১
বিদেশী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন একটি দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য অপরিহার্য কারণ এগুলি কেবল সামরিক উপস্থিতির প্রতীক নয়, বরং এর 'পাওয়ার প্রোজেকশন' ক্ষমতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে। এই স্থাপনাগুলি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম ও মানবিক ত্রাণ সরবরাহ করতে লজিস্টিক হাব হিসেবেও কাজ করে, উদাহরণস্বরূপ তাজিকিস্তানের আইনি ঘাঁটির কথা বলা যেতে পারে। এই ঘাঁটির মাধ্যমে ভারত আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় লজিস্টিক সহায়তা পাঠানোর সুযোগ পেত। এছাড়াও এই সামরিক উপস্থিতি শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ নিশ্চিত করতো, যেমন- আইনি ঘাঁটির অবস্থান ভারতকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ এবং পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি থেকে নজরদারি ও প্রয়োজনে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা দিত। কূটনৈতিক দিক থেকে এই ধরনের ঘাঁটিগুলি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলির সাথে সামরিক কূটনীতি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার করতে সহায়ক। এছাড়াও ঘাঁটিগুলির অবকাঠামোগত সক্ষমতা, যেমন- আইনি ঘাঁটিতে নির্মিত ৩২০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে ভারী সামরিক বিমান (C-17 Globemaster III) এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান (Su-30 MKI) পরিচালনার জন্য সুবিধাজনক, যা সামরিক অভিযান ও দূরপাল্লার নজরদারির জন্য এয়ারফিল্ড ক্যাপাবিলিটি দান করে। সর্বোপরি বিদেশী সামরিক ঘাঁটিগুলি একটি দেশকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের খেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দেয়।
তাজিকিস্তানের দুশানবের কাছে অবস্থিত আইনি বিমান ঘাঁটিতে ভারতের জন্য উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সুবিধা বিদ্যমান ছিল। প্রায় দুই দশক ধরে এটি ভারতের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিদেশী সামরিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছে, যা কৌশলগত নজরদারির একটি কেন্দ্র ছিল। এর কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে ভারত এই ঘাঁটিতে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ এবং ২০২৩ সালের প্রথম দিকে নীরবে সমস্ত কর্মী ও সরঞ্জাম সরিয়ে তাজিক সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। এটি নয়াদিল্লির ভূ-রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ 'কৌশলগত ধাক্কা' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই 'পতন'-এর মূল কারণ ছিল ভারত ও দুশানবের মধ্যে হওয়া দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া। তবে চুক্তির নবায়ন না হওয়ার পেছনে ছিল রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে আসা জোরালো ভূ-রাজনৈতিক চাপ। উভয় শক্তিই ভারতকে এই অঞ্চলে 'অ-আঞ্চলিক অভিনেতা' হিসেবে বিবেচনা করতো এবং তাদের সম্মিলিত চাপের মুখে তাজিকিস্তান লিজ চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলস্বরূপ আইনি ঘাঁটির প্রত্যাহার মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বিস্তারে এক বড় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
২
আইনি ঘাঁটির ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ।
আইনি বিমান ঘাঁটিটি কেবল একটি স্থাপনা ছিল না, এটি ছিল মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত ইচ্ছার একটি প্রতীক। সোভিয়েত যুগের এই সামরিক ক্ষেত্রটি দীর্ঘ দুই দশক ধরে নয়াদিল্লির সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আফগানিস্তান-পাকিস্তান-চীন ত্রিভুজ অঞ্চলে নজরদারির একটি দুর্লভ কেন্দ্র ছিল। ফারখোর ঘাঁটির সাফল্যের সম্প্রসারণ হিসেবে এটিকে আধুনিকায়ন করা হয়, যা ভারতকে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলার সুযোগ দিত। সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এর অবস্থান ছিল অমূল্য।
ক। সামরিক-কূটনৈতিক বিবর্তন: ফারখোর থেকে আইনি।
ভারতের বিদেশী সামরিক ঘাঁটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৮ সালে ফারখোর ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে। তাজিকিস্তান -আফগানিস্তান সীমান্তে অবস্থিত এই ঘাঁটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তালেবানের বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে সহায়তা করা। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসে প্রথম বিদেশী সামরিক উপস্থিতি। এই প্রাথমিক সাফল্যের ভিত্তিতে ভারত তার সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্প্রসারণ করে এবং ২০০২ সালে সোভিয়েত আমলের আইনি বিমান ঘাঁটির উন্নয়ন শুরু করে। এটি ফারখোর ঘাঁটির সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে এবং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিমান ঘাঁটিতে রূপান্তরিত করা হয়। দুশানবের কাছে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি ২০০২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল এবং আগেই যেটা উল্লেখ করেছি, এটি মূলত বিমান প্রতিরক্ষা ও গভীর নজরদারির জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এই ঘাঁটি দুটির মাধ্যমে ভারত দীর্ঘ দুই দশক ধরে মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। আইনি ঘাঁটির পতন সেই দীর্ঘ ও কৌশলগত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায়।
খ। অবস্থানগত কৌশল।
তাজিকিস্তানের আইনি বিমান ঘাঁটি তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের জন্য স্ট্র্যাটেজিক রত্ন হিসেবে বিবেচিত হতো। এই ঘাঁটিটি ভারতকে এমন এক বিরল সুবিধা এনে দিয়েছিল, যা নয়াদিল্লির সামরিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে আইনি ঘাঁটিটি পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে আকাশপথে মাত্র ৯০০ কিমি দূরে ছিল, যা আধুনিক যুদ্ধবিমানের জন্য প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্ব। এছাড়াও এটা আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোরের একদম কাছে, মাত্র ২০ কিমি দূরে অবস্থিত। এই করিডোরটি পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর এবং চীনের শিনজিয়াং প্রদেশকে সংযুক্ত করে, এরফলে এই অবস্থান ভারতকে সরাসরি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর এবং শিনজিয়াং-এর গতিবিধির ওপর নজরদারির সুযোগ দিত। এই গভীর নজরদারি এবং সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষমতা ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় অপরিহার্য ছিল। এই সুবিধাগুলির গুরুত্ব বিবেচনা করেই ভারত এই ঘাঁটির সংস্কার ও উন্নয়নে অনুমানিক ৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল। এককথায় আইনি ঘাঁটির অবস্থান ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে ভারতের প্রভাব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি অমূল্য সামরিক সম্পদ ছিল।
৩
ঘাঁটি প্রত্যাহারের নেপথ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
আইনি ঘাঁটি থেকে ভারতের প্রত্যাহারের কারণ কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছে আরও গভীর এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। সামরিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাটিকে মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের 'গ্রেট গেম'-এর একটি নতুন সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। এই কৌশলগত ধাক্কার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল রাশিয়া এবং চীনের কাছ থেকে আসা সম্মিলিত চাপ। উভয় শক্তিই ভারতকে এই অঞ্চলে একটি 'অ-আঞ্চলিক অভিনেতা' মনে করে তাদের প্রভাব বলয় থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, যা তাজিকিস্তানকে চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্তে বাধ্য করে।
ক। রাশিয়া ও চীনের সম্মিলিত চাপ।
আইনি ঘাঁটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে আসা সম্মিলিত ও জোরালো কূটনৈতিক চাপ, যা মধ্য এশিয়ায় তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে তুলে ধরে। রাশিয়া ঐতিহ্যগতভাবে মধ্য এশিয়াকে তার 'প্রভাব বলয়' হিসেবে দেখে আসছে। ভারতের সামরিক উপস্থিতি মস্কোর আঞ্চলিক কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করছিল এবং এটি রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী। ভারতকে অপসারণের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রত্যাশিত লাভ ছিল তাজিকিস্তানের সামরিক সুবিধাগুলির, যেমন তার ২০-তম সামরিক ঘাঁটির উপর একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। অন্যদিকে চীন ভারতকে এই অঞ্চলে একটি 'অ-আঞ্চলিক শক্তি' হিসেবে চিহ্নিত করে। চীনের জন্য আইনি ঘাঁটির উপস্থিতি তার উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প এবং সংবেদনশীল শিনজিয়াং প্রদেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। বিশেষত চীনের লক্ষ্য ছিল চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-এর কাছাকাছি ভারতীয় সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করা। এই দুই বৃহৎ শক্তির অভিন্ন স্বার্থ এবং সম্মিলিত চাপের মুখে তাজিকিস্তানের পক্ষে লিজ চুক্তি নবায়ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, এরফলে ভারতকে আইনি ঘাঁটি থেকে সরে যেতে হয়।
খ। তাজিকিস্তানের বাধ্যবাধকতা।
আইনি ঘাঁটির লিজ চুক্তি নবায়ন করতে তাজিকিস্তানের অস্বীকৃতির পেছনে মূল কারণ ছিল দেশটির ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক ও সামরিক নির্ভরতা। তাজিকিস্তান তার সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মস্কো সেখানে তার ২০-তম সামরিক ঘাঁটির মতো বড় সামরিক সুবিধা বজায় রাখে, যা দুশানবের সামরিক সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে তাজিকিস্তানের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ ব্যাপক এবং দেশটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া এবং চীন উভয় শক্তিই যখন ভারতকে এই অঞ্চল থেকে সরাতে ঐক্যবদ্ধ চাপ সৃষ্টি করে, তখন তাজিকিস্তানের পক্ষে এই দুই প্রভাবশালী শক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে চুক্তি নবায়ন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রক্ষার্থে দুশানবে ভারতের কৌশলগত আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করতে বাধ্য হয়।
৪
ভারতের ভূ-রাজনীতিতে কৌশলগত ধাক্কা: গভীরতা ও প্রভাব।
তাজিকিস্তানের আইনি বিমান ঘাঁটি থেকে সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নেয়া ভারতের ভূ-রাজনীতির জন্য একটি গুরুতর সামরিক ধাক্কা। দুই দশক ধরে মধ্য এশিয়ায় ভারতের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সামরিক উপস্থিতি হিসেবে এই ঘাঁটি কাজ করছিল। এর পতনের ফলে নয়াদিল্লির বহুদূর পর্যন্ত সামরিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি সামরিক স্থাপনা হারানোর বিষয় নয়, বরং মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগত তথ্যের শূন্যতা পূরণের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই ধাক্কা আঞ্চলিক শক্তিসমূহের মধ্যে ভারতের অবস্থান দুর্বল করেছে।
ক। মধ্য এশিয়ায় 'তথ্যগত শূন্যতা'।
আইনি ঘাঁটির প্রত্যাহারের ফলে ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মধ্য এশিয়ার অভ্যন্তরে এক গুরুতর 'তথ্যগত শূন্যতা' সৃষ্টি হওয়া। দুই দশক ধরে আইনি ঘাঁটি এই অঞ্চলে ভারতের একমাত্র সামরিক এবং পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করছিল, যা ভারতকে ওই অঞ্চলের গভীর থেকে কৌশলগত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করে দিত। ঘাঁটিটি হারানোর অর্থ হলো, ভারত এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটিতে তার সামরিক প্রভাব বিস্তার এবং তথ্যের শূন্যতা পূরণ করার একটি অপরিহার্য কেন্দ্র হারালো। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রচেষ্টায় এবং চীন-পাকিস্তান সামরিক কার্যকলাপের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে। এই ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক গতিবিধি সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও গভীরতা এখন মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই শূন্যতা পূরণ করা নয়াদিল্লির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।
খ। চীনের কৌশলগত স্বস্তি।
আইনি ঘাঁটির প্রত্যাহার চীনের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য এক বিশাল কৌশলগত স্বস্তি এনে দিয়েছে। দুই দশক ধরে ভারতীয় সামরিক বাহিনী চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-এর ওপর সরাসরি নজরদারি করতো। এই করিডোরগুলি চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়াকে সংযুক্ত করে। আইনি ঘাঁটির অবসানের ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক রুটগুলি এখন ভারতীয় নজরদারি থেকে মুক্ত। এর ফলে চীন তার অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলির নিরাপত্তা নিয়ে কম উদ্বিগ্ন হতে পারে এবং এই অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বিস্তারকে আরও সুসংহত করতে পারে। এই ঘটনা মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আঞ্চলিক শক্তিসমূহের মধ্যে ভারতকে একটি দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে, যা চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। চীন এখন মধ্য এশিয়ায় তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ আরও সহজে নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
গ। সামরিক ঘাঁটি কূটনীতিতে ব্যর্থতা।
আইনি ঘাঁটির প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সামরিক ঘাঁটি কূটনীতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ভারত এই ঘাঁটির আধুনিকায়নে বহু বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা সত্ত্বেও মধ্য এশিয়ার অভ্যন্তরে একটি স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে ভারত এখনো তার নিকটবর্তী প্রতিবেশী অঞ্চল ছাড়িয়ে অন্য কোনো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই ঘটনাটি চীনের সাফল্যের সঙ্গে একটি বড় বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছে। চীন সফলভাবে পূর্ব আফ্রিকায় জিবুতিতে তার একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, যা বহুদূর পর্যন্ত চীনা 'পাওয়ার প্রোজেকশন' নিশ্চিত করে। আইনি ঘাঁটির পতন তাই ভারতের জন্য একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে সামরিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি কূটনৈতিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
৫
পরিবর্তিত কৌশল: ভারত মহাসাগরে মনোযোগ বৃদ্ধি।
আইনি ঘাঁটির প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট কৌশলগত ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায়, ভারত তার সামরিক ও কূটনৈতিক মনোযোগ মধ্য এশিয়া থেকে সরিয়ে ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এনেছে। এই কৌশলগত পরিবর্তন ভারতের 'উপমহাদেশের বাইরের' সামরিক উপস্থিতি থেকে 'ভারতের নিকটবর্তী সমুদ্রকেন্দ্রিক' অঞ্চলে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। এর প্রধান লক্ষ্য ভারত মহাসাগরে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে 'নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার' হিসেবে নিজের ভূমিকা জোরদার করা। এই নতুন কৌশলের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ('স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশল) মোকাবেলা করা এবং কৌশলগত সামুদ্রিক পথগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ক। পশ্চিম ভারত মহাসাগরে সুবিধা জোরদার।
এই নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে ভারত পশ্চিম ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশগুলির সাথে তার সামরিক ও লজিস্টিক সুবিধা উন্নত করছে:
(১) মরিশাসের আগালেগা দ্বীপ: এখানে ভারত একটি নতুন এবং উন্নত এয়ারস্ট্রিপ ও জেটি নির্মাণ করেছে। এই সুবিধাটি ভারতীয় নৌবাহিনীর দূরপাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি বিমান পি-৮আই (P-8I) পরিচালনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই দ্বীপটি দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগরে অবস্থিত হওয়ায় এটি চীনের সামরিক প্রভাব মোকাবেলায় এবং জলদস্যুতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(২) ওমানের দুকম পোর্ট: ভারত এই বন্দরে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য লজিস্টিক এবং বার্থিং রাইট নিশ্চিত করেছে। আরব সাগরে অবস্থিত এই গভীর সমুদ্র বন্দরটি ভারতের নৌবহরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ 'অপারেশনাল রিজার্ভ' হিসেবে কাজ করে, যা পশ্চিম ভারত মহাসাগরে নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক।
খ। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত লজিস্টিক অ্যাক্সেস।
পূর্ব ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও ভারত তার কৌশলগত সংযোগ বাড়াচ্ছে, যা জলপথ-এর নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করবে:
(১) ইন্দোনেশিয়ার সাবাং পোর্ট: ইন্দোনেশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে ভারত লজিস্টিক অ্যাক্সেস নিশ্চিত করেছে। এই বন্দরের অবস্থান মালাক্কা প্রণালীর মুখে হওয়ায় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত এই সামুদ্রিক পথে চীনের সামরিক বাণিজ্যের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে।
(২) সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি নেভাল বেস: এই ধরনের লজিস্টিক অ্যাক্সেস ব্যবহার করে ভারত তার সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করছে। এই পদক্ষেপগুলি সম্মিলিতভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় নৌবাহিনীর উপস্থিতি, রেসপন্স টাইম এবং সমুদ্রপথের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষমতাকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করছে, যা আইনি ঘাঁটির ক্ষতিকে সামুদ্রিক ক্ষেত্রে পুষিয়ে নেয়ার একটি প্রচেষ্টা।
৬
আইনি ঘাঁটির পতন নিঃসন্দেহে ভারতের ভূ-রাজনীতিতে একটি কৌশলগত ধাক্কা এবং মধ্য এশিয়ায় দুই দশক ধরে চলে আসা ভারতের সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার জটিলতা এবং বৃহত্তর শক্তিগুলির প্রভাব বলয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি এবং রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক কর্তৃত্বের সম্মিলিত চাপের মুখে ভারত তার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধাটি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সামরিক ঘাঁটি কূটনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে। এই পতন মধ্য এশিয়ার অভ্যন্তরে ভারতের সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্যের শূন্যতা তৈরি করেছে এবং আঞ্চলিক শক্তিসমূহের মধ্যে ভারতকে সাময়িকভাবে দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। তবে ভারত এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার কৌশলগত মনোনিবেশে পরিবর্তন এনেছে।
এই কৌশলগত ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায় ভারত তার মনোযোগ মধ্য এশিয়া থেকে সমুদ্রকেন্দ্রিক ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে এনেছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মনোযোগ বৃদ্ধি করার এই নীতিটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। মরিশাসের আগালেগা দ্বীপ এবং ওমানের দুকম বন্দরের মতো সুবিধাগুলিতে বিনিয়োগ করে ভারত তার নৌবাহিনীর শক্তি এবং সামুদ্রিক নজরদারির ক্ষমতা বহুগুণে বাড়াচ্ছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ভারত মহাসাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি মোকাবেলা করা এবং 'নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার' হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করা। এভাবে আইনি ঘাঁটির পতনের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, ভারত এখন তার ঐতিহ্যবাহী প্রভাব বলয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষায় আরও বেশি মনোযোগী হচ্ছে এবং তার সামুদ্রিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর কৌশলগত ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পোস্ট ভিউঃ 1