ভারত ও চীনের ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈরথে দক্ষিণ এশিয়া

লেখালোক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়
ভারত ও চীনের ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈরথে দক্ষিণ এশিয়া

১ 

দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও চীন তাদের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক তীব্র ও বহুমুখী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই দ্বৈরথ কেবল সীমান্ত সংঘাত বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিস্তৃত হয়েছে অর্থনীতি, অবকাঠামো, কূটনীতি এবং কৌশলগত প্রভাবের ক্ষেত্রে। ভারতের ঐতিহ্যগতভাবে নিজস্ব প্রভাবের বলয় হিসেবে বিবেচিত এই অঞ্চলে চীনের আগ্রাসী প্রবেশ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলি নয়াদিল্লির আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ভারত তার ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি এবং পশ্চিমা অংশীদারদের (যেমন কোয়াড) সঙ্গে কৌশলগত জোটের মাধ্যমে চীনা প্রভাবকে মোকাবিলা করতে সচেষ্ট। এরফলে এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলো যেমন বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলায় জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে একদিকে রয়েছে চীনের কাছ থেকে বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তার প্রলোভন এবং অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য। ভারত ও চীনের এই রেষারেষি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে, যার ফলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল দুই দেশের বিষয় না থেকে সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে।


চীনের অর্থনৈতিক কৌশল: 'ঋণের ফাঁদ' এবং অবকাঠামো বিস্তার।


ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈরথের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র হলো অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা। চীন মূলত তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর মাধ্যমে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। এরফলে এসব দেশ উন্নয়নের সুযোগ পেলেও কৌশলগত নির্ভরশীলতা ও ঋণের বোঝায় ক্রমাগত জর্জরিত হচ্ছে। চীনের এই কৌশল ভারতের আঞ্চলিক অর্থনীতিতে চিরাচরিত প্রভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চীনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার অর্থনৈতিক কৌশলগুলো:


ক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ও অনুপ্রবেশ।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার, যা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে দেশটির অনুপ্রবেশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। বেইজিং তার ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এই বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে এশীয়, ইউরোপীয় এবং আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে স্থল ও সামুদ্রিক পথে সংযোগ স্থাপন করে বিশ্ববাণিজ্যে নিজেদের কেন্দ্রীয় অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যেমন- পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা বন্দর, সড়ক, রেলপথ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিনিয়োগগুলি স্বল্পমেয়াদে দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটালেও এরসাথে প্রায়ই যুক্ত থাকে অস্বচ্ছ চুক্তি এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের হার, যা এই দেশগুলোর ওপর ব্যাপক ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এই বিনিয়োগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়েও চীনের কৌশলগত এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য বেশি নিয়োজিত, যা আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে।


খ। কৌশলগত করিডোর: সিপেক।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক হলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অংশ। এই করিডোর চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আরব সাগরে অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদার বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই করিডোর চীনকে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি স্বল্পতম এবং দ্রুততম প্রবেশাধিকার এনে দেয়, যা তার উপকূলীয় রুটগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমায়। ভারতের জন্য সিপেক একটি গুরুতর কৌশলগত ঘেরাওয়ের প্রচেষ্টা হিসাবে বিবেচিত হয়, কারণ এটি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বিতর্কিত অঞ্চল দিয়ে গেছে। এই করিডোরের মাধ্যমে চীন সামরিক এবং অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে তার স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে।


গ। হাম্বানটোটা বন্দর ও 'ঋণের কূটনীতি'।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাম্বানটোটা বন্দর শ্রীলঙ্কার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এই বন্দর চীনের 'ঋণের ফাঁদ কূটনীতি'র এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত। বন্দর নির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য শ্রীলঙ্কা চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি অর্থনৈতিক দিক থেকে তেমন একটা লাভজনক না হবার কারণে এবং শ্রীলঙ্কার দুর্বল অর্থনীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এরফলে ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার সরকার ঋণ পরিশোধের বিকল্প হিসেবে এই বন্দরটি এবং এর সংলগ্ন ১৫,০০০ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিকে ইজারা দিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা কেবল শ্রীলঙ্কার আর্থিক দুর্বলতাই নয় বরং এই অঞ্চলে চীনা প্রভাবের গভীরতাও প্রকাশ করে এবং ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এরফলে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত নৌ-পথে চীনের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।


ঘ। বাণিজ্যিক আধিপত্য ও স্থানীয় শিল্পের ক্ষতি। 

চীনের বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা এবং সস্তা পণ্যের লাগামহীন আমদানির ফলে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারগুলিতে বাণিজ্যিক আধিপত্য দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন খরচের তুলনায় চীনা পণ্য অনেক বেশি সাশ্রয়ী হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে এবং বহুক্ষেত্রে তা বন্ধও হয়ে গেছে। এই প্রবণতা এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। চীনের এই বাণিজ্যিক আধিপত্য ভারতের জন্য একটি গুরুতর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও চীনের তুলনায় তার সক্ষমতা কম। চীনের সস্তা পণ্য একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে তার প্রভাবকে পোক্ত করেছে।


ভারতের প্রতি-কৌশল: 'নেইবারহুড ফার্স্ট' ও সামরিক সহযোগিতা।


চীনকে মোকাবিলা করার জন্য ভারত তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত সুবিধাগুলি ব্যবহার করে প্রতি-কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতি, যার মাধ্যমে নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়। একই সাথে ভারত নিজেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহায়তাকারী হিসেবে তুলে ধরে চীনের ঋণ-ভিত্তিক অবকাঠামো কূটনীতির বিপরীতে অনুদান ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট।


ক। 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতির প্রয়োগ।

ভারত তার 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতির মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার কৌশল নিয়েছে। এই নীতির মূল লক্ষ্য ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক বন্ধনকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। চীন যখন মূলত বাণিজ্যিক এবং ঋণের উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করছে, সেখানে ভারত প্রধানত অনুদান, দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তে ঋণ এবং মানবিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছে। এই কৌশলগত পার্থক্য ভারতকে তার প্রতিবেশীদের কাছে অর্থনৈতিক শোষণের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে ভারত চীনের ঋণের ফাঁদ কূটনীতি মোকাবিলা করে আঞ্চলিক দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করছে।


খ। দ্বিপাক্ষিক সংযোগ ও উন্নয়ন।

ভারত তার 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতির অধীনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সংযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে। চীন যখন বিশাল ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প করছে ভারত তখন নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে জ্বালানি পাইপলাইন, রেল ও সড়ক সংযোগ প্রকল্পগুলোতে জোর দিচ্ছে। এই সংযোগগুলি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে অপরিহার্য। এই উদ্যোগগুলি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিপরীতে একটি নির্ভরযোগ্য ও টেকসই আঞ্চলিক সংযোগের মডেল তুলে ধরার চেষ্টা করছে।


গ। সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা।

চীন যখন অর্থনৈতিক মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে ভারত তখন নিজেকে এই অঞ্চলের দেশগুলির জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সরবরাহকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এই কৌশলগত ভূমিকার মাধ্যমে ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোর আস্থা অর্জন করতে চায় এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতিকে প্রতিহত করতে সচেষ্ট। এর অংশ হিসেবে ভারত নিয়মিতভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সামরিক মহড়া পরিচালনা করে, উপকূলীয় নজরদারি বাড়াতে রাডার সিস্টেম সরবরাহ করে এবং দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় দ্রুত মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসে।


ঘ। বহুপাক্ষিক জোট: কোয়াড-এর শক্তি। 

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্য ভারত কোয়াড জোটকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করেছে। এই অনানুষ্ঠানিক জোটের অন্য সদস্যরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কোয়াড একটি সামরিক জোট না হলেও এটি চারটি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়াতে কাজ করে। এই জোটের মূল লক্ষ্য এই অঞ্চলকে 'মুক্ত ও উন্মুক্ত' রাখা, যা চীনের আঞ্চলিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। কোয়াড-এর মাধ্যমে ভারত বৃহত্তর আন্তর্জাতিক মঞ্চে চীনা আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের একতরফা প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে সীমিত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক ভারসাম্য তৈরি করেছে।


আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনীতি: 'ভারসাম্য রক্ষা'র চ্যালেঞ্জ।


ভারত ও চীনের তীব্র দ্বৈরথের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশগুলোর অবস্থান সবচেয়ে জটিল এবং কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। এই দেশগুলো উভয় শক্তিধর প্রতিবেশীর কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা এবং উন্নয়ন সহায়তা আদায় করতে চায়, কিন্তু একই সাথে তারা কোনো পক্ষের কৌশলগত প্রভাবের শিকার হতে নারাজ। তাই এই রাষ্ট্রগুলো এক সূক্ষ্ম 'ভারসাম্য রক্ষা'র খেলায় লিপ্ত, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও তাদের সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।


ক। বিচক্ষণ 'ভারসাম্যমূলক আচরণ'। 

দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশগুলো ভারত ও চীনের তীব্র দ্বৈরথের মাঝে এক বিচক্ষণ 'ভারসাম্য রক্ষা' করার কৌশল অবলম্বন করে। এই দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো উভয় বৃহৎ শক্তির কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা সর্বোচ্চ পরিমাণে আদায় করা, কিন্তু একই সাথে কোনো একক শক্তির কৌশলগত প্রভাবের কাছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বন্ধক না রাখা। তারা চীনের বিআরআই প্রকল্প থেকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অর্থ নেয়, আবার ভারতের সাথে ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বজায় রাখে। এই দেশগুলো কোনো অবস্থাতেই কোনো একক শক্তির পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেয়া থেকে সতর্ক থাকে, কারণ এতে অন্য বৃহৎ শক্তির সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার এবং তার ফলে অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কৌশলটি চ্যালেঞ্জিং হলেও এটিই তাদের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত।


খ। নেপালের কৌশলগত দোদুল্যমানতা।

ঐতিহাসিকভাবে নেপাল ভারতের সাথে খোলা সীমান্ত এবং সাংস্কৃতিক নৈকট্যের কারণে গভীরভাবে যুক্ত থাকলেও দেশটি বর্তমানে তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সচেষ্ট। এজন্য নেপাল অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে ভারতের ওপর একতরফা নির্ভরতা কমাতে চাইছে। দেশটি সম্প্রতি চীনের সাথে বাণিজ্য ও সংযোগ চুক্তিতে সই করে সেই প্রচেষ্টা দেখিয়েছে, যার মধ্যে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত। নেপালের এই দোদুল্যমানতা মূলত বেইজিং-এর কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় এবং একই সাথে নয়াদিল্লির সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য। এই পদক্ষেপ নেপালকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাফার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ইঙ্গিত দেয়।


গ। মালদ্বীপের রাজনৈতিক পালাবদল।

ভারত মহাসাগরের কৌশলগত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে সরকারের পরিবর্তন প্রায়শই দেশের বৈদেশিক নীতিতে দোদুল্যমানতা সৃষ্টি করে। যখন ভারতপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসে তখন তারা নয়াদিল্লির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতিকে স্বাগত জানায়। আবার অন্যদিকে যখন চীনপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসে তখন তারা চীনের বিআরআই-এর আওতায় বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ঋণ গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেয়। এই ঘন ঘন রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে মালদ্বীপের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক নীতি সরাসরি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মালদ্বীপকে ভারত ও চীনের মধ্যে চলা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি প্রধান ক্ষেত্র বানিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


ঘ। দুর্বল আঞ্চলিক সংহতি।

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংহতির অভাব চীনকে তার ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের এক বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে। সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাগুলি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত, বিশেষত ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার কারণে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে চীন কোনো সম্মিলিত আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি না হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করছে এবং এককভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। এরফলে ছোট দেশগুলো চীনের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির মোকাবিলায় সম্মিলিত দর কষাকষির ক্ষমতা হারাচ্ছে। চীনের এই 'একক দেশের সাথে সম্পর্ক' নীতি আঞ্চলিক সংহতিকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে, যা ভারতকে কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


৫ 

ভারত ও চীনের মধ্যে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়াকে জটিল কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত করেছে, যেখানে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এক গভীর পরীক্ষার সম্মুখীন। এই দ্বৈরথ কেবল সামরিক বা সীমান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। চীন তার বিপুল আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এই অঞ্চলের ভূখণ্ডে দ্রুত অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে, যা ক্ষুদ্র দেশগুলির দ্রুত উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করলেও তাদের ওপর ঋণের বোঝা এবং কৌশলগত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করছে। এই 'ঋণের কূটনীতি' একদিকে যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। অপরদিকে ভারতের 'নেইবারহুড ফার্স্ট' নীতি এবং তার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক নৈকট্য চীনা প্রভাবকে সীমিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হলেও, চীনের গভীর পকেট এবং দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্পগুলির বিপরীতে ভারতকে তার প্রভাব বজায় রাখতে আরও উদ্ভাবনী ও সংহত কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে।


ভবিষ্যতে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিণতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য দ্বিমুখী পথ উন্মোচন করবে। যদি আঞ্চলিক শক্তিগুলো বিচক্ষণতার সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং উভয় পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া সুবিধাগুলোকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে, তবে এটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অনুঘটক হতে পারে। কিন্তু তারা যদি কোনো একটি বৃহৎ শক্তির সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হয় বা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই দ্বৈরথের শিকার হয় তবে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এই অঞ্চলের দেশগুলির জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল হবে তাদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি স্বাধীন ও অ-জোটবদ্ধ পররাষ্ট্র নীতি বজায় রাখা। ভারত ও চীনের এই রেষারেষি চলতে থাকবে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজেদের সংহতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার সক্ষমতার উপর।



পোস্ট ভিউঃ 1

আপনার মন্তব্য লিখুন