১ ‘Don't miss the chance to see an okapi. It's a once-in-a-lifetime experience!’, পোস্টিং অর্ডার হাতে পেয়ে মেজর লিও বলেছিল। লিও গুয়াতেমালা আর্মির, আমরা একসাথে কিনসাশা’য় ছিলাম, ১৫ দিনের প্রাক-পোস্টিং ট্রেনিং শেষে একসাথেই বুনিয়া, ইতুরি ব্রিগেডে জয়েন করেছিলাম। ওকাপি গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর জাতীয় প্রাণী। পৃথিবীতে ওকাপির মতো আরও কিছু বিচিত্র প্রাণী আছে, যারা একইসাথে দুটো বা তিনটা ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বৈশিষ্ট্য বহন করে, যেমন- বীভার এবং হাঁসের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রাণী তাসমানিয়ার প্লাটিপাস। এরকম আরও আছে, প্যাঙ্গোলিন, মিরক্যাট, ক্যাপিবারা ইত্যাদি। অনেকে মজা করে এরকম শংকর জাতের প্রাণীদেরকে বলেন জোড়াতালি দেয়া প্রাণী। সুকুমার রায়ের 'হাঁসজারু'র মতোন। Epulu Okapi Wildlife Reserve-এ ওকাপি দেখার ইচ্ছেয় গুরুং-এর সাথে একদিন Long Range Patrolling (LRP) প্ল্যান করলাম, রথ দেখা এবং কলা বেচা দুটোই হবে। সঙ্গী হিসেবে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল বুনিয়ায় বাংলাদেশী কন্টিনজেন্টে কর্মরত মেজর মামুন, আমার কোর্সমেট। ফটোগ্রাফি মামুনের নেশা, আর তাই ওর দারুণ একটা ক্যামেরা ছিল। যথাসময়ে মামুন ক্যামেরা কাঁধে আমাদের সাথে যোগ দিল। প্যাক লাঞ্ ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তার কাঁধেই বর্তেছিল। ইউএন-এর সাদা রঙের নিশান পেট্রল গাড়িটা নিয়ে আমরা প্রথমে Komanda গিয়েছিলাম, ইতুরি ব্রিগেডের ওটাই সবচেয়ে দূরের Company Operating Base (COB)। COB Commander মেজর সোলায়মান, বাংলাদেশ আর্মির একজন কমান্ডো। সেখানে স্ন্যাক্স, চা/কফি বিরতি শেষে রিজার্ভ ফরেস্টের ভিতর দিয়ে আরও দূরে গেলে Mambasa, পুরোটাই লাল মাটির রাস্তা। সেখান থেকে Epulu আরও দূরের পথ। ১৮৮৭ সালে হেনরী মর্টন স্টানলি’র আফ্রিকা অভিযানের পর মানুষ প্রথমবারের মতো ওকাপিদের সম্পর্কে জানতে পারে। পিগমিরা অবশ্য একে অ্যাটি নামে ডাকে। আরেক ইংলিশ অভিযাত্রি হ্যারি জন্সটন ১৯০১ সালে প্রথম ওকাপির মৃতদেহ লন্ডনে আনলে তা গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। ১৯০১ সালে উগান্ডার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার হ্যারি জন্সটন জানতে পারেন, জার্মান সার্কাস মালিকরা পিগমি মানুষদের ধরে ইউরোপে প্রদর্শন করছে। তিনি তাদের উদ্ধার করে বাসস্থানে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করলে পিগমিরা কৃতজ্ঞতাবশত তাকে ওকাপির চামড়া ও মাথার খুলি উপহার দেয়। তবে ওকাপি রেইন ফরেস্টের অনেক গভীরে বাস করে বলে তিনি নিজ চোখে দেখতে পারেননি। ওকাপি দর্শন শেষে গবেষণা কেন্দ্রের পাশেই পাহাড়ি নদীতে প্রচুর ছবি তুললাম। নদীর পাড়েই শেডের ব্যবস্থা, সেখানে লাঞ্চ সেরে টিম সাইডে ফেরার পালা। আমরা ফিরে এলাম একটা lifetime experience নিয়ে। পশুপাখির প্রতি যাদের আগ্রহ, তাদের জন্য এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। জানা যায়, ৯০র দশকে কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ওকাপির সংখ্যা ছিল ৪,৪০০। গৃহযুদ্ধ এবং খনি ব্যবসার কারণে ১০ বছর পর সংখ্যাটা ২,৫০০ তে নেমে আসে। ওকাপি এমন একটি প্রজাতি যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং কয়েক দশকে এরা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
ডিআর কংগোর উত্তর-পূর্ব দিকের প্রদেশটাই ইতুরি। কিনসাশাতে বুলেভার্ডের প্রশস্ত বুকে ছড়ানো জ্যাকারান্ডার নীল চাদরের মায়া। সেই মায়া কাটিয়ে বুনিয়ার সবুজ ক্যানোপির আড়ালে প্লেন ল্যান্ড করলে আমাকে পাঠানো হলো মারাবো টিম সাইটে। ওটা তখনো রেড জোন। টিম লিডার ইউক্রেনিয়ান লে কর্নেল, টিমমেট হিসেবে ছিলেন নেপাল আর্মির মেজর বিজু গুরুং, ইন্দোনেশিয়ান এয়ার ফোর্সের ক্যাপ্টেন ফালাহ দারতা জারি, মালাওয়ির নারী অফিসারের নামটা ভুলে গেছি আর ছিলেন বেনিনের মেজর সিডি। এক সন্ধ্যার আড্ডায় আমি আর গুরুং ওকাপি দেখার প্ল্যানটা করে ফেললাম। ওকাপি দেখতে ছোট আকারের জিরাফের মতোন, আমার কাছে জেব্রা আর ঘোড়ার সংমিশ্রণ বলে মনেহয়েছে, কিংবা বলা যেতে পারে জেব্রা- জিরাফ- ঘোড়া তিনটি প্রাণীর বৈশিষ্ট্যই তারা বহন করছে। আফ্রিকাতে শুধু ইতুরি প্রদেশের রেইন ফরেস্টেই তাদের দেখা মেলে।
২
Epulu-তে ওকাপি পরিচর্যা এবং গবেষণা কেন্দ্র পর্যন্তই যাওয়া যায়, রিজার্ভ ফরেস্টে ঢোকা নিষেধ। সেখানে পিগমিদের বাস, নিরাপত্তাজনিত কারণে যাওয়া নিষেধ। পরে অবশ্য বেনি’র দিকে একটা সেটলার ক্যাম্পে পিগমিদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। গবেষণা কেন্দ্রে বেশ কিছু ওকাপি আছে, অনুমতি নিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখা যায়, ছবি তোলা যায়।
৩
ওকাপিরা তৃণভোজী প্রাণী, গায়ের রং বাদামি। লেজের কাছে ও পেছনের পায়ে জেব্রার মতো সাদা কালো ডোরা কাটা দাগ আছে। দেহের তুলনায় গলা লম্বা, কিন্তু জিরাফের মতো অতটা নয়। মাথার গড়ন অবশ্য জিরাফের মতো। পুরুষ ওকাপির মাথায় জিরাফের আদলে দুটো শিঙের মতো আছে। ওকাপিদের কানের আকার বড় তাই শ্রবণ এবং ঘ্রাণশক্তি প্রখর। বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে গাছপালা ও লতাগুল্মের মধ্য দিয়ে এরা পালিয়ে যেতে পারে। এদের কালো রঙের জিভটা বেশ লম্বা বলে গলা বাড়িয়ে উঁচু ডালের কচি পাতাসহ ছোট ছোট শাখা- প্রশাখা মুখের ভেতর টেনে নিতে পারে। এছাড়াও জিভ দিয়ে এরা এদের কান পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পারে, জিভ দৈর্ঘ্যে সাধারণত ০.৪৬ মিটার বা ১৮ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ২.১৫ কেজি হয়ে থাকে। এরা এতোটাই নিরীহ প্রাণী যে তাদের কণ্ঠস্বরটি খুব কমই ব্যবহার করতে হয়, শুধুমাত্র প্রজননের সময়ে তাদের ডাক শোনা যায়।
প্রজননের সময়ে তাদের ছোট ছোট দলে দেখা গেলেও অন্যসময় একাই চলাফেরা করে। এদের গর্ভধারণ কাল প্রায় ১৫ মাস এবং গ্রীষ্মের শেষের দিকে বাচ্চা দিয়ে থাকে। গর্ভধারণের সময়কাল দীর্ঘ বলে এদের প্রজনন হার খুব কম। এরা গরুর মতো শুরুতে ঝটপট খেয়ে অবসরে জাবর কেটে থাকে।
৪
পোস্ট ভিউঃ 33