১
২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের জেদ বিশ্ব রাজনীতিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে। ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ট্রাম্পের বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন হুমকির পর পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয় যে, ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দাভোস সম্মেলনে ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এলেও যে বিতর্কিত ‘চুক্তির কাঠামো’ ঘোষণা করেন, তাতে মার্কিন ‘গোল্ডেন ডোম’ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম স্থাপন ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যদিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে কিন্তু ট্রাম্পের আরোপিত ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্কের খড়গ এখনো ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ঝুলছে। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, কারণ জোটের প্রধান সদস্য যখন মিত্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানে তখন এই সামরিক জোটের অস্তিত্বই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে উত্তর আটলান্টিকে ডেনমার্ক ও তার নর্ডিক মিত্রদের ‘অপারেশন আর্কটিক এনডিউরেন্স’ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পাল্টাপাল্টি মহড়ায় আর্কটিক অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
২
খনিজ সম্পদের মোহ ও ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড প্রীতির মূলে রয়েছে দ্বীপটির বিশাল খনিজ ভাণ্ডার এবং এর কৌশলগত অবস্থান। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডে প্রায় ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসের (REE) প্রমাণিত মজুত রয়েছে, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অপরিহার্য এবং বর্তমানে যার বাজারের সিংহভাগ চীনের নিয়ন্ত্রণে। শুধু খনিজ নয়, আর্কটিক সাগরে ক্রমবর্ধমান রুশ ও চীনা আধিপত্য রুখতে এবং আমেরিকার জন্য একটি অভেদ্য ‘গোল্ডেন ডোম’ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তুলতেই ট্রাম্প এই বিশাল বরফাবৃত দ্বীপটিকে যেকোনো মূল্যে মার্কিন মানচিত্রের অংশ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
ক। কঙ্গোর চেয়েও ধনী অঞ্চল।
গ্রিনল্যান্ড আয়তনে তিনটি টেক্সাসের সমান হলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বরফের নিচে লুকানো বিশাল খনিজ ভাণ্ডারে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি বাজারের প্রেক্ষাপটে, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ আফ্রিকার কঙ্গোর চেয়েও কৌশলগতভাবে সমৃদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫ লক্ষ মেট্রিক টন বিরল মৃত্তিকা, বিপুল পরিমাণ সোনা এবং তেলের প্রমাণিত মজুত রয়েছে, যা ভবিষ্যতের হাই-টেক শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য। মাটির নিচে থাকা এই খনিজ সম্পদ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার।
খ। চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানোর কৌশল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ড যদি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে সেখানে চীন বা রাশিয়া স্থায়ী থাবা বসাবে যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর হবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পেন্টাগনের এক গোপন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাশিয়া তাদের উত্তর মেরুর সামরিক ঘাঁটিতে নতুন পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন আইসব্রেকার জাহাজ মোতায়েন করেছে। একই সময়ে চীন নিজেকে ‘আর্কটিক-নিকটবর্তী রাষ্ট্র’ ঘোষণা করে গ্রিনল্যান্ডের অবকাঠামো ও খনি প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে, যাকে ট্রাম্প একটি আধুনিক ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের মতে উত্তর মেরুর নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হওয়ার ফলে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের যুক্তি চীন এই দ্বীপটিকে ব্যবহার করে আমেরিকার দোরগোড়ায় নজরদারি ব্যবস্থা বসাতে চায়। তাই ২০ জানুয়ারি ২০২৬-এর ভাষণে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন আধিপত্য নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি মূলত রাশিয়া ও চীনের মেরু-সাম্রাজ্যবাদ ঠেকানোর প্রধান বর্ম। এই অজুহাত তুলেই তিনি গ্রিনল্যান্ডে একটি স্থায়ী সামরিক কমান্ড সেন্টার এবং ‘গোল্ডেন ডোম’ মিসাইল শিল্ড তৈরির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে চান।
৩
বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন: রিয়েল এস্টেট বনাম সার্বভৌমত্ব।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ১৯৪৫ সাল থেকে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, “আমার আন্তর্জাতিক আইন মানার প্রয়োজন নেই; আমার কর্মকাণ্ড আমার নিজস্ব নৈতিকতা দিয়েই পরিচালিত হবে।” এই ঘোষণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার সেই স্তম্ভটিকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, যেখানে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
ক। ওয়েস্টফালিয়া চুক্তি ও আধুনিক আইনের লঙ্ঘন।
১৬৪৮ সালের ‘ওয়েস্টফালিয়া শান্তি চুক্তি’ থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদ—সবখানেই প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি জন-অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে স্রেফ ‘রিয়েল এস্টেট’ হিসেবে বিবেচনা করে এই আইনের মূলে আঘাত করেছেন, যা ২০২৬ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক আইনি মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন যে, সার্বভৌমত্বকে পণ্য হিসেবে দেখার এই প্রবণতা জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনকি ডেনমার্কের আইনি গবেষকরা একে ‘ডিপ্লোম্যাটিক এক্সট্রিম’ বা কূটনৈতিক চরমপন্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার সেই ভিত্তিকেই অস্বীকার করে যেখানে সীমানা কোনো ব্যবসায়িক লেনদেনের বিষয় নয়। বর্তমানে এই ইস্যুটি কেবল একটি দ্বীপের মালিকানা নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা বজায় রাখার এক বৈশ্বিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
খ। ১৯ শতকের উপনিবেশবাদের প্রত্যাবর্তন।
সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই আচরণ ১৯ শতকের সেই অন্ধকার সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় যখন শক্তিশালী দেশগুলো দুর্বল দেশের ওপর বলপ্রয়োগ করে সম্পদ লুট করত। ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি দাভোস সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পের এই নীতিকে সরাসরি “নব্য-উপনিবেশবাদ” এবং “নতুন সাম্রাজ্যবাদ” হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানান। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের চেয়ে খনিজ সম্পদ বড় হয়ে ওঠায় গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমাদের দেশের মানুষ কোনো পণ্য নয় যে কেনা-বেচা করা যাবে।” জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় নেতাদের মতে আধুনিক যুগে একটি সার্বভৌম অঞ্চলকে ‘রিয়েল এস্টেট’ হিসেবে বিবেচনা করা নৈতিকতার চরম অবক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ।
৪
ন্যাটোর জন্য চরম পরীক্ষা।
সামরিক জোট ন্যাটোর ইতিহাসে এটি সম্ভবত সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকট। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান এই জোটের মূল স্তম্ভ ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষা’র ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যদি জোটের প্রধান সদস্য দেশই অন্য এক মিত্রের সার্বভৌমত্ব হরণের চেষ্টা করে, তবে ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতা এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্বই এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
ক। মিত্র যখন শত্রু: অনুচ্ছেদ ৫-এর সংকট।
ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা মানে পুরো জোটের ওপর হামলা, কিন্তু বর্তমান সংকটে আক্রমণকারী খোদ ন্যাটোর প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং আক্রান্ত পক্ষ মিত্র ডেনমার্ক। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষভাগে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত জরুরি সম্মেলনে ডেনমার্ক ও সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীরা ওয়াশিংটনকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার অনুরোধ করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনড় অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। উল্টো হোয়াইট হাউস থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের “জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ”, যার ফলে ন্যাটোর যৌথ নিরাপত্তার ধারণাটি এখন গভীর খাদের কিনারায়। চলতি বছরের জানুয়ারির ৩০ তারিখের গোপন প্রতিবেদনে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনোভাবে ডেনমার্কের জলসীমা লঙ্ঘন করে, তবে ইউরোপীয় জোট অনুচ্ছেদ ৫-এর দোহাই দিয়ে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার এক নজিরবিহীন আইনি প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি ১৯৪৯ সালে গঠিত এই সামরিক জোটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে, যেখানে মিত্ররাই এখন পরস্পরের সামরিক প্রতিপক্ষ হওয়ার উপক্রম।
খ। ইউরোপের সামরিক প্রতিরোধ।
নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ডেনমার্কের নেতৃত্বে ইউরোপের আটটি দেশ ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে বিশেষায়িত সৈন্য দল ও নৌবহর পাঠিয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন আর্কটিক এনডিউরেন্স’-এর অধীনে নর্ডিক দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (S-400 ও Patriot বিকল্প) সক্রিয় করেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এক কড়া বার্তায় জানিয়েছেন যে, কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা থাকলেও তারা মাঠ পর্যায়ে কোনো সামরিক উস্কানি বরদাশত করবেন না। বর্তমানে নুক বন্দরে ইউরোপীয় মিত্রদের যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এবং আর্কটিক সাগরে যৌথ মহড়া ট্রাম্প প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ইউরোপ তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সম্মুখ সমরে যেতেও প্রস্তুত। এই সামরিক প্রস্তুতি ন্যাটোর ভেতর এক নজিরবিহীন ‘ইউরোপীয় ব্লক’ তৈরি করেছে, যা একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা সমীকরণকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে।
৫
আসন্ন বাণিজ্যযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা।
ট্রাম্প কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক অস্ত্রকেও ব্যবহার করছেন গ্রিনল্যান্ড হাসিল করতে। ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে দেয়া এক চরম আল্টিমেটামে বলা হয়েছে, ইউরোপ যদি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ ‘ট্রেড লুপ’-এ আটকা পড়বে। সামরিক চাপের পাশাপাশি এই অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল বিশ্ববাজারকে ২০ মেগাটন বিস্ফোরণের সমতুল্য এক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক। অতিরিক্ত বাণিজ্য শুল্কের হুমকি।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপের বিরোধিতার জেরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরবর্তী ধাপে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের মতে, এই “ট্রেড কার্নেজ” বা বাণিজ্যিক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের সাপ্লাই চেইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় গাড়ি শিল্প, স্টিল এবং কৃষি পণ্যের ওপর এই শুল্কের খড়গ নামায় কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের এই অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল নীতি কেবল ইউরোপকে চাপে ফেলার কৌশল নয়, বরং এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে অকার্যকর করে নতুন ‘আর্থিক বিশৃঙ্খলা’র সূচনা করেছে।
খ। ইইউ-র ‘ট্রেড বাজুকা’ ও পাল্টা আঘাত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের মুখে হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা মার্কিন বড় বড় টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতের মাধ্যমে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্রাসেলস তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ বা ‘ট্রেড বাজুকা’ সক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা এর আগে কখনো ব্যবহৃত হয়নি। এই পদক্ষেপের আওতায় সিলিকন ভ্যালির গেটকিপার কোম্পানি যেমন—গুগল, মেটা এবং অ্যাপল-এর ওপর নতুন ডিজিটাল কর আরোপ, ক্লাউড সার্ভিসে বিধিনিষেধ এবং ইউরোপীয় ডেটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় অংকের ফি নির্ধারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ট্রান্স-আটলান্টিক বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করেছে এবং প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পাল্টা শুল্কের একটি তালিকা তৈরি করেছে যা সরাসরি মার্কিন রপ্তানি খাতকে আঘাত করবে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দাভোসে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, “আমরা গুণ্ডামির চেয়ে সম্মান এবং পাশবিকতার চেয়ে আইনের শাসনকে বেশি গুরুত্ব দেই,” যা নির্দেশ করে যে ইউরোপ তার ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমেরিকার বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধে নামতে দ্বিধা করবে না।
৬
২০২৬-এর পরিস্থিতি: সমঝোতা নাকি যুদ্ধ?
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখান থেকে কারো পিছু হটার সুযোগ নেই। ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যরাতে হোয়াইট হাউস ও ব্রাসেলসের মধ্যকার রেড-লাইন হটলাইনগুলো সচল থাকলেও কোনো পক্ষই নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। কাল সকাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া মার্কিন শুল্ক নীতি এবং গ্রিনল্যান্ড উপকূলে ইউরোপীয় নৌবাহিনীর উপস্থিতি বিশ্বকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক। ট্রাম্পের অবস্থান।
২০২৬ সালের শুরুতে হোয়াইট হাউস, কংগ্রেস এবং সুপ্রিম কোর্ট—সবই এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে, যা তাকে যেকোনো কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অভূতপূর্ব আইনি ও রাজনৈতিক শক্তি প্রদান করেছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ ভাণ্ডার ও কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তিনি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডা থেকে এক চুলও সরবেন না। ট্রাম্পের মতে এটি কেবল একটি দ্বীপ নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীতে চীনের সাথে প্রযুক্তিগত যুদ্ধে জেতার প্রধান চাবিকাঠি। তার এই অনড় মনোভাবের কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এখন সম্পূর্ণভাবে ডেনমার্কের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং গ্রিনল্যান্ডকে একটি মার্কিন টেরিটরিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
খ। ডেনমার্কের অনড় মনোভাব।
ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের সরকার ও সাধারণ মানুষ সমস্বরে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—“গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।” ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কোপেনহেগেন ও নুকের রাজপথে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ মিছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, সার্বভৌমত্ব কোনো রিয়েল এস্টেট লেনদেনের বিষয় হতে পারে না। গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার ইতিমধ্যে একটি বিশেষ গণভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে দ্বীপটির ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের সংযুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন আন্তর্জাতিক মহলে ঘোষণা করেছেন, “গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের নয়, গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীদের; আর আমরা আমাদের ইতিহাসের এই অবিচ্ছেদ্য অংশকে কোনো দরাদরি বা হুমকির মুখে বিসর্জন দেব না।”
গ। দাভোস সম্মেলন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে চলমান ২০২৬ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বিশ্বনেতারা ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের অনড় অবস্থানের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা এই সংকটকে “বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রধান ঝুঁকি” হিসেবে অভিহিত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক সমাধান বা কার্যকর মধ্যস্থতা দৃশ্যমান হয়নি। বিশেষ করে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানালেও ওয়াশিংটন থেকে আসা পাল্টা হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দাভোস থেকে আসা সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আলোচনার টেবিলের চেয়ে বর্তমানে পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকিই বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে।
৭
২০২৬ সালের এই গ্রিনল্যান্ড সংকট কেবল একটি বরফাবৃত ভূখণ্ড বা খনিজ সম্পদ দখলের লড়াই নয়; এটি মূলত আধুনিক সভ্যতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক নৈতিকতার এক অগ্নিপরীক্ষা। গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে থাকা বিশাল সম্পদের মোহ এবং চীন-রাশিয়াকে ঠেকানোর ভূ-রাজনৈতিক অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র যে আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। যদি বিশ্ব সম্প্রদায় আজ ওয়াশিংটনের এই অনৈতিক ও একতরফা দাবি মেনে নেয় তবে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তি থেকে ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদ পর্যন্ত অর্জিত সার্বভৌমত্বের সকল রক্ষাকবচ চিরতরে বিলুপ্ত হবে। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা হারানো এবং ট্রান্স-আটলান্টিক বাণিজ্যিক যুদ্ধের দামামা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমরা একটি অরাজক ও শক্তি-নির্ভর নতুন যুগে প্রবেশ করছি। ট্রাম্পের ‘রিয়েল এস্টেট’ কূটনীতি বনাম ডেনমার্কের অটল সার্বভৌমত্বের এই সংঘাত প্রমাণ করছে যে, একবিংশ শতাব্দীতেও পেশ পেশিশক্তি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পারে। প্রশ্ন এখন একটাই—বিশ্ব কি ১৯ শতকের সেই অন্ধকার উপনিবেশবাদে ফিরে যাবে, নাকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই নজিরবিহীন আগ্রাসন রুখে দিতে সক্ষম হবে? আইনের শাসন বনাম শক্তির এই লড়াইয়ের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দশকের বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের নিরাপত্তা।
পোস্ট ভিউঃ 17