন অস্পৃশ্য! সে হাসিমুখে আমার
কথাগুলো মেনে নিয়েছিল। আর তাই অনেকটা বছর পর,
এন্টেবের ভিন্ন পরিবেশে হ্যাপি আওয়ারের সন্ধ্যেগুলোয় আমরা ছিলাম পাখির মতোই স্বাধীন
এবং নীলনদের খরস্রোতা জলের মতো অনিয়ন্ত্রিত।
চিমজি’র হাতের স্বচ্ছ ককটেইল গ্লাসে সেদিন ছিল জিমলেট আর আমি নিয়েছিলাম স্ক্রু ড্রাইভার, তবে অরেঞ্জ জুসের বদলে আনানাস। মিউজিক সিস্টেমে এলি গোল্ডিংয়ের Love Me Like You Do গানের টিউন যখন বেজে উঠলো ততক্ষণে আমাদের বেশ কয়েক পেগ হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির ছাঁট গায়ে মেখে সেদিন আমরা নেচেছিলাম,
I'll let you set the pace
'Cause I'm not thinking straight
My head's spinning around, I can't see clear
no more
What are you waiting for?
আড্ডার সুমধুর অভিজ্ঞতার শেষে লিরিকের শেষ লাইনটার উত্তর দিতেই যেন আমাদের মাঝে সেদিন ক্যাজুয়াল সেক্স ঘটেছিল। আবারও, এবং অনেকদিন পর। বিপসটে শিউলির ঘ্রাণভেজা রাতে ফোরপ্লে দিয়ে যে দেহজ মিলনের সূচনা এন্টেবের ডোপামিন ভুরভুর রাতে মাল্টিপল অর্গাজমের মাধ্যমে তার যেন সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। এ যেন দীর্ঘ অভিযাত্রার গল্পে আমি থেটিসের সন্তান একিলিস! একিলিসের সাথে হেলেনের মিলন স্বপ্নে ঘটলেও আমি চিমজিকে সে রাতে বাস্তবে পেয়েছিলাম। সেই রাতে আমরা দুজন যেন আন্দালুসিয়ার কেইভে জেগে থাকা একমাত্র নিয়ানডার্থাল! হর-পার্বতীর মিলনের চেয়েও আমাদের মিলন অভিজ্ঞতা ছিল গভীর সুখ আর আনন্দের। শরীরের সাথে আত্মার ক্ষণিকের মিলনকে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড বলে তবে চিমজির সাথে আমার যা ঘটেছিল তাকে যৌনবিজ্ঞানের ভাষায় কী বলে জানিনা। কিন্তু I can claim, I had a brief fling with her.
চিমজির সাথে আমার হালকা দুষ্টামি কিংবা দুষ্টামিপূর্ণ
কথাবার্তা সবসময়ই চলতো। তবে পাবলোর সাথে ডরিনের স্টেডি রিলেশন ডেভেলপ করায় স্বাভাবিকভাবেই
আমাকে দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিতে হয়। তাছাড়া আমি নিজেও যেহেতু ইথিওপিয়ান সুন্দরী ডরিনের
সাথে অস্থির টাইপের সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম তাই ওদের বিষয়টা তেমন ভাবায়নি।
৫
চিমজির ডেস্কের ওদিকটায় কখনো ঢুঁ মারতে গেলে দেখেছি
পিসির স্ক্রিনে অভিনিবিষ্ট একজোড়া চোখ, যেন দম ফেলবার ফুরসৎ নেই! কাজের অবসরে কিংবা
উইকএন্ডে তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যায়না, পাবলো এবং সে যেন লা-পাত্তা জুটি! সকালের এই সময়টায়
আমার ডেস্কের পাশে চিমজির উপস্থিতি আমাকে তাই অবাক করেছে। আচ্ছা, পাবলোর সাথে কিছু
হয়েছে কী! ওদের বোঝাপড়ায় সমস্যা হলে আমাকেই দুতিয়ালি করতে হয়। কী নিষ্ঠুর নির্যাতন!
তবে চিমজি আমার ডেস্কে আসাতে একদিক থেকে বরং ভালো হয়েছে। আনন্দের মুহুর্তটা একজন বন্ধুর সাথে শেয়ার করা গেল। আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নিলে সেটা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তবে দুঃখবোধটা একান্ত নিজের। একদিন এক তরুণীকে তাই চোখের জল ফেলতে দেখে বলেছিলাম, ‘তোমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মুখে লেগে থাকা নিষ্পাপ হাসি। হাসির এই মাধুর্য হোক চির অমলিন।’ যে চোখে-মুখে লেগে থাকে অনাবিল হাসি, সে চোখে জল মানায় না। একদম না। তাকে বলেছিলাম, আনন্দ অনুভূতি সবার জন্য, আর কষ্টটুকু মানুষের একান্ত আপন একটা কিছু, তাকে ঝিনুকের মাঝে মুক্তোর মতন আগলে রাখতে হয়। আবার কখনও একা একা কাঁদতেও হয়, যেমন পৃথিবীর মায়ায় মেঘ কাঁদে!
গম্ভীর স্বভাবের পাবলো ম্যাফিও নর্থ স্পেনের বিলবাও শহর থেকে এসেছে। আমি জানি না নর্থ পোল আর সাউথ পোল এই এক জায়গায় এসে কী করে একাকার হলো! স্বভাবের দিক থেকে দুই মেরুর দুই বাসিন্দা চিমজি আর পাবলোর মাঝে সংযোগটা কিভাবে ঘটলো! পৃথিবীতে যত আজব ঘটনা ঘটে থাকে তাদের সম্পর্কের রসায়ন তার থেকে কম কিছু না! চিমজিকে একদিন জিজ্ঞেস করে তাদের কাছে আসার গল্পটা শুনতে হবে। স্রেফ কৌতূহল! কখন কীভাবে যে এরকম একটা কিছু ঘটে গেল শালা টেরই পেলাম না। কখনো কখনো প্রেম ছায়ার মতোন এভাবেই নিভৃতে আসে, ঘাড়ের কাছে এসে নিঃশ্বাস ফেলে এবং স্পর্শের দাগ রেখে ফিরে যায়। কাছের মানুষটা হয়তো টের পায়না।
কিছু কিছু বিষয়ে পৃথিবীর সব মেয়েরা বোধহয় একইরকম। প্রতিটা মেয়েই সম্পর্কের মাঝে খুঁজে পেতে চায় নিরাপত্তা, আমি হয়তো সেটা দিতে পারিনি কিন্তু পাবলো সেটা পেড়েছিল। তাছাড়া আমি তো আমার ঘুড়ির মতোন স্বভাবের কথা জানি। আমি জানি মাসুদ রানা স্পাই থ্রিলারের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর সুন্দর এক অন্তর। একা। টানে সবাইকে কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ আচ্ছা, পাবলো কী জানে বিছানায় চিমজি অস্থির টাইপের ডমিনেটিং! এতদিনে নিশ্চয়ই জানে। কাউগার্ল! মনেমনে হাসলাম। আমার মনের মাঝে যে দুষ্টামিপূর্ণ কিছু একটা চলছে তা আন্দাজ করতে পেরে চিমজি ভ্রূ কুচকে আমার তাকালো। মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অনুভূতি কী প্রবল! প্রকৃতির কী এক অদ্ভুত খেয়ালে তারা কারো দিকে ভালোভাবে না তাকিয়েই বুঝতে পারে কোন পুরুষটি তার বুকের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের শরীরে সম্ভবত মাছির মতো পাঁচটি চোখ আছে। ভ্রূর নিচে একজোড়া আর মাথার বাকী তিনদিকে তিনটা। আর তাই হাঁটার সময় কোন পুরুষের দৃষ্টি তার নিতম্ব বিভাজিকায় সেঁটে থাকলে তারা সেটা বুঝতে পারে। আমার হঠাৎ চিমজির বাট ডিম্পলের কথা মনেপড়লো। বিশেষ করে সে যখন নগ্ন শরীরে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যেত, পিঠের ঠিক নিচে ছোট একজোড়া ডেন্ট। একে ‘ডিম্পল অফ ভেনাস’ বা ‘লাভ ডিম্পল’ বলে। চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় বলে স্যাক্রাল বা স্পাইনাল ডিম্পল। আচ্ছা চিমজির বাট ডিম্পল কি প্রাকৃতিক নাকি ব্যায়াম করে বানানো! আগে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। এখন জিজ্ঞেস করলে নির্ঘাত পিঠে কিল-ঘুষি পড়বে! শ্রাগ করে সামনে পা বাড়ালাম। লজিস্টিক বেইজের ভিতরেই আমরা ‘বিন ব্লিস’ নামের ক্যাফেটেরিয়াতে গেলাম। মাঝেমাঝে আমরা আলজিভের স্বাদ বদলাতে এন্টেবে এয়ারপোর্টের প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জের বাইরে সারি বেঁধে থাকা কফি এন্ড স্ন্যাক্স শপগুলোতেও যাই।
চিমজির পছন্দ লেমন কোরিয়েন্ডার ফিশ ফিলেট উইথ স্টিম ভেজ; সাথে টাকিলা অরেঞ্জ লিকার, লেমন জুস আর বরফ দিয়ে বানানো ককটেল মার্গারিটা। খুব কড়া নয় বলে মেয়েরা এই ককটেলটা নাকি বেশ পছন্দ করে। বেশি পান করলে অবশ্য হালকা মিষ্টি ধরনের একটা হ্যালুসিনেশন হয়। তবে আজ লাঞ্চে সে একটা বেকড বিন স্যান্ডউইচ আর আমি চিকেন চিজ বার্গার নিলাম, সাথে মোকাচিনো এবং মিনারেল ওয়াটার। গল্পে গল্পে অনেকটা সময় কেটে গেছে। হাতে আর মাত্র তেইশ মিনিট সময় অবশিষ্ট, এরপরই লাঞ্চ আওয়ার শেষ হবে। তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে আমরা নিজনিজ ডেস্কের দিকে ছুটলাম। তবে চিমজি ঠিক কী কারণে আমার কাছে এসেছিল তা জানা হলো না। একটা হাগ দিয়ে পরের শনিবারে মনুস্কো ক্লাবে দেখা হবে জানালাম। আমার হাতে এখন অনেক কাজ। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে ক্লিয়ারেন্স নেয়ার বিশাল চক্কর সামনে অপেক্ষা করছে, ফিনান্সের ব্যাপারটায় চিমজি ভালো সাহায্য করতে পারবে। ডরিনের স্মৃতি থেকে আমার দ্রুতই মুক্তি দরকার! খুব দ্রুত!
৬
অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহটা কাটলো দারুণ ব্যস্ততায়।
বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে ক্লিয়ারেন্স করাতে হলো। এরই ফাঁকে ডরিনদের বাসায় দুদিন গিয়েছিলাম,
সন্ধ্যেটা কাটিয়ে এসেছি। ডরিনের মৃত্যুর পর আমি ঐ পরিবারের সাথে আগের চেয়ে যেন আরও
বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছি। রবিবার সকালে চার্চে যাওয়া, ডরিনের সমাধিতে ফুল দেয়া কিংবা তাদের
সাথে সান্ধ্যকালীন কফির কাপে চুমুক দেয়া। আগে আমার আগ্রহের পুরোটা জুরে ডরিন থাকলেও
এখন তার মা কিংবা একমাত্র ছোট বোন, বাথশেবার সাথেও সুন্দর সময় কাটে। সময় আসলে শোকের
মহাঔষধ, ধীরেধীরে মানুষের দুঃখের স্মৃতি ভুলিয়ে দেয়। মিসেস বেরকনেসের কাছে গেলে তিনি
খুব আদর-যত্ন করেন। সম্ভবত আমার মাঝে তিনি ডরিনকে খুঁজে পেতে চাইতেন। স্থান-কাল-পাত্রভেদে
মাতৃস্নেহ আসলে এক এবং অভিন্ন, পৃথিবীর সব মায়েরা সন্তানদের একইরকম ভালো বাসেন। আবেগ
আর অনুভূতির জায়গায় এসে একজন আফ্রিকান এবং একজন বাংলাদেশি মা যেন মিলেমিশে একাকার!
তবে ঐ ঘটনার পর থেকে মিঃ কেজেলা মেরদাসা যেন আগের চেয়ে আরও বেশি গম্ভীর হয়ে গেছেন!
এমনিতেও কথা বলতেন কম, এখন তা যেন প্রায় শূন্যের কোটায় এসে ঠেকেছে। তবে স্কুলের পড়ার
চাপ বাথশেবাকে দ্রুত শোক কাটাতে সাহায্য করেছে। ওকে সাথে নিয়ে দুদিন কাম্পালা শহরে
ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। এটাসেটা কিনে দিয়েছিলাম। উগান্ডার জনগণকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
যতই হাসি-তামাশা করা হোক না কেন তারা কিন্তু বেশ আমুদে জনগোষ্ঠী। অল্পতেই সন্তষ্ট থাকে।
অন্তত আমার কাছে সেরকমই মনেহয়েছে। কাম্পালা আর দশটা উন্নয়নকামী আফ্রিকান রাজধানী শহরের
মতো হলেও এন্টেবে শহরটা বেশ গোছানো এবং সবুজ, আমার কাছে ভালো লাগে। নাইরোবি বা কাম্পালাতে
ঘুরে-বেড়ানো বেশ আনন্দদায়ক কারণ এগুলো একসময় বাংলাদেশের মতো ব্রিটিশ কলোনি ছিল। সেখানে
ইংরেজি ভাষার প্রসার থাকায় খুব সহজেই সাধারণ জনগণের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। কোথাও
ঘুরতে গিয়ে এটা যে কতোটা জরুরী সেটা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষী কিগালি
আর বুজুম্বুরা ঘুরতে গিয়ে।
ট্রাভেল এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করে ‘দি প্রাইড অভ আফ্রিকা’, কেনিয়া এয়ারওয়েজের টিকেট পেলাম। তবে এমিরেটস-এর টিকেট পেলে খুব ভালো হতো, যাত্রাপথের ঝক্কি সামলে এন্টেবি থেকে সরাসরি দুবাই হয়ে রোম যাওয়া যেত। কেনিয়া এয়ারওয়েজের ফ্লাইট নম্বর KQ 419, Boeing 767 প্রায় এক ঘন্টার এয়ার জার্নি করে এন্টেবি থেকে জমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর নাইরোবি নিয়ে যাবে। সেখান থেকে দুবাই সোয়া ৫ ঘণ্টার ফ্লাইট। তারপর আকাশ পথে আরও প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রোম এবং সেখান থেকে ট্রেনে ব্রিন্দিসি। যেহেতু ভ্রমণের ঝক্কি-ঝামেলা সয়ে নাইরোবি হয়ে যেতে হচ্ছেই, তাই ট্যুর প্ল্যানে সামান্য পরিবর্তন আনলাম। নাইরোবিতে ৩/৪ দিনের ট্রানজিট নিয়ে জাঞ্জিবার আইল্যান্ড ঘুরে আসবো ঠিক করেছি। শুনেছি সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর টিপের মতো ঝকঝকে দ্বীপ জাঞ্জিবারের বেশিরভাগ ট্যুরিস্ট ইটালিয়ান। সামনের কয়েকটা দিন একটানা জার্নির উপরে থাকতে হবে। এরমাঝেই দু’টো দিন ভারত মহাসাগরের ধবধবে সাদা বিচে মদের নেশায় চুর হয়ে পড়ে থাকলে মন্দ হয়না। ডরিনের শোক থেকেও তো মুক্তি দরকার! অফিসের কলিগদের অনেকেই জানতেন ডরিনের শোক থেকে পালানোর জন্যই এত আয়োজন। আমি তো জানি শোক, মনস্তাপ আর স্মৃতি ভিতরে ভিতরে আমাকে কীরকম শেষ করে দিচ্ছে! সামান্য কিছু সাথে রেখে ভারী জিনিসপত্র ব্রিন্দিসিতে সিএমআর করে দিলাম, ওগুলো যথাসময়ে পৌঁছে যাবে।
এক হাতে কেবিন লাগেজ আর অন্যহাতে বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে কি একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে হাঁটছিলাম, আর মনে পড়ছিলো ডরিনের কথা।
৭
ওয়েনি মেনগেশা, ওর ডাক নাম ডরিন। হৃদয় ঝলসে দেয়া কালো হরিণ চোখের মেয়েটা তার পরিবারের সাথে ইথিওপিয়ার মেকেলে শহর থেকে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্ভবত একদিন ডরিনের জন্যই লিখেছিলেন,
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার 'পরে দেয় নি তুলে বাস, লজ্জা পাবার পায় নি
অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ॥
প্রথম দেখায় ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত একজোড়া চোখ, চিবুকের ডিম্পল আর ঠোঁটের প্রান্তে ঝুলে থাকা হাসির রেখা চোখ পড়ে। লম্বায় প্রায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি, ছিপছিপে গড়নের মেয়েটার শরীরের রঙ দারুচিনির মতো! একমাথা কোঁকড়ানো চুল, খাড়া নাক আর দেহের বাঁকের দিকে তাকালে সে এক ঘোরলাগা অনুভূতি! তার শরীরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চ কেবলই ছুঁতে ইচ্ছে করে। কোন এক হেমন্তের রাতে তার অতল গহ্বরে ডুবে আমি নাম রেখেছিলাম সিনামন গার্ল। ডরিনের নাভির গভীরে বৃষ্টিভেজা ফিনফিনে বাতাসের রাতে আমি দারুচিনির ঘ্রাণ খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাদের সেই রাতটা কেটেছিল স্পাইস গার্ডেনের ভিতরে এক গেস্ট হাউজে। সেই থেকে শি ওয়াজ মাই সিনামন গার্ল ফ্রম দ্য ল্যান্ড অভ শেবা! কেননা মাকেদা বা কুইন অভ শেবার জন্য ইথিওপিয়া বিখ্যাত।
সূর্য-পূজারী শেবার রানী এবং রাজা সলোমনকে নিয়ে ইহুদী,
খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া তথ্য এ বিষয়ে প্রচলিত মিথের মূল সূত্র।
পবিত্র কোরআন শরীফের সুরা আল-নামল এর ৩২ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে শেবার রানী ও রাজা সলোমনের
ঘটনার উল্লেখ আছে। আরবরা শেবার রানীকে ‘বিলকিস’ আর ইথিওপিয়ানরা তাকে ‘মাকেদা’ নামে
সম্বোধন করে থাকে। ইতিহাসবিদদের মতে ইয়েমেনই হচ্ছে দক্ষিন আরবের সেই হারানো রাজ্য শেবা।
তবে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনেকরেন শেবা নামের রাজ্যটা আসলে পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া।
ইথিওপিয়াই ছিল শেবা, শেবার রানীর রাজত্ব ছিল অ্যাকজাম নামে এক রাজ্যের উপর। ইথিওপিয়ান
ক্যাবরা নাগাস্টের মতে, শেবার রানী মাকেদা আর রাজা সলোমন একে অপরের প্রেমে পড়েন এবং
রানী যখন ফিরে যান তখন তিনি রাজা সলোমনের সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। রানী শেবায়
ফিরে গিয়ে মেনেলিক নামে এক ছেলে সন্তানের জন্মদান করেন। মাকেদা, মেনেলিক, মেকেলে সবগুলো
শব্দই ‘এম’ অক্ষর দিয়ে, কি অদ্ভুত!
ইথিওপিয়ার একদম উত্তরের রিজিয়ন, টাইগ্রের রাজধানী মেকেলের জনসংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। আদ্দিসআবাবার পর মেকেলে ইথিওপিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। মেকেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক বিজ্ঞান ও ভাষা বিষয়ে আন্ডারগ্রেড শেষে ডরিন পরিবারের সাথে উগান্ডায় চলে আসে এবং এন্টেবি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণ-যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়। পড়াশুনার পাশাপাশি সে মোবাইল কোম্পানি জেইনে পার্ট টাইম চাকুরি করতো। ডরিনের সাথে আমার পরিচয়পর্বটা এন্টেবি এয়ারপোর্টে জেইনের কিয়স্কে। সেদিন কি এক কারণে মনখারাপ ছিল, তাই বেইজের ক্যাফেটেরিয়াতে লাঞ্চে না গিয়ে এয়ারপোর্টের এদিকটায় চলে এসেছিলাম। তাছাড়া সেদিন একা নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটানো খুব দরকার ছিল। লাঞ্চ শেষে কফির কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে অফিসে ফেরার পথে জেইনের কিয়স্কে গিয়েছিলাম। এয়ারটাইম ভরতে ভরতে তার প্রথম প্রশ্ন ছিল,
: মুখটা গোমড়া করে রেখেছো কেন? কেউ কী বলেনি হাসলে তোমাকে সুন্দর দেখায়!
আমি অবাক হয়ে সেদিন ডরিনের দিকে তাকিয়েছিলাম। ইথিওপিয়ান মেয়েদের গায়ের রঙ এমনিতেই আমাকে বেশ টানে। কালো, আবার কালো নয়, খানিকটা যেন সাদা আর কালোর মিশেল। ডরিনের চিবুকের ডিম্পল বা জেলসিন থেকে যেন সোমরস চুয়ে পড়ছিল। সম্ভবত জাইগোম্যাটিকাস মেজর নামে পরিচিত মুখের পেশীর গঠনের তারতম্য বা ত্রুটির কারণে মেয়েদের মুখে ডিম্পল তৈরি হয়। তার অবয়বে ঝকঝকে দাঁতের সারি, তুলোর মতন নরম ওষ্ঠ এবং অধর, যাকে বলে 'তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা'। ডরিনের উদ্ধত স্তন যেন বাসুকির ফণা! চোরা চোখে ডরিনের বুকের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল ছেলেরা শৈশবে মায়ের কোলে বসে যা পান করে আজীবন সে তার আগ্রহ তাতে ধরে রাখে! লেখক হুমায়ুন আহমেদ ‘মীরার গ্রামের বাড়ি’ উপন্যাসের একজায়গায় লিখেছেন, ‘হরিণ সুন্দর চোখে, নারী সুন্দর বুকে’।
: কি ভাবছো?
সামান্য শ্রাগ করেছিলাম, মুখে কিছু বলিনি। কিংবা আমি যা ভাবছিলাম তা তো আসলে মুখে বলা সম্ভব না। কোন মেয়েকে কখনো বলা সম্ভব না, ‘তোমার বুক খুব সুন্দর, জোয়ারের মতো হাতছানি দেয়, ভাটার মতো কাছে টানে কিংবা জোছনার মতো মোহাবিষ্ট করে রাখে’। আমাকে চুপ থাকতে দেখে,
: চুপ যে! আমি জানি তুমি বেশ প্রাণবন্ত, প্রাণ খুলে
হাসতে পারো।
: এতসব কি করে জানলে?
: প্রায়ই তো আসো। তুমি ইন্ডিয়ান,
নাহ!
: ইন্ডিয়ান না, আমি বাংলাদেশী।
: আচ্ছা। তো সাথের মেয়েটি কই?
: কে? কার কথা বলছো?
: চায়নিজ একটা মেয়ের সাথে আসতে……
: ও তো চায়নিজ না, মঙ্গোলিয়ান।
: সে যাই হোক……
: ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে মোম্বাসা গিয়েছে।
ডরিনের সাথে সেদিন কথা হয়েছিল অনেকক্ষণ। তার সেদিন কাজের প্রেসার ছিল না। তবে অফিস আওয়ারে কাজ ফাঁকি দিয়ে এইপ্রথম গল্প করাতে আমার অনুতাপ হয়নি। ডরিনের সান্নিধ্য আমার বরং ভালোই লাগছিল। গল্পেগল্পে সেদিন জেনেছিলাম মিঃ কেজেলা মেরদাসা, ডরিনের বাবা ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের উগান্ডা অফিসে সিনিওর সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ এন্ড টিকেটিং সুপারভাইজর হিসেবে আছেন। তাকে কাম্পালা এবং এন্টেবি, দু’জায়গাতেই অফিস সামলাতে হয়। এন্টেবি চার্চ রোডের অভিজাত এলাকায় স্নো-হোয়াইট দেয়াল এবং স্কাই-ব্লু রঙের টিনের ছাউনি দেয়া দোতলা বাংলোটা তাদের।
কয়েকদিন পর এক বিকেলে ডরিন আমাকে তার বাসায় কফির নিমন্ত্রণ করেছিল। কফির সাথে যবের কুকিজ খেতে খেতে ওর পরিবারের সাথে সেদিন পরিচিত হয়েছিলাম। বাবা-মা আর টেন গ্রেডে পড়া একমাত্র ছোটবোন, বাথশেবা। কোন ভাই নেই। বেশ স্বচ্ছল পূর্বআফ্রিকান পরিবার। সামান্য উঁচু টিলার ওপরে সিমেন্টের ব্লকে বানানো বাংলো, টিনের ছাউনির নিচে কাঠের ফলস সিলিং। বারান্দার সিলিং-এ যে ফ্যানটা ঝুলছিল সেটা সম্ভবত কখনো ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি। কেননা লেক ভিক্টোরিয়ার দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। নুড়ি বিছানো পথের দু’পাশে ইনকা, পানসি, লুপিনের বর্ণিল কোয়ারি। তার পাশেই, এলোমেলো ভাবে সাজানো পাথরের ছোটছোট বোল্ডারের ফাঁক থেকে ফার্ণের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাদা স্পাইডার লিলি এবং উজ্জ্বল কমলা রঙের অ্যামেরিলিস। ঘাসের নরম মাঠে ছোট কাশফুলের সাথে ফুটে থাকা সাদা, হলুদ, পার্পল রেইনলিলি চোখ টানে। তিনটা স্প্রিংলারকে থেকে থেকে মাঠের চারদিকে পানি ছিটানো দেখে মনে হয়েছিল পৃথিবীর শুরু থেকেই বোধহয় ওগুলো ওভাবেই ব্যস্ত। ডরিনকে বলেছিলাম সে কথা, ও হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। কোন মেয়েকে হাসতে দেখলে যে এতোটা সুন্দর দেখায় সেটা এর আগে জানিনি।
এন্টেবির চৌরাস্তার স্কাল্পচার, পথের পাশের দারুণ
ল্যান্ডস্কেপিং, জ্যাকারান্ডার সারি আর পাহাড়ের ঢালে রঙিন বাংলোগুলোকে আমার কাছে ক্যানভাসে
আঁকা ছবির মতো লাগে। ডরিনদের বাংলোর অদূরে ব্যানবাট হাউজ। কঙ্গো এবং সাউথ সুদানের ইউএন
মিশনে কর্মরত বাংলাদেশী অফিসারদের ছুটি-ছাটায় সেখানেই উঠতে হয়। ব্যয়সাশ্রয়ী এবং নিরাপত্তা
ইস্যুতে আমাকেও কয়েকবার সেখানে থাকতে হয়েছিল। তখন অবশ্য ডরিনের সাথে আমার পরিচয় ঘটেনি।
ডরিনদের বাংলোর বিপরীত দিকের তিনতলা বাড়িটার নাম ছিল ‘নানক হাউজ’। প্রথমদিন নেমপ্লেটে
নামটা পড়ে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম, জাহাঙ্গীর কবীর নানক নামে বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদের
কথা মনে পড়েছিল। ভেবেছিলাম দেশ থেকে টাকা পাচার করে তিনি উগান্ডায় এসে ব্যবসাবাণিজ্যের
ছুতোয় ঘাঁটি গেড়েছেন। পরে অবশ্য জেনেছিলাম বাড়ির মালিক একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী। ধর্মে
পার্সি, অগ্নি উপাসক। উগান্ডায় প্রচুর ভারতীয় বাস করেন এবং দেশের ব্যবসাবাণিজ্য মূলত
তাদেরই দখলে।
১৯৭১ সালে ক্ষমতায় এসে ইদি আমিন বাণিজ্যের উপর স্বদেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্বান্ত নেন এবং পরের বছর ‘দ্য ইকোনমিক ওয়্যার’ ঘোষণা করেন। তবে তার এই ঘোষণা ছিল কেবল ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। কেননা সেসময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতীয়দের প্রচুর দাপট ছিল। তিনি তাদের উগান্ডা থেকে চলে যাওয়ার জন্য ০৩ মাস সময় বেঁধে দেন এবং ছেড়ে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য নিজের সমর্থকদের মধ্যে বণ্টন করেন। তিনি উগান্ডার সবচেয়ে বড় রপ্তানিখাত কফির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তার এসব সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে। কেননা উগান্ডাবাসীদের ব্যবসায়ের জ্ঞান ছিল না, এরফলে মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করে এবং দ্রব্যমূল্যের দাম জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়।
ডরিনের সাথে আলাপের একপর্যায়ে একদিন সাহস করে ফোর সিজন রেস্টুরেন্টে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। সে আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে কীনা সেবিষয়ে আসলে শিওর ছিলাম না। তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে সেদিন সে রাজী হয়েছিল। মাথায় কিউপিড ভর করলে যেটা হয়! হাসি আর আনন্দে আমাদের প্রজাপতি সময় বেশ দ্রুত কেটে যেতে থাকে। লগবেইজের কলিগদের মাঝে আগে যে অভিযোগ ছিল চিমজি’র বিরুদ্ধে, তা যেন এখন আমার বিরুদ্ধেই শোনা যেতে লাগলো।
আমাদের ছুটির দিনগুলো কাটতো এন্টেবির বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, লেকের সাদা বিচ কিংবা নাইটক্লাবের ডান্সফ্লোরে। উইকএন্ডের দিনগুলোয় নাইটক্লাব ‘প্যারাডাইস লস্ট’ ছিল আমাদের প্রিয় গন্তব্যের একটি। ডিজের হাতের ছন্দে টার্নটেবল, বিট মিক্স কিংবা পারকাশন বা ত্যামবোরিনের বিটসের সাথে নেশাধরা আফ্রিকান আদিম টোয়ার্ক! আইভোরিয়ান মাপোকা নাচের আধুনিকতম রূপ হলো টোয়ার্ক, বিগত তিন দশকে এটা পুরো আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। একেকটা দিন নিওলিথিক যুগের পানীয়র উপচানো ফ্যানার সাথে ড্রামের বিটস আর আমাদের উদ্দাম ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত! কার্লসবার্গ কিংবা হেইনকেন বিয়ারের ক্যান হাতে আমরা যেন পৃথিবীর আদিম মানুষ! আমার লিপলক কিসের হাতেখড়ি ডরিনের কাছেই, এন্টেবের উডেন ডান্সফ্লোরে। তবে শারীরিক সম্পর্কটা হয়েছিল আরও পরে, সোর্স অভ নাইলে।
ছুটির দিনে মাঝে মাঝে বোডা-বোডা চেপে আমরা কাম্পালা শহরটা চষে বেড়াতাম। উগান্ডার জনপ্রিয় ট্রান্সপোর্ট ‘বোডা-বোডা’ সিয়েরালিওনে ‘পোডা-পোডা’, জাঞ্জিবারে ‘ডালা-ডালা’, নাইরোবিতে ‘পিকি-পিকি’, ঘানাতে ‘ট্রো-ট্রো’, গিনিতে ‘মাগবানা’, নাইজেরিয়াতে ‘ডানফোর’, সেনেগালে ‘কার রেপিড’, ফিলিপাইনে ‘জিপনি’ আবার সাউথ আমেরিকাতে ‘কোলেক্টিভো’ নামে পরিচিত। ডরিনের সাথে এভাবে কয়েকবার এন্টেবে থেকে কাম্পালা কিংবা আশেপাশের এলাকায় ঘুরাঘুরি করে আমার সাহস খানিকটা যেন বেড়ে গিয়েছিল! নাইটক্লাব থেকে ফেরার পথে একদিন ডরিনকে জিনজা’তে ঘুরতে যাবার প্ল্যানটা জানালাম। সে প্রথমে রাজী হয়নি, তবে আমার চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছিল। এটাসেটা বলে বা লুকিয়ে নাইটক্লাবে ঘুরতে এলেও বাইরে রাতকাটাবার অনুমতি যে পাবে না, সেটা সে নিশ্চিত জানতো। ততদিনে আমরা অবশ্য বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। ডরিনের মা মিসেস বেরকনেস মেয়ের মনোভাব আঁচ করতে পেরে আমাদের বিয়ের অনুমতি দিলেও মিঃ মেরদাসা মোটেই রাজী ছিলেন না। ওনারা একটু অর্থোডক্স বা সনাতনপন্থী খ্রিষ্টান। তবে ডরিনের জেদের কাছে মিঃ মেরদাসাকে একসময় হার মানতে হয়েছিল। তবে তিনি ডরিনকে শর্ত দিয়েছিলেন, মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর। ডরিন পিএইচডিটা বিয়ের পর করবে বলে আমাকে এবং পরিবারকেও জানিয়েছিল। আমাদের জিনজা’তে ঘুরতে যাবার প্ল্যানটা হয়তো অধরাই থেকে যেত যদি ডরিনের পরিবারকে পারিবারিক প্রয়োজনে কেনিয়া না যেতে হতো।
২০১৫ সালের মার্চের ঘটনা।
ডরিনের
পরিবারকে গারিসা, কেনিয়াতে যেতে হলেও সেমিস্টারের প্রজেক্ট পেপার তৈরির অজুহাতে তাকে
এন্টেবেতে থেকে যেতে হয়েছিল। দিনটা সম্ভবত মার্চের ২১ তারিখ শনিবার, ডান্সফ্লোরে নাচের
অবসরে আমরা ‘সোর্স অভ নাইল’ ঘুরতে যাবার প্ল্যানটা চূড়ান্ত করে ফেলি। ক্লাবের নিয়ন
আলোয় সেদিন ডরিনের ঝকঝকে সাদা দাঁত কেবলই হাসছিল। আমি একটু পরপর ওর মদালসা ঠোঁটে চুমুর
স্বাক্ষর রেখে চলছিলাম, সমান তালে সেও সারা দিয়েছিল। সেদিন রাতে দুজনই পানীয়র নেশায়
চুর হয়ে গিয়েছিলাম। নেশাচ্ছন্ন সে রাতে জানতাম না আমরা আসলে কী করছিলাম!
ডরিনের পরিবারের অজান্তেই ২৮/২৯ মার্চ, শনি-রবি দু’দিন উইকএন্ডের সাথে মার্চের ২৭ তারিখ শুক্রবারের একদিন ছুটি মিলিয়ে আমি সেটাকে তিন দিনের হলিডে বানিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহুর্তে মেকআপ এক্সামের নোটিশ এলে শুক্রবারে যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল করতে হয়েছিল। যাহোক আমরা ২৮ মার্চ, শনিবারে বেশ সকালে একটা মাইক্রোবাস রেন্ট করে ঘুরতে গিয়েছিলাম। দু’দিন একরাতের ট্যুর, আমার জন্য সেটা শুধুই ঘুরে বেড়ানো কিংবা হাওয়া বদল। কিন্তু ডরিন হাতে কিছু কাজ নিয়ে এসেছিল, সাথে ল্যাপটপ। ওর ছিল মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য প্রোজেক্ট পেপার, প্রেজেন্টেশন রেডি করার তাড়া! সে পড়াশুনার বিষয়ে বেশ সিরিয়াস ছিল, আন্ডারগ্রেডেও ভালো রেজাল্ট করেছিল শুনেছিলাম।
আধবেলা জার্নি করে যে রিসোর্টে উঠেছিলাম সেটার নাম ছিল ‘চেরি ব্লসম’। ওয়েবসাইট ঘাঁটাঘাঁটি করে ডরিন নিজেই এটাতে বুকিং দিয়েছিল। যাওয়ার পথে একজায়গায় ব্র্যাকের বিলবোর্ড দেখে আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠেছিল। কাম্পালা থেকে কিগালি যাওয়ার পথেও ব্র্যাকের বিলবোর্ড চোখে পড়েছিল। বাংলাদেশের বিখ্যাত এনজিও ব্র্যাকের অপারেশন শুধু দেশের মাঝেই সীমাবদ্ধ না। সময়ের পরিক্রমায় তারা আন্তর্জাতিক এনজিওতে পরিণত হয়েছে। এশিয়ায় আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, নেপাল, মায়ানমার এবং আফ্রিকার উগান্ডা, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন ইত্যাদি দেশগুলোতে তাদের কার্যক্রম আছে বলে শুনেছি। রিসোর্টটা কিসিঞ্জা রোডে জিনজা সেইলিং ক্লাবের কাছেই, স্পাইস গার্ডেনের একদম ভিতরে। পথে একপ্রস্থ বৃষ্টি হয়েছিল বলে চারদিকের সবুজ একটু বেশি ঘন এবং সতেজ। রিসোর্টের রিসিপশনে চেক-ইন করার জন্য মাইক্রো থেকে নামতেই লাংলাং ফুলের ভেজাঘ্রাণ নাকে এসে বিঁধেছিল। ঘ্রাণের উৎস সন্ধানে আশেপাশে তাকাতে গিয়ে আমগাছের অমসৃণ ডালে উজ্জ্বল হলুদ লাংলাং ফুল ফুটে থাকতে দেখেছিলাম। ডরিন নিঃসন্দেহে ভীষণ বাস্তববাদী মেয়ে এবং অবশ্যই বুদ্ধিমতী। শরীরের জড়তা কাটাতে জিনজাতে পৌঁছানোর আগেই আমাদের পথের ধারে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে থামতে হয়েছিল। কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ডিসপোজেবল কাপটা ছুঁড়তে আশেপাশে বিন খুঁজতে খুঁজতে আমাকে ড্রাগস কর্নার থেকে কনডম কিনতে বলেছিল। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই,
:
রাতে তো শান্তিতে ঘুমাতে দিবে না জানি। ছিঁবড়ে খাবে। আগামি দু’তিন বছরের মধ্যে আমি
মা হতে চাইনা। আগে মাস্টার্স কমপ্লিট করতে দাও, কোথাও জবে ঢুকি, তারপর। আমি চাইনা সন্তানের
বেড়ে ওঠা নিয়ে কোন ঝামেলা-ঝক্কি হোক।
: আমি পারবো না। তুমিই দেখেশুনে কিনো।
ডরিন আমার ওপরে বিরক্তি প্রকাশ করে র্যাক থেকে ডিউরেক্স এক্সট্রা সেফ কনডমের দু’তিনটা প্যাকেট নিয়েছিল। আমি সামনের গন্ডোলা থেকে বাংলাদেশী কোম্পানি, প্রা্নের ফ্রুটজুসের কয়েকটা ক্যান এবং কিছু বেকারি আইটেম কিনে ডরিনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম,
:
মোটে একটা রাত, তারজন্য এতগুলো!
:
হুম, রিসোর্টের সবার জন্য কিনেছি। চলবে!
:
মানে!
: অত মানে মানে করতে হবে না। বিল ক্লিয়ার করো…
কথাটা
বলে ডরিন এক্সিট রুটের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।
ক্যাশ কাউন্টারে বিল ক্লিয়ার করে মাইক্রোতে উঠতে উঠতে সেদিন বলেছিলাম,
:
একটা কথা ভেবেছো?
:
কি?
:
প্রেমের জন্য তোমাকে সারাজীবন আমার কাছে নত হতে হবে।
:
সেটা কীরকম?
:
এই যেমন ধরো, তোমার হাইট ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি অথচ আমি ৫ ফুট ৬, ঠোঁটের এই দুই ইঞ্চির ব্যবধান
ঘুচাতে তোমাকে প্রতিবার আমার ঠোঁটের দিকে নত হতে হবে।
: ব্যাপার না। নিকোল কিডম্যান, চার্লিজ থেরন, ব্রুক শিল্ডস এনাদের কাপল ছবি দেখোনি! এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে।
ডরিনের কথাটা শেষ না হতেই খানিকটা উদাস সুরে বলেছিলাম,
:
অবশ্য বিছানায় মেয়েদের শরীরের হাইট কোন ব্যাপার না……আত্মসমর্পন করতেই হয়।
: ওরে শয়তান!
মাইক্রোবাসের
জানালা থেকে দূরের গাছপালার দিকে তাকিয়ে সেদিন কেন জানিনা ‘ইলেভেন ডেইজ ইলেভেন নাইটস’
মুভিটার কথা মনেপড়ে গিয়েছিল। ডরিন যদি জেসিকা মুর তবে আমি কী জশুয়া ম্যাকডোনাল্ড! ভীষণ
হাসি পেয়েছিল, ডরিনকে বললে সেও আমার কাঁধে হাসিতে গড়িয়ে পড়েছিল। পাগলের সুখ মনেমনে!
৯
শোভাময় চেরি গাছের ফুলকে ‘চেরি ব্লসম’ বা জাপানি ভাষায় ‘সাকুরা’ বলে। শাহবাগে হোটেল রুপসী বাংলার উল্টাদিকের মার্কেটের দ্বিতীয় তলাতে এই নামে একসময় একটা বার ও রেস্টুরেন্ট ছিল। অনেক বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের পদচারনায় একসময় মুখরিত সেই বারটা এখনও আছে কীনা জানিনা। বারের একপাশে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল, সেখানে একদিন কবি রফিক আজাদ তার প্রেমিকা দিলারা হাফিজকে প্রেমের প্রথম চিঠিটা নিবেদন করেছিলেন। এমনকি প্রথম চুমুটাও সেখানেই খেয়েছিলেন। সেকালে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা পুরনো ঢাকার বিউটি বোর্ডিং কিংবা স্টেডিয়ামের ম্যারিয়েটা ছাড়াও গুলিস্তানের রেক্স, নিউমার্কেটের মনিকো, শাহবাগের সিনোরিটা অথবা মৌলী কিংবা শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনেও চলতো। শাহবাগের সাকুরাতে কবি রফিক আজাদ-দিলারা হাফিজের মতো জিনজার সাকুরাতে আমাদের প্রেম বিনিময় হয়েছিল, তবে প্রেমের বহিঃপ্রকাশে যস্মিন দেশে যদাচার!
রিসোর্টের ঘন গাছপালার আড়ালে ট্র্যাডিশনাল লুকে ছোটছোট কটেজ, তাতে পামগাছের পাতার ছাউনি। পাতার ছাউনিগুলো অবশ্য টিনের চালার ওপরে আর ভিতরে কাঠের সিলিং। কটেজের আশেপাশে চেরিগাছ খুঁজে না পেলেও ঘরের ছাউনি ছাড়িয়ে বারান্দার কার্নিশ পর্যন্ত থোকায় থোকায় গোল্ডেন শাওয়ার ঝুলে ছিল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই বিছানার সাদা চাদরে গোলাপের সদ্যবিছানো পাপড়ি দেখে ভালো লাগলো। রুমেও একটা হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে। ব্যাগটা বিছানার পাশে ছুড়ে দিয়ে ডরিনের দিকে এগোতেই,
:
দরজাটা আটকে দাও প্লিজ।
কিন্তু আমার সে অবধি যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। ওখান থেকেই পায়ে ঠেলে দিলাম, শব্দ করে কাঠের পাল্লাটা চৌকাঠে সেঁটে গেল। তারপর,
:
লজ্জা করছে, লাইটগুলো নেভাও।
:
থাক না।
: উহু। নেভাও প্লিজ।
বারান্দার উজ্জ্বল কমলা রঙের গোল্ডেন শাওয়ার কিংবা রিসোর্টের হলুদ লাং লাং ফুলের চোখধাঁধানো সৌন্দর্য দেখে যতোটা না বিমোহিত হয়েছিলাম, আমি তারচেয়ে বেশি বিমোহিত হয়েছিলাম ডরিনের শারীরিক সৌন্দর্যে। ভারী পর্দার কিনারা উপচে আসা দিনের আলোর বিভায় আমি তাকে অনাবৃত করেছিলাম। কমলার খোসা ছাড়ানোর মতো করে গভীর আগ্রহ এবং পরম যত্নে শরীরের মাচুপিচু রহস্য আবিষ্কার করেছিলাম। পায়ের পাতা থেকে শুরু করে শরীরের সবখানে ছুঁয়ে দিয়েছিলাম চুমুর কোমল স্পর্শ। এযেন তার শরীরে আমার ভালোবাসার দখলদারি। আমাদের প্রথমবারের অভিজ্ঞতা খানিকটা লজ্জা, খানিকটা অনভ্যস্ততা এবং খানিকটা আশঙ্কায় শেষ হয়েছিল কারণ প্রয়োজনের মুহুর্তে ডিউরেক্স এক্সট্রা সেফ কনডমের প্যাকেট খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা চাইনি ওগুলো খুঁজতে গিয়ে ভালোবাসার আনন্দঘন মুহুর্তটা পানসে হয়ে যাক। পথের দীর্ঘ জার্নি এবং প্রথমরতির ক্লান্তিতে প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছিল। শাওয়ার নিয়ে রেস্টুরেন্ট অবধি যেতে ইচ্ছে করলো না বলে ফোন করে রুমেই খাবার সার্ভ করতে বলেছিলাম। ডরিন সাদা বাথরোবে নিজেকে জড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ারে একমাথা কোঁকড়ানো চুল শুকাতে শুকাতে পাশে এসে বসেছিল। তার শরীরে তখনও লেগেছিল জলের বিন্দুবিন্দু ফোটা। বাথরোব সরিয়ে নাভির গভীরে নাকটা গুঁজে দিয়ে আমি সেদিন দারুচিনির ভেজাঘ্রাণ খুঁজে পেয়েছিলাম। হেসে বলেছিলাম, মাই সিনামন গার্ল! ডরিন কিন্তু আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরেছিল,
: উহু। এখন আর না।
আমি
সেদিন রাইস কেকের সাথে গ্রিল্ড তেলাপিয়া ইন হার্ব অলিভ ওয়েল নিয়েছিলাম, সাথে ক্যাপসিকাম
আর টমেটো মেশানো অ্যাভাকাডো সালাদ। ডরিন ওর পছন্দের চিকেন আইটেমে লাঞ্চটা সেরে নিয়েছিল।
দিনের বাকী সময়টায় বাইরে ঘুরতে যাবার মুড আমার কিংবা ডরিনের ছিল না, এমনকি ডিজে’র জনপ্রিয়
প্লে-লিস্টের সাথে সন্ধার বারবিকিউ পার্টিও না। আমাদের সেদিন ছিল ভালোবাসায় আর্দ্র
বিকেল, প্রেমঘন সন্ধ্যা এবং শৃঙ্গার ও
শীৎকারে ঘুমহারা দীর্ঘরাত।
রাতজাগা কায়িক পরিশ্রম আমাকে পরদিন সকাল দশটা অবধি ঘুমোতে বাধ্য করে। পাশ ফিরে শুন্য বিছানার দিকে তাকিয়ে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিলাম। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি ডরিন ইজিচেয়ারের সামনে পাতা টেবিলে পা তুলে দিয়ে কোলে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। ল্যাপটপের টাচপ্যাড আর কী বোর্ডের টাইপে ঝড়ের গতি তুলতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। নাম না জানা গাছের পাতার আড়াল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছিল। সম্ভবত মেলোস্পিজা মেলোডিয়া, আমরা যাকে গান চড়ুই নামে ডাকি। টি টেবিলে রাখা কফিমগ থেকে উড়ন্ত ধোঁয়া, কিছু বই এবং কাগজপত্র। সবমিলে রবিবারের একটা শান্ত সকালের জানান দিচ্ছিল। আমাকে দেখে,
:
কী ঘুম ভাঙলো?
:
হুম, এত পরিশ্রম!
:
রাক্ষস!
:
টিজার দেখেছো প্রিয়, ফুল-লেন্থ ফিল্ম এখনো বাকী…
:
মানে!
:
নাস্তা করেছো?
: হুম। রিসেপশনে বলে দাও, এখানেই দিয়ে যাক।
তুমি আমার পাশে এসে বসো, বলে ডরিন আবারও কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায়,
:
তুমি কি এগুলোই করবে? নাকি আমার সাথে বের হবে?
:
উপায় নেই ডার্লিং। বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে তোমার সাথে এপর্যন্ত এসেছি। আমাকে কাজ করতে
দাও প্লিজ।
:
তাহলে আমি!
:
তুমি ঘুরে এসো, বেশি দূরে যেওনা।
:
একা ঘুরতে ইচ্ছে করছে না। আমি বরং তোমার সাথেই থাকি।
:
উহু। তা হবে না। অত্যাচার শুরু করবে জানি। আমার কাজ লাটে উঠবে। বুসোওকো জলপ্রপাত বা
কাছেই ‘সোর্স অভ নাইল’ দেখে চলে এসো। এরমাঝে আমার পেপার রেডি হয়ে যাবে আশাকরি। তারপর
একসাথে লাঞ্চ করবো। বিকেলের দিকেই এন্টেবেতে ফিরতে হবে মনেরেখো।
:
বাকি প্যাকেটগুলোর কি হবে?
: ওগুলো তুমি বরং সাথে নিয়ে যেও, নীলনদের জলে ভাসিয়ে দিও।
স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ডরিন কথাগুলো বলেছিল। আমার তাতে একটু অভিমান হয়েছিল বোধহয়। আচ্ছা, ঢাকার মেয়ে হলে কী এরকম করতো! জানিনা। রুমে ঢুকে পোষাক পাল্টে ক্যামেরা হাতে বের হতেই,
: দাঁড়াও। এদিকে ফেরো।
ল্যাপটপ টেবিলে রেখে ডরিন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে ঝুঁকে চুমু খেয়ে বলেছিল,
: রাগ করো না সোনা। আমাকে সোমবার প্রজেক্ট পেপার অবশ্যই সাবমিট করতে হবে। একটু কোঅপারেট করো প্লিজ।
ডরিনের অমন গভীর চুমু আমাকে প্রতিবার যুদ্ধের জন্য তৈরি করে। সৃষ্টিকর্তা মেয়েদের ইমোশন বোঝার কী অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছেন! তারা অবলীলায় সঙ্গীর রাগ-অভিমান বুঝতে পারে। জমে থাকা যত অভিমান মুহুর্তেই মোমের মতো গলে গিয়েছিল। আমার কোমর পেঁচিয়ে রাখা ওর হাতদুটো সরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম,
:
রাগ করিনি। আমি তাহলে ঘুরে আসি, তুমি কাজ করো। পুরো পথটা তো সামনে পড়েই আছে। আমি জীবনভর
তোমাকে একটু একটু করে পান করবো, ওয়াইনের গ্লাসের মতো। অথচ এই আমি চকলেট কখনো চুষে খাইনি,
আর আইসক্রিম সবসময় কামড়ে খেয়েছি।
: ওরে অসভ্য! দেখাচ্ছি মজা!
কথাটা
বলেই আমার বুকে দুটো কিল দিয়ে ডরিন একটু দূরে সরে গিয়েছিল। এইযে বৃষ্টির ফোঁটার মতো
সে আমাকে টপাটপ চুমু খায়, ঢাকার মেয়ে হলে এরকম করতো কী! যৌনতার ব্যাপারে এদেশের মেয়েরা
সবসময়ই আনাড়ি! অথচ তারা সেটা স্বীকার করতেও চায় না। কে বলবে ‘কামসূত্র’ এর উৎসভূমি
ভারতীয় উপমহাদেশ! প্রায় দু’হাজার বছর আগে একদিন এই উপমহাদেশের পণ্ডিত মল্লনাগ বাৎস্যায়ন
রমণীদের জন্য চৌষট্টি কলার ফিরিস্তি লিখে গেছেন। পঞ্চাল দেশের বাভ্রব্য চৌষট্টি কলা
ছাড়া আরও চৌষট্টি ধরনের শিল্পকাজের কথা বলে গেছেন।
১০
নীলনদ এবং লেক ভিক্টোরিয়ার তীরে জিনজা উগান্ডার চতুর্থ বৃহত্তম শহর। ‘জিনজা’ নামটা নীলনদের উভয় তীরে বসবাসরত বাগান্ডা এবং বসোগা, উভয় জাতির ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘শিলা’। ১৯৭৮-৭৯ সালে উগান্ডা-তানজানিয়া যুদ্ধের সময় তানজানিয়া পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের কাছে উগান্ডা ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির পরাজয় এবং কাম্পালার পতন হলে প্রেসিডেন্ট ইদি আমিন জিনজায় পালিয়ে এসে স্থানটিকে উগান্ডার রাজধানী ঘোষণা করেন। এর গ্রীষ্মমন্ডলীয় বায়ুমণ্ডল এবং সবুজ গাছপালা কাছে টানলেও ‘সোর্স অভ নাইল’ পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। পর্যটকদের জন্য এখানে কায়াকিং, ওয়াটার রাফটিং, হাইকিং, বাঞ্জি জাম্পিং, ওয়াটার স্কিইং, উইন্ডসার্ফিং, ক্যানোয়িং ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকলেও সময় স্বল্পতার কারণে আমি শুধুমাত্র বুসোওকো জলপ্রপাত দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। রিসোর্টের অনতিদূরে, ক্লিফ রোড ধরে সামান্য এগিয়ে গলফ কোর্সের কাছে মহাত্মা গান্ধীর মনুমেন্ট দেখে যখন রুমে ফিরলাম তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে।
ইথিওপিয়ার তানা হ্রদের নীল জলরাশি এবং জিনজা, উগান্ডাতে লেক ভিক্টোরিয়ার সাদা জলরাশির মিলিত জলধারা নীলনদ তার ৬,৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাপথে আফ্রিকার মোট ১১টা দেশ কভার করেছে। এটি মিশর, সুদান এবং সাউথ সুদানের জলের মূল উৎস। মহাত্মা গান্ধী মৃত্যুর পরে তার ছাই নীল নদের জলে মিশিয়ে দিতে বলেছিলেন। ‘সোর্স অভ নাইল’-এ তার দেহভস্ম ঢেলে দেয়া ছাড়াও একটা আবক্ষ ব্রোঞ্জমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব আই কে গুজরাল মূর্তিটা উন্মোচন করেন এবং উগান্ডার ‘ব্যাঙ্ক অভ বরোদা’ এটা রক্ষণাবেক্ষণ করে।
বিকেলের
পরপর রওনা করে আমরা কাম্পালা হয়ে এন্টেবেতে যখন পৌঁছেছিলাম তখন রাত সাড়ে আটটা। আমরা
কাম্পালাতেই যাত্রাবিরতি দিয়ে ডিনার সেরে নিয়েছিলাম। প্রায় ১৪০ কিলোমিটার পথ পারি দিতে
প্রায় তিনঘণ্টা লেগেছিল। সন্ধ্যার দিকে, আমরা তখনো কাম্পালা পৌঁছাতে পারিনি, মিসেস
বেরকনেস মোবাইলে ফোন করে ডরিনের খোঁজখবর নিলেন। তিনি ডরিনকে মঙ্গল অথবা বুধবারে গারিসায়
যেতে বলেছিলেন। গারিসার নামটা শুনে আমি চমকে উঠেছিলাম। সোমালিয়ার কাছাকাছি কেনিয়ার
ঐ কাউন্টির আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না। ডরিন নিজেও যেতে চায়নি কিন্তু কি
একটা অনুষ্ঠানে তাকে থাকতেই হবে, মিসেস বেরকনেস বলেছিলেন। ডরিন ৩১ মার্চে গিয়েছিল তবে
সে আর কখনো ফিরে আসেনি। ডরিন এরপর থেকেই শুধুই স্মৃতি জপমালা।
১১
১৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখের ঝকঝকে সকাল। এন্টেবে এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন কিউতে দাঁড়িয়ে আছি। অবশেষে বারবার ঘড়ির ডায়াল দেখা বন্ধ করতে ‘নেক্সট প্লিজ’ ডাকটা ভেসে এলো। এন্টেবের ইমিগ্রেশন অতটা শক্ত নয়, আলতোভাবে বডিফ্রিস্কিং করে ছেড়ে দিল। তাছাড়া প্রায়ই এয়ারপোর্টের কফিশপে ডরিনের সাথে আড্ডা মারা হতো বলে তাদের অনেকেই মুখচেনা, সেটা বোধহয় কাজে লাগলো। আমি এয়ারপোর্টের ফর্মালিটি সারছি আর রাজ্যের কীসব কথা ভাবছি। টুকরো টুকরো স্মৃতি আজ আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি হাঁটছি মুভিতে দেখা জম্বিদের মতো করে। চিমজি বিদায় জানাতে এসেছিল কিন্তু ওর সঙ্গও যেন উপভোগ করছিলাম না। আমার যেন একা থাকতে, নিজের সাথে থাকতে কিংবা নিজের স্মৃতির মাঝে থাকতেই ভালো লাগছে। কফিশপে বসে আমরা দুটো ক্যাপাচিনো নিয়েছিলাম। জানালার ওপাশে পরিস্কার আকাশ, ঝকঝকে টারমাকে প্লেনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। বোর্ডিং ব্রিজ নেই বলে যাত্রীদের হেঁটেই বোর্ড-ইন করতে হয়, তাদের হৈ-হল্লা শোনা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চিমজির সাথে দু’চার কথা হলো।
এন্টেবে এয়ারপোর্টে ৩ জুলাই ১৯৭৬ সালে একটা সফল কাউন্টার টেররিস্ট অপারেশন পরিচালনা করা হয়। ১০০ জন ইসরাইলি প্যারাকমান্ডো পরিচালিত সেই অপারেশনের কোডনাম ছিল ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ড’, এটা ‘রেইড অন এন্টেবে’ নামেও পরিচিত। ২৭ জুন তারিখে এয়ার ফ্রান্সের এয়ারবাস A300 জেট এয়ারলাইনার ২৪৮ জন যাত্রী নিয়ে তেল আবিব থেকে প্যারিসে যাবার পথে এথেন্সে স্টপ ওভার করে, সেখান থেকে ৫৮ জন যাত্রী বোর্ড-ইন করে, যাদের মধ্যে ৪জন টেররিস্ট ছিল। তাদের দু’জন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন-এক্সটারনাল অপারেশনস (PFLP-EO) এবং অন্য দু’জন জার্মানির গেরিলা সংগঠন (RZ) এর সদস্য। এথেন্স থেকে টেকঅফ করার মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় তারা প্লেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্যারিসের বদলে লিবিয়ার বেনগাজিতে চলে যায়। সেখানে জ্বালানি ভরা হলে তারা ২৮ জুনে উগান্ডার এন্টেবেতে ল্যান্ড করে, এপর্যায়ে সেখানে অপেক্ষারত আরও ০৩জন টেররিস্ট তাদের সাথে যোগ দেয়। মোসাদের প্ল্যানে সফল জিম্মি উদ্ধার অপারেশনে ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু’র বড় ভাই, কমান্ডোদের অ্যাসাল্ট ইউনিটের প্রধান ইয়োনাথান নেতানিয়াহু মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং ০৫ জন কমান্ডো আহত হন। অপরদিকে কমান্ডোরা টেররিস্টদের সবাইকে এবং উগান্ডার ৪৫জন সৈন্যকে হত্যা করে। এছাড়া তিনজন জিম্মি মারা যান এবং আহত হন ১০ জন।
:
কী হলো? কি ভাবছো?
:
এই এয়ারপোর্ট কতকিছুর স্বাক্ষি। কত ঘটনার।
:
হুম
:
রেইড অন এন্টেবের কথা ভাবছিলাম।
: আমাকে সামনে বসিয়ে রেখে!
চিমজি একইসাথে অবাক এবং বিরক্ত হলো। আমাদের আড্ডাটা আসলে ঠিক জমছিল না। কিছুই ভালো লাগছিল না। চিমজি হয়তো বুঝতে পেড়েছিল আমার মনের অবস্থা। আমার আসলে একটু একা থাকা দরকার। সে বিদায় জানাতে উঠে দাঁড়ালো।
চিমজি হাতের মুঠোয় ধরে রাখা ছোট প্যাকেটটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরলো। ঠোঁটে চুমু খেলো এবং চোখের কোণের চিকচিক করা জলের ফোঁটা লুকিয়ে চলে গেল। মনেপড়লো বিপসটের এক রাতজাগা চ্যাটিং এর কথা।
:
আমি তোমাকে চুমু খেতে চাই।
:
ওকে, কিন্তু কোথায়?
:
চিবুক অথবা কপালে।
:
কী! তুমি তো আমার বাবা নও।
: ঠোঁটে।
ঢাকা এয়ারপোর্টে একদিন যেটা সম্ভব ছিল না আজ এন্টেবের এয়ারপোর্টে সেটাতে কোন বাঁধা ছিল না।
:
পৌঁছে জানিও। যোগাযোগ রেখো।
: পাবলো ভালো ছেলে, ওকে ছেড়ে যেও না। ও তোমাকে সুখি করবে।
ওর চলার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোর্ডিং পাস হাতে উঠে দাঁড়ালাম। গতকাল সন্ধ্যায় ডরিনের বাসায় গিয়েছিলাম। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি, মিসেস বেরকনেস আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলেন। বাথশেবা বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে আসতে চেয়েছিল, নিষেধ করেছি। তবে চিমজি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মিঃ কেজেলা মেরদাসা এসেছিলেন। এই প্রথম আমি যেন অন্য এক মানুষকে আবিষ্কার করলাম। এই মুহুর্তে তিনি শুধুই একজন বাবা। সন্তান হারানো একজন বাবা। গাম্ভীর্যের যে কঠিন চাদরে তিনি নিজেকে সবসময় আবৃত করে রাখেন তা যেন আজ খসে পড়েছে। তার দুহাতে আমার দুহাত যখন চেপে ধরলেন তখন তার চোখের প্রান্ত নোনাজলে ভেসে গেছে। যাত্রীদের বোর্ড-ইন করার জন্য লাউডস্পিকারে ঘোষণা চলছে। খুব কষ্টে নিজেকে তার হাতের বন্ধন থেকে ছাড়ালাম। আমি জানিনা তাদের সাথে আর কখনও দেখা হবে কীনা! অল্পসময়ের পরিচয়ে আফ্রিকান এই পরিবারের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা কখনো ভুলবার নয়। তাদের অমূল্য সম্পদ, ভালোবাসা নিয়ে আমি চলে যাচ্ছি তাদের কাছ থেকে বহুদূরে।
টারমাকে
কয়েক কদম হেঁটে, ল্যাডার বেয়ে ক্যারিয়ারের ভিতরে ঢুকলাম। এখানে অন্যরকম পরিবেশ, বাইরের
থেকে যা সম্পূর্ণ আলাদা। সরু ওয়াক ওয়ে ধরে নিজের সীটের পাশে দাঁড়ালাম। কেবিন ক্রু হেসে
সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন, ‘গুড আফটার নুন স্যার’। উইন্ডো সীট নিয়েছি। কেবিন ক্রুকে
পাল্টা হাসি উপহার দিয়ে কেবিন লাগেজ ওভারহেড বিনে ঠেলে বসে পড়লাম। জানালার বাইরে তাকিয়ে
বিক্ষিপ্ত কীসব ভাবছি।
১২
গভীর রাতে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে দেশ-বিদেশের নিউজ পড়া আমার অনেকদিনের অভ্যাস। ২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখ বা বৃহস্পতিবার রাতে এরকম একটা খবর পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম, ‘আল-শাবাব বন্দুকধারীরা গারিসা ইউনিভার্সিটি কলেজে হামলা চালিয়ে ১৪৮ জনকে হত্যা এবং ৭৯ জন স্টুডেন্টকে আহত করেছে। তারা ৭০০ জনের অধিক স্টুডেন্টকে জিম্মি করে মুসলমানদেরকে ছেড়ে দিলেও খ্রিষ্টান স্টুডেন্টদেরকে হত্যা করেছে’। গারিসা নামটা জানলেও লোকেশন জানা ছিল না। গুগল ম্যাপ ঘেঁটে জানলাম গারিসা কাউন্টি কেনিয়ার ৪৭টা কাউন্টির মধ্যে একটি। এই কাউন্টির পূর্বে সোমালিয়া, উত্তরে ওয়াজির এবং ইসিওলো কাউন্টি, পশ্চিমে তানা নদী কাউন্টি, দক্ষিণে লামু কাউন্টি। কাউন্টির নামে রাজধানী শহর গারিসার নামকরণ করা হয়েছে। মূলত সোমালি জাতিগত সম্প্রদায় দ্বারা অধ্যুষিত এই কাউন্টির জনসংখ্যার ৯৭% মুলমান, ২% খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের।
আরবি
শব্দ ‘আল-শাবাব’ এর বাংলা অর্থ যুবক। হত্যাকাণ্ডের পর চারজন অস্ত্রধারী যুবক বিস্ফোরণ
ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাদের দাবি, কেনিয়ার সেনারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী সোমালি
অঞ্চল ও দক্ষিণ সোমালিয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। এজন্য ক্ষিপ্ত
হয়ে তারা কেনিয়ায় বড় ধরনের হামলা চালানোর সুযোগ খুঁজতে থাকে। পশ্চিমা শক্তিতে খ্রিস্ট
ধর্মাবলম্বীদের প্রাধান্য বলে অমুসলিমদের ওপর তাদের চাপা রোষ ছিল। এই রোষ গারিসা হত্যাকাণ্ডের
মতন পৈশাচিক বর্বরতার জন্ম দেয়। নিউজটা পড়ামাত্রই মিসেস বেরকনেসকে ফোন করেছিলাম। ফোনটা
কয়েকবার বেজে থেমে গিয়েছিল, কেউ ধরেনি। অজানা আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল
ডরিনের ভাগ্যে খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। নিউজের বাকীটা থেকে জানলাম আল-শাবাবের পুরো নাম
‘হরকত আল শাবাব আল মুজাহিদিন’। বিগত কয়েক দশকে খরা, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
ও অন্যান্য কারণে প্রায় পাঁচ লাখ সোমালিয় নাগরিক শরণার্থী হিসেবে কেনিয়ায় আশ্রয় নিলে
আল-শাবাব তাদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগে একটা বড় অংশকে দলভুক্ত করে ফেলে। সে রাতে আমার আর ঘুম আসেনি।
সারাটা রাত ছটফট করে কেটেছিল। পরদিন সকালে অফিসে গিয়েই মিসেস বেরকনেসকে আবারও ফোন করেছিলাম।
কীভেবে বাথশেবাকে ফোন করলে দু’বার রিং হবার পর সে ফোনটা
ধরেছিল। তার কাছেই জেনেছিলাম, ডরিন এই পৃথিবীতে আর নেই। আমাদেরকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে
গেছে। আল-শাবাব এর হত্যাকাণ্ডের শিকার খ্রিষ্টান
স্টুডেন্টদের গ্রুপটাতে সেও ছিল।
সম্ভবত আট/দশ দিন পর ডরিনের কফিনসহ পরিবারের সবাই এন্টেবেতে ফিরেছিলেন। আইনগত, ইমিগ্রেশন এবং অফিসিয়াল ফর্মালিটির কারণে ডরিনের ডেডবডি আনতে এই সময়টা লেগেছিল। এরপর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের নিয়ম অনুযায়ী শেষকৃত্যের আয়োজন শেষে চার্চের কাছেই সেমিটারিতে কফিন দাফন করা হয়। বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এসেছিলেন। তবে আমি এসল্ট রাইফেলের গুলিতে ক্ষতবিক্ষত ডরিনের মুখটা দেখতে যাইনি। মরচুয়ারি কুলার থেকে কফিনটা যখন বাসায় আনা হয়েছিল, চার্চে যখন নেয়া হয় কিংবা তাকে যখন সেমিটারির সমাধিতে শোয়ানো হয়, তখনও দেখতে চাইনি। ডরিনের যে হাসিমাখা মুখ আমার চোখের সাথে সেঁটে আছে, তা অন্যকোন দৃশ্যদিয়ে ঢেকে ফেলতে চাইনি। রাখীর সাথে ব্রেকআপের কষ্টটা তাও মেনে নেয়া যায় কিন্তু ডরিনের অসময়ে এভাবে চলে যাওয়া! এরকম তো কখনো ভাবিনি। সে আমার অনেক রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। অনেকদিনের হাসি মুছে দিয়েছিল। এলোমেলো জীবনটাকে যার অনুপ্রেরণায় গৎবাঁধা জীবনের ছকে ফেলতে চেয়েছিলাম সে কিভাবে এভাবে ফেলে চলে গেল………
: Excuse me Sir, please fasten your seat belt.
এয়ার
হোস্টেজের কথায় ভাবনার সুর কেটে গেল। লজ্জা পেয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে সরি বললাম। উনি হাসিতে
মুক্তো ঝরিয়ে, ‘Hakuna Matata’ বলে সরে গেলেন।
১৩
উইন্ডো দিয়ে বাইরে তাকাতেই বোঝা গেল প্লেনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। পার্কিং বে থেকে রানওয়েতে ট্যাক্সি করে কেনিয়ান এয়ারওয়েজের ফ্লাইট নম্বর KQ 419, Boeing 767 ক্যারিয়ার সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছনের দিকে ক্রমাগত সরে পড়ছে এন্টেবে এয়ারপোর্টের ধূসর টারমাক। আমিও যেন ডরিনের স্মৃতি থেকে ক্রমাগত সরে যাচ্ছি। পরিযায়ী পাখির অভিযাত্রায় খসেপরা পালকের চিহ্ন কী সে মনেরাখে! আমি জানিনা। আমি শুধু জানি ডরিন আমার জীবনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সে আমার স্মৃতির মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালক। একটু পর প্লেনটা এয়ারবর্ন হলে পিছনে পরে থাকে আধপোড়া স্মৃতি, ধূসর নীরবতা এবং একটা প্রাণবন্ত মুখের ছায়া, ভালোবেসে একদিন যার নাম রেখেছিলাম ‘সিনামন গার্ল’, দ্য গার্ল ফ্রম দ্য ল্যান্ড অভ শেবা।
পোস্ট ভিউঃ 15