ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদাম: ইসরায়েলি নারী গুপ্তচর তালিকায় সম্ভবত সর্বশেষ সংযোজন

লেখালোক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়
ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদাম: ইসরায়েলি নারী গুপ্তচর তালিকায় সম্ভবত সর্বশেষ সংযোজন

গত ১৩ জুন ২০২৫ তারিখে ইরানে ইসরায়েলের বিমান হামলার মাধ্যমে ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ইরানও প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে মিসাইল হামলা শুরু করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় বোমা হামলা করে। প্রায় ১২ দিন ধরে চলা সংঘাতের পর আপাতত যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে দুই পক্ষ। এই যুদ্ধে নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনের ব্যবহারের পাশাপাশি গুপ্তচরবৃত্তির দুর্দান্ত তথ্য আমাদেরকে আলোড়িত করেছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে গুপ্তচরবৃত্তির ধারণা নতুন কিছু নয়, এটি বরং মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান যুগে গুপ্তচর সংস্থাগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় শত্রুদেরই নয়, বরং অবৈধ মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং সাইবার হামলার মতো বিষয়গুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করে থাকে। প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা এখন গুপ্তচরবৃত্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ।


গুপ্তচরবৃত্তি যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। আর তাই প্রাচীনকাল থেকেই রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী এবং শাসকরা তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনে গুপ্তচরদের ব্যবহার করে আসছে। এই ইতিহাস সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।  প্রায় ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মেসোপটেমিয়াতে রাজা হাম্মুরাবির সময়ে কূটনীতিক দূত হিসেবে ছদ্মবেশে গুপ্তচরদের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্বাব্দ তৃতীয় শতকে মৌর্য সাম্রাজ্যে সুসংগঠিত ও কার্যকর গুপ্তচর বাহিনীর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তখন শাসনকর্তারা নিজ দেশ ও শত্রুদেশে গুপ্তচরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতেন। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে এর বিশদ বিবরণ রয়েছে। সেসময়ে গুপ্তচরদের ‘গূঢ়পুরুষ’ বলা হতো এবং তারা দুই ধরণের ছিলেন, ‘সমস্থা’ (নির্দিষ্ট স্থান থেকে খবর সংগ্রহকারী) এবং ‘সঞ্চরা’ (বিভিন্ন স্থানে বিচরণের মাধ্যমে খবর সংগ্রহকারী)। প্রাচীন গ্রীস ও রোমান সভ্যতাতেও সামরিক ও রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহের জন্য গুপ্তচরদের ব্যবহার করা হতো। তবে মধ্যযুগে গুপ্তচরবৃত্তির কৌশল আরও উন্নত হয়। সেসময় বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও রাজ্য একে অপরের দুর্বলতা জানতে এবং নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গুপ্তচরদের ওপর নির্ভর করতো, বিশেষ করে সামরিক কৌশল, জোট এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের খবর জানতে গুপ্তচরদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।


১৯শ থেকে ২০শ শতাব্দী অবধি বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সাথে গুপ্তচরবৃত্তির ধারণা আরও পেশাদারী রূপ নেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুপ্তচরবৃত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ সময় বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তোলে, যেমন– যুক্তরাজ্যে এমআই-৬, জার্মানিতে গেস্টাপো, জাপানে কেম্পেইতাই ইত্যাদি। এই সংস্থাগুলো শত্রুদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ, নিজ দেশের অভ্যন্তরে প্রতি-গোয়েন্দাগিরি ঠেকানোসহ বিভিন্ন  বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। স্নায়ুযুদ্ধকালে (১৯৪৭-১৯৯১) গুপ্তচরবৃত্তি চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে, এসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যাপক গুপ্তচর কার্যক্রমে লিপ্ত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি এসময়ে গঠিত হয় এবং  প্রযুক্তিগত গুপ্তচরবৃত্তি, যেমন - ইলেকট্রনিক নজরদারি, কোড ব্রেকিং ইত্যাদির ব্যাপক উন্নতি ঘটে। এসময় পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও গুপ্তচরবৃত্তির সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে এবং তাদের মধ্যে অনেকেই বেশ সুনাম অর্জন করেন। উদাহরণ হিসেবে মাতা হারি, ন্যান্সি ওয়াক, নূর ইনায়েত খান, নীরা আর্য্য, সিলভিয়া, এলিজাবেথ বেন্টলি, হেবা সেলিম ইত্যাদিদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এনাদের বাইরে আরও অসংখ্য নারী গুপ্তচর ছিলেন, যাদের নাম হয়তো ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি। ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ১০ মে পর্যন্ত চলমান পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে যেমন নাম এসেছিল জ্যোতি মালহোত্রার।


ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবার জ্যোতি মালহোত্রা পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। তাকে হরিয়ানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং বর্তমানে তিনি ভারতীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং ভারতের স্পর্শকাতর তথ্য পাচার করতেন। তাছাড়া তিনি পাকিস্তান হাই কমিশনের একজন কর্মকর্তার সাথেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন বলে জানা গেছে। তদন্তকারীরা মনেকরেন তার বিদেশ ভ্রমণের খরচ আইএসআই এজেন্টরাই জোগাত।


২০২৫ সালের ১৩ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের সময়ে জ্যোতি মালহোত্রার মতো আরেকজন নারীর কাহিনী বেশ আলোচিত হয়, যা হার মানাবে যে কোন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। এই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে ইরানে ঢুকেছিলেন। এরপর ধর্মবদলে ইরানের শীর্ষ কর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে এবং বিভিন্নভাবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে স্পর্শকাতর তথ্য ইসরায়েলে পাচার করেছেন। উচ্চ শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী এবং বেশ সাহসী ফ্রান্সের নাগরিক এই অভিযুক্তের নাম ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদাম। তিনি ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন মহিলা গুপ্তচর বলে দাবী করা হয়েছে। তথ্যমতে তিনি দীর্ঘ পরিকল্পনার পর বছর দুয়েক আগে গোপনে ইরানে প্রবেশ করেছিলেন। তার সম্পর্কে আরও জানার আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া যাক।


ইসরায়েলি গোয়েন্দারা বিশ্বজুড়ে সক্রিয়, বিশেষ করে যেসব দেশে ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ জড়িত। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, যেমন - সাইবার গোয়েন্দাগিরি, ইলেকট্রনিক নজরদারি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে থাকে। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি মানব গোয়েন্দাদের মাধ্যমেও তথ্য সংগ্রহে তারা অত্যন্ত দক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি গুপ্তচর নেটওয়ার্কের বিস্তৃতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সাথে স্থানীয় সহযোগীদেরও কাজ করার কথা বলা হচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার পেছনে প্রায়শই মোসাদের নাম জড়িয়ে থাকে। তাদের তিনটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে, যারা দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে:


মোসাদ: মোসাদের পুরো নাম, হামোসাদ লেমোদী'ইন উলেতাফকিদিম মেয়ুহাদিম (The Institute for Intelligence and Special Operations)। এটি ইসরায়েলের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, যা মূলত ইসরায়েলের বাইরে গোপন তথ্য সংগ্রহ, বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি, গোপন অভিযান এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে কাজ করে থাকে। এই বাহিনীর প্রধান সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করেন। মোসাদের কার্যক্রম অত্যন্ত গোপনীয় এবং এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিত। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞানী হত্যা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের সাথে মোসাদের নাম প্রায়শই উচ্চারিত হয়।


শিন বেত: এই সংস্থার পুরো নাম, শেরুত হা-বিটাউইন হা-ক্লিলি (General Security Service- GSS) । এদের প্রধান কাজ দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদ দমন, প্রতি-গোয়েন্দাগিরি, নাশকতা প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখা। এটি ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও স্থাপনার সুরক্ষা প্রদান করে। ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


আমান: এই সংস্থার পুরো নাম, আগাফ হা-মোদি'ইন (Agaf Ha-Modi'in) । ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই সামরিক গোয়েন্দা শাখা’র প্রধান কাজ হলো সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা, যা ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে সহায়তা করে। এটি শত্রুদের সামরিক গতিবিধি, সক্ষমতা এবং কৌশল সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করে।


কথা বলছিলাম ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদামকে নিয়ে। মোসাদের কার্যক্রমে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সবসময়ই ছিল। আর তাই শুধু ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদাম নন, অসাধারণ সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং কৌশল দিয়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অংশ নেয়ার কারণে ইতিহাসের পাতায় বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি নারী গুপ্তচরের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। যেমন- সারা অ্যারনসন, সিলভিয়া রাফায়েল, শেরিল বেন্টোভ, হিবা সেলিম, এরিকা চেম্বার্স এবং এই পাতায় সম্ভবত সর্বশেষ সংযোজন ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদাম। দীর্ঘ পরিকল্পনার পর বছর দুয়েক আগে তিনি গোপনে ইরানে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে থাকেন। জানা যায় যে, ক্যাথরিন দাবি করেছিলেন শুরুতে তিনি কেবল ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কৌতূহলী ছিলেন। এরপর তিনি শিয়া ত্বরিকা অনুসারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ইরানের সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে দেখা এবং কথা বলতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, তিনি তাদের বিশ্বাস অর্জন করেন এবং তাদের বাড়িতে নিয়মিত অতিথি হয়ে ওঠেন। এভাবেই তিনি দিনে দিনে নানা জায়গায় ঢুকে পড়েন, ছবি তোলেন এবং সংগ্রহ করেন নানা গোপন তথ্য। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা যখন তদন্ত শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে এই সত্যি বেরিয়ে আসে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি ক্যাথরিনকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে, তবে ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন? তা কেউ জানে না। ক্যাথেরিন সম্পূর্ণরূপে নিখোঁজ। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষ করে আইআরজিসি-এর গোয়েন্দা শাখা এবং এতেলাত তাদের পোস্টার এবং ছবি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু কোথাও ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদামের কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।



পোস্ট ভিউঃ 34

আপনার মন্তব্য লিখুন