১
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউয়ে ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ, বুধবার সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে, তবে বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী খবরটি ২৭ নভেম্বর ভোরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে। একদল সেনা কর্মকর্তা ক্ষমতা দখল করে প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এমবালোকে গ্রেপ্তার করেছে এবং জেনারেল হোর্তা এনতামকে এক বছরের জন্য অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা যায়। অভ্যুত্থানকারী সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছিল এবং নির্বাচনী ফলাফল কারচুপির একটি পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ায় তারা ‘শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায়’ সামরিক হস্তক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। অভ্যুত্থানকারীরা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে, সব সীমান্ত বন্ধ করেছে এবং রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করেছে। অভ্যুত্থানের ঘটনাটি ঘটেছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণার ঠিক একদিন আগে। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এমবালো এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফার্নান্দো দিয়াস উভয়েই নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করেছিলেন। গিনি-বিসাউ ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য পরিচিত।
২
পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় রাষ্ট্র গিনি-বিসাউয়ের এই সামরিক অভ্যুত্থান এবং নির্বাচন স্থগিতের ঘটনাটি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নয়; বরং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইকোনমিক কমিউনিটি অফ ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস (ECOWAS)-এর সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। গিনি-বিসাউয়ের এই অস্থিতিশীলতা সাহেল অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদকে আটলান্টিক উপকূলে ছড়িয়ে পড়ার নতুন সুযোগ করে দিতে পারে। একারণে গিনি-বিসাউয়ে সামরিক অভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম আফ্রিকায় গণতন্ত্রের ক্ষয় এবং একের পর এক সামরিক ক্ষমতা দখলের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বশক্তিগুলো এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কিত। অথচ লক্ষণীয় বিষয় হলো, মালি বা নাইজারের মতো অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা বিরোধী মনোভাব দেখিয়ে রাশিয়া বা চীনের পক্ষ থেকে কোনো সামরিক সরকারের প্রতি সরাসরি সমর্থন বা উৎসাহের ইঙ্গিত এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়নি। ECOWAS-এর ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া (আফ্রিকান কর্পস) এই অঞ্চলে তার সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।
ক। জাতিসংঘের নিন্দা।
জাতিসংঘের মহাসচিব অবিলম্বে অভ্যুত্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সহিংসতা পরিহার করে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ বিশেষভাবে প্রেসিডেন্ট এমবালো এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা ও মুক্তির দাবি জানিয়েছে।
খ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা শক্তি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর প্রধান সদস্য রাষ্ট্রগুলো (যেমন- ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন—যারা গিনি-বিসাউয়ের কৌশলগত অবস্থান এবং মাদক পাচারের বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন) সামরিক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা অভ্যুত্থানকারীদের সতর্ক করে দিয়েছে যে এই পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন সহায়তা পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করবে।
গ। আঞ্চলিক জোটের চাপ (ECOWAS)।
পশ্চিম আফ্রিকার প্রধান আঞ্চলিক সংস্থা, ECOWAS এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দ্রুত এবং কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা গিনি-বিসাউয়ের সামরিক নেতৃত্বের উপর তাত্ক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে। আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট আলহাজির আসানে ওয়াত্তারা, ECOWAS-এর বর্তমান প্রধান বা চেয়ারপারসন এই অঞ্চলের গণতান্ত্রিক শাসনের উপর এই সামরিক হস্তক্ষেপের পুনরাবৃত্তিতে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
৩
ECOWAS-এর প্রতিক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা: কেন সংস্থাটি দুর্বল?
গিনি-বিসাউয়ে অভ্যুত্থানের পর ECOWAS দ্রুত কঠোর ভাষায় নিন্দা করে প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এমবালোকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। তবে এই নিন্দা ও হুমকির প্রভাব সীমিত বলে ধারণা করা যেতে পারে। এর মূল কারণগুলো হলো:
ক। অভ্যুত্থানের ঢেউ।
গিনি-বিসাউয়ে সামরিক অভ্যুত্থানটি গত ৪ বছরের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় সংঘটিত ষষ্ঠতম ক্ষমতা দখল, যা এই অঞ্চলে গণতন্ত্রের প্রতি এক গভীর হুমকি। মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার এবং গিনির মতো দেশগুলোতে একের পর এক সামরিক শাসন ফিরে আসায় এটি স্পষ্ট যে ECOWAS তার নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং রাজনৈতিক সংকট প্রতিরোধের ব্যবস্থা কার্যকর করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। ঘন ঘন অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই বাড়াচ্ছে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং গণতন্ত্রের প্রতি সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার ক্ষেত্রে ECOWAS-এর ক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ECOWAS সামরিক শাসকদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও সেই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতাকে কমাতে পারেনি। বরং এটি সংস্থাটির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে এর আঞ্চলিক কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দিয়েছে।
খ। হস্তক্ষেপে অনীহা বা অক্ষমতা।
পশ্চিম আফ্রিকায় ঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থান মোকাবেলায় ECOWAS-এর সামরিক হস্তক্ষেপে অনীহা বা স্পষ্ট অক্ষমতা বর্তমানে এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজারের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও জনগণের একাংশের সমর্থন এবং সামরিক প্রস্তুতি না থাকায় সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি কার্যত কার্যকর করা যায়নি। এই সামরিক সরকারগুলো বরং আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে আঞ্চলিক সংস্থা ত্যাগ করে 'এলায়েন্স অফ সাহেল স্টেটস' নামে নতুন একটি সামরিক জোট গঠন করেছে। এই জোট গঠন সরাসরি ECOWAS-এর আঞ্চলিক প্রভাব এবং কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এর ফলে ECOWAS-এর আঞ্চলিক একতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে সংস্থাটিকে একটি দ্বিধাবিভক্ত এবং দুর্বল অবস্থানে ফেলেছে। এই দুর্বলতা গিনি-বিসাউয়ের সামরিক কর্তৃপক্ষকেও বার্তা দিচ্ছে যে ECOWAS-এর হুমকি সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
গ। ক্ষমতার হ্রাস বা বিভাজন।
ECOWAS-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সংঘাত এবং আদর্শগত বিভাজন সংস্থাটির সামগ্রিক শক্তিকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করেছে। বর্তমানে সদস্য দেশগুলো দু'টি প্রধান ভাগে বিভক্ত। একদল পশ্চিমা-সমর্থিত গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যারা সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান চায়; অন্যদিকে কিছু সদস্য রাষ্ট্র সামরিক শাসনের প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছে অথবা পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব পোষণ করছে। মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসো ECOWAS ত্যাগ করে আলাদা জোট গঠন করায় এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই অনৈক্যের ফলে সংস্থার ঐক্যবদ্ধ সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষমতা কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে এবং রাজনৈতিক সমঝোতা বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। গিনি-বিসাউয়ের মতো সংকটের সময়ে এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামরিক শাসকদের হাতে একটি বড় সুযোগ তুলে দিয়েছে।
৪
জঙ্গীবাদের বিস্তার: উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন ফ্রন্ট।
গিনি-বিসাউয়ের সামরিক অভ্যুত্থান আল-কায়েদা (যেমন জামা'আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন বা JNIM) এবং ইসলামিক স্টেট (IS) সংশ্লিষ্ট জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি নতুন রণক্ষেত্র খোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর কারণ:
ক। দুর্বল রাষ্ট্র ব্যবস্থার সুযোগ।
গিনি-বিসাউয়ে সরকারের উপর সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ সৃষ্ট সাংবিধানিক শূন্যতা ও আইনি বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে পারে সাহেল অঞ্চল থেকে ছড়িয়ে পড়া জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো। ঐতিহাসিকভাবেই দেশটি 'নার্কো-স্টেট' হিসেবে পরিচিত, যেখানে সামরিক বাহিনী ও মাদক পাচারকারীদের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। অভ্যুত্থানের ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি আরও দুর্বল হবে। জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো এই সুযোগে দারিদ্র্যপীড়িত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে নতুন সদস্য নিয়োগ করতে পারে। মাদক চক্রের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ জঙ্গী অর্থায়নে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ায়। এই সামরিক অভ্যুত্থান গিনি-বিসাউকে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে জঙ্গীবাদের বিস্তারের একটি নতুন 'ট্রানজিট পয়েন্ট' বা স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করতে পারে।
খ। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণহীনতা ও উপকূলীয় সম্প্রসারণ।
সাহেল অঞ্চলের জঙ্গীবাদ ইতোমধ্যে বুরকিনা ফাসো, মালি এবং নাইজারের অভ্যন্তর থেকে দক্ষিণে উপকূলীয় রাষ্ট্র আইভরি কোস্ট, ঘানা ও টোগোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গিনি-বিসাউয়ের অভ্যুত্থান এই 'দক্ষিণমুখী বিস্তারের' পথকে আরও প্রশস্ত করবে। এর উপকূলীয় অবস্থান জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোকে সমুদ্রপথে অবৈধ অস্ত্র, অর্থ এবং রসদ পাচারের জন্য একটি নতুন কৌশলগত করিডোর দিতে পারে।
(১) জঙ্গীবাদের দক্ষিণমুখী বিস্তারের পথ প্রশস্ত: সাহেল অঞ্চলের কেন্দ্র, বিশেষত মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজারে সক্রিয় জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো তাদের কার্যক্রম এখন দক্ষিণে আটলান্টিক উপকূলীয় দেশগুলোতে জোরদার করছে। গিনি-বিসাউয়ের সামরিক অভ্যুত্থান এই 'দক্ষিণমুখী বিস্তারের' জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ 'ব্রেকপয়েন্ট' হিসেবে কাজ করতে পারে। অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কারণে এর স্থল সীমান্তগুলো—বিশেষত সংঘাতপ্রবণ সেনেগালের কাসামান্স অঞ্চল এবং গিনির সংলগ্ন এলাকা—কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়বে। একবার গিনি-বিসাউয়ে ঘাঁটি তৈরি করতে পারলে জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো পার্শ্ববর্তী স্থিতিশীল রাষ্ট্র সেনেগাল বা গিনির অভ্যন্তরে সহজে হামলা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া চালাতে সক্ষম হবে।
(২) উপকূলীয় কৌশলগত গুরুত্ব ও অবৈধ নেটওয়ার্ক: গিনি-বিসাউয়ের উপকূলীয় অবস্থান এবং বহু দ্বীপ নিয়ে গঠিত এর ভূ-প্রকৃতি জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর জন্য এক নতুন কৌশলগত সুবিধা নিয়ে আসে। দেশটি ঐতিহাসিকভাবেই মাদক ও অস্ত্র পাচারের একটি কেন্দ্র হিসেবে কুখ্যাত। অভ্যুত্থানের ফলে সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় অবৈধ সমুদ্রপথগুলো সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো এই পাচারকারীদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের কার্যক্রমকে সমুদ্রপথে সম্প্রসারিত করতে পারে। তারা সমুদ্রপথে অবৈধভাবে অস্ত্র, গোলাবারুদ, সরঞ্জাম এবং অর্থ পাচারের জন্য গিনি-বিসাউয়ের উপকূলকে একটি 'লজিস্টিক হাব' হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
গ। সামরিক মনোযোগের পরিবর্তন।
সামরিক অভ্যুত্থান গিনি-বিসাউয়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে দ্রুত অবনতির দিকে ঠেলে দেবে। অভ্যুত্থানের পর সামরিক নেতৃত্ব তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং অভ্যুত্থান-বিরোধী কোনো বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ দমনকে অগ্রাধিকার দেবে। এর ফলে পূর্বে সীমান্ত সুরক্ষা এবং জঙ্গিবাদ মোকাবেলার জন্য নিয়োজিত সামরিক সম্পদ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং টহল দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা ও রাজধানী বিসাউয়ের নিরাপত্তায় সরিয়ে আনা হবে। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে দেশের দুর্বল ও অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলগুলো কার্যত সামরিক নজরদারি থেকে বঞ্চিত হবে। জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো এই 'নিরাপত্তা শূন্যতা'-কে তাদের অনুপ্রবেশ, সদস্য নিয়োগ এবং অপারেশন চালানোর জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ হিসেবে কাজে লাগাবে।
৫
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি: মাদক পাচার ও আন্তর্জাতিক প্রভাব।
গিনি-বিসাউয়ের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব তার উপকূলীয় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের 'নার্কো-স্টেট' হিসেবে পরিচিতির কারণে। এই অভ্যুত্থান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গভীর হুমকি সৃষ্টি করছে:
ক। মাদক পাচারের কেন্দ্র।
গিনি-বিসাউয়ের অবৈধ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো কোকেন পাচার, যা এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি 'নার্কো-স্টেট' হিসেবে পরিচিত করেছে। সামরিক অভ্যুত্থান এই মাদক পাচারকারী চক্রকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে আরও গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিয়েছে। ক্ষমতা দখলের ফলে অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার এবং এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ জঙ্গিবাদসহ অন্যান্য অস্থিতিশীল কার্যকলাপকে অর্থায়ন করতে পারে।
(১) 'নার্কো-স্টেট' পরিচিতি ও ট্রানজিট হাব: গিনি-বিসাউ বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি 'নার্কো-স্টেট' হিসেবে কুখ্যাত, যার ভূ-রাজনৈতিক পরিচিতি মূলত ল্যাটিন আমেরিকা থেকে ইউরোপে কোকেন পাচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হিসেবে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক নেতারা সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করায় এই অবৈধ বাণিজ্যের মাত্রা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবেই এই আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
(২) মাদক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা: সামরিক অভ্যুত্থান সরাসরি গিনি-বিসাউয়ের দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর মাদকের ক্ষতিকারক প্রভাবকে আরও গভীর করবে। মাদক পাচার থেকে অর্জিত বিপুল অর্থ সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থানের পর সামরিক নেতারা অবৈধ অর্থায়নের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। এরফলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো এই মাদকের নেটওয়ার্ককে তাদের অর্থায়ন ও অস্ত্র পাচারের কাজে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।
খ। রাজনৈতিক শূন্যতা ও বৈদেশিক স্বার্থ।
গিনি-বিসাউয়ে সামরিক অভ্যুত্থান একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। ECOWAS-এর চাপ ও পশ্চিমা অবরোধ সামরিক সরকারকে রাশিয়া (বিশেষ করে আফ্রিকান কর্পস) এবং চীনের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর দিকে ঠেলে দেয়ার পথ তৈরি করে। এই শক্তিগুলো নিরাপত্তা সহায়তা বা পরিকাঠামো উন্নয়নের লোভ দেখিয়ে অনায়াসে গিনি-বিসাউয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এটি কেবল আঞ্চলিক অস্থিরতাই বাড়াবে না বরং পশ্চিম আফ্রিকাকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে একটি 'প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্র'-এ পরিণত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
গ। আঞ্চলিক সংক্রামক রোগ।
গিনি-বিসাউয়ের সামরিক অভ্যুত্থান এবং এর ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা শুধু এই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি প্রতিবেশী দেশগুলোতে 'নিরাপত্তা সংক্রামক রোগ' ছড়াতে পারে। এর সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে স্থিতিশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র সেনেগালের ওপর, বিশেষত কাসামান্স অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। একটি সামরিক সরকারের সাফল্য পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলোর ওপর একটি নেতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করে, যা অন্যান্য দেশের অসন্তুষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের আরও সহজে ক্ষমতা দখলের জন্য উৎসাহিত করতে পারে।
৬
গিনি-বিসাউয়ে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক শাসন, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। এই অভ্যুত্থানটি কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা প্রকাশ করে না বরং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ECOWAS-এর কার্যকারিতার সংকটকে প্রকটভাবে তুলে ধরে। এছাড়া সাহেল অঞ্চলজুড়ে চলমান জঙ্গীবাদের বিস্তার এবং একটি 'নার্কো-স্টেট'-এর রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ায় জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো এখন তাদের কার্যক্রমকে আটলান্টিক উপকূলীয় অঞ্চলে সহজে সম্প্রসারিত করার নতুন সুযোগ পেতে পারে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর মনোযোগ অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ধরে রাখার দিকে নিবদ্ধ থাকলে, দেশের অরক্ষিত সীমান্তগুলো মাদক পাচার এবং জঙ্গি অনুপ্রবেশের জন্য মুক্তদ্বার হয়ে উঠতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর উচিত কেবল নিন্দা জ্ঞাপন না করে সুসংগঠিত এবং কার্যকরী কূটনীতি প্রয়োগ করা। কঠোর ও লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে (যেমন সেনেগাল) নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করা বিশেষ জরুরি। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যদি দ্রুত নিরসন করা না হয়, তবে পশ্চিম আফ্রিকার সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলটি জঙ্গিবাদ এবং অবৈধ কার্যকলাপের একটি নতুন কেন্দ্রে পরিণত হবে। যার ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি সুদূরপ্রসারী হবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে পরিবর্তন করে দেবে।
পোস্ট ভিউঃ 1