ভারত মহাসাগর: কোয়াড বনাম রেলোস চুক্তি

লেখালোক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়
ভারত মহাসাগর: কোয়াড বনাম রেলোস চুক্তি

১ 

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ৪ থেকে ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ০২ দিনের জন্য ভারত সফর করেন, যা ছিল ২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। এই সফরে দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে মোট ১৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরমধ্যে রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিক সাপোর্ট (RELOS) বা 'রেলোস' চুক্তিটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি দুই দেশের সামরিক বাহিনীকে পারস্পরিক সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে রসদ ও জ্বালানি সরবরাহের সুবিধা দেবে। এরফলে ভারত যেমন আর্কটিক পর্যন্ত রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে, তেমনি রাশিয়াও ভারত মহাসাগরে ভারতের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।


বর্তমানে বিশ্ব ক্ষমতা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে, আর ভারত মহাসাগর অঞ্চল হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রস্থল। এই অঞ্চলে চীন তার 'স্ট্রিং অফ পার্লস' কৌশল এবং ব্লু ওয়াটার নেভি নিয়ে প্রভাব বিস্তার করছে, যা দিল্লির জন্য সরাসরি নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতকে নিয়ে গঠিত কোয়াড জোট চীনের সামরিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে চাইছে। তবে কোয়াডের পশ্চিমা অক্ষের সমান্তরালে ভারত তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়ার সাথে রেলোস চুক্তি স্বাক্ষর করে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই চুক্তি কেবল দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নয়, বরং ভারত মহাসাগর থেকে আর্কটিক পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের সমীকরণ তৈরি করেছে। রেলোস চুক্তি কোয়াডের পশ্চিমা কৌশল এবং রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি- এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে ভারতকে তার 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' বজায় রাখার এক মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


কোয়াড: পশ্চিমা সহযোগিতা ও চীনকে ঘিরে ফেলার কৌশল।


কোয়াড (চতুর্ভুজ নিরাপত্তা সংলাপ) জোটের মাধ্যমে ভারত সামরিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে অবাধ, উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক রাখা এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করা। কোয়াড দেশগুলোর মধ্যে একাধিক সামরিক মহড়া ও লজিস্টিকস চুক্তির মাধ্যমে উচ্চমানের আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা (Interoperability) নিশ্চিত হয়েছে, যা চীনের বিরুদ্ধে সমন্বিত নৌ-নজরদারি ও অভিযানের জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। এই জোটের মূল লক্ষ্য ও সামরিক তাৎপর্যগুলি হলো:


ক। লজিস্টিকস চুক্তি।

ভারত কোয়াড জোটের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে LEMOA (Logistics Exchange Memorandum of Agreement), অস্ট্রেলিয়ার সাথে MLSA (Mutual Logistics Support Arrangement) এবং জাপানের সাথে ACSA (Acquisition and Cross-Servicing Agreement)-এর মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এই চুক্তিগুলি ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থানগুলোতে, যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিয়েগো গার্সিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলোতে জ্বালানি, মেরামত ও রসদ সরবরাহের সুবিধা নিতে দেয়। এটি চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দীর্ঘ পরিসরের নৌ-অপারেশনের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য।


খ। আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা বৃদ্ধি।

নিয়মিত মালাবার নৌ-মহড়ার মাধ্যমে কোয়াড দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর মধ্যে উচ্চস্তরের আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। এই মহড়াগুলোতে জটিল সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় অনুশীলন করা হয়, যা চারটি দেশের নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগের মানকে উন্নত করে। এরফলে কোয়াড দেশগুলো যেকোনো যৌথ অভিযান, মানবিক সহায়তা মিশন বা চীনকে মোকাবিলায় সমন্বিত নজরদারি কার্যক্রম অনেক সহজে এবং দ্রুততার সাথে পরিচালনা করতে পারে। এটি জোটের সামরিক সক্ষমতা এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে।


গ। ভূ-রাজনৈতিক চাপ।

কোয়াড জোট একটি সামরিক মঞ্চের চেয়েও বেশি কিছু, এটি মূলত চীনের উপর একযোগে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম। জোটের সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বেইজিং-কে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে। এই কৌশলগত জোটের কারণে ভারতকে একা চীনের মোকাবিলা করার ঝুঁকি নিতে হয় না, কারণ এর পাশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তি রয়েছে। কোয়াড-এর এই সম্মিলিত অবস্থান ভারতের নিরাপত্তা ভিত্তি মজবুত করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য চীনের ওপর বহুপাক্ষিক চাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে।


৩ 

'রেলোস' চুক্তি: আর্কটিক থেকে ভারত মহাসাগরে মস্কোর পা।


রাশিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষরিত রেলোস চুক্তি ভারতের কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই চুক্তি মস্কোকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভারতীয় নৌ-ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এরফলে একদিকে যেমন আর্কটিক পর্যন্ত ভারতের সামরিক প্রবেশাধিকার সুনিশ্চিত হবে, তেমনি অন্যদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে তৃতীয় একটি পরাশক্তির সামরিক উপস্থিতি তৈরি হওয়ায় আঞ্চলিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসবে। রেলোস চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে স্থাপিত লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক কোয়াড চুক্তির প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করে:


ক। চুক্তির সামরিক ভিত্তি।

রেলোস চুক্তির সামরিক ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ়। এই চুক্তিটি ভারত এবং রাশিয়ার সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে পারস্পরিক লজিস্টিকস সহায়তা আদান-প্রদানের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী উভয় দেশের সামরিক ইউনিট, যুদ্ধজাহাজ, সামরিক বিমান এবং কর্মীদের প্রয়োজনে একে অপরের সামরিক ঘাঁটি, বন্দর ও বিমানঘাঁটি ব্যবহার করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এই সুবিধার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ, যুদ্ধ সরঞ্জামের মেরামত, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় রসদ সহায়তা। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে কার্যকর সক্ষমতা (Operational Efficiency) বজায় রাখা।


খ। আর্কটিক পর্যন্ত প্রসারিত সামরিক শক্তি।

রেলোস চুক্তির মাধ্যমে ভারত এক বিশাল কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে, আর সেটা হলো রাশিয়ার আর্কটিক ও দূর প্রাচ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশাধিকার। এই প্রবেশাধিকার ভারতীয় নৌবাহিনীকে আর্কটিক অঞ্চলের নর্দার্ন সি রুট-এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের দিকে কার্যকরভাবে নজর দিতে সক্ষম করবে। এই নতুন সামুদ্রিক রুট বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, ভারতের সামরিক উপস্থিতি তার জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য কৌশলগত স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। এই চুক্তিটি ভারতের সামরিক ক্ষমতায় একটি দূরপাল্লার প্রসার ঘটিয়েছে।


গ। ভারত মহাসাগরে নতুন অক্ষ। 

রেলোস চুক্তি মস্কো এবং দিল্লির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অক্ষের জন্ম দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে রাশিয়ার নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরের কৌশলগত ভারতীয় বন্দরগুলিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলো। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন পশ্চিমা দেশগুলোতে রাশিয়ার সামরিক প্রবেশাধিকার খর্ব হচ্ছে, তখন ভারত মহাসাগরে লজিস্টিক সুবিধা পাওয়ায় এটি মস্কোকে বৈশ্বিক সামরিক মানচিত্রে সক্রিয় থাকতে সাহায্য করবে। এরফলে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজগুলি দীর্ঘ সময় ধরে ভারত মহাসাগরে মোতায়েন থাকতে পারবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই সামরিক উপস্থিতি ভারত মহাসাগরে চীনের একতরফা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি তৃতীয় শক্তির ভারসাম্য যোগ করবে। এভাবে ভারত রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থকে ব্যবহার করে তার নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করে তুলছে।


ঘ। সামরিক সরঞ্জামের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।

সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে রেলোস চুক্তি ভারতের জন্য অপরিহার্য। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সামরিক সরঞ্জামের একটি বিশাল অংশ, প্রায় ৬০% - ৭০% রাশিয়ার তৈরি। এই বিপুল পরিমাণ সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলির কার্যকর সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে রাশিয়ার ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই চুক্তিটি সেসব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে।


ভারসাম্যের কূটনীতি: দুই অক্ষের মধ্যে ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।


কোয়াড এবং রেলোস- এই দুটি বিপরীতমুখী সামরিক অক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারত তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে সচেষ্ট। এই দ্বিমুখী নীতি ভারতের কূটনীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য যেখানে দিল্লি কোনো একটি সামরিক ব্লকের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে তার জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী মিত্র নির্বাচন করে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতা কাঠামোতে ভারতকে একজন স্বাধীন ও অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ভারত একই সাথে দুটি বিপরীত সামরিক চুক্তির নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকার যে নীতি নিয়েছে, সেটাই 'ভারসাম্যের কূটনীতি':


ক। চীনের প্রতি কৌশলগত চাপ।

ভারতের ভারসাম্যের কূটনীতির মাধ্যমে চীনের ওপর দ্বিমুখী কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। ভারত একদিকে কোয়াড জোটের মাধ্যমে চীনের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা বাড়াতে পারে এবং সম্মিলিত পশ্চিমা শক্তির মাধ্যমে একটি শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। আবার অন্যদিকে রেলোস চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখে ভারত এক গুরুত্বপূর্ণ 'ব্যাক চ্যানেল' বা সাপ্লাই নেটওয়ার্কের বিকল্পও নিশ্চিত করে। এই ব্যবস্থা মস্কোর মধ্যস্থতায় চীনের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি বা সামরিক সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক বিকল্পের পথ খোলা রাখে।


খ। ব্লক রাজনীতি এড়ানো।

রেলোস চুক্তির মাধ্যমে ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা কোনো একটি সামরিক ব্লকের প্রতি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়বে না। যেখানে কোয়াড-এ সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে ভারত পশ্চিমা ব্লকের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সেখানে রাশিয়ার সাথে এই চুক্তি সেই ধারণাটিকে নাকচ করে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ভারতের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলি কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বা চাপ দ্বারা প্রভাবিত হবে না। বরং ভারতের বৈদেশিক নীতি তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে, যা তার স্বতন্ত্র অবস্থানকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও মজবুত করে।


গ। শক্তিশালী দর কষাকষির ক্ষমতা।

দুটি ভিন্ন অক্ষ—পশ্চিমা কোয়াড জোট এবং রাশিয়ার সঙ্গে রেলোস চুক্তি—দিল্লির জন্য বিশেষ কূটনৈতিক সুবিধা এনে দিয়েছে। দুটি প্রধান সামরিক শক্তির সাথেই কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে ভারত আন্তর্জাতিক দরবারে দর কষাকষির ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। এরফলে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়ের কাছ থেকেই অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম এবং কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকে। এই ভারসাম্য ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণ এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাবকে সুনিশ্চিত করে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়।


ভারতের রেলোস চুক্তি এবং কোয়াড-এ সক্রিয়তা—এই দ্বিমুখী কৌশল ওয়াশিংটনের জন্য এক জটিল কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারতের সহযোগিতা অপরিহার্য, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দিল্লির সামরিক ঘনিষ্ঠতা মার্কিন নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে এবং মিত্রতা ধরে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।


ক। রেলোস চুক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জটিলতা। 

ভারত এবং রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত রেলোস চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের জন্য এক জটিল কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন চীনকে ঠেকানোর জন্য যখন কোয়াড-এর মাধ্যমে ভারতকে তাদের দিকে টানতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ভারতের এই পদক্ষেপ তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক:


(১) দ্বন্দ্বের আশঙ্কা ও CAATSA-এর ঝুঁকি: রেলোস চুক্তির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে মস্কোকে সুবিধা দেয়াকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নীতির পরিপন্থী মনে করে। রাশিয়াকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এবং রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলে তাদের প্রভাবের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ভারতের উপর CAATSA (Countering America's Adversaries Through Sanctions Act) প্রয়োগের মতো কঠোর পদক্ষেপের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই আইনটি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা খাতের সাথে গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে যুক্ত দেশগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান দেয়। যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়, তবে তা ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।


(২) কৌশলগত বাধ্যবাধকতা এবং বিপরীতমুখী প্রভাব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই কঠিন বাস্তবতাকে বুঝতে হবে যে মস্কোর সাথে দিল্লির সামরিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত, যা দ্রুত ছিন্ন করা সম্ভব নয়। ভারতের সামরিক সরঞ্জামের বিশাল অংশ রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে রাশিয়ার প্রভাব থেকে সরাতে গিয়ে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তবে তার ফল হবে বিপরীত। এই চাপ ভারতকে আরও বেশি রাশিয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার ফলে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনকে ঠেকানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোয়াড জোট দুর্বল হতে পারে। তাই ওয়াশিংটনকে অবশ্যই একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।


খ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ করণীয়। 

রেলোস চুক্তির ফলে উদ্ভূত কৌশলগত জটিলতা নিরসনে এবং চীনের মোকাবিলায় ভারতকে সাথে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।


(১) চাপের পরিবর্তে প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ভারতকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে আরও উদার ও দ্রুত হওয়া। ভারতের সামরিক সরঞ্জামের রাশিয়ার ওপর যে বিশাল নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা কমাতে হলে কেবল চাপ প্রয়োগ না করে উচ্চমানের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে, ভারত ক্রমান্বয়ে রাশিয়ার উপর তার নির্ভরতা কমাতে উৎসাহিত হবে। এই নীতি কেবল ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণকেই নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে কোয়াড জোটের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকেও শক্তিশালী করবে।


(২) কৌশলের নমনীয়তা এবং স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি: ওয়াশিংটনকে অবশ্যই ভারতের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষাকে মেনে নিতে হবে এবং এই নীতিকে সম্মান জানাতে হবে। ভারতের জন্য রাশিয়া-নির্ভরতা একটি ঐতিহাসিক বাস্তব এবং রেলোস চুক্তি হলো সেই সম্পর্কের একটি বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন নীতি নির্ধারকদের উচিত ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার সীমিত লজিস্টিক উপস্থিতিকে চীনের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাবের তুলনায় কম ক্ষতিকারক হিসেবে দেখা। নমনীয়তা দেখালে তা দিল্লিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরও বেশি আস্থাশীল করবে যা ইন্দো-প্যাসিফিকে তাদের যৌথ উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হবে।


(৩) কোয়াডের ফোকাস পরিবর্তন এবং অ-সামরিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব প্রদান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা কোয়াড জোটকে শুধুমাত্র চীনের বিরুদ্ধে একটি সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে এর ফোকাস অ-সামরিক ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করতে হবে। জোটের কার্যক্রমকে অর্থনৈতিক সংযোগ, মানবিক সহায়তা (Humanitarian Assistance and Disaster Relief - HADR), স্বাস্থ্য সহযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কোয়াডের এই ধরনের গঠনমূলক ও উন্নয়নমূলক এজেন্ডাগুলো ভারতকে আরও বেশি আকর্ষণ করবে এবং জনগণের কাছে জোটের উপযোগিতা প্রমাণিত হবে। এটি কোয়াডকে একটি সামরিক বলয়ের বাইরে, আঞ্চলিক কল্যাণ ও স্থিতিশীলতার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।


আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এখন দ্রুত বহু মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। ভারতের কোয়াড চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিমা অক্ষের সাথে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং একই সাথে রাশিয়ার সঙ্গে 'রেলোস' চুক্তি স্বাক্ষর, দিল্লীর ভারসাম্যের কূটনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই দ্বিমুখী কৌশল ভারতকে কেবল তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে মোকাবিলা করার জন্য অতিরিক্ত সামরিক সক্ষমতা ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক দেয়নি, বরং একই সাথে তাকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে একজন স্বতন্ত্র, অপরিহার্য এবং স্বাধীন খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই পদক্ষেপ ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। রেলোস চুক্তির মাধ্যমে আর্কটিক থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি বিস্তৃত সামরিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা এই অঞ্চলে একক শক্তির আধিপত্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা মূলত নির্ভর করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর। ওয়াশিংটনকে অবশ্যই এই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। ভারতকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য চাপ না দিয়ে, বরং নিজস্ব কৌশলকে আরও নমনীয় ও সমন্বিত করে তোলা উচিত। শেষ পর্যন্ত কোয়াড এবং রেলোস—এই দুটি বিপরীতমুখী কৌশলই প্রমাণ করে যে ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ কোনো একক শক্তি বা ব্লকের হাতে থাকবে না। 



পোস্ট ভিউঃ

আপনার মন্তব্য লিখুন