১
একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। কাতার অবরোধ থেকে শুরু করে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুথি দমনে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম’ পর্যন্ত যে ঐক্য বজায় ছিল, তা আজ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী স্বার্থে রূপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার ফাটল এখন আর কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আড়ালে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রণক্ষেত্রেও স্পষ্ট। ইয়েমেনের মরুভূমি আর লোহিত সাগরের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির লক্ষ্য এখন সম্পূর্ণ আলাদা। সৌদি আরব যেখানে তার সীমান্ত নিরাপত্তা ও ইয়েমেনের অখণ্ডতা রক্ষায় মরিয়া, সেখানে আমিরাত মনোযোগী হয়েছে এডেন উপসাগর ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর ওপর নিজেদের সামুদ্রিক সাম্রাজ্য বিস্তারে। এই দুই মিত্রের ছায়াযুদ্ধ ইয়েমেনে হুথিদের জন্য অভাবনীয় রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। লোহিত সাগরের নতুন সমীকরণে এই দ্বন্দ্ব কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের এই জোট এখন কোল্ড ওয়ারে পরিণত হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো অঞ্চলকে। ইয়েমেনের মাটিতে বিশ্বাসের যে চূড়ান্ত ভাঙন ধরেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ মানচিত্রকে নতুন করে এঁকে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২
ইয়েমেন: এক যুদ্ধ, দুই ভিন্ন লক্ষ্য।
ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল হুথিদের হটিয়ে আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে ক্ষমতায় ফেরাতে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দুই মিত্রের লক্ষ্য বদলে গেছে:
ক। সৌদি আরবের লক্ষ্য: সীমান্ত নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা।
ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষ্য হলো নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা। রিয়াদের জন্য এই লড়াই একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, কারণ ইয়েমেনের অস্থিরতা সরাসরি সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। দীর্ঘ ৬৮৪ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে কোনো শত্রুভাবাপন্ন গোষ্ঠী বা বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত হুথিদের একচ্ছত্র আধিপত্য সৌদি আরব কখনোই মেনে নিতে পারে না। তারা চায় ইয়েমেনে এমন একটি অনুগত ও অখণ্ড সরকার থাকুক, যারা রিয়াদের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করবে না। অখণ্ড ইয়েমেন বজায় থাকলে দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমানো সহজ হবে এবং সীমান্তের নিরাপত্তা ঝুঁকিও অনেকটা হ্রাস পাবে বলে সৌদি নীতিনির্ধারকরা মনে করেন। তাই ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সৌদির জন্য কেবল আঞ্চলিক প্রভাব নয়, বরং জাতীয় সংহতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খ। আমিরাতের লক্ষ্য: লোহিত সাগরে সামুদ্রিক সাম্রাজ্য।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের লক্ষ্য সৌদি আরবের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এটি মূলত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত। আবুধাবি লোহিত সাগর থেকে শুরু করে এডেন উপসাগর পর্যন্ত শক্তিশালী সামুদ্রিক সাম্রাজ্য বা ‘Port Empire’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের মূল দৃষ্টি ইয়েমেনের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ওপর নিবদ্ধ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা সরাসরি 'সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল' (STC)-এর মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে অস্ত্র, অর্থ এবং রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে লালন-পালন করছে। আমিরাতের পরোক্ষ সমর্থনে এই গোষ্ঠীটি এখন একটি স্বাধীন ‘দক্ষিণ ইয়েমেন’ গঠনের স্বপ্নে বিভোর, যা অখণ্ড ইয়েমেনের ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। মূলত দুবাই ও আবুধাবির বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় এই অঞ্চলের বন্দরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩
ডিসেম্বর ২০২৫: বিশ্বাসের চূড়ান্ত ভাঙন।
২০২৫ সালের শেষভাগে হাদরামাউত ও আল-মাহরায় এসটিসি (STC)-এর অতর্কিত অভিযান রিয়াদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ধৈর্যকে চূড়ান্তভাবে চুরমার করে দেয়। এই আগ্রাসনকে সৌদি আরব তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে দীর্ঘদিনের মিত্রতার আড়ালে জমে থাকা অবিশ্বাস এক নজিরবিহীন সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়।
ক। হাদরামাউত সংকট ও রিয়াদের নিরাপত্তা ঝুঁকি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইয়েমেনের হাদরামাউত এবং আল-মাহরা প্রদেশে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এসটিসি (STC) বাহিনীর আকস্মিক অভিযান সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙে দেয়। তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত অঞ্চলটি সরাসরি সৌদি সীমান্তের সাথে যুক্ত হওয়ায় এখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আধিপত্য রিয়াদের জন্য এক ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। সৌদি নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এই কৌশলগত অঞ্চলে আমিরাতি প্রক্সিদের নিয়ন্ত্রণ মানেই হলো সৌদির ঘরের দরজায় সরাসরি হুমকির ছায়া বিস্তার করা। দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যেখানে রিয়াদের অগ্রাধিকার, সেখানে এসটিসির এই আগ্রাসনকে তারা পিঠে ছুরিকাঘাত হিসেবেই দেখছে। হাদরামাউতের দখল হাতছাড়া হওয়া মানে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তকে চিরস্থায়ী অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দেওয়া, যা রিয়াদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এখানকার নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে পুরো ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদির পরাজয় নিশ্চিত হওয়া।
খ। মুকাল্লা বন্দরে হামলা ও রিয়াদের কঠোর বার্তা।
৩০ ডিসেম্বরের সেই নাটকীয় ঘটনাটি ছিল সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক, যখন মুকাল্লা বন্দরে আমিরাত থেকে আসা অস্ত্রের চালানে সৌদি জোট সরাসরি বিমান হামলা চালায়। এই নজিরবিহীন হামলা ছিল রিয়াদের পক্ষ থেকে আবুধাবির প্রতি একটি অত্যন্ত কঠোর ও সরাসরি সামরিক বার্তা যে, তারা আর আমিরাতের “প্রক্সি গেম” সহ্য করবে না। নিজেদের জোটসঙ্গীর পাঠানো অস্ত্রের ওপর বোমাবর্ষণ প্রমাণ করে যে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ফাটল এখন এক প্রকাশ্য এবং বিপজ্জনক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সৌদি আরব স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ইয়েমেনের মাটিতে তাদের জাতীয় স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করলে তারা মিত্র বাহিনীর সরঞ্জাম ধ্বংস করতেও দ্বিধা করবে না। এই বিমান হামলার ঘটনাটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে ওলটপালট এবং বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। মুকাল্লার আকাশে সৌদি ফাইটার জেটের গর্জন আসলে আমিরাতের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে রিয়াদের এক চরম হুঁশিয়ারি সংকেত। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার তথাকথিত ‘ভ্রাতৃত্ব’ যে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। মূলত এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তারের লড়াই এখন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
গ। কূটনৈতিক বহিষ্কার ও আনুষ্ঠানিক জোটের অবসান।
মুকাল্লায় হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যখন আমিরাতি সেনাদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়, তখন আনুষ্ঠানিক জোটের কঙ্কালসার রূপটি সবার সামনে উন্মোচিত হয়। জরুরি অবস্থা জারি করে আমিরাতি সৈন্যদের বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্ত ছিল মূলত রিয়াদের সাজানো একটি সুনিপুণ প্রশাসনিক চাল। এর মাধ্যমে রিয়াদ বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে তারা আমিরাতকে এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে চায়। একসময় যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল, আজ সেই আমিরাতি সেনাদের জন্য ইয়েমেনের মাটি রীতিমতো নিষিদ্ধ ও শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। এই বহিষ্কারাদেশ কেবল সামরিক ছিল না, বরং এটি ছিল আবুধাবির আঞ্চলিক প্রভাবকে সরাসরি নস্যাৎ করার একটি চরম রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এর ফলে ইয়েমেন যুদ্ধে তথাকথিত ‘আরব কোয়ালিশন’ বা জোটের অস্তিত্ব এখন কেবল ইতিহাসের পাতায় বা সরকারি নথিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
৪
ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা।
সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের এই ফাটল এখন কেবল ইয়েমেনের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৃহত্তর এবং বহুমুখী আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের এই লড়াই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল ও নতুন মোড় এনে দিয়েছে।
ক। ভিশন ২০৩০ ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের লড়াই।
সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার এই ফাটল এখন কেবল ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ সরাসরি দুবাইয়ের দীর্ঘদিনের ‘রিজিয়নাল হাব’ বা আঞ্চলিক কেন্দ্রের মর্যাদাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। রিয়াদ এখন কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তাদের মধ্যপ্রাচ্যের সদর দপ্তর সৌদি আরবে স্থানান্তরের জন্য ব্যাপক চাপ দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওপেক প্লাসে তেলের উৎপাদন কোটা এবং তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের ভিন্নধর্মী অবস্থান তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক আস্থায় চরম চির ধরিয়েছে। রিয়াদ চায় বিশ্ব অর্থনীতিতে একক আধিপত্য, যা আমিরাতের বাণিজ্যিক মডেলের জন্য একটি বড় ধরনের অস্তিত্বের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যকার পুরোনো মিত্রতা এখন এক তীব্র ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।
খ। সুদান সংকট, ইসরায়েল এবং কূটনৈতিক মেরুকরণ।
অর্থনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি সুদান যুদ্ধ এবং ইসরায়েল ইস্যুতে দুই দেশের কূটনৈতিক দূরত্ব এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সুদান যুদ্ধে সৌদি আরব সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে দেশটির সরকারি সেনাবাহিনীকে (SAF), যখন আমিরাত নেপথ্যে মদদ দিচ্ছে শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ-কে (RSF)। এই বিপরীতমুখী অবস্থান আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে দুই দেশের প্রভাব বিস্তারের এক রক্তক্ষয়ী ছায়াযুদ্ধ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে সৌদি আরবের অনড় অবস্থান দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক গভীর মেরুকরণ তৈরি করেছে। রিয়াদ যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, আবুধাবি সেখানে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত মিত্রতা গড়ে তুলছে। এই ভিন্নধর্মী আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি জোটের ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৫
হুথিদের ‘নীরব বিজয়’ ও সোমালিল্যান্ড ফ্যাক্টর।
সৌদি-আমিরাত জোটের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও দক্ষিণের রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উত্তর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রক হুথি বিদ্রোহীরা। শত্রুপক্ষের এই বিভাজন হুথিদের কেবল সামরিকভাবেই শক্তিশালী করেনি, বরং লোহিত সাগরের নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করেছে।
ক। বিভক্ত শত্রু ও হুথিদের শক্তি বৃদ্ধি।
অ্যান্টি-হুথি কোয়ালিশন বা হুথিবিরোধী জোট যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত, তখন উত্তর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রক হুথিরা এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে। সৌদি ও আমিরাতের মধ্যকার এই ছায়াযুদ্ধ হুথিদের ওপর সামরিক চাপ কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে তারা সানা ও কৌশলগত হুদাইদা বন্দরে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার সুযোগ পেয়েছে। শত্রুপক্ষের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে হুথিরা এখন কেবল প্রতিরক্ষা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছে। দক্ষিণ ইয়েমেনে স্থিতিশীলতার অভাব হুথিদের রাজনৈতিক বৈধতা ও প্রচারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জোরালো করার পথ প্রশস্ত করেছে।
খ। সোমালিল্যান্ড ফ্যাক্টর ও নতুন আঞ্চলিক উত্তেজনা।
লোহিত সাগরের প্রবেশপথে সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে সেখানে সম্ভাব্য ইসরায়েলি উপস্থিতির খবরে। হুথি নেতা আব্দুল মালিক আল-হুথি সম্প্রতি সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি কোনো স্থাপনা বা উপস্থিতিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু করার যে হুমকি দিয়েছেন, তা এই অঞ্চলে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। এই হুমকি কেবল কথার লড়াই নয়, বরং লোহিত সাগরের নৌ-বাণিজ্যে হুথিদের প্রভাব বিস্তারের একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক চাল। সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি বা পশ্চিমা প্রভাব বাড়লে তা হুথিদের জন্য সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে, যা তারা যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে চায়। এর ফলে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সমীকরণ এখন আরও জটিল হয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ।
৬
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: ওপেকের ঐক্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।
সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের এই অবনতি কেবল ইয়েমেনের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট জিসিসি (GCC)-র স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপেকের ভেতর এই দুই প্রভাবশালী দেশের ক্ষমতার রেষারেষি এবং তেলের উৎপাদন কোটা নিয়ে দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার ক্ষমতা রাখে। তবে এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার লড়াইয়ের সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ, যাদের জীবন আজ দুই মিত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষার যাতাকলে পিষ্ট। যখন রিয়াদ আর আবুধাবি নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য ক্ষমতার ঘুঁটি চালছে, তখন ইয়েমেনের কোটি কোটি মানুষ ভয়াবহ অনাহার ও মহামারীর মুখে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথগুলো এই দ্বন্দ্বের কারণে বিঘ্নিত হওয়ায় ইয়েমেন এখন এক নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার খেসারত দিতে গিয়ে একটি পুরো প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে পড়ে যাচ্ছে, যা কোনো রাজনৈতিক অর্জন দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়।
৭
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বর্তমান সম্পর্ককে একটি জটিল 'শীতল যুদ্ধ' হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে স্থায়ীভাবে বদলে দিচ্ছে। ইয়েমেনের মাটিতে রিয়াদ ও আবুধাবির বপন করা অবিশ্বাসের বীজ আজ এমন এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে, যা উপড়ে ফেলা কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা বা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পক্ষে সহজ নয়। দক্ষিণ ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই দুই মিত্রের মরণপণ লড়াই প্রকারান্তরে উত্তর ইয়েমেনে হুথিদের একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত সমীকরণে হুথিদের এই উত্থান কেবল সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তাকেই নয়, বরং বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতাকেও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এককালের অবিচ্ছেদ্য জোট আজ কেবল আনুষ্ঠানিক দলিলেই সীমাবদ্ধ, আর মাঠপর্যায়ে তাদের এই ছায়াযুদ্ধ ইয়েমেনকে এক ভয়াবহ খণ্ডবিখণ্ড ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ওপেকের তেল রাজনীতি থেকে শুরু করে হর্ন অফ আফ্রিকার বন্দর নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বের বিস্তৃতি প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি সীমান্ত সংঘাত নয় বরং আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের এক অন্তহীন প্রতিযোগিতা। সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের এই চূড়ান্ত পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবকে আরও বৈধতা দিতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল পাল্টে দেবে।
পোস্ট ভিউঃ 35