১
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকালে পার্বত্য অঞ্চলে ২৩২টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প ছিল। শান্তিচুক্তির ধারা ঘ-এর ১৭(ক): "বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলীকদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হবে।" মোতাবেক অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৬ সালের একটি তথ্য অনুসারে চুক্তি স্বাক্ষরকালীন ২৩২টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প থেকে ১১৯টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বর্তমানে ০৩পার্বত্য জেলায় ১১৩টি সেনা ক্যাম্প রয়েছে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর মূল সংগঠনগুলোতে বিভাজন এবং নতুন দলের উত্থানের ফলে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS), মূল জেএসএস থেকে ২০০৭ সালে রূপায়ণ দেওয়ান এবং সুধাসিন্ধু খীসা’র নেতৃত্বে বেরিয়ে আসা জনসংহতি সমিতি (সংস্কার) [PCJSS (Reformed)] বা জেএসএস (সংস্কার), প্রসিত বিকাশ খীসা’র নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (UPDF), ২০১৭ সালে তপন জ্যোতি চাকমা’র নেতৃত্বে ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে আসা ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) [UPDF (Democratic)] এবং ২০১৭ সালে নাথান বম-এর নেতৃত্বে গঠিত কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (KNA)। এই প্রধান গোষ্ঠীগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আরও ছোট ছোট সশস্ত্র দল বা উপদলগুলোর (যেমন: মগ লিবারেশন পার্টি, আরাকান লিবারেশন পার্টি - ALP) সক্রিয়তার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়। এই দলগুলোর মধ্যে প্রায়শই আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং মতাদর্শগত কারণে সশস্ত্র সংঘাত দেখা যায়। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় মিয়ানমারভিত্তিক যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নাম প্রায়শই আলোচনায় আসে, তার মধ্যে অন্যতম হলো আরাকান আর্মি (Arakan Army - AA), চিন ন্যাশনাল আর্মি (Chin National Army - CNA), চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স (Chinland Defense Force - CDF) ইত্যাদি। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (KNF)-এর সাথে মিয়ানমারের এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। তারা ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমারের কাচিন রাজ্য থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং কারেন বিদ্রোহীদের সাথেও তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং ইউপিডিএফ (মূল) সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। তবে আজ লিখবো ইউপিডিএফ (মূল) সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনকে নিয়ে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকা থেকে সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার সুফল ভোগ করছে উপরে উল্লেখিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম তাদের চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সশস্ত্র সংঘর্ষের স্বর্গভূমিতে পরিণত হয়েছে। এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে স্থানীয় এবং মিয়ানমারভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে, তাদের দ্বারা প্রতি বছর চাঁদাবাজি ও অপহরণ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগৃহীত হয়। এই অর্থের সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা খুবই কঠিন, কারণ এটি স্বভাবতই একটি অবৈধ এবং গোপনীয় কার্যক্রম। তবে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকা থেকে ৭০০ কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি করে থাকে। কিছু রিপোর্টে এই পরিমাণ ৩৫০ কোটি টাকা বা ৪০০ কোটি টাকা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো রিপোর্টে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজির কথা বলা হয়েছে। তাদের চাঁদাবাজির প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদার, পরিবহন খাত, স্থানীয় ব্যবসায়ী, পর্যটন শিল্প (হোটেল-মোটেল), জুম চাষি এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ। চাঁদাবাজির পাশাপাশি অপহরণ হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আয়ের আরেকটি বড় উৎস, যেখানে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। নির্দিষ্ট কোনো বছরে এই খাত থেকে ঠিক কত টাকা আয় হয়, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত ১৬ বছরে (২০০৯-২০২৫ সময়কালে) ০৩পার্বত্য জেলায় ২৭৮ বারের মতো অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৩৩২ জন অপহরণের শিকার হন। সাম্প্রতিক কালেও অপহরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেমন- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অপহরণ বা ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি। তাদের এই বিপুল চাঁদাবাজির অর্থ ব্যয় হয় মূলত ভারত এবং মিয়ানমারের বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছ থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহ বা অস্ত্র কেনাবেচায়। এই অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ পরবর্তীতে ব্যবহৃত হয় অপহরণ-খুন-চাঁদাবাজির কাজে। ‘ওয়াটার সাইকেল’ এর মতো এও এক অদ্ভুত চক্র! আর এই কাজগুলো তারা করে তাদের ভাষায় স্বাধিকার আন্দোলনের নামে, সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে তারা নিজেদের স্বাধীনতাকামী হিসেবে উপস্থাপিত করে। তবে আইনের ভাষায় তারা অস্ত্রব্যবসায়ি-খুনি এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী নামে পরিচিত। সেনাবাহিনী যখন তাদের নাশকতামূলক বা বিদ্রোহী কর্মকান্ডে বাধা দেয় কিংবা গ্রেফতার অভিযানে নামে তখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন কুৎসা এবং উস্কানিমূলক প্রচারণা চালায়। মিছিল-মিটিং কিংবা নানাবিধ প্রচারণা কাজে তারা সাধারণ জনগোষ্ঠী, এমনকি নারী-শিশুদেরকেও ব্যবহার করে থাকে। তাদের চাঁদাবাজির বিপুল অর্থ সাইবার টিমের মাধ্যমে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের পেইড প্রচারণা এবং দেশে-বিদেশের বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলকে প্রভাবিত করার কাজে ব্যয় করে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদেরকে পার্বত্য এলাকা অস্থিতিশীল করার কাজেও ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ করে দেশে যখন ক্ষমতার পালাবদল ঘটে কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ অবস্থায় থাকেনা। ঠিক এই বিষয়টাই সম্প্রতি খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নে ঘটেছে।
২
লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়ন খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ঘন বন ও পাহাড়বেষ্টিত জনপদ। সেখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি জনগোষ্ঠী মিলে প্রায় ৭ হাজার মানুষের বসবাস। বর্মাছড়ি’র কাছাকাছি কোথাও সেনা ক্যাম্প না থাকায় ইউপিডিএফ (মূল) দীর্ঘকাল ধরে সেখানে তাদের সশস্ত্র গ্রুপের ক্যাম্পসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। একই সাথে বর্মাছড়ি এলাকাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে সমতল এলাকার যোগসূত্র হবার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরে ইউপিডিএফ (মূল)-এর অস্ত্র চোরাচালানের রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি এই এলাকায় তাদের তৎপরতা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জানা যায় যে, ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে তাদের সশস্ত্র গ্রুপগুলো এই এলাকায় প্রবেশ করে এবং সুবিধাজনক সময়ে ব্যবহারের জন্য অবৈধ অস্ত্র ক্যাশে বা ডাম্পিং করে রাখে। এসব অস্ত্র অন্যান্য পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সমতলের অপরাধীদের কাছে বিক্রি করা কিংবা অপহরণ, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। আর তাই এসব সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার করে। বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজি-অপহরণের ঘটনার তথ্য এলে বা কোথাও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা দেখা গেলে পার্শ্ববর্তী নিরাপত্তা ক্যাম্প থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্থানীয় জনসাধারণের ছদ্মবেশে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী তাই সেনাবাহিনীর যে কোন সামরিক অভিযান বা তৎপরতার বিরুদ্ধে সবসময়ই সক্রিয়। সুযোগ পেলেই তারা সংগঠনের ব্যানারে আবার কখনো সাধারণের বেশে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং-আন্দোলনে নামে।
বিগত কয়েকমাসের ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, বার্মাছড়ি মুখ এবং কুতুবছড়ি এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল)- এর ৪০/৪৫ জন সশস্ত্র গ্রুপের আশ্রয় নেয়ার তথ্য থাকায় সেনাবাহিনী মার্চ ২০২৫ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এরফলে সশস্ত্র গ্রুপটা পালিয়ে দুর্গম কালাপাহাড় এলাকায় আশ্রয় নেয়। সেনাবাহিনীর কাছে তথ্য ছিল প্রসিত বিকাশ খীসা তার সামরিক নেতা, তরেন চাকমাকে সাথে করে কাউখালী-কেরেক কাটার পূর্বের আস্তানা থেকে তাদের বিকল্প কোন এক আস্তানায় স্থানান্তরিত হয়েছে। এই এলাকায় ১১-২৪ মে ২০২৫ তারিখে পরিচালিত অভিযানে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হলেও ইউপিডিএফ (মূল)- এর বেশ কয়েকটা পরিত্যক্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি এবং ক্যাম্প খুঁজে পাওয়া যায়। এই অভিযানের পর, গত ২৬ জুলাই ২০২৫ তারিখে লক্ষীছড়ি উপজেলার কুতুবছড়ি বাজারে ‘পাহাড়ের নারী নিরাপত্তার হুমকি সেনাবাহিনী ও সেটেলার প্রত্যাহার কর’ এই শিরোনামে ইউপিডিএফ (মূল) ও এর সহযোগী সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম যৌথভাবে লাঠি ও ঝাড়ু মিছিলের আয়োজন করে। পরের মাসে, ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দেওয়ান পাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল)-এর একটা আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করা হলে দুষ্কৃতিকারীরা পালিয়ে গেলেও নগদ প্রায় সাড়ে নয় লাখ টাকাসহ অন্যান্য মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ধারণা করা হয় চাঁদাবাজি থেকে প্রাপ্ত এসব অর্থ ইউপিডিএফ (মূল) এর সশস্ত্র গ্রুপগুলো অস্ত্র কেনাবেচা এবং নাশকতার কাজে ব্যবহার করতো। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে উপজেলার টবলাছাড়া এবং কালাপানি এলাকায় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) এবং গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ) একটি প্রতিবাদ মিছিল আয়োজন করে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে খাগড়াছড়ির রামসু বাজার এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল)-এর সশস্ত্র গ্রুপের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে ০৩জন পাহাড়ি যুবক নিহত হলে পার্বত্য অঞ্চলের যেসব দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনীর ক্যাম্প নাই, সেসব এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেনাসদস্যরা বর্মাছড়ি এলাকায় ১৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ থেকে অভিযান পরিচালনা শুরু করে। এরমাঝেই ৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে লক্ষীছড়ি উপজেলার বার্মাছড়ি, কুতুবছড়ি, যতীন্দ্রকারবারি পাড়া, শীলাছড়ি বাজার এলাকায় ইউপিডিএফ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পোস্টারিং করে।
বর্মাছড়ি এলাকায় অভিযানের একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর দলটা অস্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে ইউপিডিএফ (মূল)-এর সশস্ত্র গ্রুপটাকে নির্মূল করার জন্য আভিযানিক কার্যক্রম শুরু করে। তাদের অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের জায়গাটা সরকারি খাস জমি বা জঙ্গলকীর্ণ এলাকায়, যা বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের খিরাম অংশের জমির অন্তর্ভুক্ত এবং বর্মাছড়ি আর্য কল্যাণ বিহার থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিম দিকে অবস্থিত। বর্মাছড়িতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং তাদের পরিচালিত অভিযানের কারণে ইউপিডিএফ (মূল) এর সশস্ত্র গ্রুপ ঐ এলাকা ত্যাগ করে কালাপাহাড় রেঞ্জ এবং ফটিকছড়ির দুর্গম এলাকায় অবস্থান নেয়। বর্মাছড়ি এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে কৌশলগত, এখান থেকেই সন্ত্রাসীরা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের সংযোগপথে পালিয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদী সেনা অভিযানের কারণে খাগড়াছড়িতে আগামী মাসগুলোতে চাঁদা আদায় এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ইউপিডিএফ (মূল) জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বর্মাছড়িতে অস্থায়ী সেনা ঘাঁটি স্থাপনের বিরুদ্ধে এলাকার জনগণ, মহিলা এবং শিশুদের জোরপূর্বক জমায়েত করে আন্দোলন শুরু করে। গত ২৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তারা বর্মাছড়ি অস্থায়ী ঘাঁটির কাছে আনুমানিক ১০০০ জন মহিলা, শিশু ও পুরুষদের জমায়েত করে। বর্মাছড়িতে স্থাপিত অস্থায়ী ঘাঁটি আর্য কল্যাণ বিহারের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করলেও তারা দাবির স্বপক্ষে প্রমাণাদি বা দলিলপত্র উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়। তারপরও তারা বনবিভাগের সংরক্ষিত জমিতে স্থাপিত অস্থায়ী ঘাঁটি বর্মাছড়ি আর্য কল্যাণ বিহারের অংশ দাবি করে দেশ-বিদেশ থেকে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসব এলাকায় তাদের আধিপত্য আছে সেসব এলাকায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচারণামূলক পোস্টার লাগিয়ে পাহাড়ি জনগণকে উত্তেজিত করে।
এসব ঘটনা খাগড়াছড়ির সংবেদনশীল ধর্ষণ ইস্যুর মতো ধর্মীয় বিষয় ও আবেগকে পুঁজি করে পাহাড় অশান্ত করার প্রচেষ্টার একটি পুনরাবৃত্তি মাত্র। জানা যায় যে, ইউপিডিএফ (মূল)- এর শীর্ষ নেতৃত্ব পার্বত্য অঞ্চলকে এক অনিবার্য সংঘাতময় অঞ্চলে রূপ দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদের এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র গ্রুপগুলো নিজ জাতিগোষ্ঠীর জনগণের উপর গুলি চালিয়ে হত্যা করার মত কার্যক্রমের দায়ভার সেনাবাহিনীর উপর চাপিয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করার জন্য প্রতিনিয়ত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে রামসু বাজারে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ইউপিডিএফ সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে ০৩ জন পাহাড়ি যুবক নিহত হবার বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে।
৩
সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধিমালা, ১৯০০ (The Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900) বা পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়াল (CHT Manual) রহিত করা। ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর-জেনারেল ইন কাউন্সিল প্রণীত এই ম্যানুয়ালটিতে ভূমি হস্তান্তর সংক্রান্ত বিশেষ বিধান রয়েছে, যেখানে ভূমি সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা মূলত উপজাতীয়দের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য করা হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ম্যানুয়াল রহিত বা প্রয়োজনীয় সংশোধন ও যুগোপযোগী করে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের সব নাগরিকের বসবাস ও চলাচলের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত একজন পাহাড়ি নাগরিক যেমন সমতলের যেকোন স্থানে বসতি গড়তে পারেন তেমনি সমতলের অধিবাসীদেরও পূর্ণ অধিকার রয়েছে পাহাড়ে বসতি গড়ার। একটা দেশে নাগরিকদের জন্য দু’রকম ভূমি আইন থাকতে পারে না। পাহাড় এবং সমতলে বসবাসরত নাগরিকদের প্রধান সমস্যা হলো একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস। এই অবিশ্বাস এবং প্রতিহিংসার বীজের মূল উৎপাটন করতে হলে উভয় জনগোষ্ঠীর মাঝে মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন, যা বর্তমান ভূমি আইন বহাল রেখে সম্ভব না। দেশের কোন জনগোষ্ঠীর প্রতি সেটলার বা সংখ্যালঘু/ সংখ্যাগুরু কিংবা ক্ষুদ্র/বৃহৎ জাতীয় অমর্যাদাকর বা আত্মসম্মানহানীকর শব্দ ব্যবহার না করে যে যেই জাতিগোষ্ঠীর তাকে সে নামেই ডাকা হোক। একজন মুরং বা ম্রো শিশু নিজেকে ‘ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ শব্দের বদলে সবসময়ই ‘ম্রো’ বলে পরিচয় দিতেই গর্ব অনুভব করবে। কেননা ‘ম্রো’ শব্দের অর্থ হলো ‘মানুষ’। এজন্য প্রয়োজনে সংবিধানে পাহাড়-সমতলে বসবাসরত সব জাতিগোষ্টীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সব জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা যেন নিজনিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে পর্যায়ক্রমে সে ব্যবস্থা নেয়া হোক। মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জন একজন নাগরিকের অধিকার। সরকারি চাকুরিতে বর্তমানে যে কোটাসুবিধা রয়েছে বর্তমানে তার মূল সুবিধাভোগী চাকমা/মারমা/ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী, এই সুবিধা পাহাড়ে বসবাসরত মুরং/খুমি/লুসাই এবং সমতলে বসবাসরত ওঁরাও/ কোচ/ রবিদাস/রাজবংশীদের জন্য সহজলভ্য করা হোক। তবে সবচেয়ে আগে যেটা প্রয়োজন দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রত্যাহার করা ১১৯টি সেনা ক্যাম্প পুনঃস্থাপনসহ নতুনকরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাক্যাম্প স্থাপন করা।
পোস্ট ভিউঃ 2