দ্য সামার অভ নাইন্টিনাইন

গল্প লাস্ট, লাভ এন্ড আদার স্পাইসেস অভ লাইফ
দ্য সামার অভ নাইন্টিনাইন

: Hi! I’m Roja.  

: Wow! I didn't know you were Muslim!

: উহু। আমার নাম রোজা।

পরিষ্কার বাংলায় কথাটা শুনে এবার আমার অবাক পালা! ধন্দ কেটে গেলে,

: ও আচ্ছা, আমি আসলে বুঝতে পারিনি। দুঃখিত।

: It's okay. No mention.

রোজালিন্ড রিডিলি’র সাথে আমার পরিচয় ওভাবেই।   

৯৭ কিংবা ৯৮ সালের দিকের কথা। রোজা জার্মানির মেয়ে, আমার শহরে এসেছিল জার্মান ফান্ডপুষ্ট একটা এনজিও’র কাজে। সম্ভবত এক বা দেড়বছরের জন্য। ঝরঝরে বাংলায় কথা বলতে পারে। তবে বাংলা ভাষাটা সে কীভাবে রপ্ত করেছে তা জানিনা। তাকে আসলে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি। আমাদের বাসার চারতলা’র স্টুডিও এপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতো। ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে রংপুরে গিয়েছিলাম। রমযান মাসের বিকেল, বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে ঘরে ফেরার সময় সিঁড়ির গোঁড়ায় ওর সাথে দেখা এবং সেখানেই প্রথম কথা হয়েছিল। এরপর কয়েকটা দিন আর দেখা হয়নি। আমি নিজেও কী একটা কাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম, তাই তার খোঁজ নেয়া হয়নি। তবে তার সাথে আরেকদিন দেখা হয়েছিল। সেটা ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে আসার দুদিন আগের ঘটনা। আমি বাসা থেকে বের হচ্ছি, আর সে রিকশায় কোথা থেকে যেন ফিরলো। গেটের কাছেই দেখা। মোটর সাইকেলে ওঠার সময় হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম,  

: Wanna go for a ride?

: Yes, why not! আমার এবারও অবাক হবার পালা।     

    আমি এমনিতেই, যাকে বলে সৌজন্যতা দেখাতে কথাটা বলেছিলাম আর সে কীনা রাজি হয়ে গেল! বাইকে স্টার্ট নিতেই সে পিছনে দু’পা ছড়িয়ে বসে পড়লো। তাকে নিয়ে কোথায় যাওয়া যেতে পারে ভাবছি! কিছুই তো ঠিক করা ছিল না। অবশেষে এদিক সেদিক ঘুরে তিস্তা রেলওয়ে ব্রিজ প্রটেকশন বাঁধে নিয়ে গেলাম। ব্রিজের ওপারে নদীর বাম তীর বরাবর বাঁধ, সেখানে শিমূল গাছের সারির নিচে কিছু পাথরের বোল্ডার পড়ে আছে। মোটরসাইকেল পার্ক করে তার একটাতে বসে সিগারেট ধরালাম। অফার করাতে সেও সিগারেটে আগুন দিল। আজ আমার শুধুই অবাক হবার পালা। চুপ করে বসে থাকা তো যায় না। দু’জন ব্রিটিশ সাধারণত আবহাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে কথা বলা শুরু করে। আর আমরা তো নাম-ধাম জিজ্ঞেস করে শুরু করি, তারপর হাড়ির খবর জানতে চাই। আমি সে পথেই হাঁটলাম,      

: ‘Roja’ শব্দের অর্থ?  

: পিংক, গাছের ভাঙ্গা ডাল দিয়ে ধূলা ঝেড়ে বসতে বসতে বললো।   

: ‘রোজা মিউতাবিলে’ কখনো শুনেছো?

জ্ঞান ফলানোর জন্যই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেননা কয়েকদিন আগেই পুর্নেন্দু পত্রীর ‘পদ্যপাগলের পাণ্ডুলিপি’ পড়েছি। স্মৃতিতে সব তথ্য তখনও একদম তাজা।   

: No, what’s that? 

উত্তরটা জানা ছিল, তাকে সেদিন গল্পটা বলেছিলাম। সিগারেটের ধোঁয়ার ফাঁকে সে অবাক হয়ে শুনেছিল।  

    জোসে মোরেনা ভিল্লা ছিলেন মাদ্রিদের রয়্যাল প্যালেসের লাইব্রেরিয়ান। তিনি একদিন তার বন্ধু লোরকাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর একটা বোটানির বই থেকে রহস্যময় এক গোলাপের কাহিনী শুনিয়েছিলেন। গোলাপ ফুলটার নাম ছিল ‘রোজা মিউতাবিলে’। এই গোলাপের বিশেষত্ব হচ্ছে, সকালে যখন ফোটে তখন এটার রঙ গাঢ় রক্তিম। এরপর বেলা বাড়ার সাথে সাথে ফিকে হতে থাকে এর রঙ। যখন ঝরে পড়ে তখন পাঁপড়ির সব রঙ হারিয়ে মৃত হাড়ের মতো একদম সাদা। গল্পটা শোনার কিছুদিনের মধ্যেই লোরকা তার বিখ্যাত তিন অঙ্কের নাটক ‘ডোনা রোসিটা দি স্পিনস্টার’ লিখেছিলেন। ‘রোজা মিউতাবিলে’র মতো নাটকের নায়িকা ডোনা রোসিটা’র বয়স যত বাড়ে, ততোই ঝরে পড়ে তার সৌন্দর্য। রক্তিম যৌবনকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়াতে থাকে ব্যাধি। রোজা মনযোগী শ্রোতার মতো সবটা শুনলো, আমি কথায় বিরতি দিলে সে সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছুঁড়ে দিয়ে উদাস ভঙ্গীতে বলেছিল,      

: My boyfriend, Baldwin, used to call me 'Luna Rosa'.

: বাহ! ‘লুনা রোজা’ মানে কি?  

: 'Luna Rosa' means 'Red Moon.'

: তাই?   

: হুম। চাঁদের রং লাল হয়ে যাওয়াটাই পিঙ্ক বা রেড মুন। অনেকে একে ব্লাড মুন বলে। পূর্ণগ্রাসের সময় চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধকার অংশ ‘আম্ব্রা’তে ঢোকে। ওখানে থাকাবস্থায় লালচে রং-এ পরিণত হয় বলে তাকে ‘রেড বা ব্লাড মুন' বলে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যদিয়ে সূর্যের আলো চাঁদে পৌঁছানোর সময় ধূলিকণায় প্রতিফলিত হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে বলেই এমনটা হয়। তখন বায়ুমণ্ডলে যত বেশি ধূলিকণা থাকবে চাঁদকে ততো বেশি লাল লাগবে।    

: Learned a lot. Thank you, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কথাটা বলেছিলাম।    

: মজার কথা কী জানো! ‘লুনা রোজা’ নামে একটা ইতালিয়ান মুভি আছে। মুভির নায়িকা মারিয়াকে তার বাগদত্তা কার্লো প্রতারণা করে। মারিয়ার বান্ধবী লুসিয়া, যার কিনা মারিয়ার ভাই পাওলোর সাথে বিয়ে হবার কথা তার সাথেই কার্লো প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আমার জীবনে অনেকটা ওরকমই ঘটেছে। একবছরের বেশি লিভইন সম্পর্কে থাকার পরও বল্ডউইন আমার বান্ধবি ক্লারা’র সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে আমাকে ডিচ করেছিল।        

    আমার মনখারাপ যেন আকাশের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছিল। চারদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে।’ সেদিনের আড্ডাটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর সময় ডুবন্ত লাল সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘লুনা রোজা।’ সে হেসেছিল। শিমূল গাছের নিচে স্মৃতির কিছু টুকরো জমা রেখে আমরা সেদিন বাসায় ফিরেছিলাম। আমি তাকে সেদিন পুর্নেন্দু পত্রীর গল্প বলেছিলাম আর সে আমাকে লোরকার সন্ধান দিয়েছিল। এরআগে যাকে আমি শুধু নামেই জানতাম কিন্তু রোজার কারণে সেদিন থেকে গার্সিয়া লোরকার জিপসি ব্যালাডস-এর প্রেমে পড়েছিলাম,      

Playing her parchment moon

Precosia comes along a watery path of laurels and crystal lights.

The starless silence, fleeing from her rhythmic tambourine,

falls where the sea whips and sings, his night filled with silvery swarms.

High atop the mountain peaks the sentinels are weeping;

they guard the tall white towers of the English consulate.

And gypsies of the water

for their pleasure erect little castles of conch shells

and arbors of greening pine. 

    কর্মস্থল ঢাকায় ফিরে এলেও ফোনে রোজার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। রংপুরে তখনও মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার বসেনি বলে ল্যান্ডফোন কিংবা চিঠিই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। ল্যান্ডফোনে বাংলা-ইংরেজি দুটোতেই সমান তালে কথা বলা যেত বলে আমাদের গল্পে কখনো ভাব প্রকাশের সীমাবদ্ধতা ছিল না। কখনো সামান্য হাই/হ্যালো, আবার কখনো সময় পেলে আমরা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসতাম। বিশেষ করে রাতে কথা হলে। রাতের গভীরতা বন্ধুতার গভীরতা এনে দিয়েছিল। রাতের আঁধার লজ্জার অবগুণ্ঠন সরিয়ে দেয় বলে সেদিনের সামান্য হাই/হ্যালো আমাদের দেহের চড়াইউৎরাই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। আমরা সবকিছু নিয়েই কথা বলতাম। এভাবেই রোজার জীবনের অজানা অনেক অধ্যায় জানার সুযোগ হয়েছিল। আমিও তাকে আমার জীবনের গল্প শুনিয়েছিলাম এবং পরের সামারে আমাদের আবারো দেখা হবে জানিয়েছিলাম। সামারে আমাদের দেখা হয়েছিল, তবে সেই গল্পে পরে আসছি। তার আগে অসংখ্য বিনিদ্র রাতের গল্পের টুকরো জোড়া বেঁধে রোজা এবং তার জীবনের কিছু ঘটনা জেনে নেই।        

   

২     

ইন রিভারের পশ্চিম তীর ঘেঁষে দক্ষিণ-পূর্ব জার্মানির বাভারিয়ার একটি ছিমছাম শহর রোজেনহেইম। শহরটা রাজধানী বার্লিন থেকে অনেক দূরে হলেও মিউনিখ থেকে বেশ কাছে, মাত্র ৬৬ কিলোমিটার। এই শহরেই রোজার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়ে সে মিউনিখ বিজনেস স্কুলে ‘মাস্টার্স ইন ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং এন্ড ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে পড়তে গিয়েছিল। অ্যালেক বল্ডউইন মিউনিখের ছেলে, রোজার সাথে তার পরিচয় সেখানেই, ক্লান্তিকর এক সেমিনার শেষে কফিশপের আড্ডায়। আলাদা ফ্যাকাল্টির হলেও তারা একই সেমিস্টারের। এরপর বলতে গেলে তাদের একসাথে পথচলা, লাইব্রেরি ওয়ার্ক, প্রজেক্ট পেপার নিয়ে তুমুল ব্যস্ততা। এরমাঝেই একসময় তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে এবং রোজা যে নিজের ডর্ম থেকে বল্ডউইনের কনডো’তে শিফট করে এযেন নির্ধারিত ছিল।                  

    রোজা পড়ুয়া টাইপের মেয়ে হলেও বল্ডউইন ছিল তার একদম বিপরীত। ধনী বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান এবং প্রচুর প্রাণশক্তিতে ভরপুর। সে ফুটবল খেলতে ভালোবাসতো এবং বায়ার্ন মিউনিখ বা এফসি বায়ার্ন ক্লাবের অন্ধ সমর্থক। সে আরও ভালোবাসতো ঘুরে বেড়াতে, হাইকিং, র‍্যাফটিং বা স্কিইং করতে। তার পাল্লায় পড়ে রোজার শান্ত-ধীরগতির জীবনে পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। রিলকে, কাফকা, গ্যাটে কিংবা এরিক মারিয়া রেমার্কের কালজয়ী সাহিত্য বাদ দিয়ে সে বল্ডউইনের মতো ক্লাব, পার্টি, ক্যাম্পিং এসবের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেশন ব্রেকে তারা একবার রোজেনহেইমের ইনস্পিটজে ক্যাম্পিং করেছে। বল্ডউইন আসলে এমন দুরন্ত ধরণের ছেলে, চাইলেও যার কাছ থেকে দূরে সরে থাকা যায় না। অতলের প্রবল আহ্বানের মতো সে কেবলই কাছে টানে।      

    বল্ডউইনের আহ্বান উপেক্ষা করতে না পেরে রোজা তার সাথে স্প্রিং সেমিস্টার ব্রেকে হাইকিং-এর জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমের বাভারিয়ান আল্পসেও গিয়েছিল। আল্পসের জুগস্পিটজে চূড়ায় হাইকিং এবং ছবির মতো সুন্দর গ্রাম, মিটেনওয়াল্ডে রাত যাপন রোজার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। বল্ডউইনকে সে একটা বেহালা উপহার দিয়েছিল। বল্ডউইনের অবশ্য মিউজিকের দিকে আকর্ষন নেই বললেই চলে, কিন্তু মিটেনওয়াল্ডের বেহালা এবং সেখানকার ঐতিহ্যবাহী বাভারিয়ান স্থাপত্য বেশ বিখ্যাত। সে চেয়েছিল স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওটা বল্ডউইনের সাথেই থাকুক কিন্তু মিটেনওয়াল্ড থেকে ফিরে সে ওটা কাকে দিয়েছিল নিজেই স্মরণ করতে পারেনি। রোজা কিন্তু বল্ডউইনের এই আচরণে দুঃখ পেয়েছিল। কিন্তু সে কখনো তার এই কষ্টটা বল্ডউইনের কাছে প্রকাশ করেনি কিংবা বলা যেতে পারে কখনো সেটা জানানোর সুযোগই পায়নি।       

    চিমসি হ্রদে নৌকা ভ্রমণ রোজার জীবনের আরেক দারুণ অভিজ্ঞতা। অথচ এই হ্রদটা রোজেনহেইম থেকে একদম কাছে, মাত্র ২৯ কিলোমিটার, গাড়িতে ২৭ মিনিটের ড্রাইভ। আসলে অনেকবার যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়নি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া।’ সামার সেমিস্টার ব্রেকে বল্ডউইন যখন চিমসি হ্রদে কায়াকিং বা তিরোলার আচেন রিভারে র‍্যাফটিং করার পরিকল্পনাটা মেলে ধরলো তখন সে না করতে পারেনি।   

    চিমসি বাভারিয়ার শুধুমাত্র বৃহত্তম কিংবা জার্মানির তৃতীয় বৃহত্তম হ্রদ নয়, এটি সবচেয়ে পরিষ্কার  সাঁতারের হ্রদগুলির মধ্যে একটি। মিষ্টি জলের এই হ্রদকে ‘বাভারিয়ান সাগর’ নামে ডাকা হয়। রিভার  তিরোলার আচেন এবং প্রিয়ান দক্ষিণ দিক থেকে হ্রদে মিলেছে। আলজ রিভার হ্রদ থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে প্রথমে ইন এবং তারপর দানিউব রিভারের সাথে মিলেছে। ধারণা করা হয়, প্রায়  ১০,০০০ বছর আগে চতুর্থ বা শেষ বরফ যুগের একেবারে শেষের দিকে জুঞ্জেনবেকেন হিমবাহ থেকে হ্রদটা তৈরি হয়েছিল। চিমসি হ্রদের উপকূলের বেশিরভাগ অংশই প্রাকৃতিক, তবে এখানে অসংখ্য লিডো, বাদিং স্পট এবং গ্রাম রয়েছে। হ্রদটি একসময় আয়তনে প্রায় ২৪০ বর্গ কিলোমিটার হলেও বর্তমানে এটি তিনভাগের একভাগে এসে ঠেকেছে, মাত্র ৮০ বর্গ কিলোমিটার। হ্রদের মাঝে থাকা প্রধান তিনটা দ্বীপকে হেরেনিনসেল, ফ্রাউয়েনচিমসি এবং ক্রাউটিনসেল নামে ডাকা হয়। এরমধ্যে ক্রাউটিনসেল দ্বীপটা জনবসতিহীন, মধ্যযুগে ৮.৬ একর আয়তনের এই দ্বীপে বাঁধাকপি চাষ করা হতো বলে এই নামকরণ। রোজা বলেছিল, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গম অভিজ্ঞতা হয়েছিল চিমসির গোলেনশাউসেন এলাকার সৈকতে।    

    সেদিন হ্রদের জলে ছিল পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলোয় ঝিকিমিকি জলের কাঁপন, কেউ যেন ইচ্ছেকরেই হাজার গ্যালন মধু হ্রদের জলে মিশিয়ে দিয়েছিল। হ্রদের ২৩ ডিগ্রী তাপমাত্রায় লাল রঙের বিকিনিতে হাত-পা ছড়িয়ে অলসভাবে সে সাঁতার কাটছিল। তার সাঁতারের মৃদু দমকে পানির হালকা কুলকুল শব্দ ছাড়া  চারদিকে অখণ্ড নীরবতা। দূরেও কেউকেউ হয়তো সাঁতার কাটছিল, রাতের নির্জনতা খুন করে তাদের হাসির ছররা ভেসে এলেও দুধের ঘন সরের মতো আঁধার ফুঁড়ে দেখা যাচ্ছিলো না। প্রকৃতি যেন ইচ্ছে করেই বিশ্বচরাচর থেকে তাদেরকে আড়াল করে রেখেছিল। চারদিকে কেমন মায়াময় আবছায়া পরিবেশ। বল্ডউইন হ্রদের সৈকতে নুড়ির উপরে পাতলা ম্যাট্রেস বিছিয়ে শুয়েছিল। একটু আগেই সাঁতার কেটে পাড়ে উঠেছে, শরীরে লেগে থাকা জলের রেখা তখনো শুকায়নি। তার হাতে শিভাস রিগ্যালের খোলা বোতল, একটু পরপর ছোটছোট সিপ নিয়ে চুপচাপ নর্দান পিনটেল হাঁসের মতো করে রোজার সাঁতার কাটা দেখছে। চাঁদের আলো যেন সরাসরি রোজার শরীরে ঠিকরে পড়েছে। তার শরীরের উম্মুক্ত সোনালী অংশ যেন কোন বাভারিয়ান শিল্পীর আঁকা বডি পেইন্টিং।   

    রোজা কিছুক্ষণ সাঁতরে হ্রদের পাড়ে এসে হাতের টাওয়েলটা বল্ডউইনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে পিঠের দিকটা মুছে দিতে বলে। তারপর ঘটে যায় সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা। পানির শেষ ফোঁটাটা টাওয়েলে মুছে শরীরটা চাদরে এলিয়ে দিতেই বল্ডউইন বোতলে থাকা হুইস্কির বাকীটা তার শরীরে ঢেলে দেয়। তীব্র শিহরণের অভিজ্ঞতা থেকে রোজার তখন মনেহয়েছিল যেন হাজারটা শুঁয়োপোকা তার শরীরের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছে। বিকিনি একহাতে ছুঁড়ে ফেলে বল্ডউইন তার ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শে রোজার শরীর থেকে ধীরে ধীরে হুইস্কির অমিয়ধারা মুছে নিয়েছিল। সেই রাতে তাদের অবিস্মরণীয় যৌন অভিজ্ঞতার সাক্ষি ছিল দিগন্ত উদ্ভাসিত চাঁদ, মোমের মতো গলে পড়া জোছনা, জ্বলজ্বলে ক্যাসিওপিয়া আর একজোড়া রাতজাগা মাউন্টেন ক্রো।          

    চার মাস পরেই, ফল সেমিস্টার ব্রেকে তারা অস্ট্রিয়ার বাস রুট-১৫১ ধরে সালসবার্গের গাইসবার্গস্পিটজে প্যারা গ্লাইডিং করতে গিয়েছিল। বল্ডউইনের সাথে রোজার লিভইনের অভিজ্ঞতাটা হাইকিং, স্কিইং, প্যারা গ্লাইডিং সব মিলেমিশে একাকার অ্যাড্রেনালিন রাশে পরিপূর্ণ একটা জীবন। আর ব্রেকআপটা যেন উত্তেজনার চরম শিখর থেকে তীব্র পতনের মতোন গড়িয়ে পড়া পাথর। সিসিফাসের সেই পাথরের মতন। আর একারণেই লিভইন থেকে আলাদা হয়ে গেলে রোজা ভীষণ হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে।   

 

বল্ডউইনের সাথে সেপারেশনের পর মিউনিখ শহরটা রোজার কাছে অসহ্য, ক্লান্তিকর ঠেকে। তার কেবলই মনেহতো বল্ডউইন একা নয়, পুরো শহরটা, শহরের প্রতিটা দালান-কোঠা, রাস্তা-কফিশপ-মিউজিয়াম-পার্ক তার সাথে প্রতারণা করেছে। সময় কাটানো কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। একসময় লাইব্রেরী ওয়ার্কে কিংবা ঘন্টার পর ঘন্টা বইয়ের পাতায় পড়ে থাকলেও বল্ডউইনের সাথে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস রপ্ত করার পর থেকে সেসব এখন আর ভালো লাগে না। অগত্যা সেমিস্টার বিরতিতে রোজেনহেইমে পরিবারের কাছে চলে আসে, তবে ভ্যাকেশন শেষে সে আর মিউনিখের ক্লাসে ফিরে যায়নি।     

    পরিবারের সাথে সপ্তাহখানেক কাটানোর পর মানসিক অবস্থার উন্নতির জন্য রোজা কিছুদিন একা থাকার বা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এভাবেই সীমান্তের ওপাড়ে, প্রায় ৮৬ কিলোমিটার দূরের শহর, অস্ট্রিয়ার সালসবার্গে চলে যায়। সালসবার্গে রোজা এর আগেও এসেছিল, বল্ডউইনের সাথে। কিন্তু এবারে সে একা, তার এবারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

সালজাক রিভার শহরটাকে নিতম্বের মতো দু’ভাগ করেছে। বাম দিকটা পুরনো, আর ডানে উনিশ শতকের দিকে নতুন সালসবার্গ শহরের পত্তন ঘটেছে। পুরনো শহরটা বিখ্যাত সুরকার মোৎসার্টের জন্মস্থান হিসেবে বিখ্যাত। তার পুরোনাম ভল্ফগাং আমাডেউস মোৎসার্ট। জন্মের পরদিনই তাকে বরোক স্থাপত্যের এক অমূল্য নিদর্শন সেন্ট রুপার্ট ক্যাথিড্রালে ব্যাপ্টাইজ করা হয়। ক্যাথিড্রালের নথিতে ল্যাটিন ভাষায় তার নাম লেখা হয়েছিল Joannes Chrysostomus Wolfgangus Theophilus Mozart (ইয়োনেস ক্রিসোস্টোমুস ভোল্ফগাংক্ থিওফিলুস মোৎসার্ট)। মোৎসার্ট, বেটহোফেন, সোপিন, বাখ, ভিভালদি, চাইকোভস্কি প্রমুখ পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সংগীতগুরুদের বিখ্যাত সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত না হওয়া সংগীত পিপাসুদের জন্য এক ধরনের পাপ। মোৎসার্টের বিখ্যাত কম্পোজিশন ‘eine kleine nachtmusik ( A little night music)’ এর আনুষ্ঠানিক নাম জি মেজর ১৩ নং সেরেনেড। চার্লির অ্যাঞ্জেলস, ফুল থ্রোটল, এলিয়েন, এস ভেনচুরার পাশাপাশি প্রচুর টিভি প্রোগ্রাম এবং বিজ্ঞাপনে এই কম্পোজিশন ব্যবহার করা হয়েছে। তার জীবনীভিত্তিক আমাদিউস মুভিতেও একটা দৃশ্যে এটা ব্যবহৃত হয়েছিল।      

    মোৎসার্ট স্কয়ারে স্থাপন করা শিল্পীর ভাস্কর্য থেকে রেসিডেন্ট স্কয়ার হয়ে কিছুটা এগোলে ইউনিভার্সিটি স্কয়ার। এই স্কয়ারের পাশে গেট্রেইডেগাসের ধারে হলুদ রঙের যে প্রাচীন ইমারত, সেটাই মহান শিল্পীর জন্মস্থান। ৯ নাম্বার বিল্ডিঙটা বর্তমানে যাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শৈশবে ব্যবহার করা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের নমুনা সারিবদ্ধ ভাবে রাখা হয়েছে। যাদুঘরের বাইরে পাথরে বাঁধানো সরু গলিটার দু’পাশে অর্ধেকটা জুড়ে খাবারের দোকান। পোর্টেবল শেডের নিচে চেয়ার-টেবিল পেতে বসার ব্যবস্থা। পাশে সিমেন্টের বাঁধানো টবে নানান রঙের জিনিয়া, সাদা ক্লিমেটিস কিংবা থোকায় থোকায় জিপসি ফুলের ঝাঁড়। এই শহরেই জিপসি যুবক প্ল্যামেন আলফানসোর সাথে রোজার পরিচয় ঘটে।               

    দীর্ঘকায় গড়নের আলফানসোর চোখেমুখে ছিল আদিম তীক্ষ্নতা। অন্যসব জিপসি যুবকদের মতো তার পায়েও বুট, মাথায় টুপি আর হাতে যথারীতি একটা গিটার। জিপসি যুবকদের সবার হাতেই আসলে কোনো না কোনো বাদ্যযন্ত্র থাকবেই। কিছু বাদ্যযন্ত্রে জিপসিদের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে, যেমন জুর্না এবং টুপান। তাদের বোহেমিয়ান মন আর সঙ্গীতসাধনা অন্যদের কাছে তাদেরকে আকর্ষণীয় করে তোলে। আলফানসোর সাথে যখন দেখা তখন সে সেন্ট রুপার্ট ক্যাথেড্রালের কাছেই কাপিটেল প্লাৎজে একটা বরোক ইমারতের দেয়ালে হেলান দিয়ে গিটারে সুর তুলেছিল, অদূরে পাথরের টুকরোটার উপরে মাথার টুপি উল্টো করে রাখা। কেউকেউ সেখানে কয়েন ছুঁড়ে দিচ্ছে, কেউকেউ এমনিই দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে কিংবা শুনছে। শতাব্দী প্রাচীন দেয়াল এবং সুউচ্চ ডোমজুড়ে মহানশিল্পীদের আঁকা ম্যুরাল, ফ্রেস্কো, টেম্পেরা দর্শনের ঘোরলাগা অনুভুতি নিয়ে ক্যাথেড্রাল থেকে বের হয়ে কয়েক কদম হাঁটতেই চোখে পড়ে আলফানসোর তীব্র চাহনি। কিন্তু রোজার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ফ্রেটবোর্ডে আঙ্গুলের মাতাল ছন্দের দিকে। গিটারের বিষণ্ণ সুর তার হৃদয় স্পর্শ করে গিয়েছিল। লোরকার গিটার কবিতায় যেমনটা বর্ণনা মেলে,     

The weeping of the guitar begins.

The goblets of dawn are smashed.

The weeping of the guitar begins.

Useless to silence it.

Impossible to silence it.

It weeps monotonously as water weeps

as the wind weeps over snowfields.

    গিটারের ঝংকার থেমে গেলে রোজা তাকে কফিপানের আমন্ত্রণ জানালো, কাজটা সে হঠাৎ করেই করেছে। তবে কেন করেছে, তার উত্তর আজও মেলেনি। আমরা অনেকসময় এরকমই, কোন কারণ ছাড়াই আপন খেয়ালে অনেক কিছু করে বসি। ফিরে আসি জিপসি যুবক আলফানসোর কথায়।

    জিপসিদের প্রসঙ্গ এলে স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা’র কথা আসবেই। তার ‘জিপসি ব্যালাডস’ কাব্যগ্রন্থের সব কবিতাই আন্দালুসিয়ার জিপসিদের নিয়ে লেখা। কবিতাগুলো প্রিকোসিয়া নামের এক জিপসি মেয়ে এবং বাতাস, যা পুরুষের সাধনা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, এই দুইয়ের সাধনা চিত্রিত করে। সত্যি বলতে লোরকা এবং তার কবিতার সাথে রোজার পরিচয় ঘটে আলফানসোর মাধ্যমে, রোজা আমাকে বলেছিল।  

    সরুগলি ধরে মানুষের পাশাপাশি মচমচ শব্দে পর্যটকদের নিয়ে জোড়া ঘোড়ায় টানা টমটম বা ক্যারেজ চলছে। সেসবের মাঝেই হাঁটতে হাঁটতে ভবঘুরে যুবক আলফানসো তার নিজের জীবনের পাশাপাশি লোরকার জীবনের করুণ গল্প শুনিয়েছিল। আজও, এতবছর পরও কেউই জানে না ঠিক কোথায় লোরকার সমাধি, কোথায় তার দেহাবশেষ। কেউই জানেনা কারা কবিকে হত্যা করেছিল? সমকামিতা? নাকি সমাজতন্ত্রী চিন্তাধারার কারণে জাতীয়তাবাদী বাহিনীর লোকেরা তাকে হত্যা করেছিল! অথচ কবি যেন জানতেন তাকে হত্যা করা হবে তাই তিনি লিখেছিলেন,        

If I die, leave the balcony open.

The little boy is eating oranges.

(From my balcony I can see him.)

The reaper is harvesting the wheat.

(From my balcony I can hear him.)

If I die, leave the balcony open!

 

৫      

মিরাবেল গার্ডেনের পাথরে বাঁধানো পথের পাশে চোখধাঁধানো ফুলের কোয়ারিতে পপি, টিউলিপসহ নানান রঙের ও রকমের লিলি, ফ্রেঞ্জি, ল্যাভেন্ডার। ভিতরের পুরোটা জুড়ে নানাভঙ্গিমার ভাস্কর্য, ফোয়ারাতে পানির লহর এবং নাম না জানা পাখির কলতানে মুখরতা! কখনো গার্ডেনের পাশে, আবার কখনো রিভার সাইডে ক্যাম্পিং করে আধাঘুমে-আধা জাগরণে, গল্পে-গল্পে তারা অনেক রাত কাটিয়েছে! মাঝ আকাশে উরসা মেজরের দিকে তাকিয়ে আলফানসো লোরকার কবিতা শুনিয়েছিল, 

Playing her parchment moon

Precosia comes.

The wind sees her and rises,

the wind that never slumbers.

Naked Saint Christopher swells,

watching the girl as he plays with tongues of celestial bells

on an invisible bagpipe.

Gypsy, let me lift your skirt and have a look at you.

Open in my ancient fingers the blue rose of your womb. 

    আকাশের অসংখ্য নক্ষত্রমণ্ডলীর মাঝে সে যেন কোন এক জিপসি তরুণীর মুখ খুঁজে ফিরছিল। রিভার সাইডের নুড়ি-পাথর কিংবা সবুজ ঘাসে শুয়ে জলের কূলকুল ধ্বনির সাথে তারা গিটারের কর্ডে টুংটাং শুনেছে। আবার কখনো পায়েচলা পথের পাশে লোহার চেয়ারে হেলান দিয়ে মারিজুয়ানা ভরা স্টিক টেনেছে একটার পর একটা। যৌন পরিচয়ের দিক থেকে আলফানসো অ্যাসেক্সুয়াল, বাইসেক্সুয়াল, প্যানসেক্সুয়াল নাকি হোমোসেক্সুয়াল রোজা সেটা জানে না, সে শুধু জানে তার প্রতি আলফানসোর বায়োলজিক্যাল আকর্ষন ছিল না। অথচ রোজার সৌন্দর্য যেকোন যুবকের রক্তে জোয়ার আনতে সক্ষম। রোজা মনেমনে অনেকবার চেয়েছিল আলফানসো তাকে আহ্বান জানাক কিন্তু সেটা কখনো ঘটেনি। হয়তো তার ভাবনার জগত দখল করে রেখেছিল উজ্জ্বল ঝলমলে রঙের স্কার্ট পরা কোন এক জিপসি মেয়ে, প্রিকোসিয়া। আলফানসো বলেছিল জিপসি মেয়েদের কথা, তাদের পরনের ঘাঘরা নেমে যায় গোড়ালি অবধি। তাদের পায়ে থাকে রুপোর পুরু মল, শরীরে থাকে ছোট ঢিলে চোলি অথবা দীর্ঘ জামা, সে জামা নাচের প্রয়োজনে নিচের দিক থেকে বড় হয়ে মেলে যায় ময়ূরের পেখমের মতো।

    জিপসি মেয়েদের গলায় থাকে পুঁতির মালা, কারো মালায় মোহর কিংবা রূপার মুদ্রা আর কানে থাকে বড় সাইজের রিং। তবে তাদের শরীরের পোশাক আর পরিধেয় গহনা যাইই থাকুক না কেন, কোনো পুরুষের চোখ তাতে আটকে থাকতে চায় না। তাদের কাছে ওসব তুচ্ছ করে চোখের সামনে সেঁটে থাকে জিপসি নারীর আশ্চর্য সুন্দর গড়ন, সহজ স্বাভাবিক রূপ। মানুষের কাছে আকর্ষণ করে তাদের উচ্চতা আর নির্মেদ শরীর, তাদের যাদুকরী কালো চোখ, কালো চুল এবং মুক্তোর মতো সাদা দাঁতের সারি। রোজা তার কল্পনায় এরকম কাউকে খোঁজে যে আলফানসোর মনোযোগের পুরোটা লোপাট করে আছে। এত কথা বলেও যার কথা আলফানসো কখনো শেয়ার করেনি। সে বুঝেছিল বল্ডউইন এবং আলফানসো, তারা দু’জন স্বভাবে-বৈচিত্র্যে আসলে দু’রকমের মানুষ। তাদের চিন্তাভাবনা, দর্শন, চলাফেরা ছিল একেবারে ভিন্ন। পুঁজিবাদী সভ্যতার প্রতিনিধি, বল্ডউইন তাকে দিয়েছিল সাইবেরিয়ান বল্গা হরিণের গতিতে অ্যাড্রেনালিন রাশ কিন্তু বোহেমিয়ান রোমা যুবক, আলফানসো তাকে দিয়েছিল লামাদের নিরাসক্ত গভীর মৌনতা। আলফানসোর সংস্পর্শে এসে রোজা প্রচণ্ডভাবে মারিজুয়ানাতে আসক্ত হয়ে পড়ে। হয়তো এভাবেই সে নিঃসঙ্গতার একশো বছর কিংবা বিষাদগ্রস্থতার দীর্ঘ বেড়াজাল থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছিল। আলফানসোর স্বভাবজাত বোহেমিয়ানা তাকেও ছুঁয়ে গিয়েছিল।  

    আলফানসো রোজাকে তার জিপসি জীবনের কথা বলেছিল। তাকে বলেছিল ইউরোপের লোকজন কেন তাদেরকে ‘রোমা’ বলে ডাকে। এই শব্দটি কীভাবে তাদের জীবনে অনিষ্ট বাঁধিয়েছে, কেননা এটি জন্ম দিয়েছে রোমানি শব্দের। আর সেখান থেকে মানুষ রোমানিয়ার সাথে জিপসিদের আজীবন সম্পর্ক বেঁধে দিয়েছে। অথচ তাদের শিকড় মধ্য ইউরোপে না,  প্রাচীন ভারতে। ইতিহাস বলে ৫০০ থেকে আনুমানিক ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে উত্তর ভারতের পাঞ্জাব থেকে তারা ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিল। রোমানিয়ায় এখন প্রায় ১০ লাখ জিপসির বাস। তারা নিজেদের রম বলে ডাকে, ‘রম’ শব্দের অর্থ মানুষ। ইউরোপের লোকেরা  মনেকরে জিপসি একটি জীবনধারা, তারা জিপসিদের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবে না। তাই অনেকে জিপসি সাজতে গিয়ে উদ্ভট, উত্তেজক পোশাক পরে ক্যারাভানে ইউরোপময় ঘুরে বেড়ায়।     

 

সামারে রোজার সাথে দেখা হতেই হাসতে হাসতে বলেছিলাম,   

: ভৌগলিক অবস্থানের কারণে তোমাকে আমি অ্যাড্রেনালিন রাশ দিতে পারবো না, সাংস্কৃতিক বিভাজনের কারণে উদ্দাম যৌনতা দিতে পারবো না। তবে তোমাকে দিতে পারবো উপমহাদেশীয় সতেজ মারিজুয়ানার স্বাদ। এই জায়গায় কোন সাংস্কৃতিক বিভাজন নেই। পূর্ব-পশ্চিম একবিন্দুতে মিশে গেছে। তোমরা যাকে বলো পট, উইড কিংবা মারিজুয়ানা, আমরা তাকে বলি গাঁজা, পিওর Cannabis Indica.

: Haven't tasted cannabis in a long time.

: আচ্ছা, আলফানসোর সাথে পরে কি হয়েছিল বলোনি কিন্তু!  

: আরেকদিন বলবো, এখন বলো কবে পট পার্টি হচ্ছে?

: খুব শীঘ্রই, জানাবো।     

    ছোটবেলার বন্ধু রোমিওকে বলেছিলাম রোজার কথা, এবং কখনো একটা উইড পার্টি কতোটা প্রয়োজন! সামারের এক সন্ধ্যায় আমরা শহরের বাইরে কোথাও গিয়েছিলাম। রোমিও’র গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে এলিজাবেথ উলরিজের সামার ওয়াইন গানটা অনেকবার বেজে যখন থেমে গেল। আমরা তখন স্টিয়ারিঙে গাড়ির গতি থামিয়ে মাঠের সবুজ প্রান্তে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে-বসে আছি। জায়গাটা বেশ খোলামেলা, সবুজ ঘাসের মাঠ, ফিনফিনে নির্মল বাতাস এবং মাঠের পাশেই ছোট শান্ত নদী ঘাঘট। রোমিও আঙ্গুলের ফাঁকে ধরে রাখা জয়েন্টে আগুন দিয়ে স্টিকের প্যাকেটটা রোজার দিকে এগিয়ে দিলো। একটা লম্বা টানের পর বুকের হাঁপর ভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে আমিও নিজেকে ইউফোরিক এফেক্টসে নিষিক্ত করলাম। দ্বিতীয় রাউন্ডের পর রোমিও’র কন্ঠে ভেসে এলো গানের গুনগুন, 

আমার গল্প বলা রাত, সেই জোনাক জ্বলা রাত

কেন এত ব্যাথা সয়ে বসে থাকি একা হয়ে

এই আশার প্রদীপ নিভে গেল

তবে কি ইচ্ছে করে সে মিথ্যে আশার কথা দিয়েছিল

আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।

শাল পিয়ালের বনে কাছে সে ছিল

সবকিছু উজাড় করে ভালবেসেছিল।         

    রোজা আরেকটাতে আগুন ধরিয়ে রোমিওর কন্ঠে সুর মিলিয়েছিল, মিটিমিটি হাসছিল, হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। একদিন সালজাক রিভার সাইড ক্যাম্পে উরসা মেজরের দিকে তাকিয়ে আলফানসো তাকে লোরকার কবিতা শুনিয়েছিল। মারিজুয়ানার ধোঁয়ায় নীল হয়ে কল্পনার পুরোটা অধিকার করে থাকা জিপসি মেয়ে প্রিকোসিয়ার গল্প বলেছিল। রোজা বলেছিল পরিযায়ী পাখির মতো আলফানসোর হারিয়ে যাওয়ার গল্প, যে বুকের ওমের আড়ালে পাখার পদচিহ্ন রাখেনি। অথচ রোহিণী নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আমি তখন ভাবছিলাম অন্যকিছু। মেঘের আড়াল থেকে খুঁজে ফিরছিলাম ইতির প্রিয়মুখ। সে হয়তো অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে কোন একনক্ষত্রের আড়ালে লুকিয়ে আমাকে দেখছে। কখনো কখনো মনেহয় পৃথিবীর চলার পথে আমি, রোজা, রোমিও আমরা সবাই একমরু কষ্ট বুকে ইথিওপিয়ার অ্যাফার থেকে কালের দীর্ঘ অভিযাত্রায় পথে নেমেছি। বল্ডউইন, আলফানসো, প্রিকাসিয়া কিংবা ইতি যেন প্যারালাল বিশ্বে আমাদের সমান্তরালে ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপে হাঁটছে। আমরা যার যার জীবনের সুতোয় সুর বেঁধে চলছি সেই নিয়ান্ডারথাল যুবকের মতো যে একদিন গ্রিফিন শকুনের হাড়ে পাঁচটা ফুটোয় সুর তুলেছিল। আমরা তিন lunatic soul সেদিন ইন্টারস্টেলার ক্লাউডের মাঝে এক বিশেষ নক্ষত্রের অপেক্ষায় ছিলাম। আজও আমাদের হৃদয়ে দাগ কাটে ফেলে আসা দ্য গ্রেট সামার নাইট অভ নাইন্টিনাইন আর কণ্ঠের সেই বীটলস, যা আমরা একদিন একসাথে গেয়েছিলাম,     

Picture yourself in a boat on a river

With tangerine trees and marmalade skies

Somebody calls you, you answer quite slowly

A girl with kaleidoscope eyes

Cellophane flowers of yellow and green

Towering over your head

Look for the girl with the sun in her eyes

And she's gone

Lucy in the sky with diamonds.



পোস্ট ভিউঃ 11

আপনার মন্তব্য লিখুন