১
‘গুজব! গুজবে কান দিতে মানা কিন্তু গুজব কখনো কখনো যেন সত্যি………………’ টিভির রিমোট চাপতেই সংবাদ পাঠিকার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। কফির কাপে প্রথম চুমুকটা দিতেই থমকে গেলাম, টিভির স্ক্রিন জুরে সামিয়া হাসানের মুখ। আমার কাছে সামিয়া মানেই একটা ট্যাটুর স্মৃতি যা থেকে আমার মুক্তি নেই।
‘ ………গুঞ্জন ছিল অল রাউন্ডার মুশতাক ইউসুফের সাথে, অবশেষে তাদের দেখা গেলো লিভারপুলের কাছে ম্যাক ডোনাল্ডসে। বছর তিনেক আগে করাচির অভিজাত হোটেলে বড়দিনের অনুষ্ঠানে লস্কর-ই-তৈয়বা’র এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে সামিয়া হাসানের স্বামী খালিদ উমার নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেকে সামাজিক ও এনজিও’র কাজে ব্যস্ত রেখেছিলেন, কিন্তু সম্প্রতি তাকে নিয়ে বেশ গুঞ্জন, এরমাঝেই তাদের ………’
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বছর দশেক আগের এক শীতের
রাতের স্মৃতিতে পেয়ে বসলো আমাকে। সেলুলয়েড ফিতের মত সেদিনের একটার পর একটা দৃশ্য চোখের
পর্দায় ভেসে উঠে অবচেতন মনকে জানিয়ে দিল টিভির পর্দা নয়, আমি এখন সামিয়া হাসানের কথা
ভাববো। মাঝেমাঝেই তার কথা মনেপড়ে। নিতম্বের ফর্সা ত্বকের ক্যানভাসে একটা ছোট প্রজাপতি
ট্যাটু। আমি তাই এখনো নেটে তার খবর, তাকে খুঁজি। তবে ক্রিকেটারকে জড়িয়ে তার খবরটা শুনে
খারাপ লাগলো, টিভি দেখতে ইচ্ছে করলো না, রিমোটে চাপ দিলাম। এবং ফিরে গেলাম হারানো অতীতে।
২
তারিখ: ১২/১৩ জানুয়ারি ২০০৭
সময়: মধ্যরাত
স্থান: ঢাকা
জানুয়ারির শীতের রাত, কুয়াশার হালকা চাদর আর ঘনকালো অন্ধকার একসাথে জমে ক্ষীর হয়েগেছে। ডীপ সী ব্লু কালারের নিশান পেট্রোল এবং অ্যান্টিক সিলভার রঙের টয়োটা রেজিউস ১৯৯৮ মডেলের মাইক্রোবাসটাতে সি টাইপ পেট্রল নিয়ে যাচ্ছি গুলশানের দিকে। সেনা কারফিউ চলছে বলে চারদিকে সুনসান নীরবতা। রাতের নিস্তব্ধতা খুন করে মাঝে মাঝে নাইটগার্ডের হুইসেল কিংবা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। আবার কখনো গলির মুখে ভবঘুরে ফকিরের মুখ হেডলাইটের আলোয় হঠাৎ ভেসে উঠে সরীসৃপের মতো সরে যাচ্ছে।
র্যাব-১০-এর যাত্রাবাড়ি অফিস থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার ধরে মালিবাগের দিকে যাচ্ছি, সেখান থেকে বনানী মাঠের কাছাকাছি কোথাও যেতে হবে। বের হবার আগে ফিল্ডমেসে বসে এককাপ কফি পান করেছিলাম, ফ্ল্যাট হোয়াইট, স্টিমড মিল্কের সাথে এস্প্রেসো। বরাবর অ্যামেরিকানো বানাতে অভ্যস্ত মেসকুক কফির এই টাইপটা নতুন শিখেছে, অতটা ভালো হয়নি, মুখে তেতো স্বাদটা লেগে আছে। সিগারেটের প্যাকেটে হাত দিয়েই সেটা আবারও সীটের ওপরে ছুঁড়ে দিলাম। ধরাতে ইচ্ছে করছে না। কলমটা গড়িয়ে নিচে পড়লো কিন্তু তুলতে ইচ্ছে করলো না। আসলে মনের ভিতরে তোলপাড় চলছে, কেননা এইপ্রথম সাবজেক্ট সম্পর্কে ডিটেইলস না জেনেই অন্ধের মতো অপারেশনে পা বাড়িয়েছি। এ যেন অন্ধের হাতি দেখার মতো। এই অভিজ্ঞতাটা খুবই বিরক্তিকর। আমি শুধু বলা হয়েছে লিস্টের ৪৯ নম্বর সিরিয়ালে থাকা জনৈক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে টিএফআই-এর কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে। নাম কি বা তিনি কোথায় থাকেন বা কি করেন বলা হয়নি। কাজটা সম্ভবত তারা নিজেরাই করতে পারতেন, তাদের প্রয়োজনীয় লোকবল নেই বিষয়টা তো এমন নয়। বরং আমার ধারণা প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই লোকবল আছে। তবুও ইউনিটের কাঁধে অপারেশনের দায়িত্বটা কেন ঠেলে দেয়া হয়েছে তার মাজেজা ঠিক বুঝলাম না। তাছাড়া গুলশান-বনানী আমাদের এওআর-এর মধ্যেও পড়েনা। ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স হিসেবে কর্ণেল আসহাব জয়েন করার পর থেকে এ অবস্থা শুরু হয়েছে। আমাকে একটা পাসওয়ার্ড, আরভি এবং সাবজেক্ট-এর ক্রমিক নম্বর হাতে ধরিয়ে দিয়ে অপারেশনে পাঠানো হয়েছে। আরভিতে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে পৌঁছাতে হবে, সেখানে প্রথম কন্টাক্ট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনিই টার্গেট সম্পর্কে ব্রিফ করবেন।
সিডিটা ড্রাইভারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্লে করতে বললাম, কারেন কার্পেন্টারের ইয়েস্টারডে ওয়ান্স মোর মৃদু ভলিউমে বেজে উঠলো,
Every Sha-la-la-la
Every Wo-o-wo-o
Still shines
Every shing-a-ling-a-ling
That they're startin' to sing's
So fine.
টানটান উত্তেজনার মুহুর্তে এরকম কুল নাম্বার্স আমার
মানসিক চাপ দূর করতে সাহায্য করে। আমার মতো আরও বেশ কয়েকজন অফিসার আজ রাতে বিভিন্ন
ইউনিট থেকে অপারেশনে বের হয়েছেন শুনেছি। আমার ধারণা আমাদের সবারই মানসিক অবস্থা একইরকম।
ওকে রিপোর্ট দেয়ার সময় কমান্ডিং অফিসার বারবার সতর্ক করে বলে দিয়েছেন, কোনভাবেই ব্যর্থ
হওয়া চলবে না। কয়েকমাস আগে একটা অপারেশনে অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ একডজন পিস্তল উদ্ধার করেছিলাম
বলে আমার উপরে ডিজি’র বেশ আস্থা। জটিল এবং স্পর্শকাতর অপারেশনগুলোতে উনি আমাকেই পাঠান।
৩
বনানী মাঠের আশেপাশের গলিতে, মেঘশিরীষ গাছের ছায়ায় স্নো হোয়াইট রঙের একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার কার্নিশে ঝুলছে রেড ট্রাম্পেট ভাইন। আমাদের জন্য নির্ধারিত ফাইনাল আরভি। আমি আসলে ক্লিয়ার না, এই কুয়াশার রাতে স্নো হোয়াইট রঙ ঠিকঠাক বুঝতে পারবো কিনা! অনুমানের উপরে নির্ভর করে একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির কাছাকাছি গাড়ি পার্ক করলাম। হেড লাইট অফকরতেই অন্ধকারের চাদর ভেদ করে একজন ব্যক্তি্র হাতের টর্চ দু’বার জ্বলে নিভে গেছে।জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। সম্ভবত সিগারেট হাতে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিলেন।সাইডডোর গ্লাস নামাতেই তামাকপোড়া গন্ধের ঝাপটা নাকে এসে বিঁধলো। পাসওয়ার্ড বিনিময় করে আমরা একে অপর সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। ইতিমধ্যে মাইক্রোবাসটাও গতি কমিয়ে নিঃশব্দে পিছনে এসে থামলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে সামান্য দূরে কন্টাক্ট-এর সাথে কথা বলে সাবজেক্ট সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিলাম। কন্টাক্ট জানালেন সাবজেক্টের বাসার কাছেই দ্বিতীয় কন্টাক্ট আমার টিমের জন্য অপেক্ষা করবে, একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে। একইসাথে অবাক এবং বিরক্ত হলাম। এভাবে এক কন্টাক্ট থেকে আরেক কন্টাক্ট পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করতেই না রাতটা পার হয়ে যায়!
গোয়েন্দা সংস্থা থেকে নিয়োজিত প্রথম কন্টাক্ট-এর
ব্রিফিং থেকে বুঝলাম গুলশান-২ নম্বর সেকশনে, পিংক সিটির পাশ দিয়ে ১০৩ নম্বর সড়ক ধরে
কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যে ওয়াকিটকির বার্তা চালাচালি থেকে বুঝলাম ঢাকা
শহর চষে বেড়ানো আমাদের ইউনিটের একটাসহ বেশ কয়েকটা গ্রুপ তাদের টার্গেট মিস করেছে। যেকোন
ভাবেই হোক, কেউ বা কারা যেন ইনফরমেশন লিক করেছে। ইনফরমেশন লিক হওয়ার কথা শুনে আমার
মনের ভেতরে অস্থিরতা ভর করলো। আমাদের হাতে যে তালিকা দেয়া হয়েছে তাতে ৬৫/৬৭ জনের ছদ্মনাম
ও ক্রমিক নম্বর লেখা। কামাল আতাতুর্ক এভেনিউ ধরে গুলশান-২ সার্কেল থেকে হাতের ডানপাশটা
ধরে একটু এগোলে পিংকসিটি শপিং কমপ্লেক্স। সেটা পার হয়ে সামান্য বামে মোড় নিয়ে কিছুটা
এগোতেই দ্বিতীয় কন্টাক্টের দেখা পেলাম। সাবজেক্ট কিছুক্ষণ আগে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান
থেকে ফিরেছেন। তথ্যটা জেনে মানসিক প্রশান্তি পেলাম। ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের দেয়ালঘেঁষা
গাছের সারির দিকে, খানিকটা অন্ধকারে গাড়ি পার্ক করে মাইক্রোবাসের ভিতরেই টিমের সবাইকে
ব্রিফ করলাম। একটা গ্রুপ এক্সিট রুট কভার করে ডুপ্লেক্স বাড়ীটাকে চারদিক থেকে ঘিরে
ফেললো, আমি ৩/৪জনকে নিয়ে দো’তলায় উঠলাম। অদূরে বোগেনভিলিয়ার ন্যুয়ে পড়া ডাল অন্ধকারে
কালো-ভুতুরে দেখাচ্ছে। বারান্দায় পৌঁছাতেই ছায়ার মতন কেউ একজন কাঠের ভারী দরজা ঠেলে
লাগাতে উদ্যত হলে ফ্লাইং-কিক করে দরজার হুড়কো ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকলাম। কলেজ জীবনে নেয়া
কারাতে প্রশিক্ষণ সেদিন রাতে বেশ কাজে লেগেছিল।
৪
: আপনারা কারা?
প্রচন্ড বিরক্তি আর ক্রোধ নিয়ে সামিয়া ইকবাল সামনে এগিয়ে এলেন। ২৩/২৪ বছর বয়সের একজন তরুণী, বেশ স্মার্ট এবং সুন্দরী। তার পরনে আঁটসাঁট ব্লু জিন্স আর লিনেনের টপস, রঙটা মনে নেই। ইয়োগা চর্চিত ফিগার, তবে দৃষ্টি যতোটা না তার মুখের দিকে তারচেয়ে বেশি তার বাস্টলাইনের দিকে টানছে। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে খুব কষ্টে নিজেকে সংযত রাখতে হচ্ছে। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ, এ এক অন্যরকম অনুভূতি! তিনি পার্টি থেকে ফিরে পোশাক বদলাবার ফুরসৎ পাননি বোঝা যাচ্ছে। তবে অ্যাপাচি রমণীদের মতো তার বুনো এবং মারমুখী আচরণটা কেন জানিনা ভালো লাগলো। পিস্তল হোলস্টারে ঢুকাতেই রাগত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
: আপনি কে? ক্যাডার? কোন দলের?
তিনি আসলে তখনো জানতেন না শীতের রাতের আঁধারে ঢাকা শহরে তখন কি তাণ্ডব চলছে! মাথায় বড় চুল, পরনের জিন্সের সাথে কালো লেদার জ্যাকেট এবং কোমরের হোলস্টারে ঝুলানো ৭.৬২ মিমি চায়নিজ পিস্তল দেখে আমাকে হয়তো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বলে মনেহয়েছে। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে থাকলাম। তিনি উত্তরটা দৃষ্টি থেকেই বুঝে নিলেন। তিনি বুঝলেন এখানে চেঁচিয়ে সুবিধে হবে না। তবে সেদিন রাতে আমি যেটা উপলব্ধি করলাম, সুন্দরী মেয়েরা যখন গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে তখন তাদের রূপের দ্যুতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই রূপ তেজস্ক্রিয়তার বিকিরণে ঝলসে দেয়া রূপ! তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাটা প্রতি সেকেন্ডে কত বেকারেল হতে পারে ভাবতে ভাবতেই বললাম,
: দোতলার সব রুম সার্চ করবো।
তিনি ঠাণ্ডা মাথায় শুনলেন, পূর্বেকার আচরণ ইতিমধ্যে বেশ মিইয়ে গেছে। তবে বারান্দায় উঁচুস্বরে কথাবার্তার আভাস পেয়ে ভারী সিল্কের গাউনে কোমরের নট বাঁধতে বাঁধতে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন ভদ্রলোক। লম্বা, ফর্সা, মার্জিত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। তার পরনে হালকা ফিরোজা রঙের গাউন, তাতে বাটিকের ছাপ, ইনারের রঙটা বোঝা গেলো না। বুঝলাম, ইনিই আমার আজ রাতের অতিথি, আমার সাবজেক্ট জনাব ইকবাল হাসান। ঢাকা শহরের একজন বিখ্যাত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং একটা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে এসেছি, কিন্তু কারা সেটা না বুঝলেও পরিবারের সবাইকে আমাদের কাজে সহযোগিতা করতে বললেন।
ভদ্রলোক পোশাক বদলাতে পাশের ঘরে গেলেন। সবাইকে মাস্টার বেডরুমে ডেকে মোবাইল ফোন একজায়গায় রাখতে বললাম। আমি চাইনা অপারেশনের কোন পর্যায়ে কারো মামা-ফুপা-খালুর ফোন আসুক। কিছুদিন আগে বাড়ির ছোটো মেয়ে, সামিয়ার বিয়ে হয়েছে, তার অবাঙালি স্বামী জনাব খালিদ উমার অবাক চোখে আমাদের কাজকর্ম দেখছেন। বড় মেয়ে ওয়ামিয়া সেদিন বাসায় ছিলেন না। জনাব ইকবাল হাসানের স্ত্রী, সামিনা হাসানকে বললাম,
: ম্যাডাম, সার্চ করার সময় আপনাদের কেউ একজন যেন আমাদের সাথে থাকেন।
কাউকে বলতে হলো না। সামিয়া হাসান নিজেই উদ্যোগী হয়ে
আমাদেরকে ফলো করলেন। টিমের সাথে থাকা ভিডিও ক্যামেরাম্যানকে বললাম পুরো সময়টা ভিডিও
করে রাখতে। সামিয়া হাসানের দিকে ইঙ্গিত করে ক্যামেরাম্যানকে বললাম আমিসহ কেউই যেন ক্যামেরার
লেন্সের বাইরে না থাকি।
৫
প্রথম যে ঘরে ঢুকেছিলাম সেটা সম্ভবত সামিয়া হাসানের। দেয়ালে বিয়ের কণে সাজে প্রমাণসাইজের ছবি সাঁটানো দেখে যে কেউই তাই আন্দাজ করবেন। কোন বিখ্যাত এজেন্সির ব্রাইডাল ফটোগ্রাফি বোঝা যাচ্ছে, দামী ফ্রেমে ঘরের দেয়ালে তার ছবি শোভা পাচ্ছে। ঘরের পুরোটা জুরে মেয়েলী পারফিউমের ঘ্রাণ, সম্ভবত ফেন্ডি। লাং লাং ফুলের হালকা মিষ্টিঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে চারদিক। ছবিটার দিকে দু’সেকেন্ড তাকিয়ে টিমের নারী সদস্যদের আলমারি, কাবার্ড এসব ভালো করে সার্চ করতে বললাম। কিন্তু তিনি আমার সামনে দু’হাত মেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে নিষেধ করলেন। সহযোগিতা না করলে তাকে সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার করতে পারি জানালে সরে গেলেন। কাবার্ডের ড্রয়ারের নব ধরে টান দিতেই থরে থরে গোছানো জামা, শাড়ি, এটাসেটা এলোমেলো হয়ে নিচে ছড়িয়ে পড়লো। টিমের নারী সদস্যরা তার মৃদু আপত্তি না শুনে আলমারির পাল্লাটা সরাতেই কোবাল্ট ব্লু, ব্ল্যাক এবং ডিপ পার্পল কালারের কয়েকটা প্যাডেড ব্রা গড়িয়ে মেঝেতে পড়লো, ৩৬ ডি। একনজর তাকিয়ে উদ্ধত বাস্টলাইনের রহস্য উন্মোচিত হলো, মনেমনে হাসলাম। তবে আলমারির নিচের ড্রয়ারে একটা ভারী কাপড়ের আড়ালে যা পাওয়া গেল তারজন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। ল্যাটেক্স কনডমের কয়েকটা ফয়েল প্যাকের পাশাপাশি স্ক্রিন কালারের একটা মাইক্রোপেনিস ভাইব্রেটর। কনডমের নামটা বেশ অদ্ভুত, আমি ট্রোজান নামে শুধু কম্পিউটার ভাইরাসের কথা জানতাম। মাথা উঁচু করতেই আমি তার সাথে দৃষ্টিতে যেন ভস্ম হয়ে গেলাম। ভীষণ রেগে বললেন,
: আপনি যে আমার ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশের চেস্টা
চালাচ্ছেন তা কি বুঝতে পেরেছেন?
: কিন্তু আমি কি করে জানবো?
: আমার রুম থেকে বেরিয়ে যান প্লিজ।
: দুঃখিত। এরকম বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্য আমি নিজেও দুঃখিত।
তার রুম থেকে একটা ক্যারিবিয়ান দেশের পাসপোর্ট এবং কিছু ফরেইন কারেন্সি উদ্ধার হয়েছিল। একজনকে সেগুলো সিজার লিস্টে ঢুকাতে বলে টিমের অন্যদের পাশের ঘরে সার্চ করতে বললাম। এদিকে সামিয়া রাগত স্বরে অনর্গল কথা বলছিলেন। খানিকটা বিরক্ত হলেও চুপচাপ শুনছিলাম কারণ যা খুঁজে পেতে চাই তা পাচ্ছি না। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তিনি আমাদের পরিচয় জানতে চেষ্টা করছিলেন। সেদিন জেনেছিলাম, সুন্দরী মেয়েদের উপেক্ষা করার মাঝে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। শংকর বা নিমাই ভট্টাচার্যের কোন উপন্যাসে সেরকমটা কখনো পড়িনি। তবে তার প্রতি আমার এই আচরণ যে মেল শভিনিজম না, তা নিশ্চিত। তিনি আমাদের কাজে খুব বিরক্ত করছিলেন, সেজন্যই মূলত উপেক্ষা করে যাওয়া।
পাশেরটা সম্ভবত গেস্ট রুম। সামিয়া আমাদের সাথে ঘরের ভিতরে ঢুকেই বিছানার চাদর গুছিয়ে বসে পড়লেন। তার চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। পরনের টাইট ব্লু জিন্স হাঁটুর চাপে খানিকটা নিচে নেমে গেলে নিতম্ব বিভাজিকার কিছুটা অনাবৃত হয়ে পড়লো। এরফলে তার প্রিন্টেড গ্রে থং প্যান্টির ব্ল্যাক লাইনিং দৃশ্যমান হলেও চোখের নজর কাড়লো গাঢ় সবুজ পিগমেন্টের একটা ছোট প্রজাপতি ট্যাটু। নিতম্বের ফর্সা মসৃণ ত্বকের ক্যানভাসে প্রজাপতি ট্যাটুটা যেন নিশিডাকের শিসতোলা তীব্র বাঁশীর মতো রক্তে কাঁপন ধরায়, কবি আল মাহমুদের ভাষায়। নিওলিথিক যুগের এই প্রবণতা একসময় মানুষের আচার, মর্যাদা বা পদমর্যাদা, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ভক্তি, বীরত্ব, উর্বরতা, প্রেমের অঙ্গীকার ইত্যাদি প্রকাশ করতো। কখনো এসব ছিল সুরক্ষা বা শাস্তির চিহ্ন, যেমন ট্রাইব থেকে বহিষ্কৃত হলে বা কখনো দাসদের প্রতীক। পাশ্চাত্যে মেয়েরা ভালোবাসা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং বোঝাপড়ার আকর্ষণ জানার স্বপ্ন থেকে এরকম ভাবে কব্জি, নিতম্ব, পা বা বুকে একটি ছোট প্রজাপতি ট্যাটু আঁকে কোথায় যেন পড়েছি। সামিয়ার নিতম্বে আঁকা প্রজাপতি ট্যাটুর স্মৃতি থেকে আমার কখনো মুক্তিলাভ ঘটেনি। কিছুকিছু স্মৃতি যেন ফেভিকল দিয়ে নিউরনে সেঁটে দেয়া থাকে!
এরকম অবস্থায় ঠিক কি করা উচিত বুঝতে পারছিলাম না। টিমের কেউ তাকে এরকম অবস্থায় দেখে ফেলুক সেটাও চাইছিলাম না। বাধ্য হয়ে তাকে ইশারা করলাম, মুহুর্তেই তার ধবধবে ফর্সা চিবুকে কে যেন আবীর ঢেলে দিল। মুহুর্তেই সামিয়া গলায় প্যাঁচানো শিফনের ফ্লোরাল প্রিন্টের স্কার্ফটা খুলে কোমরে পেঁচিয়ে সেই যে ছুটে গেলেন, এরপর তাকে আর দেখিনি। এমনকি অপারেশন শেষে ফিরে যাবার সময়ও তার দেখা মেলেনি। হাসান সাহেবের স্ত্রী, সামিনা হাসান ইকবাল হাসান সাহেবকে বিদায় দিয়েছিলেন। সামিয়া ওভাবে চলে গেলে তার স্বামী, জনাব খালিদ উমার এসে আমাদের সার্চ করার কাজে সহযোগিতা করলেন। কথায় কথায় জানলাম খালিদ উমার পাকিস্তানের নাগরিক, তার জন্ম এবং বেরে ওঠা সারগোদা, পাঞ্জাবে। সারগোদার মিশন গ্রামার স্কুল থেকে এ লেবেল শেষ করে পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির অন্যসব ছেলেমেয়েদের মতো লন্ডনে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পড়াশুনা শেষ করে তার পারিবারিক ফ্রুট প্রোসেসিং বিজনেসের হাল ধরার কথা। সামিয়ার সাথে উমারের পরিচয় লন্ডনে, তারা দুজনই লন্ডন স্কুল অভ বিজনেস থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস প্রোগ্রামে আন্ডারগ্রাড করেছেন। তাদের পরিচয় এবং প্রণয় সেখানেই। সামিয়ার সাথে পরিচয়ের পর উমারের জীবনের সবকিছুই এখন ওলটপালট, তাকে নতুন করে জীবনের অংক কষতে হচ্ছে। তার প্যারেন্টস বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে গত সপ্তাহে ফিরে গেছেন, দুদিন পর তিনি নিজেও লন্ডনে ফিরে যাবেন। সামিয়া এদিকের সবকিছু গুছিয়ে তার ওখানে চলে যাবেন। কেননা তাদেরকে মাস্টার্স শেষ করতে হবে। আমার বুকের গভীরে কেন জানি না একটা চিনচিন অনুভূতি হলো। এনজাইনা! নাকি গ্যাস! নাকি অন্যকিছু!
গেস্টরুম থেকে ঈর্ষনীয় সংখ্যক মদের বোতল জব্দ করা সম্ভব হলো। সংগ্রহের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য দেখে মনেহচ্ছে গুলশানের কোন অভিজাত বার উঠিয়ে এনে গেস্টরুমে বসানো হয়েছে। ভাবছিলাম তারা বাসায় H2O নাকি R-OH পান করে! জিজ্ঞেস করাতে উমার হেসে জানিয়েছিলেন বিয়ে উপলক্ষ্যে পাকিস্তান থেকে তার কয়েকজন বন্ধু ঢাকায় এসেছিল, সামিয়ার কাজিনরাও ছিল। সেজন্য কয়েক কেস আনা হয়েছিল। বলতে গেলে অর্ধেকটা কনজিউম করার পরও এগুলো রয়ে গেছে। উমার শ্রাগ করে জানালেন আমরা চাইলে ওগুলো নিয়ে যেতে পারি। স্মারনফ রেড লেভেল ভদকা থেকে শুরু করে রাস্পবেরি ক্রাশ, পিঙ্ক লেমোনেড, ব্লাক-ব্লু-সিলভার লেভেলের সমাহার দেখে আমি ভাবছিলাম ইউএন মিশনে আমার রাশিয়ান বস লে. কর্নেল দিমিত্রি পাত্রুশেভ-এর কথা। কঙ্গোর মারাবো মিলিটারি অবজারভার ক্যাম্পের সেইসব সন্ধ্যার কথা। দিনের আলো ফুরানোর আগেই ডিনার সেরে আমরা ভদকার বোতল নিয়ে গল্পের আসর জমাতাম। ছোটছোট পেগের সাথে পিনাটস বা অন্যকিছু নিয়ে রাত নয়টা-দশটা অবধি চলতো সেই আড্ডা। এসব আড্ডা-আয়োজনে নেপাল আর্মির মেজর গুরুং ছিল সিদ্ধহস্ত। আমাদের সাথে যোগ দিত বেনিনের মেজর কুনলে, মালাউই’র লেডি অফিসার ক্যাপ্টেন চ্যাওনাইন। ইন্দোনেশিয়ান এয়ারফোর্সের লেডি অফিসার ক্যাপ্টেন ফালাহ দারতা জারি ভদকা পান করতো না, তবে আড্ডায় নিয়মিত যোগ দিত। এছাড়া পাশের বাংলাদেশী সিওবি থেকে মেজর মামুন মাঝেমাঝে আসতো।
দিমিত্রি আমাকে একদিন বলেছিলেন স্মারনফের ইতিহাস, ১৮৬৪ সালে মস্কোতে পিওটার আর্সেনিয়েভিচ স্মারনফের হাতে ভদকা ডিস্টিলারি প্রতিষ্ঠা এবং তার মৃত্যুর পর তৃতীয় পুত্র ভ্লাদিমিরের হাতে ভদকা কীভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের সময় তারা দেশ ছেড়ে ইস্তাম্বুলে পালিয়ে যান এবং সেখানে কারখানা স্থাপন করেন। চার বছর পর ভ্লাদিমির ইউক্রেনের লভিভ-এ নতুন কারখানা স্থাপন করে ভদকার নতুন নাম দেন ‘স্মারনফ’। এরপর স্মারনফ ভদকা উত্তর আমেরিকা হয়ে পৃথিবীর আরও অনেকদেশে ছড়িয়ে পড়ে। গল্পে গল্পে লে. কর্নেল দিমিত্রি পাত্রুশেভ বলেছিলেন একদম ‘র’ ভদকাকে হ্যামার, টমেটো কেচাপের সাথে মেশালে ব্লাডিমেরী আর আনানাস অথবা অরেঞ্জ জুসের সাথে মেশালে তাকে স্ক্রু ড্রাইভার বলে। স্যারের সাথে আমরা পেগের পর পেগ স্ক্রু ড্রাইভার পান করতাম। উমার ইশারায় কৌতুকভরে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
: চলবে……
: দুঃখিত, হেসে উত্তর দিলাম।
উমার বোতলগুলো জব্দ এবং সিজার লিস্ট তৈরিতে সাহায্য
করলেন। তবে আসল জিনিসটা এখনও খুঁজে পাওয়া গেল না। উমার অস্ত্রের বিষয়ে কিছু জানেন না
জানালেন।
৬
লাইব্রেরীতে ঢুকে আমার চোখে যেন ধাঁধাঁ লেগে গেল! উডেন ফ্লোরের মেঝে থেকে ছাদ অবধি বইয়ের র্যাক, তাতে সারিবদ্ধভাবে গোছানো নানা বিষয়ের বই। বইগুলো নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করা হয় বোঝা যাচ্ছে। জনাব ইকবাল হাসানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঈর্ষা এসে ভর করলো। ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে বইয়ের এরকম সংগ্রহের মালিককে হিংসা না করে পারা যায় না। কয়েকটা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বললাম,
: স্যার, বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ আপনার। কিন্তু অস্ত্র কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?
আমার কথায় তিনি অবাক হবার ভান করলেন।
: আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে। আমরা জানি বিভিন্ন
ক্যালিবার ও টাইপের পিস্তল বা রিভলবার সংগ্রহ করা আপনার শখ। অথচ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা
বা আত্মরক্ষার খাতিরে হলেও আপনি একাধিক পিস্তল কাছে রাখতে পারেন না। এবং সেটা লোকাল
থানার নলেজে থাকবার কথা।
: একসময় শখটা ছিল, অল্পবয়সে মানুষের মনে তো বিভিন্ন
রকম শখ জাগে। সেটাও একরকম তাইই ছিল, বাবা-দাদাকে ছোটবেলা অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে দেখেছি।
তবে এখন ওসব ছেড়ে দিয়েছি।
: আমরা সেটা জানি, সংগ্রহে যা আছে দেখান,
বিরক্তি চেপে কথাটা বললাম। আমরা একরোখা এবং আমাদের অনমনীয় মনোভাব দেখে তিনি একসময় হাল ছেড়ে দিলেন। হয়তো বুঝলেন সুবিধা হবেনা। তাকে বেশিক্ষণ জেরা করতে হয়নি, সম্ভবত সদ্য বিবাহিতা কন্যার হাজবেন্ডের কাছে নিজের সম্মান খোয়াতে চাননি। কয়েক কদম এগিয়ে তিনি একটা নির্দিষ্ট র্যাকে হাত রেখে বিশেষভঙ্গিতে চাপ দিতেই সেটা সরে গেল। এযেন ‘আলীবাবা ও চল্লিশ চোর’ গল্পের খুলে যাও সিমসিম! বইয়ের কাঠের র্যাকের পিছনে ব্ল্যাক মেটালের স্লটওয়াল গন্ডোলা। কুঠুরির মৃদু আলোয় র্যাকে সারবেঁধে রাখা কয়েকটা হার্ড পেপারের বাক্স চোখে পড়লো। পিস্তলের অরিজিনাল বাক্স না, সম্ভবত কোন বিশেষ লিঙ্ককে কাজে লাগিয়ে পিস্তল সংগ্রহ করা হয়েছে। টিমের একজনকে লাইব্রেরীর রিডিং টেবিলে বাক্সগুলো রেখে খুলতে বললাম।
প্রথমেই পেলাম ০৩টা BERSA MODEL 323 পিস্তল। আর্জেন্টাইন .৩২ ক্যালিবারের সেমি-অটোমেটিক পিস্তলটাতে থাম্ব রেস্ট প্লাস্টিক গ্রিপস সুবিধা রয়েছে। ম্যাগাজিনে মোট ০৮ রাউন্ড গুলি ধরে, তবে ওজনে বেশ হালকা। এটারই কয়েকবাক্স গুলি পেলাম। পরের বাক্সে জে.পি. সাউয়ার অ্যান্ড সোহন কোম্পানির তৈরি একটা Sauer 38H পিস্তল পেলাম। জার্মান সশস্ত্র বাহিনী, লুফটওয়াফে এবং পুলিশ বাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পিস্তল ব্যবহার করতো। জার্মানির তৈরি .৩২ ক্যালিবারের এই পিস্তলের ম্যাগাজিনে ০৮ রাউন্ড গুলি ধরে। এরপর জার্মানির তৈরি Walther PPK পিস্তল পেলাম। আমাদের কাছে মূলত এটারই তথ্য ছিল। আনুমানিক একডজন পিস্তলের তথ্য থাকলেও গুনে গুনে মোট ০৮টা পেলাম, যার মধ্যে .৩২ ক্যালিবারের ০৩টা, আর .৩৮ ক্যালিবারের ০৫টা পিস্তল। সবরকম ক্যালিবার ও টাইপের পিস্তল যোগ করে অবশ্য একডজন পুরো হয়েছে! এই যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এতরকম পিস্তলের সংগ্রহ এটা আসলে রিপু তাড়িত একটা শখ। এমন না যে পিস্তল নিয়ে তিনি খুনোখুনি করেছেন বা তিনি অবৈধ অস্ত্রব্যবসার সাথে জড়িত! তিনি যে রিপুর তাড়নায় এই শখটাকে জাগিয়ে রেখেছেন তার নাম আসলে ‘মোহ’, এই মোহ হলো ক্ষমতার মোহ। যা তাকে বেপথে চালিত করেছে।
১৯২৯ সালে জার্মান অস্ত্রনির্মাতা Carl Walther সেমি-অটোমেটিক
ব্লোব্যাক পিস্তল ডিজাইন করে নাম রাখেন Walther Polizeipistole, সংক্ষেপে Walther
PP, ওয়ালথার পুলিশ পিস্তল পৃথিবীর প্রথম সফল ডাবল অ্যাকশন সেমি-অটোমেটিক পিস্তল। এই
পিস্তলের অনেকগুলো ভ্যারিয়েন্ট বা সিরিজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে,
যেমন- Walther PP, PPK, PPK/S, PPK-L, PP Super, PPK/E, L66A1 মডেল। ওয়ালথার পিস্তল
সিরিজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পিস্তল ডিজাইনকে অনুপ্রাণিত করেছে, যারমধ্যে সোভিয়েত
মাকারভ, হাঙ্গেরিয়ান FEG PA-63, পোলিশ P-64, আমেরিকান Accu-Tek AT-380 II, আর্জেন্টিনার
বারসা থান্ডার 380 ইত্যাদি মডেলগুলো রয়েছে। নির্ভরযোগ্য এবং গোপনীয়তার সাথে ব্যবহার
সুবিধার কারণে ইউরোপীয় পুলিশ কিংবা বেসামরিক নাগরিক, উভয়ের কাছে Walther PP কিংবা
Walther PPK সমান জনপ্রিয় বলা হলেও এই সিরিজের সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেল আসলে
Polizeipistole Kriminal, সংক্ষেপে PPK-এর অর্থ ‘পুলিশ পিস্তল অপরাধী’। নাৎসি নেতা
অ্যাডলফ হিটলার বার্লিনের বাঙ্কারে তার কোমরে ঝুলানো Walther PPK দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।
কিম জায়ে-গিউ দক্ষিণ কোরিয়ার নেতা পার্ক চুং হিকে হত্যা করতে .৩৮ ক্যালিবারের
Walther PPK পিস্তল ব্যবহার করেছিলেন। রাজকুমারী অ্যানের ব্যক্তিগত পুলিশ অফিসার জেমস
বিটন রাজকুমারী এবং তার স্বামীকে অপহরণ প্রচেষ্টার সময় Walther PPK ব্যবহার করেছিলেন।
তবে Walther PPK পিস্তলকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা দিয়েছেন জেমস বন্ড স্পাই থ্রিলারের
লেখক ইয়ান ফ্লেমিং। ফ্লেমিং শুরুতে তার উপন্যাসে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট জেমস
বন্ড-এর .২৫ ক্যালিবারের Beretta Model 418 ব্যবহার করার কথা লিখলেও আগ্নেয়াস্ত্র
বিশেষজ্ঞ জিওফ্রে বুথরয়েডের পরামর্শে ১৯৫৮ সালে এই সিরিজের ষষ্ঠ উপন্যাস, ‘Dr.
No’ থেকে Walther PPK ব্যবহারের কথা লিখেন।
৭
টার্গেট মিস করিনি, এক ডজন পিস্তল, ফরেইন কারেন্সি, মদ এবং বিদেশি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে। সাবজেক্ট আমার সাথেই আছেন, কমান্ডিং অফিসারকে ফোন করে সবকিছু জানালাম। শুধুমাত্র সামিয়ার জন্য হালকা চিনচিনে অনুভূতিটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়েই রইলো। তারপর তাকে আর কোনদিন দেখিনি। অথচ তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করতো, এটাকে কি বলে? রিপুর কোন সংজ্ঞায় এই অনুভূতিকে সংজ্ঞায়িত করা যায় জানিনা। আমার কমান্ডিং অফিসার টিমকে কংগ্রাচুলেট করে সাবজেক্টকে টিএফআই-তে পৌঁছে দিতে বললেন। জব্দ করা মালামাল আপাতত ইউনিটে থাকবে, পরবর্তীতে সদর দপ্তর থেকে যেভাবে সিদ্ধান্ত আসে সেভাবেই কাজ করা হবে।
সিজার লিস্টের কাজ শেষে ইকবাল হাসান সাহেবের স্ত্রী, সামিনা হাসান কাগজে স্বাক্ষর করলেন। সবশেষে জনাব ইকবাল হাসানকে বললাম,
: আপনাকে অস্ত্র এবং মাদক আইনে গ্রেফতার করা হলো। আমাদের সাথে যেতে হবে।
তার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে এদিকে ওদিকে তাকালাম কিন্তু সামিয়া হাসানকে খুঁজে পেলাম না। বের হবার সময় ইকবাল সাহেব লাইব্রেরীর র্যাক থেকে একটা বই নিতে চেয়েছিলেন। অনুমতি দিয়ে ব্যক্তিগত আগ্রহে তার সাথে লাইব্রেরীতে গেলাম। একজন ভারতীয় লেখকের একটা বই হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলেন। বইয়ের ঝকঝকে তাক থেকে অন্য একটা বই নামিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
: ঐ বইটা সাথে নিলে তো আমাকে ভারতের দালাল ভাবতেন।
উত্তরে কিছু বললাম না। চুপচাপ ওনাকে সাথে নিয়ে দোতলা থেকে নামলাম। মিনিংলেস কথার উত্তর থাকে না। আমি ভাবছি অন্যকথা, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমাকে এখানে আসতে হয়েছিল তাতে আমি সফল। কিন্তু এইমুহুর্তে আমার মনের ভিতরে যে ‘রিপু’ খেলা করছে তার নাম ‘কাম’। ষড়রিপু’র প্রথম রিপুটা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তার একমাত্র কারণ গাঢ় সবুজ পিগমেন্টের একটা ট্যাটু। গাড়ি নিচের পোর্চে অপেক্ষা করছে, ইকবাল হাসান সাহেবকে ব্লাইন্ড ফোল্ড করে নিশান পেট্রোলের মাঝের সীটে বসানো হলো, বামে আমি আর ডানদিকে অন্য আরেকজন অফিসার। বের হবার সময় সামিয়া হাসানের দেখা না পেলেও আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে এইমুহুর্তে তিনি দোতলা’র জানালার শার্শি ঠেলে তাকিয়ে আছেন। তার অগ্নিদৃষ্টি আমাকে চিতাভস্ম করে দিচ্ছে জানি, অথচ আমাদের আর দেখা হলো না। কুয়াশার চাদর ভেদ করে আমাদের গাড়ি ছুটে যাচ্ছে উত্তরার দিকে। আমি জানি টিএফআই-তে জনাব ইকবাল হাসানকে হ্যান্ড ওভার করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু মাথার ভিতরে যে স্মৃতিবহন করে যাচ্ছি তা থেকে আমার মুক্তি নেই। আমি জানি সবুজ পিগমেন্টের প্রজাপতি ট্যাটু আমাকে সারাটা জীবন জ্বালাবে।
পোস্ট ভিউঃ 10