দ্য সিক্সথ সেন্স

গল্প লাস্ট, লাভ এন্ড আদার স্পাইসেস অভ লাইফ
দ্য সিক্সথ সেন্স

স্থান: ফায়ার অন আইস মিউজিক ক্যাফে এন্ড রেস্টুরেন্ট, উত্তরা।   

কাল: নভেম্বর ২০১০।      

সময়: হেমন্তের ফুরফুরে সন্ধ্যা।      

উত্তরা-১ নম্বর সেক্টরের মিউজিক ক্যাফেটা কয়েক বছরে বেশ নাম করেছে। ডিনারে মুখরোচক দেশি-বিদেশি রেসিপির সাথে এখানে এস আই টুটুল, অপুর্ব, বালামসহ বিভিন্ন শিল্পীদের লাইভ পারফরম্যান্সের স্বাদ নেয়া যায়। চাইলে নিজেও পারফর্ম করা যায়। আমি গান গাইতে পারি না তবে শুনতে ভালোবাসি। তাই সুযোগ ও সময় পেলে ঠিকই ঢুঁ মারি, কখনো ফ্যামিলির সাথে আবার কখনো বন্ধুদের সাথে। তবে আজ আসা হয়েছে মধ্যবয়সী এক দম্পতির আমন্ত্রণে। আমি মেজর ইফতেখার, যার আমন্ত্রণে এসেছি তিনি জনাব মোঃ ফজলুল হক, একটা ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকে উচ্চপদে আসীন। সাথে তার স্ত্রী মিসেস জেবুন্নেসা খাতুন, তিনি কিছুদিন একটা প্রিপারেটরি স্কুলে শিক্ষকতা করে বর্তমানে সংসার গোছাচ্ছেন। আর আমার ঠিক সামনের আসনটা উজ্জ্বল করে বসে আছেন যে ফুটফুটে তরুণী তার নাম রায়না হক। রায়না এনএসইউ’তে বিবিএ পড়ছে। আমার সাথে যে বন্ধু এসেছেন তার নামটা এই গল্পের সাথে প্রাসঙ্গিক না, তাই উহ্যই থাকুক। তারা তিনজন আর আমরা দুই, এই পাঁচজনে ছয় জনের একটা টেবিল দখল করে বসে আছি।    

    এরকমভাবে কারো নিমন্ত্রণে কখনো যাই না, তবে আজ আসতে হয়েছে আর্মিতে আমার এক সিনিয়র কলিগের রিকোয়েস্টে। তাছাড়া ফজলুল হক সাহেব খুব করে বলছিলেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তার আর কোন ভাষা জানা নেই বলে। আমি র‍্যাব-৪ এ কর্মরত আছি, কিছুদিন আগে তার পরিবারকে একটা অসম্মানজনক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি, সে গল্পে পরে যাবো। আজকের ঘটনাটা দিয়েই বরং শুরু করি। ওয়েটার একটু আগেই ক্রিম অভ মাশরুম স্যুপ সার্ভ করে গেছেন, সাথে ফিশকেক। রেস্টুরেন্টে এখনও তেমন লোক সমাগম হয়নি। ফ্লোরের মিউজিক কর্নারে ইন্সট্রুমেন্ট আর্টিস্টরা লঘু লয়ে পরিচিত ইংরেজি সেন্টিমেন্টালের সুর ভাঁজছেন। লাইভ গান শুরু হতে সম্ভবত আরও ঘন্টা দেড়েক বাকী। মিউজিক ক্যাফেতে আসা হয়েছে আমার পছন্দে, তারা গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্সে বসতে চেয়েছিলেন। দক্ষিণখানে বাড়ি করেছেন বলে ফজলুল সাহেবের জন্য এই জায়গাটা সুবিধেজনক বলে মনেহয়েছে, তিনি বেশি চাপাচাপি করেননি। তবে তার স্ত্রী এই পরিবেশে যে অস্বস্তিবোধ করছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে।         

    চামচের হালকা টুং-টাং এর সাথে সবাই নীরবে খাচ্ছি, রায়না হঠাৎ তার সামনের স্যুপের বাটিটা ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে চলে গেল মিউজিক কর্নারে। ইন্সট্রুমেন্ট আর্টিস্টদের সাথে গানের লিরিক্স শেয়ার করে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে পরপর তিনটা গান গাইলো। এইপর্যন্ত সব ঠিকঠাক চলছিল। ফজলুল সাহেব মেয়ের বালখিল্য আচরণে সামান্য বিরক্ত হলেও কিংবা মিসেস জেবুন্নেসার অস্বস্তিবোধের পারদ চড়ে গেলেও মাথা নিচু করে চুপচাপ স্যুপ খেয়ে যাচ্ছিলেন। আমরাও। তবে সবার হাতের স্যুপের চামচ যেন একসাথে থেমে গেল যখন গান শেষে রায়না উচ্চারণ করলো, ‘I dedicate the songs to Major Iftekhar. I dedicate this evening, the smallest yet most joyful part of my life, to him.’     

    আমার দু’কানে লজ্জার লু হাওয়া ছুঁয়ে গেল, মাথা নিচু করে থাকা থুতনিটা ততক্ষণে স্যুপের বাটি ছুঁইছুঁই। অথচ যেভাবে উঠে গিয়েছিল রায়না ঠিক সেভাবেই ফিরে এসে ঠাণ্ডা স্যুপের বাকীটা শেষ করে মেইন কোর্সে চলে গেল। অথচ আমাদের মাঝে যে মানসিক তোলপাড় চলছে তার কাছে তা যেন কিছুই না। এবার ফিরে যাই সেই দিনগুলোয়, যেখান থেকে আজকের এই সন্ধ্যার সূত্রপাত।  

 

স্থান: উপ-অধিনায়কের অফিস। র‍্যাব-৪, মিরপুর-১।   

কাল: সেপ্টেম্বর ২০১০।   

সময়: ঢলে পড়া দুপুর।      

সপ্তাহের প্রথম দিন। লাঞ্চ সেরে দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত। আরপি সার্জেন্ট মেইনগেট থেকে ওয়্যারলেস করে জানালো আমার সাথে একজন ভদ্রমহিলা দেখা করতে এসেছেন। নাম, পরিচয় খাতায় এন্ট্রি করে একজন গাইডসহ অফিসে পাঠাতে বললাম। আমার এক সিনিয়র কলিগ ভদ্রমহিলাকে পাঠিয়েছেন, তার আত্মীয়া। সমস্যার সামান্য আভাস দিয়েছিলেন তাই সিপিসি-১ কোম্পানি কমান্ডারকে অফিসে ডেকে পাঠালাম। কাজটা তাকে দিয়েই করাতে হবে।     

    ভদ্রমহিলার পুরো শরীর কালো বোরকায় আবৃত, চোখজোড়া শুধু দেখা যাচ্ছে। বোরকার সাথে কালার মিলিয়ে হ্যান্ড গ্লভস জোড়াও কালো। অনুমান করছি ওনার পায়ে সকস আছে এবং সেটাও কালো রঙের। আর কিছুর রঙ ভাবতে চাই না তবে ওনাকে দেখে আমার দাদীর কথা মনেপড়ে গেল, উনি ১৯৭৬ সালের দিকে মারা গেছেন। একদম শৈশবে ওনাকে দেখেছিলাম, আবছায়া স্মৃতিতে তাকে এরকম বোরকায় দেখি। আফগানিস্তান টাইপের এই বোরকা আবারও এদেশে ফিরে এসেছে। ভদ্রমহিলার সাথে তার তরুণী কন্যা। তিনি অবশ্য একটা হিজাবে নিজেকে জড়িয়েছেন। তবে তিনি যে এসবে অভ্যস্ত না সেটা পরার ধরণ দেখে অনুমান করা যায়। স্যার তাদের সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি তাই ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম। তবে তিনি একটু ইতস্থত করছিলেন। কেসটা সিপিসি-১ কোম্পানি কমান্ডার, মেজর ইশরাক নিজেই দেখবেন বলা সত্ত্বেও কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি একটা নাম্বারে কল করে ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। ফোনের ওপাশে আমার সেই সিনিয়র কলিগ, বিষয়টাতে খুব সিক্রেসি মেইন্টেইন করার ব্যাপার আছে বলে তিনি আমাকেই হ্যান্ডেল করতে রিকোয়েস্ট করলেন। মনেমনে বিরক্ত হলেও মুখে প্রকাশ করলাম না। মেজর ইশরাককে ইশারা করতেই সে উঠে গেল। এরকম অনেক সময় হয় এবং আমরা এতে অভ্যস্ত। তবে তারা ঘটনা যেটা বর্ণনা করলেন সেটা শুনে আমি একদম হতভম্ব। এরকম ঘটনাও ঘটে! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন না থাকায় এরকম টুকটাক অভিযোগ বা রিকোয়েস্ট আমাদের কাছে এলে যতোটা সম্ভব সল্ভ করার চেষ্টা করি। এবার তাদের গল্পটা বলি।

 

৩  

ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং করার অভ্যাস থেকে আবীরের সাথে রায়না’র পরিচয়। আবীর মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, বাসা গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর সদরে। পেশাগত কারণে বছরের একটা বড় সময় আবীরকে শিপেই কাটাতে হয়, আবার কখনো টানা দু’তিন মাস ছুটি। চাকরিটা অদ্ভুত! ঘটনাটা যে সময়ের, আবীরের তখন পূর্বের কোম্পানির সাথে চুক্তি শেষ হয়েছে মাত্র, হাতে অফুরন্ত অবসর। তবে বিভিন্ন শিপিং লাইনের অফিসে যোগাযোগের জন্য প্রায়ই গাইবান্ধা-ঢাকা-গাইবান্ধা করতে হচ্ছে। তার একটা চাকরি দরকার। খুব জরুরী। কাজের ফাঁকে রায়নার সাথে নিয়মিত চ্যাটিং হয়। এভাবেই সম্পর্কটা ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর দিকে ধাবিত হতে থাকে। কথাবার্তা একটা সময় এমনকি বিয়ে পর্যন্তও গড়ায়, এবিষয়ে অবশ্য আবীরের চেয়ে রায়না’র আগ্রহটাই বেশি। মিসেস জেবুন্নেসা প্রথমদিকে রাজী না থাকলেও মেয়ের জেদের কাছে পরাজিত হয়ে একপর্যায়ে সম্পর্কটা মেনে নেন এবং রায়নার সমবয়সী কাজিনরাও গল্পটা এরকমই জানেন।

    তাদের সম্পর্কে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ফজলুল সাহেব, কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি কোনভাবেই আবীরকে মেয়ের বর হিসেবে মেনে নিতে রাজী নন। এসব নিয়ে পারিবারিকভাবে বিভিন্নরকম ঝামেলা-বিপত্তিও হয়। এপর্যন্ত বর্ণনা করে তারা চুপ থাকেন। কিন্তু এটুকুতে অপরাধের আলামত খুঁজে না পেয়ে তাদের সমস্যাটা আসলে কি তা সরাসরি জানতে চাইলাম। কথা প্রসঙ্গে মনেহলো, রায়না সম্ভবত তার মায়ের সামনে বাকীটা বলতে অস্বস্তি বোধ করছে। তবে এটা সে ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে যে বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে তাকে সবটাই জানাতে হবে। ডাক্তার, উকিল এবং পুলিশ বা র‍্যাবের কাছে কখনো কিছু লুকাতে নেই। কলিংবেলে হাত রেখে একজন মেস ওয়েটারকে ডেকে পাঠালাম। মিসেস জেবুন্নেসাকে হাই টি অফার করে ফিল্ডমেসে বসতে বললাম। মেসওয়েটার রায়নার জন্য টি, সাথে চিকেন ড্রামস্টিক এবং আমার জন্য লেমন টি সার্ভ করে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেল।   

রায়না গল্পের বাকীটা বলতে শুরু করলো। 

    প্ল্যান অনুযায়ী তাদের কয়েকমাস পরে বিয়ে করার কথা। বিয়েসাদী নিয়ে এরকম প্ল্যানের মাঝেই এক আবেগঘন মুহুর্তে রায়না মোবাইল ক্যামেরায় নিজের কিছু ন্যুডস আবীরের সাথে শেয়ার করেছিল। কথা ছিল আবীর সেগুলো ডিলিট করবে, কিন্তু তার মাথায় যে অন্যরকম ভাবনা ছিল রায়না সেটা বুঝতে পারেনি। চাকরি না থাকার কারণে আবীর আর্থিক সংকটের বাহানায় শুরুতে অল্পস্বল্প ধার করা শুরু করলেও তার চাহিদা দিনদিন যেন বাড়তেই থাকে। রায়না প্রথম দিকে নিজের জমানো সামান্য কিছু টাকা বা ছোটখাট গয়না ইত্যাদি বিক্রি করে বা ইউনিভার্সিটিতে সেমিস্টার ফি জমা না দিয়ে আবীরের কাছে টাকা পাঠালেও তার লোভ দিনদিন বাড়তেই থাকে। একপর্যায়ে পেনড্রাইভে সেভ করে রাখা ন্যুডস নেটে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে সে ব্ল্যাকমেইলিং শুরু করে। রায়না অবশেষে বুঝতে পারে সে এক প্রতারকের ফাঁদে পড়েছে, প্রেমিকের ছদ্মবেশে আবীর আসলে একজন জঘন্য অপরাধী।      

    রায়না দিশেহারা হয়ে আত্মহত্যা করার প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু ব্যর্থ হয়। অবশেষে অনন্যোপায় হয়ে মায়ের কাছে সবকিছু খুলে বলে। মিসেস জেবুন্নেসা মেয়ের এই পরিণতিতে হতভম্ব! তিনি বুঝতে পারেন না কি করবেন! তিনি আবীরের সাথে ফোনে কথা বলে মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষার অনুরোধ জানান। কিন্তু মোটা অঙ্কের টাকা হাতে না পেলে আবীর তাদের কথা শুনবে না বলে জানিয়ে দেয়। এই পর্যায়ে রায়নার মা বিষয়টা মোঃ ফজলুল হক সাহেবের কানে তোলেন। সেই রাতে স্বামী-স্ত্রীতে ভীষণ ঝগড়া হয় এবং রায়না ঘরের দরজা লাগিয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকে। ফজলুল হক সাহেব বুঝতে পারেন না কোন পাপে সৃষ্টিকর্তা তাকে এরকম বিপদে ফেলেছেন। মেয়ের কারণে সামাজিক মান-মর্যাদা কখনো এভাবে ধুলিস্যাত হয়ে যাবে তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। ঘটনার এই পর্যায়ের একজন ঘনিষ্ঠ সিনিয়র কলিগের মাধ্যমে বিষয়টা সুরাহা করার জন্য আমার কাছে তাদের আগমন।

 

আমার ধারণা, রায়না তার মায়ের সামনে আবীরের সাথে সম্পর্কের অনেককিছুই এড়িয়ে যাচ্ছিল যা তদন্তের স্বার্থে এবং অপরাধীকে ধরতে হলে জানা থাকা দরকার। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সেজন্যই এটাসেটা জিজ্ঞেস করলাম, নোটবুক-পেন্সিল টেনে নিয়ে প্রথম থেকে আবারও পুরোটা শুনলাম। কিছু কিছু অসঙ্গতি আছে, সেসব নোট করলাম। তবে এটা পিওর কেস অভ ব্ল্যাকমেইলিং। রায়নার কাছ থেকেই জানলাম, কোন এক অপরাধের কারণে আবীর আগের চাকরিটা হারিয়েছে। এজন্য সহজে অন্যকোন শিপিং কোম্পানিতে চাকরি খুঁজে পেতে বিলম্ব হচ্ছে। আমার ধারণা এজন্যই সে উপার্জনের সহজ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে ব্ল্যাকমেইলিং। সেক্ষেত্রে একাধিক মেয়ের সাথে সম্পর্কের বিষয়টা উড়িয়ে দেয়া যায় না। রায়নার ডিভাইস থেকে আবীরের ফেসবুকে ঢুকলাম। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, হ্যান্ডসাম দেখতে, বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় তোলা ছবি পোষ্ট করেছে। এসব দেখে অনেকেই হয়তো তার ট্র্যাপে পা দিয়েছে। আমি ঠিক শিওর না সে এভাবে এপর্যন্ত কতজন মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। আবীরের বিভিন্ন ভঙ্গীতে তোলা কয়েকটা ছবি কপি করে প্রিন্টে পাঠালাম। অপারেশনে দরকার হতে পারে।   

    মিসেস জেবুন্নেসাকে আমাদের অফিসিয়াল প্রসিডিওর জানালাম। আপাতত মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করে দরখাস্তের সাথে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে কমপক্ষে একটা ছবি দরকার। ছবির বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই তিনি আপত্তি জানালেন। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে ওগুলো দরকার। তাদেরকে আলামত বেহাত না হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হলো। দু’দিন পর রায়না তার এক কাজিনসহ অফিসে এসে একটা সাদা খাম দিয়ে গেল। এটাসেটা প্রশ্ন করে সেদিনও কিছু তথ্য জেনে নিলাম এবং বিজনেস কার্ড দিয়ে যোগাযোগ রাখতে বললাম। খামে দু’টা ছবি, একটা বাথরুমে বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোলা হয়েছে, আর অন্যটাতে উম্মুক্ত বুকের ওপরে পাতলা ওড়না ছড়িয়ে দেয়া। কমান্ডিং অফিসারকে সবকিছু ব্রিফ করলে তিনি বিষয়টা সেন্সিটিভ বিবেচনা করে আমাকেই হ্যান্ডেল করতে বললেন।      


টানা কয়েকদিন ট্র্যাকিং করে দেখলাম আবীর গাইবান্ধা শহরের বাইরে খুব একটা পা ফেলছে না। ট্র্যাকিং বলতে মোবাইলের কল লিস্ট, টাওয়ার লোকেশন বা খুদেবার্তার ডাটা স্টাডি করা। তার ক্রিমিনাল প্রোফাইল স্টাডি করে মনেহলো দেশে থাকা অবস্থায় সে পর্ণ সাইটে ন্যুডস ছড়িয়ে দেয়ার মতো সাহস করবে না। তবে মাঝে মাঝে হুমকি-ধামকি দিয়ে হয়তো টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। রায়নাকে বলেছি স্বাভাবিক সম্পর্ক চালিয়ে যেতে, ঘুণাক্ষরেও যেন সে বুঝতে না পারে যে তারা র‍্যাবের সহযোগিতা নিয়েছে এবং বর্তমানে সে আন্ডার ওয়াচ। সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করে কোন লাভ না হওয়ায় পুরনো পদ্ধতিটাই বেছে নিতে হলো, ‘হানি ট্র্যাপ’ বা ‘ভালোবাসার ফাঁদ’। যদিও এটা একধরনের অপকৌশল, তবু অপরাধীদেরকে ধরতে অনেক সময় যৌনতা ও শারীরিক সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে কাজটা করতে হয়।  

    ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ-আইরিশ লেখক জন লে ক্যারের ‘টিঙ্কার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ নামে এক গোয়েন্দা উপন্যাসে ‘হানি ট্র্যাপ’ শব্দটা প্রথম ব্যবহৃত হয়। এরপর এই শব্দটাকে উপজীব্য করে পৃথিবীতে বহু সিনেমা, নাটক, ওয়েব ও টিভি সিরিজ নির্মিত হয়েছে। জেমস বন্ড সিরিজে প্রচুর ‘হানি ট্র্যাপ’ এর ঘটনা দেখানো হয়েছে। ‘হানি ট্র্যাপ’ নামে একটি থ্রিলার ২০০২ সালে মুক্তি পেয়েছিল। এই ফাঁদের মধ্য দিয়ে কখনো কখনো সত্য যেমন বেরিয়ে আসে, অনেকসময় নিরপরাধ লোকও ক্ষণিকের ভুলে ফেঁসে যেতে পারে।   

    ব্যাটালিয়ন আনসার থেকে র‍্যাবে ডেপুটেশনে আসা তাহমিনাকে আবীরের নাম্বারটা দিয়ে রিলেশন ডেভেলপ করতে বললাম। মেয়েটার নার্ভ বেশ শক্ত, যার ফলে ইমোশনাল আউট বার্স্ট ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পারে। এরআগে সে একজন অপরাধীকে প্রেমের প্রলোভনে ফেলে ঢাকার বাইরে থেকে বনানীর এক ব্যস্ত কফিশপ পর্যন্ত আনতে সক্ষম হয়, বাকীটা আমাদের গোয়েন্দা টিম সেরে ফেলে। এবারও তাকে তাইই করতে হবে। যে করেই হোক আবীরকে ঢাকা অবধি আনতে হবে। বাধ্য হয়ে এই অপকৌশল প্রয়োগ করতে হলো, কারণ এটা জঙ্গি দমন বা অস্ত্র-মাদক-বিস্ফোরক উদ্ধার জাতীয় কোন অপারেশন না। এরফলে আবীরকে গ্রেফতার করতে হলে ঢাকার বাইরে ফোর্স পাঠানো সম্ভব না। বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে স্থানীয় র‍্যাব ব্যাটালিয়নের সাহায্য নেই সেটাও ফজলুল সাহেব চান না। মাসখানেক পর তাহমিনা তার সাকসেস স্টোরিটা জানালো। আবীর পরবর্তী সপ্তাহে গুলশান-২ এর একটা শিপিং লাইন্সে চাকরীর প্রয়োজনে আসবে। পিঙ্ক সিটির উপরের তলার একটা জুসবার তাদের পরবর্তী সাক্ষাতের আরভি।


ছেলেটা আসলে বোকা। তাকে অ্যামবুশ করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি। নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে পিঙ্কসিটির উপরের তলায় জুসবারে কিউই স্মুদি অর্ডার করে ল্যাপটপ মেলে বসেছিল। তবে তাহমিনাকে জুসবার অবধি যেতে হয়নি। আমার গোয়েন্দা টিমের সদস্যরা গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকেই আবীরকে চোখের আড়াল করেনি। তারা মোবাইলে সেভ করা ছবির সাথে আবীরের চেহারা মিলিয়ে নিয়েছিল। অপারেশনের বাকীটা খুবই সাদামাটা গল্প। আমার টিম কৌশলে তার চেয়ারের দুপাশে বসে কোমরে পিস্তলের মাজল ঠেকিয়ে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় আবীর মুখে রা ফেলবার সুযোগ পায়নি। এরপর মাইক্রোবাসে তুলে তাকে সোজা র‍্যাব-৪ অফিসে আনা হয়।       

    আবীর এইমুহুর্তে আমার সামনে। ইন্টেরোগেশন রুমের মেঝেতে ব্লাইন্ড ফোল্ডেড অবস্থায় বসে আছে। মৃদু  আলোয় ইন্টেরোগেশন কাজে ব্যবহৃত ধাতব চেয়ারটা দেখতে ভৌতিক লাগছে। চারদিকে ছায়াছায়া ভাব। একজনকে ইশারা করতেই সে চোখের বাঁধন খুলে দিল। চোখজোড়া কিছুক্ষণ পিটপিট করে আবীর মাথা উঁচু করে তাকালো। একটু আগে একপ্রস্থ জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গেছে। ইশরাক জানালো প্রথমে সে সবকিছু অস্বীকার করতে চেয়েছিল, সব অপরাধীই তাই করে থাকে। তবে সামান্য থেরাপি দিতেই আবীর ঘটনার সবটা গড়গড় করে বলে যায়। সৌভাগ্যক্রমে ল্যাপটপটা তার সাথেই ছিল। আমার কড়া নির্দেশ ছিল আবীরের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আমি নিজে হ্যান্ডেল করবো। ওগুলো একটা টেবিলের ওপরে রাখা, আরপি সার্জেন্টকে আমার অফিসে রেখে আসতে বললাম। কোম্পানি কমান্ডারকে ১৬৪ ধারায় আবীরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে মিরপুর থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া করতে বললাম। ফৌজদারি আদালতে দন্ডবিধির ধারা ৪০৬/৪২০ অনুযায়ী এটা প্রতারনা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলা হতে পারে। তবে বিষয়টা একটু স্পর্শকাতর বলে বাদী মামলা করতে চাইবেন কীনা সেটাও জানা দরকার। সাবজেক্টকে হালকা খাবার ও পানি দিতে বলে আমার অফিসে ফিরে এলাম।    

    রায়নাকে খবর দেয়া দরকার। সে এসে তার প্রতারক প্রেমিককে দেখে যাক। এইমুহুর্তে আমার একমাত্র এবং জরুরী কাজ হলো কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভ এবং মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড থেকে রায়নার ন্যুডস মুছে ফেলা। মোবাইলের মেমোরি কার্ডে সাধারণ কিছু ছবি ছাড়া আর তেমন কিছুই ছিল না তবে আবীরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ল্যাপটপের নির্ধারিত ফোল্ডারে ঢুকে আমি হতবাক! মেয়েটা এসব কী করেছে! নিজেকে এভাবে কেউ কারো কাছে উম্মুক্ত করে! নিজের অজান্তেই কান গরম হয়ে গেল। অফিসের চারদিকে তাকিয়ে যেন নিশ্চিত হতে চাইলাম আর কেউ ছবিগুলো দেখছে কীনা! আমি যেন কোন এক তরুণীর অজান্তেই তার গোপন কুঠুরিতে আগন্তকের মতো ঢুকে পড়েছি। ছেলেটা আসলেই রাসপুতিন! রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দরবারে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন গ্রেগরি ইয়েফেমোভিচ রাসপুতিন। নারীদের মুগ্ধ করার জন্য তিনি যেমন নানা কায়দা কানুন ব্যবহার করতেন। আবার নারীরাও মুগ্ধ ছিল তার প্রতি, এমনকি রুশ সম্রাটপত্নী জারিনা আলেক্সান্দ্রাও, তিনি রাসপুতিনের কথা ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর বলে মনে করতেন। অনেকে বলে তারা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন। তবে এটা ঠিক রাসপুতিনের সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল, আর একারণেই বহু নারী তার ওপর আকৃষ্ট হতেন। ল্যাপটপের সবছবি মুছে ড্রাইভ ফরম্যাটিং করলাম। আরপি সার্জেন্টকে ডেকে বললাম মোবাইলটা যেমন আছে থাক, তবে ল্যাপটপটা ভেঙ্গে গুঁড়ো করতে হবে।       

 

ঘন্টাখানেক পর রায়না এবং মিসেস জেবুন্নেসা আমার অফিসে ঢুকলেন। আমি লজ্জায় রায়নার দিকে তাকাতে পাড়ছিলাম না। আমি যেন তার পরনের পোষাক ভেদ করে শরীরের প্রতিটা ভাঁজ স্পষ্ট দেখতে পারছি। এমনকি স্তনের বাঁ পাশের লাল জরুলের মতো দাগটাও। রায়না’র ইনোসেন্ট মুখের দিকে তাকিয়ে খারাপ লাগলো, ও বুঝতে পারছে না তখন আমার ভেতরে কী চলছে! কে বলবে এই মেয়ে কি অঘটন ঘটিয়ে বসে আছে। মিসেস জেবুন্নেসা যদি একবার জানতেন তার মেয়ে আবীরের আহবানে কতোটা ডুবেছে তাহলে নির্ঘাত আত্মহত্যা করতেন। মেসওয়েটারকে ডেকে তাদের চা/কফি একটা কিছু সার্ভ করতে বলে আমি অফিসের বারান্দায় গেলাম। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজেকে গালি দিলাম, কীসব ছাই-ভস্ম ভাবছি! আজেবাজে সব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে অফিসে ঢুকলাম।  

    ওয়্যারলেস সেটে আরপি সার্জেন্টকে বললাম সাবজেক্টকে নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পর আরপি সার্জেন্ট দরজা ঠেলে আবীরসহ আমার অফিসে ঢুকলো, তার দু’হাতে হ্যান্ডকাফ, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে। রায়নাকে ঘরের একপাশে সোফায় বসা অবস্থায় দেখে সে মাথা নিচু করলো। রায়না আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় সম্মতি চাইলো, কিন্তু সে আসলে সম্মতির জন্য অপেক্ষা করেনি। সোফা থেকে উঠে আবীরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে একটাই প্রশ্ন করলো,   

: কেন?

    এবারও সে উত্তরের অপেক্ষা করেনি। ঝুলে পড়া চিবুক সামান্য উঁচিয়ে রায়নার দিকে তাকাতেই সে আবীরের বাম গালে কষে চড় মেরে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। মিসেস জেবুন্নেসা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন, একদম চুপচাপ। জানিনা তার মনের ভেতরে তখন কি চলছিল, হয়তো নীরব সম্মতি! আর রায়নার দু’চোখে তখন শুধুই ঘৃণা! এই ঘৃণা পম্পেইয়ের মতো একটা নগরী গরলে ডুবিয়ে দিতে পারে। 

    চড়ের জোড়ালো আঘাতে আবীর সোফার উপরে পড়ে গেল। আরপি সার্জেন্ট তাকে ধরে দাঁড় করাতেই রায়না চোখের সামনে থেকে তাকে সরিয়ে নিতে বললো। আমি আরপি সার্জেন্টকে ইশারা করতেই সে আবীরকে নিয়ে কয়েদী সেলের দিকে চলে গেল। ঘরের ভিতরে এখন শুধুই নীরবতা। সামান্য কাশি দিয়ে মিসেস জেবুন্নেসাকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি মামলা করতে চান কীনা! আমার ধারণাই সঠিক। কোম্পানি কমান্ডারকে ইন্টারকমে জানালাম দন্ডবিধির ধারা ৪০৬/৪২০ অনুযায়ী যে মামলাটা সাজানো হয়েছে বাদী সেটা চালাতে ইচ্ছুক না। ১৬৪ ধারায় আবীরের কাছ থেকে নেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিটা ছিঁড়ে ফেলতে বললাম। তবে থানায় চালান দেয়ার আগে একটা লিখিত মুচলেকা নিয়ে রাখতে হবে। 

    মিসেস জেবুন্নেসা পরিবারের সম্মানের দিকে তাকিয়ে মামলা করতে ইচ্ছুক নন। তবে তিনি অনুরোধ করলেন সবছবি যেন মুছে ফেলা হয়, আবীর যেন কোনভাবেই রায়নার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা না করে। একনাগাড়ে কথাগুলো বলে তিনি সামান্য থামলেন, তারপর আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি আসলে আমার কাছ থেকে নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। আমি সম্মতি দিতেই তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। আরও দু’চার কথার পরে তারা সেদিন চলে গেলেন। আমি শুধু ভাবছি, এই আসামীকে কোন মামলায় হ্যান্ডেল করবো। অনেক ভেবেচিন্তে তার কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে মিরপুর থানায় পাঠিয়ে দিলাম। উকিল ধরলে কিংবা দু’একদিন পর এমনিতেই ছাড়া পাবে। তবে রায়নার ঘৃণা ভরা দৃষ্টি সে হয়তো কোনদিনই ভুলতে পারবে না।   

    এক সপ্তাহ পর উত্তরার ফায়ার অন আইস মিউজিক ক্যাফে এন্ড রেস্টুরেন্টে এই পরিবারের সাথে দেখা হয়েছিল। তারপর তাদের সাথে আর কখনো যোগাযোগ বা কথা হয়নি। সম্ভবত মাসখানেক পরে র‍্যাবে ডেপুটেশনের মেয়াদ শেষ হলে আমাকে আর্মিতে ফিরে যেতে হয়। 

 

স্থান: যশোর সেনানিবাস।

কাল: ফায়ার অন আইস রেস্টুরেন্টের মিউজিক ফ্লোরের সেই ঘটনার মাস ছয়েক পর।

সময়: রাত সাড়ে দশটা। বৃহস্পতিবার।    

র‍্যাবে ডেপুটেশন শেষ করে আর্মিতে ফিরে এসেছি। একটা পদাতিক ইউনিটে পোস্টিং হয়েছে। এখনও সরকারি বাসস্থান বরাদ্দ হয়নি বলে অফিসার মেসে একাই থাকতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে নাইট স্মল আর্মস ফায়ারিং শেষে রুমে ফিরেছি। ব্যাটম্যান কোণের রিডিং টেবিলটাতে ডিনার সাজিয়ে ঘুমাতে চলে গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে খাবারও সম্ভবত ঠান্ডা হয়ে গেছে। হেলমেট আর স্মলপ্যাক খুলে বাথরুমের পাশে কাবার্ডের নিচে ঠেলে দিলাম। আর্মিতে কিছু প্রচলিত বাংলাভাষা বা অদ্ভুত ধরণের শব্দ আছে, যার উৎপত্তি সৈনিক মেস কিংবা লঙ্গরে। সে ভাষায় স্মলপ্যাক ঝোলা-চামড়া আর প্যাক-০৮ পিট্টু নামে পরিচিত। যশোরে শীত এবং গরম দুটাই অসহনীয়। টিভি এবং এসি চালু করে সোফায় বসে সামনের সেন্টার টেবিলে বুটসহ দু’পা মেলে দিলাম। বুটজোড়া খুলতে ইচ্ছে করছে না, মোজাও। আসলে ফায়ারিং রেঞ্জে সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে শরীরটা এখন বেশ ক্লান্ত। তাই আলস্য ভর করেছে। ছাইদানি কোলে রেখে সিগারেটের ধোঁয়ার প্রথম কুন্ডুলিটা শূন্যে ছুঁড়েছি মাত্র, মোবাইলে খুদেবার্তা’র নোটিফিকেশন টোন বেজে উঠলো। একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে, 

: কেমন আছেন?  

এক নারীর কণ্ঠস্বর। ভ্রূ কুচকে ডিসপ্লেতে তাকালাম, কিন্তু চিনতে পারছিনা কে! একইসাথে বিরক্তি এবং কৌতূহল চেপে ধরলেও হার মানলাম কৌতূহলের কাছে।   

: ভালো। কে আপনি? 

: কয়েক মাসেই ভুলে গেলেন? সত্যিই চিনতে পারতেছেন না! নাকি ঢং করতেছেন!  

: আজব! চিনতে পারছি না বলেই তো জিজ্ঞেস করলাম।

: রায়না।

: আরে! আপনি আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?

: বিজনেস কার্ড দিছিলেন, মনে নেই? দুইটা নাম্বার ছিল। প্রথমটাতে অনেকদিন ফোন করছিলাম, বন্ধ পাইছি। কি ভেবে আজ এইটাতে ফোন করতেই আপনাকে পেয়ে গেলাম। কেমন আছেন আপনি? কোথায় আছেন?    

: ও আচ্ছা। আমি তো র‍্যাবে নেই। ডেপুটেশন শেষ। ছ’মাস হলো আর্মিতে ফিরে এসেছি।

: তাই বলেন।  

: আপনি হঠাৎ? কোন সমস্যা হয়নি তো!  

: আরে নাহ। ঐ দিন ব্যাটারে যে ধোলাই দিছিলেন, আর সাহস পায় নাই। আরে সেইদিন থেকেই তো আপনে আমার ক্রাশ!

    রায়নার কণ্ঠে প্রবল উচ্ছ্বাস বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো ছড়িয়ে পড়লো যেন। আমাকেও ভেজালো কি? হাসতে হাসতে আরও কীকী সব যেন বলে গেল। কিছু বুঝলাম, কিছু মাথার উপর দিয়ে চলে গেল তবে প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে! আমারও ভালো লেগেছে, সেই সাথে লজ্জাও। উচ্ছ্বাসে লাগাম টেনে বললো,      

: দাদা বাড়ি বেড়াতে আসছি, যশোরের দড়াটানা মোড়ের কাছেই। আপনে দড়াটানা মোড় চিনেন?    

: না। তা এতদিন পর কি মনেকরে?  

: সবসময়ই তো মনেপড়ে। বললাম না ক্রাশ! কিন্তু ফোনে যোগাযোগ করতে পারতেছিলাম না, তাই কথা হয় নাই। আপনার পোস্টিং কোই এখন?   

    রায়নার এই প্রশ্নে সতর্ক হয়ে উঠলাম। মনেপড়লো ফায়ার অন আইসে তার সেই ক্রেজিনেস! আবার এখন বলছে আমি নাকি তার ক্রাশ! তার আসেপাশে কেউ আছে মনেহচ্ছে, হয়তো কাজিন-টাজিন হবে। ফিসফিস করে কথা বলছে আর ফিকফিক করে হাসছে।

: চুপ থাকলেন যে! পোস্টিং কোথায় মিঃ?

: পার্বত্য চট্টগ্রাম, রুমা’র বড় থলিপাড়া। কাল সকালেই মুভে চলে যাচ্ছি। 

পরদিন শুক্রবার, ছুটির দিন জেনেও অবলীলায় মিথ্যে বলে গেলাম। এছাড়া উপায় ছিল না।  

: ইসস! আচ্ছা, ওখানে কথা বলা যায় তো! মানে মোবাইলে?

: মনেহয় না। শুনেছি নেটওয়ার্ক নেই, তবে গেলেই বুঝতে পারবো।

: কী বলেন! তাহলে কথা বলবো কেমনে? আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করতেছে।  

: আপাতত দেখা করার উপায় তো নেই। কথা হয়তো হবে। এভাবেই কোন একদিন।

: মনটা খারাপ করে দিলেন। 

রায়না কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, 

: আচ্ছা, আমাকে আপনার কেমন লাগে?

: কাল অনেক ভোরে উঠতে হবে। এখন একটু ঘুমাতে হবে যে।

: এটা তো উত্তর না। আমাকে কেমন লাগে! আবীরের ল্যাপটপে ছবি ছিল, ড্যাবড্যাব করে দেখছেন না! নাকি এটাও অস্বীকার করবেন! অবশ্য অস্বীকার করলেও লাভ নাই। বিশ্বাস করবো না।

: কীসের ছবি? না, কোন ছবি দেখিনি।    

    কথাটা বললাম বটে, কিন্তু চোখের সামনে সেলুলয়েড ফিতেয় ভেসে উঠলো একটার পর একটা ছবি। একটা মেয়ে কতোটা বেপরোয়া প্রেমিকা হলে ওভাবে ছবি তুলে প্রেমিকের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারে! কারো কাছে এটা ক্রেজিনেস, আবার কারো কাছে এটা শুধুই নোংরামি! স্প্যানিশ কবি জোসে মর্টি’র একটা লেখা পড়েছিলাম, Sane love, is not love. তাই বলে এতোটাই Insane!  সিগারেটে টান দিয়ে আমি শুধু ভাবছি সেই সময়ে মেয়েটার দু’কূল ছাপানো আবেগ আর অনুভূতির কথা। জানি না এতটা সাহস সে কোথা থেকে পেয়েছিল! জানিনা তখন তার মনের ভেতরে কি চলছিল। আমি জানি, কোনোদিন এসব প্রশ্নের উত্তর জানা হবে না। সেদিন তাদের মাঝে কী কথা হয়েছিল তাও জানা হবে না! আমি এও জানি, আমার এখন কী করা উচিত। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে এখানে ঝামেলা আছে।  

    হাতঘড়িতে তখন রাত বারোটা ছুঁইছুঁই, ঘুমাতে হবে। দ্রুতই কর্তব্য স্থির করে ফেললাম। কলটা কেটে দিয়ে, সিমকার্ড ভেঙ্গে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। কোথায় যেন পড়েছিলাম, sometimes even deep love requires us to walk away.  

তবে আমার জন্য সিদ্ধান্তটা অনেক সহজ ছিল।



পোস্ট ভিউঃ 9

আপনার মন্তব্য লিখুন