১
নাজমা বোর্ডিং হাউজ,
দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।
সময়টা সন্ধ্যার পরপর।
বাইরে বেশ ঝড়-বৃষ্টি চলছে।
এরমাঝেই, ঝুপ। একটু পরে আবারো,
ঝুপ।
ভোঁতা শব্দ দু'টো যখন ইথারে ভেসে এলো নাজমা বোর্ডিং হাউজের ক্যাশিয়ার অনিল দাস তখন রিসিপশনে
বসে দিনের হিসেব মেলাতে ব্যস্ত।
তিনি চেয়ার থেকে সামান্য হেলে উঁকি দিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালেন
কিন্তু কিছু চোখে পড়লো না।
বিরক্ত হয়ে ফ্লোর বয়কে ডাকলেন,
- শামসুজ্জামান, এই ব্যাটা শামসুজ্জামান। ওপরে কিসের শব্দ হল? সুধীর
......দেখত...
কি ব্যাপার!
দু’টার একটাও সাড়া দিচ্ছেনা। বদমাশ দুটো গেল কোথায়?
এখন বোধহয় সুধীরের ডিউটি না। তাহলে শামসুজ্জামান হতচ্ছাড়াটা যে কোথায় গেল!
এই বৃষ্টির মাঝে তাকে কেউ বাইরে পাঠালো নাকি! অনেক সময় বোর্ডাররা রাতে-বিরাতে সিগারেট বা ওষুধ
আনতে হলে ছেলেদেরকে বাইরে পাঠায় অবশ্য, কিন্তু তাই বলে এই
ঝড়ের রাতে! এসব ভাবতে ভাবতে অনিল বাবু হাতের কাজটা ফেলে উঠে
দাঁড়ান। কলম
গড়িয়ে টেবিলের নীচে পড়ে যায় কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না। ঠিক এমন সময় কোথাও বাজ পড়ার
শব্দের সাথেসাথেই কারেন্ট চলে গেলে তিনি রাগে গজগজ করতে থাকেন,
বিরক্ত হয়ে অন্ধকার হাতরে টেবিলের ড্রয়ার থেকে টর্চ লাইট বের করে
সিঁড়ির দিকে এগোন।
সম্ভবত অনিল বাবুর পায়ের শব্দ পেয়ে বোর্ডিং
হাউজের কেউ একজন রুমের দরজা খুলে বাইরে বের হলেন, মোমবাতি চাইলেন তার কাছে। অনিল বাবু বিরক্তবোধ করলেও ক্লায়েন্টের কাছে ধরা দেননা,
তিনি রিসিপশন কাউন্টারে ফিরে যেয়ে আলমারির তা’কে সাজানো মোমবাতির প্যাকেট থেকে দু’টা মোমবাতি
এনে ভদ্রলোকের হাতে দিলেন।
ভদ্রলোক এরইমধ্যে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছেন। সিগারেটের লাল আলোয় তার
আবছায়া মুখ রহস্যময় লাগছে।
তিনি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন,
- দাদা, একটু দেখুন
তো, ওদিকটায় কিসের যেন শব্দ শুনলাম। যা বৃষ্টি,
আর যেভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ভালোভাবে কিছুই
বোঝা যাচ্ছে না।
কথাগুলো বলে লোকটা অবশ্য দাঁড়ালেন না। নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে
দিলেন। অনিল
বাবু টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে সামনে এগোন।
শামসুজ্জামান এই বোর্ডিং হাউজের তিনজন
ফ্লোর বয়ের একজন। কিন্তু
অনিল দাসের কথায় কেউ সাড়া দিলো না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষা করে আবার ক্যাশে ফিরে গিয়ে ভাবলেন
ওটা সম্ভবত বিড়ালের লাফিয়ে পড়ার শব্দ।
ইঁদুরের যা উৎপাত বেড়েছে আজকাল!
সারাদিন এখানে সেখানে ইঁদুর আর বিড়ালের ছোটাছুটি চলতেই থাকে,
এক মুহুর্তও শান্তিতে থাকবার জো নেই। তিনি ফতুয়ার কোণায় চশমার পুরু লেন্স ঘষে আবারো হিসেবের খাতায়
মনযোগ দিতে চেষ্টা করেন।
কিন্তু কাজে মন বসেনা, সুরটা কেটে গেছে যেন।
ডেস্কের এক কোণায় পড়ে থাকা সিগারেটের
প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুণ ধরাতে না ধরাতেই একজন আগন্তক ভেজা কাপড়
থেকে বৃষ্টির ছাঁট ঝারতে ঝারতে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকেন। কয়েকদিন ধরে কীযে বৃষ্টি শুরু হয়েছে!
পৌষ মাসের ভরা শীতের মধ্যেও তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। কে যেন বললো সমুদ্রে নিম্নচাপের
কারণে অসময়ের এই ঝড়-বৃষ্টি। পশ্চিমবঙ্গের দিকে প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে,
আমাদের সাতক্ষীরা-বরিশালের দিকেও। তিনি জানালার পর্দা সরিয়ে
বাইরে তাকান, বৃষ্টির কারণে যতটা না রাত হয়েছে তার
চেয়ে বেশী গভীর দেখাচ্ছে।
এমনিতেই শীতের রাত, কুয়াশার
কারণে ঘন অন্ধকারে কিছুই দেখা যায়না। কখন যে কারেন্ট আসবে কে জানে!
জেনারেটরটা কয়েকদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে, কতবার মালিককে বলেছেন কিন্তু তিনি যেন গায়ে মাখছেন না। আসলে বোর্ডারদের কটু কথা
তো তাকে শুনতে হয়না, ঝড়-ঝাপটা যা
যাবার সব তার ওপর দিয়েই যায়।
প্রায় ১৪/১৫ বছর
ধরে এখানে চাকুরী করে কেমন মায়ায় জড়িয়ে গেছেন। ভালো কোথাও চাকুরী জুটিয়ে যে চলে যাবেন সে ইচ্ছেও করেনা,
তাছাড়া অনেক বয়সও হয়ে গেছে। এ হল বটবৃক্ষের জীবন, শেকড়-বাকল ছড়িয়ে এমন অবস্থা যে এই বয়সে আসলে নতুন করে আর কিছু শুরু করতে ইচ্ছে
করেনা।
একটু পরপর মেঘের গুরগুর ডাকের সঙ্গে
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তিনি
ভাবলেন কিছুক্ষণ আগে শোনা শব্দটা মেঘের ডাকও হতে পারে। এসব নয়-ছয় ভাবতে ভাবতেই তিনি
আগন্তকের দিকে তাকান।
নাহ্, নতুন কেউ না। দোতলার ২০৭ নাম্বার রুমের
বোর্ডার, সন্ধ্যের আগেআগে বোর্ডিং হাউজে এসে উঠেছেন। খাতায় তো নাম লিখেছেন জসিম
আখতার, আসলে যে কে সেটা কেইবা জানে! কম তো দেখলেন না, কতো কিসিমের লোকের যে আনাগোনা
এই বোর্ডিং হাউজে! ২ ঘণ্টা/৩ ঘণ্টা
থেকে শুরু করে ২/৩ সপ্তাহও থাকে কেউ কেউ। এলাকাটার ব্যবসা কেন্দ্র
হিসেবে বেশ নামডাক আছে, তাই যার যেরকম ধান্দা আর কি! ইনি যে কত দিন থাকবেন কে জানে! গেস্ট রেজিস্টারে
নাম-ঠিকানা এসব টুকতে টুকতে অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলেন,
তিনি পরে জানাবেন বলেছিলেন। অবশ্য মালিকের পরিচিত যে ব্যক্তির মাধ্যমে রুম দু’টা বুক করা হয়েছে তিনি এক মাসের কথাই বলেছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলেন
কিন্তু দেখাতে পারেনি, সাথে নেই বলে প্রসঙ্গের ইতি টেনেছিলেন। অনিল বাবু অভ্যেসবশত রেজিস্টারের
পাতায় লেখা নামটা মিলিয়ে নেন।
এই বোর্ডিং হাউজের এটাই নিয়ম,
প্রতিবারই নামধাম নিশ্চিত করেই তবে রুমের চাবিটা হাতে দেয়া হয়। বোর্ডাররা এতে বিরক্ত হলেও
তার কিছুই করার নেই, লোকাল থানার নির্দেশ। ব্যবসা চালাতে হলে তাদের
বেঁধে দেয়া নিয়ম মানতেই হবে।
কিন্তু তার সাথে তো আরেকজন থাকবার কথা,
ওনারা দুজন এসেছিলেন। ২০৭ আর ২১৭ নাম্বার, মুখোমুখি
রুম দু’টা তাদের জন্য বুক করা ছিল। তিনি গলা পরিষ্কার করে জানতে
চান,
-কি ব্যাপার দাদা, আপনি একা যে! আপনার বন্ধু কই?
জসিম সাহেব অর্থাৎ নসু ওরফে পাঙ্খা নসু
উত্তর দিতে আগ্রহ বোধ করে না, রিসিপশন ডেস্কে হাত
বাড়িয়ে চাবিটা নিয়ে একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। নাজমা বোর্ডিং হাউজে শুধু
থাকবার ব্যবস্থা আছে।
খাবার-দাবার বোর্ডারদের
বাইরে থেকেই আনাতে হয় অথবা নিজেদেরই আশেপাশে কোথাও থেকে সেরে আসতে হয়। ফ্লোর বয়দের বললে তারা অবশ্য
পাশের নুরানি হোটেল থেকে ভাত-মাছ যা লাগে এনে দেয়,
হোটেলের সাথে একটা অলিখিত সমঝোতা করা আছে এবং সে অনুযায়ী তারা রুম
সার্ভিস দিয়ে থাকে। বোর্ডাররাও কেউ আজ পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় কখনও অভিযোগ করেনি,
তাই মালিকের বাপ-দাদার আমলের ব্যবসা আজো একই নিয়মে চলছে।
২
দোতলার করিডর।
নাজমা বোর্ডিং হাউজ,
দারিয়াকান্দি রোড, কুলিয়ারচর।
সারাদিনের ধকল আর টেনশনের পরে পেটে দু’মুঠো খাবার ঢোকায় নসু এখন একটু স্বস্তিবোধ করে। বোর্ডিং হাউজে ঢোকার মুখে
যে ছাপরা রেস্তোরাঁটা আছে সেখান থেকে কড়া লিকারের এক কাপ চা মেরে দেয়ার ফলে শরীরের
ঝিমলাগা ভাবটা বেশ কেটে গেছে, মামুনটা এলে পারত। ওর নাকি অত্যধিক টেনশনের
কারণে খিদে উবে গেছে, এমুহুর্তে গোসল সেড়ে একটা ঘুম বড় বেশী
প্রয়োজন। নসু
খামাখা জোর-জবরদস্তি না করে নিজের পেটটা ভরাতে যায়। মনের মাঝে একটা হালকা স্বস্তি
ভাব থাকলেও রিসিপশনের লোকটার অযথা কৌতূহলে নসু বেশ বিরক্ত বোধ করে। এমনিতেই বোর্ডিং হাউজে খাবারের
ব্যবস্থা নেই জেনে তার মেজাজটা তেতে ছিল। তার মতে এধরণের গায়ে পড়া বা তেলতেলে স্বভাবের লোকগুলো একটু
ঘাঘু টাইপের হয়ে থাকে, সে এদের দু’চোখে
দেখতে পারে না।
সেজন্যই লোকটার প্রশ্নে সে উত্তর দেবার তাগিদও অনুভব করে
না।
বুকিং থাকা সত্ত্বেও লোকটা এটা সেটা
প্রশ্ন, জাতীয় পরিচয় পত্র এসব চেয়ে একটু ঝামেলায়
ফেলার চেষ্টা করেছিল।
ডিবি’র টিকটিকি বোধহয়। মাথায় এক তাড়া বিপদ নিয়ে
ঘুরছে বলে নসু তাকে কিছু বলেনি।
অন্য সময় হলে এতোক্ষণে তার কপালে খারাপ কিছু ঘটত। এর আগে এরচেয়ে অল্পতেও সে
অনেকের ডেডবডি ফেলে দিয়েছিল। তার রাগচটা বা খুনে স্বভাবটা দলের কমবেশী সবাই জানে। স্বভাবে ওয়েস্টার্ণ সিনেমার আউট ল'দের মত ট্রিগার হ্যাপি বলে নসুর অযথা কথা বলতে ভালো লাগেনা। অনিল বাবু’র দিকে তাকিয়ে সামান্য চোখ পাকাতেই তিনি যেন শামুকের মত গুঁটিয়ে যান। দ্বিতীয় প্রশ্নটি করার সাহস
পাননি। আজ
সকালেই সাভারে এত বড় একটা ঘটনার জন্ম দিলেও নসু কেন জানেনা একটু ভারমুক্ত বোধ করে। নিজের এরকম কঠিন স্বভাবের
কারণে সে নিজেও মাঝে মাঝে বেশ অবাক হয়।
তবে এটা সে ভালো করেই জানে যে, এর সবটাই হয়েছে তার
শক্ত-পোক্ত ট্রেনিং-এর কারণে। কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডে
ফেরারি জীবন কাটানর সময় দাশু মাস্তান তাকে নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন। দোতলার করিডরে শিস্
দিতে দিতে নসু নিজের রুমের দিকে এগোয়। শিস্
এর এই সুরটা তার খুব প্রিয়, মন ফুরফুরে থাকলে
সে প্রায়ই সুরটা তোলে, ফ্লো-রিডা হুইসেল-
Can you blow my whistle baby, whistle baby
Let me know
Girl I'm gonna show you how to do it
And we start real slow
কলকাতায় দাশু মাস্তানের হয়ে কাজ করার
সময় দলের একটা ছেলের কাছ থেকে এই সুরটা শিখেছিল। একসময় সেও সুরটা রপ্ত করে ফেলে। রূপনগর বস্তির ঝুপড়িতে বেড়ে উঠলেও ছেলেটার কাছ থেকে অল্প-বিস্তর বাংলা-ইংরেজি লেখাপড়া শিখে নসু নিজেকে বদলে
ফেলেছে। কিছু
শেখার বা জানার প্রবল আগ্রহ থেকেই নসু আজ তাদের দলের সবার থেকে একদম আলাদা। আচ্ছা,
কি যেন নাম ছেলেটার! সুদীপ্ত না সুখদেব!
অনেকদিন হল, ভুলে গেছে অনেক কিছু। এদিকের পরিস্থিতি একটু ঠাণ্ডা
হলে তার কলকাতায় যাবার কথা, দর্শনার উথুলি সীমান্তে সেভাবেই প্রস্তুতি
নেয়া আছে। তবে
এবার গেলে ছেলেটাকে খুঁজবে, রোগা লিকলিকে চেহারায় একমাথা চুল,
দার্জিলিং-এর কোন এক কনভেন্টে পড়ত। কি একটা অপরাধ করে সেখান
থেকে পালিয়ে এসে দাশু মাস্তানের দলে যোগ দিয়েছিল। মাঝে মাঝে গিটার বাজিয়ে কি সুন্দর দারুণ গান গাইত!
এলোমেলো কীসব ভাবতে ভাবতে রুমের সামনে
পৌঁছেই তাকে থমকে দাঁড়াতে হয়।
কিছু একটা অস্বাভাবিক লাগছে,
সে চারদিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় কিন্তু সমস্যাটা ঠিক ধরতে পারেনা। বৃষ্টির কারণে বাতাসটাও
বেশ ভারী, আর তাতে হালকা বারুদের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে
যেন! নাকি সকালের ওরকম ফায়ারিং-এর পরথেকে তার ঘ্রাণ শক্তি লোপ পেয়ে গেছে কে যানে! তবে সে খেয়াল করে তার রুমের বিপরীত দিকে অর্থাৎ ২১৭ নাম্বার রুমের দরজার
পাল্লা আধেকটা খোলা।
কি ব্যাপার হোয়াইট মামুন কোথায় গেল?
তার তো এভাবে দরজা মেলে রেখে কোথাও যাবার কথা না! নসুর কপালে চিন্তার রেখা হালকা ভাঁজ তুলেই মিলিয়ে যায়। সে জানে মামুন আর সবার মত
না, সে খুবই সতর্ক টাইপের ছেলে। নসু দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে
ঢুকতে চায়, কিন্তু বাথরুম থেকে শাওয়ারের পানির ফোঁটার
শব্দ ভেসে এলে সে ঘুরে দাঁড়ায়।
এখনো গোসল করছে! সে অবাক
হয়, কিন্তু মুখে কিছু বলেনা। কবে যে ছেলেটার আক্কেল জ্ঞান হবে,
নসু আপন মনে ভাবতে ভাবতে নিজের রুমের দিকে ফেরে।
৩
রুম নাম্বার-
২১০, নাজমা বোর্ডিং হাউজ।
দারিয়াকান্দি রোড,
কুলিয়ারচর।
নসু একটু কৌতূহলী হয়ে ২১৭ নাম্বার রুমের
বাথরুমে ঢুকলে দেখতে পেত কমোডের পাশে একটা লাশ বেকায়দা ভঙ্গীতে পড়ে আছে। লাশটা ফ্লোর বয় শামসুজ্জামানের। জিহ্বাটা সামান্য বেড়িয়ে
আছে, গলায় নায়লনের কর্ডের গভীর দাগ। তার বিস্ফোরিত দু’চোখে তখনো আতঙ্ক ভিড় করে আছে। পেশাদার হাতের কাজ, চোখ
বুঁজেই বলে দেয়া যায়।
নসু ফ্লোর বয়ের লাশটা ওভাবে পড়ে থাকতে দেখলে নিজেকে অন্তত
সতর্ক করতে পারত। কিন্তু
তার দুর্ভাগ্য যেন তাকে তাড়া করে ফেরে তাই
হয়ত সে নিজের রুমের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
হালকা মুডে দরজায় চাবি ঘোরাতে যেয়ে সে ওভাবেই যেন হঠাৎ একদম
স্থির হয়ে যায়। করোটির
পিছনে সে ধাতব একটা কিছুর ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করে। লোকটা ওভাবেই তাকে ফ্রিস্কিং করে,
কোমরে গুঁজে রাখা ৭.৬৫ মি.মি. ক্যালিবারের সেমি-অটোমেটিক বেরেতা পিস্তলটা নিজের দখলে নেয়। জিন্সের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে ঘরের এক কোণে
ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তবে তাড়াহুড়োর কারণে দ্বিতীয় ফোনটা চোরাই পকেটে রয়েই যায়, নসু তবুও
সে মুহুর্তে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করে।
অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝতে পারে তার করোটিতে ঠেকানো
জিনিসটা আসলে কি। নিজেরাই
তো কত বার একইভাবে অপারেশন করেছে।
এতদিন সে ছিল শিকারি, আর আজ
সে নিজেই যেন কারো শিকার।
ধাতব বস্তুটির মালিক তাকে আলতো ভাবে রুমের ভেতরের দিকে ঠেলে
দেয়। দরজাটা
সম্ভবত খোলাই ছিল। সামান্য
ধাক্কায় পাল্লাটা সরে গেলে ঘরের ভেতরের উজ্জ্বল আলোয় যে দৃশ্যটা দেখতে পায় তার জন্য
সে আসলে প্রস্তুত ছিলনা।
হোয়াইট মামুনের নিথর দেহটা সোফার ওপরে
হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। খালি শরীর,
কোমরে সাদা তোয়ালে প্যাঁচানো। ওর বাম হাতের বাহুতে আঁকা মারমেইড ট্যাটুতে টিউবলাইটের আলো
রিফ্লেক্ট করায় জ্বলজ্বল করছে।
রক্তে ভেজা সোফার কুশনটা মেঝেয় পড়ে আছে,
তার প্রান্ত ছুঁয়ে রক্তের একটা ক্ষীণ ধারা ঘরের এক কোণে সরে গেছে,
সম্ভবত তার ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তবে তার চোখের জমাট দৃষ্টি
সিলিঙ-এ বিঁধে আছে যেন। অবস্থাদৃষ্টে মনেহচ্ছে ঘটনাটা
খুব বেশী আগে ঘটেনি, হয়ত সে যখন রেস্তোরাঁর পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের
কাপে চুমুক দিচ্ছিল তখন, কিংবা যখন সে রিসিপশন ডেস্কের সামনে
দাঁড়িয়ে কথা বলছিল তখন।
সে চোখের কোণা দিয়ে আসেপাশে দেখার চেষ্টা করে। সে জানেনা কিলিং মিশনে তারা
কত জন এসেছে। সে
শুধু জানে আততায়ী একজন হয়ে থাকলে সে সম্ভবত সামলাতে পারবে। হয়ত সে কারণেই তার শরীরের পেশীগুলো শক্ত হতে চায় কিন্তু আততায়ী
তা যেন বুঝতে পেরে সামান্য পিছিয়ে আসে।
সে ফিসফিস করে বলে,
- কোন লাভ নেই, ডার্লিং।
একটা ফিচেল হাসি দিয়ে সে ফিসফিস করে
আবৃত্তি করে,
"I was born with the devil in me."
These people search for me, sleeping within my
chambers
The look of terror
Horror is defined by my legacy
Nothing is more entertaining than a good murder
"I was born with the devil in me."
নসুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে যেন, সে নির্ঘাত ঠাণ্ডা মাথার
কোন পেশাদার খুনির কবলে পড়েছে।
প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে তার মুখটা দেখতে পারছে না। তবে আততায়ীর চোখে মুখে এমুহুর্তে
যে রক্তের নেশা লেগে আছে তা বেশ অনুভব করতে পারছে। এরকম টানটান উত্তেজনার মুহুর্তে যে ঠাণ্ডা মাথায় কবিতা আবৃত্তি
করতে পারে, সে আর যাই হোক কোন সাধারণ খুনি নয়। নসু ভেবে পায়না,
কে তাকে পাঠিয়েছে! এই জীবনে কত জনের হয়ে
যে কত রকম কাজ করে দিয়েছে! কলকাতাতেও তো কত কিছু করেছে,
কিন্তু এই টাইপের কিলারের সাথে তার কখনো পরিচয় ঘটেনি। সে জানে অন্ধকার জগতের কেউই
তাকে এভাবে হত্যা করার সাহস করবে না, এমনকি
কোটি টাকা দিলেও না।
তার নিজের দলের বা প্রতিপক্ষ দলের কারো কলিজায় সেরকম সাহস
নেই। এই
লোকটা কালাবাবু'র দলের কেউ হতে পারেনা, ওদের অনেককেই সে কমবেশি চিনে। তারাও নসুর ক্ষিপ্রতা এবং নৃশংসতার ধরণ সম্পর্কে জানে,
এজন্যই আড়ালে-আবডালে অনেকে তাকে চিতা,
আবার কেউকেউ তাকে কসাই বলেও ডাকে। আপনমনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,
- দশ পেটি।
- হুম! কি?
আততায়ী কানের পাশে বাঁ হাতটি রেখে নসুর
কথাগুলো শোনার ভঙ্গী করে।
নসু আবারো উচ্চারণ করে,
- যেই হানে পৌঁছান লাগবো কইবি, পায়া যাবি।
- উঁহু, মাত্র
দশ লাখ! আমি তো আরও ভালো অফার পেয়েছি ডার্লিং!
হেঁয়ালি করে কথাগুলো বলেই সে হাসতে থাকে,
এবং আবারও বিরক্তিকর আবৃত্তি,
A cellar filled with the fragrance of bodies
So much creativity when I hold a cadaver
The look of terror
I live for a true scream of agony
Blood stains my fingers
"I was born with the devil in me."
আততায়ীর উত্তর শুনে নসু ভাবে,
ঠিকভাবে আলাপচারিতা চালানো গেলে একটা রফায় হয়ত পৌঁছানো সম্ভব হতে
পারে। সেক্ষেত্রে
টাকার অঙ্কটা যে তাকে খুন করতে পাঠিয়েছে তার চেয়ে অবশ্যই বেশী হতে হবে,
কিন্তু অঙ্কটা কত হতে পারে সে ভেবে পায়না। তবু কথার সূত্র যেন ছিন্ন
না হয় অথবা একটা কিছু বলার জন্যই হয়ত সে সাহস করে বলে ফেলে,
- এক খোখা। চলবো?
হিন্দি ক্রাইম বা থ্রিলার মুভির মাধ্যমে
মুম্বাই আন্ডার ওয়ার্ল্ড এ ব্যবহৃত কিছু কিছু শব্দ বা ডায়ালগ,
খিস্তি-খেউড় এদিকেও চলে এসেছে। পেটি,
খোখা এসব মূলত মারাঠি শব্দ, এক পেটি মানে
এক লাখ এবং এক খোখা মানে এক কোটি। নসু এক কোটি টাকার কথা বলে বটে,
তবে সে জানে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে সুদে-আসলে টাকাটা উসুল করে নেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে টাকার অঙ্কটা শুনে আততায়ী
একটু মজা পায় যেন। সম্ভবত
আরেকটু মজা করার জন্য আততায়ী নসুকে ঘরের এক কোণে ঠেলে দিয়ে নিজে একটা চেয়ার টেনে বসে। সে নসুকে হাত দুটো মাথার
ওপরে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে বলে।
ইঁদুর-বিড়াল খেলতে তার বেশ
ভালো লাগছে। নসু
ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায় এবং ঘাতককে চিনতে চেষ্টা করে। না, এই লাইনে সে সম্ভবত
নতুন। সে
একে এর আগে কখনো দেখেনি।
৪
বালাক্লাভা’র আড়ালে।
রুম নাম্বার-
২১০, নাজমা বোর্ডিং
হাউজ।
ছাই রঙের বালাক্লাভার আড়ালে আততায়ীর
চোখের শীতল দৃষ্টি এবং নিকোটিনে ঝলসানো ঠোঁট জোড়া ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছেনা। তার পরনে ধূসর রঙের জিন্স
আর কালো হুডি। তার
পায়ে বাদামী রঙের লোফার এবং হাতের কালো লেদার গল্ভসে একটা পিস্তল মুঠোবন্দী। সে মাথার
ওপর থেকে হুডিটা সরিয়ে বালাক্লাভাটা খুলে এক পাশে রাখে। এইমুহুর্তে তাকে বেশ
আত্মবিশ্বাসী বলে মনেহয়, তা না হলে তার এরকম করার কথা না। তবে আততায়ী বেশ মার্জিত
এবং পেটানো চেহারার। অনেকটা সামরিক ধাঁচের, চুলও
সেভাবেই ছাঁটা। নিয়মিত জিম করে, দেখলেই বোঝা যায়। নসু তার
শারীরিক শক্তি সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারে।
তার হাতের পিস্তলটা সম্ভবত পয়েন্ট
৩২ ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে, জার্মানির তৈরি সেমি অটোমেটিক পিস্তল। জেমস বন্ড
ব্যবহার করে থাকে। একসময় এরকম একটা পিস্তল জোগাড় করার জন্য সে খুব চেষ্টা করেছিল,
পারেনি। আলাপচারিতার সুযোগ পেয়ে নসু যেন আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়,
সে জিজ্ঞেস করে,
- তুই ক্যাঠা?
আততায়ী হাসে,
তার সাদা রঙের দাঁতগুলো ভেসে ওঠে। বলে,
- জুলিও সান্তানা, তোর মৃত্যুদূত।
নসু আততায়ীর হেঁয়ালিপনা গায়ে মাখেনা,
কারণ সময়টা আসলে তার প্রতিকূলে। তার মাথার ভেতরে প্রতি সেকেন্ডে একশোটা প্ল্যান উঁকিঝুঁকি
মারছে, কিন্তু কোন ধরণের সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। একই সাথে ঝুঁকি নেয়ার ইচ্ছা,
কিংবা অনিচ্ছা, মুক্তি, মুক্তির পরের জীবন, এমনকি অতীতের ফেলে
আসা দিনগুলো মাথার ভেতরে সেলুলয়েডের ফিতের মত ঘুরছে, ক্লোজ
শট থেকে লং শট, রঙিন থেকে সাদাকালো, সে যেন দিব্যদৃষ্টিতে সব দেখতে পায়। একে একে বিগত দিনের সব স্মৃতি চোখের সামনে এসে ভিড় করে। ছোটবেলা। ভাইবোনদের সাথে একসঙ্গে
রূপনগর বস্তিতে বেড়ে ওঠা।
এটাসেটা চুরি করে ডাণ্ডির নেশা করা,
তারপর একেএকে সব কিছু। বাবার কথা মনেপড়ে খুব। তৃপ্তি পায় নিজ হাতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পেরেছে বলে। খুব নিষ্ঠুর ভাবে প্রতিশোধটা
নিয়েছিল, যেমনটা চেয়েছিল। নসু তার মনের সব ঝাল মিটিয়ে
ছিল আজগরের মৃতদেহের ওপরে।
মনেপড়ে মায়ের কথা। তার মা জুলেখা বেওয়া কি কখনও জানতে পারবে বা খুঁজে পাবে কি
তার মৃতদেহ? সে নিজেও তো জানেনা তার মৃতদেহ নিয়ে এরা
কি করবে! লাশটা কি এখানেই ফেলে যাবে! নাকি নদীতে ভাসিয়ে দিবে! মা এখন কি করছেন তাও নসুর
খুব জানতে ইচ্ছে করে।
তাকে মাস শেষে এখন কে টাকা পাঠাবে?
মা হয়তো মাস শেষে ঠিকই তার পাঠানো টাকার অপেক্ষায় বসে থাকবেন। তারপর অপেক্ষা করতে করতে
একদিন হয়ত জানতে পারবেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই। তখন কি তিনি কাঁদবেন ছেলের
জন্য? তার মনেপড়ে হেনার সাথে সব স্মৃতি। প্রথম পরিচয়,
তারপর তার সাথে প্রেম আর সবশেষে তার সাথে হেনার বিশ্বাসঘাতকতা। হেনা'র শেষ কথাটা শোনা হয়নি, মেয়েটা কী যেন বলতে চেয়েছিল!
মনেপড়ে যায় টুকরো টুকরো সব কথা, অগুনতি স্মৃতি।
মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আততায়ীর সাথে
কথা চালিয়ে যেতে যেতে একটা কিছু করার জন্য সে
প্ল্যান আঁটে। নসু মাথা ঠাণ্ডা রেখে অনুত্তেজিত স্বরে আততায়ীকে জিজ্ঞেস
করে,
- তুই কইত্থন! কেঠায় পাঠাইছে?
- তোর বাপ্।
উত্তর দিয়েই সে হাসতে থাকে,
এবং আবারো নিচু স্বরে আবৃত্তি,
You have never experienced beauty until holding a body
cavity
The apartments remain open so you may enter
The look of terror
কবিতার একটি শব্দও তার মাথায় আর ঢোকে
না। নসুর
মাথায় এমুহুর্তে বরং খুন চেপে বসে।
দলের সবাই জানে, বাবা’কে নিয়ে কিছু বললে সে স্থির থাকতে পারেনা। দলের সবাই জানে আজগরকে সে কিরকম নিষ্ঠুরভাবে খুন করে পিতৃহত্যার
প্রতিশোধ নিয়েছিল।
৫
বৃষ্টির আঁধারে।
নাজমা বোর্ডিং হাউজ।
বাবা'র নাম তুলে গালি, শুধুমাত্র একটি কথার কারণে মুহুর্তেই
নসুর সমস্ত হিসেব ওলট-পালট হয়ে যায়। সে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিয়ে
ডান দিকে তাকায়, কিন্তু বাম দিকে লাফিয়ে খাটের আড়ালে যেতে
চায়। তবে
আততায়ীকে সে বিভ্রান্ত করতে পারেনা। ওরকম ভাবে বসে থাকা অবস্থাতেও সে যেন ধুর্ত হায়েনার মত তৈরিই
ছিল। সে
হয়তো জানত এরকমই কিছু একটা ঘটবে।
তাই চোখের পলকেই কালো লেদার গ্লভসের মাঝে ধরে থাকা ৩২
ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে পিস্তল থেকে আচমকাই ক্লিক করে ছোট একটা শব্দ হয়,
পিস্তলের ফায়ারিং পিন কার্টিজের প্রাইমারে আঘাত করে। তামার তৈরি খালি কার্টিজ
কেস তপ্ত শরীর নিয়ে নিচে খসে পড়ে, মেঝের টাইলসে হালকা
টুংটাং শব্দ হয়।
প্রায় সাথে সাথেই নসুও ঢলে পড়ে মসৃণ মেঝের ওপর। বুলেট বা প্রজেক্টাইল ওর
করোটি ছুঁয়ে পাশের দেয়ালে বিঁধেছে।
ঝুরঝুর করে খসে পড়ে পলেস্তরার প্রলেপ। পাঙ্খা নসুর আত্মা পাঙ্খা
হয়ে ততক্ষণে কোথায় উড়ে যায়, কেউ জানেনা।
টাইলসের মসৃণ মেঝে বলেই হয়ত রক্তের ধারা
দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারদিকে।
একসময় মামুনের রক্তের ধারার সাথে মিশে যায় নসুর রক্তের প্রলেপ। আততায়ী হাটু মুড়ে বসে শিল্পীর দৃষ্টিতে সেদিকে কিছুক্ষণ
তাকিয়ে থাকে। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে
সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবং বিরক্তিকর সেই কবিতাটা আবারও শুরু করে,
ইংরেজি সাহিত্যে এধরণের কবিতাকে ডার্ক কবিতা বলে। এমিলি ডিকিনসন,
রবার্ট ফ্রস্ট, এলিয়ট, বায়রনের মতো কবিরা প্রচুর ডার্ক কবিতা লিখেছেন। মূলত জীবনের অন্ধকার
দিক, যেমন-মৃত্যু, যন্ত্রণা, কষ্ট, বেদনা এসব উপজীব্য করে এধরণের কবিতা লেখা হয়ে
থাকে।
I never acted on insanity
You decide the number of people I slaughtered
ভারী স্বরে উচ্চারণ করা কবিতার শেষ লাইনটুকু
নসু সম্ভবত শুনতে পারেনা, তার শুন্য দৃষ্টি তখন অসীম শুন্যতার দিকে। হঠাৎ হাত-পা টানটান করে নসু মরিয়া হয়ে শেষবারের মত দাঁড়াতে বা কিছু একটা আঁকরে ধরার
চেষ্টা করে যেন।
আততায়ী মেঝেয় পড়ে থাকা প্রায় নিথর শরীরের কাছে যায়,
নসুর চোখের কোণে তখন জমাট অশ্রু। এক ফোঁটা হঠাৎ গড়িয়ে পড়ে। আততায়ী কিছুক্ষণ নসুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে,
এরপর সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ধাতব মাজলটা ঘাড়ের কাছে নিয়ে ট্রিগারে
চাপ দেয়। ভোঁতা শব্দে আরেক রাউন্ড
ফায়ার। নসু
স্তব্ধ হয়ে যায়, ঢাকার অন্ধকার জগতে সে এখন ছাই চাপা ইতিহাস।
"I was born with the devil in me."
The look of terror ।
কবিতার শেষ লাইন দু'টো ভাবতে ভাবতে আততায়ী ঘরে এদিকে সেদিকে তাকায়, সে আসলে নিশ্চিত হতে চায়, কোথাও কোন চিহ্ন রেখে
গেল কিনা! ঘরের পশ্চিম কোণে পড়ে থাকা নসুর মোবাইল ফোনটা
কুড়িয়ে হাতে নেয়, ওটার ব্যাটারিটা বডি থেকে আলাদা হয়ে গেছে। কমদামের চায়নিজ সেট। এরপর
যেভাবে ঘরে ঢুকেছিল ঠিক সেভাবেই নিঃশব্দে সরে পড়ে।
সব কাজ শেষ করে আততায়ী যখন করিডোরে এসে
দাঁড়ায় তখন বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেছে, আঁধারটাও
যেন আরও বেশী জমাট বেঁধেছে পুডিং-এর মত। বৃষ্টির মাঝেই হুডিটা তুলে
দিয়ে আততায়ী আঁধারে মিলিয়ে যায়।
বৃষ্টির আঁধারে মিলিয়ে যায় একটা অধ্যায়, যার শুরু হয়েছিল
আজ থেকে আট বছর আগের আরেক শীতের আঁধারের রাতে।
৬
আট বছর আগের এক রাত।
চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন। রাত সাড়ে
সাতটা।
রেলষ্টেশনটা ঐ রাত জেগে থাকা কালের
সাক্ষী বটগাছটার মতই পুরনো। সেখানে ইট সুরকী আর ক্ষয়ে যাওয়া লোহার ফ্রেমগুলো দিনরাত ফিসফিস করে কোনও এক
সুদূর অতীতের কথা বলে। এলোমেলো বাতাসে মরচে ধরা টিনের ছাউনিগুলো দোল খায় বেতের লতার মত। হাল্কা বাতাসে তিরতির করে
কেঁপে ওঠে। বিবর্ণ ষ্টেশনটা যেন বিগত যৌবনা নারী, শুধু কাঠামোটাই টিকে আছে। কালের আবর্তে স্থাপনার জৌলুশ চাপা পড়েছে। শীতের শেষ, তবু
সন্ধ্যাগুলোয় ঘন কুয়াশার চাদর শাড়ীর মত জড়িয়ে রাখে ষ্টেশনের জীর্ণ কাঠামোটাকে। বিদ্যুতের লাইনগুলো
থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ে রাতের ঘন শিশির। ভেজা ল্যাম্পপোস্টের আলোও যেন ঠাণ্ডায় জমে আছে। আলো তাই মাটি অব্দি
পৌছায় না। ল্যাম্পপোষ্টের
হলদেটে আলো বাদুড় ঝোলার মতই পোস্টেই
ঝুলে থাকে। ম্যাড়মেড়ে
আলোয় প্ল্যাটফর্মে হেঁটে বেড়ান মানুষগুলোকে আধিভৌতিক লাগে। তাদের কেউ হয়ত তার মতই পলাতক অপরাধী, রাতের ট্রেনের
সাধারণ যাত্রী কিংবা ভবঘুরে মানুষ অথবা চোরাকারবারি। সীমান্তের কাছে বলে চোরাচালান ব্যবসাটা বেশ জমজমাট এখানে। ওপার থেকে মাদক দ্রব্য,
অস্ত্র এসব আসে আর এপার থেকে সোনা অথবা ডলার হুন্ডি হয়ে যায়।
রেল পুলিশের দু’জন কনস্টেবল
কাঁধে কাঠের ৩০৩ রাইফেল ঝুলিয়ে পান খায়, পিক্ ফেলে আর উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরে সারা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে। এর
ওর সাথে কথা বলে, যাত্রীদের কারো সাথে
বস্তা বা বড় ব্যাগ দেখলে কি আছে জানতে
চায়। জিজ্ঞেস করে,
- ওই মিয়া ব্যাগের ভিতরে কি? খোলেন
দেহি। যাইবেন কই ?
ওরা প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তরের
অপেক্ষা না করেই বিভিন্ন জনের চটের
বস্তায় লাঠি দিয়ে গুঁতো দেয়, পরখ করে দেখে। এত রাতেও এক অন্ধ ভিখারি
তার কিশোরী কন্যাকে সাথে নিয়ে
ভিক্ষা করছে। মেয়েটির হাড় জিরজিরে
শরীর ঠেলে উঁকি দেয়া পুষ্ট স্তন জানান দিতে চাচ্ছে নতুন যৌবনের। নসু হায়েনার দৃষ্টিতে
তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মেয়েটি
বোধহয় নসুর চোখের ভাষা বুঝতে পারে,
- শুয়োর!
গালির সাথে একটা রহস্যময় হাসি
দিয়ে মেয়েটি তার বাবা'র হাতটা টেনে ধরে, অন্যদিকে সরে যায়। নসু উত্তরে কিছু বলে না। গালিটা গায়ে
না মেখে সে বরং চাপা হাসি ছুঁড়ে দেয় তার দিকে। প্ল্যাটফর্মের এক কোনের
চায়ের স্টল থেকে ভেসে আসছে মানুষের ফিসফাস, মাঝেমাঝে
চাপা হাসি কিংবা চায়ের কাপের সাথে চামচের অযথা
টুংটাং আর পুরনো দিনের হাল্কা চটুল হিন্দি গানের সুর, 'সাঁইয়া
দিল মে আনারে.........'।
যাত্রীদের মাঝে ট্রেনের অপেক্ষায় টানটান
উত্তেজনা কাজ করে। কেউবা
ঘনঘন হাতঘড়িতে সময় দেখে আর টর্চের অনুজ্জ্বল আলো ফেলে রেল লাইনের অতল অন্ধকার বরাবর। দূরের গুমটি ঘরটা অন্ধকারে দেখতে কালো দৈত্যের মত লাগে। যাত্রীরা টর্চের ঘোলাটে আলোয় যেন ট্রেন খুঁজতে চায়। জিন্সের
পকেট থেকে লাইটারটা বের করে প্যাকেটের শেষ সিগারেটে আগুন দেয় নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি
নসু ওরফে পাঙ্খা নসু। একটা লম্বা ঘন টান দিয়ে ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়তেই চোখে পরে
প্ল্যাটফর্মের শেষে পা ঝুলিয়ে বসে
থাকা পাগলিটার দিকে। শরীরে নোংরা চট মোড়ানো, বিড়িতে টান দিয়ে
বিরবির করে কি সব বলছে। দৃষ্টিটা সেখান থেকে সরিয়ে এনে এদিকে সেদিকে, ঘন অন্ধকারে তাকায়। পুলিশ বা র্যাবের ইনফরমার তাকে ফলো করছে কিনা তা বোঝার চেস্টা করে। অবশ্য তাদের কারও জানার কথা না যে সে সীমান্তের এপারে, কাঁটাতার পেরিয়ে দেশে ঢুকেছে। নসু শুধু লীডার অর্থাৎ ল্যাংড়া মনিরকে ফোন করে দেশে ফিরে
আসার দিন ক্ষণ জানিয়েছে।
নসু কাঁধের
ব্যাগটা ফ্লোরে নামিয়ে নিঃসঙ্গ কাঁঠালগাছটার নিচে বসে। এই জায়গাটা বোধহয় প্ল্যাটফর্মের এক্সটেনশন। সেখানে সিমেন্টে বাঁধানো ফ্লোর
থাকলেও মাথার ওপরে ছাউনিটা নেই। দূরে আধো আলোয় রূপজীবী এক যুবতী দাঁড়িয়ে আছে খদ্দেরের
আশায়। এতদূর
থেকেও তার মুখে পাউডারের সাদা প্রলেপ আর ঠোঁট লেপ্টে থাকা লিপিস্টিকের টকটকে লাল রঙ
বোঝা যায়। শরীরটা কীরকম বাঁকা করে
দাঁড়িয়ে আছে! খাজুরাহোর প্রস্তর মূর্তি
যেন! শরীরের ভাঁজ দেখানোর কী
এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! তার দিকে তাকিয়ে নসুর শরীরটা কেমন যেন করে ওঠে! কিন্তু সেটা
কয়েক মুহূর্তের আদিম লিপ্সা মাত্র, বিদ্যুতের ঝলসানো আলোর মত সারা দিয়েই চলে যায়। পরক্ষণেই সে হাত দিয়ে জিন্সের কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলের অস্তিত্ব পরখ করে
নেয়। একটু
পরপর হাত ছুঁয়ে পিস্তলের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া, এটা ওর একধরনের অভ্যাস কিংবা বদ
অভ্যাস বলা যেতে পারে। ঢাকার অপরাধ জগতে ওরা অবশ্য পিস্তলকে বলে ঘোড়া। আর পিস্তলের প্রজেক্টাইল বা বুলেটকে বলে বীচি, ওর সাথে এমুহূর্তে গোটা দশেক আছে। কলকাতার পঞ্চাননতলা বস্তিতে থাকার
সময়ে ঘোড়া চালানোয় দারুণ হাত পাকিয়েছে সে। নসু সেখানে দাশু মাস্তানের দলে ভিড়েছিল, দাশু মাস্তানের হয়ে খোখা-পেটির
বিনিময়ে ভাড়ায় কিলিং করত, আমরা যাকে
কন্ট্রাক্ট কিলিং বা সুপারী কিলিং বলি। এসব করে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি মাস শেষে ভাল মাসোহারা জুটত। তাছাড়া মাঝেমধ্যে বড়সড় কাজ শেষে বেশ মৌজ-ফুর্তিও হত।
৭
পঞ্চাননতলা বস্তি,
সোদপুর।
কলকাতা,
পশ্চিমবঙ্গ।
নসুর ঘরটা
ছিল আমরি হাসপাতালের ঠিক পিছনে রেল লাইনের ধারে। ৯৬ বর্গফুটের ঘরটাতে সে আর নলাদা আলাদা দুটি চৌকিতে থাকত, মাঝে সামান্য ব্যবধান। নলাদা এসেছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে, তার চেয়ে বছর আটেক বড় হবেন। তিনি পার্ক স্ট্রীট এলাকায় হাত ছাপাইয়ের কাজ করেন। বলতে গেলে গোটা পার্ক স্ট্রীট এলাকায় তিনি পকেটমারদের একটা বড় দলের দায়িত্বে। প্রতিদিন পকেটমারদের কাজের ভাগ-বাটোয়ারা থেকে শুরু করে দিন শেষে বিভিন্ন
জায়গায় সেদিনের বখরা পৌঁছানর কাজ তাকেই করতে হয়।
কলকাতার অপরাধ
জগতে নলাদা'র বিচরণ অনেক দিনের, হয়ত এজন্যই এই লাইনে তার জানাশোনাও প্রচুর। নসু যখন জোড়া খুনের দায়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে পার্ক স্ট্রিটে এসে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরাফেরা করছিল তখন নলাদা তাকে দেখে ঠিকই তার
সমস্যার কথা বুঝতে পেরেছিলেন। নলাদাই তাকে সোদপুরের পঞ্চাননতলা বস্তিতে এনে ঠাই দিয়েছিলেন। তারপর অতীতের সব ঘটনা শুনে নসুকে দাশু মাস্তানের দলে ভিড়িয়ে দেন। এভাবেই দাশু মাস্তানের দলের
সাথে থাকতে থাকতে একদিন ভুয়া ঠিকানা-পরিচয়ে রেশন কার্ডও মিলে যায়।
এরপর থেকে নসুকে সবাই ধুবরি, আসাম থেকে এসেছে বলেই জানত। সবার মুখে নসুর নাম তখন নসু চৌধুরী।
পশ্চিমবঙ্গে সত্তর-আশির দশকে নকশাল আন্দোলন যখন বেশ তুঙ্গে দাশু ব্যানার্জি তখন হাইস্কুলে পড়ে।
যৌবনের ধর্ম মেনে বন্ধুদের অনেকের মত সেও বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেসের রাজ্য সরকার ব্যাপক রক্তপাত-ধরপাকড়ের মাধ্যমে নকশাল আন্দোলন দমন করে। সে সময় রাজ্যপুলিশ দাশুকে এরেস্ট করে জেলে পুরে দিলে কয়েক বছরের জন্য সাজা খাটতে হয়। সাজা'র মেয়াদ শেষে জেল থেকে ছাড়া পেলে
দাশু ব্যানার্জি নাম বদলে হয়ে যায় দাশু মাস্তান। এরপর সে সরাসরি তৃনমূলে ভিড়েছে
এবং এখনও সেখানেই আছে, দলের পান্ডা। তৃণমূল এখন ক্ষমতায়,
আর সে দলের নেতাদের কাছের লোক বলেই হয়ত রাজ্য পুলিশ তাকে কখনও ঘাটায়না। সে নিজেও যতোটা সম্ভব গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করে।
দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য মিছিল-মিটিং-সমাবেশে লোক জোগাড় করার দায়িত্ব আরো অনেকের মত দাশু মাস্তানের ওপরেও ন্যস্ত থাকে। এজন্য দলের ছোটবড় অনেক নেতার সে কাছের লোক। নলা দা'র মত আরও বেশ কিছু চ্যালা-চামুন্ডা দাশু মাস্তানের শেল্টারে থাকে।
মিছিল সমাবেশের জন্য লোকজন ম্যানেজ করার দায়িত্ব মূলত নলাদার মত কর্মীদের ওপরেই বর্তায়। তারাও খুশী এরকম কাজ পেয়ে,
কারণ সমাবেশের জন্য বিভিন্ন বস্তি থেকে ভাড়ায় আনা লোকজনের ভিতরে পকেটমার দলের ছেলেপেলেদের ঢুকিয়ে দিতে সুবিধা হয়। আর এরফলে স্বাভাবিক ভাবেই সেদিনের আয়-রোজগার একটু বেড়ে যায়।
স্বভাবে নলাদাটা আসলে চরম বেহায়া। মদ,
রান্ডি নিয়ে ফুর্তি বা রাতভর জুয়া খেলাসহ তার সমস্ত কুকর্মের ঘাঁটি হল ঝুপড়ির এই ঘরটা। আর নসু হল এসব অপকর্মের নীরব স্বাক্ষি। নলাদা মাঝে মাঝে জুয়ার টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বন্ধুদের সাথে সারারাত এমন হৈ-হল্লা করে যে সেদিন রাতে আর ঘুমানো হয়না। এসব তো তাও মেনে নেয়া যায়, কিন্তু তার বেলেল্লাপনা চরমে ওঠে যখন সে রান্ডিবাজির জন্য রেল লাইনের ওপারের ঝুপড়ি থেকে মেয়েমানুষ নিয়ে আসত। নসু যে রক্ত-মাংসের একজন মানুষ সেটা যেন দাদা আমলেই নিত
না। অবলীলায় নসুর সামনে মশারীর সাথে চাদর
মুড়ে দিয়ে আদিম প্রবৃত্তি সেরে নিত। সারারাত চৌকির ক্যাচর-ক্যাচর
শব্দ, শীৎকার, চেঁচামেচিতে রাতের ঘুম নষ্ট হলে মনেমনে গালি দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকত
না। কখনো
রান্ডিগুলোর আবদারে তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হলে উঠানের খুঁটিতে হেলান দিয়ে সারারাত
পার করে দিতে হতো। অন্য কোন উপায় না থাকায় সে নসুর এসব বেলেল্লাপনাতে কিছু মনে করত না। তবে তার মেজাজটা চরম খারাপ হত
যখন রান্ডিগুলো ভোরে উঠে শাড়ি গোছাতে গোছাতে তাকে নাল্লা বলে গালি দিত। শুধুমাত্র কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে নসু নলাদা'র এসব কর্মকান্ডের কখনও প্রতিবাদ করেনি।
৮
চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশন।
রাত সাড়ে আটটা।
কুয়াশায় মাথা ভিজে যাচ্ছে, নসু মাফলারটা মাথায় ভালো করে পেঁচিয়ে নেয়। ঘড়ির কাঁটায় এখন
রাত সারে আটটা। সুন্দরবন এক্সপ্রেস আসতে এখনও আধ ঘণ্টা বাকী। সে সিগারেটে বেশ জোরে শেষ টানটা
দিয়ে বাটটা দূরে ছুড়ে ফেলে। প্ল্যাটফর্মের কোনা গড়িয়ে সেটা পড়ে রেল লাইনের ওপর। নিভুনিভু
আগুনটা একসময় পুরোপুরি নিভে যায়। ওদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে আকাশের দিকে তাকায়। নিঃসীম অন্ধকার আর শূন্যতার
মাঝে কুয়াশা ঢাকা চাঁদটাকে কেমন পানসে লাগে! স্বল্প ভোল্টেজে সড়কের বাতিগুলো যেমন জ্বলে আরকি! নসুর মনেপড়ে, এরকম আরেক পানসে আলোর রাতে জীবনটাকে হাতে নিয়ে সে ওপারে
পালিয়ে গিয়েছিল। তাও
প্রায় বছর তিনেক হতে চললো। তবে নসুর
অপরাধ জগতে পদচারনা আরও আগে, ১৪/১৫ বছর বয়সে। ওপারে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে বাচ্চু ভাই,অর্থাৎ কালীগঞ্জের বাচ্চু
চেয়ারম্যান নসুকে সাহায্য করেছিলেন। এজন্য তার কাছে সে খুবই কৃতজ্ঞ। এপারে এসেই
নসু তার খোঁজ করেছিল। কিন্তু
তিনি আজ বেঁচে নেই। বাচ্চু ভাইকে কি একটা
কাজে ঝিনাইদহ যেতে হয়েছিল, রাতে ফেরার পথে সর্বহারা দলের লালন গ্রুপের হাতে খুন
হয়েছেন। এখন অবশ্য তার ছেলে নজরুল এলাকার চেয়ারম্যান।
লালন গ্রুপের কোন পক্ষের হাতে বাচ্চু
ভাই খুন হয়েছেন সে ব্যাপারে নসু চেয়ারম্যানকে ভালো ভাবে খোঁজ খবর নিতে বলে,
- ভাতিজা, ক্যামতে কি হইলো একটু পাত্তা
লাগাও।
- ক্যান! কলাম না! লালন গ্রুপের
হাতে।
- হাছা নি! কারা কারা ওদের লগে
আছিলো পাত্তা লাগাও।
- জী।
সময় দেন। খবর দেবানে।
- এই কামটা তো আগেই করন দরকার আছিলো।
তুমি বইসা ছিলা ক্যালা!
- সময়টা খুব খারাপ ছিল চাচা। আপনি
শুধু কয়েকটা দিন সময় দেন।
- ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি করো, দরকার হইলে
আমিই পুরা টিম লইয়া আমুনে।
নসু যদিও চেয়ারম্যানের কাছে
প্রতিজ্ঞা করে তবুও সে আসলে জানেনা তার গ্রুপটার এখন কি অবস্থা! পুরনো কে কে গ্রুপে আছে? নতুন
কারা এসেছে? তারা কে কি রকম? সে তেমন কিছুই জানেনা।
ঢাকায় ফিরলে অবশ্য সবই জানা
যাবে। লীডারের কাছে সে
শুধু জেনেছে যে তার অবর্তমানে
হোয়াইট বাবুই গ্রুপটাকে চালাচ্ছে। সে ফিরে গেলে হয়ত
ওই গ্রুপটাকেই তাকে দেয়া হবে কিংবা নতুন কোন গ্রুপ তৈরি করে
তাকে নতুন কোন এলাকার দায়িত্ব দেয়া হবে।
সরীসৃপের মত হিসহিস শব্দ করতে করতে
ট্রেনটা এক সময় প্ল্যাটফর্মের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। মাতৃ মাকড়সার মত ট্রেনটা অসংখ্য
যাত্রী প্রসব করে। মুহূর্তে
মানুষের প্রাণ চাঞ্চল্যে কর্মমুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেশন। যাত্রীরা কেউ নামছে
আবার কেউবা উঠে নিজের সীটের সন্ধানে ব্যস্ত। তবে যত জন যাত্রী নেমেছে উঠেছে বোধহয় তার দ্বিগুণ। মাথায় গামছা বাঁধা লাল
ফতুয়া পরা কুলীদের জোরালো হাকডাক শুনতে পাওয়া যায় চারদিকে। তারা মাথায় বাক্স-পেটরা নিয়ে দৌড়ে চলে ট্রেনের বিভিন্ন কামরার
দিকে। সবাই
ব্যস্ত অথচ নসুর যেন ট্রেনে উঠবার কোন তাড়া নেই। সে বরং দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে তাতে আগুন ধরায় আর
চেয়ে দেখতে থাকে মানুষের আনাগোনা। গ্রীক পুরাণের দানব মেডুসার মাথার হাজারো সাপের মত কিলবিল করছে মানুষের
কোলাহল! এক সময় ট্রেনটা তীব্র হুইসেলে সুর তোলে আর ঢংঢং করে বেজে ওঠে প্ল্যাটফর্মের লোহার ঘন্টাটা। ট্রেনটা
যেন ঝাঁকুনি দিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে। রেলের কর্মচারী সবুজ পতাকা
উড়িয়ে সংকেত দেয়, যাত্রার প্রস্তুতি। নসু পায়ের তলায়
সিগারেটের আগুন মাড়িয়ে কাঁধের ব্যাগটা হাতে নেয় আর লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সামনের
বগিটাতে। ঝিকঝিক
শব্দে ট্রেন চলতে শুরু করে। নসু মিয়া ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসু যাত্রীর বেশে জনারন্যে মিশে যায়।
৯
গল্পটা অনেক আগের।
রূপনগর বস্তি,
মিরপুর।
নসুর বয়স তখন ১৪/১৫ বছর।
নসু মিয়া তখনও পাঙ্খা নসু হয়ে ওঠেনি, সবাই তাকে ডাকতো পিচ্চি। উচ্চতায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল, সেজন্য। মিরপুরে রূপনগর বস্তির
এক মাথায় লেকের কাছাকাছি একটা ঝুপড়ি ঘরে তারা থাকত।
বাবা-মা আর পাঁচ ভাই-বোন মিলে বেশ বড় সংসার। নসু সবার বড়। নসুর বাবা ফুল মিয়া রোজ
সকালে ঘুম থেকে উঠে তার চটপটির ভ্যান নিয়ে চলে যেত চিড়িয়াখানার গেটে। মাঝেমাঝে অবশ্য খেলা থাকলে ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যেত। বিক্রি বাট্টা খারাপ হতোনা। নসু রোজ দুপুরে টিফিন বাটিতে করে বাবার জন্য খাবার নিয়ে যেত। নসুর মা, জুলেখা বেওয়া'র
ছিল বিভিন্ন বাসায় ছুটা বুয়ার কাজ। দিনে তেমন সময় পেত না। কিন্তু তারপরও ঠিকই সময়
বের করে ছুটে এসে গরম ভাত, ভর্তা–ভাজি
রান্না করে টিফিনবাটি হাতে নসু মিয়াকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দিত। মাসে একদিন
পরিবারের সবাই মিলে পর্বত সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেত। মান্না ভাইয়ের অভিনয় ভালো
লাগত। কি
সুন্দর ফাইট করে! এরপর
রঙিন বেলুন কিনে আইসক্রিম
খেতে খেতে সবাই একসঙ্গে বস্তিতে ফিরত। মার যেদিন কাজ থাকত না সেদিন ওর বাবা ভ্যানে তালা মেরে দুপুর নাগাদ বস্তিতে ফিরত।
এরপর সবাই মেঝেয় মাদুর পেতে খেতে বসতো। খাওয়া
শেষে ফুল মিয়া খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে মুখ ভর্তি পান চিবাতে চিবাতে কাজে ফিরে যেত। কি সুন্দর সুখের সংসার
ছিল তাদের!
রোজ দুপুর বেলা বাবার জন্য টিফিন বাটিতে
খাবার নিয়ে যাওয়া ছাড়া নসুর তেমন কোন কাজ ছিল না। একদিন ঠিক এরকম সময়েই নসুর পরিবারে একটা ঘটনা ঘটে, যার
ফলশ্রুতিতে বস্তিতে একটা হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটে যায়। হত্যাকাণ্ডের কোন স্বাক্ষী
না থাকলেও জুলেখা বেওয়া ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, তবে ছেলে যেন বিপদে না পড়ে সেজন্য তিনি
মুখে কুলুপ এঁটে রাখেন। কারো কাছে বলেননি সেদিনের কথা। সেদিনও নসু টিফিন বাটিতে
করে বাবা'র জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি ওগুলো বাসায় ফেরত নিয়ে যেতে বলেন,
- আইজ আর খাওন লাগবো না বাজান, তুমি
টিফিন বাটিগুলা বাইত নিয়া যাও।
- ক্যা ? খাইবা না ক্যা?
- অনেকদিন পর এক পুরান বন্ধুর লগে
দেখা হইছিল, হেয় বিরানি খাওয়াইলো।
- ও
নসু আর কথা বাড়ায় না, বস্তিতে ফেরার
পথ ধরে। এরফলে প্রতিদিন সাধারণত যতটা সময় লাগে সেদিন তার বেশ আগেই সে চলে আসে, আর
এতেই বেঁধে যায় যত বিপত্তি। বরাবরের মত বাটি হাতে ঘরে ঢুকতে গেলে দেখে যে দরজাটা
ভিতর থেকে আটকানো। তবে ঘরের ভিতর থেকে ধ্বস্তাধস্তি এবং ফুঁপিয়ে কান্নাকাটির শব্দ ভেসে
আসছে। কণ্ঠটা তার মায়ের। প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে জোরে ধাক্কা দিতেই দরজার কপাট খুলে
যায়। বড় চৌকিটা, যেটাতে বাবা-মা আর ছোট দু'ভাই-বোন ঘুমায়, সেটাতে কাশেম চাচা তার
মায়ের সাথে
ধ্বস্তাধস্তিতে লিপ্ত। তাদের দু'জনেরই পরনের
কাপড় অবিন্যস্ত। কাশেম চাচা নসুকে হঠাৎ ওভাবে ঘরে ভিতরে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে
যায়। নসুর মা শাড়িটা কুড়িয়ে নিজের শরীর ঢাকতে ঢাকতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগে তার মায়ের কি সর্বনাশ ঘটতে যাচ্ছিল নসু তার কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। সে প্রবল
আক্রোশে টিফিন ক্যারিয়ারটা ঘরের মেঝেতে আছড়ে ফেলে দেয়। বাটি থেকে ভাত, ডাল, তরকারী
এসব চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এরপর দৌড়ে বাইরে থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে এনে রুখে
দাঁড়ায়, হিংস্র বাঘের মত রাগে ফুঁসতে থাকে। কাশেম চাচা হেসে তার দিকে এগিয়ে যান,
নসুর হাত থেকে এক ঝটকায় লাঠিটা কেড়ে নিয়ে ঘরের এক কোনে ছুঁড়ে দেন। তারপর একগাল
হেসে তার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিতে চেষ্টা করে,
- এইটা রাখ। কিছু কিইন্যা খাইস।
নসু সরে যেয়ে মুখের ভেতর থেকে এক দলা থুতু এনে
তার মুখে ছুঁড়ে মারে। কাশেম চাচা রাগে গর্জে উঠে নসুর গালে চড় মারেন,
- খানকির পুত, তোর সাহস দেহি কম না!
যা দেখছোস তা যদি কোন হালার কানে যায় তো গলা টিইপ্যা মাইরা ফালামু। কুনো হালায়
ট্যারও পাইবো না কইলাম।
নসু একহাত দিয়ে গাল চেপে ধরে
ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাশেম চাচা বস্তির মাস্তান, ওয়ার্ড কমিশনারের
পোষা গুন্ডা। লম্বা তাগড়া টাইপের লোকটা বস্তির ভেতরেই এক কোনে একাই থাকে, তিন বেলা
হোটেলে যেয়ে খাবার খায়। তার বউ সংসার বা
ছেলেপুলে নেই। তার একমাত্র কাজ হল বস্তির একে ওকে মারপিট করা বা শাসানো আর মাস
শেষে বস্তিবাসীদের কাছ থেকে ঘরের ভাড়া উঠিয়ে কমিশনারের কাছে জমা করা। এ জন্য
বস্তির সবার সাথেই তার পরিচয় এবং উঠাবসা আছে। তার দুশ্চরিত্র স্বভাব সম্পর্কে
কমবেশি সবাই জানে। তার নানাবিধ অপকর্ম নিয়ে বস্তির ভেতরে অনেকবার ঝগড়া-ঝাঁটি বা
সালিশ-মিটিং হয়েছে কিন্তু তাতে কোন লাভ
হয়নি। আসলে বস্তির সব লোকজনই ভাসমান শ্রেণীর, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা
ভাগ্যন্বেষনে ঢাকায় এসেছে। আর তাই জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য তাদেরকে প্রতিনিয়ত
সংগ্রাম করতে হয়। নিজের কাজ ফেলে এসব উটকো ঝামেলা নিয়ে মেতে থাকার বদলে দুটো ভাতের
সংস্থান করার জন্য ছুটাছুটি করা তাদের কাছে বেশী গুরুত্বপুর্ণ। তাছাড়া বস্তির অনেকের
মেয়ে-বউ যে আড়ালে-আবডালে দেহ বিলিয়ে আয়-রোজগার করে থাকে সেরকম কানাঘুষা তো কান
পাতলেই শোনা যায়। সম্ভবত এই কারণে কিংবা কমিশনারের লোক বলে কাশেম চাচার মত লোকজন
বস্তিতে যত অপকর্মই করুক না কেন তারা সবসময় পার পেয়ে যায়। এমনকি এসব নিয়ে
থানা-পুলিশ পর্যন্ত হয়না।
কাশেম চাচার শকুন দৃষ্টি যে তাদের
পরিবারের ওপরেও পড়েছে তা নসু কোন ভাবেই টের পায়নি। আর সে টের পাবেই বা কীভাবে! তার
তো সময় কাটে ছোট ভাইয়ের সাথে ডাঙ্গুলি খেলে, নয়তো বস্তিতে তার সমবয়সীদের সাথে এটা সেটা বা ভাংরি
জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করে চিপা-চাপায় বসে ডাণ্ডি খেয়ে। কোন কোনও দিন তারা দু’ভাই হাঁটতে হাঁটতে কালশি রোড অব্দি চলে যায়, তারপর পুরো শরীরে ধুলো মেখে
তবে ঘরে ফেরা। হাঁটার যে আনন্দ তা শিশুর মত আর কেউ ভোগ করতে পারে কি!
খুট করে একটা শব্দ হলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়,
এরপর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে, তার চোখ-মুখ ফোলা। আঁচলটা মুখে জড়িয়ে এখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
- নসু!
নসু'র দু'চোখ জলে আর্দ্র হয়ে আছে। সে
মায়ের দিকে তাকাতে পারে না। এক ধরণের চাপা প্রতিশোধ স্পৃহা তার চোখ-মুখ ঠেলে বের হয়ে আসতে
চায়। সে জোড়ে হাঁটতে হাঁটতে গলির মুখে চায়ের দোকানের দিকে যায়। নসু মনেমনে ঠিক
করে, মায়ের অপমানের প্রতিশোধ না নিয়ে সে ঘরে ফিরবে না।
- নসু! শোন বাপধন।
নসু উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে
না। রাস্তার বাঁকে নসুর লিকলিকে শরীরটা হারিয়ে যায়।
নসু চায়ের দোকানের বাইরের টুলটায়
বসে ভাবতে থাকে, সে তার মায়ের সম্ভ্রমহানির অবশ্যই প্রতিশোধ নিবে। কিন্তু প্রতিশোধটা কিভাবে নেয়া
যায় সেটা নিয়েই সে ছক কষতে থাকে। নসু ভালো
করেই জানে কাশেম চাচা'র সাথে সে সামনা সামনি কিছুই করতে পারবে না। উল্টো মার খেয়ে কেলো
ভুত হয়ে যেতে হবে। সে একেকবার একেকটা প্ল্যান আঁটা'র পর সেটা নিয়ে ভালোমন্দ ভাবে, তারপর মনপুত না হলে সে নিজেই তা
বাতিল করে দেয়। এভাবে সে নিজের সাথে নিজেই বাঘবন্দী খেলতে থাকে। হঠাৎ একটা বুদ্ধি তার
মাথায় এসে চেপে বসে। সে অনেকবার দেখেছে কাশেম চাচা প্রায় প্রতিদিনই রাত
দেড়টা-দুটার দিকে মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায়
রিকশায় চেপে ঘরে ফেরে। সে সময় রিকশাওয়ালা ছাড়া কেউই তার সাথে থাকেনা। দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা মিলে একমাত্র ঐ সময়টাতেই সে একদম
অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। তার ঘরের একটু সামনে
একটা সরু নর্দমার মত থাকায় রিকশাওয়ালারা সাধারণত সেখানে রিকশা থেকে নেমে ঘর
পর্যন্ত বাকী পথটা ঠেলে নিয়ে যায়। সে সময় কাশেম চাচার হুঁশ থাকে না বললেই চলে, রিকশাওয়ালাই ঘরের বারান্দায় তাকে
নামিয়ে দিয়ে চলে যায়।
নসু ঠিক করে কাশেম চাচা যখন মাতাল
অবস্থায় রিকশায় চেপে ঘরে ফিরবে তখন সে রিকশার পিছন থেকে গলায় দড়ি বেঁধে হ্যাঁচকা
টান মেরে ছুটে পালিয়ে যাবে। এরপর থেকে সে প্রায় প্রতি রাতেই তাকে ফলো করতে থাকে
এবং একদিন একটা ভালো সুযোগ পেয়েও যায়। তার অস্ত্র বলতে সরু নায়লনের দড়ি বা সুতো। টায়ারে যেগুলো
থাকে আরকি, সরু তবে প্রচন্ড শক্ত। কোন একরাতে কাশেম চাচা মাতাল অবস্থায় যখন গলিতে
ঢুকলেন তখন সে রিকশার পিছু নেয়। এরপর
নর্দমাটা পার হওয়ার পরপরই সুযোগ বুঝে রিকশার হুডের
পিছনের ফাঁকা অংশ দিয়ে তার ছোট শরীরটা গলিয়ে দিয়ে কাশেম চাচার গলায় ফাঁস পড়িয়ে
শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে একটা হ্যাঁচকা
টান দেয়। নসুর ওরকম হালকা লিকলিকে শরীরে কতোটুকুইবা শক্তি! তারপরও বুদ্ধিটা বেশ
কাজে দেয়। তার হাতে গামছা প্যাঁচানো থাকায় হাত কেটে যায়নি।
হ্যাঁচকা টানের কারনে রিকশার সামনের চাকা শূন্যে উঠে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় কাশেম
চাচার নেশার ঘোর কেটে গেলে চীৎকার করতে চান কিন্তু তার মুখ থেকে শুধু ঘৎ করে একটা
শব্দ বের হয়, তারপর সুনসান নীরবতা। তার অমন দশাসই শরীরটা রিকশার সীট থেকে মাটিতে থুবড়ে পড়ে, প্রাণ বায়ু বের
হয়ে গেছে তারও আগে। রিকশাওয়ালাও পা পিছলে একদিকে পড়ে যায়। তবে সে উঠে দাঁড়াতে
দাঁড়াতে বা চীৎকার করে কাউকে ডাকার আগেই নসু একটা সরু গলির ভিতরে মিলিয়ে যায়।
তারপর এপথ সেপথ হয়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় ছোট ভাইটার পাশে শুয়ে পড়ে।
অনেকদিন পরে নসুর মনে প্রশান্তির
ভাব ফিরে আসে, তবে সে আসলে নিশ্চিত না কাজটা ঠিকঠাক করতে পেরেছে কিনা! পরদিন সকালে
ছোটভাইটা অনেক সাধলেও সে শরীর খারাপের অজুহাতে ঘরেই শুয়ে বসে দিনটা কাটায়। দুপুরে বাবা'র
কাছে ছোট ভাইটাই খাবার নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর সে ঘরে ফিরলে তার কাছেই শুনতে পারে
কাশেম চাচা'কে কে যেন আগের দিন রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলেছে। মিরপুর থানা থেকে
ঘটনার তদন্ত করতে পুলিশের লোক বস্তিতে এসেছিল, তারা কয়েকজন সন্দেহভাজন আসামীকে
কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে। সেদিন রাতে জুয়ার আড্ডায় সঙ্গীদের সাথে কাশেম
চাচা'র নাকি বেশ মারামারি বেঁধে ছিল। ওখানেই
কেউ একজন তাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছিল বলেও জানা
যায়। পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সেখানেই লুকিয়ে আছে। ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে
গল্পের সবটা শুনে নসু আপন মনে হাসতে থাকে। সে ভয়ে-বিস্ময়ে ভাবতে থাকে, সে আসলে কখনই
ভাবেনি ওরকম একজন মোটাতাজা মানুষকে এত
সহজে খুন করে ফেলা সম্ভব হতে পারে। মানুষ হত্যা করা কি তাহলে এতই সহজ! তার মা দিনের
কাজ শেষে ঘরে ফিরে ছেলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, কিন্তু নসু তাতে
পাত্তা না দিয়ে শিস দিতে দিতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এই একটা হত্যাকাণ্ড নসুর বয়সটাকে
যেন দ্বিগুন করে দেয়। জুলেখা বেওয়া নিজের ছেলেকে ঠিক চিনতে পারেন না।
১০
ঘটনাস্থল মিরপুর। ক্রিকেট স্টেডিয়াম
এলাকা।
দুপুর আড়াইটা।
মিরপুর স্টেডিয়ামে ক্রিকেট বিশ্বকাপ
খেলা উপলক্ষে প্রচুর নির্মাণ কাজ চলছে।
নসু বস্তির লোকদের চায়ের আড্ডা থেকে শুনেছে কোটি টাকার
কাজ। এই টেন্ডারবাজির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে বল্টু রাসেল আর আজগর
বাহিনীর মধ্যে লেগে গেল ভীষণ গণ্ডগোল। আজগর তার বিশাল দল নিয়ে রাজত্ব করত মূলত কাফরুল-কচুক্ষেত এলাকায়। কিন্তু কাঁচা টাকার লোভ তাকে টেনে আনে মিরপুর-২ এর স্টেডিয়াম এলাকা
অবধি।
ঘটনার দিন সকালেও ফুল মিয়া যথারীতি স্টেডিয়াম
এলাকায় চটপটি বিক্রি করতে গিয়েছিলেন। ঘটনার সূত্রপাত বেলা দু'টার পরপর। টেন্ডার পেপার ড্রপ করার সময়সীমা পার
হওয়ার আগেই আজগর বাহিনীর ছেলেরা টেন্ডার বক্স ছিনতাই করে পালাতে চাইলে বল্টু
রাসেলের ছেলেরা বাধা দেয়। একপর্যায়ে দু’দলের মধ্যে শুরু হল প্রচন্ড ফায়ারিং। নসুর সামনেই বিদেশী থ্রিলার মুভির এ্যাকশন দৃশ্যের মত সবকিছু ঘটতে থাকে। টিফিন
বাটি হাতে সে তখন দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার ওপাশে। সেদিনের সেই গান ফাইটের পরিণামে বুকে
আধা ডজন বুলেটের আঘাত নিয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে বল্টু রাসেল।
মিরপুর থানা থেকে পুলিশের টহল পিকআপ
এসে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তীব্র শব্দে হুটার বাজিয়ে র্যাবের বেশ কয়েকটা
গাড়িও এসে উপস্থিত হয়। কিন্তু ততক্ষণে আজগর আর বল্টু রাসেলের বাহিনীর সন্ত্রাসী
ছেলেরা যে যেভাবে পারে পালিয়ে গেছে। পরিবেশ
মোটামুটি শান্ত হলে নসু এগিয়ে যেয়ে দেখে
তার বাবা'র মৃতদেহটা ড্রেনের পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পুলিশের একজন কনস্টেবল এসে
মৃতদেহটা সোজা করে দিলে দেখা যায় বুলেট কপাল ফুটো করে ঢুকে মগজ ভেদ করে বের হয়ে গেছে। পিছনে রেখে গেছে
স্মৃতি। ভ্যান গাড়ীর প্যাডেলে বিচ্ছিন্ন মগজের সঙ্গে
ঠিকরে পড়ে নসুদের ভাগ্যের চাকা। নসু'র ধারণা আজগর গ্রুপের ছেলেদের হাতেই তার বাবা মারা
গেছেন। সে তখনই প্রতিজ্ঞা করে বড় হয়ে একদিন বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিবে। আজগরকে হত্যা করেই শুরু
হবে তার সেই প্রতিশোধ অভিযান, তারপর দলের অন্যদেরকেও।
আজগর গ্রুপের বুলেটের আঘাতে বাবা'র
মৃত্যুর প্রতিশোধ স্পৃহা তাকে টেনে নেয় ল্যাংড়া মনিরের দলে।
বল্টু রাসেলের পর ল্যাংড়া মনিরের গ্রুপটাই আজগরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নসু
প্রথমদিকে এই গ্রুপটার ইনফরমার হিসেবে কাজ করত। এরপর
এটাসেটা ফুট-ফরমায়েশ খাটতে খাটতে সে একসময় ঘোড়া চালানোর
কায়দাও ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলে। এভাবে সেই যে ১৩/১৪ বছর বয়সে কাশেম চাচাকে ক্লুলেস খুন করে তার
হত্যাকাণ্ডের হাতেখড়ি হল, তারপর একজন দক্ষ সার্জনের মত সে শিখে নিয়েছিল মানব শরীরের
এনাটমি। দশ নাম্বার গোল চক্করের কাছে জিল্লুর কসাই এর মাংসের দোকানে সহকারী হিসাবে
কাজ করতে করতে সে দক্ষ হাতে ছুড়ি-চাকু চালাতে শিখেছিল। তবে নসু কাজের ক্ষেত্রে সবসময়ই অস্ত্রের চেয়ে বরং বুদ্ধিমত্তার উপরেই বেশি
নির্ভর করে। নসুর মতে মাথায় মাল থাকলে হাতের কাছে পাওয়া যে কোন সাধারণ বস্তুকেই
মানুষ হত্যার হাতিয়ারে পরিণত করা সম্ভব। সেটা হতে পারে সাধারণ আলপিন/পেরেক থেকে
শুরু করে যে কোন কিছু, বিশেষ করে তার দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটা এ প্রসঙ্গে
উল্লেখ করা যেতে পারে। ওটা ছিল প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার চেয়েও চমকপ্রদ এবং এটাও ক্লুলেস।
নসু'র বয়স তখন সম্ভবত পনেরো বছর
হবে। তার দ্বিতীয় শিকার ছিল ওয়ার্ড কমিশনার নিজেই। কাশেম চাচা খুন হবার পর ওয়ার্ড
কমিশনার বস্তির লোকজনদের ওপরে নির্যাতনের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিল। কথায় কথায় বস্তির লোকজনদের দলের গুণ্ডাপাণ্ডা দিয়ে পেটানো, কাউকে বস্তি থেকে উৎখাত করা বা কারো মেয়ে-বউকে পছন্দ হলে রাতের আঁধারে
তুলে নিয়ে যাওয়া এসব ইস্যু নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াল।
এতকিছু ঘটনা পুলিশের চোখের সামনেই ঘটছে অথচ তার রাজনৈতিক
অবস্থানের কারণে লোকাল থানা ওয়ার্ড কমিশনারের বিরুদ্ধে কোন জিডি-ডায়েরি নিতে
নারাজ। ওয়ার্ড কমিশনারের এসব পুঞ্জিভূত অপরাধ নসু'র
মধ্যে হত্যা প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে। তবে ঘটনাটা ঘটে তার বন্ধু জগদীশের দিদিকে
উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর।
নসু আর জগদীশ বস্তিতে ছোটবেলা থেকে
একসাথেই বেড়ে উঠেছে। তারা একসাথেই ভাঙরি-লোহার টুকরা এসব টুকিটাকি কুড়িয়ে বা
ছোটখাট ছিনতাই-চুরি এসব করে ডাণ্ডির নেশা করে থাকে। একদিন সকালে মিরপুর বাজারে
টুকরি মাথায় ফুটফরমায়েশ খেটে হাতে কিছু টাকা জমলে দুপুরের পর জগদীশকে ডাকতে যায়,
একসাথে নেশা করবে। কিন্তু জগদীশের ঘরের সামনে উঁকি দিয়ে দেখে ওর মা আর ছোট ভাইটা
মেঝেতে বসে কান্নাকাটি করছে। ওর বাবা অমলেশ কাকু বিছানায় বসে উদভ্রান্তের মত
বাইরে তাকিয়ে আছেন। জগদীশ মুখ গম্ভীর করে
তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সেও নিজেও যে কান্নাকাটি করেছে সেটা তার মুখের দিকে
তাকিয়েই বোঝা যায়। পাশের ঘরের দু'একজন মহিলা তাদের সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছে। কেমন
একটা থমথমে গুমোট পরিবেশ।
নসু ইশারায় জগদীশকে ঘরের বাইরে ডেকে
জানতে চায় কি হয়েছে, তবে জগদীশ যেটা বলে সেটা শুনতে সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
ওয়ার্ড কমিশনারের কিছু মাস্তান ছেলেপেলে আগের দিন রাতে রমাদি'কে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।
অমলেশ কাকু জগদীশকে সাথে নিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করতে রাতেই ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন কিন্তু
তার বাড়ির গেটে পাহারাদার গুন্ডাগুলো তাদেরকে লাথি-গুতা মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়ার্ড কমিশনারের সাথে দেখা করার জন্য অনেক অনুনয় বিনয় করেও লাভ হয়নি। সেখানে কিছু করতে না পেরে
শেষে থানায় গেছেন কিন্তু তারাও অভিযোগটি আমলে নেয়নি। বরং থানার ডিউটি অফিসার তার মেয়ে কারো সাথে স্বেচ্ছায় ভেগেছে
কিনা সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে পরামর্শ দেন। উনি যতই বলেন যে মেয়েকে
বস্তি থেকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তবুও তিনি বিশ্বাস করেন না। যারা এই অপকর্মটা করেছে
তাদেরকে তিনি সনাক্ত করতে পারবেন, তারা সবাই ওয়ার্ড
কমিশনারের লোক এসব বলেও কোন লাভ হয়না। ডিউটি অফিসার এত রাতে বিরক্ত না করে পরদিন সকালে এসে
অভিযোগ দায়ের করতে বলেন। সকালে উঠে অমলেশ কাকু একাই আবারও থানায় গিয়েছিলেন, কিন্তু
কোন লাভ হয়নি।
জগদীশের মুখে ঘটনার বর্ণনা শুনে
নসুর মধ্যে প্রচণ্ড রকমের রাগ এবং ক্ষোভ এসে ভর করে। ওয়ার্ড কমিশনারের পোষা গুন্ডা কাশেমের মৃত্যুতে
নসুর জড়িত থাকার ঘটনাটা জগদীশ জানত। নসু
নিজেই একবার নেশার ঘোরে গল্পের ছলে বলেছিল। জগদীশ নসুকে বলে, কেউ যদি ওয়ার্ড কমিশনারকে খুন করে দিদি'র অপমানের প্রতিশোধ নিতে তাকে সাহায্য করে তাহলে সে তার টিনের কৌটায় জমানো
সব টাকা দিয়ে দিবে।
নসুর কানে কথাগুলো ঢোকে কিন্তু মুখে কিছু বলেনা। সে বরং ভাবতে থাকে কিভাবে
এই অপমানের প্রতিশোধ নেয়া যায়! তার কাছে এই মুহুর্তে
টাকা-পয়সার চেয়ে রমাদি'কে উদ্ধার
করা বা ওয়ার্ড কমিশনারকে শাস্তি দেয়াটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনেহয়। রমাদি'কে অবশ্য ওরা অপহরণ ঘটনার পরেরদিন রাতেই ফিরিয়ে দিয়ে যায়। কিন্তু তার সম্ভ্রমহানির
ঘটনাটা নসুর রাগকে প্রশমিত করতে পারেনা। বস্তির যে ছেলেগুলো হাল্কা-পাতলা খুন-খারাবির সাথে জড়িত তাদের সাথে নসু কয়েকদিন
চলাফেরা করে।
গল্পে গল্পে ওদের কাছ থেকে অপরাধ জগতের অনেক কিছু জেনে নিজেকে
তৈরি করে। তারপর
একদিন জগদীশকে বলে,
- ডিব্বা আছেনি! কোই রাখছোস?
- আছে, চিন্তা
করিস না।
জগদীশ আর নসুর মধ্যে সেদিন কথাবার্তা
আর বেশি এগোয় না। ডাণ্ডির
প্যাকেটে কয়েকবার নাক ডুবিয়ে যে যার ঘরে ফিরে যায়।
১১
ঘটনাস্থল পল্লবী এক্সটেনশন।
ওয়ার্ড কমিশনারের দোতলা বাংলো, কোন
একদিন দুপুর বেলা।
বেশ কিছুদিন ধরে ফলো করার পর নসু
বুঝতে পারে দুপুরে খাওয়ার পর দোতলার বেডরুমে ঘন্টাখানেক ঘুমানো ওয়ার্ড কমিশনারের
নিয়মিত অভ্যাস। এসি চলে, সেজন্য বেডরুমের দরজাটা তখন ভেজান
থাকে এবং এসময় তাকে বিরক্ত করা নিষেধ। তাকে অনেক রাত অবধি জেগে দলের ও
এলাকার জন্য কাজ করতে হয়। বাড়িতে
লোকজন বলতে তার স্ত্রী, দু'টো বাচ্চা আর কয়েকজন কাজের লোক। এদের সামলাতে কোন সমস্যা
হবেনা। তবে ঝামেলা বাঁধাতে
পারে নিচতলায় লোহার গেট পাহাড়ারত দলের ক্যাডার দু'জন।
তবে তাদেরকে ফাঁকি দেয়ার ফন্দীও সে এঁটে ফেলে।
ওয়ার্ড কমিশনারকে ফলো করতে গিয়ে দুপুরে ঘুমানোর সময়টায় ওনার স্ত্রীর কাজের লোক বা
বাচ্চাদের নিয়ে পাশের ঘরে কেবল টিভিতে স্টার জলসার সিরিয়াল দেখা অভ্যাসের কথা সে
জেনে গেছে। ঘটনার দিন সকালে সে প্রথমে বিশেষ কৌশলে ওয়ার্ড কমিশনারের বাসার কেবল
টিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, তারপর নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করে কেবল অপারেটর পরিচয়ে
ওয়ার্ড কমিশনারের বাসায় যায়। যথারীতি গেটে দাঁড়ান একজন ক্যাডার তাকে থামিয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ করে, অন্যজন সম্ভবত বাথরুম বা অন্যকোন প্রয়োজনে আশেপাশে কোথাও গিয়েছে।
- খাঁড়াও।
কই যাইতাছো ?
- কমিশনার সায়েবের বাসা, কেবল লাইন
চেক করন লাগবো।
- কেডায় কইছে! লাগবো না, ভাগ।
- আগে দ্যাখেন গিয়া, কেউরে জিগান। তারপর যামু কিনা ভাবুমনে।
কাইল রাইত থাইক্যা এই মহল্লার অনেক বাসায় লাইন আছিলো না।
ক্যাডার ছেলেটা ভ্রু কুচকে তার দিকে
তাকায়। এরকম কোন সমস্যা থাকলে তাদেরই আগে জানার কথা এবং এসব সমস্যার সমাধান তাদেরই
করার কথা।
- তুই কই থাইক্যা খবর পাইছস!
- ঘণ্টা খানেক আগে,
এক ব্যাটায় কইলো। বুড়া মতন।
ঠিক আছে, সমস্যা নাই তো জাইগা।
কথাটা বলে নসু চলে যাওয়ার জন্য পা
বাড়াতে উদ্যত হলে তাকে থামায়। আসলে সে নিজেও এবার খানিকটা বিভ্রান্ত বোধ করে।
- খাড়া। দেইখ্যা আসি।
ছেলেটা ধুপধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে
যায় এবং মিনিট তিনেক পরে ফিরে আসে।
- যা। নেতা ঘুমাইতাছে। ওনার ঘুম
য্যান না ভাঙ্গে।
- ঠিক আছে, বেশি সময় লাগবো না।
- এই হালার পুত, খাড়া। ব্যাগটা খোল,
ভিতরে কি?
- ধুর। যাইগা,
আমি পারুম না।
আপনারা অন্য কাউরে আইন্যা কাজ করাইয়েন।
- যা। মাগার সময় বেশি নিবি না কইলাম।
নসু আর দেরি করেনা। সে সিঁড়ি বেয়ে
দোতলায় উঠে চুপিসারে ওয়ার্ড কমিশনারের ঘরে ঢুকে পড়ে এবং দরজার লক এঁটে দেয়। উনি
এসির আরামদায়ক পরিবেশে একদিকে কাত হয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। তার পরনে সাদা লুঙ্গী,
গায়ে সাদা হাফহাতা গেঞ্জি। একটা পা কোল বালিশের ওপর উঠিয়ে দেয়া।
নসু ঘরের ভিতরে ঢুকে প্রথমে দু'হাতে সার্জিক্যাল গ্লভস
পড়ে নেয়। কোথাও যেন আঙ্গুলের ছাপ না পড়ে সেজন্য শুরু থেকেই সে সাবধানতা অবলম্বন
করে। এই টেকনিকের কথা আবুইল্যার কাছ থেকে শোনা। এরপর ব্যাগ থেকে কাঁচের শিশিটা বের
করে বেশ খানিকটা তরল জাতীয় পদার্থ ঢেলে হাতের রুমালটা ভিজিয়ে নেয়। এরপর পা টিপে
টিপে ওয়ার্ড কমিশনারের দিকে এগিয়ে তার মুখে রুমালটা একদম শক্ত করে চেপে ধরে। মুখের
ওপরে কারো হাতের শক্ত চাপ অনুভব করে ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি হাতে ঝটকা মেরে উঠে বসতে
চেষ্টা করেন কিন্তু ক্লোরোফর্মের প্রভাবে আবারো ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যান। নসু বস্তির
ওদের কাছ থেকেই জেনেছে এই জিনিসটা খুব কাজের,
কিন্তু সহজে পাওয়া যায়না। নসু বহুত কষ্ট করে মিটফোর্ড এলাকার এক মেডিক্যাল স্টোরের সেলসম্যানকে পয়সা
দিয়ে চোরাই পথে এই জিনিসটা সংগ্রহ করেছে।
একটু পর ওয়ার্ড কমিশনারের নাক ডাকার
হালকা থেকে গভীর শব্দ শোনা যায়। নসু ব্যাগ থেকে কারেন্টের তারটা বের করে একপ্রান্ত
ওনার হাতে ভালোভাবে পেঁচিয়ে দেয় এবং প্লাগটা বেড সাইড টেবিলের পাশে মোবাইল ফোন চার্জ করার সকেটে
ঢুকিয়ে দেয়। এরপরের কাজটা খুবই সামান্য। সুইচ অন করে দিতেই ওনার শরীরটা দু'তিনবার
ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়।
হার্ট অ্যাটাকের কারণে ঘুমের মাঝেই ওয়ার্ড
কমিশনার চিরঘুমের দেশে চলে যান। নসু কারেন্টের তারসহ সবকিছু তাড়াতাড়ি গুছিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে কাজের লোকদের
ডেকে টিভির কেবল লাইন সংযোগ পরীক্ষা করে। সব ঠিকঠাক আছে। সে নিচে নামতেই গেটের কাছে বসে থাকা
ক্যাডার তাকে দাঁড় করায়, ইতিমধ্যে অন্যজনও ফিরে এসেছে।
- কীরে কাম শ্যাষ?
- হুম।
- মানে!
- উপরে সমস্যা নাই। নিচের লাইন চেক
করন লাগবো। আপনেরা একজন আইবেননি!
- খাড়া।
ওদের একজন দোতলায় ওয়ার্ড কমিশনারের
রুমে গিয়ে উঁকি দেয়, কমিশনার সাহেব এখনো ডান দিকে কাৎ হয়ে ঘুমাচ্ছেন। সে নিচে নেমে
আসে।
- বস অহনো ঘুমাইতাছে। তুই আয় আমার লগে।
নসু তাকে সাথে নিয়ে কেবল লাইনটার বাইরের
সংযোগ ঠিক করে সার্ভিস চার্জ বুঝে নিয়ে চলে যায়। পরদিন সকালে পত্রিকার পাতায় খবর
আসে, ওয়ার্ড কমিশনার নিজ বাসভবনে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। খবরের কাগজের
দোকান থেকে একটা পত্রিকা কিনে জগদীশের হাতে দিয়ে নসু টিনের কৌটাটা বুঝে নেয়।
দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিই যে কন্ট্রাক্ট কিলার হিসেবে নসুর হাতেখড়ি,
তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়।
এরপর এরকম আরও কয়েকটা ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের
ঘটনায় নসুর কর্ম কুশলতা তাকে অপরাধ জগতে একসময় বেশ পরিচিত করে তোলে। নসু মিয়া এখন হাসতে
হাসতেই করোটিতে ফায়ার করতে কিংবা নির্দয় ভাবে কারো পেটে ছুড়ি চালাতে জানে। সে এখন এও জেনে গেছে কোথায় ফায়ার করলে মানুষ রক্তক্ষরণের
কারণে ধীরে ধীরে মরে যায় কিংবা কোথায় ফায়ার করলে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর
কোলে ঢলে পড়ে।
১২
ঘটনাস্থল কালসি।
ফুল মিয়া হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর
পরের কথা।
আজগরের সঙ্গে নসু তার পুরনো হিসাবটা
চুকিয়ে ছিলো বেশ নিষ্ঠুর ভাবে।
মিরপুর ১২-ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট সংযোগ
সড়কটা এখন যেরকম ঝকঝকে-তকতকে তখন কিন্তু এরকম ছিল না। দোকান-বাড়িঘর বলতে কিছুই নেই। চারদিকে উঁচুনিচু ঝোপঝাড় আর জলাভূমি। ঠিকাদারদের
দানবাকৃতির ট্রাকগুলো
সারা রাত ধরে জলাশয়ে বালি ফেলে মাটি ভরাটের কাজ করত। ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝে ট্রাকের হেডলাইট কুয়াশা ভেদ করে ভৌতিক
পরিবেশের সৃষ্টি করত। এমনি
এক কৃষ্ণপক্ষের রাতে আজগরকে তার বাসা থেকে তুলে আনে নসু। এরপর দলের একজন সদ্য বালি
ভরাট করা পথের পাশে একটা মাছের ঘেরের কাছে আজগরকে মাটিতে চেপে ধরে, আর অন্য আরেকজন
তার মুখে বালি ভরে দেয়। একসময় আধাভেজা বালিতে আজগরের মুখ
ভরে যায়। নিঃশ্বাস
নেয়ার জন্য সে হাত-পা ছুঁড়তে চায়, কিন্তু
পারেনা। নসুর
ধারালো ছুড়ির ফলা আজগরের বুকের মাঝ বরাবর চলে যায় দক্ষ সার্জনের মত। আট ইঞ্চি দৈর্ঘের ছুড়ির
আঘাতে রক্ত গড়িয়ে পড়ে অজস্র ধারায়।
মানুষের ইতিহাসে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডটি ঘটে তারপরই।
নসুর আদেশে দলের একজন একটা অব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর
থেকে ব্যাটারি খুলে এনে এসিড ঢেলে দেয় হা মেলে থাকা বুকের পাঁজরে। পরদিন দুপুরে খোঁজ পাওয়ার আগে পর্যন্ত ডেডবডিটা সেভাবেই
ঝোপের পাশে পড়ে থাকে। পিঁপড়ের দল অবশ্য তার আগেই খোঁজ পেয়ে যায়। সারা শরীর, চোখের কোটর-নাকের ফুটো ধরে দাপিয়ে বেড়ায় তারা। পুডিং এর মত জমে থাকা
রক্ত মাড়িয়ে চলে। কিসের
অপেক্ষায় একটা কুকুর আর কিছু কাক এসে সকাল না হতেই ভেড়ে সেখানে।
বিকাল নাগাদ কিভাবে যেন আজগর
বাহিনীর লোকেরা জেনে যায় এটা পিচ্চি নসুর কাজ।
চোখে মুখে প্রচন্ড জিঘাংসা নিয়ে তাকে ধরতে বাহিনীর প্রায়
সবাই বেরিয়ে পড়ে কিন্তু ততক্ষণে নসু পগার পার। সে হাওয়ার মত কোথায় যেন মিলিয়ে যায়! কেউ তার খোঁজ দিতে পারেনা।
মিরপুরের
আন্ডারওয়ার্ল্ডে সেই থেকে তার নাম বদলে হয়ে গেল পাংখা নসু। পল্লবী থানায় ক্রিমিনাল ফাইলে রেকর্ড করা হয়, নসু মিয়া
ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাংখা নসু, পিতা
# মৃত ফুল মিয়া, মা
# জুলেখা বেওয়া, গ্রাম # রূপনগর বস্তি, স্থায়ী ঠিকানা অজ্ঞাত। দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত র্যাপিড একশন ব্যাটালিয়নে তার সম্পর্কে সব তথ্য আপডেট
করে নতুন করে প্রোফাইল বানানো হয়। অপরাধীদের বিশেষ একটা লিস্টে তার নাম তালিকাভুক্ত হয়।
আজগরের মৃত্যুতে তার দলের নেতৃত্ব চলে
আসে শুটার বাবুর হাতে। নসু অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে আসে কয়েক বছরখানেক পর।
বলতে গেলে ল্যাংড়া মনিরের চেষ্টায় শুটার বাবুর সাথে তার বিরোধ মিটে
যাওয়ার পরপরই। অবশ্য
বিরোধ না মিটিয়েও তাদের উপায় ছিল না। এলাকার ডন, কালাবাবুর বেশ প্রেশার ছিল।
মিরপুরের অপরাধ জগতে সবাই জানে ল্যাংড়া
মনির কালা বাবুর কাছের লোক।
১৩
স্বপ্নের শুরুটা।
সোনিয়া উপাখ্যান।
কালাবাবু একটা হত্যা মামলার
দন্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে কাসিমপুর কারগারে দীর্ঘ মেয়াদের সাজা খাটছেন। মানিকগঞ্জ থেকে শুরু করে সাভার-মিরপুর
পর্যন্ত আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবকিছু তিনি জেলখানার সেলে বসেই নিয়ন্ত্রণ করেন। কালাবাবু আসলে ভীষণ ধুর্ত, আর তার আছে গ্রীক পুরাণের
হাইড্রার মতো অসংখ্য মুখ-চোখ, তাই
দিয়ে তিনি দারুণ দক্ষতায় তার এলাকা নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। কালাবাবুর চেহারা যতটা
না কালো, তার মনটা তারচেয়ে আরও বেশী কালো। তবে তিনি কথা বলেন অত্যন্ত চিকন সুরে, যেটা আসলে তার
দশাসই চেহারার সাথে একদম যায়না। এটা প্রকৃতির একটা বিস্ময়। তবে এটা তো ঠিক, জীবনে অপূর্ণতার দায় নিজেকেই বহন
করতে হয়।
কালাবাবু জেলে থাকায় দলের সব ধরনের টাকা
পয়সার হিসাব রাখে তার রক্ষিতা সোনিয়া, একসময়ের বিখ্যাত র্যাম্প মডেল। এখন তার
বয়স ২৭ কিংবা ২৮ হবে।
দারুণ ফিগার তার। পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার দীর্ঘ শরীরে ফর্সা সুন্দর ত্বক। তার চোরা দৃষ্টিতে এখনো
আরেকটা ট্রয় নগরী ধ্বংস হতে পারে।
সোনিয়া একটা টিভি চ্যানেলের ট্যালেন্ট
হান্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে একসময় খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছিল। খুলনার বি.এল কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়লেও তার মন কিন্তু পড়ে থাকত অন্য কিছুতে। পড়াশুনার বদলে নিত্য নতুন ফ্যাশনের পোশাক আর সাজগোজ নিয়ে তার মেতে থাকতে
ভাল লাগত। কলেজে মৌলবাদী আর বামপন্থীদের
মধ্যে আদর্শগত কারণে যতটা না মারামারি হত,
তাকে প্রেমপত্র লেখা নিয়ে ছেলেদের মধ্যে মারামারিটা হত তার চেয়েও বেশী। সে যেন এক জ্বলন্ত
অগ্নিকুন্ড, আর তাতে ঝাঁপ দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকত
উঠতি বয়সী ছেলেরা। তাকে ঘিরে এসব ধ্বংসযজ্ঞ সে অবশ্য বেশ উপভোগ করত। সৌন্দর্য আর মেধার উপযুক্ত সমন্বয় না থাকায় ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায়
সুবিধা করতে না পারলেও দলের গ্রুমিং এর দায়িত্বে থাকা কানিজ ফাতেমার দৃষ্টিতে সে পড়ে
যায়। কানিজ
ফাতেমা প্রায়ই দেশের নামকরা সব ফ্যাশন হাউজগুলোর জন্য ফ্যাশন শো এ্যারেঞ্জ করে
থাকে।
এরপরের কয়েকটা বছর সোনিয়া দাপিয়ে বেরিয়েছে ঢাকার সব বড় বড় ফ্যাশন শো’র আলো ঝলমলে রানওয়ে'তে। দীর্ঘ সুডৌল পায়ের কারণে তার ক্যাটওয়াক ছিল অন্যদের চেয়ে
আলাদা। হয়ত
এজন্যই সোনিয়ার অল্প সময়ের মধ্যে র্যাম্প মডেল হিসাবে বেশ খ্যাতি, অর্থ আর প্রাচুর্য চলে আসে। গ্ল্যামার আর সিনে ম্যাগাজিনের রঙিন পাতাগুলোতে তাকে
নিয়ে নিয়মিত কাভারস্টোরি করা ছাড়াও সেন্টার
স্প্রেডে বিভিন্ন ভঙ্গীতে তার বোল্ড ছবি নিয়মিত ছাপা হতে থাকে। তবে একসময়
কালের অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া অন্য অনেক মডেলদের মত সেও নিয়মিত ইয়াবা, কোকেন, হিরোইন,
মারিজুয়ানা ইত্যাদি সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মডেলিং এর পাশাপাশি তাকে কানিজ ফাতেমার নির্দেশে সমাজে অভিজাত
শ্রেণীর ক্লায়েন্টদের দৈহিক চাহিদা মেটাতে
রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল-গেস্ট হাউজে যেতে হয়। বাড়তি অর্থের লোভে সে একসময় ভালভাবেই এসবের সাথে জড়িয়ে
পড়ে। সমাজের
অভিজাত শ্রেণী, ধনী ব্যবসায়ী,
শিল্পপতিসহ প্রশাসনের উচ্চমহলের লোকজনদের সাথে এভাবে তার পরিচয় ঘটে। সোনিয়ার এসব ঘটনা
বিভিন্নজন হয়ে একসময় দেশের বাড়ীতে বাবা-মায়ের কান অবধি পৌঁছায়। তারা তাকে এ
জগত থেকে ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। মডেলিং-এর জগতটা আসলে এক ধরনের নেশার মত। সহজে কাউকে এই জগত থেকে ছাড়ানো এক
কথায় অসম্ভব। সোনিয়ার
বাবা-মা অনেক তিক্ততার শেষে মেয়ের সঙ্গে সব ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
পরিবারের আপনজনদের সাথে বিচ্ছিন্নতার কারণে তখন সময়টা খুব
খারাপ কাটছিল। এরকম সময়ই এক নামকরা ফ্যাশন হাউজের মালিক ও চিত্র
নির্মাতা আরিফ আজিমের সাথে সোনিয়ার গাঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের প্রায়ই গুলশানের নামী রেস্টুরেন্টগুলোতে একসঙ্গে দেখা
যেতে থাকে। সোনিয়ার ফুরফুরে প্রজাপতি দিনগুলো ভালই যাচ্ছিল। কিন্তু একদিনের এক
দুর্ঘটনা তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় র্যাম্প মডেলিং-এর রঙিন জগত থেকে।
১৪
অতলের গভীরে।
এয়ারপোর্ট রোডের এক পাঁচ তারকা হোটেল।
সেটা ছিল দেশের নামকরা সব ফ্যাশন
ডিজাইনারদের ডিজাইনে করা ব্রাইডাল ফ্যাশন শো।
হালকা সুরের মূর্ছনা আর হাজারো দর্শকের চোখ এবং ক্যামেরার উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ
লাইটের আলো ঝলকানিতে সোনিয়া রানওয়ে ধরে ক্যাট ওয়াক করছিল। স্টেজের ধবধবে সাদা স্পট লাইটটাও
ওয়াক ওয়ে ধরে তাকে অনুসরণ করে। রাউন্ড শেষ হলে সে ব্যাক স্টেজে যেয়ে বসে, সোনিয়া জানে সে
শো-স্টপার, নেক্সট রাউন্ড আসতে অনেক দেরী হবে। র্যাম্পে তখন পরবর্তী ইভেন্টের ছেলেমেয়েরা
পারফর্ম করছিল, সে উইংস এর পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের পারফর্মেন্স দেখার পর ব্যাক
স্টেজে বসে ড্রাগ সেবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি তার ট্রেনার কানিজ ফাতেমা নিষেধ করলেও সে গায়ে
মাখেনা।
- এখন তো এসব করার সময় না সোনিয়া।
- ইটস ওকে আপু। সমস্যা হবেনা।
- অবশ্যই সমস্যা হবে।
- কিন্তু তোমার হাতে আমার বিকল্প তো
কেউ নেই আপু। সো
একসেপ্ট ইট।
- মানে!
- কিছুই না। আমি জানি, আই অ্যাম দ্যা বেস্ট।
কানিজ ফাতেমা চোয়াল শক্ত করে সোনিয়ার
দিকে চেয়ে থাকেন, মুখে কিছু বলেন না। সোনিয়ার দাবী ড্রাগ নিলে তার ক্যাটওয়াক ভাল হয়, রানওয়েতে কনসেন্ট্রেশন থাকে। তার শরীরী ভাষায় একধরনের অহংকার ফুটে ওঠে। তবে সোনিয়ার যেমনটা দাবী, তার ক্যাটওয়াক আসলেই সেদিন বেশ ভাল হয়েছিল। সে প্রতিবারই শো-র দীর্ঘ রানওয়ে ধরে গর্বিত রাজহংসীর মত সাঁতরে যায়। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে একেবারে
শেষ ইভেন্টে। সেটা ছিল ডিজাইনার মাসুদ আলমাসের ডিজাইনে বানানো
ধবধবে সাদা ওয়েডিং গাউন। রানী ভিক্টোরিয়া বিয়েতে এ ধরনের পোশাক চালু করেন। স্পট লাইটের উজ্জ্বল আলোয় ধবধবে সাদা লিলি ফুলে ভর্তি
ব্রাইডাল বাকেট হাতে সোনিয়াকে দেখতে আসলে রানি ভিক্টোরিয়ার চেয়ে কোন অংশে কম লাগছিল না। সে রানওয়ের মাথায় গর্বিত গ্রীবা উচিয়ে একটা স্মোকি লুক দিয়ে যখন ইউ টার্ন
করছে, ঠিক তখনই এক অর্বাচীন ফটোগ্রাফারের
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটে তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। হিরোইনের কারণে ঘোরলাগা অনুভূতি কিংবা ক্যামেরার চোখ ধাঁধান ফ্ল্যাশে শরীরের
ভারসাম্য হারালে তার গাউনের দীর্ঘ লেস পেন্সিল হিলে চাপা পড়ে। এরফলে হোঁচট খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলে সোনিয়ার ডান পায়ের
এ্যাংকেল মচকে যায়।
পায়ের সমস্যার কারণে তাকে ব্যান্ডেজ বেঁধে অনেকদিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে-বসে কাটাতে
হয়। তবে
সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে জানতে পারে যে সে আর কানিজ ফাতেমার
গ্রুপে নেই, তার জায়গায় অন্য কেউ
কাজ করছে। কানিজ
ফাতেমা ডাস্টবিনে কলার খোসা ছুড়ে ফেলার মত করে তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সোনিয়া সেদিনই প্রতিজ্ঞা করে,
এ জীবনে কোনদিন সুযোগ পেলে সে এর চরম প্রতিশোধ নেবে।
অনেক জায়গায় চেষ্টা করলেও ড্রাগ
এডিকশনের খবর ততদিনে বেশ চাউর হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই তাকে ইভেন্টের কাজে নিতে রিস্ক অনুভব
করে। এই অসহ্য দিনগুলোতে যাকে সবচেয়ে বেশী পাশে প্রয়োজন ছিল সেই চিত্রনির্মাতাও তখন
লাপাত্তা। পরে
অবশ্য শুনেছে বিদেশে টাকা পাচার সংক্রান্ত একটা অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলার কারণে
সে বিদেশে পালিয়ে গেছে। এদিকে
তার হাতে জমানো টাকার অনেকটা হাসপাতালের
খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েক মাসের বাড়ী ভাড়া বাকী পড়ে যায়। ভেবে পায়না সে
কি করবে। বাবা-মা সম্পর্ক ছিন্ন করায় সেখানে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই,
তাছাড়া সে নিজেও তাদের এ মুখ দেখাতে চায়না। অর্থের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে সে অন্ধকার
জগতে পা বাড়ায়। জায়গা এবং মানুষগুলো তার পরিচিত, সোনিয়া ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকে অতলের আরও গভীরে।
১৫
গুলশান-১ ও ২ এর মাঝে একটা স্বল্প
পরিচিত গেস্টহাউজ।
ঘন বর্ষার এক রাত।
কালাবাবু ক’দিন আগে জেল থেকে ছাড়া
পাওয়ায় তার সঙ্গীরা পার্টি দিয়েছে। ঘরের আলো আঁধারিতে সাউন্ড সিস্টেমে লাউড মিউজিক বাজছে। কয়েকজন ডান্সার বিচিত্র ভঙ্গিতে মিউজিকের
তালে তালে নাচছে, তাদের পরনে পশ্চিমা সংক্ষিপ্ত পোশাক।
গেস্টরা সবাই অপরাধ জগতের, তাদের কেউ বসে, কেউবা দাঁড়িয়ে। সবার
হাতে মদের পেয়ালা কিংবা বিয়ারের ক্যান,
ক্যান উপচে সাদা ফ্যানা পড়ছে কারো কারো হাতে। সিগারেট আর সীসা'র ধোঁয়ায় ঘরে দমবন্ধ হওয়ার মত অবস্থা। পরিচিত
এক ব্যক্তির মাধ্যমে সোনিয়া সেখানে নাচতে গিয়েছিল। টুকটাক
মডেলিং এর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ভালো অফার পেলে তাকে ইদানিং এসবও করতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ নাচার পর পাশের রুমে যেয়ে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে
মুছতে সে তার জীবনের করুণ পরিণতির কথা ভাবছিল। নিয়তি তাকে কোথা থেকে কোথায় টেনে নামিয়েছে! তার বুক চিরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। কালাবাবুর ধুর্ত দৃষ্টিতে
সেটা এড়ায়না। সে
একসময়ের মডেল সম্রাজ্ঞী সোনিয়াকে দেখে ঠিকই চিনতে পারে। কিন্তু একি হাল হয়েছে তার! কথা বলার জন্য সোনিয়াকে
ইশারায় কাছে ডাকে।
কালাবাবু স্পীকারের লাউড মিউজিক এড়াতে
দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় বসতেই সোনিয়া যান্ত্রিক ভাবে তার পরনের কাপড় খুলতে শুরু
করে। কালাবাবু একটু অবাক হয়, সে ধমক দিয়ে পোশাক
পরতে বলে। এরপর তার দুরবস্থার কারণ জানতে চায়। সোনিয়া প্রথমে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়নি। অসহায় পরিণতির কথা সবাইকে বলে কি লাভ! সে জানে, তার জীবনের গল্প শুনে কারো মনে একটু করুণার উদ্রেক হয়ত হবে কিন্তু অবশেষে
তো ঐ শরীরটাই বেচতে হবে! তাই
অযথা সময় নষ্ট না করে বরং ঝটপট কাজ সেরে
বাসায় ফিরতে পারলে তার জন্য ভাল হয়। আবার সে এও ভাবে, তার দুর্দশার জন্য যে সবচেয়ে বেশী দায়ী, অর্থাৎ কানিজ
ফাতেমার ওপরে প্রতিশোধ নিতে হলে এনাদের মতই কাউকে তার প্রয়োজন। সে
কালাবাবুর প্রতিপত্তি আর দুর্ধর্ষ জীবনের কথা শুনেছে, পত্রিকাতেও পড়েছে। আজ নিয়তি তাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে।
অনেক ভেবে অবশেষে সোনিয়া কালাবাবুর কাছে মেলে ধরে তার নিজের জীবনের করুণ ইতিহাস। বাবা-মা, স্কুল-কলেজ জীবন, ঢাকায় আসা, র্যাম্প
মডেলিংএ ক্যারিয়ার গড়া কিছুই বাদ যায়না। কিভাবে ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় এসে কানিজ ফাতেমার
নজরে পড়ে এবং এরপর তার গ্রুপে ঢুকে ফ্যাশন
শো’র রানওয়েতে বিচরণ। তার নির্দেশে সমাজের বিভিন্ন জনের কাছে শরীর বিলানো। রাজী না হলে ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি ছেড়ে দেয়ার হুমকি। কানিজ কিভাবে তাদেরকে মাদকদ্রব্যে
অভ্যস্ত করে শেষে স্লেভে পরিণত করে, অনর্গলভাবে সবকিছু বলে যায়। কালাবাবু চুপচাপ তার সব কথা শোনে। অপরের কস্ট এর আগে এভাবে কখনও তাকে স্পর্শ করেনি। সে সোনিয়ার প্রতি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাকে মাদকাসক্তি থেকে
উদ্ধার করতে দেশের নামকরা এক রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করে দেয়। কয়েকমাস পরে সোনিয়া যখন মোটামুটি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে, তখন সে যেন অন্য
এক নারী! সোনিয়া এরপর কালাবাবুর ফ্ল্যাটে শিফট করে তার সাথেই থাকতে শুরু করে, সোনিয়া কয়েকবার বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিল কিন্তু কালাবাবুর অনাগ্রহে
তা বেশিদূর এগোয়নি। কালাবাবু আসলে সোনিয়াকে বিয়ে করে তার অনিশ্চিত জীবনের সাথে বাঁধতে
চায়না। বরং সে দলের টাকা-পয়সার হিসাব ঠিকঠাক রাখলেই ভাল। কালাবাবু জানে, সে যতটা না জেলের বাইরে, তারচেয়ে জেলের কাঁটাতারের ভিতরেই
বেশি সময় কাটাতে হয়। এরকম অবস্থায় একজন বিশ্বস্ত মানুষ খুব দরকার,
যে তার অবর্তমানে বাইরের হিসাবকিতাব ঠিকঠাক ম্যানেজ করবে। সে জানে সবসময়ই
জীবন-মৃত্যুর মাঝে তার অবস্থান। এরকম অবস্থায় বিয়ে করে আরেকজন মানুষকে জেনেবুঝে সে
বিপদে ঠেলে দিতে চায় না।
একটা চাপা অভিমান থাকলেও কৃতজ্ঞতা বোধের কারণে সোনিয়া সব
মেনে নিয়েই তার সাথে দিন পার করে দিচ্ছে।
সোনিয়া কালাবাবুর ফ্ল্যাটে চলে আসার
কয়েক মাস পরে পুলিশ কানিজ ফাতেমাকে মৃত অবস্থায় তার স্টাডি রুম থেকে উদ্ধার করে। তার অর্ধউলঙ্গ শরীর ঘরের সিলিঙ্গ ফ্যানের সাথে ঝুলছিল। পোস্ট মরটেম রিপোর্ট থেকে পুলিশ জানতে পারে তার মৃত্যু রশিতে
ঝুলে হয়নি, তাকে ধর্ষন করার পর গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই লোমহর্ষক কাজটা কে
করেছে তা ফ্ল্যাটের দারোয়ান বা অন্য কেউ বলতে পারেনি। ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরা নষ্ট থাকায় কোন ফুটেজ সংগ্রহ করা যায়নি, ক্রাইম সীন থেকে পর্যাপ্ত আলামতের অভাবে পুলিশ কাউকে গ্রেফতারও করতে পারেনি। খবরের কাগজে কানিজ ফাতেমার মৃত্যু সংবাদ বেশ বড় করে ছাপা হয়।
সোনিয়া নির্বিকার ভাবে সেদিনের পেপারটা উল্টিয়ে দেখে। সূক্ষ্ম
হাসির রেখা ফুটে ওঠে তার মুখে। এখনও সে হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। গুলশান থানায় পুলিশ রেকর্ডে সেটা অমীমাংসিত কেস হিসেবে এখনো পড়ে আছে। সন্দেহভাজন আসামী
হিসেবে দারোয়ানকে কোর্টে চালান দিলেও যথাযথ স্বাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে কিছুদিন পর সে
জামিনে বের হয়ে আসে। হত্যাকান্ড যারা ঘটিয়েছিল তারা বেশ প্রফেশনাল। র্যাবের ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশনেও কিছু পাওয়া যায়নি, প্লেস অফ অকারেন্সে দুর্বৃত্তরা কোন সূত্র ফেলে যায়নি।
১৬
জীবনের বিভীষিকা।
আন্ডারওয়ার্ল্ড মিরপুর।
আন্ডার ওয়ার্ল্ডে বিভিন্ন দলের মধ্যে
বিরোধ বা মারামারি লাগলে চাঁদাবাজিতে ভাটা পড়ে।
তাই নিজেদের প্রয়োজনেই বুদ্বুদের
মত কোন ঝামেলার উৎপত্তি হলে তা’ মিটে যেতে কখনো সময় লাগেনা।
কখনো খুব বেশী রকমের ঝামেলা হলে হয়ত দু’চারজন পোস্টার
হয়ে পড়ে থাকে শহরের বিভিন্ন জায়গায়, অলিতে গলিতে।
দু'চারদিন মর্গে লাশ পড়ে থাকার পর আঞ্জুমানে মফিদুলের গাড়ি এসে বেওয়ারিশ লাশগুলো
নিয়ে দাফন করে। আন্ডার ওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতের সমস্যাগুলো আসলে এভাবেই আপনা আপনি মিটে
যায়। মৃত
ব্যক্তিকে কেউ কখনো মনেও রাখেনা, একসময় সবাই সবকিছু ভুলে যায়। দুর্ধর্ষ মানুষগুলো এভাবেই পুলিশের খাতায় স্রেফ সাদাকালো ছবি হয়ে যায়। পুলিশের কাছে এসব ঘটনা অবশ্য গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে,
তাই তারা এসবে মাথা না
ঘামিয়ে অন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সারে। আসলে থানার অপরাধী
লিস্টে থাকা কেউ
যদি এভাবে পরিস্কার হয়ে যায় তাতে তারা বরং
খুশীই হয়।
পাঙ্খা নসুর সঙ্গে ব্যাঙ্গা বাবু, হোয়াইট মামুনসহ আরও কয়েকজন কাজ করে। নসুর হাতের কাজ ভালো, যেখানে এইম করে সেখানেই বুলেট লাগে। পিস্তলের মাজল থেকে বের হওয়া বুলেট সাধারণত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না, হাতও চলে দ্রুত, অনেকটা ওয়েস্টার্ন সিনেমার নায়ক ক্লিন্ট ইস্টউড-এর মতো
করে সে পিস্তল ড্র করে। তাই
দলে তার প্রচুর কদর আর লীডারও তাকে খুব পছন্দ করে। একদম কাছের লোক, বলতে
গেলে সেই লীডারের ডান হাত। কয়েক
বছর আগে লীডার গাজীপুরের এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অপারেশন শেষে ঢাকায়
ফেরার পথে মাজুখানের দিকে পুলিশের এম্বুশে পড়ে।
লীডার যদিও গাড়ির জানালার গ্লাস ভেঙ্গে বের হয়ে রাস্তার
এক আরোহীর মটর সাইকেল কেড়ে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে পুলিশের
৭.৬২ মিঃমিঃ চায়নিজ রাইফেলের মাজল থেকে একটা বুলেট ছুটে এসে তার ডানপায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ
হয়। সে অবস্থাতেই সাভার এলাকায়
এক ক্লিনিকে যেয়ে বুলেটটা
বের করতে পারলেও ক্র্যাচ হয়ে যায় তার সারাজীবনের সঙ্গী।
এরপর থেকে
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে লীডারের নাম হয়ে যায় ল্যাংড়া মনির।
মিরপুর-পল্লবী
এলাকার গার্মেন্টসগুলোর ঝুটমালের ব্যবসা নিয়ে প্রতিনিয়ত চলে চাঁদাবাজি আর
সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। সন্ত্রাসী দলগুলো তাদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নির্বিঘ্নে চাঁদাবাজি চালিয়ে
থাকে। কখনও একদল আরেক দলের এলাকায় ঢুকে চাঁদাবাজি করলে কিংবা আরেক দলের এলাকায় আধিপত্য
বিস্তারের চেস্টা করলে শুরু হয় গোলাগুলি-বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ। পুলিশ ঝঞ্ঝাট থামাতে কখনো এগিয়ে
আসে আবার কখনও ইচ্ছে করেই চুপ থাকে যেন তারা নিজেরাই খুনোখুনি করে শেষ হয়ে যায়। তা অবশ্য কখনো হয়না। কেউ গান ফাইটে মারা গেলে কিংবা র্যাব-পুলিশের
হাতে ধরা পড়লে সাথে সাথেই সে শুন্য স্থান পূরণ হয়ে যায়। ঝাঁঝালো বারুদের ঘ্রান আর রক্তের উত্তাপ মাখা এ এক অদ্ভুত জগত যেখানে
কাঁচাপয়সা আর বর্ণীল জীবন যাপনের জন্য সবকিছুর ছড়াছড়ি। তাই যোগ্য লোকের অভাব হয়না।
তবে কেউ একবার এই জগতে ঢুকে পড়লে তার পরিণতি জেলের সদর দরজা কিংবা বুলেটের
সীসা।
ঝুটমালের ব্যবসায়ীরা কন্ট্রাক্ট
পেলে এলাকার সন্ত্রাসীদের চাঁদাটা দিয়েই তবে গার্মেন্টসের গোডাউন থেকে পণ্য খালাস
করে। বিনিময়ে মাল পরিবহণে
নিরাপত্তা পাওয়া যায়, তা’নাহলে
মালামাল লুটপাট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারটা তো আছেই।
অনেকসময় সন্ত্রাসীরা নিজেরাই ঝুটমালের দখল নিয়ে তা
ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। আসলে ঝুটমালের চেয়ে ঝুটের বড় বড় গাইটের আড়ালে পাচার হওয়া স্টক লট আর চোরাই থান
কাপড়ের জন্যই এত খুনোখুনি-রক্তারক্তি। ওসবের পরিমাণের ওপর সবসময় লাভের অংকটা ওঠানামা করে।
এ এক বিশাল চক্র আর এর সাথে থানার ইনফর্মার থেকে শুরু করে গার্মেন্টসের
দারোয়ান-ওয়্যারহাউজ কিপার-ফ্লোর ম্যানেজার এবং এলাকার মাস্তান-টাউট-বাটপাররাও জড়িত
থাকে। সাধারণত গার্মেন্টস বা ফ্যাক্টরির ভিতরের লোকজনই দু’চার পয়সার বিনিময়ে
সন্ত্রাসীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়।
যারা এসব কাজে সন্ত্রাসীদের সহায়তা করে তারা টিকে থাকে, আর সহায়তা না করলে হাত-পা ভেঙ্গে বিছানায় পড়ে থাকতে হয় অথবা বেঘোরে প্রাণ
দিতে হয়।
১৭
হেনা অধ্যায়।
রূপনগর বস্তি, মিরপুর।
স্বামীর অকাল মৃত্যুর পরে নসুর মা জুলেখা বেওয়া তার অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রামের বাড়ী
নাভারন, যশোরে ফিরে যান। ফলে রূপনগর বস্তির
ঝুপরি ঘরে নসুকে একাই থাকতে হয়।
সে রাজমিস্ত্রী ডেকে ঘরের ভিতরটা আর বাথরুম ঠিক করে নেয়।
নিজের প্রয়োজনে টিভি-ফ্রিজ সবই
কিনে ঘর সাজায়। কিন্তু ঘর জুড়ে বাবা-মা, ভাই-বোনদের
অসংখ্য স্মৃতি তাড়িয়ে ফেরে তাকে। সে মাদকের নেশায় চুর হয়ে কষ্টগুলো ভুলতে চেস্টা করে। মাকে সংসার চালাতে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হয়।
তার পাঠানো সেই টাকায় গ্রামে
ভাইবোনদের খাওয়া-দাওয়া-লেখা-পড়া চলছে। পাঙ্খা নসুর এই নিঃসঙ্গ জীবনে বসন্ত বাতাসের মত এসে দোলা দেয় হেনা।
গার্মেন্টসে চাকুরীর সূত্রে সে স্টিমারে উঠে বরিশালের
হিজলা থেকে ঢাকায় এসেছে। তার
মত আরও কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে সে মিরপুর এক নাম্বারে ভাড়া বাসায় থাকে। নসু একবার এক গার্মেন্টসের ঝুটের চালান সাফাই করতে গেলে
হেনার সাথে পরিচয় হয়।
সেই পরিচয় থেকেই একটু আধটু ভাল লাগা। নসু
একসময় বিয়ের জন্য চাপ দিলেও হেনা নসুর এই অনিশ্চিত
জীবনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে ভয় পায়।
সে হয়ত নসুকে ভয় পায়, তাই এক কথায় সম্পর্কের ইতি টানতে পারে
না। সে ভাল করেই জানে নসুর সাথে তার সম্পর্কের কারণে
ফ্যাক্টরির ফ্লোর ম্যানেজার থেকে শুরু করে
অনেকেই ভয় পায়, সমীহ করে কথা বলে। তাকে অশ্লীল কিছু বলতে বা অন্য অনেক মেয়েদের মত তাকেও স্টোর
রুমের কোনায় নিয়ে যৌন হয়রানি করতে সাহস পায়না।
গার্মেন্টসের মেয়েদেরকে তাদের ওপরে
চালানো নানারকম যৌন নিপীড়ন নীরবে সহ্য করতে হয়, তা’না হলে ফ্লোর ম্যানেজার যে কোন অজুহাতে চাকুরী থেকে ছাটাই করতে মালিকের
কাছে সুপারিশ করবে। তবে যেসব ফ্যাক্টরিতে কমপ্লায়েন্স নীতিমালা ঠিকঠাক মেনে চলা হয় সেখানে এসব
সমস্যা কম বা একদম নেই বললেই চলে। তাদের ফ্লোর ম্যানেজার জয়নাল ভীষণ বদমেজাজি আর তার হাতে যেটুকু ক্ষমতা আছে তা সে
বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। হেনার মাঝে মাঝে তাকে স্যান্ডেল পেটা করতে ভীষণ ইচ্ছে করে। হেনা মনেমনে ঠিক করেছে একদিন নসুকে দিয়ে ওর বেপরোয়া
হাতটা ভাঙবে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির গেটের
দারোয়ানগুলোও লুচ্চামিতে কম যায়না। তবে
তার কখনও ঢুকতে দেরী হলে দারোয়ান সামসু মিয়া মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করার সাহস পায়না। অন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে এরকম
হলে হয়ত দশ/বিশ টাকা ঘুষ দিয়ে বা অন্য কোন উপায়ে দারোয়ানকে ম্যানেজ করে তবে কারখানার
ভিতরে ঢুকতে হয়। নসুর দলের ছেলেরাও তাকে
খুব সম্মান করে। তাকে দেখলে উঠে দাঁড়ায়, ভাবী বলে ডাকে। কখনো হয়ত রিক্সা ডেকে জোর করে
উঠিয়ে দেয় বা দোকান থেকে কোক/স্প্রাইট এনে খেতে দেয়। সে জানে নসুর আশ্রয়ে সে নিরাপদ। যদি নসু তার পাশে থাকে তাহলে এই হায়েনা শহরে কেউ তার
দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকাতে সাহস পাবেনা।
বিয়ে করা নিয়ে হেনার দ্বিধাগ্রস্থতা
দেখে নসু খুব বিরক্ত হয়। কোন
এক শনিবারের রাতে সে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে হেনাকে
জোরপূর্বক তার বস্তির ঘরে এনে তোলে। হেনা শুরুর দিকে বাঁধা দিলেও একসময় এই জীবন তাকে মেনে
নিতে হয়। তাকে
বাধ্য হয়ে নসুর সাথে লিভটুগেদার করতে হয়। তবে সে মনেমনে প্ল্যান আঁটে, হাতে কিছু
টাকা পয়সা জমলে এখান থেকে পালিয়ে যাবে। নসুর অবশ্য ইচ্ছা হাতে প্রচুর টাকা জমলে, গ্রামে ফিরে যাবে। হেনাকে বিয়ে করে সংসার করবে। সন্তান-সন্ততিতে ভরে উঠবে তার সাজানো সংসার। প্রায়ই সে তার স্বপ্নের
কথা হেনাকে শোনায়। হেনা
সেসব শোনে কিন্তু তার মনে কি ভাবনা তা শুধু সেই জানে। নসু হেনাকে তার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করলে সে একরকম
নিরুত্তর থাকে, কিংবা কৌশলে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যায়। নসু আসলে হেনাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। হেনা আপত্তি করলেও নসু একদিন গার্মেন্টসের চাকুরী থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনে। এরপর থেকে সে বস্তির
চার দেয়ালে বন্দী, কিন্তু যে পাখি উড়তে শিখেছে তাকে কি খাঁচায় বন্দী করে রাখা যায়!
১৮
কাসিমপুর জেলখানা।
কোন এক ঝলমলে রোদের দিন।
হাতে কাজের কোন ফর্দ না থাকলে নসু আগে
ঘরেই শুয়ে বসে সময় কাটাতো, কিন্তু ইদানীং হয়েছে তার ঠিক উল্টোটা। বাইরেই বেশীর ভাগ সময় কাটছে তার।
এখন কখনও গভীর রাতে, আবার কখনওবা সেই কাকডাকা ভোরে ঘরে
ফিরতে হয়। আবার কখনও হয়ত ঘরে
ফিরছে তিন-চার দিন পর। জিজ্ঞেস
করলেও ঠিক মত উত্তর পাওয়া যায়না। হেনা
ভাবে এখন হয়ত তার
কাজের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে।
সে শ্রাগ করে, যার জীবন সেই ভাল
বুঝবে। ল্যাংড়া মনিরের দলে নসু এখন সেকেন্ডম্যান। সে প্রায়ই ভাবে লীডারকে পাতালে বা হাসপাতালে পাঠিয়ে সে নিজেই দলের দখল নিবে, কিন্তু কালাবাবুর ভয়ে
সাহস পায়না। দলের কিছু ছেলে অবশ্য তার এই প্ল্যানে রাজী, তাদের ইশারা ইঙ্গিতে সেটা বোঝা যায়। কিন্তু কালাবাবু কিভাবে যেন বিষয়টা টের পেয়ে যায়।
ব্যাটা মহা ধুরন্ধর!
একদিন নসুকে জেলগেটে ডেকে পাঠায়,
- এই হালা বান্দির পুঁত ক্যালা! তোর
নামে কিসব শুনতাছি ?
- কি ?
- তুইই ভালো জানোস! কইলজা টাইনা
ছিঁইড়া ফালামু। হালার পো হালা। সাবধান
হইবি কইলাম।
- কি যে, সব কইতাছেন বস!
- কি কইতাছি মানে! যা হাছা তাই
কইতাছি।
নসু যেন ভুলেও কখনও মনিরকে দুনিয়া
থেকে সরানোর চিন্তা না করে, এসব বলে সাবধান করে দেয়। কালাবাবু
সেদিন দলের ছেলেদের সামনেই নসুকে আরো আজেবাজে-অপমানজনক কথা বলে। নসু সেসব কথা গায়ে না
মেখে বরং দাবার বোর্ডে পাল্টা চাল দিয়ে বসে,
- বস, মগর একখান কথা আছিলো।
- কইয়া ফালা।
- একটু সাইডে আহেন। পারসোনাল।
- এই হালায় কয় কি? বান্দির পুঁত কি
কইবি এই হানেই কইয়া ফালা।
- বস, সোনিয়া ম্যাডামের দিকে একটু
খেয়াল রাইখেন। পাখি উড়াল দিবার পারে। বাতাসে কিছু
কথা উড়তাছে কইলাম।
কালাবাবু চীৎকার করে উঠে এবং এরপর
নসুর পিছনে জোরে একটা লাথি কষে বের হয়ে যেতে বলে। নসুকে ছিটকে মাটিতে পড়ে যেতে
দেখে কেউ কেউ কাছে এগিয়ে আসতে চায়। নসু ইশারায় তাদের না করে দিয়ে প্যান্টের ধুলো
ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ায়। আগের মতই একরোখা ভঙ্গীতে বলে,
- কথাটা মাথায় রাইখেন বস। পরে
কিন্তু পস্তাইবেন। অই ব্যাডার লগে ম্যাডামের আগে থাইকাই লাইন আছে। এক ক্লিনিকের ডাক্তারের লগেও কীসব চলতাছে শুনি।
কালাবাবুর কঠিন দৃষ্টিতে নসু যেন
ভস্মে পরিণত হয়ে ধুলোয় মিশে যাবে। নসু সেই দৃষ্টির সামনে শ্রাগ করে চলে আসে,
সে জানে তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। নসু মনেমনে হাসে।
১৯
মিরপুর।
একদিন সন্ধ্যায়।
নসুকে জেলগেটে ডেকে নিয়ে অপমান
করাটাই যেন কালাবাবুর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। স্বভাবে হিংস্র আর একরোখা নসু এই অপমানের জ্বালাটা
কোনভাবেই ভুলতে পারেনা। তার
অতীত ইতিহাস অন্তত তাই বলে। প্রতিশোধ স্পৃহা নসুকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে তার অন্যান্য কাজগুলোও ঠিকভাবে করাই দায় হয়। স্বভাবে কিছু পরিবর্তন দেখে লীডার তাকে জিজ্ঞেস করে,
- তর কি হইছে রে ? ভাও ভাল্লাগতেছে না।
সমস্যা কি ?
নসু উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থাকে। তার ওভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে ল্যাংড়া মনির তাকে আবারও জিজ্ঞেস করে,
- কিছু কস না ক্যালা! কি হইছে কইয়া
ফালা। কিছু লাগবো!
- না, লীডার। সব তে ঠিকঠাক আছে।
- হুন, আমি বুঝছি, তর উপর দিয়া বহুত চাপ যাইতাছে। এক কাম কর, কিছুদিন ঢাকার বাইর থাইক্যা
ঘুইরা আয়। কক্সবাজার যা।
লীডার তাকে কিছুদিন ঢাকার বাইরে
কাটিয়ে আসার পরামর্শ দেয়। এতে হয়ত তার মানসিক চাপ লাঘব হবে, কিন্তু নসু তাতে রাজী হয়না। সে আপনমনে ভাবতে থাকে, ল্যাংড়া
মনিরের বদলে কালাবাবুকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলে কেমন হয়! রিস্ক নিতে হলে বড় ধরনের
রিস্ক নেয়াই উচিৎ। প্ল্যানটা ঠিকমত কাজ না
করলে মৃত্যুর সম্ভাবনা দু’টোতেই আছে, কিন্তু কালাবাবুকে সরাতে পারলে লাভের অংকটা বিশাল। সারাক্ষণ এই এক চিন্তা সিন্দাবাদের ভূতের মত তার মাথায়
চেপে বসে থাকলেও প্ল্যানটাকে কিভাবে কার্যকর করবে তা ভেবে পায়না। এরকম এক উথাল পাতাল সময়ে
একটা অভাবিত ঘটনা ঘটে তার ব্যক্তিগত জীবনে। যার কারণে তাকে ওপারে পালিয়ে যেতেই হয়।
২০
নভেম্বর মাসে কোন এক বুধবারের রাত।
নসুর ঘরে ফেরার কোন নির্দিষ্ট সময়
সূচি না থাকায় হেনা সাধারণত বেশী রাত পর্যন্ত জাগেনা। সে তার মত ঘুমাতে যায়। নসু
হেনার ঘুমের ব্যাঘ্যাত না ঘটাতে একটা চোরাই ফোকরে হাত গলিয়ে নিঃশব্দে দরজার
হুড়কোটা খুলে ঘরে ঢোকে। তারপর নিজের টুকটাক কাজ শেষ করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ে।
এভাবেই সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু
ঝামেলা বাঁধলো কোন এক বুধবারের রাতে। নসু বরাবরের মত মাঝরাতে
ঘরে ঢুকে সেদিন তার জীবনের চরমতম ধাক্কাটা খায়।
নসুর বিছানায় ব্যাঙ্গা বাবু। সে হেনাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে।
ঘরের হালকা নীল আলোয় চোখটা সয়ে গেলে
নসু সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। তাদের শরীরের ওপর থেকে পাতলা কম্বলটা সরে গেছে। মশারীর আবরণ ভেদ করে হেনার উম্মুক্ত স্তন চোখে পড়ে। মেঝের ঘিয়ে রঙের টাইলসে লুটাচ্ছে হেনার পরনের শাড়ি। ব্লাউজ-ব্রা-পেটিকোট পড়ে আছে সোফার কুশনের ওপর। শ্বাস-প্রশ্বাসের
সাথে কামারের হাপরের মত তাদের বুক ওঠানামা করছে। সেন্টার টেবিলের উপরে চীনেমাটির প্লেটে অভুক্ত ভাত,
আধখাওয়া পাউরুটির টুকরো। বাটিতে
মাংসের ঝোল লেগে আছে। হুইস্কির
বোতলটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে আছে, সে নিজেই গত সপ্তাহে খাওয়ার
জন্য এনেছিল। ইদানীং হেনাও তার সাথে দু'এক পেগ করে খেতে শিখেছে।
তার অবর্তমানে ঘরের ভিতরে কিকি ঘটেছে সেলুলয়েডের ফিতের মত তার চোখে ধরা পড়ে।
কোন এক অজ্ঞাত কারণে নসুর মনেহত, সে
অপারেশনে বাইরে থাকলে হেনা হয়ত কারো হাত ধরে পালিয়ে যেতে পারে। এজন্যই সে একদিন হেনাকে চাকুরি থেকে ছাড়িয়ে আনে। শুধু
তাই না, ব্যাঙ্গা বাবুকে বলে হেনার দিকে খেয়াল রাখতে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে অপারেশনে গেলে। কিছুদিন আগে হাতে চোট পাওয়ায় আজকাল ব্যাঙ্গা
বাবুকে কোন অপারেশনে নেয়া হচ্ছে না। কিন্তু দলে দীর্ঘদিনের সঙ্গী যে তার সাথে
এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে তা ঘুণাক্ষরেও তার মাথায় আসেনি।
চোখের সামনে হেনা এবং ব্যাঙ্গা বাবুকে
এভাবে
নগ্ন শরীরে বিছানায় জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতে দেখে সে কি করবে
প্রথমে ভেবে পায়না। নসু
কয়েক মিনিট হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর রাগে-ক্ষোভে চীৎকার দিয়ে ওঠে। পিস্তলের সন্ধানে পকেটে
হাত বাড়ায় কিন্তু ব্যাঙ্গা বাবুর ভাগ্য আসলেই ভাল, পিস্তলের ম্যাগাজিনে একরাউন্ড
বুলেটও অবশিষ্ট নেই। পিস্তলের হ্যামার ফায়ারিং পিন-এ আঘাত করলে ক্লিক করে একটা শব্দ বেরোয় কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়না। সন্ধ্যার অপারেশনে বেশ ফায়ারিং
হয়েছিল, তাতেই পিস্তলের ম্যাগাজিন খালি হয়ে গেছে। এরপর পিস্তলের ম্যাগাজিন রিলোড
করতে খেয়াল ছিল না। তার
জান্তব চীৎকারে দু’জনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। নসুর
বিভ্রান্তির সুযোগে ব্যাঙ্গা বাবু জিন্সের প্যান্টের ভিতর
দু’পা গ’লে দৌড়ে পালিয়ে যায়। হেনা
বিছানা থেকে নেমে ওভাবেই ঘরের
এক কোনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে
থাকে। সে
কি করবে ভেবে পায়না। তার মাথায় এলোমেলো চুলের জটলা।
হাই চাপতে চাপতে হেনা বামহাত দিয়ে আলতো ভাবে কপাল-চোখের
ওপর থেকে চুলের গোছা সরিয়ে নেয়।
ব্যাঙ্গা বাবুর সাথে হেনা অবশ্য সেদিনই
প্রথম বিছানায় যায়নি।
যেদিন থেকে নসু তাকে পাহারার কাজে লাগিয়েছে তার সপ্তাহ খানেক পর থেকেই নসু বাইরে গেলে তারা একান্তে
মিলিত হত। হেনা অবশ্য এটা টাকা বা অন্য কিছুর লোভে করেনি।
তার প্ল্যান ছিল এভাবে ব্যাঙ্গা বাবুর সাথে ভাব জমিয়ে একদিন সুযোগ বুঝে তার সাথে পালিয়ে
যাবে। নসুর সাথে বন্দী পাখির
জীবন তার কাছে অসহ্য লাগছে। সবকিছু কেন জানেনা বিরক্তির শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল,
তাছাড়া সেতো নসুর বিয়ে করা বউ না যে তাকে নসুর সাথে থাকতেই হবে।
তাকে জোর করে তুলে এনে এই যে একসাথে স্বামী-স্ত্রীর মত থাকা, এটা সে কোনদিনই মন থেকে মেনে নেয়নি। নসু তার মন সেভাবে ছোঁয়ার
আগেই শরীরের দিকে হাত বাড়িয়েছে।
একবারও জানতে চায়নি হেনা কি চায়!
সে জানে গার্মেন্টসের অনেক মেয়ে থাকার জায়গার অভাবে কিংবা খোরপোষ খরচ কমাতে পুরুষ সহকর্মীদের
সাথে গোপনে লিভ টুগেদার করে।
এতে মেয়েদের লাভ হল মাথার ওপরে বিনে পয়সায় মাথা গোঁজার
ঠাঁই, আর ছেলেদের লাভ হল বিনে খরচায় অবাধ যৌনতার পাশাপাশি রান্না-বান্নার ঝুট
ঝামেলা পোহাতে হয়না। তবে এরচেয়েও ভয়ংকর খবর হল, তারা কিছুদিন পরপর নিজেদের মধ্যে
পার্টনার পরিবর্তন করে থাকে। কিছু কিছু এনজিও অবশ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণসহ
অন্যান্য স্বাস্থসেবার কারণে এসব খোঁজ-খবর টুকটাক রাখে। হেনা এসব ঘটনা
গার্মেন্টসের অন্যান্য মেয়েদের মত অল্প-বিস্তর জানলেও সে কখনোই এসব পছন্দ করেনি।
তাকে আসলে প্রতিকূল বাস্তবতার কারণে নসুর কাছে ভিড়তে হয়েছিল।
কিন্তু নসু যে তার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে এভাবে তুলে এনে
লিভটুগেদার করতে পারে, তা সে কোনদিনই ভাবতে পারেনি। সে যদি ঢাকাতেই না থাকে তাহলে
তো আর নসুকে তার প্রয়োজন নেই। সে কখনোই নসুকে ভালোবাসেনি।
হেনা ভয়ার্ত হরিণ শাবকের দৃষ্টিতে দেখে
নসু রান্না ঘর থেকে বটিটা এনে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।
সে দু'হাতে বাঁধা দিয়ে নসুকে কিছু একটা বলতে বা বোঝাতে
চায় কিন্তু পারেনা। তার আগেই নসুর হাতের ধারালো বটি হেনার ঘাড়ে নেমে আসে।
হেনার না বলা কথাগুলো আর বলা হয়না। তার বদলে কেমন একটা ঘরঘর শব্দ বেরিয়ে আসে বিচ্ছিন্ন কণ্ঠনালী থেকে। হেনার না বলা কথাগুলো হয়ত ইথারেই ভেসে যায়। নসু
হিস্টিরিয়াগ্রস্থ যুবকের মত বটি দিয়ে একের পর এক কোপ দিয়ে
যায় হেনার পুরো শরীরে।
ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়া রক্ত ভিজিয়ে দেয় নসুর জামা-কাপড়।
সে এক সময় হাঁপিয়ে ওঠে। হাতে ধরে রাখা বটিটা খাটের
দিকে ছুড়ে দিয়ে অবসন্ন দেহে বসে পড়ে ঘরের মেঝেয়।
খাটের কোনায় ধাক্কা খেয়ে টাইলসের মেঝেয় লোহার বটিটা ঝনঝন
শব্দে আছরে পড়ে। রক্তের প্রবল ধারা
ভিজিয়ে দেয় ঘরের মেঝে।
একসময় হঠাৎ
সংবিৎ ফেরে নসুর, চমকে ওঠে সে। সে
এ কি কাজ করেছে! সে কিভাবে নিজ হাতে নিজের প্রেমিকাকে খুন করেছে! নসু উদ্ভ্রান্তের
মতো ঘরের চারদিকে তাকায়।
কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা। ধরহীন রক্তাক্ত দেহটা খিচুনি দিতে দিতে এক সময় নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রক্তের অজস্র ধারায় ভাসছে সে।
মুহূর্তেই নসুর ষষ্ঠইন্দ্রিয় জেগে ওঠে।
বালতির পর বালতি পানি এনে
মুছে ফেলে রক্তের সব ধারা, এখানে সেখানে লেগে থাকা দাগ।
তার পরনের কাপড়ে লেগে থাকা রক্তের দাগও মুছতে চেষ্টা করে
কিন্তু তাতে কোন কাজ না হওয়ায় সেগুলো খুলে ধুয়ে খাটের স্ট্যান্ডে শুকাতে দেয়। এরপর সোফার উপরে পড়ে থাকা হেনার কাপড়-প্লেট-গ্লাস-হুইস্কির খালি বোতল বস্তায় ভরে ঘরের
আলো নিভিয়ে দেয়।
কালো
জিন্সটা পরে ঘরের বাইরে এসে নসু চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত
হতে চায় তাকে কেউ খেয়াল করছে কিনা। এদিকের
ল্যাম্পপোস্টগুলোয় বাতি জ্বলেনা অনেক দিন।
অনেকগুলো বাতি ভাঙ্গা।
বস্তির ছেলেরা গুলতি মেরে
ভেঙ্গেছে হয়ত। অন্যসময়
এসবের জন্য তাদেরকে বকাঝকা করলেও আজ পরিস্থিতি সম্পুর্ণ ভিন্ন,
সে মনেমনে তাদেরকে ধন্যবাদ দেয়।
নসু অদূরে খালের পার ঘেষে আবছা জঙ্গলের দিকে তাকায়, তারপর দ্রুত
পায়ে ঘরের বারান্দা থেকে কোদালটা হাতে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়।
গর্ত খোরা শেষ হলে ঘর থেকে বস্তাটা এনে সেখানে পুঁতে ফেলে।
এরপর ঘরে ফিরে ধারালো চাকু
হাতে হেনার হাত-পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে পলিথিনের ব্যাগে মুড়ে ডীপ ফ্রিজে রাখে। কাজ শেষে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে ভাল করে গোসল করে, কিন্তু তার
শরীরে কাঁচা মাংসের ঘ্রাণ পারফিউমের বেইজ নোটের মত লেগে থাকে।
নসু লাইট
জ্বেলে পুরো ঘর তন্নতন্ন করে এটাসেটা খুঁজে দেখে।
খাটের নিচে রাখা হেনার ট্র্যাঙ্কে নসু
অনেকগুলো টাকার বান্ডিল দেখতে পায়,
পরে কাজে লাগতে পারে ভেবে ওগুলো তার ট্র্যাভেল ব্যাগে ভরে রাখে। হেনাকে বিভিন্ন সময়ে দেয়া তার কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল সেখানে। সেগুলোও ব্যাগে ভরে নেয়। এসব করতে করতেই প্রায়
ভোর হয়ে আসে। এরপর বিছানায় শুয়ে একটু
ঘুমাতে চেষ্টা করে, কিন্তু বটির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হেনার শরীরের দৃশ্যটা নসুর চোখ
থেকে সরতে চায়না যেন। আঠার মতো লেগে থাকা দৃশ্যটা
বারবার ফিরে আসে। নসু রাতের বাকী সময়টুকু বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই পার করে দেয়। তার মাথার বালিশে তখনো হেনার শরীরের ঘ্রাণ। ওর প্রিয় সুগন্ধি ছিল মুনড্রপ,
নসুকে মার্কেট ঘুরে ঘুরে এখন আর
কালোকেশি তেল কিংবা তিব্বত স্নো কিনতে হবেনা।
তার প্রিয় হাস্না হেনা এখন শুধুই স্মৃতি।
২১
রূপনগর বস্তি,
মিরপুর।
পরের দিন দুপুর।
নসু গোসল করে ঘর তালাবদ্ধ করে
বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার মোড়ে আবুলের চায়ের দোকানে নাস্তা খেতে বসে সে চোখ–কান খোলা রাখে। কেউ কিছু আঁচ করতে পেরেছে কিনা বুঝতে চেষ্টা করে। মনেহচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। বিল মিটিয়ে সে মিরপুর দশ নাম্বার গোল চক্করের দিকে যায়। চায়ের দোকানদার আবুল হোসেন নসুর দিকে অবাক দৃষ্টিতে হা মেলে তাকিয়ে থাকে। কারণ সে এর আগে কখনই খাবারের বিল দিত না, সবসময়ই ফ্রিতে খেত। দোকানদার দাড়িতে হাত
বুলাতে বুলাতে ক্যাশ বাক্সে টাকা ভরে অন্য খদ্দেরের দিকে তাকায়। খদ্দেরের চাপে নসুর অস্বাভাবিক আচরণটা একসময় সে হয়ত ভুলেও
যায়। নসু বাজার থেকে বড়
সাইজের চারটা কর্কশিটের প্যাকিং বাক্স কেনে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এগুলোতে করে ঢাকায় মাছের চালান আসে। বাক্সগুলো ঘরে রেখে একটা ডাবল
কেবিন পিকআপ ভাড়া করতে যায়। কাজগুলো
শেষ হতে না হতেই লীডার তাকে ডেকে পাঠায়।
তার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে।
ধরা পড়তে চায়না সে।
ওই ব্যাটা নিমক হারাম ব্যাঙ্গা বাবু লীডারকে সব বলে
দিয়েছে কিনা কে জানে! পরপর কয়েকবার ফোন এলে সে বাধ্য হয়ে ঘরে তালা মেরে লীডারের
সাথে দেখা করতে যায়।
লীডার আসলে তাকে ডেকেছে পিস্তলের ম্যাগাজিন
রিলোড করে নেয়ার জন্য। কাল
অপারেশনের পরপরই কাজটা না করায় তিনি নসুকে গালমন্দ
করেন,
- কীরে! ফোন ধরোস না ক্যান! কয়বার
কল দিছি দেখছোস?
- ফোন সাইলেন্ট আছিলো, দেখি নাইক্যা।
- তোর কাছ থাইক্যা এইটা আশা করি নাই
নসু!
- ভুল হইছে লীডার। কাইল অপারেশনের
পর থাইক্যা আসলে মাথাটা কাম করতাছে না।
- ক্যান! কি হইছে ?
- কিছু না লীডার। হুদাই।
- তুই তো জানোস এই রকম হইলে শুধু
নিজের না, বেবাগতির জন্যও বিপদ ডাইকা আনবি।
- আর হইবো না লীডার।
এধরনের অসাবধানতার যেন আর
পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা বুঝিয়ে তিনি ব্যাঙ্গা বাবুর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন,
- ব্যাঙ্গারে দেখছোস ?
- না।
- হালার পুঁতে গ্যালো কোই!
সে কোথায় গেছে দলের কেউই বলতে পারছে
না, তার মোবাইল নাম্বারটাও
বন্ধ। পুলিশ বা র্যাবের কাছে
ধরা পড়লো কীনা কে জানে, লীডার আপন মনে ভাবেন।
আগের দিন রাতে হেনার সাথে ঘটে যাওয়া
ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য মনে আসাতে নসু একটু আনমনা হয়ে পড়ে। তার আনমনা ঘোর কাটে বসের কথায়,
- হেনার
লগে তোর কিছু হইছেনি!
- না তো। ক্যালা! কি হইবো ?
- কিছু না হইলেই ভালা। তবে ওর দিকে
একটু খেয়াল রাখিস, দিনকাল ভালা না।
- হু।
- ব্যাঙ্গা বাবুরে যে কাম দিছোস ঐটা
অন্য কাউরে দিস। ওর লগে আমার বহুত কাম আছে।
- আইচ্ছা।
নসু আসলে অল্প কথাতেই
প্রসঙ্গটার ইতি টানতে চায়। লীডার হয়ত বুঝতে পারেন অজ্ঞাত কোন কারণে নসু মানসিকভাবে
বিধ্বস্ত। দু’দিন আগে দলের একজন ব্যাঙ্গা বাবুকে নসুর ঘরে ঢুকতে দেখেছে। সেটা জানালেও নসুর মধ্যে
কোন প্রতিক্রিয়া হয়না দেখে লীডার একটু অবাক হন। তবে বিষয়টা যেহেতু নসুর একান্ত ব্যক্তিগত তাই ও
প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। ব্যাঙ্গা বাবু পুলিশ বা র্যাবের হাতে ধরা পড়লে নসুর
ঝামেলা হতে পারে জানিয়ে তাকে সতর্ক ভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ দেন। লীডারের ওখানে আরো কিছুক্ষণ সময়
কাটিয়ে কিছু টাকা হাতে নিয়ে সে চলে আসে। দূরে কোথাও অনেকগুলো কাক তারস্বরে চীৎকার করে যাচ্ছে।
নসু ডান হাতের আড়ালে রোদ ঢেকে বুঝতে চেষ্টা করে। কিন্তু কোথা থেকে যে কাকের ডাক ভেসে আসছে সে বুঝতে পারেনা। আমাদের এই শহরে প্রতিদিন অসংখ্য কোকিল কাকের বাসায় ডিম
পেরে যাচ্ছে! কেউ তার হিসেব রেখেছে কি ?
২২
একই দিন বিকেল।
সাঁতারকুল,
বাড্ডার দিকে একটা চারতলা বিল্ডিঙের চিলেকোঠা ঘর।
রাস্তার মাথার রড-সিমেন্টের দোকান
থেকে নসু এক ব্যাগ সিমেন্ট আর দু’বস্তা বালি কিনে বাসায় ফেরে। কিসের কাজ করাবে দোকানদার জিজ্ঞেস করেছিল। বাথরুমের কাজ করাবে বলে নসু সাপের দৃষ্টিতে এমনভাবে তাকায় যে দোকানদার ভয়ে গুটিয়ে যায়। তার মুখ ভর্তি পান চিবানো থেমে যায়। এরপর দ্বিতীয় প্রশ্নটা না করে সে নিঃশব্দে টাকাগুলো গুনে
নেয়। ভ্যানওয়ালাকে বালির
বস্তা দু’টা দরজার সামনে নামাতে বলে সিমেন্টের ব্যাগটা সে নিজেই ঘরের ভিতরে টেনে
নিয়ে যায়। এরপর হোটেলে যেয়ে সামান্য
কিছু খেয়ে ঘরে ফিরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। তার আসলে ক্ষুধা নেই, গতকাল রাত থেকেই মুখের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। সে বালতিতে বালি-সিমেন্ট
ভাল করে মিশিয়ে এক পাশে রাখে।
এরপর কর্কশীটের প্যাকিং বাক্সগুলোতে হেনার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে সাজিয়ে
তার ওপরে বালি-সিমেন্টের মিশ্রণ ঢেলে দেয়। এভাবে চারটি বাক্সই রেডি হলে খাটের নীচে লুকিয়ে রাখে।
বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায়
নেই প্যাকিং বাক্সগুলোর ভিতরে কি আছে। নসু এরপর গোসল সেরে পিস্তলের ম্যাগাজিন লোড
করে জিন্সের প্যান্টের কোমরে গুঁজে ঘর থেকে বের হয়। সেফটি ক্যাচ সেইফ
পজিশনে, পিস্তল লক করা আছে, সমস্যা নেই। বাতাসে
প্যাকিং বাক্সের মিশ্রণ শুকাতে থাকে, একসময় জমাট বেঁধে সেগুলো সিমেন্টের ব্লকের মত আকার নেয়।
নসু
একটা ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করে সাঁতারকুল, বাড্ডার
দিকে যায়। সেখানে ব্যাঙ্গা বাবুর
মামার বাড়ি।
মামার চারতলা বাড়ীর ছাদে ছোট একটা কুঠুরি বা চিলেকোঠা আছে। হাবিজাবি জিনিসপত্র রাখার জন্য স্টোর হিসেবে বানানো
হয়েছিল সম্ভবত। গতবছর এক অপারেশনের পরে সে আর ব্যাঙ্গা বাবু সেখানে কয়েকদিন লুকিয়ে ছিলো। ঢাকা শহরের ভিতরেই চমৎকার
একটা হাইড আউট। তার ধারণা, তার কোনও ভুল না হলে ব্যাঙ্গা বাবু সেখানেই লুকিয়ে আছে। সে হল কুয়ার ব্যাঙ, তার চিন্তার দৌড় নসুর জানা আছে।
নসু পিছনের তিন তলা বিল্ডিঙের ছাদ
থেকে স্যানিটারী পাইপের লাইন বেয়ে চারতলায় ওঠে। এরপর কুঠুরির পিছনে নিজেকে লুকিয়ে ছোট জানালাটা দিয়ে ভিতরে উঁকি মারে, তার ধারণা সঠিক। ব্যাঙ্গা বাবু আপন মনে শীষ দিয়ে পরিচিত গানের সুর ভাঁজতে
ভাঁজতে ব্যাগ গোছাচ্ছে। সে
সম্ভবত অন্য কোথাও পালানোর প্ল্যান এঁটেছে।
নসু চুপিসারে ঘরের ভিতরে ঢোকে, অবস্থাদৃষ্টে মনেহচ্ছে সে আরেকটু পরে এলে ব্যাঙ্গা
বাবুকে খুঁজে পেত না। ব্যাঙ্গা
বাবু হঠাৎ ঘরের ভিতরে নসুকে আবিষ্কার করে
প্রবল আতংকে চমকে ওঠে।
তার হাত-পা কাঁপতে থাকে,
ভয়ে মুখটা শুকিয়ে যায়।
অবসন্ন শরীরে দু'হাত দু'পাশে ঝুলে পড়ে, নিজের অসহায়তা বুঝতে পেরে সে
যেন তার এই পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য হয়। জেলখানার নির্জন কনডেম সেলে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীরাও নাকি দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর জন্য
অপেক্ষা করতে করতে একসময় বিরক্ত হয়ে সবকিছু মেনে নেয়। ফাঁসি কার্যকর করার জন্য নিজ থেকেই জল্লাদকে সহযোগিতা
করে, যমটুপি পরার সময় বা ফাঁসির মঞ্চে
ওঠার সময় কোন ঝামেলা করেনা।
অনেকে এমনকি নিজ থেকেই এগিয়ে যায়, যেন তার অতি আপন
বা পরম আরাধ্য কারো কাছে সে ফিরে যাচ্ছে। তারপর লিভারটা টেনে দেয়া হলে সে যেন মুক্তির শ্বাস ফেলে। অপেক্ষা এক ভয়ঙ্কর
অসুখ। বেশীদিন এর চাপ সহ্য করা যায়না।
ব্যাঙ্গা বাবু জোরে চীৎকার করে
কাউকে সাহায্য করার জন্য ডাকতে চায়,
কিন্তু তার গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোয় না।
প্রচন্ড ভয়ের কারণে শুধু ফ্যাসফেসে একটা ধ্বনি বের হয় মাত্র। শেষ প্রচেষ্টা হিসাবে বলে,
- বস মাফ কইরা দ্যান। আমার কুনো দোষ নাই। হ্যায় নিজেই আমারে.........
নসু তাকে কথাটা শেষ করার
সুযোগ দেয় না। বিছানা থেকে বালিশটা নিয়ে
ব্যাঙ্গা বাবুর মুখে ঠেসে ধরে পিস্তলের মাজল ঠেকিয়ে ট্রিগার প্রেস করে। এক রাউন্ড বুলেট
পিস্তলের মাজল থেকে বেরিয়ে গেলে ধুপ্ করে একটা শব্দ হয়। বুলেট ব্যাঙ্গা
বাবুর মুখ দিয়ে ঢুকে করোটি ভেদ করে চলে যায়, পিছনে রেখে যায় টেনিস বলের সমান
একটা গর্ত। রক্তমাখা মগজ ছড়িয়ে পড়ে, ঘরের মেঝেও রক্তে ভেসে যায়। খালি
কার্টিজটা বিছানার নিচে গড়িয়ে পড়ে। কাজ
শেষ করার পর নসু
যে পথে এসেছিল চুপিসারে সে পথেই পালিয়ে যায়।
২৩
একই দিন সন্ধ্যার পরপর।
রোড টু ফেরিঘাট।
মাগরিবের আজানের পর ডাবল কেবিন
পিকআপটা এলে নসু ড্রাইভারের হাতে কিছু টাকা দিয়ে হোটেলে ভাত খেতে পাঠায়। এরপর সে একাই একে একে চারটা প্যাকিং
বাক্স ঘরের বাইরে এনে পিকআপের ট্রেইল বোটে রাখে।
বালি আর সিমেন্টের মিশ্রণ জমাট বাঁধায় কর্ক শিটের বাক্সগুলো ওজনে বেশ ভারী হয়েছে।
তেরপল দিয়ে বাক্সগুলো ঢাকার পর দড়ি
শক্তভাবে ট্রেইল বোটের হুকের সাথে বাঁধে। ততক্ষণে ড্রাইভার ফিরে এলে সেও কাজে হাত দেয়। নসু ঘরের দরজায় তালা মেরে পিকআপের কেবিনে ড্রাইভারের ঠিক পিছন বরাবর বসে গাড়ি স্টার্ট করতে বলে।
ড্রাইভার গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রাখতে রাখতে হালকা
ভাবেই জিজ্ঞেস করে,
- ওস্তাদ বাক্সোর ভিতরে কি?
- ফ্রোজেন ফিশ।
নসু ড্রাইভারের ঘাড়ের পিছনে পিস্তলের মাজলটা ঠেকিয়ে রাখে। এরপর সে আর কখনও কথা
বলেনি। নিঃশব্দে গাড়ি চালাতে
থাকে। একফাঁকে ড্রাইভারের কাছ থেকে ড্রাইভিং
লাইসেন্স এবং এনআইডিটা সংগ্রহ নিজের প্যান্টের পকেটে রাখে। ড্রাইভারের নাম রহমত আলী,বাড়ি নরসিংদী। আমিনবাজার পার হওয়ার পর নসুর
অনুমতি নিয়ে ড্রাইভার এফএম রেডিও’র একটা চ্যানেল অন করে। সে আসলে মানসিক চাপটা নিতে পারছিল না। খামাখা বাড়তি টাকার
লোভে এই ট্রিপটা নেয়ার কারণে সে তার কপালকে দুষতে থাকে। রেডিওতে
খেলার খবর প্রচারিত হচ্ছে। নসু ব্যাগটা কোলে নিয়ে সীটে হেলান দেয়।
তার প্ল্যান হলো সাভার দিয়ে বেরিয়ে সোজা মানিকগঞ্জের
দিকে চলে যাবে। এরপর পদ্মার পানিতে
বাক্সগুলো ফেলে দিয়ে ফেরী পার হয়ে একটানে কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহের দিকে চলে যাবে। বাচ্চু চেয়ারম্যানকে বলা আছে, সে মহেশপুর বর্ডার হয়ে
তাকে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিবে।
বাচ্চু চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মহেশপুর/বাঘাডাঙ্গা
সীমান্ত দিয়েই তারা আন্ডার ওয়ার্ল্ডের
জন্য দরকার অনুযায়ী অস্ত্র বা
গোলাবারুদের চালান এনে থাকে। সে
নিজেও কয়েকবার অস্ত্রের চালান বুঝে নিতে চেয়ারম্যানের
লোকের সাথে ওপারে কৃষ্ণনগর, নদীয়া পর্যন্ত গিয়েছিল।
কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ থেকে প্রতিদিন ফুলের ট্রাক লোড হয়ে শাহবাগ, ঢাকায় আসে। ট্রাকে
ফুলের ঝাঁপির আড়ালে অস্ত্রের চালান লুকিয়ে ঢাকায় আনা হয়। ব্যাপারটা খুবই সহজ আর পদ্ধতিটাও মোটামুটি নিরাপদ। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল
কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পার হয়ে তারা বিশ
মাইলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের
হলগুলোয় দিনভর সংঘর্ষ-গোলাগুলিতে দু'জন ছাত্র নিহত হওয়ায়
পুলিশ হাইওয়েতে ব্যারিকেড দিয়ে চেকপোস্ট বসিয়েছে, বাস-ট্রাক ইত্যাদি র্যান্ডম সার্চ করছে। এই হাইওয়ে ধরে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সমস্ত গাড়ী চলাচল করে। পুলিশের
কম্বিং অপারেশনের কারণে হাইওয়েতে তাই বেশ জ্যাম লেগেছে।
চেকপোস্টের সামনে এবং পিছনে অনেক গাড়ি লাইন ধরে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে সন্দেহজনক মনেহলে কিছু মাইক্রোবাস বা কার
গাড়ির লাইন থেকে আলাদা করে ডিটেইল সার্চ করা হচ্ছে।
এক সময় তাদের পিকআপটিও গাড়ির লাইনধরে চেকপোস্টের সামনে
এসে থামে। জানালার গ্লাস নামালে একজন পুলিশ কনস্টেবল ভিতরে উকি দিয়ে জানতে চায়,
- পিকআপের ট্রেইলবোটে কি আছে?
- ফ্রোজেন ফিশ। ব্যাক চালান।
কিন্তু তারা
নসুর উত্তরে সন্তষ্ট হয়না।
অন্য একজন কনস্টেবল এসে বলে,
- ঠিক আছে। চালানের কাগজপত্র দেখান।
পিকআপটা রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে
তিনি ড্রাইভারকে গাড়ির ব্লুবুক, ড্রাইভিং লাইসেন্স
ও চালানের কাগজপত্র বের করতে বলেন, ডিটেইল সার্চ করা হবে।
- বস দেরী হলে মাছ পচে নষ্ট হবে।
নসু অনুরোধ করলেও পুলিশ কনস্টেবল
তার আদেশে অনড় থাকেন। তিনি
বলেন,
- কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করতেছেন
ক্যান? ঠিকঠাক সহযোগিতা করেন, দেরী হবেনা।
নসু ড্রাইভারকে গাড়ি সাইড লাইনে নিতে
নিষেধ করে ব্যাগ হাতে নামতে গেলে পুলিশ কনস্টেবল তার ব্যাগটা ধরতে চায়, কিন্তু নসু
এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দেয়। পুলিশ
সদস্যটি আসলে তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু নসুর এমন অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সে
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
- হেই মিয়া আপনের ব্যাগে কি?
- কিছু না। কাপড়-চোপড়, ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র।
- ব্যাগের চেইন খোলেন দেখি।
সে যেন একেবারে নাছোড়বান্দা। এসময় আরেকজন কনস্টেবল বডি ফ্রিস্কিং করার জন্য নসুর দিকে
এগিয়ে আসে। নসুর
জিন্সের প্যান্টের পিছনে কোমরের বেল্টের সাথে তখন লোডেড ম্যাগাজিনসহ ৭.৬৫ মি.মি.
ক্যালিবারের সেমি-অটোমেটিক বেরেতা পিস্তলটা গুঁজে রাখা। সে জানে যে কোন মুহুর্তে
ব্যবহারের জন্য পিস্তলের ম্যাগাজিনে সাতটা আর চেম্বারে একটা বুলেট অপেক্ষা করছে। তবে সামনে তার জন্য কি পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে সেটা সে জানেনা,
বিপদে পড়লে কি করবে সেটা সম্পর্কেও সে
নিশ্চিত না।
হাজারটা চিন্তা
নসুর মাথায়
ঘন্টায় ১৮০ মাইল বেগে ঝড়ের তান্ডব চালাচ্ছে। তবে সে ততক্ষণে এটা অন্তত ভালভাবেই বুঝে গেছে যে, এখানে এভাবে
ধরা পড়তে না চাইলে তার মাথা একদম ঠাণ্ডা আর নার্ভ শক্ত রাখতে হবে। নসু ফ্রিস্কিং করার সুযোগ না দিয়ে যে পুলিশ কনস্টেবল তার ব্যাগ চেক করতে চেয়েছিল তার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে
তর্কাতর্কি শুরু করে দেয়। নসু
দাবী করে যে, সে ব্যাগ চেক করার নামে তাকে
আঘাত করেছে। ইতিমধ্যে লাইনের পিছনে দাঁড়ানো
বেশ কয়েকটা গাড়ি এবং একটা এ্যাম্বুলেন্স অসহ্যভাবে একটানা হুটার বাজিয়ে চলছে। এ্যাম্বুলেন্সে ইমার্জেন্সি
সাপোর্ট দিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী একজন রোগীকে বহন করা হচ্ছে।
নসুর ওভাবে চীৎকার চেঁচামেচিতে রোগীর আত্মীয় স্বজন এবং যাত্রীবাহী গাড়ি থেকে কয়েকজন স্টাফ নেমে এলে
সেখানে ছোটখাট একটা জটলার সৃষ্টি হয়। এরফলে রাস্তায় একটু জ্যাম লাগে।
গাড়ির সাধারণ যাত্রীদের কেউ কেউ নেমে এসে বিষয়টা
ভালোভাবে না জেনেই নসুর পক্ষ নিলে তর্কাতর্কি চরমে ওঠে।
কর্তব্যরত পুলিশ কনস্টেবলদের কয়েকজন পিকআপের ট্রেইল বোট সার্চ করা
বাদ দিয়ে তর্কাতর্কিতে যোগ দেন। তবে পুরো সময়টা জুরে নসুর একটা চোখ নিবদ্ধ থাকে পিকআপের ড্রাইভারের ওপর।
কিন্তু ড্রাইভার কোন ঝামেলা না করে
চুপচাপ ড্রাইভিং সীটে বসে থাকে।
জটলা দেখে একজন সাব ইন্সপেক্টর বাঁশি
বাজাতে বাজাতে এগিয়ে এসে সবাইকে তর্কাতর্কি বাদ দিয়ে দ্রুত রাস্তা ক্লিয়ার করতে
বলেন। ওয়্যারলেস সেটে
ম্যাসেজ এসেছে, মন্ত্রী মহোদয়ের গাড়ির বহর ঐ এলাকা অতিক্রম করবে। তবে একরোখা টাইপের একজন পুলিশ
কনস্টেবল এসে পিকআপটিকে জোরপূর্বক রাস্তার এক সাইডে নিতে চাপাচাপি
করলে নসু আবারও চেঁচামেচি শুরু করে। তার
চীৎকার শুনে গাড়ীর স্টাফরা ঘুরে
এগিয়ে আসতে উদ্যত হলে সাব ইন্সপেক্টর সাহেব পুলিশ কনস্টেবলকে বকা দিয়ে পিকআপ ছেড়ে
দিতে বলেন। পুলিশের ব্যারিকেড সরানো মাত্রই
নসু ঝুপ্ করে সীটে বসে পড়ে ড্রাইভারকে গাড়ী টান দিতে বলে। গাড়ীর ড্রাইভার সম্ভবত অ্যাড্রিনালিন হরমোনের প্রবল নিঃসরণের কারণে স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে তৈরিই ছিল। সে পিছনে এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে জটলা
থেকে গাড়ীটা বের করে নিয়ে যায়। নসু এতক্ষণে প্রাণ খুলে হাসে। পাঙ্খা নসু আবারও পাঙ্খা।
২৪
পাটুরিয়া ফেরী ঘাট, মানিকগঞ্জ।
কুয়াশা মাখা শীতের রাত।
ঘাটে এসে তারা অপেক্ষমান একটা
ফেরীতে উঠে পড়ে। ড্রাইভার নসুর নির্দেশ অনুযায়ী
ফেরীর রেলিঙ ঘেঁষে পিকআপটিকে পার্ক করে। ঠিকঠাক কথা
না শুনলে তার পরিবারের কি পরিণতি হবে সেটা নসু তাকে ভালভাবেই বুঝিয়ে
দিয়েছিল। এজন্য ড্রাইভার পথে কখনই কোন রকম ঝামেলা করেনি। ফেরীর যাত্রীরা বাসে বসে কেউ ঘুমে অচেতন আবার
কেউবা অর্ধ ঘুমে বা মশার কামড়ে এপাশ ওপাশ করছে।
একটা ফেরী আরেকটা ফেরীকে অতিক্রম করার সময় ভেঁপু বাজিয়ে
একে অপরকে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য সতর্ক করে থাকে। পিকআপের ট্রেইল বোটে, তেরপলে ঢাকা
বাক্সগুলো ডেকে নামিয়ে রাখার আদেশ দিয়ে নসু সিগারেটে আগুন ধরায়। অনেকক্ষণ পরে সে একটু রিলাক্সড বোধ করে। সে অপেক্ষায় থাকে কখন ফেরী দু’টো একে অপরকে
অতিক্রম করবে। ফেরীর ভেঁপু বেজে ওঠার সাথে সাথেই নসু ঝটপট একেএকে সবগুলো বাক্স পানিতে ফেলে দেয়,
ড্রাইভার তাকে সহযোগিতা করে। ঘন
কুয়াশার চাদর আর ভেঁপুর তীক্ষ্ণ শব্দে বাক্সগুলোর
পানিতে পরার ঝুপঝুপ শব্দ হারিয়ে
যায়। হেনা এখন শুধুই স্মৃতি!
সিমেন্টে জমাট বাঁধা করুণ স্মৃতি।
নসু হোয়াইট বাবুকে ফোন করে বস্তিতে
তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে বলে। হোয়াইট বাবু কোন প্রশ্ন করেনা, তবে কাজটা ঠিকঠাক
পালন করে। এ জগতে কেউ কখনও প্রশ্ন করেনা
বা অযথা কৌতূহল দেখায় না। তাদের
চলাফেরা ছায়ার মত, তারা নীরবে-নিভৃতে শুধু আদেশ পালন করে যায়।
নসু ভোরের দিকে কালীগঞ্জ সীমান্তে পৌঁছে বর্ডার ক্রস
করার আগে লীডারকে ফোন করে সবকিছু খুলে বলে। নসু ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসু জানে এদিকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না
হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস অথবা কয়েক বছর তাকে লুকিয়ে থাকতে হবে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়ত সে ফিরে
আসতে পারবে।
পরদিন পত্রিকার পাতায় খবর আসে রূপনগর
বস্তিতে রাতে আগুন লেগে বেশ কিছু ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে।
বস্তির একটা ঘরের বৈদ্যুতিক
শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছিল বলে জানা যায়। কয়েকজন বস্তিবাসীও ঘুমন্ত
অবস্থায় আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।
২৫
সেফ হাউজ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে কয়েক
কদম হেঁটে সামনে এগোলেই একটা মেঠো পথ বাম দিকে
চলে গেছে। পথের শেষে ধুধু ফাঁকা মাঠ আর ফসলের ক্ষেত। ক্ষেতের কোল ঘেষে একটা সাড়ে
তিন তলা বাড়ি একাই দাঁড়িয়ে আছে।
এ তল্লাটে এটাই একমাত্র উঁচু বিল্ডিঙ। বাড়িটার ছাদে দু’রুমের একটা ছোট ফ্ল্যাটে পাঙ্খা নসু থাকে। নসুর বসার ঘর থেকে জানালা বরাবর পথটা একদম পরিস্কার দেখা যায়। এটাই তার বর্তমান আস্তানা
বা সেফ হাউজ। লীডার
তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে অনেকটা ইচ্ছে করেই নসুকে তার থেকে দূরে রাখলেও
নসুর ওপর সর্বক্ষণ চোখ রাখার নামে ফুট-ফরমায়েশ খাটার জন্য রিয়াজকে নিয়োগ করেছে। এখন পর্যন্ত
অবশ্য নসুর আচরণে অস্বাভাবিক কিছুই
ধরা পড়েনি। রিয়াজ নামের হালকা পাতলা গড়নের ছেলেটার আসল কাজ যাই হোক না কেন নসু জানে ওর
একমাত্র কাজ হল সিসিটিভি মনিটর করা আর মাঝে মাঝে বাইনোকুলার বা নাইট ভিশনে চোখ
রাখা।
অতীতের রেকর্ডের কারণে লীডার হয়ত
পাঙ্খা নসুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না কিন্তু সে এটা ঠিকই জানে নিপুণ লক্ষ্যভেদ, নিষ্ঠুরতা এবং কর্ম কৌশলে দলে নসুর মত দ্বিতীয়টি আর কেউ
নেই। সে যদি নসুকে তার দলে নাও রাখে, তবুও তাকে লুফে নিতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে দলের অভাব
হবে না। নারায়ণগঞ্জের হাজী মাস্তান
কিংবা পুরান ঢাকার জেমস বাহিনী তো তাকে নেয়ার
জন্য একরকম মুখিয়ে আছে। তবে
নসু লীডারের প্রতি প্রচণ্ড অনুগত, সেজন্যই সে তাকে ছেড়ে
অন্য কোথাও যেতে উৎসাহ বোধ করে না।
আট বছর আগে দীর্ঘ অজ্ঞাতবাস কাটিয়ে
দেশে ফেরার পর নসুকে আগের মত কোন দায়িত্বে না রেখে বরং সুপারী কিলার বা প্রফেশনাল
কিলার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কন্ট্রাক্ট কিলিং-এর মতো বিশেষ ধরনের কাজগুলোই আসলে
তার জন্য উপযুক্ত। কলকাতার অপরাধ জগতে নেপালের তরাই এলাকার মদেশিয়া বা বিহারের
কিলারদের সাথে রীতিমত পাল্লা দিয়ে কাজ করতে যেয়ে নসু অস্ত্র ব্যবহারে অনেক পরিণত এবং
দক্ষ হয়েছে। তাছাড়া অভিজ্ঞতা ও বয়সের কারণেও তার চেহারায় সম্প্রতি একটা ভারিক্কি ভাব এসেছে।
র্যাবের সাথে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিয়ে
অপরাধ কর্মকান্ড ঘটাতে যেয়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডও এখন
অনেক পেশাদার। আগে কেউ কাটা রাইফেল বা
গাদা বন্দুক হাতে পেলেই খুশী হত। শুধু নসুর মত কিছু ভাগ্যবানরাই ওপার
থেকে আসা সস্তা ফাইফ স্টার ব্রান্ডের পিস্তল ব্যবহার করার সুযোগ পেত। ওসব এখন কেউ ছুঁয়েও দেখে
না। আজকাল অনেকেই .২২ ক্যালিবারের ওয়ালথার পিপিকে কিংবা .৩২ বা ৭.৬৫ মি.মি. ক্যালিবারের বেরেতা হরহামেশা ব্যবহার করছে। ডার্লিং টাইপের এই অস্ত্রগুলো সাইজে ছোট, পুরো
স্বয়ংক্রিয়, মেকানিক্যাল ফল্ট হয়না আবার শরীরে লুকিয়ে রাখতেও সুবিধা। চোখে না দেখলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডএ উজি পিস্তল ব্যবহারের কথাও
শোনা যায়। অত্যাধুনিক পিস্তলের পাশাপাশি এখন একে ৪৭-টমি গান, এমনকি টেলিস্কোপিক
সাইট, সাইলেন্সার লাগানো স্নাইপার রাইফেলও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলে এসেছে বলে
শোনা যায়। তারা এখন পিস্তলের মাজল ফ্ল্যাশ বা কার্টিজের সাউন্ড লুকানোর জন্য অস্ত্রের সাথে
সাইলেন্সার, টার্গেট মিস না করার জন্য লেজার এইমিং ডিভাইস ব্যবহার করে। এর পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বুলেটপ্রুফ
জ্যাকেটও ব্যবহার করা হয়। জিপিএস, থার্মাল ইমেজারসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র-সরঞ্জামাদি
ব্যবহার করার খবরও শোনা যায়।
এসব কারণে নসুর মতো পেশাদারদের ডিমান্ড এখন অনেক বেশী।
কন্ট্রাক্ট কিলিং ছাড়াও নসুকে আরেকটা
বিশেষ কাজ করতে হয়। সেটা হলো প্রতি মাসের চতুর্থ শনিবারে সোনিয়ার কাছে কালাবাবুর বখরাটা
পৌঁছে দিয়ে আসা। অবশ্য এই কাজটা সে একরকম
জোর করেই নিয়েছে। ল্যাংড়া মনির নসুর
উদ্দেশ্য কিছুটা আঁচ করতে পারলেও সে মুখে কিছু প্রকাশ করেনি। নসু সবসময়ই চেষ্টা করেছে টাকার বান্ডিল পৌঁছে দেয়ার সুযোগে সোনিয়ার
কাছাকাছি ভিড়তে। কিন্তু সোনিয়া আসলে গভীর জলের মাছ, সে একটা পর্যায়ের পর নসুকে আর কাছে
ঘেঁষতে দেয়না। তবুও তারসাথে টুকটাক কথা বলে এবং বিভিন্ন চ্যানেলে খোঁজখবর নিয়ে যা
বুঝতে পারে, তার মতো সোনিয়াও এক বিপন্ন খেলায় মেতেছে। তবে তার সাথে কারা জড়িত বা
কিভাবে কি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে কোন আইডিয়া করতে পারেনা।
সোনিয়া নসু'র কাছে নিজের পরিকল্পনা
মেলে না ধরে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। তা না হলে নসু হয়ত তাকে ব্ল্যাকমেইলিং করে
অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করত। নসু'র আসল উদ্দ্যেশ কি তা পরিষ্কার ভাবে বোঝার জন্য নসুর পিছনে সে লোক লাগিয়ে
দেয়। পয়সা খরচ করলে এই জগতে কাজ করার জন্য লোকের অভাব হয়না। প্রতিমাসে তার কাছে যে
পরিমাণ টাকা জমা হয়, তা থেকে দু'চার বা দশ-বিশ লাখ টাকা খরচ করা কোন ব্যাপার না।
সে তাই করে এবং সরীসৃপের মত নিজের পরিকল্পনা ধরে এগিয়ে যায়।
২৬
অপারেশন বিগফিশ।
সূচনা পর্ব।
ওপার থেকে ফিরে আসার পর দলের প্রায় সবাই
জানে নসু কিভাবে এবং কেন হেনা ও ব্যাঙ্গা বাবুকে সরিয়েছে।
আজগর কিলিং এর গল্পতো আগে থেকেই সবার জানা।
কিন্তু মজার ব্যাপার হল নসুর হাত একদম পরিস্কার, পুলিশের
খাতায় সন্ত্রাসী হিসাবে তার নাম থাকলেও তার কোন অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নাই।
জোড়া কিলিং করে ওপারে পালানোর সময় নসু যে পিকআপটা নিয়ে কালীগঞ্জ গিয়েছিল সেই পিকআপের
ড্রাইভারকে দর্শনার উথুলি আউটার সিগন্যালের কাছে ট্রেন লাইনে কাটা পড়া অবস্থায়
পাওয়া যায়। পিকআপটা ট্রেনের
ইঞ্জিনের আঘাতে দুমড়ে মুচড়ে রেললাইনের পাশেই পড়ে ছিল।
যদিও পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী সেটা নিছক দুর্ঘটনা ছিল, কিন্তু
দলের ছেলেরা প্রমাণ না থাকলেও অনুমান করতে পারে সেখানে আসলে কি ঘটেছিল।
নসু আগেও কথা কম বলত, কিন্তু এখন সে
আরও বেশী চুপচাপ হয়ে গেছে। সে
এখন যতটা না কথা বলে, ভাবে তার চেয়েও বেশী। তাকে নিয়ে ল্যাংড়া মনিরের উৎকণ্ঠা সে বুঝতে পেরে মনে মনে হাসে। সে আন্দাজ করতে পারে রিয়াজের আসল কাজটা কি, কিন্তু সেটা
নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামায়না। এক সময় লীডারকে সরিয়ে তার জায়গা দখল করার প্ল্যান থাকলেও নসু এখন আর তা
ভাবেনা। তার দৃষ্টি এখন অনেক দূরে কিংবা বলা যায় অনেক ওপরে। বিশেষ করে কালাবাবু তাকে অপমান করার পর থেকে তার এখন
একটাই ভাবনা কালাবাবুকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া এবং তার
সাম্রাজ্য দখল করা। এই বিষয়টা নিয়ে কলকাতায়
এসটিএফ এর অসাধু সদস্যদের শেল্টারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং মিরপুর এলাকার আরেক গডফাদার
বোমা মিজানের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। কালাবাবুর সাথে তার পুরনো শত্রুতার
প্রতিশোধ নিতে সে নিজেও নসুকে একাজে সবধরনের সাহায্য করতে আগ্রহী। সে নিজ থেকেই কালাবাবুকে হত্যা মিশনের নাম দিয়েছে অপারেশন বিগফিশ,
সতর্কতার জন্য সবসময় এই ছদ্মনাম ব্যবহার করে নসুকে কথা বলতে নির্দেশ দেয়। বোমা মিজান নিজেও একসময় পাঙ্খা নসুর মতই চুনোপুঁটি ছিল, কিন্তু
তার সাহস, দক্ষতা আর পরিশ্রম তাকে
বর্তমানের ঐ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সে এখনও ঢাকার অপরাধ জগতের কিংবদন্তী।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় বোমা মিজানের
নামটা সবার আগে থাকায় সে দেশে ফিরতে পারছে না। বিশেষ করে ইন্দিরা রোড, ঢাকায় সেভেন মার্ডারের কারণে সে খুবই আলোচিত একজন
সন্ত্রাসী। তাকে ধরার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের আগ্রহের কারণে কিছুদিন আগে ইন্টারপোল রেড এলার্ট জারী করেছে। তাছাড়া তাকে ধরার জন্য
সরকারের ঘোষিত পুরষ্কারের অংকটাও নেহায়েত কম না।
তবে সে সল্টলেকে প্রাসাদোপম বাড়ীতে বেশ আরামেই আছে। ঢাকা থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজী
এবং মাদক ব্যবসার অর্থের একটা বড় অংশ তার কাছে হুন্ডী আকারে যায়। সেদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু বড় কর্তা এবং
রাজনৈতিক নেতা মাস শেষে তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট অংকের উৎকোচ পায় বলে তার উপস্থিতি
নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
তবে সেখানে যে কোন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে তার জড়িত না থাকার জন্য কঠোর
নির্দেশনা রয়েছে। সেজন্যই সেখানে শেল্টার নিলেও তার সমস্ত অপরাধমূলক কর্মকান্ড মূলত
ঢাকাকে ঘিরেই। সেখানে বসে থেকেই সে ঢাকার
ইয়াবা, ফেন্সিডিল,
নারী-শিশু পাচার আর অস্ত্র চোরাচালানের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে সে মাফিয়া/ডন বলে এসব খবরের সত্য-মিথ্যা আদৌ কখনো
যাচাই করা সম্ভব হয়না।
২৭
অপারেশন বিগফিশ।
প্রস্তুতি পর্ব।
কালাবাবুকে হত্যা করতে চাইলে জেলের
ভিতরেই করতে হবে, অথবা যখন তাকে কোর্টে মামলার প্রয়োজনে হাজির করা হয় তখন। কালাবাবু জীবন বাঁচানোর জন্য মামলায় প্রভাব বিস্তার করে মাসের পর মাস জেলের নিরাপদ আশ্রয়ে কাটিয়ে দেয়। সে
জানে জেলের বাইরে থাকলে তার প্রতিপক্ষ দল অথবা নিরাপত্তা-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ না কেউ তাকে সরানোর চেষ্টা করবেই। তার চেয়ে আপাতত এই ভাল, জেলের ভিতরে বসে অপরাধ জগত সামলানো। তাছাড়া দলের ক্যাডারদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা
পয়সার কালেকশন এবং হিসাব রাখার কাজটা তো সোনিয়া বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছে।
ইদানিং অবশ্য সোনিয়ার ব্যাপারে টুকটাক
কথাবার্তা তার কানে আসছে, কিন্তু কোন উপায় নেই। বর্তমান সরকার ক্ষমতা
থেকে সরে গেলে সে নিরাপদ সময় বুঝে একসময় জামিন নিয়ে বের হবে।
তখন সোনিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা যাবে। সরাসরি ফিল্ডে না থাকার কারণে তার মাসিক কালেকশন হয়ত একটু
কম হচ্ছে কিন্তু সেতো নিরাপদ, এবং আইনের কাছেও পরিষ্কার থাকতে পারছে। তার মত অপরাধীদের জন্য জেলের ভিতরে সুযোগ-সুবিধার কমতি
নেই। অর্থবিত্ত শুধু উপার্জন না, ঠিকমত ব্যবহার করার উপায়ও জানতে হয়। কালাবাবু
জানে কিভাবে অর্থের বিনিময়ে সুখ কিনতে হয়।
নসু'র ধারণা যে কোন উপায়ে সোনিয়াকে
ম্যানেজ করতে পারলে কালাবাবুকে খুন করা কোন ব্যাপারই না। বিশেষ করে জেলের ডাক্তার, তার সাথে সোনিয়ার খুব ভালো সম্পর্ক। নসু বিভিন্ন
সূত্র থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে, একমাত্র সোনিয়ার কালাবাবুর সাথে দেখা করার অনুমতি আছে। সে কালাবাবু'র সাথে দেখা করার অজুহাতে দলের বা চাঁদা
সংগ্রহ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করে
থাকে। আর এই কাজে তাকে
সহযোগিতা করে কয়েদীদের স্বাস্থ্যসেবার কাজে নিয়োজিত ডাক্তার। সোনিয়া প্রতিমাসে
নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ দেয়ার পাশাপাশি দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ডাক্তার
সাহেবকে ম্যানেজ করেছে। এভাবেই সে মাসে-দু’মাসে একবার কালাবাবুর সেলে রাত কাটিয়ে
আসে। কালাবাবু একমাত্র
সোনিয়াকেই বিশ্বাস করে।
কিন্তু যেমনটা শোনা যায়, সোনিয়াকে ম্যানেজ
করা নাকি এক কথায় অসম্ভব। সে
কালাবাবু'র প্রতি খুবই বিশ্বস্ত এবং তার কথাতেই উঠে বসে। তবে গুলশানের এক
ব্যবসায়ীর সাথে তার গোপন সম্পর্কের
ব্যাপারে মার্কেটে গুজব চালু আছে। এছাড়া সম্প্রতি এক ডাক্তারের সাথেও তার মাখামাখি সম্পর্কের কথা শোনা যায়। কিছুদিন আগে কোন এক পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার তাকে এই তথ্যটা সরবরাহ করেছে। এ এও অদ্ভুত জগত, এখানে মাফিয়া-মিডিয়া-পুলিশ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
নসু সোনিয়ায় এসব গোপন সম্পর্কের ব্যাপারে আরও তথ্য জোগাড়
করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে
শুনেছে কোনও এক কারণে সোনিয়া কিছুদিন আগে কারো মাধ্যমে পাসপোর্টে কানাডার ভিসা নিয়ে রেখেছে। তবে কি
সে ঐ ব্যবসায়ীর সাথে দেশ
ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছে! নাকি সেই ডাক্তার!
নাকি তৃতীয় অন্য কেউ! খোঁজ নিতে হবে,
ঘটনাটা সত্য হতেও পারে, আবার সত্য নাও হতে পারে। কেননা জীবনের প্রতিটি বাঁকে প্রণয় রূপ বদলায়, যে তার একটি রূপকে ধ্রুব সত্য মানে সে দুঃখ পায়।
২৮
সেফ হাউজ।
স্টেশন রোড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
পাঙ্খা নসু দিনের পর দিন হত্যার ছক কেটে
চলে। একটা না একটা ব্যবস্থা হবে বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস। সে মোটামুটি তিনটা প্ল্যান ধরে এগোয়। এরমধ্যে কোন একটাকে কাজে লাগাতে পারলে তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন
পুরন হবে। প্ল্যান ‘এ’ হলো জেলখানার সেলের ভিতরেই তাকে খুন করা।
কিন্তু প্ল্যান ‘এ’ অনুযায়ী
জেলের ভিতরে কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে নিজেকেই ছোটখাট অপরাধ করে জেলে যেতে হবে
এবং কাজ শেষে জামিনে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থাও করতে হবে।
কিন্তু সেজন্য একটা ভাল
চ্যানেল খুঁজে বের করতে হবে, যারা তাকে নিশ্চিত করবে যে তাকে মামলার শুনানি শেষে কাসিমপুর জেলে পাঠানো হবে এবং
কালাবাবুর পাশের সেলেই রাখা হবে।
এরপর একজন ভাল উকিল নিয়োগ করে তাকে জামিনে বের করে আনবে।
ভালভাবে চেস্টা করলে এর সবই হয়ত
ব্যবস্থা করা যাবে কিন্তু সমস্যা
আসলে অন্যখানে। কোন ছোটখাট অপরাধ করে পুলিশের
কাছে ধরা দেয়ার পরে পুলিশ যদি তাকে তার পূর্বের অপরাধের কারণে কোন পেন্ডিং হত্যা
বা ধর্ষণের মামলায় কোর্টে চালান দেয় তাহলে তো জামিনে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন হবে। এছাড়া ক্রস ফায়ারে যাওয়ার রিস্ক তো আছেই, এ লাইনে তার নিজেরও শত্রুর
অভাব নেই। হয়ত দেখা যাবে ল্যাংড়া মনিরই তাকে
সরানোর জন্য টাকা ঢালছে। এছাড়া
জেলখানার ভিতরে কালাবাবুকে হত্যা করতে হলে জেল পুলিশের সহযোগিতা লাগবে। সে জানে র্যাব-পুলিশও কালাবাবুকে সরাতে চায় কিন্তু
সেটা তো জেলের বাইরে। জেলের ভিতরে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা কাস্টোডিয়াল ডেথ জাতীয়
কোন রিস্ক নিতে চাইবে না।
প্ল্যান ‘বি’ হলো কালাবাবুকে যেদিন আদালতে
হাজিরা দেয়ার জন্য নেয়া হবে সেদিন আদালত প্রাঙ্গনেই তাকে খুন করা। সেটা হতে পারে ধারালো কমান্ডো
নাইফ কিংবা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে সফল হতে হলে তাকে
টার্গেটের খুব কাছে পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। তবে কালাবাবু বা জেল পুলিশ
সম্ভবত সে ধরনের সুযোগ দিবেনা। তাছাড়া আদালত প্রাঙ্গনে অত শত লোকের মাঝে হত্যাকান্ড ঘটাতে গেলে অনেক রিস্ক
নিতে হবে। এতে এমনকি হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। অবশ্য ঘটনার দিন যদি আদালত প্রাঙ্গনে এলোপাথাড়ি বোমাবাজি করে ত্রাস ও
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায় তাহলে হৈ-হল্লার সুযোগে কালাবাবুর কাছে গিয়ে শ্যুট করা
সম্ভব। তবে এটা পুলিশ স্কর্টের পাল্টা এ্যাকশন এবং অনেকাংশে তার ভাগ্যের সহায়তার ওপর
নির্ভর করছে। এজন্য তার কিলিং দলটা বেশ ভারী করতে হবে।
আবার দলে বেশী লোক টানা মানে তথ্য
লিক্ হওয়ারও বেশী সম্ভাবনা। সেরকম কিছু হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আরেকটা পদ্ধতি হতে পারে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে দূর থেকে গুলি
করে ফেলে দেয়া। সেক্ষেত্রে ওর নিজের কাছে স্নাইপার রাইফেল না থাকায় ওটা কারো কাছ থেকে ধার করতে হবে। এই অস্ত্রটা সে কলকাতায়
কয়েকবার ব্যবহার করেছিল। চমৎকার
কাজ দেয়, অনেক দূর থেকে সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান নিয়ে এইম করে
লক্ষ্যবস্তু ফেলে দেয়া যায়। কিন্তু ওর জানামতে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই অস্ত্র একটা কিংবা দু'টার বেশী নাই। অনেক দামী অস্ত্র, তাই ওটার ভাড়া বেশী এবং কার্টিজও দেয়া
হয় খুব হিসাব কষে। এছাড়া ওটা সংগ্রহ করতে
গেলে চারদিকে, এমনকি পুলিশের কাছেও খবরটা
ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে।
নসুর প্ল্যান ‘সি’ হল সবচেয়ে কঠিন এবং ভয়াবহ। আর্জেস ৭২ গ্রেনেড মেরে কালাবাবুসহ জেল পুলিশের প্রিজন
ভ্যান উড়িয়ে দেয়া। সে ভাল করেই জানে এতে প্রচুর
ক্ষয়ক্ষতি এবং অযথা রক্তপাত হবে।
প্রিজন ভ্যানের অন্যান্য
সাধারণ কয়েদী ছাড়াও রাস্তার নিরাপরাধ পথচারীও এতে মারা যেতে পারে।
কক্সবাজার কিংবা বান্দরবানের দিকে
গেলে আরাকানের রোহিঙ্গা অথবা অন্যান্য আরাকান আর্মি'র মতো বিদ্রোহী দলগুলোর কাছ
থেকে আর্জেস ৭২ গ্রেনেড ম্যানেজ করা সম্ভব। তবে এভাবে অস্ত্র গোলাবারুদ অল্প দামে ম্যানেজ করা গেলেও সেটা ঢাকা পর্যন্ত
নিরাপদে আনাটাই হবে ভীষণ রিস্কি কাজ। হাইওয়ের বিভিন্ন জায়গায় বিজিবি-পুলিশের চেকপোস্টে ধরা
পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পটিয়া-কেরানীগঞ্জের পর থেকে ওদিকে খুব
সক্রিয়। তবে নসু অনেক চিন্তা
ভাবনা আর প্ল্যান কাটছাট করে অবশেষে প্ল্যান ‘সি’ নিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। যতই রিস্ক থাকুক বা রক্তপাত
ঘটুক না কেন কালাবাবুকে খুন করতে হলে তার কাছে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি বলে
বিবেচিত হয়।
২৯
প্রিয়াঙ্কা রেস্টুরেন্ট, মিরপুর বেড়ীবাঁধ এলাকা।
সন্ধ্যার
পরপর।
পাঙ্খা নসুর সামনে এখন অনেক কাজ। প্ল্যান অনুযায়ী এগোতে হলে তার এখন প্রচুর টাকা আর কিছু
ছেলেপেলে প্রয়োজন। সে ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ছক কষে ধীরে ধীরে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। পাঙ্খা নসু এটা ভালোভাবেই বুঝতে পারে যে তার প্ল্যান
কার্যকর করতে হলে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পড়ে থাকলে চলবে না।
ঢাকায় ফিরে কিছু দক্ষ ও
পরীক্ষিত ছেলেদের নিয়ে একটা টিম তৈরি করতে হবে।
তবে সবকিছুর আগে সবচেয়ে
বেশী যেটা প্রয়োজন সেটা হলো ল্যাংড়া মনিরের তাকে নিয়ে যে অহেতুক উৎকণ্ঠা রয়েছে,
সেটা দূর করা। কারণ সে হয়ত ছেলেপেলে
ম্যানেজ করতে পারবে কিন্তু টাকা-পয়সার জন্য লীডারের সাহায্যই এখন তার সবচেয়ে বেশী
প্রয়োজন।
তবে টাকা-পয়সা সংগ্রহের জন্য বিকল্প
সোর্স হতে পারে সোনিয়া। সে ইতিমধ্যে বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে যে, সোনিয়া সেই
ব্যবসায়ী প্রেমিক আরিফ সাহেবের সাথে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করছে। তাদের ভিসা-পাসপোর্ট সব প্রস্তুত, তারা
শুধু উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে। সোনিয়া ইতিমধ্যে বিট কয়েন, অনলাইন জুয়া, ভার্জিন আইল্যান্ড বা অন্য কোথাও
অফশোর কোম্পানি খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে কানাডায় প্রচুর অর্থ পাচার করেছে এবং
সেখানে টরেন্টোর বেগম পাড়ায় তার একটা ম্যানসন রয়েছে বলে শোনা যায়। তবে তার সেই
ক্রাইম রিপোর্টার সূত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খবর হলো, তারা ডার্ক
ওয়েব এক্সেস করে বিশেষ ব্যবস্থায় অ্যাকোনাইট বিষ সংগ্রহ করেছে। ডার্ক ওয়েব এক্সেস করার
জন্য অনিওন নামের একটা নেটওয়ার্ক আছে, যা গেটওয়ে
হিসেবে কাজ করে।
এছাড়াও গুগল প্লে-স্টোর
থেকে অরবোট ডাউনলোড করে এন্ড্রয়েড স্মার্টফোনের মাধ্যমেও ডার্ক ওয়েবে এক্সেস করা যায়,
তবে তারা কিভাবে এক্সেস করেছে তা তারাই ভালো জানে। নসুর সুত্র জানিয়েছে যে
অ্যাকোনাইট ওষুধ হিসেবে আসলে খুবই সামান্যই ব্যবহৃত হয়,
আর এই পরিমাণটা অল্প থেকে সামান্য বেশি হলে তা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অ্যাকোনাইটের বিষক্রিয়ার
ফলে প্রাথমিকভাবে ডায়রিয়া, বমি এসব হয়। এরপর হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন
শূন্যতার কারণে শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি হয়।
ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরা পড়ে অক্সিজেন স্বল্পতা
বা দম বন্ধ হয়ে যাওয়া।
তাই বিষক্রিয়ার কারণ দুর্ঘটনা নাকি উদ্দেশ্য প্রণোদিত তা
সনাক্ত করা বেশ কঠিন।
সোনিয়া যে কালাবাবু'র সাথে ডাবল গেম
খেলছে তা নসুর কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হলেও কালাবাবু হয়ত এখনও আন্দাজ করতে
পারেনি অথবা কানাঘুষা শুনলেও তা বিশ্বাস করতে চায় না। হয়তো ভালবাসা কিংবা প্রবল মায়া! তা না হলে সে এতদিনে
সোনিয়াকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিত। অপরাধজগতে
বিশ্বাসঘাতকতার একটাই শাস্তি, মৃত্যু। এটা নিশ্চয়ই
সোনিয়া'র জানা, সে যে কালাবাবু'র এত টাকা-পয়সা বিদেশে সরিয়ে ফেলল সেক্ষেত্রে তারও
তো একটা পালানোর পথ প্ল্যান করার কথা। কিন্তু সেটা ঠিক কি তা জানতে সোনিয়াকে
যথোপযুক্ত সময়ে একটা টোপ দেয়া এবং প্ল্যান ‘সি’ নিয়ে লীডারের সাথে আলোচনা করার
জন্য নসু ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় আসে। নসু কি ভেবে লীডারকে এতটা বিশ্বাস করে তা সে নিজেও জানেনা। তবে তার দৃঢ় বিশ্বাস লীডার
তাকে সাহায্য করতে না পারলেও বা তার কাজে সহযোগিতা না করলেও অন্তত প্ল্যানটা কারো
কাছে ফাঁস করে দিবে না।
কোন এক সন্ধ্যায় মিরপুর বেড়ীবাঁধ
এলাকার একটা রেস্টুরেন্টে নসু আর লীডার মিটিংএ বসে।
ল্যাংড়া মনির অবশ্য জরুরী
কাজের অজুহাতে নসুর সঙ্গে মিটিংটা এড়াতে চেয়েছিল।
সে আসলে এভাবে একাকী পাঙ্খা নসুর সাথে আলোচনায় বসতে চায়নি। তার ধারণা ছিল এটা হয়ত তাকে হত্যা করার জন্য নসুর কোন প্ল্যান। অনিচ্ছাসত্ত্বেও লীডার
তার গাঢ় নীল রঙের ভক্সি মাইক্রোবাসটা নিয়ে নসুর সঙ্গে দেখা করতে আসে। তার সঙ্গে দু’জন গানম্যান।
তারা রেস্টুরেন্টের
এক কোনে জানালার পাশে আলো আঁধারিতে
বসে নসুর ওপরে দৃষ্টি রাখে। তারাও
যথেষ্ট পেশাদার এবং অস্ত্রের ব্যবহারটাও নসুর চেয়ে কম বোঝেনা। নসু একটু ঝামেলা করলেই তারা শ্যুট করতে দ্বিধা করবেনা। তাদের সেরকম ট্রেনিংই দেয়া আছে এবং জার্মান শেফার্ড কুকুরের মত
প্রভুকে রক্ষা করতে তারা কখনও পিছুপা হবেনা। নসু লীডারকে নিয়ে এমন জায়গায় বসে যেখান থেকে রেস্টুরেন্টের ভিতর এবং প্রবেশপথটাও ভালভাবে নজরে রাখা যায়।
নসুর এই যে সবসময় সতর্ক থাকার অভ্যাস, এটা মনিরের খুব ভাল লাগে। নসুর চলাফেরায় আসলে একধরনের
স্মার্টনেস আছে, যেটার কারণে তাকে সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। তার দলের বেশীর ভাগ ছেলেরাই যেন কেমন পানসে টাইপের, শুধু পাঙ্খা নসুই একটু আলাদা। আবার ঠিক এজন্যই তাকে দলের অন্যদের মত পুরোপুরি বিশ্বাসও করা যায় না। কেনোনা তার
পক্ষেই সম্ভব যে কোন সময় পাশার দান উল্টে দেয়া। ওপারের প্রফেশনালদের
সঙ্গে টক্কর দিয়ে কাজ করতে যেয়ে এই লাইনের অনেক কিছুই সে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে
হাতে কলমে শিখেছে। অনেক বদলে গিয়েছে নসু, দলের অন্য আর দশজন থেকে তাকে তাই একটু বিশেষ খাতির
করতেই হয়। নসু হচ্ছে তার ট্র্যাম কার্ড, তাই লীডার তাকে হিসাব করেই ব্যবহার করে। কালাবাবু
অনেকবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নসু নিজ থেকেই তার দলে ভিড়তে চায়নি। ল্যাংড়া মনিরের প্রতি তার
কৃতজ্ঞতাবোধই হয়ত তাকে এখনও তার দলে ধরে রেখেছে।
নসু ওরফে পাঙ্খা নসু তার জন্য স্ম্যাশড
পটেটো উইথ বীফ স্টেকের সঙ্গে বিয়ারের অর্ডার দিয়ে লঘু স্বরে আলোচনা শুরু করে। লীডার তার জন্য ফিশ গ্রিলের অর্ডার দেন, সাথে ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস।
উনি এরকম আলোচনার মুহুর্তে মদ বা বিয়ার পান করেন না। নসু
তার প্ল্যানটা বলতে গিয়ে আসলে নিশ্চিত ছিল না লীডারের প্রতিক্রিয়াটা
ঠিক কিরকম হবে।
তিনি রাজী হবেন কিনা তাও নসুর জানা নেই। তাই একথা সেকথার পর একপর্যায়ে
একরকম মরিয়া হয়েই লীডারকে
তার প্ল্যান ‘সি’ বর্ননা করে এবং একাজে লীডারের সাহায্য চায়।
নসুর এরকম প্ল্যানের কথা লীডার স্বপ্নেও
ভাবেননি তাই খানিকটা ভিরমি খান। তার গ্লাস থেকে কিছু জুস ছলকে টেবিলের ওপরে পড়ে এবং তার প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়। টিস্যু পেপার দিয়ে
মুছতে চেস্টা করেন কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়না।
প্যান্টের চেইনের পাশে কাপড়টা ভেজাই থাকে, দলের ছেলেরা
দেখলে অন্য কিছু ভাবতে পারে ভেবে তিনি বিব্রত বোধ করেন।
কিন্তু পরক্ষণেই অপ্রতিভ অবস্থা কাটাতে গলা ঝেড়ে নসুকে জিজ্ঞেস
করেন,
- এইটা ক্যামতে! প্রচুর রিস্ক।
- ঠিক আছে, আমরাও কইলাম ছোট না।
- অনেক লম্বা হ্যার হাত।
- সবতেই জানে।
- রাস্তার টোকাই থাইক্যা
পুলিশ-প্রশাসন এমনকি পার্টির নেতাগোর লগেও হ্যার খাতির আছে।
- জিতলে সবতে ম্যানেজ করা যাইবো। হ্যারা চেনে মাল, সেটা কালা বাবু না লীডার ক্যাঠায়
দিতাছে সেইটা বিষয় না। তাগো মাল-পানি ঠিকঠাক
বুইঝা পাইলেই অইলো।
- ডেভেলপার কোম্পানিগুলো হ্যার
পিছনে প্রচুর পাত্তি ঢালে, হ্যার কখনও পাত্তির অভাব হয়না।
- পরে আমগো পিছনে
ঘুরবো।
নসু এবং ল্যাংড়া মনির তাদের ভাষায় আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। কখনও তাদের গলার স্বর উঁচুতে আবার কখনও
খাদে নেমে যায়। তারা
জানে কোনভাবে যদি এই প্ল্যান ভেস্তে যায় এবং তা যদি কালাবাবুর
কান অবধি পৌঁছে তাহলে এই দুনিয়াতে আর বেঁচে থাকতে হবেনা।
এমনকি দেশের কোথাও পালিয়েও
বাঁচা সম্ভব না, সব খানে তার লোক আছে। প্রয়োজন
বোধে পাতাল থেকে ধরে এনেও হত্যা করে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে তাদের মৃতদেহ ঝুলিয়ে
দিতে পারে। এটাই হল কালাবাবুর নিজস্ব স্টাইল, অতীতেও দলের কেউ বেঈমানি করলে সে তাদেরকে এভাবেই
শাস্তি দিয়েছে। এভাবেই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, তর্ক-বিতর্কের মধ্যে দিয়ে তাদের আলোচনা
এগিয়ে যায়।
লীডার তাকে সব ধরণের বিপদের কথা
স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেন। কালাবাবু ভীষণ ধূর্ত আর শঠ। তাকে খুন করা এক কথায় অসম্ভব।
আর কোনোভাবে নসু যদি তার
প্ল্যান কার্যকর করতে পারেও তাহলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে একদম তুলকালাম কান্ড লেগে যাবে। ফাঁকা মাঠ পেয়ে অন্য এলাকার ডন-মাফিয়ারা মিরপুর এলাকার দখল নিতে আসা মাত্র রক্তের হোলিখেলা ঢাকা শহরের সব
জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। এর
আগেও একবার এরকম হয়েছিল। নসু
তাকে এসব নিয়ে অযথা বেশী ভাবতে নিষেধ করে জানায় যে তার এই প্ল্যানে বোমা মিজানের
সমর্থন আছে এবং কালাবাবুর অবর্তমানে মিরপুর এলাকার বস সেই হবে। ল্যাংড়া মনির তাকে অবিশ্বাস করলে নসু বোমা মিজানের বিশেষ আইএসডি নাম্বারে ফোন করে লীডারকে কথা বলার
জন্য ফোনটা এগিয়ে দেয়। বোমা
মিজান নসুকে সাধ্যমত সবরকম সহায়তা করার জন্য নির্দেশ দেন, এরপরে আসলে আর কোন কথা থাকে না। লীডার পাঙ্খা নসুর সঙ্গে বোমা মিজানের এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখে অবাক হন। তবে লীডার খুশী একথা জেনে যে সে কখনই পাঙ্খা নসুর টার্গেট ছিল না, কিন্তু নসুর মনে কি
আছে তা সেই শুধু জানে।
৩০
ডেপুটি জেলারের অফিস।
কাসিমপুর কারাগার, সময় রাত আনুমানিক
বারোটা।
কালাবাবুর কাছে মোবাইল ফোনের
মাধ্যমে নসু এবং ল্যাংড়া মনিরের মধ্যে বিশেষ মিটিং এর খবরটা পৌঁছে যায়। কালাবাবু তখন ডেপুটি জেলারের অফিসে বসে দাবা খেলছিলেন। খবরটা পেয়ে কালাবাবুর কপালে চিন্তার
ভাঁজ পড়ে। কি বিষয়ে মিটিং তা
অবশ্য জানা যায়নি। তিনি ভ্রু কুঁচকে দাবার বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দাবার চাল দিতে দু'একবার ভুল করেন।
এরপর হঠাৎ দাবার বোর্ড উল্টে
দিয়ে মোবাইল ফোনে কয়েক জায়গায় নির্দেশনা দিতে দিতে নিজের সেলে ফিরে যান। তার এই হঠাৎ ক্ষেপে ওঠায় ডেপুটি
জেলার আছির সাহেব বেশ অবাক হন। তিনি কালাবাবুর চলে যাওয়া পথের দিকে
তাকিয়ে থাকেন কিন্তু মুখে কিছু বলার সাহস হয়না।
প্রতিমাসে কালাবাবুর
কাছ থেকে তিনি লাখ টাকার বান্ডিল আর পরিবারের নিরাপত্তাটা পান।
তার একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আছে, তার নিরাপত্তার কথাও তাকে ভাবতে হয়।
অনেক ভেবে চিন্তে নসু অপারেশনের
জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আর সাভার বাজারের মাঝে জ্বালেশ্বর-রেডিও কলোনি
এলাকাটাকে পছন্দ করে। জায়গাটা
অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশ ফাঁকা।
বিশ্বরোডের এই অংশটায়
দোকানপাট-বাড়িঘর বেশ কম।
এখানে এ্যাকশন করে নির্বিঘ্নে
বোমকা-বিরুলিয়া-জিরাবো হয়ে বাইপাইল থেকে উত্তরবঙ্গ কিংবা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অথবা
টঙ্গি থেকে ভৈরব হয়ে সিলেট বা চট্টগ্রামের দিকে, এমনকি দরকার হলে মিয়ানমারেও পালিয়ে
যাওয়া সম্ভব।
অপারেশন সফল হলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের
পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য কিছুদিন সম্ভবত লুকিয়ে থাকতে হতে পারে। নসুর সাথে এর আগেও কাজ করেছে এরকম কয়েকজন
বিশ্বস্ত এবং দক্ষ ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সে তার টিম তৈরি
করে। তারা অপারেশন প্ল্যান জানলেও কিলিং টার্গেট সম্পর্কে কিছু জানে না, গোপনীয়তা
রক্ষার খাতিরে কাউকে তা জানানো হয়নি।
শেষ মুহূর্তে প্রয়োজন বোধে তাদেরকে টার্গেট সম্পর্কে
জানানো হবে। পুরো প্ল্যানটা শুধু
নসু আর লীডারের মাথায়। নসু
লীডারকে কালাবাবুর আদালতে হাজিরার তারিখ এবং কোন পথে কিভাবে তাকে সেখানে নেয়া হবে
সেসব তথ্য সংগ্রহ করতে অনুরোধ করে নিজে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হোয়াইট মামুনকে সাথে
নিয়ে বান্দরবান যায়।
৩১
অপারেশন বিগফিশ।
বান্দরবান, অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান।
লীডারের নির্দেশে লোকাল কন্টাক্ট
হিসাবে মংপ্রু চাকমা তাদের সঙ্গে যায়। মংপ্রু চাকমা একসময় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ছোটখাট নেতা ছিল। এখন রাজনীতি বাদ দিয়েছে।
অপরাধ জগতের লোকজনদের কারো কারো সাথে পরিচয় থাকলেও সে এখন
কাকরাইলের মোড়ে একটা ফার্মে স্টেনো পদে চাকুরী করে।
তার সম্পর্কে এরবেশি কিছু জানা যায় না। তবে তার বড় ভাই ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির
ধারা মেনে আত্মসমর্পণ করলে তারা রাজস্থলী থেকে বান্দরবানের সুয়ালকে এসে বসতি গড়ে। নসু তার সাথে বান্দরবানের মেঘলা এলাকায় একটা গেস্ট হাউজে
ওঠে। মংপ্রু’র
সাথে তারা বিভিন্ন জায়গায় গোপনে অনুসন্ধান চালালেও কেউই
অস্ত্র কেনাবেচার বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেনা বা কেউ এ
বিষয়ে মুখ খুলতেও চায়না। আসলে
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে অনেকেই এসব তথ্য জানলেও সহসা কেউই
ধরা দিতে চায়না।
অবশেষে এক সোর্সের দেয়া তথ্য
অনুযায়ী তারা রোয়াংছড়ি যায়।
সেখানে অর্থের বিনিময়ে একজন কারবারী তাদেরকে সাহায্য
করতে রাজী হয়। তাকে গাইড হিসাবে নিয়ে নসু
বলিপাড়া থেকে থানচি হয়ে আরও দক্ষিনপূর্বে রেমাক্রি যেয়ে আসল ব্যক্তিটির সন্ধান পায়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং টাটমাডো বা সেনাবাহিনীর অত্যাচার উৎপীড়নের কারণে মিয়ানমারের প্রায় প্রতিটা প্রদেশেই বিদ্রোহী বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। এসব বাহিনীকে ঘিরে সেখানে অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদের একটা চোরাই বাজার গড়ে উঠেছে।
সে মিয়ানমারের এরকম একটা বিদ্রোহী দলের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও এমুনিশন সংগ্রহ করে দিতে রাজী হয়, কিন্তু এজন্য সে প্রচুর অর্থ দাবী করে। দরদাম কষাকষির পর অবশেষে তাদের মধ্যে একটা আপোষ রফা হয়। সোর্সের দাবী অনুযায়ী অর্ধেক
মূল্য পরিশোধ করে তারা লামা'তে রাত যাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। লামা বাজারে একটা বোর্ডিং
হাউজে উঠে তারা অপেক্ষা করতে থাকে।
মংপ্রু চাকমা রাতেই, খাওয়ার টেবিলে অস্ত্র কি জন্য প্রয়োজন হচ্ছে জানতে চাইলে নসু
নিরুত্তর থাকে। হোয়াইট মামুনও মুখ খোলে
না। তারা নিঃশব্দে খাবার
শেষ করে রুমে এসে শুয়ে পড়ে। এখন অবশ্য শুয়ে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই। মংপ্রু এমনি ভাসাভাসা ভাবে শুনেছে যে কারা যেন কালাবাবুকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করছে, তবে
কবে কোথায় কিভাবে হবে সেটা সে জানেনা। এরপর থেকে মংপ্রুও অস্ত্র কেনা'র বিষয়ে কোন প্রশ্ন না করে মুখে কুলুপ এঁটে
থাকে। তাদের পরের দিনটা একরকম
শুয়ে-বসে চুপচাপই কাটে। মংপ্রু একবার সুয়ালকে তার বাড়ী থেকে ঘুরে আসতে চেয়েছিল কিন্তু নসু রাজী না
হয়ে তাকে ডিলিংস বুঝে নেয়ার পরে বাড়ীতে যাবার পরামর্শ দেয়।
নসু ট্যুর করার জন্য কিছু প্রসাধন সামগ্রী,
ট্র্যাভেল ব্যাগ ইত্যাদি কেনা সহ ট্যুর প্রোগ্রাম, হোটেলের বিজ্ঞাপন ইত্যাদি
সংগ্রহ করার জন্য মামুনকে কক্সবাজারে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া তিন দিন পরের কক্সবাজার-ঢাকা রুটের রাত্রিকালীন
এসি বাসের টিকেটও কাটতে বলে। রাত আটটার দিকে যে বাসটা কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসবে তাতে ফাসিয়াখালি
থেকে তারা উঠবে বলে জানায়।
মামুন তার কাজে চলে যায়। মংপ্রু কান খাড়া করে নসু এবং মামুনের মধ্যে কথোপকথন শোনে
কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তিতে তার প্রতিফলন ঘটে না।
হোয়াইট মামুন পরদিনই সন্ধ্যায় লামায় ফিরে আসে কিন্তু অস্ত্রপাতি
তখনো না পৌঁছানোর কারণে নসু একটু চিন্তায়
পড়ে যায়। মংপ্রু চাকমা অবশ্য তাকে
দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে। তার ভাষ্যমতে পাহাড়িরা বাঙ্গালীদের তুলনায় অনেক সৎ, তারা কাউকে কথা দিলে
সেটা রাখে। হয়তো সীমান্তে কোন সমস্যার
কারণে খানিকটা দেরী হচ্ছে, কিন্তু তার ডেলিভারি ঠিক সময়ই চলে আসবে।
৩২
কক্সবাজার-ঢাকা মহাসড়ক।
ফেরার পালা।
তাদের
যেদিন ফাসিয়াখালি থেকে ঢাকায় ফেরার কথা সেদিন বিকেলেই চাহিদানুযায়ী সব অস্ত্রপাতি এসে পৌঁছায়। একটা একে-৪৭ রাইফেলসহ কয়েকটা
ম্যাগাজিন ভর্তি কার্টিজ এবং গোটা দশেক আর্জেস ৭২ গ্রেনেড। ম্যাগাজিনের গায়ে একটু মরচের দাগ থাকলেও তা ব্যবহার যোগ্য, প্রতিটা
ম্যাগাজিনে ৩০ রাউন্ড করে এমুনিশন ঠাসা। নসু অস্ত্র থেকে ম্যাগাজিন রিলিজ করে চার্জিং হ্যান্ডেলটা কয়েকবার আগুপিছু
করে এবং অস্ত্রের মাজল আকাশের দিকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দেয়। ক্লিক করে একটা
আওয়াজ হয়। এভাবে অস্ত্রের বোল্ট, পিস্টন, ফায়ারিং পিন এসব ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা তা
সহজেই বোঝা যায়। সে সেফটি লিভার সেইফ পজিশনে রেখে অস্ত্রটা মামুনের দিকে এগিয়ে
দেয়। মামুন এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে নসু'র কাজকর্ম দেখছিল, সে জীবনে প্রথম এরকম একটা
অস্ত্র স্পর্শ করতে পেরে খানিকটা উত্তেজিত বোধ করে।
নসু
অস্ত্রের চালান বুঝে পেয়ে দুশ্চিন্তা মুক্ত হলেও অজানা আশংকায় তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তবে সেটা মুহুর্তের ভাবনা মাত্র। বাকী অর্থ পরিশোধ করে তারা লামা থেকে চিরিঙ্গায় চলে আসে। নসু আসলে কোনও রিস্ক নিতে চায়না। অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে এ লাইনে ডাবল গেইম খেলার লোকের অভাব নেই। মংপ্রু পাওনা অর্থ বুঝে নিয়ে সুয়ালক যেতে চায়। লামা থেকে সুয়ালক কাছেই। নসু এবার যদিও না করেনা কিন্তু তার
মনটা খচখচ করতে থাকে। ঢাকায় আরও কাজের প্রলোভন দেখিয়ে
তাকে ঢাকায় ফিরে দেখা করতে বলে। মংপ্রু দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ীর পথে পা
বাড়ায়। তবে সে পথে এক জায়গায় থেমে
মোবাইলের দোকান থেকে অজ্ঞাত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ফোন করে। কয়েক হাত হয়ে সে খবর পৌঁছে যায় কালাবাবু এবং আরও কয়েক জায়গায়।
নসু
একবার মংপ্রুকে ইয়াংচার দিকে নিয়ে হত্যা করে জঙ্গলে ডেডবডি ফেলে দিতে চেয়েছিল। নসু আসলে একটা বড় কাজ সামনে রেখে এরকম অপরিচিত
জায়গায় কোন ধরনের উটকো ঝামেলায় পড়তে চায়নি। তাছাড়া ঢাকায় দেখা হলে সেখানেও ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকছে। নসু চিরিঙ্গায় একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে হোয়াইট মামুনকে নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে কক্সবাজারে হাজির হয়। সেখানে বাদ্যযন্ত্রের দোকান
থেকে একটা হাওয়াই গীটারের ব্যাগ
কিনে পরিচিত এক সস্তা হোটেলে ওঠে এবং গোসল
সেরে রাতের খাবার খেয়ে নেয়।
অস্ত্র এবং গ্রেনেডগুলো গীটারের ব্যাগে সুন্দরভাবে প্যাক
করে ঢাকায় ফেরার জন্য একটা এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে।
এরপর ওষুধের দোকান থেকে
স্যালাইন ও অন্যান্য জিনিসপত্র কেনে এবং কর্মচারীর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে একটা
ভুয়া প্রেসক্রিপশন বানিয়ে নেয়।
নসু একটা সেলুনে ঢুকে মাথা ন্যাড়া
করে এবং দাড়ি-গোঁফ ছেটে ফেলে।
তার দিকে তাকিয়ে হোয়াইট মামুনের হাসি পেলেও সে মুখে কিছু বলেনা। সে জানে নিশ্চয়ই এর পিছনে কোন কারণ আছে। নসু হোয়াইট মামুনকে মাথার চুল এবং জুলফি ছোট করতে বলে। এরপর রাত
সাড়ে আটটা/নয়টার দিকে তারা ঢাকার উদ্দেশে
রওয়ানা দেয়। হাওয়াই গীটারের
ব্যাগটা বেডের নীচে ঠেলে দিয়ে নসু রোগীর বেডে শুয়ে পড়ে।
হাতে এমনভাবে স্যালাইনের নলটা বাঁধা যেন তার শরীরে
স্যালাইন চলছে। তবে যে কোন মুহুর্তে
ব্যবহারের জন্য পিস্তলটা প্যান্টের কোমরে গুঁজে রাখে।
হোয়াইট মামুন ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে। এ্যাম্বুলেন্সের হুটার রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে
ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে কিন্তু পটিয়াতে এসে তারা বাধাগ্রস্থ হয়। সামনে বেশ বড় জ্যাম। পুলিশ চেকপোস্ট বসেছে। ঢাকার
দিকে যাওয়া সব গাড়ীতে তল্লাশি চলছে। হোয়াইট মামুন পিছনে ফিরে নসুর দিকে তাকায়। তাদের চার চোখের মিলন হয়। নসুর মুখে হালকা হাসির রেখা, তারা তাদের ভাষা বুঝে
নেয়।
ড্রাইভার
বেশ বিরক্ত হয়ে পথের অন্যান্য গাড়ীকে পাশ কাটিয়ে আস্তে আস্তে এ্যাম্বুলেন্সটা
পুলিশ চেকপোস্টের সামনে নেয়।
দু’জন পুলিশ কনস্টেবল
কাছে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মামুন ঠাণ্ডা মাথায় তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়,
- কোথা থেকে আসছেন ?
- কক্সবাজার।
- কোথায় যাবেন ?
- ঢাকা।
- বেডে কে ? ওনার কি হয়েছে ?
- কয়েকদিন আগে কক্সবাজারে বেড়াতে
গিয়েছিলাম। আজ বিকালে হঠাৎ ফুড পয়জনিং
এর কারণে তার বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তারের পরামর্শে ভালো চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নিয়ে
যাওয়া হচ্ছে। রোগীর শারীরিক অবস্থা
বেশী ভাল না, তার পরিবারের
লোকজনদেরকে খবর দেয়া হয়েছে।
মামুন রোগীর ব্যবস্থাপত্র এবং তারা
কক্সবাজারে যে হোটেলে ছিল তার ভাউচার ও অন্যান্য কাগজপত্র বের করে দেখায়। পুলিশ তাদের ব্যাগ তল্লাশি
করতে চায় কিন্তু রোগীর ক্রমাগত চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে ক্লিয়ার সিগন্যাল দিয়ে এ্যাম্বুলেন্সটাকে
সাইড কেটে বেরিয়ে যেতে বলে। কিছুটা
এগোনোর পর তাদের যে গাড়ীতে ঢাকায় ফেরার কথা ছিল সেটাকে তারা রাস্তার
পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়।
পুলিশ লাগেজ বক্স থেকে
যাত্রীদের সব মালপত্র নিচে নামিয়ে প্রতিটি
ব্যাগ পরীক্ষা করছে। সবাই
যাত্রার অযাচিত বিলম্বের কারণে বেশ বিরক্ত কিন্তু তাদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু
করার নেই, পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে।
ব্যাকভিউ মিরর দিয়ে হোয়াইট মামুন
পিছনে নসুর দিকে তাকায়। নসুর
প্রতি শ্রদ্ধায় তার ঘাড় নুয়ে পড়তে চায়। সে
একারণেই পাঙ্খা নসুকে এত ভালবাসে। কি বুদ্ধিমান আর স্মার্ট! তার সাথে কাজ করার
মজাই আলাদা। ফাঁকা হাইওয়ে ধরে
এ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশে হুহু করে এগিয়ে চলে।
কাকডাকা ভোরে যাত্রাবাড়ী
পৌঁছে তারা এ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়। নসু স্যালাইনের নল খুলে গীটারের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে
শুরু করে। হোয়াইট মামুন ভাড়া মিটিয়ে নসুর চলার গতির সঙ্গে তাল মেলায়।
এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার অবাক
হয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে। ভোরের ঘন কুয়াশায় দুটো অবয়ব একসময়ে ফিকে হতে হতে মিলিয়ে যায়।
৩৩
অপারেশন
বিগফিশ।
রেডিও কলোনি এলাকা,
জ্বালেশ্বর, সাভার।
সময়
আনুমানিক বেলা এগারোটা।
রৌদ্র করজ্জল সেই দিনটা নসু মিয়া
ওরফে পিচ্চি নসু ওরফে পাঙ্খা নসুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। দিনটা তার জন্য একই সাথে ভাগ্য গড়ার কিংবা ধ্বংসের দিন। লীডারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী
সেদিনই কালাবাবুকে আদালতে নেয়া হবে এবং কোন পথে আসামীকে আদালতে নেয়া হবে তাও সোর্সের
মাধ্যমে প্রিজন ভ্যান চালকদের কাছ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
পূর্বের প্ল্যান অনুযায়ী নসু জেলখানার গেট থেকে শুরু করে সাভার বাজার পর্যন্ত পথের বিভিন্ন
স্থানে লুক আউট ম্যান বসিয়ে দেয়। তারা প্রিজন ভ্যান এবং পুলিশ এস্কর্টের মুভমেন্টের তথ্য ফোনে জানিয়ে
পরিস্থিতির আপডেট দিবে।
নসু ভিতরে ভিতরে খুবই রোমাঞ্চিত হয়ে
আছে কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করে না। অনেক
রকমের অজানা আশঙ্কা তার মনের ভিতরে উঁকি দিয়ে যায়। সে জানে এ অপারেশনে ব্যর্থ হওয়া যাবেনা। আর যদি সে কোন কারণে ব্যর্থ হয় তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ রকমের, যা হয়ত সে কল্পনাও করতে পারেনা।
আর তা ভাবতে গেলে শরীরটা শিউড়ে ওঠে।
তাই মাথা থেকে জোর করে সব
দুশ্চিন্তা বা টেনশন ঝেড়ে ফেলে নিজের কাজে মন দেয়।
এত দীর্ঘ প্রস্তুতির পর
সে ব্যর্থ হতে পারেনা। প্যাকেট
থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুন ধরায়। বুকের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের করে আকাশে
ছুঁড়ে দেয়। টেনশনগুলো যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিশে যায়।
সে আর লীডার অনেকদিনের পরিশ্রমের পর
যেভাবে অপারেশন প্ল্যান সেট করেছিল ঠিক সেভাবেই
দলের ছেলেদের নিয়ে জ্বালেশ্বর রেডিও কলোনি এলাকায় রোড এমবুশ পেতে শিকারের জন্য
অপেক্ষা করতে থাকে। নসুর হাতে কক্সবাজার থেকে কেনা সেই গীটারের ব্যাগ,
আর একটা চটের তৈরি বাজারের ব্যাগ নিয়ে হোয়াইট মামুন তার পাশে
বসে আছে। তার চটের ব্যাগ থেকে লাউএর কচি ডগা উঁকি মারছে। যেন এইমাত্র বাজার থেকে শাকসব্জি
কিনে বাসায় ফেরার পথে দু’বন্ধুর দেখা হয়েছে। তারা যেন গাছের ছায়ায় বসে গভীর আড্ডায় ব্যস্ত।
নসুর ব্যাগে একে-৪৭এর বাট ফোল্ডিং
করে রাখা, সাথে লোডেড ম্যাগাজিন। হোয়াইট মামুনের বাজারের
ব্যাগে আরজেস ৭২ গ্রেনেডগুলো লুকিয়ে রাখা আছে।
সময় হলে ছেলেদের মধ্যে
ভাগ করে দেয়া হবে। তাদের একেকজনের একেক রকম ছদ্মবেশ।
কেউ বাদামওয়ালা সেজে বসে আছে, আবার কেউবা বাদামওয়ালার
পাশে অলস ভাবে বসে বাদামের খোসা ছিলছে। একজন অদূরে রাস্তার পাশে একটা দেড়টন ওজনের
কাভার্ড ভ্যানে হেলান দিয়ে কানের ময়লা পরিষ্কারে ব্যস্ত, যেন তার আজ কাজে যাওয়ার কোন তাড়া নেই! আরেকজন রেইন ট্রির ছায়ার একটা মোটর সাইকেলে বসে একটু পরপর আয়নায় তাকিয়ে চুল ঠিক করছে বা আঙ্গুলের
নখ দিয়ে মুখের ব্রণ খুচিয়ে চলছে। দূরে তাদের আরেকটা গ্রুপ কোত্থেকে ক্যারাম বোর্ড জোগাড় করে আড্ডাবাজ
যুবকদের মত চুটিয়ে ক্যারাম খেলছে। একটু পরপর সেখান থেকে হৈ-হল্লা ভেসে আসছে।
বিভিন্নরকম ছদ্মবেশে ছোট ছোট উপদলে
ভাগ হয়ে তারা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়ে শিকারের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা অবশ্য তখনও জানেনা তাদের শিকার বা এই অপারেশনের সাবজেক্টটা আসলে কে। জানলে হয়ত তাদের অনেকেই এই অপারেশনে অংশগ্রহণ না করে পালিয়ে যেত।
তবে ভিতরে ভিতরে তারা সবাই যে উত্তেজিত হয়ে আছে তা বেশ
বোঝা যায়। বারুদ, রক্তের নেশা আর তাতানো রোদ্দুর তপ্ত করে রাখে তাদের। সময়ের সাথে সাথে তাদের অ্যাড্রিনাল
গ্রন্থির মেডালা অঞ্চল থেকে অ্যাড্রিনালিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়েই চলে।
৩৪
নিজের সেল,
কাসিমপুর কারাগার।
সময় আনুমানিক সকাল সাড়ে নয়টা।
ল্যাংড়া মনিরের সাথে নসুর হঠাৎ বেশী
ঘনিষ্ঠতা শুরু থেকেই কালাবাবুকে বেশ সন্দিগ্ধ করে তোলে।
তাই যেদিন নসু সেফ হাউজ ছেড়ে
ঢাকায় এসে তার তৎপরতা শুরু করে কালাবাবু সেদিন থেকেই তার পিছনে আন্ডার কাভার স্পাই
বা তাদের ভাষায় টিকটিকি লাগিয়ে দেয়। এর বাইরে ল্যাংড়া মনিরের ঘনিষ্ঠ লোকজনই
কালাবাবুর লোকদের কাছে অর্থের বিনিময়ে তথ্য পাচার করে।
এভাবে নসুর প্রতিটি মুভমেন্ট সে তার নজরে রাখে, এমনকি বান্দরবান থেকে অস্ত্রপাতি সংগ্রহ করা পর্যন্ত। সে অবশ্য নসুকে অস্ত্রসহ সেখানেই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে অলৌকিকভাবে
তার পাতানো জাল ফস্কে বেড়িয়ে যায়। বান্দরবান থেকে ঢাকায় ফেরার পরপরই কালাবাবু অনেক টাকার বিনিময়ে হোয়াইট
মামুনকে কিনে ফেলে। এছাড়াও অতিরিক্ত
সতর্কতা হিসেবে হোয়াইট মামুনের স্ত্রী এবং একমাত্র সন্তানকে কালাবাবুর লোক
অজ্ঞাতনামা কোন এক হাইড আউটে আটকে রেখেছে। এরপর থেকে তার বাকী কাজ খুব সহজ হয়ে যায়। তবে তারই রক্ষিতা যে তারই টাকা-পয়সা তার বিরুদ্ধে
ব্যবহারের জন্য নসুর পিছনে ঢালছে এই তথ্য কিভাবে যেন লোক-চক্ষুর আড়ালে চলে
গেছে।
হোয়াইট মামুন জানত নসু যতোই চেষ্টা করুক না কেন সে আসলে কোনদিনই কালাবাবুর সঙ্গে ক্ষমতা বা
বুদ্ধিতে পেড়ে উঠবে না। অথচ
নসুর উচ্চাশা পূরণ করতে যেয়ে শুধুশুধুই তাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে। তার চেয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো টাকার অফার পেয়ে সে গোপনে কালাবাবুর
দলে ভিড়ে যাওয়াই উত্তম বলে বিবেচনা করে। এছাড়া তার স্ত্রি এবং সন্তানের প্রাণহানির শঙ্কা তো আছেই। কালাবাবুর
নির্দেশে সে নসুর সাথে বরাবরের মত মিশে থাকে আর সুযোগ পেলেই নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন
করে তথ্য জোগাতে থাকে। এভাবে
পাঙ্খা নসুর প্ল্যানের কমবেশি সবকিছুই কালাবাবুর নখদর্পণে
থাকে। সে জেলে বসে সন্তর্পণে
নসুকে বড়শিতে গাঁথার জন্য ছক কষতে থাকে। সে জানে দিন শেষে সব কিছুই তার প্ল্যান অনুযায়ীই হবে
কিন্তু পুলিশ তার টিকিটিও ছুঁতে পারবেনা। সে জাল বুনে শিকারি মাকড়শার মত অপেক্ষা করতে থাকে আর পাঙ্খা নসুকে তার
প্ল্যান অনুযায়ী এগিয়ে যেতে দেয়।
প্রিজন ভ্যানে ওঠার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে
কালাবাবু অসুস্থ হওয়ার ভান করে। ডাক্তারের
প্রেসক্রিপশন মতে তার মাইল্ড
কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট হয়েছিল।
তাই কোর্টে হাজিরা দেয়ার জন্য সেদিন তাকে আর নেয়া সম্ভব
হয়নি। ডাক্তার অবশ্য এর বিনিময়ে বুঝে পায় পাঁচশত টাকার একটা বান্ডিল। কালাবাবু এসব বিষয়ে খুব উদার। তার দৃঢ় বিশ্বাস এই
পৃথিবীতে সবারই একটা বিক্রয় মূল্য আছে আর এই এমাউন্টটা নির্ভর করে পরিবেশ
পরিস্থিতি এবং কারো চাহিদার অনুপাতে। কেউ ক্যাশে আবার কেউ কাইন্ডে এই এমাউন্টটা
বুঝে নেয়। বিক্রয় মূল্যের এই তারতম্যের জন্যই হয়ত ডাক্তার সাহেব গোপনে আরেকটা
অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
জেল কর্তৃপক্ষ একেবারে শেষ মুহুর্তে কালাবাবু'কে ড্রপ করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সেটা কোনভাবেই নসুর পক্ষে জানা সম্ভব হয়না। জেলের গেটের কাছে অপেক্ষারত
নসুর লুকআউট ম্যান সেসময়ে প্রকৃতির ডাকে একটু
দূরে সরে যাওয়ায় তার পক্ষেও
বিষয়টা আঁচ করা সম্ভব হয়না। সে জেল পুলিশের কর্ম ব্যস্ততা আর যাত্রার প্রস্তুতির তারতম্য থেকে ধরেই নেয় যে কালাবাবু প্রিজন ভ্যানের ভিতরেই আছেন এবং সে হিসাবেই নসুকে তথ্য
আপডেট দেয়া হয়। কালাবাবুকে ছাড়াই
প্রিজনভ্যান সামনে-পিছনে এস্কর্ট পিকআপসহ আদালত ভবনের
উদ্দেশে যাত্রা করে।
হুটারের তীক্ষ্ণ শব্দ আর সব শব্দকে ছাপিয়ে
কালো রাজপথ ধরে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়।
৩৫
অপারেশন বিগফিশ।
অপারেশন এলাকা-রেডিও কলোনি,
জ্বালেশ্বর, সাভার।
সময় আনুমানিক বেলা বারোটা।
প্রিজন ভ্যান নবীনগর পার হয়ে বিশ
মাইলের কাছাকাছি পৌঁছামাত্র ওয়াচম্যান মোবাইলে কনভয়ের অবস্থান জানায়। হোয়াইট মামুন দ্রুত সবার মাঝে গ্রেনেডগুলো ভাগ করে দেয়। নসুর মধ্যে একই সঙ্গে একধরনের অস্থিরতা আর হৃদকম্পন শুরু
হয়। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে
সে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
টানটান উত্তেজনার সাথে অপেক্ষার
প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। একসময় দূর থেকে ঘন নীল রঙের প্রিজন ভ্যানের দেখা মেলে। সেটা যেন সরীসৃপের মত ধীর পায়ে
এগিয়ে আসে। বিপিএটিসি-রেডিও
সেন্টার পার হয়ে রেডিও কলোনি মডেল স্কুলের কাছাকাছি এসে পৌঁছালে আগের পরিকল্পনা
অনুযায়ী কাভার্ড ভ্যান রাস্তার পাশ থেকে ছুটে এসে আড়াআড়িভাবে রাস্তার মাঝখানে
দাঁড়ানো মাত্র মোটর সাইকেল আরোহী মোটর সাইকেল চালিয়ে এসে সেটাতে সরাসরি জোরে ধাক্কা
মারে। সঙ্গে সঙ্গেই কাভার্ড
ভ্যানের ড্রাইভার আর একজন শ্রমিক গাড়ী থেকে নেমে মোটর সাইকেল
আরোহীর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়।
রাস্তা ব্লক হয়ে যাওয়াতে প্রিজন
ভ্যানের সামনে থাকা এস্কর্ট পিকআপের ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে ঘন ঘন হর্ন বাজাতে থাকে
কিন্তু তাতে কাভার্ড ভ্যানের ড্রাইভার বা হেল্পারের যেন বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা তাদের ঝগড়া চালিয়ে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে মোটর
সাইকেল আরোহীর সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়। এ পর্যায়ে এস্কর্ট পিকআপ থেকে কর্তব্যরত সাব-ইন্সপেক্টর
নেমে এসে মারামারি থামিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার করতে উদ্যত হন।
পুলিশের প্রিজন বাহী কনভয় তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছে আর প্রিজন ভ্যানের উঁচু শিকবদ্ধ জানালা থেকে
ভিতরের উৎসুক কয়েদীরা বাইরে তাকিয়ে পরিস্থিতি
বোঝার চেস্টা করছে। ঠিক এ মুহূর্তটুকুর
অপেক্ষাতেই নসু অনেকগুলো নির্ঘুম রাত পরিকল্পনার
জাল বুনে কাটিয়েছে।
কাভার্ড ভ্যানের শ্রমিক হঠাৎ ঝগড়া
থামিয়ে ৪৫ ডিগ্রী কোনে ঘুরে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে দাড়িয়ে থাকা সাব-ইন্সপেক্টরের
বুক বরাবর ফায়ার করে। মুহূর্তেই
ঘটে যায় দেশের ক্রাইম জগতের সবচেয়ে আলোচিত
ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা। যা
পরবর্তীতে অনেকদিন পর্যন্ত দেশ সেরা দৈনিক পত্রিকাগুলোর হেডলাইন
দখল করে রেখেছিল। এ ধরনের দুধর্ষ সন্ত্রাসী
ঘটনা দেশের অপরাধ জগতে এর আগে কখনও ঘটেনি। এসব ঘটনা এতদিন শুধু হলিউডের
ক্রাইম থ্রিলার মুভিতেই দেখা যেত। পিস্তলের প্রজেক্টাইল পাক্ খেতে খেতে পুলিশ অফিসারের বুক ভেদ করে পীঠে বড় স্বাক্ষর
রেখে দূরে কোথাও হারিয়ে যায়। মোচড়
দিয়ে সে রাস্তায় পড়ে এবং কিছু বলার আগেই তার প্রাণ বায়ু
বেড়িয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় এস্কর্ট
পিকআপের ট্রেইল বোটে আসীন পুলিশ সদস্যরা হতভম্ব হয়ে যায়।
তারা তাদের প্রাথমিক হতবিহ্বল
অবস্থা কাটিয়ে সঙ্গে থাকা চাইনিজ রাইফেলে ম্যাগাজিন লোড করে ফায়ার করতে উদ্যত হলে নসুর
হাতের একে-৪৭ থেকে একপশলা বুলেট এসে ভেদ করে তাদের শরীর, ভ্যান এবং পিক আপের বডিতে। বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিজেদের আসনেই হেলে পড়ে থাকে তাদের কেউ কেউ।
ড্রাইভারসহ দু’একজন অবশ্য পালাতে সক্ষম হয়।
পিছনের এস্কর্ট পিকআপ সজোরে একটা
বাঁক নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্র পিকআপে বসে থাকা পুলিশ সদস্যরা সন্ত্রাসীদের দিকে
লক্ষ্য করে ফায়ার করে, কিন্তু আচমকাই গ্রেনেডের হাজারো স্প্লিন্টার এসে ভেদ করে তাদের সমস্ত অঙ্গ
প্রত্যঙ্গ। কেউ কেউ মুখ থুবড়ে সেখানেই পড়ে যায়। রক্তে
ভেসে যায় পুরো রাজপথ।
সন্ত্রাসীদের কয়েকজন আহত এবং দু’একজন রাস্তার ওপরে
বেকায়দায় মরে পড়ে থাকে। পুরো
ঘটনাস্থল জুড়ে রক্তের হাজারো ধারা রঞ্জিত করে দেয় কালো রাজপথ।
বুলেটের আঘাত আর গ্রেনেডের
স্প্লিন্টার ক্ষত বিক্ষত করে রাখে পীচের কালো আস্তর, আশেপাশের গাছের ডাল-পালা আর প্রিজন কনভয়ের গাড়ীগুলো। চারদিকের বাতাসে বারুদের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ আর মানুষের
আর্ত চীৎকার। বাঁচার আশায় তাদের তীক্ষ্ণ
করুণ আহাজারি আর্দ্র করে রাখে পুরো পরিবেশ। নসু কয়েকজনকে সাথে নিয়ে দৌড়ে প্রিজন ভ্যানের পিছনের ভারী তালা ভেঙে
কালাবাবুকে খোঁজে।
কিন্তু নাহ্, কালাবাবু সেখানে নাই।
প্রিজন ভ্যানের ভিতরে এখানে সেখানে পড়ে আছে নাম না জানা হতভাগ্য কয়েকজন কয়েদীর লাশ।
কেউ কেউ বাঁচার আশায় আকুতি
মিনতি করছে। হয়তো ভেবেছে তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হবে।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে
সদ্য গোঁফ ওঠা এক কিশোর। নসুর
লোকজন উপুড় হয়ে পড়ে থাকা লাশের সারি উল্টিয়ে দেখে কিন্তু সেখানে কালাবাবুর নাম-গন্ধ পর্যন্ত নেই। সে যেন হাওয়ায় মিইয়ে গেছে।
কিন্তু তা কি করে সম্ভব!
প্রিজন ভ্যানের তালাটা তো সে নিজেই ভেঙ্গেছে আর ভ্যানের জানালা গ’লে পালিয়ে যাওয়া
কোন ভাবেই সম্ভব না। তবে কি কালাবাবু প্রিজন ভ্যানের মধ্যে হাজির ছিল না! কিন্তু
তা’ কি করে সম্ভব!
নসু কিংকর্তব্যবিমুঢ়!
ল্যাংড়া মনিরের কাছ থেকে ফোন আসে,
- ওই হালা! তুই কই রে?
- এইতো লীডার, এই হানে।
- কেইস হয়া গেছে রে নসু। তুই বেবাগটিরে
নিয়া ভাগ। পালা।
- ক্যালা! কি হইছে?
- আরে হালার পুত! কালাবাবু তো
ভ্যানে আছিলো না। কেউ তোর লগে গাদ্দারি করছে।
- কিন্তু এটা ক্যামতে।
- জানি না।
তুই তাড়াতাড়ি কাইট্যা পড়।
কেউরে তর লগে রাখিস। কালাবাবু'র পোলাপাইন
তোরে মারণের লাইগা রওনা দিছে কইলাম। তুই ভাগ, দোহাই লাগে।
লীডার এও জানায় যে, অপারেশন ক্যান্সেল।
সে আর এসবের মধ্যে নেই।
নসু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব কিছু গুটিয়ে যেন পালিয়ে যায়। কালাবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের
চেষ্টা চলছে। সে কালাবাবুকে বুঝিয়ে একটা
আপোষরফা করে নিবে, আশাকরি
কোন সমস্যা হবেনা।
কিন্তু এতজন পুলিশ সদস্যের লাশ! এর কি হবে ? রাষ্ট্র কি তাকে ক্ষমা করবে! মনেহয় না। একটা সরীসৃপ যেন শীতল পায়ে তার
শিরদাড়া বেয়ে হেঁটে যায়। ভয়ের
একরাশ কালো মেঘ এসে তাকে আচ্ছন্ন করে। সে ঘামতে থাকে আর দলের অন্যরা
হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারা সবাই বুঝতে পারে কঠিন
বিপদ আসন্ন, সেখান থেকে তাদের কারো রেহাই নাই। এই পরিণতির জন্য তারা একে অপরকে দুষতে থাকে। মনের মধ্যে কেউ যেন বলে ওঠে, পালা নসু ...... পালা ... পালিয়ে যা তুই!
৩৬
নাজমা বোর্ডিং হাউজ, দারিয়াকান্দি
রোড, কুলিয়ারচর।
সময়টা সন্ধ্যার পরপর।
রাস্তার দু’দিকেই যাত্রীবাহী
গাড়ীগুলো ক্রমান্বয়ে ভিড় করতে থাকে। আশেপাশের
লোকজন গোলাগুলির শব্দ থেমে যাওয়ায় ঘটনাস্থলে একেএকে জড়ো হতে
থাকে। দূর থেকে পুলিশের টহল গাড়ীর তীক্ষ্ণ হুটারের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
হয়ত গোলাগুলির শব্দ শুনে
থানায় কেউ খবর দিয়েছে। নাহ্, আর এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা
নয়। যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন পালিয়ে বাঁচতে হবে। নসু হঠাৎই বেঁচে থাকার তীব্র তাগিদ অনুভব করে। গ্রুপের সবাইকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশের যে কোন প্রান্তে
পালিয়ে যেতে বলে। সে নিজেও হোয়াইট মামুনকে
সাথে নিয়ে মোটর সাইকেলে চেপে বসে। কিন্তু সে জানেনা তারা কোথায় পালিয়ে যাবে! ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেফ হাউজ দলের
অনেকেই চেনে। তাদের কারো মাধ্যমে
পুলিশের পক্ষে সেটা হয়ত সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এ মুহূর্তে যেটা
প্রয়োজন সেটা হল যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা থেকে সরে পড়া।
হোয়াইট মামুনের পরামর্শ অনুযায়ী তারা মোটর সাইকেলে কুলিয়ারচরের
দিকে রওয়ানা দেয়। সেখানে হোয়াইট মামুনের পরিচিত একটা জায়গা আছে, প্রয়োজন হলে সেখানে বেশ কয়েকদিন
লুকিয়ে থাকা যাবে।
বিকল্প কোন প্ল্যান হাতে না থাকায় নসু
দ্বিতীয়বার আর কিছু না ভেবেই হোয়াইট মামুনের
প্রস্তাবে সারা দেয়। একটানা মোটর সাইকেলে চালিয়ে তারা প্রথমে
আশুলিয়া হাইওয়েতে ওঠে, তারপর টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক ধরে ঘোড়াশাল পৌঁছে। রিফুয়েলিং করার জন্য সেখানে একটা ফিলিং স্টেশনের পাশে থামে, সেখানে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি করে চা নাস্তা খেয়ে নেয়। কিন্তু মানসিক অবসাদ আর টেনশনের কারণে নসুর গলা দিয়ে
পেটে কিছু নামতে চায়না। মোটর সাইকেল রিফুয়েলিং
শেষে প্রস্রাব করার অজুহাতে হোয়াইট মামুন টয়লেটে ঢুকে কালাবাবু'র লোককে ফোনে তাদের
অবস্থান এবং তারা কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করেছে তা জানিয়ে দেয়।
ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ধরে বিকেল নাগাদ
তারা কুলিয়ারচর পৌঁছে।
পাঙ্খা নসু আগের প্ল্যান পাল্টে অর্থাৎ হোয়াইট মামুনের
খোঁজ দেয়া জায়গায় না যেয়ে আপাতত একটা সস্তা বোর্ডিং হাউজে ছদ্ম পরিচয়ে কয়েকদিন থাকার
সিদ্ধান্ত নেয়। সেখান থেকে ঢাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তি প্ল্যান ঠিক
করবে বলে হোয়াইট মামুনকে জানায়। এক সময় হয়ত পরিস্থিতি কিছুটা
স্বাভাবিক হবে, তখন সীমান্ত পার হয়ে ওপারে চলে যাবে।
হোয়াইট মামুনও তার সাথে যেতে চায়, তবে সে হ্যাঁ বা না
কিছু বলে না। কুলিয়ারচর রেলস্টেশনের কাছেই দারিয়াকান্দি রোডে নাজমা বোর্ডিং হাউজের বোর্ডারের
খাতায় তারা নাম ওঠায়। ভুল
নাম ঠিকানায় তারা পেশা হিসাবে মাছের
ব্যবসা উল্লেখ করে। সেখানে তাদের মত আরও
অনেক মাছ ব্যবসায়ী রাত যাপন করে থাকে। সন্ধ্যায় সিগারেট কেনার অজুহাতে রুম থেকে বের হয়ে হোয়াইট মামুন ফোনে কালাবাবু'র লোক'কে বোর্ডিং হাউজের নাম ও অবস্থান
জানিয়ে দেয়। এরপর সিগারেটের সাথে কয়েকটা রুটি আর কলা কিনে সে রুমে ফেরে। এরপর
সেগুলো পেটে চালান করে দিয়ে গোসল সেরে মাথায় একটা বালিশ চেপে সোফায় শুয়ে পড়ে। রাতে বাইরে কোথাও খেতে যাবেনা বলে নসুকে জানায়।
এতোটা পথ একটানা মোটর সাইকেল চালিয়ে সে এখন ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছে বলে
নসুকে জানায়।
কিন্তু তার আসল প্ল্যান হলো নসু রাতের খাবার খেতে বাইরে যাওয়া মাত্রই সে রুম থেকে সট্কে পড়বে।
নসু একাই কুলিয়ারচর স্টেশনের পথের ওপারে
একটা রেস্তোরাতে রাতের খাবার খেতে যায়। খাওয়া
শেষে ল্যাংড়া মনিরকে মোবাইলে ফোন দেয় কিন্তু কেউ সে ফোন রিসিভ
করেনা। পরপর কয়েকবার রিং করলে এক সময় মোবাইল ফোনটা
বন্ধ পাওয়া যায়। মোবাইল নাম্বারটা এরপর আর কখনও খোলেনি।
ওটা আসলে স্তব্ধ হয়ে যায় চিরকালের মতো আর তার মালিক তখন কালশি রোডের মাথায় বিদ্যুৎ
পোলের সঙ্গে ঝুলছে। এমনিতে
কেউ জানেনা সেটা কাদের কাজ তবে নসুর মত যারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাসিন্দা তারা ঠিকই
বুঝতে পারে, কিন্তু কেউই ভয়ে মুখ খোলে না।
ফোনে লীডারের কোন সাড়া না পেয়ে
খানিকটা চিন্তিত মুখে বোর্ডিং হাউজের দিকে রওনা করে। নসু কি ভেবে পিচ্চি জালালকে ফোন করে,
সে মূলত পুলিশের ইনফরমার। কিন্তু রূপনগর বস্তিতে একসাথে বেড়ে ওঠা এবং অনেকবার ভাগাভাগি
করে ডান্ডির নেশা করার কারণে নসু ও জালালের মধ্যে পুরনো সখ্যতা আজও রয়ে গেছে। এজন্য কখনো জরুরী অথবা গোপন
তথ্যের দরকার পড়লে নসু তাকেই ফোন করে, সেও
নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যতোটা সম্ভব তথ্য দিয়ে নসুকে সাহায্য করে। আজ এরকম টানটান উত্তেজনার
দিনে নসু জালালের স্মরনাপন্ন হয়।
কয়েকবার রিং টোন বাজার পর পিচ্চি জালাল
ফোন ধরে,
- ক্যাডা রে!
- নসু কইতাছি, ঐ দিকক্যার খবর কিরে!
- তুই কই? এইটা
কার নাম্বার? তাড়াতাড়ি ভাগ। দ্যাশের বাইরে যা। আমারেও ফোন দিস না।
- ক্যান কি হইছে?
- তুই তো আগুন লাগায়া দিছোস।
- মানে!
- ক্যান তুই কুনো আওয়াজ পাশ নাই!
কিছু শুনোস নাই! লীডাররে তো কালাবাবু'র লোক মাইরা ফালাইছে। আর ঐদিকে কালাবাবু নিজেও নাকি জেলের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক
কইরা মরছে। পুরা
আন্ডার ওয়ার্ল্ডে এখন তুলকালাম চলতাছে।
- সোনিয়া! সোনিয়ার খবর কি?
- সোনিয়া! সে আবার ক্যাডা?
নসু বুঝতে পারে,
পিচ্চি জালাল সোনিয়ার ব্যাপারে কিছু জানেনা। তাদের মধ্যে আরও বেশ
কিছুক্ষণ উত্তেজিত স্বরে কথাবার্তা চলে।
৩৭
অপারেশন বিগফিশ।
পরিণতি।
মামুনের রুমের দরজাটা আধেক ভেজানো দেখে সেদিকে এগিয়ে যায় কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার আগেই যা ঘটে তার জন্য সে আসলেই প্রস্তুত ছিল না। করোটির পিছনে পিস্তলের মাজলের ধাতব
স্পর্শ অনুভব করে সে চিরাচরিত অভ্যাসবশেই তৎক্ষণাৎ জিন্সে গুঁজে রাখা পিস্তল টান
মেরে ডান হাতে নিতে চায় কিন্তু পারে না। সময় এখন স্থির। নসুকে ঘরের ভিতরে ঠেলে
দেয়া হলে সে দেখতে পায় হোয়াইট মামুন সোফায় হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, তার মাথার বালিশ রক্তে আধ ভেজা।
বুকের ক্ষত স্থান থেকে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তারমানে ঘটনাটা কিছুক্ষণ আগেই ঘটেছে, দৃষ্টি সিলিঙের দিকে
স্থির।
নসু ভালো করেই জানত এই অপারেশনে ব্যর্থ
হওয়া মানে জীবন দিয়ে তার প্রতিদান দেয়া। মুহূর্তেই স্থির হয়ে যায় পাঙ্খা নসু, তার হাত দু’টো হঠাৎ
অসহায় ভাবে ঝুলে পড়ে কোমরের দু’পাশে। কিছু করার থাকেনা। এরকম
সময়ে অনেক অপরাধীই তার নিয়তি মেনে নিয়ে বরং সহযোগিতা করে। তবে যারা একটু বেশি
সাহসী তারা হয়ত রিএক্ট করার চেষ্টা করে, নসু এই গোত্রের।
পরদিন সকালে ভৈরব থেকে পুলিশ এসে
ডেড বডি দু’টো নিয়ে যায়। মর্গের
লাশ কাটা টেবিলে পাঙ্খা নসুর পাঙ্খাহীন লাশ
চিৎ হয়ে পড়ে থাকে পোস্ট মরটেমের অপেক্ষায়।
৩৮
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
সময়- রাত দুটা বেজে দশ মিনিট।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর প্যাসেঞ্জার
ফ্লাইটের নামগুলো খুব সুন্দর।
রাজহংস, মেঘবাড়ি,
ময়ুরকন্ঠি, আকাশবীণা কি দারুন সব নাম!
এই মুহুর্তে শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট এর টারমাকে দাঁড়িয়ে
থাকা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিম লাইনাটার এর নাম 'জলছুট'। ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে ভ্যান্কুভার যাবে। ঘন কুয়াশার মাঝে বিমানের সাদা ধবধবে অবয়বটা দেখতে অশরিরী
লাগছে। আরিফ
সাহেব নির্ধারিত কাউন্টারে চেক ইন করে বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ এবং ইমিগ্রেশন ফর্মালিটি
পুরো করে বিজনেস ক্লাস লাউন্জের সোফায় শরীরটা এলিয়ে দেন। আশেপাশে অন্যান্য যাত্রীরা কেউ বসে বা কেউ দাঁড়িয়ে আছেন,
তবে বিজনেস ক্লাসের জন্য নির্ধারিত বলে এই লাউঞ্জে যাত্রীসংখ্যা এমনিতেই
কম। আরিফ
সাহেবকে বারবার ঘড়ির ডায়ালের দিকে তাকাতে দেখা যাচ্ছে,
তিনি সম্ভবত খানিকটা টেনশনে আছেন। কিছুক্ষণ পর একজন বৃদ্ধ মহিলা হুইল চেয়ারে বসে বিজনেস ক্লাস
লাউন্জে ঢুকলেন, বাংলাদেশ বিমানের একজন এটেনডেন্ট তাকে
সাহায্য করছেন।
এয়ার লাইন্সগুলোতে যাতায়াতে এই একটা সুবিধা,
টিকিট সংগ্রহের সময় বয়স্ক, অসুস্থতা বা শারীরিক
অক্ষমতার কথা উল্লেখ করা থাকলে পৃথিবীর সব এয়ারপোর্টেই এই সুবিধাটা পাওয়া যায়।
শরীর আবায়া বোরকা আবৃত থাকায় সোনিয়াকে
ঠিক চেনা যাচ্ছেনা, তবে আরিফ সাহেবের তাকে চিনতে অসুবিধা
হল না। নিরাপত্তার
স্বার্থে তারা দু'জন একই ফ্লাইটে অপরিচিতের মতন আলাদাভাবে
ভ্রমণ করছেন।
দুবাই যেয়ে তারা মিলিত হবেন, পরবর্তী যাত্রাপথ সেভাবেই
প্ল্যান করা আছে। ঠোঁটের কোনে হাসি ঝুলিয়ে তিনি ফ্রেশ রুমে যেয়ে ফ্রেশ আপ করে কফি
কিয়স্ক থেকে দু'কাপ ব্ল্যাক কফি সংগ্রহ করলেন। এরপর কফির ধূমায়িত কাপের
একটি নিজে নিয়ে অন্যটি সৌজন্যতা প্রকাশ করে
মহিলার দিকে এগিয়ে ধরলেন।
এমন সময় বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জের পিএ সিস্টেমে ফ্লাইটে বোর্ড
ইন করার জন্য ঘোষণা করা হল।
কফির কাপে সোনিয়ার প্রথম চুমুকের দৃশ্যটা দেখে আরিফ সাহেব
হ্যান্ড লাগেজসহ এগিয়ে গেলেন।
শারিরীকভাবে অক্ষম বা অসুস্থ
যাত্রীদের সবার শেষে বোর্ড ইন করা হয় বলে সোনিয়ার দেরী হবে।
এটেনডেন্ট একটু পরে হুইল চেয়ারে করে তাকে বোর্ড ইন করবে।
তবে সোনিয়াকে আর কখনও বোর্ড ইন করতে
হয়নি।
এয়ারপোর্টের এ্যাম্বুলেন্সটা হুটার বাজিয়ে
রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
বোয়িং ৭৮৭ ড্রিম লাইনার 'জলছুট' তখন দেশের
আকাশ সীমা পার হয়ে ভারতের ছোট নাগপুর
মালভূমির ওপর দিয়ে দুবাইয়ের এয়ার রুট বরাবর ছুটে যাচ্ছে।
In restless dreams I walked alone
Narrow streets of cobblestone
‘Neath the halo of a streetlamp
I turned my collar to the cold and damp
When my eyes were stabbed by the flash of a neon light
That split the night
And touched the sound of silence
And in the naked light I saw
Ten thousand people, maybe more
People talking without speaking
People hearing without listening
People writing songs that voices never share
No one dare
Disturb the sound of silence
(এটি একটি ক্রাইম থ্রিলার। এখানে উল্লেখকরা প্রতিটি চরিত্র এবং বর্নিত ঘটনা বা স্থান সবই কাল্পনিক। চার দেয়ালের মাঝে বসে লেখা এই গল্পের সাথে বাস্তবের কোন কিছুর মিল খোঁজা হবে নিতান্তই অপচেষ্টা মাত্র)
পোস্ট ভিউঃ 53